📄 বিদআতী, হারামখোর ও পাপাচারীদের খাদ্য
বহু মানুষ আছে, যাদের চুরি, ডাকাতি, ছিন্তাই, সুদ, ঘুস, অথবা হারাম ব্যবসা দ্বারা উপার্জিত অর্থ তাদের মালের সাথে মিশ্রিত আছে, তাদের কেউ যদি আপনাকে দাওয়াত দেয়, তাহলে দাওয়াত কবুল করে তার খাবার খাওয়া বৈধ কি না-এ নিয়ে মুসলিম মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। আসুন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা একটি নীতি আগে মনে রাখি।
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ভালোবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ঘৃণাবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে (কিছু) প্রদান করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই (কিছু প্রদান করা হতে) বিরত থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমান লাভ করেছে।” (সহীহ আবু দাউদ ৩৯১০ নং)
বলা বাহুল্য, মুমিনের ঈমানের দাবী হল এই যে, সে কোন ফাসেকের সাথে আন্তরিক মহব্বত রেখে উঠা-বসা ও খাওয়া-দাওয়া করবে না। অবশ্য আল্লাহর ওয়াস্তে, ইসলামের দিকে আহবান করার উদ্দেশ্যে, সুচরিত্রের মাধ্যমে অপরের মনকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তা করতে পারে।
১। যে ব্যক্তির দাওয়াত খেতে আপনি যাবেন, সে ব্যক্তির তৈরী খাদ্যের ব্যাপারে যদি আপনি সুনিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন যে, তা হারাম অথবা হারাম উপার্জন বা টাকা দিয়েই প্রস্তুত করা হয়েছে। তাহলে আপনি জেনেশুনে হারাম খাবেন না।
২। যদি আপনি হারামের ব্যাপারে সুনিশ্চিত না হন অথবা দাওয়াতদাতার হারাম উপার্জন ছাড়াও অন্য হালাল মাল আছে বলে সুনিশ্চিত হন, তাহলে তার দাওয়াত আপনি খেতে পারেন। যেহেতু সে যে হারাম থেকেই খাওয়াচ্ছে, তার নিশ্চয়তা নেই আপনার কাছে। অবশ্য এ খাদ্য সন্দিগ্ধ। সুতরাং পারলে এবং সম্পর্ক ছিন্ন ইত্যাদি ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে সে দাওয়াত বর্জন করেন। তাতেই আপনার মঙ্গল।
তদনুরূপ যদি দেখেন যে, আপনার আব্বা অথবা আম্মার সম্পূর্ণ উপার্জন হারাম, তাহলে তা বর্জন করতে নসীহত করার পর যদি বর্জন না করে, তাহলে আপনি পৃথক হয়ে যান এবং হারামে প্রতিপালিত হবেন না। অবশ্য তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২৪/৮০)
৩। যদি কারো মাল বা খাদ্যে হারাম আছে বলে সন্দেহ হয়, তাহলে খাওয়ার আগে দাওয়াতকারীকে তা হালাল না হারাম-এ কথা জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়। আল্লাহর রসূল ও সাহাবায়ে কিরামদের এ অভ্যাস ছিল না। বরং আপনার ঐ প্রশ্ন অনেক সময় বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করবে। তাছাড়া আপনিও গোঁড়া ও অভদ্র বলে বিবেচিত হবেন। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২২/৯৪)
৪। বিদআতীদের ঈদে-মীলাদুন্নাবী, শবেমি'রাজ, শবেবরাত, চালসে, চাহারম, মহরম ইত্যাদির দাওয়াত খাবেন না। কারণ তাতে বিদআতের প্রতি মৌন-সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ পায়।
৫। মড়াবাড়ির ভোজ জাহেলিয়াতের কর্ম, তা বৈধ নয়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৪/৯, ২৮/১০৮, ৩১/৯১) সুতরাং কারো মৃত্যু-সংবাদ শুনে যদি তার জানাযায় অংশগ্রহণ করতে যান, তাহলে মড়াবাড়িতে খানা খাবেন না। অবশ্য সফর দূর হলে এবং সে খাবার ছাড়া অন্য খাবার না পেলে নিরুপায় অবস্থায় খেতে পারেন।
