📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 ডাকাতি করে কামাই

📄 ডাকাতি করে কামাই


এক শ্রেণীর দুঃসাহসী চোর আছে, যারা প্রকাশ্যে মানুষের ঘরে, দোকানে অথবা ব্যাংকে প্রবেশ করে শক্তির জোরে অর্থ লুটে নিয়ে যায়। প্রাণঘাতের ভয় দেখিয়ে এবং অনেক সময় প্রাণহানি ঘটিয়ে তারা লোকের সম্পদ হরণ করে। এদেরকে বলা হয় ডাকাত। এই ডাকাত কিন্তু আরো বড় সমাজ-বিরোধী।

অন্য এক শ্রেণীর সমাজ-বিরোধী আছে, যারা শক্তির জোরে পথে-ঘাটে মানুষের সম্পদ ছিন্তাই করে, বাস ও ট্রেন থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অলংকার ও অর্থ লুটে। এই ডাকাত ও ছিন্তাইকারী দল যেমন মানুষের কাছে ঘৃণ্য, তেমনি আল্লাহর কাছেও ঘৃণ্য এবং ক্রোধভাজন। অবশ্য মানুষের আইনে তারা অনেক ক্ষেত্রে বহাল তবীয়তে বেঁচে যায় এবং সমাজের লোকে ভয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। কিন্তু আল্লাহর আইনে বাঁচার উপায় নেই। যেহেতু এই হারামখোররা হল দুনিয়ার বুকে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। শান্তির পরিবেশে অশান্তি সৃষ্টিকারী। নিরাপদ জনপদে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। তাই মনুষ্য-সমাজে এদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। বাঁচার অধিকার থাকলেও এমন অক্ষমভাবে তারা বেঁচে থাকবে, যাতে আর দ্বিতীয়বার ঐ শ্রেণীর দুষ্কর্ম না করতে পারে। এই শ্রেণীর অপরাধীদের জন্য ইসলামের সাধারণ আইন হলঃ-
((إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ )) (۳۳) سورة المائدة
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো করা হবে অথবা বিপরীতভাবে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। পৃথিবীতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। (সুরা মাইদাহ ৩৩ আয়াত)
পক্ষান্তরে তাদের সে অর্থ যে স্পষ্ট হারাম, তাতে কারো সন্দেহ নেই।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 পণবন্দী বানিয়ে অর্থগ্রহণ

📄 পণবন্দী বানিয়ে অর্থগ্রহণ


পণবন্দী বানিয়ে অর্থগ্রহণ এক প্রকার ডাকাতি। ছোট শিশু অথবা অবলা নারীকে অপহরণ করে বন্দী রেখে তার অভিভাবকের নিকট থেকে অর্থ দাবী করা এবং তা না দিলে ঐ পণবন্দীকে মেরে ফেলার হুমকী দেখানো অথবা মেরেই ফেলা আল্লাহর যমীনে ফাসাদ ছড়ানোর শামিল। আর ঐ মুক্তিপণ যে হারাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তদনুরূপ বিবাহের নামে স্ত্রীকে পণবন্দী করে পণ ও যৌতুক আদায় এক শ্রেণীর ভদ্র ডাকাতের অর্থ অপহরণের সুন্দর কৌশল। এরা স্ত্রীর প্রেম-ভালোবাসার আশাধারী নয়, সুখী সংসার গড়ার পক্ষপাতী নয়, এরা হল অর্থলোভী ও টাকা-প্রেমী। এরা হল সেই মৎস্য-শিকারী, যে বঁড়শীর উপরে টোপ লাগিয়ে মৎস্য শিকার করে। স্ত্রীর উপর মৌখিক ও দৈহিক অত্যাচার চালিয়ে জোর-যুলুম করে শ্বশুরের অর্থ গ্রহণ করে এরা। ফলে এরা যে কোন্ শ্রেণীর হারামখোর এবং এদের ঐ পণের টাকা যে কোন্ শ্রেণীর হারাম তা বলাই বাহুল্য।

মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) এক গ্রাসও কিছু ভক্ষণ করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ গ্রাস জাহান্নাম থেকে ভক্ষণ করাবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) একটি কাপড় পরিধান করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ কাপড় জাহান্নাম থেকে পরিধান করাবেন। ---" (আহমাদ, আবু দাউদ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০৮৩নং)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 পরের জমি জবরদখল করা

📄 পরের জমি জবরদখল করা


যেন-তেন-প্রকারেন পরের জমি অথবা জায়গা দখল করে ফসল উৎপাদন করে হারাম খায় এক শ্রেণীর হারামখোর। পদের জোরে অথবা জনশক্তির জোরে পরের জিনিসকে নিজের করে নিতে তাদের কোন অসুবিধা হয় না। ফলে 'লাঠি যার মাটি তারা। জোর যার মুলুক তার। জিসকী লাঠী উসকী ভ্যাইস।' একটি আইন বলে পরিগণিত হয়।

আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি (অন্যের) অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবরদখল করবে (কিয়ামতের দিন) সে ব্যক্তির ঘাড়ে ঐ জমির (নীচের) সাত (তবক) জমিনকে বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।” (বুখারী ২৪৫৩, মুসলিম ১৬১২নং)

