📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 পরের গাই দুইয়ে নেওয়া

📄 পরের গাই দুইয়ে নেওয়া


পরের উটনী, গাই বা ছাগল লুকিয়ে দুইয়ে নেওয়া এক প্রকার চুরি। সুতরাং ঐ দুধ খাওয়া হালাল নয়। মহানবী বলেন, "তোমাদের কেউ যেন অপরের পশু তার বিনা অনুমতিতে অবশ্যই না দোয়ায়। তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে যে, তার খাদ্য ও পানীয়র পাত্র ভেঙ্গে দেওয়া হোক এবং খাবারগুলো ছড়িয়ে পড়ুক? লোকেদের পশুর স্তন তো তাদের খাবার সঞ্চয় করে রাখে। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন অপরের পশু তার বিনা অনুমতিতে অবশ্যই না দোহায়।” (বুখারী, মুসলিম ১৭২৬নং)

মহানবী আরো বলেন, "ছিনিয়ে নেওয়া মাল মৃত প্রাণী অপেক্ষা অধিক পবিত্র নয়।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ১৯৮৬নং)

এ হল চুরি-ডাকাতির কয়েকটি নমুনা মাত্র। এ ছাড়া কত চোর যে কত রকমভাবে চুরি করে খায় এবং হারাম খায় তার সঠিক হিসাব কে জানে?
কিন্তু ঐ শ্রেণীর যালেম হারামখোরদের তওবা করা উচিত। যাতে তারাও আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আল্লাহর বান্দারাও তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
মহানবী বলেন, "যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভায়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যেদিন (ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম। (সেদিন) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।” (বুখারী ৩৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)

একদা আল্লাহর রসূল বললেন, "তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কাকে বলে?” সকলে বলল, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি যার টাকা-পয়সা নেই এবং কোন সম্পদও নেই।' তিনি বললেন, "কিন্তু আমার উম্মতের মধ্য হতে (প্রকৃত) নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, পক্ষান্তরে সে একে গালি দিয়ে থাকবে, ওকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকবে, এর ধন আত্মসাৎ করে থাকবে, ওর রক্তপাত ঘটিয়ে থাকবে এবং একে মেরে থাকবে (ইত্যাদি)। ফলে সেদিন তার নেকী তার প্রতিবাদীকে প্রদান করে (প্রতিশোধ) দেওয়া হবে। অনুরূপ দেওয়া হবে অন্যান্য (মযলুম) প্রতিবাদীকেও। এতে যদি তার বিচার নিষ্পত্তি শেষ হওয়ার পূর্বেই তার সমস্ত নেকী নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রতিবাদীদের গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম ২৫৮১, তিরমিযী ২৮১৮নং)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 ধোকা-ধাপ্পা দিয়ে চুরি

📄 ধোকা-ধাপ্পা দিয়ে চুরি


এক শ্রেণীর চোর আছে, যারা গোপনে চুরি করে না। তারা বরং চোখের সামনে ধোকা-ধাপ্পা দিয়ে লোকের কাছ থেকে মাল বাগিয়ে নেয়। যেমন, ক্রেতার বেশে দোকানে মাল নিয়ে দাম না দিয়ে উল্টে বাকী টাকা চাওয়া, বিক্রেতার বেশে মাল বা টিকিটের দাম টাকা নিয়ে নিইনি বলে অস্বীকার করে দ্বিতীয়বার টাকা নেওয়া। জ্ঞাননাশক কিছু খাইয়ে অজ্ঞান করে মাল নিয়ে চম্পট দেওয়া।
গাড়ি ভাড়া করে মাল নিয়ে যেতে যেতে মাঝ পথে স্টার্ট বন্ধ করে মুসাফিরকে গাড়ি ঠেলতে বলে স্টার্ট করে তার মাল সহ চম্পট।
হোটেলে খেয়ে পয়সা না দিয়ে কৌশলের সাথে পলায়ন। গাড়িতে তেল ভরে পয়সা না দিয়ে ভোঁ করে উধাও হওয়া।
পার্টস সারা যাবে না বলে পরিবর্তে নতুন লাগিয়ে দিয়ে ফেলে যাওয়া ঐ পার্টস সেরে বিক্রয় করা।

