📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 এতীম, পাগল ও নির্বোধের মাল

📄 এতীম, পাগল ও নির্বোধের মাল


এতীম, পাগল ও নির্বোধ মানুষের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা হারাম। ইসলামে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এতীমের মাল সম্বন্ধে বলেন,
(( وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ)) (৩৪) سورة الإسراء
অর্থাৎ, পিতৃহীন বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্যে ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না। (সূরা ইসরা ৩৪ আয়াত)

(( وَآتُواْ الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُواْ الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلاَ تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كبيرًا)) (২) سورة النساء
অর্থাৎ, আর তোমরা পিতৃহীনকে তাদের ধন-সম্পদ সমর্পণ কর এবং উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্ট বদল করো না, এবং তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিশ্রিত করে গ্রাস করো না; নিশ্চয় তা মহাপাপ। (সূরা নিসা ২ আয়াত)

(( وَابْتَلُواْ الْيَتَامَى حَتَّى إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُم مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَأْكُلُوهَا إِسْرَافًا وَبَدَارًا أَن يَكْبَرُوا وَمَن كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَن كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ فَإِذَا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا))
অর্থাৎ, তোমরা পিতৃহীনদের প্রতি লক্ষ্য রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিবাহযোগ্য হয়; এবং তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখলে তাদের সম্পদ তাদের ফিরিয়ে দেবে। তারা বড় হয়ে যাবে বলে অন্যায়ভাবে তা তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যে অভাবমুক্ত সে যেন যা অবৈধ তা থেকে নিবৃত্ত থাকে এবং যে অভাবী সে যেন সঙ্গত পরিমাণে ভোগ করে। অতঃপর তোমরা যখন তাদের সম্পদ সমর্পণ করবে তখন সাক্ষী রেখো। আর হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা নিসা ৬ আয়াত)

(( وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللَّهَ وَلْيَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا (٩) إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سعيرًا)) (١٠) سورة النساء
অর্থাৎ, আর (পিতৃহীনদের সম্পর্কে) মানুষের ভয় করা উচিত, যদি তারা পিছনে অসহায় সন্তান ছেড়ে যেত (তাহলে) তারাও তাদের সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন হত। অতএব লোকের উচিত যে, (এতীম-অনাথ সম্পর্কে) আল্লাহকে ভয় করা এবং ন্যায়-সঙ্গত কথা বলা। নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। (সূরা নিসা ৯-১০ আয়াত)

মহানবী বলেন, “সাতটি সর্বনাশী কর্ম হতে দূরে থাক।” সকলে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! তা কি কি?' তিনি বললেন, “আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু করা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার ছাড়া আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা করা হারাম করেছেন তা হত্যা করা, সূদ খাওয়া, এতীমের মাল ভক্ষণ করা, (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) যুদ্ধের দিন পলায়ন করা এবং সতী উদাসীনা মুমিনা নারীর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।” (বুখারী ২৭৬৬, মুসলিম ৮৯নং, আবু দাউদ, নাসাঈ)

মহানবী বলেন, “হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বল; এতীম ও নারীর অধিকার নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে পাপ হওয়ার কথা ঘোষণা করছি।” (আহমাদ ২/৪৩৯, ইবনে মাজাহ ৩৬৭৮নং)

অতএব সাবধান হোক সেই অভিভাবকরা যারা অনাথ-এতীমের প্রতিপালন-দায়িত্ব নিয়ে থাকেন, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব নিয়ে তা পরিচালনা বা জমি-জায়গার দায়িত্ব নিয়ে চাষাদি করে থাকেন এবং তাঁরাও সাবধান হন যাঁরা এতীমখানা খুলে এতীমের মাল হরফ করে থাকেন।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 হালাল জিনিস হারাম করা

📄 হালাল জিনিস হারাম করা


কোনও কারণবশতঃ আল্লাহর দেওয়া হালাল জিনিসকে নিজের জন্য বা অপরের জন্য হারাম করা বৈধ নয়। একদা মহানবী কিছু স্ত্রীর উপর রাগ করে মধু খাওয়া হারাম করেছিলেন। তার জন্য মহান আল্লাহ তাঁকে বলেছিলেন,
(يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ)
অর্থাৎ, হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন, তুমি তোমার স্ত্রীদের খুশী করার জন্য তা অবৈধ করছ কেন? (সূরা তাহরীম ১ আয়াত, বুখারী ৫২৬৭নং)

