📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে যবেহ পশু
ইসলামী শরীয়ত মতে যবেহ ছাড়া অন্যভাবে হত্যা করা বা মরা হালাল পশুও মুসলিমদের জন্য খাওয়া বৈধ নয়। অতএব কিভাবে ইসলামে পশুকে হালাল করা যায়, তা জানা আবশ্যক।
১। যবেহকারী (পুরুষ অথবা মহিলা) মুসলিম জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক অথবা বুদ্ধিসম্পন্ন কিশোর বা কিশোরী হতে হবে।
২। যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া ('বিসমিল্লাহ' বলা) ওয়াজেব। (৩) 'বিসমিল্লাহ'র সাথে 'আল্লাহু আকবার' যুক্ত করা মুস্তাহাব। বিস্তারিত জানতে 'যুল হজ্জের তেরো দিন' দ্রষ্টব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি তোমরা তাঁর নিদর্শনসমূহের বিশ্বাসী হও তবে যাতে (যে পশুর যবেহ করার সময়) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে তা আহার কর।” (সূরা আনআম ১১৮ আয়াত) "এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি তা হতে তোমরা আহার করো না; তা অবশ্যই পাপ।” (সূরা আনআম ১২১ আয়াত)
আর নবী বলেন, "যা খুন বহায় এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর।” (বুখারী ২৩৫৬, মুসলিম ১৯৬৮-নং)
৩। যবেহর ছুড়ি ধারালো হওয়া এবং যবেহতে খুন বহা জরুরী। আর তা দুই শাহরগ (কণ্ঠনালীর দুই পাশে দু'টি মোটা আকারের শিরা) কাটলে অধিকরূপে সম্ভব হয়। প্রিয় নবী বলেন, "যা খুন বহায়, যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর। তবে যেন (যবেহ করার অস্ত্র) দাঁত বা নখ না হয়।” (আহমদ, বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি, সহীহুল জামে' ৫৫৬৫নং)
৪। মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন পশুর রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ যবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরী; শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং পার্শ্বস্থ দুই মোটা শিরা।
প্রকাশ থাকে যে, যবেহ করার সময় উপরোক্ত অঙ্গসমূহ কাটা ছাড়া অতিরঞ্জন করে আরো অধিক পেঁচানো বৈধ নয়। কারণ তাতে পশুর প্রতি অধিক কষ্ট প্রদর্শন হয়। অথচ আমাদেরকে যবেহর সময়েও পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। অবশ্য অসাবধানতা বা ভুলের কারণে যদি পশুর মাথা কেটে পৃথক হয়েই যায়, তাহলে যবেহ মকরূহ হয়ে যাবে না। বরং তা হালালরূপেই খাওয়া যাবে। (মিনহাজুল মুসলিম ৬৪০পৃঃ)
৫। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোন কোন পশু (যেমন উট) কে যবেহ করা সম্ভব নয়, সে পশুকে বাম পা বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নহর করা হবে। আল্লাহ পাক বলেন, "সুতরাং দন্ডায়মান অবস্থায় ওদের যবেহকালে তোমরা আল্লাহর নাম নাও।” (সূরা হাজ্জ ৩৬ আয়াত) ইবনে আব্বাস এই আয়াতের তফসীরে বলেন, 'বাম পা বেঁধে তিন পায়ের উপর দন্ডায়মান অবস্থায় (নহর করা হবে)।' (তাফসীর ইবনে কাসীর) নহর হবে পশুর গলার নিচে খাল অংশে বর্শা দিয়ে আঘাত করে।
৬। পশু যদি ধরাই না দেয়, কুঁয়া অথবা গর্তে পড়ে তার মুখ যদি নিচের দিকে হয়ে যায় এবং তার ফলে যবেহ কিংবা নহর করা সম্ভব না হয়, তাহলে শিকার করার মত পশুর দেহে 'বিসমিল্লাহ' বলে (তীর বা ছেদকারী গুলিবিশিষ্ট বন্দুক দ্বারা) যে কোন জায়গায় আঘাত করে খুন বইয়ে হালাল করা যাবে।
