📄 চুরি করা অর্থ
কিছু মানুষ আছে, যারা অর্থ উপার্জন করতে চায় না। এরা পরের জিনিসে লোভ করে তার চোখের আড়ালে অজান্তে সেই হিফাযতে রাখা জিনিস নিয়ে চম্পট দেয়। লোকের মেহনত বলে কামানো জিনিসে তাদের চোখ যায় এবং তা চুরি করে নিজের পেট চালায় ও বিলাসিতা করে। এমনকি সংসারের ছোট-খাট জিনিস চুরি করার ফলে ছিঁচকে চোরও চৌর্যবৃত্তিতে পাকা হয়ে যায়। 'আতি চোর পাতি চোর, হতে হতে সিঁদেল চোর।' আম চুরি, তাল চুরি, পেঁপে চুরি, গোশুশালা ও রান্নাশালায় গোশু চুরি, পরের পুকুরের মাছ চুরি, মাঠের ফসল চুরি, খামারের ধান চুরি, খড় চুরি, ছাগল-গরু চুরি, থালা-বাটি চুরি, টাকা-পয়সা ও অলংকার চুরি এবং এইভাবে সকল প্রকার চুরি রপ্ত হয়ে যায় চোর হারামখোরের।
চোর হাতের সাফাই এত বেশী যে, জাগ্রত অবস্থাতেও মানুষের পকেট থেকে টাকা চুরি করে নিতে পারে চোররা। বাসে-ট্রেনে বা কোন ভিড়ের জায়গায় একটু বেখেয়াল হলেই আপনার পকেট খালি হয়ে যাবে। এমনকি পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থান মক্কা মুকারামায় অবস্থিত কা'বাগৃহের তওয়াফকালে, অতি মাহাত্ম্যপূর্ণ ইবাদত হজ্জ বা উমরাহ করাকালে যখন হাজী সাহেবানদের মন একান্তভাবে আল্লাহ-অভিমুখী হয়, তখনও পকেট থেকে বেখেয়াল হওয়ার উপায় নেই। তখনও পৃথিবীর সর্বাধম পকেটমারটি হাজীর পকেট মারার জন্য তৎপর থাকে এবং অনেক হাজীকে বেহাল ও নাজেহাল করে ছাড়ে। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
ভাবতে অবাক লাগে সেই চোরের কথা শুনে, যে মসজিদের ভিতর থেকে মসজিদের আসবাব-পত্র চুরি করে। কত হীন ও দুঃসাহসিক সেই চোর যে, কবর খুঁড়ে লাশ অথবা তার কাফন চুরি করে। মহানবী এমন চোরকে অভিশাপ করেছেন। (বাইহাক্বী ৮/৩৭০, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৪৮নং)
বলা বাহুল্য, এটি একটি সামাজিক মহা অপরাধ। আর এই সমাজ-বিরোধী নোংরা মানুষটির হাত যা করে, তার জন্য রাখা হয়েছে উচিত ও উপযুক্ত শাস্তি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
(وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاء بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ)
অর্থাৎ, চোর ও চোরনীর কৃতকর্মের বিনিময় ও আল্লাহর তরফ থেকে শাস্তি স্বরূপ তোমরা তাদের (ডান) হাত কেটে দাও। আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, মহা প্রজ্ঞাময়। (সূরা মাইদাহ ৩৮ আয়াত)
মহানবী বলেন, "আল্লাহ চোরকে অভিশপ্ত করুন; সে ডিম (অথবা হেলমেট) চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায় এবং রশি চুরি করে, ফলে তার হাত কাটা যায়।” (বুখারী)
এই শ্রেণীর অপরাধী যখন অপরাধ করে, তখন সে মুমিন থাকে না; অর্থাৎ ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যায়। আল্লাহর রসূল বলেন, "কোন ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন মুমিন থাকা অবস্থায় সে ব্যভিচার করতে পারে না। কোন চোর যখন চুরি করে তখন মুমিন থাকা অবস্থায় সে চুরি করতে পারে না এবং কোন মদ্যপায়ী যখন মদ্যপান করে তখন মুমিন থাকা অবস্থায় সে মদ্যপান করতে পারে না।” (বুখারী ২৪৭৫, মুসলিম ৫৭নং, আসহাবে সুনান)