৬। বাচ্চা ছেলের খতনা বা মুসলমানি উপলক্ষ্যে দাওয়াত দেওয়া ও খাওয়া আল্লাহর রসূল-এর যুগে ছিল না বলে বর্ণনা দিয়েছেন সাহাবী উষমান বিন আবীল আস। একদা তাঁকে খতনা-ভোজের দাওয়াত দেওয়া হলে তিনি তা কবুল করতে অস্বীকার করলেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রসূল-এর যুগে খতনা-ভোজে হাযির হতাম না এবং আমাদেরকে সে উপলক্ষ্যে দাওয়াতও দেওয়া হতো না। (আহমাদ ৪/২১৭, ত্বাবারানীর কাবীর ৯/৫৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, তাঁকে এক দাওয়াতে আহবান করা হলে বলা হল, আপনি কি জানেন, এটা কিসের দাওয়াত? এটা হল এক বালিকার খতনা উপলক্ষ্যে দাওয়াত। তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রসূল-এর যুগে এটাকে বৈধ মনে করতাম না। অতঃপর তিনি সে দাওয়াত খেতে অস্বীকার করলেন। (ত্বাবারানীর কাবীর ৯/৫৭)
অবশ্য অনেকে এ দাওয়াত দেওয়া ও খাওয়াকে জায়েয মনে করেন। আর তাঁরা আব্দুল্লাহ বিন উমার-এর কর্মকে দলীল মনে করেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর ছেলেদের খতনার সময় ভেঁড়া যবাই করে খাইয়েছিলেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ ১৭১৬০, ১৭১৬৪নং) উপরোক্ত বর্ণনা মতে অনেকের কাছে এ দাওয়াত বিদআত। অতএব এটি একটি সন্দিগ্ধ খানা, বিধায় তা বর্জন করাই উত্তম।
📄 সোনা-চাঁদির পাত্রে পানাহার
সোনা বা চাঁদির প্লেটে খাওয়া হারাম। এমন প্লেটে কোন হালাল খাবার খেলেও জাহান্নামের আগুন খাওয়া হয়। যেহেতু সোনা-চাঁদির অযথা ব্যবহার অহংকারীদের তথা কাফেরদের আচরণ।
আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমরা সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করো না। কারণ, তা দুনিয়াতে কাফেরদের জন্য এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য।” (বুখারী ৫৬৩৩, মুসলিম ২০৬৭নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি চাঁদির পাত্রে পান করে, আসলে সে ব্যক্তি নিজ উদরে জাহান্নামের আগুন ঢক্ করে পান করে।” (বুখারী ৫৬৩৪, মুসলিম ২০৬৫নং) প্রকাশ থাকে যে, প্লেটের মতই সোনা-চাঁদির চামচ, লবণদান প্রভৃতি ব্যবহারও হারাম।
📄 বিশেষ কয়েকটি অবস্থায় পানাহার
বাম হাতে পানাহার করা বৈধ নয়। কেননা আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার বাম হাত দ্বারা অবশ্যই না খায় এবং পানও না করে। কারণ, শয়তান তার বাম হাত দিয়ে পানাহার করে থাকে।" বর্ণনাকারী বলেন, (ইবনে উমার এর স্বাধীনকৃত দাস তাবেয়ী) নাফে' (রঃ) দুটি কথা আরো বেশী বলতেন, "কেউ যেন বাম হাত দ্বারা কিছু গ্রহণ না করে এবং অনুরূপ তার দ্বারা কিছু প্রদানও না করে।” (মুসলিম ২০২০, তিরমিযী ১৮০০, মালেক, আবু দাউদ ৩৭৭৬ নং)
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানাহারও অবৈধ। যেহেতু আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। কেউ ভুলে গিয়ে পান করে থাকলে সে যেন তা বমি করে ফেলে।” (মুসলিম ২০২৬নং)
আনাস বলেন, নবী নিষেধ করেছেন যে, কোন লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আনাস-কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, 'এটা তো আরো খারাপ ও আরো নোংরা।” (মুসলিম ২০২৪নং)
কিন্তু বসার জায়গা না থাকলে অথবা অন্য কোন অসুবিধায় বা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম নয়। যেহেতু দাঁড়িয়ে পান বৈধ হওয়ার হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী ১৬৩৭, ৫৬১৫, মুসলিম ২০২৭, ইবনে মাজাহ ৩৩০১নং প্রমুখ)
সরাসরি মশক বা কলসীর মুখে মুখ লাগিয়ে পানি পান করা বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী এভাবে পান করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ৫৬২৭, ৫৬২৯, মুসলিম ১৬০৯নং প্রমুখ)