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, "যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত খুঁড়তে আদেশ করবেন। অতঃপর তা তার গলায় বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত লোকেদের বিচার-নিষ্পত্তি শেষ হয়েছে (ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সাত তবক আধ হাত জমি তার গলায় লটকানো থাকবে)!" (আহমাদ ৪/১৭৩, ত্বাবারানীর কাবীর, ইবনে হিব্বান ৫১৪২, সহীহুল জামে' ২৭২২নং)

আরো এক বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি নাহক জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত নিচে ধসিয়ে দেবেন।” (বুখারী)

তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি সেই জিনিস দাবী করে, যে জিনিস তার নয়, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয় এবং সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নেয়।” (মুসলিম ৬১নং)

তিনি আরো বলেন, "আল্লাহর অভিসম্পাত সেই ব্যক্তির উপর যে গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে যবেহ করে, আল্লাহর অভিসম্পাত সেই ব্যক্তির উপর যে নিজ পিতামাতাকে অভিসম্পাত করে, আল্লাহর অভিসম্পাত সেই ব্যক্তির উপর যে কোন দুষ্কৃতকারী বা বিদআতীকে আশ্রয় দেয় এবং আল্লাহর অভিসম্পাত সেই ব্যক্তির উপর যে ভূমির (জমি-জায়গার) সীমা-চিহ্ন পরিবর্তন করে।” (মুসলিম ১৯৭৮নং)

অপরের স্থাবর-অস্থাবর ধন-সম্পত্তি দাবীর জোরে কাযীর কাছে কসম খেয়েও নিজের প্রমাণ করে খাওয়ার হারামখোর আল্লাহর নিকট অতি ঘৃণিত। মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের মাল অনধিকার আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে কসম করে, সে ব্যক্তি এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন।” আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, অতঃপর আল্লাহর রসূল এ কথার সমর্থনে আল্লাহর কিতাব থেকে এই আয়াত আমাদের জন্য পাঠ করলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَبِكَ لَا خَلَقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ))
অর্থাৎ, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আ-লি ইমরান ৭৭ আয়াত) (বুখারী ৬৬৭৬, ৬৬৭৭, মুসলিম ১১০নং, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

অপরের গাফলতি অথবা সরলতার সুযোগ নিয়ে তার জমি অথবা জায়গা ছলে-বলে কলে-কৌশলে রেকর্ড করে নেওয়াও জমি জবর-দখলের শামিল। অতএব মুসলিম হুশিয়ার!
কয়েক বছরের জিন্দেগীর জন্য পরের জমি নাহক দখল করে কবরে গেলে তার দ্বারা উপকৃত হবে উত্তরাধিকারীরা। আর দখলকারী কবরে কয়েক হাত জায়গা নিয়ে আযাব ভোগ ও আফশোস করতে থাকবে。

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 পরের গাই দুইয়ে নেওয়া

📄 পরের গাই দুইয়ে নেওয়া


পরের উটনী, গাই বা ছাগল লুকিয়ে দুইয়ে নেওয়া এক প্রকার চুরি। সুতরাং ঐ দুধ খাওয়া হালাল নয়। মহানবী বলেন, "তোমাদের কেউ যেন অপরের পশু তার বিনা অনুমতিতে অবশ্যই না দোয়ায়। তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে যে, তার খাদ্য ও পানীয়র পাত্র ভেঙ্গে দেওয়া হোক এবং খাবারগুলো ছড়িয়ে পড়ুক? লোকেদের পশুর স্তন তো তাদের খাবার সঞ্চয় করে রাখে। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন অপরের পশু তার বিনা অনুমতিতে অবশ্যই না দোহায়।” (বুখারী, মুসলিম ১৭২৬নং)

মহানবী আরো বলেন, "ছিনিয়ে নেওয়া মাল মৃত প্রাণী অপেক্ষা অধিক পবিত্র নয়।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ১৯৮৬নং)

এ হল চুরি-ডাকাতির কয়েকটি নমুনা মাত্র। এ ছাড়া কত চোর যে কত রকমভাবে চুরি করে খায় এবং হারাম খায় তার সঠিক হিসাব কে জানে?
কিন্তু ঐ শ্রেণীর যালেম হারামখোরদের তওবা করা উচিত। যাতে তারাও আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আল্লাহর বান্দারাও তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
মহানবী বলেন, "যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভায়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যেদিন (ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম। (সেদিন) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।” (বুখারী ৩৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)

একদা আল্লাহর রসূল বললেন, "তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কাকে বলে?” সকলে বলল, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি যার টাকা-পয়সা নেই এবং কোন সম্পদও নেই।' তিনি বললেন, "কিন্তু আমার উম্মতের মধ্য হতে (প্রকৃত) নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, পক্ষান্তরে সে একে গালি দিয়ে থাকবে, ওকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকবে, এর ধন আত্মসাৎ করে থাকবে, ওর রক্তপাত ঘটিয়ে থাকবে এবং একে মেরে থাকবে (ইত্যাদি)। ফলে সেদিন তার নেকী তার প্রতিবাদীকে প্রদান করে (প্রতিশোধ) দেওয়া হবে। অনুরূপ দেওয়া হবে অন্যান্য (মযলুম) প্রতিবাদীকেও। এতে যদি তার বিচার নিষ্পত্তি শেষ হওয়ার পূর্বেই তার সমস্ত নেকী নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রতিবাদীদের গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম ২৫৮১, তিরমিযী ২৮১৮নং)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00