আর যে মক্কায় হাজীদের সামান চুরি করে এমন এক চোরের জন্য মহানবী বলেছেন, "--- এমনকি (সূর্য-গ্রহণের নামায পড়ার সময়) জাহান্নামে আমি এক মাথা বাঁকানো লাঠি-ওয়ালাকেও দেখলাম, সে তার নাড়িভুঁড়ি টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে; যে তার ঐ লাঠি দিয়ে হাজীদের সামান চুরি করত। লাঠির ঐ বাঁক দিয়ে সামান টেনে নিত। অতঃপর কেউ তা টের পেলে বলত, আমার লাঠিতে আপনা-আপনিই ফেঁসে গেছে, আর কেউ টের না পেলে সামানটি নিয়ে চলে যেত। (মুসলিম ১৫০৭নং)
চুরির জগতে চুরির নানা ধরন রয়েছে:-
ডাক-বিভাগের কোন কর্মচারী বা অন্য কারো চেক বা ড্রাফট্ চুরি। অর্থ ব্যয় করে যাদেরকে রক্ষক বানানো হয়, তারাই ভক্ষক হয়ে জনসাধারণের মাল চুরি করে।
সরকারী কারেন্ট চুরি। মাল সরকারের হলেও তা এক প্রকার চুরি। যা অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায়, তা লুকিয়ে বিনা পয়সায় ব্যবহার করা চুরি নয় তো কি? তদনুরূপ টেলিফোনের লাইন চুরি। লাইন চুরি করে ব্যবহার করা এবং বিল দিতে ফাঁকি দেওয়া, অথবা বিল অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া, অথবা চুরির লাইনে অর্থ কামানো ইত্যাদি সবই হারাম।
লাইব্রেরী থেকে গোপনে বই নেওয়া অথবা বই পড়তে নিয়ে ফেরৎ না দেওয়া এক প্রকার চুরি। দোকানে মাল কিনতে ঢুকে কোন প্রকারে কিছু মাল গোপনে রাখা অথবা হিসাবের বাইরে রাখাও চুরি ছাড়া আর কি?
📄 জিনিস ধার নিয়ে তা অস্বীকার করা
প্রয়োজনে মানুষ অপরের নিকট থেকে কোন না কোন জিনিস ধার নিয়ে সাময়িক ব্যবহার করার পর তা ফেরৎ দিয়ে থাকে। এমন কাজ যে সামাজিক সৌহার্দ্যপূর্ণ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এক শ্রেণীর হীন মানুষ আছে, যারা জিনিস ধার নিয়ে আর ফেরৎ দেয় না। ফেরৎ চাইতে গেলে অস্বীকার করে। এমন লোকও যে এক শ্রেণীর চোর তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মহানবী -এর যুগে (এক উচ্চবংশীয়া) মাখযুমী মহিলা অনুরূপভাবে লোকের কাছে জিনিস ধার নিত, অতঃপর তা অস্বীকার করত। এই শ্রেণীর চুরি করার ফলে ধরা পড়লে তাকে নিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন সহ কুরাইশ বংশের লোকেরা বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। (তার হাত যাতে কাটা না হয় সেই চেষ্টায়) তারা বলাবলি করল, 'ওর ব্যাপারে আল্লাহর রসূল -এর সঙ্গে কে কথা বলবে?' পরিশেষে তারা বলল, 'আল্লাহর রসূল -এর প্রিয়পাত্র উসামাহ বিন যায়দ ছাড়া আর কে (এ ব্যাপারে) তাঁর সাথে কথা বলার দুঃসাহস করবে?' সুতরাং (তাদের অনুরোধ মতে) উসামাহ তাঁর সাথে কথা বললেন (এবং ঐ মহিলার হাত যাতে কাটা না যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ করলেন)।
এর ফলে আল্লাহর রসূল বললেন, “হে উসামাহ! তুমি কি আল্লাহর দন্ডবিধিসমূহের এক দন্ডবিধি (কায়েম না হওয়ার) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?!" অতঃপর তিনি দন্ডায়মান হয়ে ভাষণে বললেন, "তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্যেই ধ্বংস হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোন উচ্চবংশীয় (বা ধনী) লোক চুরি করলে তারা তাকে (দন্ড না দিয়ে) ছেড়ে দিত। আর কোন (নিম্নবংশীয়, গরীব বা) দুর্বল লোক চুরি করলে তারা তার উপর দন্ডবিধি প্রয়োগ করত। পক্ষান্তরে আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা যদি চুরি করত, তাহলে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।” (বুখারী ৬৭৮৮, মুসলিম ১৬৮৮নং, আসহাবে সুনান)
