📄 প্রারম্ভিক কথা
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوْذُ بِالله مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَسَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُولُه . ﴿ يَتَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ، وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴾ ﴿ يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ، وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴾ ﴿ يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا (ج) يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
ইসলামে আকীদার পর আহকামের বড় গুরুত্ব রয়েছে। আহকামে রয়েছে করণীয় ফরয ও ওয়াজেব কর্মাবলী এবং তারই সমপর্যায়ে রয়েছে বর্জনীয় হারাম ও নিষিদ্ধ কর্মাবলী। হারাম জিনিস ও নিষিদ্ধ কর্ম হতে দূরে থাকার চাইতে ফরয ও ওয়াজেব পালনের গুরুত্ব কম নয়। তবুও তুলনামূলকভাবে হারাম বর্জনের গুরুত্ব অধিক যেহেতু মহানবী বলেন, "আমি তোমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া পর্যন্ত (কিছু না বলা পর্যন্ত) তোমরা আমাকে (কিছু প্রশ্ন না করে) ছেড়ে দাও। যেহেতু তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি বেশী বেশী প্রশ্ন করার জন্য এবং তাদের আম্বিয়াদের সাথে মতবিরোধ করার জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তোমাদেরকে কোন কিছুর আদেশ করলে তা যথাসাধ্য পালন কর। আর কোন কিছু হতে নিষেধ করলে তা বর্জন কর।” (আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত ২৫০৫নং)
বলাই বাহুল্য যে, শিক্ষা, আমল ও দাওয়াতের কাজে পর্যায়ক্রমে যা শুরু করা প্রয়োজন, তা হল আকীদার পর আহকামে হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তু ও কর্মাবলী। আকীদা বিশুদ্ধ করার পরপর যেমন হারাম থেকে দূরে থাকতে হবে, তেমনিই ফরয ও ওয়াজেব পালন করতে হবে। অতঃপর ফাযায়েল ও অতিরিক্ত সৌন্দর্যের কর্মাবলীর দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি বিপরীত দিক থেকে শিক্ষা, আমল ও দাওয়াত শুরু করেন, তাহলে তিনি ভুল করবেন এবং মহানবী -এর পদ্ধতির খিলাফ করবেন।
তাছাড়া কেউ যদি হারাম না চিনে তা খেতে, পরতে ও ব্যবহার করতে থাকেন, তাহলে এ দুনিয়ায় থাকতে তাঁর দুআ কবুল হবে না আল্লাহর কাছে। আর পরকালে নির্ধারিত শাস্তি তো আল্লাহর এখতিয়ারে আছেই। সমাজে যে সব হারামখোর সচরাচর নজরে পড়ে, তাদের সংখ্যা কম নয়। সুতরাং তাদেরকে সতর্ক করার দায়িত্ব পড়ে আলেম সমাজের উপর। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই পুস্তিকার অবতারণা।
এই পুস্তিকায় বিবৃত অনেক বস্তু হয়তো বা অনেকের নিকট হারাম নয়, বরং মকরূহ অথবা সন্দিগ্ধ। তাহলেও যা বর্জনীয়, তা বর্জন করাই উচিত। আর তাতেই আছে পরিত্রাণের পথ। আল্লাহ আমাকে আপনাকে ও সকলকে তওফীক দিন, যাতে হারাম থেকে বিরত থাকতে পারি এবং হারামখোরদের দলভুক্ত না থাকি। আল্লাহুম্মা আমীন।
বিনীত - আব্দুল হামীদ মাদানী
আল-মাজমাআহ সউদী আরব
২৭/৪/২৬হিঃ ৪/৬/২০০৫ইং
📄 হারাম উপার্জন করা ও খাওয়া হতে ভীতি-প্রদর্শন
মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীর বুকে তাদের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের সুব্যবস্থা করে রেখেছেন। অবশ্য পৃথিবীর এই খাদ্য সম্ভারে নানা জিনিস সৃষ্টির পর তিনি আদেশ করেছেন কেবল পবিত্র ও হালাল বস্তু আহার করতে। নিষেধ করেছেন অপবিত্র ও হারাম বস্তু ভক্ষণ করতে। আর এই আদেশ ও নিষেধ যে অমান্য করবে তার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন শাস্তি। প্রথমতঃ তিনি দুনিয়াতে তার দুআ কবুল করবেন না এবং দ্বিতীয়তঃ আখেরাতে তাকে দোযখে দগ্ধ করবেন।
প্রিয় নবী বলেন, "অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছেন আম্বিয়াগণকে। সুতরাং তিনি আম্বিয়াগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
يَتَأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ )
অর্থাৎ, হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত। (সূরা মু'মিনূন ৫১ আয়াত)
আর তিনি (মুমিনদের উদ্দেশ্যে) বলেন,
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَكُمْ )
অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সব রুজী দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর---। (সূরা বাক্বারাহ ১৭২ আয়াত)
অতঃপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করে আলুথালু ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু'টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দুআ করে, 'হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!' কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয় লেবাস হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে। অতএব তার দুআ কিভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম ১০১৫, তিরমিযী ২৯৮৯নং)
হারাম খাওয়া হারাম। আর হারাম খেয়ে যে রক্ত-মাংস তৈরী হয় তা অপবিত্র। পক্ষান্তরে বেহেশ্বে কোন প্রকার অপবিত্রতা নেই এবং অপবিত্র কেউ বেহেশতে যেতে পারে না। বরং যাবতীয় অপবিত্রতার স্থান হল দোযখ। হারামখোরদেরও স্থান হবে দোযখে। আল্লাহর রসূল একদা কা'ব বিন উজরার উদ্দেশ্যে বললেন, “হে কা'ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।” (দারেমী ২৬৭৪ নং)
"--- হে কা'ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।” (সহীহ তিরমিযী ৫০১নং)
মহানবী সাহাবাদেরকে দেওয়া এক অসিয়তে বলেন, (মরণের পর) মানুষের যে অংশটি সবার আগে পঁচে দুর্গন্ধময় হবে তা হল তার পেট। সুতরাং যে ব্যক্তি সক্ষম যে, সে কেবল হালাল ছাড়া অন্য কিছু (হারাম) ভক্ষণ করবে না, সে যেন তাই করে। আর যে ব্যক্তি সক্ষম যে, সে আঁজলা পরিমাণ খুন বহিয়ে তার ও জান্নাতের মাঝে অন্তরাল সৃষ্টি করবে না, সেও যেন তাই করে। (বুখারী)
বলাই বাহুল্য যে, হারাম মাল ও অবৈধ উপার্জন থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক -এর একটি গোলাম ছিল। তিনি তার উপার্জন করা অর্থ তাকে জিজ্ঞাসা করে (হালাল হলে) খেতেন। একদিন জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গিয়ে তার উপার্জিত কিছু খেয়ে ফেললেন। গোলাম বলল, 'আপনি কি জানেন, আপনি আজ কি খেলেন?' তিনি বললেন, 'না তো। কিসের উপার্জন খাওয়ালে তুমি আজ?' গোলাম বলল, জাহেলী যুগে আমি গণকের কাজ করতাম। এক ব্যক্তির ভাগ্য গণনা করেছিলাম। আমি ভাগ্য গণনার কিছুই জানতাম না। আসলে আমি তাকে ধোকা দিয়েছিলাম। আজ তার সাথে সাক্ষাৎ হলে সে সেই পারিশ্রমিক আমাকে দান করল। আর তাই আপনি ভক্ষণ করলেন।' এ কথা শোনামাত্র তিনি নিজ মুখে আঙ্গুল ভরে সমস্ত খাবারটাই বমি করে দিলেন! (বুখারী, ফাতহুল বারী ৭/১৫৪)
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, রুযীর সন্ধান ও অর্থলোভ মানুষকে অন্ধ করে তোলে। ফলে অর্থের নাগাল পেতে সে যে কোন অসীলা অবলম্বন করে বসে। একটু ভেবেও দেখে না যে, সে অসীলা তার জন্য বৈধ, না অবৈধ। আল্লাহর নবী সত্যই বলেছেন, "মানুষের নিকট এমন এক যুগ আসছে, যে যুগে সে যা উপার্জন করবে, তাতে সে পরোয়া করবে না যে, তা হালাল, না হারাম।" (বুখারী)
অথচ তকদীরের উপর ঈমান যে রাখে তার কাছে এ কথা বিদিত যে, প্রত্যেক মানুষের ভাগ্যে রুযী বন্টন করে দেওয়া হয়েছে। সেই বন্টন করা রুযী থেকে বেশী একটা পয়সাও সে উপার্জন করতে সক্ষম নয় এবং তার থেকে একটি পয়সা কম অর্জন করে সে মৃত্যুবরণ করবে না।
প্রিয় নবী বলেন, "রুজী সন্ধানের ব্যাপারে জলদিবাজি করো না। পৃথিবীতে কোন বান্দাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ রুযী অর্জন না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুযী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। হালাল উপায় গ্রহণ কর এবং হারাম উপায় বর্জন কর।” (হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৭৩২৩নং)
তিনি আরো বলেন, “--পৃথিবীতে কোন বান্দাই তার ভাগ্যে নির্ধারিত সর্বশেষ আয়ু ও রুযী পূর্ণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং রুজী সন্ধানে মধ্যবর্তী পন্থা (সুন্দর ও স্বাভাবিক বৈধ পথ) অবলম্বন কর। রুযী আসতে দেরী দেখে তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তার সন্ধানে উদ্বুদ্ধ না হয়। যেহেতু (রুযী আল্লাহর হাতে আর) তা তাঁর বাধ্য না হয়ে অর্জন করা যায় না।” (সহীহুল জামে' ২০৮৫নং)
মহান আল্লাহ বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ وَلَا تَقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا)) (۲۹) سورة النساء
অর্থাৎ, তোমরা পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসা ব্যতীত অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করো না এবং আত্মহত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়াবান। (সূরা নিসা ২৯ আয়াত)
অন্যান্য পাপাচরণের সাথে সাথে ইয়াহুদীরা নাহক ও বাতিল পন্থায় অন্যায়ভাবে লোকেদের মাল গ্রাস করতো। মহান আল্লাহ তাদের সত্বর শাস্তি স্বরূপ দুনিয়াতে অনেক হালাল জিনিস তাদের জন্য হারাম করে দিলেন। কুরআন মাজীদে তিনি বলেন,
((فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتِ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا (١٦٠) وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا)) (١٦١) سورة النساء