মহান আল্লাহ বলেন,
(( وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ)) (٤٣) سورة فاطر
অর্থাৎ, কুচক্র কুচক্রীদেরকেই পরিবেষ্টন করে। (সূরা ফাত্বির ৪৩ আয়াত)

আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোকা ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে’ ৬৪০৮ নং)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 সুদী কারবার ও তার উপার্জন

📄 সুদী কারবার ও তার উপার্জন


হারাম আল্লাহ তাআলা সূদকে সর্বতোভাবে কঠোররূপে হারাম গণ্য করেছেন এবং সুদখোরদের বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর রসূলের তরফ থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করে মানবজাতিকে ভীতিপ্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেন,
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَوْا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبوا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوْا فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَبِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (9) يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَوا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ ()
অর্থাৎ, যারা সূদ খায় তারা সেই ব্যক্তির মত দণ্ডায়মান হবে যাঁকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তা এ জন্য যে, তারা বলে, 'বেচা-কেনা তো সূদের মতই।' অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে বৈধ ও সূদকে অবৈধ করেছেন। সুতরাং যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে, তারপর সে বিরত হয়েছে, অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহর অধিকারভুক্ত। আর যারা পুনরায় (সূদ) নিতে আরম্ভ করবে, তারাই দোযখবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাক্বারাহ ২৭৫-২৭৬ আয়াত)

يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ )
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং বকেয়া সুদ ছেড়ে দাও; যদি তোমরা মু'মিন হও। যদি তোমরা না ছাড় তাহলে জেনে রাখ যে, এ হল আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শামিল। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা অত্যাচারী হবে না এবং অত্যাচারিতও না। (ঐ ২৭৮-আয়াত)

يَٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأْكُلُواْ ٱلرِّبَوٰاْ أَضْعَافًا مُّضَٰعَفَةً وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ وَٱتَّقُواْ ٱلنَّارَ ٱلَّتِىٓ أُعِدَّتْ لِلْكَٰفِرِينَ
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সূদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর, তবেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে। আর তোমরা সেই আগুনকে ভয় কর, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। (সূরা আ-লি ইমরান ১৩০ আয়াত)

মহানবী বলেন, "সাতটি ধ্বংসকারী কর্ম হতে দূরে থাক।” সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! তা কি কি?' তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক দেওয়া।” (বুখারী ২৭৬৬, মুসলিম ৮৯নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)

"সুদখোর, সূদদাতা, সূদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাকে অভিশাপ করেছেন। আর বলেছেন, "(পাপে) ওরা সকলেই সমান।” (মুসলিম ১৫৯৮নং)

"জেনেশুনে মানুষের মাত্র এক দিরহাম খাওয়া সূদ আল্লাহর নিকটে ৩৬ ব্যভিচার অপেক্ষা অধিক গুরুতর।” (আহমাদ ৫/৩৩৫, ত্বাবারানীর কাবীর ও আউসাত্ব, সহীহুল জামে' ৩৩৭৫নং)
অর্থাৎ, এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়ার গোনাহ ৩৬ বার ব্যভিচার করার গোনাহ অপেক্ষা অধিক গুরুতর ও বড়। বরং সুদ খাওয়ার সবচেয়ে ছোট গোনাহ হল নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার সমান!!