অতঃপর তিনি তা হালাল করার বিধান দিয়ে বলেন,
((قَدْ فَرَضَ اللَّهُ لَكُمْ تَحلَّةَ أَيْمَانِكُمْ وَاللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ))
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের জন্য কসম থেকে অব্যাহতি লাভের বিধান দিয়েছেন। (সূরা তাহরীম ২ আয়াত)

আর সে বিধানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُواْ طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ (৮৭) وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللهُ حَلَالاً طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ)) (৮৮) لا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقْدتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَط مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كَسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ)) (৮৯) سورة المائدة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঐ সব পবিত্র বস্তু হারাম করো না, যেগুলিকে আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা লংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা লংঘনকারীকে পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তোমাদেরকে যে সকল বস্তু রুযী স্বরূপ দান করেছেন তার মধ্য হতে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার কর এবং তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী। তোমাদের অর্থহীন কসমের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে সেই কসমের জন্য পাকড়াও করবেন, যাতে তোমরা দৃঢ়তা অবলম্বন করেছ। সুতরাং এর কাফ্ফারা হল, ১০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করা-সেই মধ্যম ধরনের খাদ্য যা তোমরা তোমাদের পরিবার-পরিজনকে দান করে থাক, অথবা তাদেরকে বস্ত্রদান করা, অথবা ১টি দাসকে মুক্ত করা। (এ তিনের একটিতে) যদি কেউ অসমর্থ হয়, তাহলে সে তিন দিন রোযা পালন করবে। তোমরা কসম করলে এই হল তোমাদের কসমের কাফফারা। তোমরা তোমাদের কসমসমূহ রক্ষা কর। আল্লাহ এইভাবেই স্বীয় নিদর্শনাবলী বিবৃত করে থাকেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। (সূরা মাইদাহ ৮৭-৮৯ আয়াত)

বলাই বাহুল্য যে, 'আমার জন্য অমুক জিনিস হারাম, অমুক জিনিস খেলে আমি হারাম খাব, আল্লাহর কসম! আমি অমুক জিনিস খাব না, বা অমুকের বাড়ির জিনিস খাব না' ইত্যাদি বলে হারাম করলে তা খাওয়া হারাম। অবশ্য হারাম করা জিনিস কসমের কাফফারা দিয়ে হালাল করে নেওয়া উচিত।
তবে সতর্কতার বিষয় যে, জরিমানা ও প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ প্রথম তিন প্রকার কাফ্ফারা দেওয়ার সামর্থ্য থাকা অবস্থায় রোযা রাখা যথেষ্ট নয়।

মিসকীন খাওয়াবার পদ্ধতির ব্যাপারে উলামাগণ বলেছেন, কাফফারাদাতা ১০ জনকে দাওয়াত দিয়ে দুপুর অথবা রাতের মধ্যম ধরনের খাবার খাইয়ে দেবে অথবা প্রত্যেক মিসকীনকে সওয়া এক কিলো করে চাল দান করবে; যদি পরিবেশের প্রধান খাদ্য চাল হয়। নচেৎ ঐ পরিমাণ গম দান করবে; যদি দেশের প্রধান খাদ্য রুটি হয়।
১০ জনকে কাপড় দেওয়ার সময় সেই কাপড় দিতে হবে, যাতে নামায পড়া শুদ্ধ হয়। যেমন পুরুষকে দিলে একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি এবং মহিলাকে দিলে একটি (ফুলহাতা) ম্যাক্সি ও ওড়না দিলে যথেষ্ট হবে।
বর্তমানে যেহেতু ক্রীতদাস আমাদের দেশে নেই, পরন্তু তা মুক্ত করা ব্যয়বহুল ব্যাপার, সেই তুলনায় ১০ জন গরীবকে বস্ত্রদান করা সহজ। অবশ্য তার থেকেও সহজ ১০ জন মিসকীনকে খাদ্যদান করা। এখন যদি কেউ খাদ্যদান করতেও সক্ষম না হয়, তাহলে সে ৩ দিন রোযা পালন করে কাফফারা আদায় করবে।