অর্থাৎ, আমি ইয়াহুদীদের অন্যায়াচরণ হেতু তাদের জন্য যে সমস্ত পবিত্র বস্তু বৈধ ছিল তাও আমি অবৈধ করলাম। যেহেতু তারা অনেককে আল্লাহর পথে বাধা দিত, তারা সূদ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণ করত এবং অন্যায়ভাবে লোকদের ধন-সম্পদ গ্রাস করত। আর আমি কাফেরদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি। (সূরা নিসা ১৬০-১৬১ আয়াত)
প্রিয় নবী বলেন, “মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার খিয়ানত করবে না, তাকে মিথ্যুক ভাববে না এবং তাকে লাঞ্ছিত করবে না। প্রত্যেক মুসলিমের উপর মুসলিমের সম্ভ্রম, সম্পদ ও খুন হারাম। তাকওয়া এখানে (হৃদয়ে)। মন্দের জন্য মানুষের এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে ঘৃণা করে।” (তিরমিযী, সহীহুল জামে' ৬৫৮২)
বিদায়ী হজ্জের বছরে আরাফায় অথবা কুরবানীর দিন রসূল তাঁর ভাষণে বর্তমান স্থান ও কালের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, “তোমাদের খুন, সম্পদ, সম্ভ্রম তোমাদের পরস্পরের উপর সেইরূপই হারাম ও মর্যাদাপূর্ণ; যেমন তোমাদের এই আজকের দিন, এই মাসে এবং এই শহরে তা হারাম ও মর্যাদাপূর্ণ।” (বুখারী ও মুসলিম)
সৃষ্টিকর্তার পৃথিবীর এ খাদ্যসম্ভারে মানুষ সৎ-অসৎ উপায়ে যা উপার্জন করবে, হালাল-হারাম যাই ভক্ষণ করবে করুক না কেন, তাকে কিন্তু উপেক্ষা করা হবে না। একদিন তার কাছে কৈফিয়ত নেওয়া হবে, তার মাল সম্পর্কে। প্রত্যেক মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে কিয়ামত কোর্টে আল্লাহর নিকটে।
মহানবী বলেন, “কিয়ামতের দিন কোন বান্দার পদযুগল ততক্ষণ পর্যন্ত সরবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে তার আয়ু প্রসঙ্গে কৈফিয়ত করা হবে যে, সে আয়ু কিসে ক্ষয় করেছে? তার ইল্ম প্রসঙ্গে কৈফিয়ত তলব করা হবে যে, সে তাতে কতটুকু আমল করেছে? তার ধন-সম্পদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে যে, সে তা কোন্ উপায়ে উপার্জন করেছে এবং কোন্ পথে তা ব্যয় করেছে? আর তার দেহ বিষয়ে কৈফিয়ত করা হবে যে, সে তা কিসে নষ্ট করেছে?” (তিরমিযী, সহীহ তারগীব ১২১নং)
মানুষ যে অর্থ উপার্জন করে, তা সাধারণতঃ ৪ প্রকার:-
(১) যা আল্লাহর অনুগত থেকে উপার্জন করা হয় এবং তাঁরই সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করা হয়। আর এটা হল পবিত্রতম ও সর্বোত্তম অর্থ।
(২) যা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কামানো হয় এবং পাপের পথে ব্যয় করা হয়। আর এ হল অপবিত্রম ও নিকৃষ্টতম অর্থ।
(৩) যা কোন মুসলিমকে কষ্ট দিয়ে কামানো হয় এবং কোন মুসলিমকে কষ্ট দেওয়ার পথে ব্যয় করা হয়। আর তাও নিকৃষ্ট অর্থ।
(৪) যা বৈধ পথে অর্জন করা হয় এবং বৈধ প্রবৃত্তির পথে ব্যয় করা হয়। যাতে আসলে কোন উপকার বা অপকার নেই।
প্রথম প্রকার অর্থ হয় মুমিনের। এই অর্থে সে উপকৃত হয় দুনিয়াতে ও আখেরাতে। অবশ্য চতুর্থ প্রকার অর্থ থাকা দূষণীয় নয়।
📄 অর্থলালসা
অনেক সময় দেখা যায় যে, মানুষের চলার মত বেশ অর্থ আছে, রুযী-রোযগারের সুন্দর ব্যবস্থা আছে। তবুও সে অতিরিক্ত অর্থের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থোপার্জন করে যাচ্ছে। হালাল পথ না পেয়ে, অথবা হালাল পথে ধনাগম কম দেখে হারাম পথকেই উৎকৃষ্ট পথ বলে গ্রহণ করে নিচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ হারাম উপার্জনে উদ্বুদ্ধ হয় কেন?
বিলাসিতা যখন মনে-প্রাণে অনুপ্রবেশ করে, তখন মানুষ অর্থলোলুপতার শিকার হয়। আর তখনই অর্থোপার্জনের জন্য উপায় ও কৌশল অবলম্বন করে। বিলাসবহুল পরিবেশের বিলাসিতার প্রতিযোগিতায় মানুষ নিজেকে পশ্চাদ্বতী করতে চায় না। বিলাসিনী অর্ধাঙ্গিনীর বিলাস-সামগ্রী সংগ্রহ করতে তাকে ধন অর্জনের পথ অবলম্বন করতেই হয়। আর সেই সময় হালাল পথ না পেলে অথবা হালাল পথে উপার্জন কম দেখলে হারাম পথকেই বেছে নেয়।
মন চায় না যে, কেউ গরীব হোক, অথচ সীমালংঘনকারী ধনবত্তা থেকে গরীবী অনেক ভাল। আসলে মন ধনী হলে সেটাই যথেষ্ট, তা না হলে পৃথিবীর সম্পদ তার জন্য যথেষ্ট নয়। এ দুনিয়ায় যার মন ধনী, সেই প্রকৃত ধনী। নচেৎ সারা পৃথিবী পেয়েও তার ধন-পিপাসা মিটবে না। ধনী হয়েও নিজেকে সে দরিদ্র মনে করবে। আসলে ধন-পিপাসা পানি-পিপাসা থেকেও কঠিনতর।
মহানবী আবু যার কে বললেন, "তুমি কি মনে কর যে, বেশী ধন হলে, তার নামই ধনবত্তা? (না,) বরং প্রকৃত ধনবত্তা হল হৃদয়ের ধনবত্তা এবং প্রকৃত দরিদ্রতা হল হৃদয়ের দরিদ্রতা। যার হৃদয়ে ধনবত্তা থাকে, দুনিয়ার কোন বঞ্চনা তার ক্ষতি করতে পারে না। আর যার হৃদয়ে দরিদ্রতা থাকে, দুনিয়ার ধনাধিক্য তাকে অভাবমুক্ত করতে পারে না। আসলে হৃদয়ের কার্পণ্যই তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।” (নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৭৮১৬নং) আর আমাদের বাংলা প্রবাদে বলে, 'বিত্ত হতে চিত্ত বড়।'
