📄 পরের হক গ্রহণ
অনেক সময় জমি-জায়গা বা টাকা-পয়সা নিয়ে বিবাদ সৃষ্টি হয়। সেই বিবাদ মীমাংসার জন্য অনেক সময় থানা-পুলিস ও কোর্ট-হাকিমের সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু সেখানে দলীল-প্রমাণ ও সাক্ষী-সবুত ছাড়া মীমাংসা হয় না। নিজের হক হলেও তা হাকিমের কাছে দলীল বা সাক্ষী দ্বারা প্রমাণ করতে না পারলে বাহ্যতঃ সে হক তার নয়। বাহ্যতঃ যার হাতে আছে, মাল তারই। দলীল বা সাক্ষী ছাড়া ভিতরের খবর কে বলতে পারে? দলীল-সাক্ষী কিছু না থাকলে কসমের পালা আসে। প্রতিবাদী নির্দোষ বলে অথবা সে মাল তার বলে কসম খেতে পারলে তা তারই হয়ে যায়।
হাকিম বা বিচারক তো আর গায়বের খবর জানেন না। তিনি বাহ্যিক দলীল, সাক্ষী বা কসম দ্বারা বিচার করে দেন। কিন্তু অনেক সময় সে বিচার বাহ্যদৃষ্টিতে সঠিক হলেও বাস্তবদৃষ্টিতে বেঠিক হয়। হকদার দলীল বা সাক্ষী উপস্থিত করতে না পেরে নিজের হক থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য সে হক কিয়ামতে তার জন্য সংরক্ষিত থাকে।
কিন্তু প্রতিবাদী জেনেশুনে যদি বাদীর হক ঐ ফায়সালা অনুযায়ী গ্রহণ করে, তাহলে তা বিচারকের দেওয়া ফায়সালা বলে তার জন্য ঐ মাল হালাল হয়ে যাবে না। বাহ্যতঃ বিচারকের ফায়সালা পরের (হারাম) মালকে হালাল করতে পারে না।
এ ব্যাপারে দ্বীনের নবী বলেন, "আমি তো একজন মানুষ মাত্র। আর তোমরা আমার নিকট বিচার নিয়ে আসছ। সম্ভবতঃ তোমাদের কেউ কেউ একে অন্যের চাইতে দলীল ও প্রমাণ পেশকরণে অধিক পারদর্শী। ফলে আমি তার নিকট থেকে আমার শোনা মতে তার সপক্ষে ফায়সালা দিয়ে তার ভায়ের কিছু হক তাকে দিয়ে দিই, তাহলে সে যেন তার কিছুই গ্রহণ না করে। যেহেতু আমি তো (এ অবস্থায়) তার জন্য (জাহান্নামের) আগুনের একটি অংশ কেটে দিই।” (বুখারী, মুসলিম ১৭১৩নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি নিজের কসম দ্বারা কোন মুসলিমের অধিকার হরণ করে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ দোযখ ওয়াজেব এবং বেহেশ্ হারাম করে দেন।” লোকেরা বলল, 'যদিও সামান্য কিছু হয় তাও, হে আল্লাহর রসূল?!' বললেন, "যদিও বা পিলু (গাছের) একটি ডালও হয়।” (মালেক, মুসলিম ১৩৭, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২৩২৪নং) তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি এমন জিনিস দাবী করে যা তার নয়, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়। আর সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ৫৯৯০নং)
প্রকাশ থাকে যে, ইসলামে যার যে হক নেই, সেই হক যদি কোন তাগূতী সরকার দিয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই তা নাহক। ইসলাম কারো হক নষ্ট করেনি। ইসলামের ভাগবন্টনে সম্পূর্ণটাই ইনসাফ। যেহেতু মহান সৃষ্টিকর্তা কারো প্রতি যুলম করেন না। (সূরা ইউনুস ৪৪ আয়াত) এখন যদি কোন মুসলিম তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তাগূতী আইনের বলে নিজের নাহক অধিকার আদায় করে, তাহলে তা তার হারাম খাওয়া হবে।
📄 গুদামজাত করা মাল
আল্লাহর রসূল বলেন, "পাপী ছাড়া অন্য কেউ (দুষ্প্রাপ্যতার সময়) খাদ্য গুদামজাত করে না।” (মুসলিম ১৬০৫, আবু দাউদ ৩৪৪৭, তিরমিযী ১২৬৭, ইবনে মাজাহ ২১৫৪নং) বিশেষ করে দুষ্প্রাপ্যতার সময় খাদ্য গুদামজাত করে রেখে দাম বাড়ানো বৈধ নয়। মানুষ যখন খাদ্যের অভাবে পয়সা দিয়েও খাদ্য পায় না, তখন মজুদদারদের তা আটকে রাখা বৈধ নয়। বলা বাহুল্য, তারপরেই তা চড়া দামে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করা অর্থ অবশ্যই হারাম।
