📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 কোন্ কোন্ প্রাণী ভক্ষণ নিষিদ্ধ

📄 কোন্ কোন্ প্রাণী ভক্ষণ নিষিদ্ধ


প্রাণী সাধারণতঃ দুই প্রকার; স্থলচর ও জলচর। স্থলচর প্রাণীর মধ্যে যা যা হারাম তা নিম্নরূপঃ-
১। মৃতঃ যে প্রাণী শরয়ী-সম্মত যবেহ ছাড়া প্রাণ ত্যাগ করেছে। অবশ্য এই বিধান থেকে দুটি প্রাণীকে ব্যতিক্রান্ত করা হয়েছে। আর তা হল, মাছ ও পঙ্গপাল (Locust)। এই দুটি প্রাণীর জন্য যবেহর প্রয়োজন নেই। মরা হলেও তা আমাদের জন্য পবিত্র ও খাওয়া বৈধ। (সিলসিলাহ সহীহাহ ১১১৮-নং)

২। যে প্রাণী কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে অথবা ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অথবা উপর থেকে নিচে পতিত হয়ে অথবা অন্য পশুর শিং দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অথবা কোন হিংস্র পশুর শিকারে পরিণত হয়ে মারা গেছে।

৩। যে প্রাণী কোন গায়রুল্লাহর নাম নিয়ে যবেহ করা হয়েছে।

৪। যে প্রাণী আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্টির নামে (পীর বা দেবতার নামে, অলী বা জিনের নামে) উৎসর্গীকৃত। মাযারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হাস-মুরগী বা গরু-খাসির গোশু মুসলিমের জন্য হারাম।

৫। যে প্রাণীকে কোন বেদী, আস্তানা, মাযার বা থানে গায়রুল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য বলিদান বা যবেহ করা হয়েছে।
তদনুরূপ সেই খাদ্য (পশুর মাংস, সবজি, ফল, মিষ্টি বা শরবত তবরুক বা প্রসাদ রূপে) যা ঐ শ্রেণীর জায়গায় উৎসর্গ করা হয়েছে, নযর ও নিয়ায স্বরূপ নিবেদন করা হয়েছে তা খাওয়া হারাম।

৬। শূকর বা শুয়োর (তার রক্ত, মাংস, চর্বি, চামড়া সবকিছু) খাওয়া হারাম।
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি পাশা-জাতীয় খেলা খেলল, সে যেন তার হাতকে শূকরের মাংস ও রক্তে রঞ্জিত করল।” (মুসলিম ২২৬০, আবু দাউদ ৪৯৩৯নং, ইবনে মাজাহ ৩৭৬৩নং)
উক্ত হাদীসে স্পষ্ট যে, শূকরের মাংস ও রক্তে হাত রঞ্জিত করা পাপের কাজ। সুতরাং কুরআনের কথা অমান্য করে তার মাংস খাওয়া কত বড় পাপ হতে পারে তা অনুমান করা যেতে পারে।

৭। গৃহপালিত গাধা ও খচ্চর খাওয়া অবৈধ।

৮। প্রত্যেক সেই প্রাণী যার রূপে কোন যুগের মানুষকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যেমন বানর, হনুমান, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি। এই আশঙ্কাতেই মহানবী সালা (যব্ব) খাননি। (মুসলিম ১৯৪৯নং)

৯। প্রত্যেক সেই (হিংস্র) পশু যার শিকারী দাঁত আছে। যেমন; সব রকমের বাঘ, ভালুক, হাতি, কুকুর, বানর, শিয়াল, খেঁকশিয়াল, খটাস, বিড়াল, কাঠবিড়ালী, নেউল প্রভৃতি।
অবশ্য এই বিধান থেকে হায়না (হাড়োল) এর কথা ব্যতিক্রম। এটির শিকারী দাঁত আছে ঠিকই, কিন্তু এটি সাধারণ হিংস্র প্রাণী নয়। তাই হাদীস শরীফে এটিকে হালাল শিকার রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। (আবু দাউদ, ইরওয়াউল গালীল ১০৫০, সহীহুল জামে' ৩৮৯৯নং) (১)

