📄 গুদামজাত করা মাল
আল্লাহর রসূল বলেন, "পাপী ছাড়া অন্য কেউ (দুষ্প্রাপ্যতার সময়) খাদ্য গুদামজাত করে না।” (মুসলিম ১৬০৫, আবু দাউদ ৩৪৪৭, তিরমিযী ১২৬৭, ইবনে মাজাহ ২১৫৪নং) বিশেষ করে দুষ্প্রাপ্যতার সময় খাদ্য গুদামজাত করে রেখে দাম বাড়ানো বৈধ নয়। মানুষ যখন খাদ্যের অভাবে পয়সা দিয়েও খাদ্য পায় না, তখন মজুদদারদের তা আটকে রাখা বৈধ নয়। বলা বাহুল্য, তারপরেই তা চড়া দামে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করা অর্থ অবশ্যই হারাম।
অবশ্য দুষ্প্রাপ্যতার বাজার না হলে খাদ্য-শস্য বেঁধে রেখে মূল্য বৃদ্ধি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তা বিক্রয় করা অবৈধ নয়। তদনুরূপ দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে জিনিসের দাম অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়ে ব্যবসা করা, ভিড়ের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে গাড়ির ভাড়া সীমাহীনভাবে বাড়িয়ে দেওয়া বৈধ নয়।
📄 রমযানের রোযার দিনে পানাহার
রমযানের রোযা প্রত্যেক সাবালক, জ্ঞানসম্পন্ন, সামর্থ্যবান, গৃহবাসী (অমুসাফির), সুস্থ ও সকল বাধা (মাসিক ও নিফাস) থেকে মুক্ত মুসলিম নরনারীর উপর ফরয। অতএব উক্ত প্রকার মানুষের জন্য রমযান মাসের যে কোন দিনে ফজর উদয়ের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ইত্যাদি হারাম।
রোযার দিনে সারাদিন রোযা থেকে কেউ যদি ইফতারীর সামান্য পূর্বেও কিছু খেয়ে নেয়, তবুও তা হারাম, তার রোযা বরবাদ এবং সে লোক মহান আল্লাহর নিকট শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
আল্লাহর রসূল বলেন, "একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊর্ধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন, 'আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন।' আমি বললাম, 'এ পাহাড়ে চড়তে আমি অক্ষম।' তাঁরা বললেন, 'আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দেব।' সুতরাং আমি চড়ে গেলাম। অবশেষে যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেশ কিছু চিৎকার-ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম 'এ চিৎকার-ধ্বনি কাদের?' তাঁরা বললেন, 'এ হল জাহান্নামবাসীদের চিৎকার-ধ্বনি।' পুনরায় তাঁরা আমাকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একদল লোক তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশবেয়ে রক্তও ঝরছে। নবী বলেন, আমি বললাম, 'ওরা কারা?' তাঁরা বললেন, 'ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত---।” (ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৯১নং)
📄 নিষিদ্ধ ভোজ ও ভোজন
কিছু লোক আছে, যারা ভোজবাজিতে প্রতিযোগিতা লাগায়। সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপরের সাথে কমপিটিশন করে। ও ভালো খাবার খাওয়ালে এ আরো ভালো খাবার খাইয়ে দেখায়, ও পাঁচ রকম খাওয়ালে এ সাত রকম করে খাওয়ায়। আর তাতে উদ্দেশ্য হয়, আপোসে গর্ব করা ও সুনাম নেওয়া। সুতরাং এই শ্রেণীর দাওয়াত আয়োজন বুঝতে পারলে কোন দাওয়াতেই অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়।
মহানবী বলেন, “(অলীমাভোজে) আপোসে প্রতিযোগিতাকারীদ্বয়ের দাওয়াত কবুল করা যাবে না এবং তাদের খাবারও খাওয়া হবে না।” (বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৬৬৭১নং)
তদনুরূপ কিছু আবেগময় দানবীর মানুষ আছে, যারা দানশীলতায় প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গর্ব ও লোকপ্রদর্শনীতে পতিত হয়। একজন গরু যবাই করে খাওয়ালে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অপরজন তার থেকে ভালো গরু যবাই করে বেশী লোককে খাওয়ায়। পরবর্তীতে প্রথমজন আবার তার থেকে ভালো গরু যবাই করে বেশী লোককে খাওয়ায় এবং অপরজনও অনুরূপ। আর এই ভাবে প্রতিযোগিতা করতে করতে পরিশেষে একজন হার মেনে নেয়। এমন ভোজবাজি বিরল হলেও তা আছে এবং ঐ ভোজ করা ও খাওয়া নিষিদ্ধ। যেহেতু মহানবী বেদুঈনদের প্রতিযোগিতামূলক যবাইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। (সহীহ আবু দাউদ ২৪৪৬নং)
📄 ভাগচাষ
যার জমি আছে, তার নিজে চাষ করা উচিত। সে যদি নিজে চাষ করতে না পারে, তাহলে তা পড়ে থাকতে না দিয়ে তার কোন মুসলিম ভাইকে কোন বিনিময় ছাড়া চাষ করতে দেওয়া উচিত। তা যদি না চায়, তাহলে সে জমি ফেলে রাখতে পারে। (বুখারী, মুসলিম)