অবশ্য দুষ্প্রাপ্যতার বাজার না হলে খাদ্য-শস্য বেঁধে রেখে মূল্য বৃদ্ধি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তা বিক্রয় করা অবৈধ নয়। তদনুরূপ দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে জিনিসের দাম অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়ে ব্যবসা করা, ভিড়ের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে গাড়ির ভাড়া সীমাহীনভাবে বাড়িয়ে দেওয়া বৈধ নয়।
📄 রমযানের রোযার দিনে পানাহার
রমযানের রোযা প্রত্যেক সাবালক, জ্ঞানসম্পন্ন, সামর্থ্যবান, গৃহবাসী (অমুসাফির), সুস্থ ও সকল বাধা (মাসিক ও নিফাস) থেকে মুক্ত মুসলিম নরনারীর উপর ফরয। অতএব উক্ত প্রকার মানুষের জন্য রমযান মাসের যে কোন দিনে ফজর উদয়ের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ইত্যাদি হারাম।
রোযার দিনে সারাদিন রোযা থেকে কেউ যদি ইফতারীর সামান্য পূর্বেও কিছু খেয়ে নেয়, তবুও তা হারাম, তার রোযা বরবাদ এবং সে লোক মহান আল্লাহর নিকট শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
আল্লাহর রসূল বলেন, "একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊর্ধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন, 'আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন।' আমি বললাম, 'এ পাহাড়ে চড়তে আমি অক্ষম।' তাঁরা বললেন, 'আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দেব।' সুতরাং আমি চড়ে গেলাম। অবশেষে যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেশ কিছু চিৎকার-ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম 'এ চিৎকার-ধ্বনি কাদের?' তাঁরা বললেন, 'এ হল জাহান্নামবাসীদের চিৎকার-ধ্বনি।' পুনরায় তাঁরা আমাকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একদল লোক তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশবেয়ে রক্তও ঝরছে। নবী বলেন, আমি বললাম, 'ওরা কারা?' তাঁরা বললেন, 'ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত---।” (ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সহীহ তারগীব ৯৯১নং)
📄 নিষিদ্ধ ভোজ ও ভোজন
কিছু লোক আছে, যারা ভোজবাজিতে প্রতিযোগিতা লাগায়। সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপরের সাথে কমপিটিশন করে। ও ভালো খাবার খাওয়ালে এ আরো ভালো খাবার খাইয়ে দেখায়, ও পাঁচ রকম খাওয়ালে এ সাত রকম করে খাওয়ায়। আর তাতে উদ্দেশ্য হয়, আপোসে গর্ব করা ও সুনাম নেওয়া। সুতরাং এই শ্রেণীর দাওয়াত আয়োজন বুঝতে পারলে কোন দাওয়াতেই অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়।
মহানবী বলেন, “(অলীমাভোজে) আপোসে প্রতিযোগিতাকারীদ্বয়ের দাওয়াত কবুল করা যাবে না এবং তাদের খাবারও খাওয়া হবে না।” (বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৬৬৭১নং)
তদনুরূপ কিছু আবেগময় দানবীর মানুষ আছে, যারা দানশীলতায় প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গর্ব ও লোকপ্রদর্শনীতে পতিত হয়। একজন গরু যবাই করে খাওয়ালে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অপরজন তার থেকে ভালো গরু যবাই করে বেশী লোককে খাওয়ায়। পরবর্তীতে প্রথমজন আবার তার থেকে ভালো গরু যবাই করে বেশী লোককে খাওয়ায় এবং অপরজনও অনুরূপ। আর এই ভাবে প্রতিযোগিতা করতে করতে পরিশেষে একজন হার মেনে নেয়। এমন ভোজবাজি বিরল হলেও তা আছে এবং ঐ ভোজ করা ও খাওয়া নিষিদ্ধ। যেহেতু মহানবী বেদুঈনদের প্রতিযোগিতামূলক যবাইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। (সহীহ আবু দাউদ ২৪৪৬নং)