📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 কুড়িয়ে পাওয়া মাল

📄 কুড়িয়ে পাওয়া মাল


ইসলাম পরের মালকে হারাম ঘোষণা করেছে। পরের মাল আত্মসাৎ করাকে অবৈধ গণ্য করেছে। কেউ কোন মাল পথে-ঘাটে মালিকহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে তা কুড়িয়ে নেবে এবং খাবে কি না, তারও বিধান দিয়েছে ইসলাম।

১। পড়ে থাকা যে কোন জিনিসের যদি মালিক চিনতে পারেন, তাহলে সে জিনিস কুড়িয়ে রেখে তার মালিককে যে কোন প্রকারে সম্ভব হলে ফিরিয়ে দিন। জিনিসটি কার তা জানা গেলে, তা কুড়িয়ে গোপন করা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "মুমিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস দোযখের শিখা স্বরূপ।” (ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬২০নং)

২। কারো মালিকানাভুক্ত সীমানায় কিছু পড়ে থাকলে এবং তারই মাল বুঝা গেলে তা কুড়ানো বৈধ নয়। নষ্ট হওয়ার ভয় থাকলে কুড়িয়ে মালিককে প্রত্যর্পণ করা উচিত। আর এ সবে আপনি অবশ্যই আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন। পরন্ত মালের মালিক যদি খুশী হয়ে বখশিস স্বরূপ আপনাকে কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই।
কারো পুকুরে মরা মাছ ভেসে উঠলে, সে মাছের মালিকও পুকুরের মালিকই। অপর ব্যক্তির তুলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (অবশ্য পুকুর-মালিকের অনুমতি থাকলে সে কথা ভিন্ন।) পুকুরের ঘাটে পড়ে থাকা ঘটি-বাটির মালিক কে তা জানতে পারলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। মালিক জানা না গেলে, পুকুরের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরী নয়। কারণ, ঘাটে সাধারণ মহিলারাও ঘটি-বাটি ধুয়ে থাকে। সুতরাং তা প্রচার করে মালিক চিনতে হবে।

৩। পড়ে থাকা জিনিস যদি এমন নিম্ন পর্যায়ের হয়, যা হারিয়ে গেলে সাধারণতঃ লোকেরা তার খোঁজ করে না অথবা তার প্রতি কেউ ভ্রূক্ষেপ করে না, তাহলে তা কুড়িয়ে নিয়ে ব্যবহার করায় দোষ নেই। যেমন কাষ্ঠখন্ড, কোন ফল ইত্যাদি। একদা পথ চলতে চলতে মহানবী একটি খেজুর পড়ে থাকতে দেখে বললেন, "যদি আমার ভয় না হতো যে, এটি সদকার খেজুর, তাহলে তা আমি খেয়ে নিতাম।” (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ) যেহেতু যাকাত ও সদকাহ তাঁর জন্য হারাম ছিল।

৪। পড়ে থাকা মালিকহীন জিনিস যদি কোন এমন প্রাণী হয়, যাকে কোন হিংস্র প্রাণী সাধারণতঃ শিকার করতে সক্ষম নয় (যেমন: উট, ঘোড়া, গরু, মহিষ প্রভৃতি), তাহলে তা ধরে আনা বৈধ নয়। তদনুরূপ এমন জিনিস কুড়িয়ে আনা বৈধ নয়, যা নষ্ট হবার নয়; যেমনঃ গাছের গদি, লোহার বড় পাত ইত্যাদি। আল্লাহর নবী -কে হারিয়ে যাওয়া উটের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “তোমার সাথে তার সাথ কি? তার সঙ্গে তার পানীয় থাকে, জুতা থাকে। পানির জায়গায় এসে পানি খেয়ে এবং গাছপালা ভক্ষণ (করে বেঁচে থাকতে) পারে। পরিশেষে (খুঁজতে খুঁজতে) তার মালিক এসে তাকে পেয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম) তিনি আরো বলেন, "ভ্রষ্ট ছাড়া অন্য কেউ (এলান উদ্দেশ্য বিনা) ভ্রষ্ট পশুকে জায়গা দেয় না।” (আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ১৭২০নং)

