📄 দান করে ফেরৎ নেওয়া মাল
যে জিনিস আল্লাহর রাস্তায় অপরকে দান করে দেওয়া হয়, উপহার ও উপঢৌকন স্বরূপ অপরকে দেওয়া হয়, তা তারই হয়ে যায়। সুতরাং দেওয়ার পর তা আর ফেরৎ নেওয়া যায় না। পক্ষান্তরে ব্যক্তিগত কোন দ্বন্দ বা আঘাতের ফলে যাদের মন ও মত পাল্টে যায় এবং সেই দেওয়া জিনিস ফেরৎ নেয়, তারা কিন্তু ভালো লোক নয়। তাদের জন্য সে মাল বৈধও নয়; কারণ তা হল স্বকৃত বমির মত।
মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি তার দানকৃত জিনিস ফেরৎ নেয়, সে ব্যক্তির উদাহরণ ঐ কুকুরের মত, যে বমি করে অতঃপর সেই বমি আবার চেঁটে খায়।” (বুখারী ২৬২১, ২৬২২, মুসলিম ১৬২২নং, আসহাবে সুনান)
অবশ্য এ ক্ষেত্রে পিতা-পুত্রের ব্যাপারটা আলাদা। যেহেতু পিতা তার পুত্রকে কোন জিনিস হেবা করে, তা ফেরৎ নিতে পারে। (সহীহুল জামে' ৭৬৫৫, ৭৬৮৬নং) যেহেতু পুত্রের সম্পত্তি পিতারই।
📄 ভিক্ষার মাল
ভিক্ষাবৃত্তি ইসলাম পছন্দ করে না। ইসলাম কর্ম পছন্দ করে এবং বসে খাওয়াকে ঘৃণা করে। একান্ত নিরুপায় অবস্থা ছাড়া অপরের নিকট হাত পাতা বৈধ নয় ইসলামে। একদা মহানবী এই কথার উপর বায়আত করতে উদ্বুদ্ধ করেন, "তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। পাঁচ অক্ত নামায আদায় কর। আনুগত্য কর এবং লোকের কাছে কোন কিছু চেয়ো না।” বর্ণনাকারী বলেন, আমি দেখেছি যে, তাঁদের কারো কারো হাত থেকে চাবুক পড়ে গেলে তা তুলে দেওয়ার জন্য কাউকে বলতেন না। (বরং সওয়ারী থেকে নিজে নেমে গিয়ে তা তুলে নিতেন।) (মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহ তারগীব ৮০৯নং)
মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি এ কথার নিশ্চয়তা দেবে যে, সে লোকের নিকট কিছু চাইবে না, আমি তার জন্য বেহেশ্বের নিশ্চয়তা দিব।” (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ তারগীব ৮১৩নং)
একদা হাকীম বিন হিযাম তিন তিনবার আল্লাহর রসূল-এর কাছে যাজ্ঞা করলে তিনি তাঁকে প্রত্যেক বারেই দান করলেন। শেষবারে তিনি বললেন, “ওহে হাকীম! এই মাল তরোতাজা মিষ্টি (ফলের মত)। সুতরাং যে তা নিজের প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে, তাকে তাতে বর্কত দান করা হবে। পক্ষান্তরে যে মনে লোভ রেখে তা গ্রহণ করবে, তাকে তাতে বর্কত দেওয়া হবে না। তার অবস্থা হবে সেই ব্যক্তির মত, যে খাবে অথচ তৃপ্ত হবে না। আর উপুড়হস্ত চিতহস্ত অপেক্ষা উত্তম।” এই কথার পর হাকীম কসম খেয়ে বলেছিলেন যে, তিনি এরপর আর কারো কাছে কিছু চাইবেন না। করেছিলেনও তাই। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহ তারগীব ৮১২নং)
সাহাবী কাবীসাহ বলেন, একবার এক অর্থদন্ডের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে থাকলে আমি সে ব্যাপারে সাহায্য নিতে আল্লাহর রসূল-এর কাছে এলাম। তিনি বললেন, "তুমি আমাদের কাছে থাক। সাদকার মাল এলে তোমাকে তা দিয়ে সাহায্য করব।" অতঃপর তিনি বললেন, "হে কাবীসাহ! তিন ব্যক্তি ছাড়া আর কারো জন্য চাওয়া বৈধ নয়;