অনুরূপভাবে কোন জিনিস আমনত রেখে অস্বীকার করাও সমপর্যায়ের অন্যায়।
📄 ডাকাতি করে কামাই
এক শ্রেণীর দুঃসাহসী চোর আছে, যারা প্রকাশ্যে মানুষের ঘরে, দোকানে অথবা ব্যাংকে প্রবেশ করে শক্তির জোরে অর্থ লুটে নিয়ে যায়। প্রাণঘাতের ভয় দেখিয়ে এবং অনেক সময় প্রাণহানি ঘটিয়ে তারা লোকের সম্পদ হরণ করে। এদেরকে বলা হয় ডাকাত। এই ডাকাত কিন্তু আরো বড় সমাজ-বিরোধী।
অন্য এক শ্রেণীর সমাজ-বিরোধী আছে, যারা শক্তির জোরে পথে-ঘাটে মানুষের সম্পদ ছিন্তাই করে, বাস ও ট্রেন থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অলংকার ও অর্থ লুটে। এই ডাকাত ও ছিন্তাইকারী দল যেমন মানুষের কাছে ঘৃণ্য, তেমনি আল্লাহর কাছেও ঘৃণ্য এবং ক্রোধভাজন। অবশ্য মানুষের আইনে তারা অনেক ক্ষেত্রে বহাল তবীয়তে বেঁচে যায় এবং সমাজের লোকে ভয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। কিন্তু আল্লাহর আইনে বাঁচার উপায় নেই। যেহেতু এই হারামখোররা হল দুনিয়ার বুকে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। শান্তির পরিবেশে অশান্তি সৃষ্টিকারী। নিরাপদ জনপদে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। তাই মনুষ্য-সমাজে এদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। বাঁচার অধিকার থাকলেও এমন অক্ষমভাবে তারা বেঁচে থাকবে, যাতে আর দ্বিতীয়বার ঐ শ্রেণীর দুষ্কর্ম না করতে পারে। এই শ্রেণীর অপরাধীদের জন্য ইসলামের সাধারণ আইন হলঃ-
((إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ )) (۳۳) سورة المائدة
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো করা হবে অথবা বিপরীতভাবে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। পৃথিবীতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। (সুরা মাইদাহ ৩৩ আয়াত)
পক্ষান্তরে তাদের সে অর্থ যে স্পষ্ট হারাম, তাতে কারো সন্দেহ নেই।
📄 পণবন্দী বানিয়ে অর্থগ্রহণ
পণবন্দী বানিয়ে অর্থগ্রহণ এক প্রকার ডাকাতি। ছোট শিশু অথবা অবলা নারীকে অপহরণ করে বন্দী রেখে তার অভিভাবকের নিকট থেকে অর্থ দাবী করা এবং তা না দিলে ঐ পণবন্দীকে মেরে ফেলার হুমকী দেখানো অথবা মেরেই ফেলা আল্লাহর যমীনে ফাসাদ ছড়ানোর শামিল। আর ঐ মুক্তিপণ যে হারাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তদনুরূপ বিবাহের নামে স্ত্রীকে পণবন্দী করে পণ ও যৌতুক আদায় এক শ্রেণীর ভদ্র ডাকাতের অর্থ অপহরণের সুন্দর কৌশল। এরা স্ত্রীর প্রেম-ভালোবাসার আশাধারী নয়, সুখী সংসার গড়ার পক্ষপাতী নয়, এরা হল অর্থলোভী ও টাকা-প্রেমী। এরা হল সেই মৎস্য-শিকারী, যে বঁড়শীর উপরে টোপ লাগিয়ে মৎস্য শিকার করে। স্ত্রীর উপর মৌখিক ও দৈহিক অত্যাচার চালিয়ে জোর-যুলুম করে শ্বশুরের অর্থ গ্রহণ করে এরা। ফলে এরা যে কোন্ শ্রেণীর হারামখোর এবং এদের ঐ পণের টাকা যে কোন্ শ্রেণীর হারাম তা বলাই বাহুল্য।
মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) এক গ্রাসও কিছু ভক্ষণ করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ গ্রাস জাহান্নাম থেকে ভক্ষণ করাবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) একটি কাপড় পরিধান করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ কাপড় জাহান্নাম থেকে পরিধান করাবেন। ---" (আহমাদ, আবু দাউদ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০৮৩নং)