১০। প্রত্যেক অরুচিকর নোংরা জন্তু। যেমন; কাঁটাচুয়া শজারু, (২) চামচিকা, ইঁদুর, বিছা, পোকামাকড় প্রভৃতি।

১১। প্রত্যেক সেই পশু, যে নোংরা খেয়ে জীবনধারণ করে।

১২। প্রত্যেক সেই পশু, যাকে মেরে ফেলতে আদেশ করা হয়েছে। যেমন; সাপ, বিছা, টিকটিকি, চিল, (পিঠে অথবা বুকে সাদা দাগবিশিষ্ট এক প্রকার) কাক, ইঁদুর ও হিংস্র (পাগলা) কুকুর।

১৩। প্রত্যেক সেই প্রাণী, যাকে হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন; ব্যাঙ, হুদহুদ, শ্রাইক। (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬৯৭০-৬৯৭১নং)

১৪। প্রত্যেক সেই পাখী, যার লম্বা ও ধারালো নখ আছে এবং তার দ্বারা সে শিকার করে। যেমন; বাজ, চিল, ঈগল, পেঁচা প্রভৃতি। (আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ সহীহুল জামে' ৬৮৫৯নং)

১৫। যে পাখী নোংরা ও মৃত প্রাণী খায়। যেমন কাক, শকুন ইত্যাদি।

১৬। যে প্রাণীর অধিকাংশ খাদ্য হল অপবিত্র জিনিস (পায়খানা)। এমন প্রাণীর দুধ পানও নিষিদ্ধ। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬৮৫৫নং) অবশ্য এই শ্রেণীর প্রাণী (মুরগী, উটনী বা গাই) কে কিছুদিন বেঁধে রেখে পবিত্র খাবার খেতে দিয়ে পবিত্র করে তবে তার দুধ খাওয়া যায় ও যবাই করা যায়। ইবনে উমার এমন মুরগীকে ৩ দিন বেঁধে রাখার পর যবেহ করতেন। (ইবনে আবী শাইবাহ ২৪৬০৮নং)
যে মাছ মল-মূত্রের ড্রেনে অথবা পুকুরে চেম্বারের পায়খানা খেয়ে প্রতিপালিত হয়, সে মাছ খাওয়াও উক্ত প্রাণীর মত। বলাই বাহুল্য যে, এই শ্রেণীর মাছ ধরে বিক্রয় করা এবং ক্রেতাকে ধোকা দেওয়া বৈধ নয়। হালাল নয় ঐ মাছ বিক্রয় করা টাকা।

১৭। পশু জীবিত থাকা অবস্থায় তার দেহ থেকে কেটে নেওয়া গোশ্ত হারাম। মহানবী বলেন, “পশু জীবিত থাকতে যে অংশ কেটে নেওয়া হয়, তা মৃত (পশুর মাংসের) সমান।” (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৫৬৫২নং)

১৮। যে পশু বা পাখীকে বেঁধে রেখে তীর, গুল্টি বা বন্দুকের নিশানা ঠিক করা শিখা হয়, তা মারা গেলে খাওয়া বৈধ নয়। মহানবী এমন পশু বা পাখীর মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযী ১৫১৬, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৩৯১নং)

হারাম খাদ্যের ব্যাপারে মহান আল্লাহর নির্দেশ হল,
(( حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ذَلِكُمْ فِسْقٌ )) (۳) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-মাংস, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু; তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া। আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এ সব পাপকার্য। (সূরা মাইদাহ ৩ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন, ((قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ)) (١٤٥) سورة الأنعام
অর্থাৎ, বল, আমার প্রতি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে তাতে, আহারকারী যা আহার করে তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাই না। তবে মৃতপ্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের মাংস; কেননা তা অপবিত্র। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ। তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে তোমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আনআম ১৪৫ আয়াত)

