📄 বাগানের ফল
যে বাগানের মালী বা আগলদার নেই এবং যে বাগান ঘেরা-বেড়া দরজা বন্ধ নয়, সে বাগানের গাছ থেকে পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে খাওয়া অথবা নিচু গাছের ফল হাতে তুলে খাওয়া অবৈধ নয়। অবশ্য তা কুড়িয়ে বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। বাগানের আগলদার বা মালী আছে মনে হলে তিনবার ডাক দিয়ে অনুমতি নেওয়া উচিত। সাড়া না পাওয়া গেলে সেখান হতে অনুরূপ খাওয়া বৈধ। পক্ষান্তরে বাগানের গাছে উঠে অথবা ঢিল বা লাঠি মেরে পেড়ে খেতে পারে না। (আবু দাউদ ১৭১০, ইবনে মাজাহ ২৩০০-২৩০১নং দ্রঃ) যেমন ফল যদি গাদা করা থাকে, তাহলে তা নিশ্চয় বাগানের মালিক, মালী বা অন্য কেউ করেছে, অতএব সেই গাদা থেকে কিছু নেওয়াও বৈধ হবে না।
প্রকাশ থাকে যে, অধিকাংশের নিকট শর্ত হল, সে লোককে অভাবী ও ক্ষুধার্ত হতে হবে, নচেৎ পরের বাগানের ফল খাওয়া বৈধ হবে না। (আল-মুলাঙ্খাসুল ফিকহী ৪৬৫পৃঃ) অতএব পড়ে থাকা আম, জাম, তাল, কুল, বেল, তেঁতুল, প্রভৃতি ফল যদি ব্যক্তিগত মালিকানাভুক্ত হয়, কিন্তু মালিক তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে এবং কেউ যদি সে ফল না খায়, তাহলে তা এমনিই নষ্ট হয়ে যাবে অথবা সে সব খাওয়াতে যদি সমাজে প্রচলিত লৌকিক অনুমতি থাকে, তাহলে এ সব ক্ষেত্রে তা খাওয়া বৈধ; নচেৎ নয়।
পক্ষান্তরে গাছে উঠে বা ঢিল মেরে পেড়ে খাওয়া বৈধ নয়। বৈধ নয় তা কুড়িয়ে বা তুলে বিক্রয় করা। অবশ্য মালিকের কোন প্রকাশ্য, মৌন অথবা লৌকিক অনুমতি থাকলে সে কথা ভিন্ন।
বলাই বাহুল্য যে, পরহেযগার মানুষদেরকে এমন সন্দিগ্ধ ফল খাওয়া হতে দূরে থাকাই উচিত।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পরের জমি থেকে জমির ফসল নষ্ট করে অথবা তার পানি তুলে ফেলে মাছ ধরা কিংবা শাক তোলা বৈধ নয়। জেনেশুনে এমন মাছ বা শাক কিনে খাওয়াও বৈধ নয়। কেননা তাতে অন্যায়ের সহযোগিতা হয়।
📄 মস্তানি করে আদায়কৃত অর্থ
সমাজে কিছু 'বলাহীন শৃঙ্খল-ছেঁড়া' ও 'অভয়-চিত্ত ভাবনা-মুক্ত' যুবক মস্তান বা গুন্ডা আছে, যারা নিজের জন্য অথবা কোন মুআক্কেলের জন্য পরের জায়গা জবরদখল, চাঁদাবাজি অথবা 'সেলামী' আদায় করে থাকে এবং তাদেরকে তা না দিলে বিরোধীপক্ষের সর্বনাশ ঘটিয়ে থাকে। তাদের নীতি হল, 'হাতি চড়ে ভিক্ষা মাগি, ইচ্ছায় না দেও ঘর ভাঙ্গি।'
বলা বাহুল্য, তাদের এ কাজ অন্যায় ও যুলুম। যেহেতু তা এক শ্রেণীর ডাকাতি। অতএব অন্যায় ও হারাম তাদের ঐ আদায়কৃত অর্থ। যদিও তাদের কেউ কেউ দাবী করে যে, তারা নাকি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, লোহা দিয়ে লোহা কাটে, লোকের পড়ে থাকা ঋণ আদায় করে দেয়, উপেক্ষিতা নারীকে তার স্বামীর ঘরে বসিয়ে দিয়ে আসে, জোর করে চাঁদা নিয়ে সেই টাকা দিয়ে অনেক গরীবদের খিদমত করে। বিধবাদের দেখাশোনা করে, গরীব মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। --- ইত্যাদি।