(১) যে ব্যক্তি অর্থদন্ডে পড়বে (কারো দিয়াত বা জরিমানা দেওয়ার যামিন হবে), তার জন্য চাওয়া হালাল। অতঃপর তা পরিশোধ হয়ে গেলে সে চাওয়া বন্ধ করবে।
(২) যে ব্যক্তি দুর্যোগগ্রস্ত হবে এবং তার মাল ধ্বংস হয়ে যাবে, তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত চাওয়া বৈধ, যতক্ষণ তার সচ্ছল অবস্থা ফিরে না এসেছে।
(৩) যে ব্যক্তি অভাবী হয়ে পড়বে এবং তার গোত্রের তিনজন জ্ঞানী লোক এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে, অমুক অভাবী, তখন তার জন্য চাওয়া বৈধ।
আর এ ছাড়া হে কাবীসাহ অন্য লোকের জন্য চেয়ে (মেগে) খাওয়া হারাম। সে মাল খেলে হারাম খাওয়া হবে।” (মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, সহীহ তারগীব ৮১৭নং)
একদা এক আনসারী ব্যক্তি মহানবী -এর নিকট চাইতে এল। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার বাড়িতে কি কিছুই নেই?” লোকটি বলল, 'অবশ্যই আছে। জিনপোশের একটি কাপড়; যার অর্ধেক পরি ও অর্ধেক বিছাই। আর একটি বড় পাত্র; যাতে পানি পান করি।'
মহানবী বললেন, "নিয়ে এস সে দুটিকে।” লোকটি সে দুটিকে হাযির করলে আল্লাহর রসূল তা হাতে নিয়ে বললেন, "এ দুটিকে কে কিনবে?” এক ব্যক্তি বলল, 'আমি এক দিরহাম দিয়ে কিনব।' মহানবী বললেন, "কে এক দিরহাম থেকে বেশী দেবে?” এ কথা তিনি ২ অথবা ৩ বার বললেন। তারপর এক ব্যক্তি বলল, 'আমি ২ দিরহাম দিয়ে কিনব।' তিনি ২ দিরহামের বিনিময়ে ঐ জিনিস দুটিকে বিক্রয় করে দিলেন। অতঃপর ঐ দিরহাম আনসারীকে দিয়ে বললেন, "এর মধ্যে এক দিরহাম দিয়ে তুমি খাবার কিনে তোমার পরিবারকে দাও। আর অপর একটি দিরহাম দিয়ে একটি কুড়াল কিনে নিয়ে আমার কাছে এস।”
লোকটি তাই করল। কুড়ালটি নিয়ে মহানবী -এর দরবারে এসে উপস্থিত হল। তিনি নিজ হাতে তাতে একটি কাঠের বাঁট লাগিয়ে দিয়ে বললেন, "যাও এটা দিয়ে কাঠ কাট এবং তা বিক্রয় কর। আর যেন আমি পনের দিন তোমাকে না দেখতে পাই।"
লোকটি নির্দেশমত চলে গিয়ে কাঠ কেটে বিক্রয় করতে লাগল। অতঃপর একদিন সে তাঁর কাছে উপস্থিত হল। তখন সে ১০ দিরহামের মালিক। সে তার কিছু দিয়ে কাপড় কিনল এবং কিছু দিয়ে খাবার। আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, "কিয়ামতের দিন তোমার চেহারায় কালো দাগ নিয়ে উপস্থিত হওয়া থেকে এটা তোমার জন্য উত্তম। আসলে তিন ব্যক্তি ছাড়া অপর কারো জন্য চাওয়া (ভিক্ষা করা) বৈধ নয়; (১) অত্যন্ত অভাবী, (২) চূড়ান্ত দেনা বা জরিমানা দায়ে আবদ্ধ অথবা (৩) পীড়াদায়ক (খুনীর) রক্তপণের জন্য দায়ী ব্যক্তি।” (আবু দাউদ, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৮৩৪নং)
অন্য এক হাদীসে মহানবী বলেন, “তোমাদের কারো ভিক্ষা করে পাওয়া- না পাওয়ার চাইতে পিঠে কাঠের বোঝা বহন (করে তা বিক্রয় করে জীবিকা-নির্বাহ) করা উত্তম।” (মালেক, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ)