অনেক মানুষের কাছে বাস্তব এই যে, দুনিয়াটা কার? দুনিয়া টাকার। যার আছে টাকা, তার সব পাপ ঢাকা! যার নাই টাকা, তার সব কথাই ঢাকা! টাকা যখন কথা বলে সত্য ও ন্যায় তখন চুপ থাকে। সব কথা ফাঁকা, আসল কথা টাকা। সুতরাং যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, অর্থই হল জীবনের সব কিছু, সে ব্যক্তি তা অর্জনের পথে সব কিছুই করতে পারে। আর সেই সময় সে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে থাকে, লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে।
আল্লাহর রসূল বলেন, "দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে কোন ছাগপালে ছেড়ে দিলে তারা ছাগলের যতটা বিনাশ সাধন করে, তার চাইতেও ধনলোভ ও দ্বীনদারীর খ্যাতিলোভ মানুষের অধিক বিনাশ সাধন করে।” (তিরমিযী ২৩৭৬, ইবনে হিব্বান ৩২১৮, সহীহুল জামে' ৫৬২০নং)
তিনি আরো বলেন, "আদম সন্তানের মালিকানায় যদি সোনার একটি উপত্যকাও হয়; তবুও সে অনুরূপ আরো একটির মালিক হওয়ার অভিলাষী থাকবে। পরন্তু একমাত্র মাটিই আদম সন্তানের চোখ (পেট) পূর্ণ করতে পারে। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন।” (বুখারী ৬৪৩৭, মুসলিম ১০৪৯নং)
তিনি আরো বলেন, “দুইজন লোভী তৃপ্ত হয় না; জ্ঞানলোভী ও ধনলোভী।” (সহীহুল জামে' ৬৬২৪নং)
মানুষ যে ধন ভালোবাসে, সে কথা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলাও বলে দিয়েছেন তাঁর কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে। এক স্থানে তিনি বলেন,
(( وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمَّا)) (٢٠) سورة الفجر (( وَإِنَّهُ لِحُبِّ الْخَيْرِ لَشَدِيدٌ)) (۸) سورة العاديات
অর্থাৎ, আর তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালোবাস। (সূরা ফাজর ২০ আয়াত)
অর্থাৎ, আর সে ধন-সম্পদের আসক্তিতে অতি কঠিন। (সূরা আদিয়াত ৮ আয়াত)
ধনলোভের কি কোন সীমা আছে। যত হয়, তত বেশী পেতে আকাঙ্ক্ষী হয় মন। যার যত আছে, সে তত আরো চায়। সদুপায়ে না পেলে অসুদপায়েও পেতে চায়। 'এ জগতে হায়, সেই বেশী চায়, আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।'
কিন্তু ধনলোভ অবশ্যই ভালো নয়। ধনলোভ মানব-মনে অশান্তি আনে। ধনলোভে কোন প্রকার মঙ্গল নেই। কথিত আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে ধন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, মাল-ধনে কোন মঙ্গল নেই। বলা হল, তা কেন হে আল্লাহর নবী? বললেন, কারণ, হারাম ছাড়া ধন হয় না। বলা হল, যদি হালাল হয়? বললেন, তার হক (যাকাত) আদায় হয় না। বলা হল, যদি তার হক আদায় করা হয়? বললেন, মালদার অহংকার থেকে বাঁচতে পারে না। বলা হল, যদি বাঁচতে পারে? বললেন, আল্লাহর যিক্র থেকে বিরত রাখে। বলা হল, যদি তা না রাখে? বললেন, কিছু না হলেও কিয়ামতে মালদারের হিসাব লম্বা হবে।
রাজার রাজকোষ থাকে। কিন্তু রাজ-মুকুট রাজাকে তার মাথাব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারে না। আসলে ধন-মালই বড় কথা নয়। তার থেকে বড় কথা হল, মনের সুখ ও সুস্বাস্থ্য। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। এই জন্যই জ্ঞানীরা অর্থ ব্যয় করে স্বাস্থ্য আনয়ন করেন, আর আহাম্মকরা স্বাস্থ্য ক্ষয় করে অর্থ উপার্জন করে।
ডঃ মুস্তফা সিবাঈ বলেন, যার জীবন অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন আহাম্মক। যার মান-সম্মান অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন নিকৃষ্ট। যার জাতি ও দেশ অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন সমাজ-বিরোধী। আর যার ধর্ম অপেক্ষা তার মালধন অধিক প্রাধান্যযোগ্য সে একজন এমন লোক যার হৃদয়কে আকৃষ্ট করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।
কোন মানুষের জন্য দুটি হাতে এক সাথে তিনটি ফুটবল রাখা সম্ভব নয়। তদনুরূপ একটি মানুষের ভিতরে সুস্বাস্থ্য, ধন ও মানসিক শান্তি একই সঙ্গে থাকতে পারে না। ধনলোভী ধনী লোকের ধন তার স্বাস্থ্যের পক্ষে বড় শত্রু। অথচ ভালো স্বাস্থ্যের চেয়ে সম্পদ বেশী মূল্যবান নয়।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ কোন মানুষের মঙ্গল আনতে পারে না। অর্থ হল উত্তম ভৃত্য, কিন্তু অর্থ হল নষ্টকারী প্রভু। অনেক সময় অর্থই অনর্থের মূল হয়ে বসে। আবার ঐ অর্থই অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। অনেক সময় অতি লোভে তাঁতি ডোবে। ধন-মালের রক্ষণাবেক্ষণ মনে দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে। আর এ জন্যই একজন দরিদ্র লোক যত বেশী নিশ্চিন্ত, একজন রাজা তত বেশী উদ্বিগ্ন। অতএব ধনী হয়ে ভয়ে ভয়ে বাস করার চেয়ে গরীব হয়ে নিরাপত্তায় বাস করা উত্তম।