কিন্তু বন্ধু! পেশাব দিয়ে পায়খানা ধুয়ে লাভ কি? পায়খানার গন্ধ গেলেও পেশাবের দুর্গন্ধ ও নাপাকী তো আর কম নয়। উল্লেখিত ভালো কাজগুলোর জন্য যাকাত ও দান-খয়রাতের অর্থ আদায় করে ফান্ড তৈরীর মাধ্যমে করা যায়। সমাজে সে ব্যবস্থা না থাকলে আন্দোলন ও দ্বীনী-জাগরণের মাধ্যমে জন-সাধারণকে সচেতন করে সে ফান্ড তৈরী করা জরুরী। তা সম্ভব না হলে মানুষের উপর যুলুম কোন প্রকারে বৈধ নয়। বৈধ নয় আইনকে হাতে নেওয়া। প্রশাসন খোঁড়া এবং আইন অন্ধ হলেও কোন সাধারণ মানুষের জন্য ইচ্ছামত আইন ও শাসন প্রয়োগ করা বৈধ নয়।
'সমাজই তো মস্তান তৈরী করে। পরিস্থিতির চাপে পড়েই অনেকে চোর-গুন্ডা-বদমাশ হয়।'-এ দাবী সত্য হলেও যা অন্যায় তা অন্যায়। কোনও সৎ উদ্দেশ্যে অন্যায় করা যেতে পারে না। যদিও বহু মস্তান অনুরূপ সৎ উদ্দেশ্য প্রকাশ করে অধিকাংশে নিজেদেরই প্রবৃত্তি-পূজা করে থাকে।
এই শ্রেণীর মানুষরা ইহ-পরকালে যে নিঃস্ব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একদা আল্লাহর রসূল বললেন, "তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কাকে বলে?” সকলে বলল, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি যার টাকা-পয়সা নেই এবং কোন সম্পদও নেই।' তিনি বললেন, "কিন্তু আমার উম্মতের মধ্য হতে (প্রকৃত) নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, পক্ষান্তরে সে একে গালি দিয়ে থাকবে, ওকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকবে, এর ধন আত্মসাৎ করে থাকবে, ওর রক্তপাত ঘটিয়ে থাকবে এবং একে মেরে থাকবে (ইত্যাদি)। ফলে সেদিন তার নেকী তার প্রতিবাদীকে প্রদান করে (প্রতিশোধ) দেওয়া হবে। অনুরূপ দেওয়া হবে অন্যান্য (মযলুম) প্রতিবাদীকেও। এতে যদি তার বিচার নিষ্পত্তি শেষ হওয়ার পূর্বেই তার সমস্ত নেকী নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রতিবাদীদের গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম ২৫৮১, তিরমিযী ২৮১৮-নং)
মহানবী বলেন, “নিশ্চয়ই চাঁদাবাজরা জাহান্নামে যাবে।” (সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪০৫নং) জোর-যুলুম করে চাঁদা ও ট্যাক্স আদায় করার পাপ বিরাট বলেই তার কথা উল্লেখ করে মহানবী ব্যভিচারের পাপে অনুতপ্তা ও দন্ডপ্রাপ্তা এক তওবাকারী মহিলার জন্য বলেছিলেন, "সে এমন তওবা করেছে যে, যালেম (চাঁদাবাজ) যদি অনুরূপ তওবা করে, তাহলে তাকেও ক্ষমা করা হবে! (আবু দাউদ ৪৪৪২ নং, 'সুখের সন্ধান' দ্রষ্টব্য)
এই শ্রেণীর চাঁদাবাজদের শ্রেণীভুক্ত লোক তারাও যারা:-
পদ বা দাপটের জোরে বিক্রেতাকে ন্যায্য মূল্য আদায় করে না। দোকানে দোকানে হুমকি দেখিয়ে চাঁদা অসূল করে। বাড়ির নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে চাঁদা আদায় করে। রাস্তায় গাড়ি আটকে চাঁদা আদায় করে। বিয়ের সময় গাড়ি আটকে জোর-জুলুম করে চাঁদা আদায় করে। নিষিদ্ধ মালের ভয় দেখিয়ে এয়ারপোর্টে, ট্রেনে, ষ্টেশনে মুসাফিরের পয়সা লুটে। কোন আপনজনকে অপহরণ করে পণবন্দী বানিয়ে টাকা অসুল করে।
আর তাদেরকে তাদের মাগা জিনিস না দেওয়া হলেই কোন ক্ষতি করে, প্রহার করে অথবা জানের হুমকি দেয়। পরের উপার্জিত হালাল রুযীতে তারা অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতে চায়। কত বড় নিকৃষ্ট যালেম তারা এবং কত বড় হীন ভিখারী তারা!