তদনুরূপ কেউ যদি নযর মেনে বলে যে, আমি ভালো খাবার (মাছ-গোশ্ত) খাব না বা ফল খাব না, তাহলে তার এ ধরনের নযর বৈধ নয়। কিন্তু ঐ জিনিস খাওয়ার জন্য তাকে কসমের উক্তরূপ কাফ্ফারা দিতে হবে। (মিনহাজুল মুসলিম ৬৩৭পৃঃ)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 কুড়িয়ে পাওয়া মাল

📄 কুড়িয়ে পাওয়া মাল


ইসলাম পরের মালকে হারাম ঘোষণা করেছে। পরের মাল আত্মসাৎ করাকে অবৈধ গণ্য করেছে। কেউ কোন মাল পথে-ঘাটে মালিকহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে তা কুড়িয়ে নেবে এবং খাবে কি না, তারও বিধান দিয়েছে ইসলাম।

১। পড়ে থাকা যে কোন জিনিসের যদি মালিক চিনতে পারেন, তাহলে সে জিনিস কুড়িয়ে রেখে তার মালিককে যে কোন প্রকারে সম্ভব হলে ফিরিয়ে দিন। জিনিসটি কার তা জানা গেলে, তা কুড়িয়ে গোপন করা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "মুমিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস দোযখের শিখা স্বরূপ।” (ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬২০নং)

২। কারো মালিকানাভুক্ত সীমানায় কিছু পড়ে থাকলে এবং তারই মাল বুঝা গেলে তা কুড়ানো বৈধ নয়। নষ্ট হওয়ার ভয় থাকলে কুড়িয়ে মালিককে প্রত্যর্পণ করা উচিত। আর এ সবে আপনি অবশ্যই আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন। পরন্ত মালের মালিক যদি খুশী হয়ে বখশিস স্বরূপ আপনাকে কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই।
কারো পুকুরে মরা মাছ ভেসে উঠলে, সে মাছের মালিকও পুকুরের মালিকই। অপর ব্যক্তির তুলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (অবশ্য পুকুর-মালিকের অনুমতি থাকলে সে কথা ভিন্ন।) পুকুরের ঘাটে পড়ে থাকা ঘটি-বাটির মালিক কে তা জানতে পারলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। মালিক জানা না গেলে, পুকুরের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরী নয়। কারণ, ঘাটে সাধারণ মহিলারাও ঘটি-বাটি ধুয়ে থাকে। সুতরাং তা প্রচার করে মালিক চিনতে হবে।

৩। পড়ে থাকা জিনিস যদি এমন নিম্ন পর্যায়ের হয়, যা হারিয়ে গেলে সাধারণতঃ লোকেরা তার খোঁজ করে না অথবা তার প্রতি কেউ ভ্রূক্ষেপ করে না, তাহলে তা কুড়িয়ে নিয়ে ব্যবহার করায় দোষ নেই। যেমন কাষ্ঠখন্ড, কোন ফল ইত্যাদি। একদা পথ চলতে চলতে মহানবী একটি খেজুর পড়ে থাকতে দেখে বললেন, "যদি আমার ভয় না হতো যে, এটি সদকার খেজুর, তাহলে তা আমি খেয়ে নিতাম।” (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ) যেহেতু যাকাত ও সদকাহ তাঁর জন্য হারাম ছিল।

৪। পড়ে থাকা মালিকহীন জিনিস যদি কোন এমন প্রাণী হয়, যাকে কোন হিংস্র প্রাণী সাধারণতঃ শিকার করতে সক্ষম নয় (যেমন: উট, ঘোড়া, গরু, মহিষ প্রভৃতি), তাহলে তা ধরে আনা বৈধ নয়। তদনুরূপ এমন জিনিস কুড়িয়ে আনা বৈধ নয়, যা নষ্ট হবার নয়; যেমনঃ গাছের গদি, লোহার বড় পাত ইত্যাদি। আল্লাহর নবী -কে হারিয়ে যাওয়া উটের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “তোমার সাথে তার সাথ কি? তার সঙ্গে তার পানীয় থাকে, জুতা থাকে। পানির জায়গায় এসে পানি খেয়ে এবং গাছপালা ভক্ষণ (করে বেঁচে থাকতে) পারে। পরিশেষে (খুঁজতে খুঁজতে) তার মালিক এসে তাকে পেয়ে যায়।” (বুখারী, মুসলিম) তিনি আরো বলেন, "ভ্রষ্ট ছাড়া অন্য কেউ (এলান উদ্দেশ্য বিনা) ভ্রষ্ট পশুকে জায়গা দেয় না।” (আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ১৭২০নং)