৫। পড়ে থাকা মাল যদি এমন হয়, যা পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, (যেমনঃ সোনা-রূপা, টাকা, কাপড়, আসবাব-পত্র, ছাগল, ভেড়া, বাছুর গরু, উট বা ঘোড়ার বাচ্চা, হাঁস-মুরগী প্রভৃতি।) তাহলে তা কুড়িয়ে আনা বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলঃ-
(ক) আমানতদারী তথা লোভ সংবরণ করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
(খ) মালের সর্বপ্রকার গুণাগুণ জেনে নিতে হবে; অর্থাৎ, তার বাঁধন, পাত্র, পরিমাণ, প্রকার, রঙ ইত্যাদি মনে রাখতে হবে। যাতে সেই সূত্র ধরে আসল মালিককে তার মাল প্রত্যর্পণ করা সহজ হবে এবং নকল মালিক থেকে বাঁচা সম্ভব হবে।
(গ) এক বছর ধরে ঘোষণা করে তার মালিক খুঁজতে হবে। যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে লিখিত অথবা মৌখিক এলান দিয়ে এ কথা জানাতে হবে যে, সে পড়ে থাকা অমুক জিনিস পেয়েছে। যার জিনিস সে তার সঠিক পরিচিতি দিয়ে যেন তার কাছ থেকে নিয়ে যায়। চুপ থেকে গোপন করা অথবা কেউ খুঁজতে এলে দেব, নচেৎ না-এই মনে করে ভরে রাখা বৈধ নয়।
প্রকাশ থাকে যে, মসজিদের ভিতরে এলান করা বৈধ নয়। তবে মসজিদের বাহির দরজায় এলান করতে পারা যায়।
(ঘ) যখন তার মালিক এসে সঠিক পরিচিতি দিয়ে তার জিনিস বলে দাবী করবে, তখন বিনা দলীল ও কসমে সে জিনিস তাকে ফেরৎ দিতে হবে। ফেরৎ দিতে হবে সেই জিনিসও, যা ঐ জিনিস থেকে বৃদ্ধিলাভ করেছে।
এখানে এ কথাও খেয়াল রাখতে হবে যে, যদি দাবীদার মালিক তার ঐ জিনিসের সঠিক পরিচিতি না বলতে পারে অথবা তার ঐ বলাতে তার জিনিস নয় বলে সুনিশ্চিত হয়, তাহলে নিজে ঐ জিনিস থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য তাকেই দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। কারণ, তাতে আসল মালিক নিজ মাল হতে বঞ্চিত হয়ে যাবে।
(ঙ) এক বছর ঘোষণার পর যদি মালিক না আসে, তাহলে প্রাপক ঐ মালের পরিচিতি মনে রেখে ব্যবহার বা ভক্ষণ বা বিক্রয় করতে পারে। কিন্তু এক বছর পরেও যদি মালিক এসে তার সঠিক পরিচিতি বলে সেই মাল দাবী করে, তাহলে তাকে তার মূল্য ফেরৎ দিতে হবে।

৬। ছাগল-ভেড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রাপক ৩টির মধ্যে একটি কাজ করতে পারে:-
(এক) সঠিক পরিচিতি মনে রেখে সে তা এই নিয়তে যবেহ করে খেয়ে ফেলতে পারে যে, তার মালিক এলে তার মূল্য তাকে আদায় করে দেবে।
(দুই) সঠিক পরিচিতি মনে রেখে তা বিক্রি করে তার মূল্য আমানত রাখতে পারে। যাতে মালিক এলে তাকে তার আমানত ফিরে দিতে পারে।
(তিন) সেই পশু লালন-পালন করতে পারে। অতঃপর মালিক এলে তার বাচ্চা সহ তাকে ফেরৎ দিয়ে দেবে। অবশ্য সে মালিকের নিকট থেকে লালন-পালনের খরচ নিতে পারে।

৭। ফলের ঝুড়ি বা কার্টুন পড়ে থাকলে তা কুড়িয়ে নিয়ে প্রাপক এই নিয়তে খেতে বা দান করতে পারে যে, মালিক এলে তার মূল্য আদায় করে দেবে। নচেৎ কুড়িয়ে বিক্রি করে তার মূল্য জমা রেখে দেবে। অতঃপর এলানের এক বছরের ভিতরে অথবা তার পরে এলে সেই মূল্য মালিককে ফেরৎ দিয়ে দেবে। বলাই বাহুল্য যে, তা ভরে রেখে নষ্ট করা যাবে না।