টিকাঃ
(১) সতর্কতার বিষয় যে, বাংলা একাডেমীর আরবী-বাংলা অভিধানে 'যাবু'র অনুবাদ 'ভল্লুক' করা হয়েছে। সুতরাং তা দেখে কেউ যেন ভল্লুক বা ভালুককে হালাল মনে করে না বসেন। আরবের মরুপ্রাণী 'যুব্ব' খাওয়া হালাল। এর উর্দু তর্জমা 'সান্ডা'। সান্ডার অনুবাদে বলা হয়েছে, এক প্রকার টিকটিকি, যাহার তৈল মালিশ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। (ফরহঙ্গ-ই-রব্বানী ৩৮১পৃঃ) আরবী-বাংলা অভিধান 'আল-কাওসার'-এ এর অনুবাদ করা হয়েছে 'গুঁই সাপ' বলে। অনেকেই এর তর্জমা 'গো-সাপ' করে থাকেন। গোসাপের ইংরেজী তর্জমা 'ইগুয়ানা'। আবার 'ইগুয়ানা'র অনুবাদ লিখা হয়েছে, 'আমেরিকার গোসাপজাতীয় বৃক্ষচর সরীসৃপবিশেষ।' কিন্তু আমার মনে হয় সান্ডা, গোসাপ ও ইগুয়ানা পৃথক পৃথক সরীসৃপ। অতএব আরবী 'যুব্ব' অর্থে ঐ সকল প্রাণীকে হালাল বলা ঠিক হবে না। বিশেষ করে 'যুব্ব' হল ভেবা ও বোকাজাতীয় সরীসৃপ; চালাক ও স্ফূর্তিবাজ নয়। ছোট বাচ্চারা তা অনায়াসে ধরে খেলা করতে পারে। পক্ষান্তরে গোসাপ বা ইগুয়ানা সেরূপ নয়। সুতরাং বিষয়টি বুঝে দেখা দরকার।
(২) প্রকাশ থাকে যে, অনেকের মতে কাঁটাচুয়া (যা মুরগীর মত ছোট দুপেয়ে জন্তু, যে ভয় পেলে নিজ দেহের কাঁটার মত লোমের ভিতরে মাথা লুকিয়ে গোলাকার বলের আকার ধারণ করে তা) খাওয়া বৈধ এবং তার হারাম হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস সহীহ নয়। (দেখুন: মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৮/১০৬, ১৪৮-১৪৯)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 জলচর প্রাণীর মধ্যে হারাম কি কি?

📄 জলচর প্রাণীর মধ্যে হারাম কি কি?


যে প্রাণী পানিতে বাস করে, সে প্রাণী সাধারণভাবে আমাদের জন্য হালাল; চাহে তা জ্যান্ত হোক অথবা মৃত, মুসলিম শিকার করুক অথবা কাফের। যেহেতু সামুদ্রিক প্রাণীকে হালাল করার জন্য যবেহর প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহর সাধারণ নির্দেশ হল,
((أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ )) (٩٦) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও তার ভক্ষণ বৈধ করা হয়েছে তোমাদের ও পর্যটকদের ভোগের জন্য। (সূরা মাইদাহ ৯৬ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,
(( وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا )) (١٤) سورة النحل
অর্থাৎ, আর তিনিই যিনি সমুদ্রকে (তোমাদের) নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা তা হতে তাজা মাংস ভক্ষণ করতে পার। (সূরা নাহল ১৪ আয়াত)

আর মহানবী ﷺ বলেন, "সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত হালাল।” (আহমাদ, সুনান আরবাআহ প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪৮০নং)