৫। পড়ে থাকা মাল যদি এমন হয়, যা পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, (যেমনঃ সোনা-রূপা, টাকা, কাপড়, আসবাব-পত্র, ছাগল, ভেড়া, বাছুর গরু, উট বা ঘোড়ার বাচ্চা, হাঁস-মুরগী প্রভৃতি।) তাহলে তা কুড়িয়ে আনা বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলঃ-
(ক) আমানতদারী তথা লোভ সংবরণ করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
(খ) মালের সর্বপ্রকার গুণাগুণ জেনে নিতে হবে; অর্থাৎ, তার বাঁধন, পাত্র, পরিমাণ, প্রকার, রঙ ইত্যাদি মনে রাখতে হবে। যাতে সেই সূত্র ধরে আসল মালিককে তার মাল প্রত্যর্পণ করা সহজ হবে এবং নকল মালিক থেকে বাঁচা সম্ভব হবে।
(গ) এক বছর ধরে ঘোষণা করে তার মালিক খুঁজতে হবে। যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে লিখিত অথবা মৌখিক এলান দিয়ে এ কথা জানাতে হবে যে, সে পড়ে থাকা অমুক জিনিস পেয়েছে। যার জিনিস সে তার সঠিক পরিচিতি দিয়ে যেন তার কাছ থেকে নিয়ে যায়। চুপ থেকে গোপন করা অথবা কেউ খুঁজতে এলে দেব, নচেৎ না-এই মনে করে ভরে রাখা বৈধ নয়।
প্রকাশ থাকে যে, মসজিদের ভিতরে এলান করা বৈধ নয়। তবে মসজিদের বাহির দরজায় এলান করতে পারা যায়।
(ঘ) যখন তার মালিক এসে সঠিক পরিচিতি দিয়ে তার জিনিস বলে দাবী করবে, তখন বিনা দলীল ও কসমে সে জিনিস তাকে ফেরৎ দিতে হবে। ফেরৎ দিতে হবে সেই জিনিসও, যা ঐ জিনিস থেকে বৃদ্ধিলাভ করেছে।
এখানে এ কথাও খেয়াল রাখতে হবে যে, যদি দাবীদার মালিক তার ঐ জিনিসের সঠিক পরিচিতি না বলতে পারে অথবা তার ঐ বলাতে তার জিনিস নয় বলে সুনিশ্চিত হয়, তাহলে নিজে ঐ জিনিস থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য তাকেই দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। কারণ, তাতে আসল মালিক নিজ মাল হতে বঞ্চিত হয়ে যাবে।
(ঙ) এক বছর ঘোষণার পর যদি মালিক না আসে, তাহলে প্রাপক ঐ মালের পরিচিতি মনে রেখে ব্যবহার বা ভক্ষণ বা বিক্রয় করতে পারে। কিন্তু এক বছর পরেও যদি মালিক এসে তার সঠিক পরিচিতি বলে সেই মাল দাবী করে, তাহলে তাকে তার মূল্য ফেরৎ দিতে হবে।

৬। ছাগল-ভেড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রাপক ৩টির মধ্যে একটি কাজ করতে পারে:-
(এক) সঠিক পরিচিতি মনে রেখে সে তা এই নিয়তে যবেহ করে খেয়ে ফেলতে পারে যে, তার মালিক এলে তার মূল্য তাকে আদায় করে দেবে।
(দুই) সঠিক পরিচিতি মনে রেখে তা বিক্রি করে তার মূল্য আমানত রাখতে পারে। যাতে মালিক এলে তাকে তার আমানত ফিরে দিতে পারে।
(তিন) সেই পশু লালন-পালন করতে পারে। অতঃপর মালিক এলে তার বাচ্চা সহ তাকে ফেরৎ দিয়ে দেবে। অবশ্য সে মালিকের নিকট থেকে লালন-পালনের খরচ নিতে পারে।