মহান আল্লাহ বলেন,
((إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ))
অর্থাৎ, কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অহেতুক বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা শূরা ৪২ আয়াত)
📄 অসিয়ত করা মাল
মৃত্যুর পূর্বে যে ধনী ব্যক্তি তার এক তৃতীয়াংশ মালের ভিতরে (ওয়ারেস নয় এমন) কোন আত্মীয়কে বা কোন প্রতিষ্ঠানকে বৈধ অসিয়ত (উইল) করে যায়, তাহলে তার মরণের পর সে অসিয়ত পালন করা ওয়াজেব এবং তাতে রদ্দ-বদল করা হারাম। বলা বাহুল্য, যার বা যে প্রতিষ্ঠানের জন্য অথবা যে কাজে অসিয়ত করা হয়েছে, তা পালন না করে নিজে ভক্ষণ করা হারাম।
যেমন কোন ওয়ারেসের নামে অসিয়ত করা হলে ওয়ারেসের সে মাল খাওয়া হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ (۱۸۰) فَمَن بَدَّلَهُ بَعْدَمَا سَمِعَهُ فَإِنَّمَا إِثْمُهُ عَلَى الَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ) (۱۸۱) فَمَنْ خَافَ مِن مُوصٍ جَنَفًا أَوْ إِثْمًا فَأَصْلَحَ بَيْنَهُمْ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (۱۸۲) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে যখন কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সে যদি ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তবে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-সুজনের জন্য বৈধভাবে 'অসিয়ত' করার বিধান দেওয়া হল। সাবধানীদের পক্ষে এটা অবশ্য পালনীয়। অতঃপর এ (বিধান) শোনার পরও যে এটিকে পরিবর্তন করে, তবে যে পরিবর্তন করবে তার উপরেই অপরাধ বর্তাবে। নিশ্চয়, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তবে যদি কেউ অসিয়তকারীর (সম্পত্তি বন্টনের নির্দেশদাতার) পক্ষপাতিত্ব অথবা অন্যায়ের আশংকা করে, অতঃপর সে তাদের পরস্পরের মধ্যে (কিছু রদ-বদল করে) সন্ধি করে দেয়, তবে তার কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (সূরা বাকারাহ ১৮০-১৮২)
প্রকাশ থাকে যে, পিতামাতা বা কোন ওয়ারেসের জন্য অসিয়ত করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী অতিরিক্ত নির্দেশ দিয়ে বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে নিজ নিজ হক দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং কোন ওয়ারেসের জন্য অসিয়ত নেই।” (আহমাদ, আবু দাউদ ২৮৭০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
অসিয়তের গুরুত্ব আছে বলেই। মহান আল্লাহ মীরাসের আয়াতে মীরাস বন্টনের পূর্বে অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা নিসা ১১-১২ আয়াত)
📄 ওয়াকফের মাল
যে মাল আল্লাহর ওয়াস্তে ওয়াক্ফ করা হয়, সে মাল মালিকের হাত থেকে বের হয়ে যায় এবং সে মাল তার হকদার ছাড়া অন্যের ভক্ষণ করা বৈধ নয়। সুতরাং মসজিদ, মাদ্রাসা, এতীমখানা, হাসপাতাল প্রভৃতি ওয়াকফের মালে যাদের অধিকার নেই তারা তা ভক্ষণ করতে পারে না। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২৩/৯১, ২৪/৫৯)