উপর্যুক্ত হাদীস থেকে এ কথাও বুঝা যায় যে, মাছ মারা গিয়ে পানির উপরে ভেসে উঠলেও তা হালাল। পক্ষান্তরে মাছ মারা গিয়ে পানির উপর ভেসে উঠলে তা খাওয়া নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে হাদীস সহীহ নয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ ১/৮৬৪) বরং পানিতে ভাসা আম্বর মাছ সাহাবাদের খাওয়ার ব্যাপারে ঘটনা হাদীসে প্রসিদ্ধ। আর তাঁরা নিরুপায় ছিলেন বলেই নয়; যেহেতু মহানবী ও সেই মাছের কিছু অংশ খেয়েছিলেন। আর এই ভিত্তিতে উলামাগণ বলেন, যে মাছকে লবণ ইত্যাদি দিয়ে ডিব্বাবদ্ধ করা হয়, অথবা রোদে শুকিয়ে শুঁটকী করা হয়, তা স্বাস্থ্যগত ক্ষতি না থাকলে খাওয়া বৈধ। অবশ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্য হতে অনেক উলামাগণ কোন কোন প্রাণীকে ব্যতিক্রম ভেবেছেন; যেমন মানুষরূপী মাছ, হস্তিরূপী (জলহস্তি), শূকররূপী, কুকুররূপী প্রাণী ইত্যাদি, যা স্থলচর প্রাণীর মত দেখতে এবং তা হারাম। সমস্যা হল উভচর প্রাণী নিয়ে। যে প্রাণী পানিতে ও ডাঙ্গাতে উভয় জায়গায় সমানভাবে বাস করতে পারে সে প্রাণী উলামাদের নিকট সন্দিগ্ধ। যেহেতু এমন শ্রেণীর প্রাণীর হালাল অথবা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন অকাট্য দলীল বর্তমান নেই। আর এই জন্যেই অনেকের মতে কাঁকড়া, কচ্ছপ, শামুক ইত্যাদি প্রাণী খাওয়া বৈধ; পক্ষান্তরে অনেকের মতে তা বৈধ নয়। অবশ্য কুমীরের ব্যাপারটা আরো বেশী সন্দিগ্ধ। কারণ, কুমীর শিকার করে এবং তার শিকারকারী দাঁতও আছে। সুতরাং আল্লাহই অধিক জানেন। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৮/১০৬, ১৯/১৪০, ১৪৮)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে যবেহ পশু

📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে যবেহ পশু


ইসলামী শরীয়ত মতে যবেহ ছাড়া অন্যভাবে হত্যা করা বা মরা হালাল পশুও মুসলিমদের জন্য খাওয়া বৈধ নয়। অতএব কিভাবে ইসলামে পশুকে হালাল করা যায়, তা জানা আবশ্যক।

১। যবেহকারী (পুরুষ অথবা মহিলা) মুসলিম জ্ঞানসম্পন্ন সাবালক অথবা বুদ্ধিসম্পন্ন কিশোর বা কিশোরী হতে হবে।

২। যবেহকালে আল্লাহর নাম নেওয়া ('বিসমিল্লাহ' বলা) ওয়াজেব। (৩) 'বিসমিল্লাহ'র সাথে 'আল্লাহু আকবার' যুক্ত করা মুস্তাহাব। বিস্তারিত জানতে 'যুল হজ্জের তেরো দিন' দ্রষ্টব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি তোমরা তাঁর নিদর্শনসমূহের বিশ্বাসী হও তবে যাতে (যে পশুর যবেহ করার সময়) আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে তা আহার কর।” (সূরা আনআম ১১৮ আয়াত) "এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি তা হতে তোমরা আহার করো না; তা অবশ্যই পাপ।” (সূরা আনআম ১২১ আয়াত)

আর নবী বলেন, "যা খুন বহায় এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর।” (বুখারী ২৩৫৬, মুসলিম ১৯৬৮-নং)

৩। যবেহর ছুড়ি ধারালো হওয়া এবং যবেহতে খুন বহা জরুরী। আর তা দুই শাহরগ (কণ্ঠনালীর দুই পাশে দু'টি মোটা আকারের শিরা) কাটলে অধিকরূপে সম্ভব হয়। প্রিয় নবী বলেন, "যা খুন বহায়, যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর। তবে যেন (যবেহ করার অস্ত্র) দাঁত বা নখ না হয়।” (আহমদ, বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি, সহীহুল জামে' ৫৫৬৫নং)

৪। মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন পশুর রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ যবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরী; শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং পার্শ্বস্থ দুই মোটা শিরা।
প্রকাশ থাকে যে, যবেহ করার সময় উপরোক্ত অঙ্গসমূহ কাটা ছাড়া অতিরঞ্জন করে আরো অধিক পেঁচানো বৈধ নয়। কারণ তাতে পশুর প্রতি অধিক কষ্ট প্রদর্শন হয়। অথচ আমাদেরকে যবেহর সময়েও পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। অবশ্য অসাবধানতা বা ভুলের কারণে যদি পশুর মাথা কেটে পৃথক হয়েই যায়, তাহলে যবেহ মকরূহ হয়ে যাবে না। বরং তা হালালরূপেই খাওয়া যাবে। (মিনহাজুল মুসলিম ৬৪০পৃঃ)