৮। মক্কায় হাজীদের মাল কুড়ানো বৈধ নয়। হারাম-সীমানার ভিতরের কোন জিনিস কুড়ালে সারা জীবন এলান করতে হবে, কোন সময়ই তা প্রাপকের জন্য হালাল নয়। হারাম-সীমার বাইরের জিনিস হলে ১ বছর এলান করতে হবে। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৯৮০)
আল্লাহর রসূল মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই শহরকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন। এর কোন কাঁটা তোলা যাবে না, কোন শিকার (পশু-পাখী) চকিত করা যাবে না এবং প্রচার উদ্দেশ্যে ছাড়া এর কোন পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না।” (বুখারী ১৫৮৭নং)
তিনি হাজীদের পড়ে থাকা জিনিস কুড়াতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম ১০৬১নং)
উল্লেখ্যে যে, বহু জুতার মাঝে আপনার জুতা হারিয়ে গেলে পড়ে থাকা অন্য জুতা নেওয়া আপনার জন্য বৈধ নয়। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৯৭৮) তদনুরূপ অন্য জিনিসও। অবশ্য যদি আপনার জুতা বা জিনিসের জায়গায় কেবল এক জোড়া জুতা বা একটি জিনিসই পড়ে থাকে এবং সেখানে তার কোন মালিক না থাকে, তাহলে যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারা যায় যে, সে নিজের পরিবর্তে আপনারটা নিয়ে গেছে, তবে তা আপনি উঠিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সমমানের না হলে আপনাকে ঘোষণার মাধ্যমে সে মালিক খুঁজে বের করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আপনারটা বেশী দামের হলে আপনারটা যে নিয়েছে তাকে খুঁজবেন এবং কম দামের হলে খুঁজবেন না, তা কিন্তু চলবে না।

৯। পথে চলতে চলতে কোন পথিক যদি তার সওয়ারী মরণোন্মুখ হওয়ার জন্য ছেড়ে যায়, তাহলে প্রাপক তা নিয়ে বাঁচিয়ে তুললে, সে তার মালিক হয়ে যাবে। (আবু দাউদ ৩৫২৪নং)

১০। শিশু বা পাগল যদি কোন জিনিস কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে আসে, তাহলে তার তরফ থেকে তার অভিভাবক অনুরূপ এলান করবে।

১১। কোন জিনিস কুড়িয়ে আনার পর, তা পুনরায় সে জায়গায় ফেলে আসা বৈধ নয়। ফেলে এলে মালিককে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

১২। বিক্রীত পশু বা পাখী ঘরে পালিয়ে এলে এবং ক্রেতার ঠিকানা অজানা থাকলে, কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসের মত তার ব্যাপারে এক বছর এলান করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও গোপন করে, তা পুনরায় অন্যের কাছে বিক্রয় করা অথবা নিজে ভক্ষণ করা বৈধ নয়।

১৩। কারগো করা মাল প্রাপক ছাড়াতে না এলে অথবা ছাড়াতে না পারলে তা নিলাম করে বিক্রি করা হয়। অন্য কারো জন্য তা ক্রয় করা বৈধ। কিন্তু কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরী তার মূল্য প্রেরককে ফেরৎ দেওয়া। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৮/৯৬)

১৪। মহানবী বলেন, অদূর ভবিষ্যতে ফুরাত নদী একটি স্বর্ণভান্ডার (সোনার পাহাড়) প্রকাশিত করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হবে সে যেন তা হতে কিছুও গ্রহণ না করে। (বুখারী, মুসলিম)

১৫। মাটির নিচে পোঁতা স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রা অথবা অলংকার যার জায়গায় পাওয়া যাবে, তা তারই। তা বের করার পর ৫ ভাগ করে ১ ভাগ আল্লাহর রাস্তায় দান করতে হবে। (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)

প্রকাশ থাকে যে, কুড়িয়ে পাওয়া মাল যদি কেউ না খেয়ে আল্লাহর নামে দান করে দেয়, তবে সেটাই উত্তম। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, দান করলেও মালিকের বিনা অনুমতিতে দান করা হবে। অতএব দান করার পরে যদি মালিক এসে তার মাল ফেরৎ চায়, তাহলে তা বা তার মূল্য অবশ্যই আদায় করতে হবে।
বলাই বাহুল্য যে, কোন জিনিস কুড়িয়ে পাওয়াটা তত বড় বা মোটেই কোন সৌভাগ্যের দলীল নয়, যতটা লোকে মনে করে। কারণ, পরের জিনিস মালিক হয়ে ভোগ করার আগে যে সকল কর্তব্য আছে, তা পালন করা সকলের জন্য সহজ ব্যাপার নয়।