কিন্তু জমি ফেলে রাখলে মালিকের ক্ষতি। ক্ষতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির। সুতরাং ফেলে রাখার চেয়ে তা চাষ করা বা করানোই উত্তম। আসলে জমি ভাগে বা ভাড়াতে দেওয়ার চাইতে মুসলিম ভাইকে চাষ করে খেতে দেওয়াই উত্তম ইসলামে। ইবনে আব্বাস বলেন, নবী জমি ভাগচাষে দিতে নিষেধ করেননি। আসলে তিনি বলেছেন, "নির্দিষ্ট কিছু নেওয়ার বিনিময়ে মুসলিম ভাইকে জমি চাষ করতে দেওয়ার চাইতে, তাকে বিনিময় ছাড়া চাষ করে খেতে দেওয়া উত্তম।” (বুখারী)
ভাগচাষে চুক্তি অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ভাগ অর্ধেক, একের-তিন অথবা যেমন উভয়ের পক্ষে সুবিধা তেমন একটা ভাগ নিয়ে জমি চাষ করানো বৈধ। মহানবী খায়বারের জমি ইয়াহুদীদেরকে অর্ধেক ভাগে চাষ করতে দিয়েছিলেন। (বুখারী, মুসলিম) অবৈধ হল নির্দিষ্ট পরিমাণের অথবা জমির নির্দিষ্ট একটা দিকের ফসল নিয়ে ভাগচাষ করা বা করানো। কারণ তাতে ধোকার আশঙ্কা আছে।
যেমন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে জমি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া দেওয়াও বৈধ। (বুখারী, মুসলিম ১৫৪৭নং) তাতে মালিক পাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঐ টাকা এবং চাষী ইচ্ছামত ফসল উৎপাদন করে নিতে পারবে।
প্রকাশ থাকে যে, জমির মালিক যদি নিজ জমির চাষ নিজে নাই করতে পারে, তাহলে তার জমির মালিকানা হাতছাড়া হবে না। অন্য কাউকে চাষ করতে দিলে চাষীর নামে রেকর্ড হয়ে যাবে না। যেহেতু শরীয়ত মতে কোন বিনিময় বা দান করা ছাড়া কোন কিছু বেহাত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া দেশের সরকার যদি সেই জমি মালিকের নিকট থেকে কেড়ে নিয়ে কাউকে দান করে, তাহলেও তা তা গ্রহণকারীর জন্য হালাল হবে না। বিশেষ করে যখন সে বুঝতে পারবে যে, এ জমির উপর তার কোন অধিকার নেই, তখন তা গ্রহণ করে চাষ করে খাওয়া এবং মালিককে ফসলের ভাগ মোটেই না দেওয়া তার জন্য বৈধ নয়। বিচারে জমি তার হলেও কোন বিচার হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতে পারে না।
মহানবী বলেন, “আমি তো একজন মানুষ মাত্র। আর তোমরা আমার নিকট বিচার নিয়ে আসছ। সম্ভবতঃ তোমাদের কেউ কেউ একে অন্যের চাইতে হুজ্জত ও দলীল পেশকরণে অধিক পারদর্শী। ফলে আমি তার নিকট থেকে আমার শোনা মতে তার সপক্ষে ফায়সালা দিয়ে তার ভায়ের কিছু হক তাকে দিয়ে দিই, তাহলে সে যেন তার কিছুই গ্রহণ না করে। যেহেতু আমি তো (এ অবস্থায়) তার জন্য (জাহান্নামের) আগুনের একটি অংশ কেটে দিই।” (বুখারী, মুসলিম ১৭১৩নং)
আর শরীয়তের ফায়সালা হল, "যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের জমি তাদের অনুমতি ছাড়া চাষ করবে, সে কেবল চাষের খরচ পাবে এবং জমির ফসলের কোন ভাগ পাবে না।” (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ৬২৭২নং)
সুতরাং মুসলিম বর্গাদারগণ একটু ভেবে দেখবেন যে, পরের জমি তাগূতী আইনের বলে জবরদখল করে ভোগ করলে তাঁরা সেই ব্যক্তিদের দলভুক্ত হচ্ছেন কি না, যাদের ব্যাপারে মহানবী বলেন,
“যে ব্যক্তি (অন্যের) অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবরদখল করবে (কিয়ামতের দিন) সে ব্যক্তির ঘাড়ে ঐ জমির (নীচের) সাত (তবক) জমিনকে বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।” (বুখারী ২৪৫৩, মুসলিম ১৬১২নং)
"যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত খুঁড়তে আদেশ করবেন। অতঃপর তা তার গলায় বেড়িস্বরূপ ঝুলিয়ে দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত না সমস্ত লোকেদের বিচার-নিষ্পত্তি শেষ হয়েছে (ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সাত তবক আধ হাত জমি তার গলায় লটকানো থাকবে)!” (আহমাদ ৪/১৭৩, ত্বাবারানীর কাবীর, ইবনে হিব্বান ৫১৪২, সহীহুল জামে' ২৭২২নং)
"যে ব্যক্তি অর্ধহাত পরিমাণও জমি নাহক জবর-দখল (আত্মসাৎ) করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন ঐ জমির সাত তবক পর্যন্ত নিচে ধসিয়ে দেবেন।” (বুখারী)
ভাগচাষ করতে গিয়ে বর্গাদারি করে মালিককে ভাগ না দিয়ে এবং তাকে সেই জমির স্বত্বাধিকার থেকে বঞ্চিত করে সেই জমির ফসল নিজের মনে করে খেয়ে যাওয়া হারাম খাওয়া ছাড়া আর কি হতে পারে? দেশের আইন সমর্থন করলেও তা যে আল্লাহর আইন সমর্থন করে না, তা জেনে রাখা উচিত আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী মুসলিমদের।
অবশ্য সরকার যদি তার অধিকৃত জমি কাউকে বৈধভাবে স্বত্বাধিকার প্রদান করে থাকে, তাহলে সে কথা ভিন্ন।