৫। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোন কোন পশু (যেমন উট) কে যবেহ করা সম্ভব নয়, সে পশুকে বাম পা বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নহর করা হবে। আল্লাহ পাক বলেন, "সুতরাং দন্ডায়মান অবস্থায় ওদের যবেহকালে তোমরা আল্লাহর নাম নাও।” (সূরা হাজ্জ ৩৬ আয়াত) ইবনে আব্বাস এই আয়াতের তফসীরে বলেন, 'বাম পা বেঁধে তিন পায়ের উপর দন্ডায়মান অবস্থায় (নহর করা হবে)।' (তাফসীর ইবনে কাসীর) নহর হবে পশুর গলার নিচে খাল অংশে বর্শা দিয়ে আঘাত করে।

৬। পশু যদি ধরাই না দেয়, কুঁয়া অথবা গর্তে পড়ে তার মুখ যদি নিচের দিকে হয়ে যায় এবং তার ফলে যবেহ কিংবা নহর করা সম্ভব না হয়, তাহলে শিকার করার মত পশুর দেহে 'বিসমিল্লাহ' বলে (তীর বা ছেদকারী গুলিবিশিষ্ট বন্দুক দ্বারা) যে কোন জায়গায় আঘাত করে খুন বইয়ে হালাল করা যাবে।

সুতরাং উপর্যুক্তরূপে শরীয়তসম্মতভাবে যবেহ না হলে, সে পশুর মাংস হারাম। বলা বাহুল্য, কোন নাস্তিক, কাফের বা মুশরিকের যবেহ করা পশু হালাল নয়। মাযারী, কবূরী এবং মতান্তরে কোন বেনামাযীর হাতে যবেহ করা পশু হালাল নয়। বৈধ নয় কোন ছোট শিশু, নেশাগ্রস্ত বা পাগল ব্যক্তির যবেহ।

যবেহর সময় আল্লাহর নাম না নিলে অথবা কোন গায়রুল্লাহর নাম নিলে সে যবেহর পশু মুসলিমের জন্য হালাল নয়।
জেনে নেওয়া দরকার যে, যবেহ করার সময় যদি কেউ 'বিসমিল্লাহ' বলতে ভুলে যায়, তাহলে তার ফলে গোশ্ত হারাম হবে না।

যে পশু কোন পশুর হাড়, দাঁত বা নখ দিয়ে যবেহ করা হয়, তা খাওয়া বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৯৬৮-নং)

যে পশু কারেন্টের শক দ্বারা যবেহ (হত্যা) করা হয়, সে পশু হালাল নয়; চাহে সেভাবে যবেহ কোন মুসলিম করুক অথবা আহলে কিতাব। অবশ্য যে পশু বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে মরতে যায় এবং তার আগে শরয়ী যবেহ করা হয়, সে পশু হালাল। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ৬/২৬১, ১১/১৬২, ১৬৭, ১৩/৩৩৫)

প্রকাশ থাকে যে, আহলে কিতাব (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান) দ্বারা যবেহকৃত পশু আমাদের জন্য হালাল। মহান আল্লাহ বলেন,
(( وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ)) (٥) سورة المائدة
অর্থাৎ, আহলে কিতাবদের খাদ্য (যবেহ করা পশু) তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল। (সূরা মাইদাহ ৫ আয়াত)

অবশ্য যেভাবে মৃত পশুকে ইসলামে হারাম বলা হয়েছে, সেভাবে মৃতকে তারা হালাল ভাবলেও মুসলিমদের জন্য তা হালাল হবে না।
বাইরে থেকে আমদানীকৃত ডিব্বাবদ্ধ অথবা হিমায়িত মাংস যদি ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যবেহ করা হয়েছে বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় অথবা মুসলিম বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তা হালাল বলে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ।