"সূদ খাওয়ায় রয়েছে ৭০ প্রকার পাপ। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মত!” (ইবনে মাজাহ ২২৭৮, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৪নং)

আবূ জুহাইফা কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল চামড়ায় দেগে নকশা করায় ও করে এমন মহিলাকে, সুদখোর ও সূদদাতাকে অভিশাপ করেছেন। কুকুর বিক্রয়ের মূল্য, বেশ্যাবৃত্তির উপার্জন গ্রহণ করতে তিনি নিষেধ করেছেন। আর মূর্তি (বা ছবি) নির্মাণকারীদেরকেও অভিশাপ করেছেন। (বুখারী ২২৩৮, আবু দাউদ ৩৪৮৩নং সংক্ষিপ্তভাবে) ('ব্যাংকের সূদ কি হালাল' এবং 'দেনা-পাওনা' বই দুটি একবার করে অবশ্যই পড়ে নিন।)

বলাই বাহুল্য যে, সূদের টাকা এবং সেই টাকার খাদ্য নিঃসন্দেহে হারাম। পেনসনে যদি সূদের গন্ধ থাকে, তাহলে তা হারাম। সুতরাং বেতন থেকে যা কাটা যায় তা বাদ দিয়ে বাকী বাড়তি টাকা খরচ করে দিতে হবে।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 জুয়া ও লটারী

📄 জুয়া ও লটারী


হারজিত খেলা জুয়া বা লটারীতে বহু মানুষ হারে, জিতে কম। পক্ষান্তরে খেলা কর্তৃপক্ষ সর্বদাই জিতে ও বহু মানুষের অর্থ লুটে থাকে।
জুয়া ইসলামে হারাম ঘোষণা হওয়ার পশ্চাতে যে যুক্তি ও মহান উদ্দেশ্য আছে তা জ্ঞানী মানুষের কাছে অজানা নয়।

১। মুসলমানের পক্ষে অর্থোপার্জনে আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়ম ও পথ অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য। কার্যকারণের মাধ্যমে ফললাভ করতে চাওয়া উচিত। ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে হবে, অবলম্বিত কারণ বা কাজের ফল চাইতে হবে -এটাই ইসলামের লক্ষ্য। জুয়া-লটারী ও মানুষের মধ্যে ভাগ্য ও ভিত্তিহীন আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভরতা গ্রহণের প্রবণতা জাগায়। আল্লাহ অর্থোপার্জনের জন্যে যেসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা, শ্রম ও কার্যকারণ অবলম্বনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন ও আদেশ করেছেন, জুয়া তা গ্রহণের জন্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে না।

২। ইসলাম মুসলমানের জন্যে অপর লোকের মাল হারাম করে দিয়েছে। অতএব তার কাছ থেকে তা নেয়া যেতে পারে কেবলমাত্র শরীয়তসম্মত বিনিময় মাধ্যমে অথবা সে নিজের খুশিতে যদি দান করে বা হেবা উপহার দেয় তবেই তা নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য যে কোন উপায়ে তা নেয়া সম্পূর্ণ হারাম এ দৃষ্টিতেই বলা যায়, জুয়া হচ্ছে পরের ধন অপহরণের একটি বাতিল ও হারাম পদ্ধতি।

৩। জুয়া খেলা খোদ জুয়াড়ী ও খেলোয়াড়দের মধ্যে গভীর শত্রুতা ও হিংসা- প্রতিহিংসা সৃষ্টি করে দেয় অতি স্বাভাবিকভাবেই এবং এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। মুখের কথায় ও বাহ্যতঃ মনে হবে তারা পরস্পরের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, কিন্তু আসলে তাদের মধ্যে জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্ব ও হিংসা-প্রতিহিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে প্রতি মুহূর্ত। আর বিজিত (পরাজিত) চুপ হয়ে থাকলেও ক্রোধ, আক্রোশ ও ব্যর্থতার প্রতিহিংসায় সে জ্বলতেই থাকে। কেননা সে বিজিত এবং তার সব কিছুই সে খুইয়েছে। আর যদি সে ঝগড়া ও বাগবিতন্ডা করতে শুরু করে, তাহলে তার অন্তরে সেই চাপা ক্ষোভ তাকে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