সুতরাং উপর্যুক্তরূপে শরীয়তসম্মতভাবে যবেহ না হলে, সে পশুর মাংস হারাম। বলা বাহুল্য, কোন নাস্তিক, কাফের বা মুশরিকের যবেহ করা পশু হালাল নয়। মাযারী, কবূরী এবং মতান্তরে কোন বেনামাযীর হাতে যবেহ করা পশু হালাল নয়। বৈধ নয় কোন ছোট শিশু, নেশাগ্রস্ত বা পাগল ব্যক্তির যবেহ।
যবেহর সময় আল্লাহর নাম না নিলে অথবা কোন গায়রুল্লাহর নাম নিলে সে যবেহর পশু মুসলিমের জন্য হালাল নয়।
জেনে নেওয়া দরকার যে, যবেহ করার সময় যদি কেউ 'বিসমিল্লাহ' বলতে ভুলে যায়, তাহলে তার ফলে গোশ্ত হারাম হবে না।
যে পশু কোন পশুর হাড়, দাঁত বা নখ দিয়ে যবেহ করা হয়, তা খাওয়া বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৯৬৮-নং)
যে পশু কারেন্টের শক দ্বারা যবেহ (হত্যা) করা হয়, সে পশু হালাল নয়; চাহে সেভাবে যবেহ কোন মুসলিম করুক অথবা আহলে কিতাব। অবশ্য যে পশু বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে মরতে যায় এবং তার আগে শরয়ী যবেহ করা হয়, সে পশু হালাল। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ৬/২৬১, ১১/১৬২, ১৬৭, ১৩/৩৩৫)
প্রকাশ থাকে যে, আহলে কিতাব (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান) দ্বারা যবেহকৃত পশু আমাদের জন্য হালাল। মহান আল্লাহ বলেন,
(( وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ)) (٥) سورة المائدة
অর্থাৎ, আহলে কিতাবদের খাদ্য (যবেহ করা পশু) তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল। (সূরা মাইদাহ ৫ আয়াত)
অবশ্য যেভাবে মৃত পশুকে ইসলামে হারাম বলা হয়েছে, সেভাবে মৃতকে তারা হালাল ভাবলেও মুসলিমদের জন্য তা হালাল হবে না।
বাইরে থেকে আমদানীকৃত ডিব্বাবদ্ধ অথবা হিমায়িত মাংস যদি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করা হয়েছে বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় অথবা মুসলিম বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তা হালাল বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ।
জ্ঞাতব্য যে, যবেহকৃত গর্ভবতী পশুর পেটের ভ্রূণকে পৃথকভাবে যবেহ না করেই খাওয়া হালাল। যেহেতু মহানবী বলেন, "ভ্রূণের যবেহ, তার মায়ের যবেহ।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৪০৯১-৪০৯৩ নং)
অবশ্য ভ্রূণ বের করার পরেও যদি তার মাঝে স্থায়ী জীবন থাকে, তাহলে হালাল করার জন্য তাকে যবেহ করা জরুরী। (ফিকহুস সুন্নাহ ২/২৩)
📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে শিকার করা পশু
যে সকল প্রাণী খাওয়া হালাল এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, তা খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা বৈধ। খামাখা পশু হত্যা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
((وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا))
অর্থাৎ, তোমরা (ইহরাম থেকে) হালাল হলে শিকার কর। (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত) শিকার করার পর তা জীবিত থাকলে হালাল করার জন্য শরীয়ত মোতাবেক যবেহ করা জরুরী।