উল্লেখ্যে যে, কেউ যদি হিসাবে আপনাকে ভুল করে বেশী দেয় অথবা কম নেয় এবং আপনি তা বুঝতে পারেন তাহলে সে মাল আপনার জন্য হালাল নয়। সাথে সাথে সে মাল তার মালিককে ফেরৎ দিন। এ ক্ষেত্রে 'যো আপসে আতা হ্যায়, আনে দো' বলে সে মাল ভক্ষণ করবেন না। কারণ তা হারাম মাল。

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 বাগানের ফল

📄 বাগানের ফল


যে বাগানের মালী বা আগলদার নেই এবং যে বাগান ঘেরা-বেড়া দরজা বন্ধ নয়, সে বাগানের গাছ থেকে পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে খাওয়া অথবা নিচু গাছের ফল হাতে তুলে খাওয়া অবৈধ নয়। অবশ্য তা কুড়িয়ে বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। বাগানের আগলদার বা মালী আছে মনে হলে তিনবার ডাক দিয়ে অনুমতি নেওয়া উচিত। সাড়া না পাওয়া গেলে সেখান হতে অনুরূপ খাওয়া বৈধ। পক্ষান্তরে বাগানের গাছে উঠে অথবা ঢিল বা লাঠি মেরে পেড়ে খেতে পারে না। (আবু দাউদ ১৭১০, ইবনে মাজাহ ২৩০০-২৩০১নং দ্রঃ) যেমন ফল যদি গাদা করা থাকে, তাহলে তা নিশ্চয় বাগানের মালিক, মালী বা অন্য কেউ করেছে, অতএব সেই গাদা থেকে কিছু নেওয়াও বৈধ হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, অধিকাংশের নিকট শর্ত হল, সে লোককে অভাবী ও ক্ষুধার্ত হতে হবে, নচেৎ পরের বাগানের ফল খাওয়া বৈধ হবে না। (আল-মুলাঙ্খাসুল ফিকহী ৪৬৫পৃঃ) অতএব পড়ে থাকা আম, জাম, তাল, কুল, বেল, তেঁতুল, প্রভৃতি ফল যদি ব্যক্তিগত মালিকানাভুক্ত হয়, কিন্তু মালিক তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে এবং কেউ যদি সে ফল না খায়, তাহলে তা এমনিই নষ্ট হয়ে যাবে অথবা সে সব খাওয়াতে যদি সমাজে প্রচলিত লৌকিক অনুমতি থাকে, তাহলে এ সব ক্ষেত্রে তা খাওয়া বৈধ; নচেৎ নয়।

পক্ষান্তরে গাছে উঠে বা ঢিল মেরে পেড়ে খাওয়া বৈধ নয়। বৈধ নয় তা কুড়িয়ে বা তুলে বিক্রয় করা। অবশ্য মালিকের কোন প্রকাশ্য, মৌন অথবা লৌকিক অনুমতি থাকলে সে কথা ভিন্ন।
বলাই বাহুল্য যে, পরহেযগার মানুষদেরকে এমন সন্দিগ্ধ ফল খাওয়া হতে দূরে থাকাই উচিত।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পরের জমি থেকে জমির ফসল নষ্ট করে অথবা তার পানি তুলে ফেলে মাছ ধরা কিংবা শাক তোলা বৈধ নয়। জেনেশুনে এমন মাছ বা শাক কিনে খাওয়াও বৈধ নয়। কেননা তাতে অন্যায়ের সহযোগিতা হয়।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 মস্তানি করে আদায়কৃত অর্থ

📄 মস্তানি করে আদায়কৃত অর্থ


সমাজে কিছু 'বলাহীন শৃঙ্খল-ছেঁড়া' ও 'অভয়-চিত্ত ভাবনা-মুক্ত' যুবক মস্তান বা গুন্ডা আছে, যারা নিজের জন্য অথবা কোন মুআক্কেলের জন্য পরের জায়গা জবরদখল, চাঁদাবাজি অথবা 'সেলামী' আদায় করে থাকে এবং তাদেরকে তা না দিলে বিরোধীপক্ষের সর্বনাশ ঘটিয়ে থাকে। তাদের নীতি হল, 'হাতি চড়ে ভিক্ষা মাগি, ইচ্ছায় না দেও ঘর ভাঙ্গি।'