৪। খেলায় বাজি হেরে গেলে বিজিত ব্যক্তি (ঋণ করে হলেও) আবার খেলতে শুরু করে। তখন সে আশা করতে থাকে যে, সে যা হারিয়েছে তা তো ফেরৎ পাবেই। সে সেই ধ্যানে মশগুল হয়। অপর দিকে বিজয়ী ব্যক্তির জিহবায় লোভ লেগে যায়, মুখে পানি টস্টস্ করতে থাকে। সে জন্যে সে বারবার খেলতে বাধ্য হয়। আরও বেশী বেশী অর্থ লুণ্ঠনের লোভ তাকে অন্ধ ও অপরিণামদর্শী বানিয়ে দেয়।
খেলার ধারাবাহিকতা এরূপেই অবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। জয়ী বা বিজিত কেউ কাউকে ছাড়তে প্রস্তুত হয় না।
এ কারণে জুয়া খেলার নেশা যেমন ব্যক্তির জন্যে বিপদ ডেকে আনে, তেমনি সমাজেও কঠিন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এ নেশা মানুষের শুধু ধন সম্পদই হরণ করে না, তার জীবনটাও বরবাদ করে দেয়।

৫। এই খেলা খেলোয়াড়দেরকে সম্পূর্ণ অকর্মণ্য বানিয়ে দেয়। তারা জীবনে অনেক কিছুই গ্রহণ করে, কিন্তু জীবনকে দেয় না কিছুই। তারা ভোগ করে, উৎপাদন করে না। জুয়াড়ী জুয়া খেলায় এতই মত্ত হয়ে যায় যে, তার নিজস্ব দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। বান্দার প্রতি আল্লাহর আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তার নিজের পরিবার, সমাজ ও জনগণের কথা স্মরণ আসা অসম্ভব থেকে যায়। এ ধরণের লোক নিজের স্বার্থের বিনিময়ে তার নিজের দ্বীন-ধর্ম, ইয্যত- হুরমত ও দেশকে বিক্রয় করে দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। (এমনকি নিজ স্ত্রীর অলংকার ও ইয্যত বিক্রয় করতে দ্বিধাবোধ করে না।) কেননা, জুয়ার আকর্ষণ এতই তীব্র যে, তার সম্মুখে অন্য কোন আকর্ষণ মুহূর্তের তরেও টিকতে পারে না। উপরন্তু জুয়াড়ীর অন্তরে জুয়া খেলার প্রতি প্রেম ও আসক্তি এত অধিক ও তীব্র হয় যে, সে সব ব্যাপারে ও সব ক্ষেত্রে জুয়া খেলতে শুরু করে দেয়। এমনকি সে এক অনির্দিষ্ট ও অনিশ্চিত উপার্জনের আশায় পড়ে তার নিজের ইয্যত ও মর্যাদা এবং তার নিজের ও গোটা জাতির আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গেও সে জুয়া খেলতে শুরু করে দেয়-এটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

কুরআন মাজীদ তার একটি আয়াত ও আদেশের মধ্যে মদ্য ও জুয়াকে একত্রিত করে ও একইভাবে হারাম ঘোষণা করে কত যে উচ্চমানের বাস্তবদর্শিতার প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে, তা বিশ্লেষণ করার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, এ দুটির ক্ষতি ও মারাত্মক অপকারিতা সমানভাবে প্রবর্তিত হয় ব্যক্তি, পরিবার, দেশ ও চরিত্র সব কিছুর উপর। জুয়ার নেশা মদের নেশার মতই সর্বাত্মক ও মারাত্মক। উপরন্তু এর একটি যেখানে তথায় অপরটির উপস্থিতি অবধারিত। (ডঃ ইউসুফ আল-কারয়াবী প্রণীত 'ইসলামে হালাল-হারামের বিধান' ৩৮৬-৩৮৭পৃঃ)

মহান আল্লাহ বলেন,
((يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا))
অর্থাৎ, লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, উভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য (যৎকিঞ্চিত) উপকারও আছে, কিন্তু ওদের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক। (সূরা বাকারাহ ২১৯ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ (۹۱) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ)) (۹২)
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ, সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? আল্লাহর অনুসরণ কর ও রসূলের অনুসরণ কর এবং সতর্ক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (সূরা মাইদাহ ৯০-৯২ আয়াত)