মহানবী বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যাজ্ঞা করতে থাকলে পরিশেষে যখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার মুখমন্ডলে এক টুকরাও মাংস থাকবে না।" (বুখারী ১৪৭৪, মুসলিম ১০১৪নং, নাসাঈ, আহমাদ ২/১৫)
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "যাচনা হল কিয়ামতের দিন যাচনাকারীর মুখের ক্ষত-স্বরূপ।” (আহমাদ, সহীহ তারগীব ৭৮৫নং)
"অভাব না থাকা সত্ত্বেও যে যাচনা করে কিয়ামতের দিন তার মুখমন্ডলে তা কলঙ্কের ছাপ হবে।” (ঐ ৭৯১নং)
তিনি আরো বলেছেন যে, "যে ব্যক্তি অভাব না থাকা সত্ত্বেও যাচনা করে (খেল), সে ব্যক্তি যেন জাহান্নামের অঙ্গার খেল।” (ত্বাবারানীর কাবীর, ইবনে খুযাইমা, বাইহাকী, সহীহ তারগীব ৭৯৩নং)
তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি নিজ মাল বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে লোকেদের নিকট যাচনা করে, প্রকৃতপক্ষে সে (দোযখের) অঙ্গার যাজ্ঞা করে। চাহে সে কম করুক অথবা বেশী।” (মুসলিম ১০৪১নং, ইবনে মাজাহ)
তিনি আরো বলেন, "যাজ্ঞাকারী যদি যাজ্ঞায় কি শাস্তি আছে তা জানত, তাহলে সে যাঞ্চা করত না।” (সহীহ তারগীব ৭৮৯নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, “তিনটি বিষয় এমন রয়েছে-সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ আছে-যদি আমি (সেগুলির বাস্তবতার উপরে) শপথ করি (তাহলে অযথা হবে না।) দান করার ফলে মাল কমে যায় না। সুতরাং তোমরা দান কর। যে কোনও বান্দা কারো অন্যায়কে ক্ষমা করে দেবে তার বিনিময়ে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে বান্দার ইজ্জত বৃদ্ধি করবেন। আর যে বান্দা যাঞ্চার দরজা খুলবে আল্লাহ তার জন্য অভাবের দরজা খুলে দেবেন।” (আহমদ, আবু য়্যা'লা, বায্যার, সহীহ তারগীব ৮০৫ নং)
বিশেষ করে আল্লাহর নাম নিয়ে যাচনা করার অপরাধ অধিক বেশী। আল্লাহর রসূল বলেন, "সে ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে আল্লাহর নামে কিছু যাজ্ঞা করে। আর সে ব্যক্তিও অভিশপ্ত, যার নিকট হতে আল্লাহর নামে কিছু যাা করা হয় অথচ সে যাজ্ঞাকারীকে দান করে না; যদি সে অবৈধ (বা অবৈধভাবে) কিছু না চেয়ে থাকে তবে। (ত্বাবারানী, সহীহ তারগীব ৮৪১ নং)
কুরআন তেলাঅত করে যাচনাও অবৈধ। অবৈধ দরজায় দরজায় বসে তেলাঅত করে ধানের সময় ধান, আলুর সময় আলু বা অন্য সময় টাকা-পয়সা বা অন্য জিনিস আদায় করা।
মহানবী বলেন, “তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বেহেস্ত প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তার মাধ্যমে দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাঅত করবে।' (আবু উবাইদ, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৫৮নং)