৭। ফলের ঝুড়ি বা কার্টুন পড়ে থাকলে তা কুড়িয়ে নিয়ে প্রাপক এই নিয়তে খেতে বা দান করতে পারে যে, মালিক এলে তার মূল্য আদায় করে দেবে। নচেৎ কুড়িয়ে বিক্রি করে তার মূল্য জমা রেখে দেবে। অতঃপর এলানের এক বছরের ভিতরে অথবা তার পরে এলে সেই মূল্য মালিককে ফেরৎ দিয়ে দেবে। বলাই বাহুল্য যে, তা ভরে রেখে নষ্ট করা যাবে না।

৮। মক্কায় হাজীদের মাল কুড়ানো বৈধ নয়। হারাম-সীমানার ভিতরের কোন জিনিস কুড়ালে সারা জীবন এলান করতে হবে, কোন সময়ই তা প্রাপকের জন্য হালাল নয়। হারাম-সীমার বাইরের জিনিস হলে ১ বছর এলান করতে হবে। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৯৮০)
আল্লাহর রসূল মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই শহরকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন। এর কোন কাঁটা তোলা যাবে না, কোন শিকার (পশু-পাখী) চকিত করা যাবে না এবং প্রচার উদ্দেশ্যে ছাড়া এর কোন পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না।” (বুখারী ১৫৮৭নং)
তিনি হাজীদের পড়ে থাকা জিনিস কুড়াতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম ১০৬১নং)
উল্লেখ্যে যে, বহু জুতার মাঝে আপনার জুতা হারিয়ে গেলে পড়ে থাকা অন্য জুতা নেওয়া আপনার জন্য বৈধ নয়। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৯৭৮) তদনুরূপ অন্য জিনিসও। অবশ্য যদি আপনার জুতা বা জিনিসের জায়গায় কেবল এক জোড়া জুতা বা একটি জিনিসই পড়ে থাকে এবং সেখানে তার কোন মালিক না থাকে, তাহলে যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারা যায় যে, সে নিজের পরিবর্তে আপনারটা নিয়ে গেছে, তবে তা আপনি উঠিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সমমানের না হলে আপনাকে ঘোষণার মাধ্যমে সে মালিক খুঁজে বের করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আপনারটা বেশী দামের হলে আপনারটা যে নিয়েছে তাকে খুঁজবেন এবং কম দামের হলে খুঁজবেন না, তা কিন্তু চলবে না।

৯। পথে চলতে চলতে কোন পথিক যদি তার সওয়ারী মরণোন্মুখ হওয়ার জন্য ছেড়ে যায়, তাহলে প্রাপক তা নিয়ে বাঁচিয়ে তুললে, সে তার মালিক হয়ে যাবে। (আবু দাউদ ৩৫২৪নং)

১০। শিশু বা পাগল যদি কোন জিনিস কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে আসে, তাহলে তার তরফ থেকে তার অভিভাবক অনুরূপ এলান করবে।

১১। কোন জিনিস কুড়িয়ে আনার পর, তা পুনরায় সে জায়গায় ফেলে আসা বৈধ নয়। ফেলে এলে মালিককে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

১২। বিক্রীত পশু বা পাখী ঘরে পালিয়ে এলে এবং ক্রেতার ঠিকানা অজানা থাকলে, কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসের মত তার ব্যাপারে এক বছর এলান করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও গোপন করে, তা পুনরায় অন্যের কাছে বিক্রয় করা অথবা নিজে ভক্ষণ করা বৈধ নয়।

১৩। কারগো করা মাল প্রাপক ছাড়াতে না এলে অথবা ছাড়াতে না পারলে তা নিলাম করে বিক্রি করা হয়। অন্য কারো জন্য তা ক্রয় করা বৈধ। কিন্তু কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরী তার মূল্য প্রেরককে ফেরৎ দেওয়া। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৮/৯৬)

১৪। মহানবী বলেন, অদূর ভবিষ্যতে ফুরাত নদী একটি স্বর্ণভান্ডার (সোনার পাহাড়) প্রকাশিত করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হবে সে যেন তা হতে কিছুও গ্রহণ না করে। (বুখারী, মুসলিম)

১৫। মাটির নিচে পোঁতা স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রা অথবা অলংকার যার জায়গায় পাওয়া যাবে, তা তারই। তা বের করার পর ৫ ভাগ করে ১ ভাগ আল্লাহর রাস্তায় দান করতে হবে। (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)