মন্দ সঞ্চার ও সঞ্চয়কারী লোভ ৬টি; বিষয়াসক্তি, নেতৃত্বলোভ, যশলোভ, উদরপরায়ণতা, নিদ্রাবিলাসিতা ও আরাম-প্রিয়তা। অতিরিক্ত ধন-সম্পদ মানুষের জন্য মন্দ বৈ কিছু নয়। ধনে আনে অহংকার। আর অহংকার আনে পতন। কারুন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
ধন-মাল মানুষের জন্য ফিতনা। ধন-মাল মানুষের মাঝে ফিতনা ও যুদ্ধ সৃষ্টি করে। এক ব্যক্তির সাথে অপর ব্যক্তির, এক গোষ্ঠীর সাথে অপর গোষ্ঠীর, এক দেশের সাথে অপর দেশের লড়াই যে সব কারণে সংঘটিত হয়, তার মধ্যে প্রধান কারণ হল ধন। নেপোলিয়ন বলেছেন, যুদ্ধ হয় তিনটি কারণে; অর্থ, অর্থ ও অর্থ।
আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায় এই টাকা। টাকা তুমি দেখতে গোল, তোমার মাঝেই গন্ডগোল। টাকা তুমি যাচ্ছ কোথা? পিরীত যথা। আসবে কবে? বিচ্ছেদ যবে। 'কহিল ভিক্ষার ঝুলি টাকার থলিরে, আমরা কুটুম্ব দোঁহে ভুলে কি গেলি রে? থলি বলে, কুটুম্বিতা তুমিও ভুলিতে, আমার যা আছে গেলে তোমার ঝুলিতে।'
টাকার লোভ যারই মাঝে আছে, তারই মনের মাঝে অশান্তি আছে। টাকার লালসা তাকে অন্ধ ও বধির করে তোলে, ফলে হারাম ও হালালের তমীয সে করতে সক্ষম হয় না। আর তার জন্যই সে হারামখোরে পরিণত হয়ে বসে। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
📄 হালাল কামাই
ধনলোভ মন্দ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ধনোপার্জন বৈধ নয় অথবা ধনের দিকে ভ্রূক্ষেপ করা যাবে না অথবা ধন পাওয়ার আশা মনে মোটেই রাখা চলবে না। বরং প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ খেয়াল রেখে হালাল উপায়ে তা অনুসন্ধান ও অর্জন করতে হবে।
বলাই বাহুল্য যে, নবীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজা ছিলেন। সাহাবাদের কারো মধ্যেই ধনলোভ ছিল না; কিন্তু তাঁদের অনেকেই ধনী ছিলেন এবং সেই ধন দ্বারা ইসলামের যথেষ্ট খিদমতও করেছেন।
একদা আইয়ুব নবী গোসল করছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁর সম্মুখে একদল সোনার পঙ্গপাল পড়লে তিনি তা নিজের কাপড়ে ভরতে লাগলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে বললেন, 'হে আইয়ুব! আমি কি তোমাকে এ সব থেকে অমুখাপেক্ষী (ধনী) করিনি?' আইয়ুব বললেন, 'অবশ্যই হে আমার প্রতিপালক, তোমার ইজ্জতের কসম! কিন্তু তোমার বর্কত থেকে আমার এতটুকু অমুখাপেক্ষিতা নেই।' (বুখারী) সুতরাং সৎ উপায়ে ধনী হওয়া কোন ত্রুটির কথা নয়। পবিত্র মাল পবিত্র পথে উপার্জন করে তা যদি পবিত্র পথে ব্যয় করা হয় এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়, তাহলে তা নিশ্চয়ই এক মহান ইবাদত। আল্লাহর নবী বলেন, “সৎ মানুষের জন্য পবিত্র মাল কতই না উত্তম!” (আহমাদ, মিশকাত ৩৭৫৬নং)
তাছাড়া হালাল রুযী-রুটির জন্য মানুষকে উপার্জনের পথ অবলম্বন করতেই হয়। নচেৎ অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়। আর আলস্য বা পরিশ্রম-বিমুখতা হল মা, তার ছেলের নাম ক্ষুধা এবং মেয়ের নাম চুরি।
মহান আল্লাহ বান্দাকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন,
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُواْ مِمَّا فِي الأَرْضِ حَلاَلاً طَيِّباً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مبين)) (١٦٨) سورة البقرة
অর্থাৎ, হে লোক সকল! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিঃসন্দেহ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বাকারাহ ১৬৮ আয়াত)
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ))
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসীগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; যদি তোমরা শুধু তাঁরই উপাসনা করে থাক। (সূরা বাকারাহ ১৭২ আয়াত)
তিনি আরো বলেন,
(( وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالاً طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ)) (۸۸) سورة المائدة
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন তা হতে বৈধ ও উৎকৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমরা সকলে বিশ্বাসী।
মানুষের জীবন-হেতুঃ
জীবন ধারণের উপায় ১০ প্রকারঃ বিদ্যা, শিল্প, ভূতি, সেবা, পশুপালন, বিপণি, কৃষি, বৃত্তি, ভিক্ষা, কুশীদ।
মানুষ যে সব উপায়ে বৈধ উপার্জন করে থাকে তা সাধারণতঃ ৪ প্রকারের:-
১। হস্তশিল্প বা নিজ হাত দ্বারা কারিগরীর কোন কাজ করে, কোন জিনিস প্রস্তুত করে তা বিক্রয়ের মাধ্যমে উপার্জন।