শিকার জীবিত না থাকলে অথবা অল্পক্ষণ জীবিত থেকে মারা গেলে তা হালাল হওয়ার জন্য শর্ত রয়েছে:-
১। যবেহকারীর জন্য যা হওয়া শর্ত, শিকারীর জন্যও তাই হওয়া জরুরী। নচেৎ শিকার হালাল হবে না।
২। শিকারের অস্ত্র বা মাধ্যম শরীয়ত-অনুমোদিত হতে হবে। অর্থাৎ :-
(ক) তা ধারালো অস্ত্র হতে হবে। তা যেন শিকারের দেহ ছেদ করে এবং রক্ত প্রবাহিত করে।
(খ) শিক্ষাপ্রাপ্ত শিকারী পাখী অথবা কুকুর দ্বারা শিকার হতে হবে এবং সে নিজের জন্য নয়; বরং মালিকের জন্য শিকার করে আনবে।
(গ) সেই অস্ত্র বা মাধ্যম শিকারের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপ বা প্রেরণ করতে হবে। অর্থাৎ, অস্ত্র নিজে থেকে শিকারের উপর পড়লে অথবা (শিকার) শিক্ষাপ্রাপ্ত পাখী বা কুকুর নিজে থেকে গিয়ে শিকার করলে তা হালাল হবে না।
(ঘ) সেই অস্ত্র বা মাধ্যম শিকারের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপ বা প্রেরণ করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলতে হবে। অবশ্য সেই সাথে 'আল্লাহু আকবার' বলাও সুন্নত। মহান আল্লাহ বলেন,
((وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ)) (٤) سورة المائدة
অর্থাৎ, --এবং শিকারী পশুপক্ষী যেগুলোকে তোমরা শিকার শিক্ষা দিয়েছ; যেভাবে আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন-ঐ (শিক্ষা দেওয়া পশুপক্ষী) গুলো যা তোমাদের জন্য ধরে আনে তা ভক্ষণ কর এবং (তাদেরকে শিকারের জন্য পাঠানোর সময়) আল্লাহর নাম নাও। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর। (সূরা মাইদাহ ৪ আয়াত)
মহানবী বলেন, "যখন তুমি তোমার শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুর (শিকার করার জন্য) প্রেরণ করবে এবং আল্লাহর নাম নেবে (অতঃপর সে তোমার জন্য যে শিকার মেরে আনবে) তা খাও।” (বুখারী, মুসলিম)
সুতরাং উক্তরূপে শরীয়তসম্মতভাবে শিকার না হলে, সে পশুর মাংস হারাম। বলা বাহুল্য, ঢিল বা লাঠির আঘাতে শিকার, ফাঁদ বা জালে আটকে শিকার অথবা অন্য কোন যন্ত্রের সাহায্যে শিকার, যাতে শিকারের দেহ বিক্ষত হয় না এবং রক্তও প্রবাহিত হয় না অথচ তা জীবিত অবস্থায় শরীয়ত মতে যবেহও করা হয় না, তা খাওয়া হালাল নয়।
পক্ষান্তরে বন্দুকের সাহায্যে শিকার করা বৈধ। যে বন্দুকের গুলি শিকারের দেহ ভেদ করে যায়, চামড়া কেটে ফেলে রক্তপাত ঘটায় সে বন্দুকের শিকার হালাল। পক্ষান্তরে ভেদ না করে কেবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৫১১)
প্রকাশ থাকে যে, একটির উদ্দেশ্যে গুলি বা তীর ছুঁড়লে যদি সেটিকে না লেগে অন্যটিকে লাগে অথবা একাধিক পশু বা পাখী শিকার হয়, তাহলে তা খাওয়াও হালাল। (আল-মুলাখখাসুল ফিক্বহী ২/৪৭২)
শিকারী কুকুর যদি শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে, তাহলে জানতে হবে সে নিজের জন্য শিকার করেছে। আর সে ক্ষেত্রে তা খাওয়া বৈধ হবে না।
শিক্ষাপ্রাপ্ত শিকারী পাখী বা কুকুর ছাড়ার পর যদি তা অন্য পাখী বা কুকুরের সাথে মিলিত হয়ে শিকার করে এবং বুঝা না যায় যে, কে শিকার করেছে, তাহলে তা খাওয়া বৈধ নয়।