প্রকাশ থাকে যে, কুড়িয়ে পাওয়া মাল যদি কেউ না খেয়ে আল্লাহর নামে দান করে দেয়, তবে সেটাই উত্তম। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, দান করলেও মালিকের বিনা অনুমতিতে দান করা হবে। অতএব দান করার পরে যদি মালিক এসে তার মাল ফেরৎ চায়, তাহলে তা বা তার মূল্য অবশ্যই আদায় করতে হবে।
বলাই বাহুল্য যে, কোন জিনিস কুড়িয়ে পাওয়াটা তত বড় বা মোটেই কোন সৌভাগ্যের দলীল নয়, যতটা লোকে মনে করে। কারণ, পরের জিনিস মালিক হয়ে ভোগ করার আগে যে সকল কর্তব্য আছে, তা পালন করা সকলের জন্য সহজ ব্যাপার নয়।

উল্লেখ্যে যে, কেউ যদি হিসাবে আপনাকে ভুল করে বেশী দেয় অথবা কম নেয় এবং আপনি তা বুঝতে পারেন তাহলে সে মাল আপনার জন্য হালাল নয়। সাথে সাথে সে মাল তার মালিককে ফেরৎ দিন। এ ক্ষেত্রে 'যো আপসে আতা হ্যায়, আনে দো' বলে সে মাল ভক্ষণ করবেন না। কারণ তা হারাম মাল。

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 বাগানের ফল

📄 বাগানের ফল


যে বাগানের মালী বা আগলদার নেই এবং যে বাগান ঘেরা-বেড়া দরজা বন্ধ নয়, সে বাগানের গাছ থেকে পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে খাওয়া অথবা নিচু গাছের ফল হাতে তুলে খাওয়া অবৈধ নয়। অবশ্য তা কুড়িয়ে বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। বাগানের আগলদার বা মালী আছে মনে হলে তিনবার ডাক দিয়ে অনুমতি নেওয়া উচিত। সাড়া না পাওয়া গেলে সেখান হতে অনুরূপ খাওয়া বৈধ। পক্ষান্তরে বাগানের গাছে উঠে অথবা ঢিল বা লাঠি মেরে পেড়ে খেতে পারে না। (আবু দাউদ ১৭১০, ইবনে মাজাহ ২৩০০-২৩০১নং দ্রঃ) যেমন ফল যদি গাদা করা থাকে, তাহলে তা নিশ্চয় বাগানের মালিক, মালী বা অন্য কেউ করেছে, অতএব সেই গাদা থেকে কিছু নেওয়াও বৈধ হবে না।

প্রকাশ থাকে যে, অধিকাংশের নিকট শর্ত হল, সে লোককে অভাবী ও ক্ষুধার্ত হতে হবে, নচেৎ পরের বাগানের ফল খাওয়া বৈধ হবে না। (আল-মুলাঙ্খাসুল ফিকহী ৪৬৫পৃঃ) অতএব পড়ে থাকা আম, জাম, তাল, কুল, বেল, তেঁতুল, প্রভৃতি ফল যদি ব্যক্তিগত মালিকানাভুক্ত হয়, কিন্তু মালিক তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে এবং কেউ যদি সে ফল না খায়, তাহলে তা এমনিই নষ্ট হয়ে যাবে অথবা সে সব খাওয়াতে যদি সমাজে প্রচলিত লৌকিক অনুমতি থাকে, তাহলে এ সব ক্ষেত্রে তা খাওয়া বৈধ; নচেৎ নয়।

পক্ষান্তরে গাছে উঠে বা ঢিল মেরে পেড়ে খাওয়া বৈধ নয়। বৈধ নয় তা কুড়িয়ে বা তুলে বিক্রয় করা। অবশ্য মালিকের কোন প্রকাশ্য, মৌন অথবা লৌকিক অনুমতি থাকলে সে কথা ভিন্ন।
বলাই বাহুল্য যে, পরহেযগার মানুষদেরকে এমন সন্দিগ্ধ ফল খাওয়া হতে দূরে থাকাই উচিত।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পরের জমি থেকে জমির ফসল নষ্ট করে অথবা তার পানি তুলে ফেলে মাছ ধরা কিংবা শাক তোলা বৈধ নয়। জেনেশুনে এমন মাছ বা শাক কিনে খাওয়াও বৈধ নয়। কেননা তাতে অন্যায়ের সহযোগিতা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00