জ্ঞাতব্য যে, যবেহকৃত গর্ভবতী পশুর পেটের ভ্রূণকে পৃথকভাবে যবেহ না করেই খাওয়া হালাল। যেহেতু মহানবী বলেন, "ভ্রূণের যবেহ, তার মায়ের যবেহ।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী, মিশকাত ৪০৯১-৪০৯৩ নং)
অবশ্য ভ্রূণ বের করার পরেও যদি তার মাঝে স্থায়ী জীবন থাকে, তাহলে হালাল করার জন্য তাকে যবেহ করা জরুরী। (ফিকহুস সুন্নাহ ২/২৩)

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে শিকার করা পশু

📄 শরীয়ত ছাড়া অন্য মতে শিকার করা পশু


যে সকল প্রাণী খাওয়া হালাল এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, তা খাওয়ার উদ্দেশ্যে শিকার করা বৈধ। খামাখা পশু হত্যা বৈধ নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
((وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا))
অর্থাৎ, তোমরা (ইহরাম থেকে) হালাল হলে শিকার কর। (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত) শিকার করার পর তা জীবিত থাকলে হালাল করার জন্য শরীয়ত মোতাবেক যবেহ করা জরুরী।

শিকার জীবিত না থাকলে অথবা অল্পক্ষণ জীবিত থেকে মারা গেলে তা হালাল হওয়ার জন্য শর্ত রয়েছে:-

১। যবেহকারীর জন্য যা হওয়া শর্ত, শিকারীর জন্যও তাই হওয়া জরুরী। নচেৎ শিকার হালাল হবে না।

২। শিকারের অস্ত্র বা মাধ্যম শরীয়ত-অনুমোদিত হতে হবে। অর্থাৎ :-
(ক) তা ধারালো অস্ত্র হতে হবে। তা যেন শিকারের দেহ ছেদ করে এবং রক্ত প্রবাহিত করে।
(খ) শিক্ষাপ্রাপ্ত শিকারী পাখী অথবা কুকুর দ্বারা শিকার হতে হবে এবং সে নিজের জন্য নয়; বরং মালিকের জন্য শিকার করে আনবে।
(গ) সেই অস্ত্র বা মাধ্যম শিকারের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপ বা প্রেরণ করতে হবে। অর্থাৎ, অস্ত্র নিজে থেকে শিকারের উপর পড়লে অথবা (শিকার) শিক্ষাপ্রাপ্ত পাখী বা কুকুর নিজে থেকে গিয়ে শিকার করলে তা হালাল হবে না।
(ঘ) সেই অস্ত্র বা মাধ্যম শিকারের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপ বা প্রেরণ করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলতে হবে। অবশ্য সেই সাথে 'আল্লাহু আকবার' বলাও সুন্নত। মহান আল্লাহ বলেন,
((وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ)) (٤) سورة المائدة
অর্থাৎ, --এবং শিকারী পশুপক্ষী যেগুলোকে তোমরা শিকার শিক্ষা দিয়েছ; যেভাবে আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন-ঐ (শিক্ষা দেওয়া পশুপক্ষী) গুলো যা তোমাদের জন্য ধরে আনে তা ভক্ষণ কর এবং (তাদেরকে শিকারের জন্য পাঠানোর সময়) আল্লাহর নাম নাও। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর। (সূরা মাইদাহ ৪ আয়াত)

মহানবী বলেন, "যখন তুমি তোমার শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুর (শিকার করার জন্য) প্রেরণ করবে এবং আল্লাহর নাম নেবে (অতঃপর সে তোমার জন্য যে শিকার মেরে আনবে) তা খাও।” (বুখারী, মুসলিম)

সুতরাং উক্তরূপে শরীয়তসম্মতভাবে শিকার না হলে, সে পশুর মাংস হারাম। বলা বাহুল্য, ঢিল বা লাঠির আঘাতে শিকার, ফাঁদ বা জালে আটকে শিকার অথবা অন্য কোন যন্ত্রের সাহায্যে শিকার, যাতে শিকারের দেহ বিক্ষত হয় না এবং রক্তও প্রবাহিত হয় না অথচ তা জীবিত অবস্থায় শরীয়ত মতে যবেহও করা হয় না, তা খাওয়া হালাল নয়।

পক্ষান্তরে বন্দুকের সাহায্যে শিকার করা বৈধ। যে বন্দুকের গুলি শিকারের দেহ ভেদ করে যায়, চামড়া কেটে ফেলে রক্তপাত ঘটায় সে বন্দুকের শিকার হালাল। পক্ষান্তরে ভেদ না করে কেবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৫১১)