২। চাকুরি বা মজদুরীঃ নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে অপরের কাজ করে উপার্জন।
৩। ব্যবসা-বাণিজ্য: পণ্য ক্রয় করে অপেক্ষাকৃত বেশী মূল্যে বিক্রয় করে লাভ করার মাধ্যমে উপার্জন।
৪। চাষ বা কৃষিকাজের মাধ্যমে জমিতে ফসল ফলিয়ে খাদ্য ও অর্থ উপার্জন।
উপরোক্ত ৪টি পেশাই মানব-সমাজের জন্য সমানভাবে জরুরী। মানুষের জীবন পথে জীবিকা নির্বাহের জন্য ৪টির মধ্যে একটি পেশা অবলম্বন করতেই হয়। সমষ্টিগতভাবে সকল বৈধ পেশাই জরুরী দ্বীন ও দুনিয়া চলার জন্য। তবে অনেকে বলেছেন, তুলনামূলকভাবে চাষই উত্তম। কারণ, তাতে সন্দিগ্ধ মাল থাকে না এবং আল্লাহর উপর ভরসা থাকে অধিক।
অবশ্য অধিক অর্থ সমাগমের জন্য ব্যবসাই উত্তম পন্থা। কথায় বলে, 'চলে যদি মনোহারি, কি করিবে জমিদারি?' 'জেলের পাছায় টেনা, আর নিকারির (মৎস্য-ব্যবসায়ীর) কানে সোনা।'
মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সকলকে রুযী দিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কোন কারণের মাধ্যমেই সেই রুযী বন্টন করে থাকেন। আর সেই কারণ ও উপকরণ অবলম্বন করতে হয় মানুষকে।
শিল্পের কাজ ও মজদূরী
কাজ করে খাওয়া কোন ত্রুটি নয়। লজ্জার কিছু নয়। তাওয়াক্কুলের খেলাপও নয়। উপার্জন দ্বারা মানুষের ইজ্জত রক্ষা পায়। এক ব্যক্তিকে মহানবী কাঠ কাটতে আদেশ দিয়ে তা বিক্রয় করে খেতে বললেন; তাওয়াক্কুল করতে বললেন না। আসলে উট বেঁধে তাওয়াক্কুল করাই হল শরয়ী তাওয়াক্কুল।
আম্বিয়ায়ে কিরাম আল্লাহর উপর যেরূপ তাওয়াক্কুল করতেন, সেরূপ তাওয়াক্কুল কোন সাধারণ মানুষ করতে পারে না। তবুও তাঁরা রুযী-রোযগারের পথ হিসাবে এক একটি পেশা অবলম্বন করেছেন।
বলা বাহুল্য, আদম চাষ করেছেন। নূহ কাঠমিস্ত্রী বা ছুতোর ছিলেন। ইবরাহীম চাষের কাজ করতেন এবং তিনি কাপড়ের ব্যবসাও করতেন। দাউদ কামার ছিলেন, তিনি লৌহবর্ম বানাতেন। সুলাইমান খেজুর পাতা ইত্যাদির ডালি বুনতেন। লুকুমান দর্জী অথবা কাঠমিস্ত্রী বা ছুতোর ছিলেন। যাকারিয়া কাঠমিস্ত্রী বা ছুতোর ছিলেন। সালেহ ব্যবসায়ী ছিলেন। ইদরীস দর্জী ছিলেন। শুআইব বকরী বা উঁট চড়িয়েছেন। ত্বালুত চামড়া পবিত্রকরণের কাজ করতেন। মুসা আট অথবা দশ বছর ধরে মজদুরী করেছেন ও ছাগল চড়িয়েছেন। ঈসা -এর মাতা মারয়্যাম সুতা কাটার কাজ করতেন। মুহাম্মাদ বকরী চড়িয়েছেন এবং ব্যবসাও করেছেন। (কোন কোন নবীর পেশার কথা দুর্বল হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, দেখুনঃ মুস্তাদরাকুল হাকেম ২/৬৫২, ফাতহুল বারী ৪/৩০৬)
এ ছাড়া এমন কোন নবী নেই যিনি তাঁর জীবনে রাখালের কাজ করেননি। (বুখারী মুসলিম, মিশকাত ২৯৮৩, ৪১৮৬নং)
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "স্বহস্তে উপার্জন করে যে খায় তার চেয়ে উত্তম খাদ্য অন্য কেউ ভক্ষণ করে না। আল্লাহর নবী দাউদ স্বহস্তে উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করতেন।” (বুখারী ২০৭২ নং)
তিনি আরো বলেন, "তোমরা যে খাদ্য ভক্ষণ কর তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম খাদ্য হল তোমাদের নিজের হাতে কামাই করা খাদ্য। আর তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের উপার্জিত ধনের পর্যায়ভুক্ত।” (বুখারীর তারীখ, তিরমিযী, নাসাঈ, বাইহাক্বী, সহীহুল জামে' ১৫৬৬ নং)
আবু হুরাইরা বলেন, একদা আমরা আল্লাহর রসূল -এর সাথে ছিলাম। এমন সময় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একজন (সুস্বাস্থ্যবান) যুবক বের হয়ে এল। আমরা যখন তাকে দেখলাম এবং তার প্রতি দৃষ্টি ফেলে রাখলাম, তখন বললাম, যদি এই যুবক তার যৌবন, উদ্যম ও শক্তিকে আল্লাহর পথে ব্যয় করত! (তাহলে কতই না উত্তম হতো।) আল্লাহর রসূল আমাদের এ কথা শুনে বললেন, “(যুদ্ধে) খুন হওয়া ছাড়া কি আর আল্লাহর পথ নেই? যে ব্যক্তি নিজ পিতামাতার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে, যে ব্যক্তি নিজ ছেলেমেয়ে জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজ আল্লাহর পথে এবং যে ব্যক্তি নিজেকে সৎ রাখার জন্য রুযী-সন্ধান করে, তার কাজও আল্লাহর পথে। কিন্তু যে ব্যক্তি ধনবৃদ্ধিতে গর্ব করার জন্য কর্ম করে, তার কাজ তাগূত অথবা শয়তানের পথে।” (বায্যার, বাইহাকী, প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ২২৩২নং)
ব্যবসা-বাণিজ্য