তিনি বলেন, “তোমরা কুরআন পাঠ কর এবং তার নির্দেশ পালন কর, তার ব্যাপারে অবজ্ঞা প্রদর্শন ও অতিরঞ্জন করো না এবং তার মাধ্যমে উদরপূর্তি ও ধনবৃদ্ধি করো না।” (সহীহুল জামে' ১১৬৮নং)
তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে, তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)
বৈধ নয় মিথ্যা বলে ভিক্ষা করা। যেহেতু তাতে রয়েছে ডবল হারাম ও ডবল পাপ; মিথ্যা বলার ও ভিক্ষা করার। মেয়ে নেই অথচ মেয়ের বিয়ের খরচ চেয়ে ভিক্ষা করা, মিথ্যা দুর্ঘটনা, অসুখ, বন্যা, ভূমিকম্প প্রভৃতিতে সব ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ভিক্ষা করা, নিজ হাতে কাটা পকেট দেখিয়ে ভিক্ষা করা ডবল হারাম।
যেমন বৈধ নয় মিথ্যা ভান (অভিনয়) করে ভিক্ষা করা। অভিনয় করে খুঁড়িয়ে হেঁটে নিজেকে কর্মে অক্ষম প্রমাণ করে, ছেঁড়া-ফাটা জামা-কাপড় পরে নিজেকে নিঃস্ব প্রমাণ করে, চোখে রঙিন চশমা পরে বা অন্য কোন প্রকার দৃষ্টিপাত করে নিজেকে অন্ধ প্রমাণ করে, পুরুষ হয়ে মহিলার বোরকা পরিধান করে, ভিখারীর নকল বেশ ধারণ করে এবং 'ভেক না করলে ভিক মিলে না'-এই নীতি অবলম্বন করে যাচনা করাও ডবল হারাম।
বৈধ নয় নামী লোকের নাম ভাঙ্গিয়ে যাচনা করা। নামী লোকের সুনামকে এমন নীচ কাজে ব্যবহার করা উচিত নয় তাঁর কোন আত্মীয়র জন্য।
বৈধ নয় যাজ্ঞার কাজে শিশুকে ব্যবহার করা।
বৈধ নয় ভিখারীদের নিয়ে ভিক্ষা-ব্যবসা করা। এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা কিছু ভিখারীর ভিক্ষাবৃত্তির পথ সহজ করে দিয়ে তাদের নিকট থেকে পার্সেন্টেজ গ্রহণ করে অথবা তাদেরকে মাসিক বেতন দিয়ে বাকী নিজের 'হাবিয়া' উদরে ভরে। বড় বড় শহরে ভিখারীদের সর্দারি করে অর্থ কামায়। পাশপোর্ট-ভিসা ও টিকিট ব্যবস্থা করে দানের দেশে নিয়ে এসে দুই হারাম শরীফ, ঐতিহাসিক স্থানসমূহ, তথা হজ্জের ময়দান মিনা-আরাফাতে ভিক্ষা করার সুযোগ ঘটিয়ে কমিশন খায় এক শ্রেণীর হারামখোর। এমন লোক আল্লাহর কাছে বড় অপরাধী তো বটেই, অপরাধী সে দেশের আইনের কাছেও।
থাকতে মেগে খাওয়া এক শ্রেণীর মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। বিনা পুঁজির ব্যবসা, তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি তো কিছু হয় না। পড়ে পাওয়া টাকা চোদ্দ আনাই লাভ। তাছাড়া মাগারামের বউ শুধু ভাতি খায় না। সুতরাং অভ্যাসগতভাবে ভালো খাওয়া ও ভালো পরার 'স্ট্যাটাস' বজায় রাখতে মেগে যেতেই হয়।
অনেকে আবার বংশগত ফকীর। কেউ তো আবার সংসারত্যাগী সন্নাসী (দরবেশ) বেশে ভিক্ষা করে খাওয়াকেই শ্রেষ্ঠ 'ধর্ম' মনে করে। অনেকে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও যাঞা করে। ঘরে খাবার থাকলে যাচনা বৈধ নয় বলে বাড়ি, গাড়ি, কল, পায়খানা প্রভৃতি করার উদ্দেশ্যে মোটা টাকা ঋণ করে যাকাত 'মেগে' বেড়ায়, কারণ ঋণগ্রস্তের জন্য যাকাত বৈধ। অনেকে প্রতিষ্ঠানের নামে যাচনা করে নিজে আত্মসাৎ করে। চাঁদার নামে চেয়ে নিজের পেট ভরে! কেউ বা ২০০ কে ২০ টাকা নতুবা ৫ (কিলো ধান, গম বা আলু)কে ৫ টাকা বানিয়ে জালসাজী করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও মিসকীনদের হক মেরে খায়! অথচ চাওয়া কাজের এই নির্লজ্জতা কত ভয়ানক! চাহে তা ভিখারীর বেশে হোক অথবা ধনীর বেশে।