কোন শিকারের প্রতি অস্ত্র ছুঁড়ার পর যদি এক অথবা দুইদিন পর সেই (জঙ্গল বা ঝোঁপ) জায়গায় তা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তাতে নিশ্চিতভাবে ঐ অস্ত্রের আঘাতেরই চিহ্ন পাওয়া যায়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। আর যদি তা পানিতে পড়ে থাকে, তাহলে তা খাওয়া বৈধ নয়। কারণ হতে পারে যে, আহত হয়ে পড়ে পানির জন্য সে মারা গেছে। (সহীহুল জামে' ৩১৩নং)
অবশ্য পড়ে থাকা শিকার পঁচে গন্ধ ধরে গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (মুসলিম ১৯৩১নং প্রমুখ) শিকারের কোন অঙ্গ কেটে পৃথক হলে এবং শিকার পালিয়ে গেলে সেই অঙ্গ খাওয়া বৈধ নয়। কারণ মহানবী বলেন, "পশু জীবিত থাকতে যে অংশ কেটে নেওয়া হয়, তা মৃত (পশুর মাংসের) সমান।” (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৫৬৫২নং)
অবশ্য অঙ্গ কেটে পৃথক হওয়ার পর পশু স্বস্থানে মারা গেলে সে অঙ্গ ও পশু হালাল।
জ্ঞাতব্য যে, হজ্জ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় অথবা হারাম সীমানার ভিতরে থাকা অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
((أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعاً لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُماً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ)) (٩٦) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতি সমুদ্রের শিকার ও তার ভক্ষণ বৈধ করা হয়েছে তোমাদের ও পর্যটকদের ভোগের জন্য এবং তোমরা যতক্ষণ এহরামে থাকবে ততক্ষণ স্থলের শিকার তোমাদের জন্য অবৈধ আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যাঁর নিকট তোমাদের একত্র করা হবে। (সূরা মাইদাহ ৯৬ আয়াত)
আল্লাহর রসূল মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, "নিশ্চয়ই এই শহরকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন। এর কোন কাঁটা তোলা যাবে না, কোন শিকার (পশু-পাখী) চকিত করা যাবে না এবং প্রচার উদ্দেশ্যে ছাড়া এর কোন পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না।” (বুখারী ১৫৮৭নং)
সুতরাং ঐ অবস্থায় কেউ শিকার করলে তাকে তার কাফ্ফারা দিতে হবে এবং যে শিকার সে নিজে করেছে অথবা যে শিকার তার জন্য করা হয়েছে অথবা যে শিকার করতে সে অপরের কোন প্রকার সহযোগিতা করেছে, সে শিকারের গোশু খাওয়া তার জন্য হারাম। অবশ্য কোন হালাল ব্যক্তি নিজের জন্য শিকার করে মুহরিমকে খেতে দিলে, তা খাওয়া অবৈধ নয়।
পক্ষান্তরে ঐ অবস্থায় সামুদ্রিক শিকার ও তা খাওয়া অবৈধ নয়。
📄 কাফেরদের খাদ্য
কোন কাফেরের দাওয়াতে হালাল খাদ্য খাওয়া অবৈধ নয়। আল্লাহর ওয়াস্তে তার মনকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য খাওয়া যায়। আমাদের আদর্শ নবী কাফেরদের দাওয়াতে তাদের তৈরী হালাল খাদ্য খেয়েছেন।
অবশ্য তাদের পূজা (তদনুরূপ মাযারীদের উরস) উপলক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত খাদ্য, মূর্তি বা মাযারে উৎসর্গীকৃত খাদ্য, ঠাকুরের প্রসাদ, মাযারের তবরুক ইত্যাদি খাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে শির্কে মৌন-সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ পায়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২৬/১০৯, ২৮/৮২, ৮৪)