বলা বাহুল্য, তাদের এ কাজ অন্যায় ও যুলুম। যেহেতু তা এক শ্রেণীর ডাকাতি। অতএব অন্যায় ও হারাম তাদের ঐ আদায়কৃত অর্থ। যদিও তাদের কেউ কেউ দাবী করে যে, তারা নাকি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, লোহা দিয়ে লোহা কাটে, লোকের পড়ে থাকা ঋণ আদায় করে দেয়, উপেক্ষিতা নারীকে তার স্বামীর ঘরে বসিয়ে দিয়ে আসে, জোর করে চাঁদা নিয়ে সেই টাকা দিয়ে অনেক গরীবদের খিদমত করে। বিধবাদের দেখাশোনা করে, গরীব মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। --- ইত্যাদি।

কিন্তু বন্ধু! পেশাব দিয়ে পায়খানা ধুয়ে লাভ কি? পায়খানার গন্ধ গেলেও পেশাবের দুর্গন্ধ ও নাপাকী তো আর কম নয়। উল্লেখিত ভালো কাজগুলোর জন্য যাকাত ও দান-খয়রাতের অর্থ আদায় করে ফান্ড তৈরীর মাধ্যমে করা যায়। সমাজে সে ব্যবস্থা না থাকলে আন্দোলন ও দ্বীনী-জাগরণের মাধ্যমে জন-সাধারণকে সচেতন করে সে ফান্ড তৈরী করা জরুরী। তা সম্ভব না হলে মানুষের উপর যুলুম কোন প্রকারে বৈধ নয়। বৈধ নয় আইনকে হাতে নেওয়া। প্রশাসন খোঁড়া এবং আইন অন্ধ হলেও কোন সাধারণ মানুষের জন্য ইচ্ছামত আইন ও শাসন প্রয়োগ করা বৈধ নয়।

'সমাজই তো মস্তান তৈরী করে। পরিস্থিতির চাপে পড়েই অনেকে চোর-গুন্ডা-বদমাশ হয়।'-এ দাবী সত্য হলেও যা অন্যায় তা অন্যায়। কোনও সৎ উদ্দেশ্যে অন্যায় করা যেতে পারে না। যদিও বহু মস্তান অনুরূপ সৎ উদ্দেশ্য প্রকাশ করে অধিকাংশে নিজেদেরই প্রবৃত্তি-পূজা করে থাকে।

এই শ্রেণীর মানুষরা ইহ-পরকালে যে নিঃস্ব, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একদা আল্লাহর রসূল বললেন, "তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কাকে বলে?” সকলে বলল, 'আমাদের মধ্যে নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি যার টাকা-পয়সা নেই এবং কোন সম্পদও নেই।' তিনি বললেন, "কিন্তু আমার উম্মতের মধ্য হতে (প্রকৃত) নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, পক্ষান্তরে সে একে গালি দিয়ে থাকবে, ওকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকবে, এর ধন আত্মসাৎ করে থাকবে, ওর রক্তপাত ঘটিয়ে থাকবে এবং একে মেরে থাকবে (ইত্যাদি)। ফলে সেদিন তার নেকী তার প্রতিবাদীকে প্রদান করে (প্রতিশোধ) দেওয়া হবে। অনুরূপ দেওয়া হবে অন্যান্য (মযলুম) প্রতিবাদীকেও। এতে যদি তার বিচার নিষ্পত্তি শেষ হওয়ার পূর্বেই তার সমস্ত নেকী নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রতিবাদীদের গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম ২৫৮১, তিরমিযী ২৮১৮-নং)

মহানবী বলেন, “নিশ্চয়ই চাঁদাবাজরা জাহান্নামে যাবে।” (সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪০৫নং) জোর-যুলুম করে চাঁদা ও ট্যাক্স আদায় করার পাপ বিরাট বলেই তার কথা উল্লেখ করে মহানবী ব্যভিচারের পাপে অনুতপ্তা ও দন্ডপ্রাপ্তা এক তওবাকারী মহিলার জন্য বলেছিলেন, "সে এমন তওবা করেছে যে, যালেম (চাঁদাবাজ) যদি অনুরূপ তওবা করে, তাহলে তাকেও ক্ষমা করা হবে! (আবু দাউদ ৪৪৪২ নং, 'সুখের সন্ধান' দ্রষ্টব্য)