উল্লেখ্য যে, 'মোছের পানি হারাম' কথাটি দলীল-সাপেক্ষ্য।
📄 যাকাতের মাল
যাকাত ইসলামের তৃতীয় রুক্ন। ইসলামী অর্থনীতির একটি সুন্দর বিধান এই যাকাত। যাকাত বিধিবদ্ধ হয়েছে দারিদ্র দূরীকরণ ও ইসলামী সংগ্রাম চিরন্তন রাখার মত মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য।
মহান আল্লাহ যাকাতের হকদার যারা, তাদের কথা কুরআন মাজীদে উল্লেখ করে দিয়েছেন; তিনি বলেছেন,
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ))
অর্থাৎ, সাদকাহ কেবল ফকীর (নিঃস্ব), মিসকীন (অভাবগ্রস্ত), সাদকার কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের মনকে (ইসলামের প্রতি) অনুরাগী করা আবশ্যক তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরের জন্য। এ হল আল্লাহর বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তাওবাহ ৬০)
১। অতএব যে ব্যক্তি উক্ত ৮ প্রকার মানুষের মধ্যে কোন এক প্রকারের অন্তর্ভুক্ত নয়, তার জন্য ওশর-যাকাতের কোন মাল খাওয়া বৈধ নয়।
২। মহানবী-এর বংশধর; বানী হাশেম, আলী, আকীল, জা'ফর, আব্বাস ও হারেষের বংশধরের জন্য যাকাতের মাল বৈধ নয়। অতএব যে ব্যক্তি নিজেকে নবী-এর বংশধর বলে মনে করে, তার জন্য ওশর-যাকাতের মাল খাওয়া হারাম।
৩। যে ব্যক্তি কোন হাতের কাজ কিংবা দৈনিক অথবা মাসিক বেতন দ্বারা রুযীপ্রাপ্ত হয়, অথবা ইচ্ছা করলে প্রাপ্ত হতে পারে, এমন উপার্জনশীল ব্যক্তির জন্য যাকাতের মাল খাওয়া বৈধ নয়। মহানবী বলেন, “এ মালে ধনী এবং কর্মক্ষম উপার্জনশীল ব্যক্তির জন্য কোন অংশ নেই।” (আবু দাউদ ১৬৩৩নং)
সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আরকাম-এর মতে যারা হকদার নয় অথচ যাকাতের মাল খায়, তারা আসলে গরমের দিনে মোটা লোকের শরমগাহ ও বোগল ধোওয়া পানি খায়। (মালেক, সহীহ তারগীব ৮০৭নং)
কোন প্রকারে যাতে নিজের আদায় করা ওশর-যাকাতের মাল খাওয়া না হয়ে যায়, তার জন্য শরীয়ত (গরীব হলেও) এমন আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দিতে নিষেধ করেছে যার ভরণ-পোষণ করা যাকাতদাতার উপর ফরয। যেমন পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, দাদা-দাদী, নানা-নানী, পোতা-পোতিন, নাতিন-নাতনী, স্ত্রী প্রভৃতি।
tদনরূপ নিষেধ করেছে নিজের আদায় করা যাকাতের মাল ক্রয় করতে। একদা উমার আল্লাহর রাস্তায় একটি ঘোড়া দান করলেন। অতঃপর দেখলেন সেই ঘোড়া বিক্রয় হচ্ছে। তিনি তা ক্রয় করতে চাইলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহর রসূল -কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, "তুমি তা ক্রয় করো না (যদিও তা তোমাকে এক দিরহামে দেয়) এবং তোমার দানে তুমি ফিরে যেয়ো না (ফিরিয়ে নিও না)।” (বুখারী ১৪৮৯, মুসলিম ১৬২১, আবু দাউদ ১৫৯৩নং)
ফরয হওয়া সত্ত্বেও যারা যাকাত-ওশর না দিয়ে মাল ভক্ষণ করে, তাদেরও কিন্তু আসলে যাকাত-ওশর (হারাম) খাওয়া হয়।
যাকাত এক অর্থে পবিত্রতার নাম। যাকাত দিয়ে মালকে পবিত্র করতে হয়। আর তার মানেই, যাকাত না দিলে মাল অপবিত্র থাকে এবং সেই অপবিত্র মাল ভক্ষণ করা হয়। (যাকাত সম্বন্ধে বিস্তারিত দেখুনঃ 'যাকাত ও খয়রাত')
যাকাতের মতই কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করে তা খাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাও মিসকীনদের হক। (আবু দাউদ ১৭৬৯নং)
কুরবানীর হাড় বিক্রি করে খাওয়া বৈধ নয়। কারণ তাও চামড়ার মতই। সুতরাং সেই হাড় বিক্রি করা অর্থ গরীবদেরকে দান করতে হবে।