অমুসলিমদের পাত্রে (তাদের দোকান ও হোটেলে) খাওয়া নিষেধ। তবে তাদের পাত্র (দোকান বা হোটেল) ছাড়া যদি মুসলিমদের কোন পাত্র (দোকান বা হোটেল) না পাওয়া যায়, তাহলে নিরুপায় অবস্থায় তাদের সেই পাত্র (ধোয়ার পর তাদের দোকান বা হোটেলে) খাওয়ার অনুমতি আছে। (বুখারী, মুসলিম ১৯৩০নং প্রমুখ)
একদা এক সাহাবী মহানবী -কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমরা আহলে কিতাবদের পাশাপাশি বাস করি। আর তারা তাদের পাত্রে শূকর রান্না করে এবং মদ পান করে। (এখন আমরা কি তাদের পাত্রে পানাহার করতে পারি?) উত্তরে আল্লাহর রসূল বললেন, "যদি তোমরা তা ছাড়া অন্য পাত্র পাও, তাহলে তাতেই পানাহার কর। আর যদি তা ছাড়া অন্য পাত্র না পাও, তাহলে তা ধুয়ে নাও এবং তাতে পানাহার কর।" (আবু দাউদ ৩৮-৩৯নং)
কাফেরদের প্রস্তুতকৃত খাদ্য ও পানীয় পানাহার অবৈধ নয়। যেমন তাদের প্রস্তুত, সিলাই ও ধৌত করা কাপড় ব্যবহার করা বৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/২০০)
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, সহকর্মী বা কার্যক্ষেত্রে কোন অমুসলিমকে এমন জিনিস উপহার বা পানাহার করতে দেওয়া বৈধ নয়, যা তাদের ধর্মে বৈধ হলেও ইসলামে অবৈধ। যেমন কোন কাজ করাবার সময় লেবারকে, মদ বা বিড়ি-সিগারেট পেশ করাও অবৈধ। সুতরাং মুসলিম সাবধান! (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/১১০)
বৈধ নয় কোন কাফেরকে মদ বা বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার জন্য পয়সা দেওয়া, মদ বা বিড়ি-সিগারেট উপহার দেওয়া অথবা দাওয়াতে পেশ করা।
📄 বিদআতী, হারামখোর ও পাপাচারীদের খাদ্য
বহু মানুষ আছে, যাদের চুরি, ডাকাতি, ছিন্তাই, সুদ, ঘুস, অথবা হারাম ব্যবসা দ্বারা উপার্জিত অর্থ তাদের মালের সাথে মিশ্রিত আছে, তাদের কেউ যদি আপনাকে দাওয়াত দেয়, তাহলে দাওয়াত কবুল করে তার খাবার খাওয়া বৈধ কি না-এ নিয়ে মুসলিম মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। আসুন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা একটি নীতি আগে মনে রাখি।
আল্লাহর রসূল বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ভালোবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে (কাউকে) ঘৃণাবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে (কিছু) প্রদান করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই (কিছু প্রদান করা হতে) বিরত থাকে, সে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমান লাভ করেছে।” (সহীহ আবু দাউদ ৩৯১০ নং)
বলা বাহুল্য, মুমিনের ঈমানের দাবী হল এই যে, সে কোন ফাসেকের সাথে আন্তরিক মহব্বত রেখে উঠা-বসা ও খাওয়া-দাওয়া করবে না। অবশ্য আল্লাহর ওয়াস্তে, ইসলামের দিকে আহবান করার উদ্দেশ্যে, সুচরিত্রের মাধ্যমে অপরের মনকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তা করতে পারে।
১। যে ব্যক্তির দাওয়াত খেতে আপনি যাবেন, সে ব্যক্তির তৈরী খাদ্যের ব্যাপারে যদি আপনি সুনিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন যে, তা হারাম অথবা হারাম উপার্জন বা টাকা দিয়েই প্রস্তুত করা হয়েছে। তাহলে আপনি জেনেশুনে হারাম খাবেন না।