এই শ্রেণীর চাঁদাবাজদের শ্রেণীভুক্ত লোক তারাও যারা:-
পদ বা দাপটের জোরে বিক্রেতাকে ন্যায্য মূল্য আদায় করে না। দোকানে দোকানে হুমকি দেখিয়ে চাঁদা অসূল করে। বাড়ির নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে চাঁদা আদায় করে। রাস্তায় গাড়ি আটকে চাঁদা আদায় করে। বিয়ের সময় গাড়ি আটকে জোর-জুলুম করে চাঁদা আদায় করে। নিষিদ্ধ মালের ভয় দেখিয়ে এয়ারপোর্টে, ট্রেনে, ষ্টেশনে মুসাফিরের পয়সা লুটে। কোন আপনজনকে অপহরণ করে পণবন্দী বানিয়ে টাকা অসুল করে।
আর তাদেরকে তাদের মাগা জিনিস না দেওয়া হলেই কোন ক্ষতি করে, প্রহার করে অথবা জানের হুমকি দেয়। পরের উপার্জিত হালাল রুযীতে তারা অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতে চায়। কত বড় নিকৃষ্ট যালেম তারা এবং কত বড় হীন ভিখারী তারা!

মহান আল্লাহ বলেন,
((إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ))
অর্থাৎ, কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অহেতুক বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা শূরা ৪২ আয়াত)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 অসিয়ত করা মাল

📄 অসিয়ত করা মাল


মৃত্যুর পূর্বে যে ধনী ব্যক্তি তার এক তৃতীয়াংশ মালের ভিতরে (ওয়ারেস নয় এমন) কোন আত্মীয়কে বা কোন প্রতিষ্ঠানকে বৈধ অসিয়ত (উইল) করে যায়, তাহলে তার মরণের পর সে অসিয়ত পালন করা ওয়াজেব এবং তাতে রদ্দ-বদল করা হারাম। বলা বাহুল্য, যার বা যে প্রতিষ্ঠানের জন্য অথবা যে কাজে অসিয়ত করা হয়েছে, তা পালন না করে নিজে ভক্ষণ করা হারাম।

যেমন কোন ওয়ারেসের নামে অসিয়ত করা হলে ওয়ারেসের সে মাল খাওয়া হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ (۱۸۰) فَمَن بَدَّلَهُ بَعْدَمَا سَمِعَهُ فَإِنَّمَا إِثْمُهُ عَلَى الَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ) (۱۸۱) فَمَنْ خَافَ مِن مُوصٍ جَنَفًا أَوْ إِثْمًا فَأَصْلَحَ بَيْنَهُمْ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (۱۸۲) سورة البقرة
অর্থাৎ, তোমাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে যখন কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সে যদি ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তবে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-সুজনের জন্য বৈধভাবে 'অসিয়ত' করার বিধান দেওয়া হল। সাবধানীদের পক্ষে এটা অবশ্য পালনীয়। অতঃপর এ (বিধান) শোনার পরও যে এটিকে পরিবর্তন করে, তবে যে পরিবর্তন করবে তার উপরেই অপরাধ বর্তাবে। নিশ্চয়, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তবে যদি কেউ অসিয়তকারীর (সম্পত্তি বন্টনের নির্দেশদাতার) পক্ষপাতিত্ব অথবা অন্যায়ের আশংকা করে, অতঃপর সে তাদের পরস্পরের মধ্যে (কিছু রদ-বদল করে) সন্ধি করে দেয়, তবে তার কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (সূরা বাকারাহ ১৮০-১৮২)

প্রকাশ থাকে যে, পিতামাতা বা কোন ওয়ারেসের জন্য অসিয়ত করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী অতিরিক্ত নির্দেশ দিয়ে বলেন, “আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে নিজ নিজ হক দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং কোন ওয়ারেসের জন্য অসিয়ত নেই।” (আহমাদ, আবু দাউদ ২৮৭০নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

অসিয়তের গুরুত্ব আছে বলেই। মহান আল্লাহ মীরাসের আয়াতে মীরাস বন্টনের পূর্বে অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা নিসা ১১-১২ আয়াত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00