প্রকাশ থাকে যে, একটির উদ্দেশ্যে গুলি বা তীর ছুঁড়লে যদি সেটিকে না লেগে অন্যটিকে লাগে অথবা একাধিক পশু বা পাখী শিকার হয়, তাহলে তা খাওয়াও হালাল। (আল-মুলাখখাসুল ফিক্বহী ২/৪৭২)

শিকারী কুকুর যদি শিকারের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে, তাহলে জানতে হবে সে নিজের জন্য শিকার করেছে। আর সে ক্ষেত্রে তা খাওয়া বৈধ হবে না।
শিক্ষাপ্রাপ্ত শিকারী পাখী বা কুকুর ছাড়ার পর যদি তা অন্য পাখী বা কুকুরের সাথে মিলিত হয়ে শিকার করে এবং বুঝা না যায় যে, কে শিকার করেছে, তাহলে তা খাওয়া বৈধ নয়।
কোন শিকারের প্রতি অস্ত্র ছুঁড়ার পর যদি এক অথবা দুইদিন পর সেই (জঙ্গল বা ঝোঁপ) জায়গায় তা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তাতে নিশ্চিতভাবে ঐ অস্ত্রের আঘাতেরই চিহ্ন পাওয়া যায়, তাহলে তা খাওয়া বৈধ। আর যদি তা পানিতে পড়ে থাকে, তাহলে তা খাওয়া বৈধ নয়। কারণ হতে পারে যে, আহত হয়ে পড়ে পানির জন্য সে মারা গেছে। (সহীহুল জামে' ৩১৩নং)

অবশ্য পড়ে থাকা শিকার পঁচে গন্ধ ধরে গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়। (মুসলিম ১৯৩১নং প্রমুখ) শিকারের কোন অঙ্গ কেটে পৃথক হলে এবং শিকার পালিয়ে গেলে সেই অঙ্গ খাওয়া বৈধ নয়। কারণ মহানবী বলেন, "পশু জীবিত থাকতে যে অংশ কেটে নেওয়া হয়, তা মৃত (পশুর মাংসের) সমান।” (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, সহীহুল জামে' ৫৬৫২নং)
অবশ্য অঙ্গ কেটে পৃথক হওয়ার পর পশু স্বস্থানে মারা গেলে সে অঙ্গ ও পশু হালাল।

জ্ঞাতব্য যে, হজ্জ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় অথবা হারাম সীমানার ভিতরে থাকা অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
((أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعاً لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُماً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ)) (٩٦) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতি সমুদ্রের শিকার ও তার ভক্ষণ বৈধ করা হয়েছে তোমাদের ও পর্যটকদের ভোগের জন্য এবং তোমরা যতক্ষণ এহরামে থাকবে ততক্ষণ স্থলের শিকার তোমাদের জন্য অবৈধ আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যাঁর নিকট তোমাদের একত্র করা হবে। (সূরা মাইদাহ ৯৬ আয়াত)

আল্লাহর রসূল মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, "নিশ্চয়ই এই শহরকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন। এর কোন কাঁটা তোলা যাবে না, কোন শিকার (পশু-পাখী) চকিত করা যাবে না এবং প্রচার উদ্দেশ্যে ছাড়া এর কোন পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না।” (বুখারী ১৫৮৭নং)

সুতরাং ঐ অবস্থায় কেউ শিকার করলে তাকে তার কাফ্ফারা দিতে হবে এবং যে শিকার সে নিজে করেছে অথবা যে শিকার তার জন্য করা হয়েছে অথবা যে শিকার করতে সে অপরের কোন প্রকার সহযোগিতা করেছে, সে শিকারের গোশু খাওয়া তার জন্য হারাম। অবশ্য কোন হালাল ব্যক্তি নিজের জন্য শিকার করে মুহরিমকে খেতে দিলে, তা খাওয়া অবৈধ নয়।
পক্ষান্তরে ঐ অবস্থায় সামুদ্রিক শিকার ও তা খাওয়া অবৈধ নয়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00