২। যদি আপনি হারামের ব্যাপারে সুনিশ্চিত না হন অথবা দাওয়াতদাতার হারাম উপার্জন ছাড়াও অন্য হালাল মাল আছে বলে সুনিশ্চিত হন, তাহলে তার দাওয়াত আপনি খেতে পারেন। যেহেতু সে যে হারাম থেকেই খাওয়াচ্ছে, তার নিশ্চয়তা নেই আপনার কাছে। অবশ্য এ খাদ্য সন্দিগ্ধ। সুতরাং পারলে এবং সম্পর্ক ছিন্ন ইত্যাদি ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে সে দাওয়াত বর্জন করেন। তাতেই আপনার মঙ্গল।
তদনুরূপ যদি দেখেন যে, আপনার আব্বা অথবা আম্মার সম্পূর্ণ উপার্জন হারাম, তাহলে তা বর্জন করতে নসীহত করার পর যদি বর্জন না করে, তাহলে আপনি পৃথক হয়ে যান এবং হারামে প্রতিপালিত হবেন না। অবশ্য তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২৪/৮০)
৩। যদি কারো মাল বা খাদ্যে হারাম আছে বলে সন্দেহ হয়, তাহলে খাওয়ার আগে দাওয়াতকারীকে তা হালাল না হারাম-এ কথা জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়। আল্লাহর রসূল ও সাহাবায়ে কিরামদের এ অভ্যাস ছিল না। বরং আপনার ঐ প্রশ্ন অনেক সময় বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করবে। তাছাড়া আপনিও গোঁড়া ও অভদ্র বলে বিবেচিত হবেন। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২২/৯৪)
৪। বিদআতীদের ঈদে-মীলাদুন্নাবী, শবেমি'রাজ, শবেবরাত, চালসে, চাহারম, মহরম ইত্যাদির দাওয়াত খাবেন না। কারণ তাতে বিদআতের প্রতি মৌন-সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ পায়।
৫। মড়াবাড়ির ভোজ জাহেলিয়াতের কর্ম, তা বৈধ নয়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৪/৯, ২৮/১০৮, ৩১/৯১) সুতরাং কারো মৃত্যু-সংবাদ শুনে যদি তার জানাযায় অংশগ্রহণ করতে যান, তাহলে মড়াবাড়িতে খানা খাবেন না। অবশ্য সফর দূর হলে এবং সে খাবার ছাড়া অন্য খাবার না পেলে নিরুপায় অবস্থায় খেতে পারেন।
৬। বাচ্চা ছেলের খতনা বা মুসলমানি উপলক্ষ্যে দাওয়াত দেওয়া ও খাওয়া আল্লাহর রসূল-এর যুগে ছিল না বলে বর্ণনা দিয়েছেন সাহাবী উষমান বিন আবীল আস। একদা তাঁকে খতনা-ভোজের দাওয়াত দেওয়া হলে তিনি তা কবুল করতে অস্বীকার করলেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রসূল-এর যুগে খতনা-ভোজে হাযির হতাম না এবং আমাদেরকে সে উপলক্ষ্যে দাওয়াতও দেওয়া হতো না। (আহমাদ ৪/২১৭, ত্বাবারানীর কাবীর ৯/৫৭)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, তাঁকে এক দাওয়াতে আহবান করা হলে বলা হল, আপনি কি জানেন, এটা কিসের দাওয়াত? এটা হল এক বালিকার খতনা উপলক্ষ্যে দাওয়াত। তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রসূল-এর যুগে এটাকে বৈধ মনে করতাম না। অতঃপর তিনি সে দাওয়াত খেতে অস্বীকার করলেন। (ত্বাবারানীর কাবীর ৯/৫৭)
অবশ্য অনেকে এ দাওয়াত দেওয়া ও খাওয়াকে জায়েয মনে করেন। আর তাঁরা আব্দুল্লাহ বিন উমার-এর কর্মকে দলীল মনে করেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর ছেলেদের খতনার সময় ভেঁড়া যবাই করে খাইয়েছিলেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ ১৭১৬০, ১৭১৬৪নং) উপরোক্ত বর্ণনা মতে অনেকের কাছে এ দাওয়াত বিদআত। অতএব এটি একটি সন্দিগ্ধ খানা, বিধায় তা বর্জন করাই উত্তম।