ভিক্ষা এতই খারাপ জিনিস যে, তাতে সম্মানী মানুষের মান চলে যায়। আলেম সমাজের মান না থাকার একটা বড় কারণ এই ভিক্ষা। অথচ যাকাতের মাল আদায় করা বা দেওয়া ভিক্ষা করা বা দেওয়া নয়, আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর মাল চাওয়া ভিক্ষা করা নয়। আর তাতে মানীর মান যাওয়ারও কথা নয়। কিন্তু অন্ধ ও অকর্মণ্য সমাজ তার নামও ভিক্ষা রেখে দ্বীনী শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মর্যাদা ছোট করে ফেলেছে। সরকার যদি খরচ না দেয়, মুসলিম ধনীরা যদি নিজেদের পকেট থেকে দ্বীনী মাদ্রাসা না চালাতে পারে, তাহলে কি দ্বীনী শিক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে? আর তাহলে তো হারামখোরী আরো বেড়ে যাবে।
অতএব ভদ্র সমাজকে ভেবে দেখা দরকার যে, যা দেওয়া ফরয তা ভিক্ষা দেওয়া নয় এবং আল্লাহর হক আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে 'ভিক্ষা বা জরিমানা দিলাম' মনে করাও উচিত নয়।
পরিশেষে আবার বলি সামর্থ্যবানের জন্য ভিক্ষার মাল খাওয়া হারাম। হারাম কাউকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করা। বৃদ্ধ পিতামাতাকে না দেখলে তারা তো ভিক্ষা করতে বাধ্য। পণ বা যৌতুক ছাড়া বিবাহ না হলে তো মেয়ের বাবা ভিক্ষা করতে বাধ্য। সুতরাং এমন হতভাগা ছেলে ও জামাইরা সতর্ক হবেন কি?
📄 ঋণ করা অর্থ
একজন মুসলিমের অর্থ অপর মুসলিমের জন্য ঠিক সেই রকম হারাম, যে রকম হারাম তার রক্ত। (সহীহুল জামে' ৩১৪০ নং) সুতরাং ঋণ করার মাধ্যমে অপরের মাল খেয়ে এবং তা পরিশোধ না করার চেষ্টা করে আল্লাহর ইবাদত করা সমীচীন হতে পারে না কোন মুসলিমের জন্য।
ঋণ ঋণদাতার কাছ থেকে নেওয়া এক আমানত। বৈধ নয় সে আমানতে খেয়ানত করা। মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি ঋণ করার পর তার মনে পাকা এই সংকল্প রাখে যে, সে তা পরিশোধ করবে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে 'চোর' হয়ে সাক্ষাৎ করবে।” (ইবনে মাজাহ ২৪১০ নং)
এমন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদিও অন্যান্য দিকে ভাল লোক হয়, তবুও মরণের পর ঐ ঋণের কারণে তার আত্মা (বেহেশ্বের পথে) লটকে থাকবে; যতক্ষণ না তার তরফ থেকে কেউ তার সেই ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে।” (ইবনে মাজাহ ২৪১৩ নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তির প্রাণ তার দেহত্যাগ করে এবং সে সেই সময় তিনটি জিনিস থেকে মুক্ত থাকে, সে ব্যক্তি বেহেশ্তে প্রবেশ করবে; (আর সে ৩টি জিনিস হল,) অহংকার, ঋণ ও খিয়ানত।” (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ঈবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ৬৪১১নং, বিস্তারিত দ্রষ্টব্যঃ 'দেনা-পাওনা') অনুরূপভাবে অগ্রিম বেতন বা দাদন নিয়ে কাজ না করা, অগ্রিম দাম নিয়ে মাল না দেওয়া উক্ত ঋণ পরিশোধ না করারই পর্যায়ভুক্ত।