পুঁজি থাকলে সদুপায়ে ব্যবসার পথও হালাল রুযী সন্ধান করার একটি বৈধ পথ। মহানবী বলেন, “সবচেয়ে পবিত্র উপার্জন হল, যা মানুষের নিজ হাতের কাজ এবং সদুপায়ে ব্যবসার মাধ্যমে করা হয়।” (আহমাদ প্রমুখ) তিনি আরো বলেন, “আমানতদার, সত্যবাদী মুসলিম ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন আম্বিয়া, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের সাথে অবস্থান করবে।” (সহীহ তারগীব ১৭৮৩, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪৫৩নং) আল্লাহর রসূল আরো বলেন, "(বিক্রয়-স্থল হতে) ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (উক্ত ক্রয়-বিক্রয়ে) উভয়ের এখতিয়ার রয়েছে। সুতরাং যদি উভয়ে (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে ও (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) প্রকাশ করে বলে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত লাভ হয়। অন্যথা যদি তারা মিথ্যা বলে ও (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) গোপন করে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।” (বুখারী ২০৭৯ নং, মুসলিম ১৫৩২ নং)
চাষ বা কৃষিকাজ
চাষ মানুষের জীবনে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। চাষ মানব-জীবনে একটি জরুরী কর্ম, রুযীর প্রধান উৎস। শিল্পের কাজ, চাকুরি, মজদূরী অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থ উপার্জন করা যায়, কিন্তু ফসল উৎপাদন করা যায় না। সুতরাং চাষ ও চাষী না হলে যে রুযীর পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য। কৃষিকাজ করার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন আমাদের নবী। তিনি বলেন, "কিয়ামত কায়েম হয়ে গেলেও তোমাদের কারো হাতে যদি কোন গাছের চারা থাকে এবং সে তা এর আগেই রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে যেন তা রোপন করে ফেলে।" (আহমাদ, সহীহুল জামে' ১৪২৪নং)
"যে ব্যক্তি কোন মৃত ভূমিকে জীবিত করে, সে ব্যক্তির তাতে সওয়াব রয়েছে। --" (আহমাদ, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৫৯৭৪নং)
"যে কোন মুসলিম যখন কোন গাছ লাগায় অথবা ফসল বোনে অতঃপর তা হতে কোন পাখী, মানুষ অথবা পশু (তার ফল ইত্যাদি) খায়, তখন ঐ খাওয়া ফল-ফসল তার জন্য সদকাহ স্বরূপ হয়।” (বুখারী ২৩২০ নং, মুসলিম ১৫৫৩ নং)
"যে কোন মুসলিম যখন কোন গাছ লাগায় অতঃপর তা হতে যা (পাখী, মানুষ অথবা পশু দ্বারা তার ফল ইত্যাদি) খাওয়া হয়, তা তার জন্য সদকাহ স্বরূপ হয়। যা চুরি হয়ে যায়, তাও তার জন্য সদকাহ স্বরূপ হয় এবং যে কেউ তা (ব্যবহার) দ্বারা উপকৃত হয়, তাও তার জন্য কিয়ামত অবধি সদকাহ স্বরূপ হয়।” (গায়াতুল মারাম ১৫৮নং)
আর এ কথা বিদিত যে, দীর্ঘস্থায়ী গাছ লাগানো সাদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। (সহীহুল জামে' ৩৬০২নং)
সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, কোন একটি উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে হারাম বর্জন করে হালাল পথে অর্থ উপার্জন করা। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখার সাথে সাথে নিজের পেটের জন্য, স্ত্রী-পরিজনের ভরণ-পোষণ করার জন্য, ছেলেমেয়েদেরকে যথার্থরূপে মানুষ করার জন্য একটা হালাল পথ বেছে নেওয়া দরকার। উচিত নয়, আল্লাহর উপর ভরসার নাম নিয়ে পরের মুখাপেক্ষী হওয়া অথবা পরের দ্বারস্থ হওয়া।
মামুন বলেন, মানুষ তার জীবনে চার শ্রেণীর একটি হয়ে থাকে। তা না হলে সে পরের মুখাপেক্ষী হয়। আর তা হল, নেতৃত্ব, ব্যবসা, চাষ এবং কারিগরি।
মানুষ যে উপার্জন করে থাকে, সে উপার্জিত অর্থের মধ্যে ২ প্রকার অর্থ হল নিকৃষ্টঃ (১) যা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কামানো হয় এবং পাপের পথে ব্যয় করা হয়। আর এ হল নিকৃষ্টতম অর্থ। (২) যা কোন মুসলিমকে কষ্ট দিয়ে কামানো হয় এবং কোন মুসলিমকে কষ্ট দেওয়ার পথে ব্যয় করা হয়। আর তাও নিকৃষ্ট অর্থ।
অসৎ-পথে টাকা-পয়সা উপার্জন করে বিরাট অট্টালিকার মালিক হলেও, মানুষ নিজ বিবেকের কাছে চির অপরাধী থাকে। আর এ জন্যই জ্ঞানীরা বলেন, 'পাপ করে পয়সা উপার্জন করার চেয়ে একজন স্ত্রীলোকের দাস হওয়া অনেক ভাল।'
তাছাড়া যদি কেউ পরের প্রত্যাশী হয় এবং তাতে লাভও করে বহু অর্থ। তবুও অন্যের দেওয়া অর্থ দ্বারা বড় একটা কিছু করলেও যাতে মানুষের নিজের কোন কৃতিত্ব নেই, তার মূল্য আর কতটুক? আসলে নিজের কামানো অর্থে সামান্য কিছু করাই হল মানুষের বড় কৃতিত্ব।
বলাই বাহুল্য যে, এ দুনিয়ার আকাশে-বাতাসে পয়সা উড়ে বেড়াচ্ছে। তা ধরার মত জাল ও কৌশল চাই। ওড়ার সঠিক স্থান জানা চাই, পয়সা অনায়াসে ধরা পড়বে।
মুদ্রা চাকার মত গোল। সে চলতে থাকে। এক ব্যক্তির হাতে স্থির থাকে না। যে মানুষ চেষ্টা করে, আল্লাহর ইচ্ছায় তার দিকে সে মুদ্রা গড়িয়ে এসে পড়ে।
সেই সম্পদ কতই না উৎকৃষ্ট; যার দ্বারা ইজ্জত রক্ষা হয় এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা যায়। কিন্তু সৎ লোকের মাঝেও কুঁড়েমি পরিদৃষ্ট হয়। অথচ অর্থের জন্য বেইজ্জতও হয়। সে মানুষ কি ভালো বলছেন?