জুয়া খেলাই নয়, বরং তার প্রতি আহবান করাও মহাপাপ। তার প্রায়শ্চিত্তের সন্ধান দিয়ে প্রিয় নবী বলেন, "যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, 'এস জুয়া খেলি' সে যেন কিছু সাদকাহ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আম্র বিন আস-এর মতে এক শ্রেণীর খেলা জুয়ারূপে (অর্থের বাজি রেখে) খেললে শূকরের মাংস খাওয়ার মত পাপ হয় এবং অর্থের বাজি না রেখে জুয়ার মত না খেললেও তা শূকরের রক্তে হাত ডোবানোর মত পাপ হয়। (আল-আদাবুল মুফরাদ ১২৭৭নং)
এই শ্রেণীর খেলা হল, পাশা, দাবা, কিরাম, তাস, কড়ি, ছক্কা, লুডু, গুটি, মার্বেল ইত্যাদি খেলা। অকর্মণ্যদের এমন সময়হন্তা খেলা এমনিই বৈধ নয় ইসলামে। পরন্তু তার উপর অর্থের বাজি রাখলে জুয়ায় পর্যবসিত হয় সেসব খেলা। খেলায় যে জিতবে বা যার পয়েন্ট বেশী হবে সেই জিতবে সকলের তরফ থেকে বাজি রাখা অর্থ। আর জুয়ায় জিতা অর্থ যে হারাম তা বলাই বাহুল্য।

প্রকাশ থাকে যে, ফ্লাশ, নাইন কাট, তিন তাস, জোড়পাতি, কলব্রিজ প্রভৃতি নামে পরিচিত টাকা-পয়সা দিয়ে খেলাও এক এক প্রকার জুয়া খেলা।
টাকা জমা দিয়ে ভাগ্য-পরীক্ষার চাকা (ডাইস) ঘুড়িয়ে অথবা বোতাম টিপে যে কোন খেলা খেলে পুরস্কার জিতা হারাম। যেমন রিং ছুঁড়ে পুরস্কার জিতা বৈধ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাগ্যের চাকা বা রিং শূন্যের ঘরেই লাগে। অথবা পরিশেষে নাকের বদলে নরুন মিলে। অনেক সময় খেলা-কর্তৃপক্ষের ধোকাবাজির ফলে ভরা হাত শূন্য হয়ে যায়।
লাখ-কোটি মানুষের মাঝে টিকিট বিক্রয় করে লটারী খেলায় যে পুরস্কার দেওয়া হয়, তাও হারাম। হারাম খেলা-কর্তৃপক্ষের টিকিটের মাধ্যমে জমা করা বাকী অর্থ।
রাজ্য লটারী, থাইলেন্ডী লটারী আর যে লটারীই বলুন না কেন, মুসলিমের ভাগ্যাকাশে ধনবত্তার সূর্য উদিত করার জন্য সেসব বৈধ নয়। ধনী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তব করতে তাকে বৈধ কর্ম ও ব্যবসার পথই অবলম্বন করতে হয়। লাখ টাকা অর্জনের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে এক টাকার টিকিট কাটা যেমন বৈধ নয়, তেমনি বৈধ নয় এক টাকার টিকিট কেটে লাখ টাকা গ্রহণ করা।
পুরস্কারের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে দেওয়ার নিয়তেও লটারীতে শরীক হওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৪১পৃঃ)
প্রকাশ থাকে যে, বিমা বা ইনশুরেন্সেও এক প্রকার ভাগ্য-লটারী থাকে। আর সেই জন্য তা জুয়ার পর্যায়ভুক্ত কারবার।
আরো প্রকাশ থাকে যে, একই মানের একাধিক বিজয়ীদের মধ্য হতে কয়েক জনের মাঝে কোন বৈধ পুরস্কার বিতরণের জন্য যে লটারী করা হয়, তা অবৈধতার আওতাভুক্ত নয়। লটারীতে যার নাম আসবে, তার জন্য সেই পুরস্কার গ্রহণ করা বৈধ। যেমন কোন কাজ কে আগে করবে তা নিরপেক্ষভাবে দেখার জন্য কৃত লটারীও নিষিদ্ধ লটারী নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00