📄 বন্ধকী ব্যবহার
বন্ধকে নেওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকী ব্যবহার করতে পারবে না। কেননা, বন্ধক রাখার মূল উদ্দেশ্য হল, ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তা লাভ। ঋণ পরিশোধের সময় এলে এবং ঋণগ্রহীতা তা পরিশোধ করতে না পারলে তা বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ হবে এবং বাড়তি টাকা ঋণগ্রহীতা ফেরৎ পাবে। সুতরাং এর মাধ্যমে ঋণদাতার মুনাফা লাভ করা বা তা ব্যবহার করে উপকৃত হওয়ার জন্য বন্ধক রাখা হয় না। সুতরাং বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধকী দ্বারা কোন প্রকারের মুনাফা লাভ করা হালাল নয়; যদিও বন্ধকদাতা বাধ্য হয়ে অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার দ্বারা উপকৃত হতে বা তা ব্যবহার করতে অনুমতি দেয় তবুও না। কেননা, ইসলামের নীতি এই যে, 'যে ঋণে পার্থিব কোন মুনাফা আনয়ন করে, তা সূদরূপে পরিগণিত হয়।'
সুতরাং যদি কেউ ঋণ দিয়ে বাড়ি বন্ধক নেয়, তাহলে সে বাড়িতে সে বসবাস করতে পারে না, অথবা ভাড়া দিয়ে তার ভাড়া খেতে পারে না। গাড়ি বন্ধক নিলে সে গাড়ি সে চড়ে বেড়াতে পারে না। বাগান বন্ধক নিলে, সে বাগানের ফল সে খেতে পারে না। পুকুর বন্ধক নিলে সে পুকুরের মাছ খেতে পারে না। জমি বন্ধক নিলে সে জমির ফসল খাওয়া তার জন্য বৈধ নয়। অলংকার বন্ধক নিলে সে অলংকার সে ব্যবহার করতে পারে না। ততদিন ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরেছে, ততদিন বন্ধকী ব্যবহার করা বা তার দ্বারা মুনাফা অর্জন করা, সূদ খাওয়ারই নামান্তর।
সুদখোর ১০,০০০ টাকা ঋণ দিয়ে এক বিঘা জমি বন্ধক রাখে। ঋণগ্রহীতা যতদিন না ঐ ১০,০০০ টাকা পরিশোধ করতে পারে, ঋণদাতা ততদিন ধরে ঐ জমির ধান-ফসল খেয়ে যায়। তাতে ঋণগ্রহীতা যদি তার ঋণ পরিশোধ করতে ১০ বছর দেরী করে ফেলে, তাহলে ১০ বছর পরও তাকে ঐ ১০,০০০ টাকাই শুধতে হয়। আর বন্ধকগ্রহীতাও ১০ বছর যাবৎ ঐ জমির ফল-ফসল খেয়ে পেট মোটা করে ফেলে। ঋণ দিয়ে উপকার করে, কিন্তু ফাউ সহ উপকারের বদলা চুকিয়ে নেয় হাতে হাতে। আসলে কিন্তু সে সুদ খায়। ('দেনা-পাওনা' দ্রষ্টব্য)
বন্ধকী ঋণদাতার হাতে রাখা একটি আমানত। এটিকে ব্যবহার বা অবহেলা করে সেই আমানতে খেয়ানত করা আদৌ বৈধ নয়।
ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করতে পারলে বন্ধকীর সবটাই ঋণদাতার জন্য হালাল হয়ে যায় না। বরং ঋণের পরিমাণ থেকে বন্ধকীর দাম বেশী হলে, তা বিক্রি করার পর বাড়তি টাকা ঋণগ্রহীতাকে ফেরৎ দিতে হবে। সে টাকা ঋণদাতার জন্য মোটেই বৈধ নয়।