সাঈদ বিন মুসাইয়েব বলেন, সেই ব্যক্তির মধ্যে কোন মঙ্গল নেই, যে নিজের মান-সম্ম্রম বজায় রাখার জন্য এবং আমানত রক্ষা করার জন্য অর্থ উপার্জন করে না।
একদা হযরত উমার মসজিদে এক ব্যক্তিকে ই'তিকাফে বসে থাকতে দেখে বললেন, তোমার খাওয়ার ব্যবস্থা কোত্থেকে হয়? বলল, আমার ভাই তার নিজের জন্য, তার পরিবারের জন্য এবং আমার জন্য রোযগার করে। উমার বললেন, তাহলে তোমার ভাইই তোমার চেয়ে বড় আবেদ।
হযরত উমার আরো বলেন, কোন কোন লোক দেখে আমি মুগ্ধ হই। কিন্তু যখনই শুনি যে, ওর কোন ব্যবসায় নেই, তখনই সে আমার চোখ থেকে পড়ে যায়।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ করেন, "হে ঈমানদারগণ! জুমআর দিন আযান হলে, তোমরা আল্লাহর যিক্র (নামায) এর জন্য (মসজিদে) দ্রুত উপস্থিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গল, যদি তোমরা জ্ঞান রাখ। অতঃপর নামায সম্পন্ন হলে তোমরা যমীনের বুকে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর। আর আল্লাহকে অধিকভাবে স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা জুমআহ ৯-১০ আয়াত)
এখন ইসলামের হালাল-হারামের এই সুন্দর বিধান জানার পরেও যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, হারাম মেনে নিলে খাব কি? ঐ চাকরি যদি হারাম হয়, তাহলে তা ছেড়ে দিলে ছেলে-মেয়ে না খেয়ে মরবে না কি? এটা হারাম, ওটা হারাম বলে যদি বহু অর্থকরী ব্যবসায় ও কর্ম যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে মুসলিমদের অর্থনৈতিক অবস্থা কি হবে?
প্রত্যেক মুসলিমকেই এ কথায় একীন রাখতে হবে যে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই রুযী দেন। উন্নতির মালিক তিনিই। তাঁর হাতেই রুযী ও উন্নতির চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ বলেন,
(( وَكَأَيِّن مِن دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ)) (٦٠)
অর্থাৎ, এমন অনেক জন্তু আছে, যারা তাদের রুযীর ভার বহন করে না। আল্লাহই তাদেরকে রুযী দান করে থাকেন এবং তোমাদেরকেও। আর তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ। (সূরা আনকাবুত ৬০ আয়াত)
তিনি আরো বলেন,
((وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مبين)) (هود : ٦ )
অর্থাৎ, পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই। তিনি তাদের স্থায়ী-অস্থায়ী অবস্থান-ক্ষেত্র সম্বন্ধে অবগত। সব কিছুই একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে সন্নিবেশিত রয়েছে। (সূরা হুদ ৬ আয়াত)
রুযীর ভার যে কোন মানুষের হাতে নেই; বরং তা কেবল তাঁর হাতেই আছে সে কথার স্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন,
((أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضاً سُخْرِيّاً وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ)) (الزخرف : ٣٢)
অর্থাৎ, ওরা কি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বন্টন করে! পার্থিব জীবনে আমিই ওদের জীবিকা ওদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছি এবং এককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছি, যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে। আর ওরা যা জমা করে তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর। (সূরা যুখরুফ ৩২ আয়াত)
তাছাড়া হারাম বর্জন করে হালাল পথে রুযী অর্জন করার চেষ্টা করলে আল্লাহ সহায় হন। সে কথার বয়ানে তিনি বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
অর্থাৎ, যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার উপায় বের করে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রুযী দান করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা রাখে সে ব্যক্তির জন্য তিনিই যথেষ্ট হন। আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করেন। আল্লাহ সমস্ত কিছুর জন্য নির্দিষ্ট মাত্রা স্থির করে রেখেছেন। (সূরা ত্বালাক ২-৩ আয়াত)
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "--- আর যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন, যে ব্যক্তি (অপরের) অমুখাপেক্ষী থাকতে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে (সকল থেকে) অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরতে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করবেন। আর ধৈর্যের চেয়ে অধিক উত্তম ও ব্যাপক দান কাউকে দেওয়া হয়নি।” (বুখারী ১৪৬৯ নং, মুসলিম ১০৫৩ নং)
অতএব হারাম পথ বর্জন করে হালাল পথ অনুসন্ধান করুন। হালাল পথে রুযী অন্বেষণের চেষ্টা তো করুন। আল্লাহ অবশ্যই আপনার পথ বের করে দেবেন। আর কষ্ট এলে ধৈর্য ধারণ করার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে হারাম থেকে বাঁচার তওফীক কামনা করুন। দুআ করুন এই বলে,
اللَّهُمَّ اكفني بحلالك عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سَوَاكَ.
উচ্চারণঃ- আল্লা-হুম্মাকফিনী বিহালা-লিকা আন হারা-মিক, অআগনিনী বিফাযলিকা আম্মান সিওয়া-ক।
অর্থ- হে আল্লাহ! তোমার হালাল রুযী দিয়ে হারাম রুযী থেকে আমার জন্য যথেষ্ট কর এবং তুমি ছাড়া অন্য সকল থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী কর। (সহীহ তিরমিযী ৩/১৮০)
আর খবরদার! হারাম উপার্জনের মাধ্যমে যারা এ দুনিয়ায় উন্নত, তাদের প্রতি যেন আপনার দৃষ্টি না যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন, “আমি অবিশ্বাসীদের কতককে তাদের পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়ে রেখেছি, তার প্রতি তুমি কখনো দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখো না। তোমার প্রতিপালকের উপজীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও চিরস্থায়ী। (সূরা ত্বাহা ১৩১)