📄 ১৩ যিলহজ্জ : মিনায় রাত্রিযাপন ও জামারাতে কংকর নিক্ষেপ
■ ১৩ যিলহজ্জে করণীয়: ১১ ১২ যিলহজ্জের মত করে ১৩ যিলহজ্জ রাতে মিনায় রাত্রীযাপন করা এবং দ্বিপ্রহরের পর ৩টি জামারায় গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করা।
■ শেষ দিনে লক্ষ্য করবেন মিনা একদম ফাঁকা গেছে। এই দিন আসরের জ্বলাতের পর থেকে তাকবীরে তাসরীক পড়া শেষ। এরপর মিনা ছেড়ে মক্কা/আজিজিয়া/মির্শায় চলে আসবেন। মিনায় আইয়ামে তাশরীকের দুই/তিন রাত অবস্থান করে তিনটি জামারায় প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে কংকর নিক্ষেপের এই কাজটি ছিল ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হজ্জ শেষ করার তাওফীক দিয়েছেন সেজন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। যদিও এখনও হজ্জের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কাজ বাকি থাকলো বিদায় তাওয়াফ করা। দেশে ফেরা বা মদীনা গমণের আগে সর্বশেষ কাজ হিসাবে এই তাওয়াফ করতে হবে। পাথর নিক্ষেপের পর মালপত্র সহ আসার জন্য আপনারা কয়েকজনে মিলে গাড়ি ভাড়া করে অথবা পায়ে হেঁটেই মক্কা/আজিজিয়া/শির্শায় পৌঁছে যেতে পারেন।
■ এবার যে কয়দিন হোটেলে থাকবেন বিশ্রাম করে পার করবেন আর প্রতি ওয়াক্তের স্বলাত জামাআতের সাথে মসজিদে গিয়ে আদায় করবেন। আজিজিয়া/শির্শা যেহেতু হারামের সীমানার মধ্যে পরে তাই এখানে মসজিদে স্বলাত পড়লেও প্রতি রাকাতে ১ লক্ষ গুণ বা তার বেশি নেকী পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে কয়েকজনে মিলে গাড়ি ভাড়া করে মসজিদে হারামে এসে নফল তাওয়াফ করে ও স্বলাত পড়ে যেতে পারেন কয়েকদিন। যে কয়দিন হোটেলে থাকবেন সে কয়দিন মসজিদে জামআতে স্বলাত, দু'আ ও যিক্র মশগুল থাকবেন। পাশাপাশি কিছু কেনাকাটা বাকি থাকলে তা সেরে ফেলা যায়।
■ সতর্কতা: অনেকে সুন্নাহ মোতাবেক হজ্জের প্রতিটি কাজ সম্পাদন করার পরও এরূপ সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন যে কে জানে হজ্জের কোথাও কোন ভুল হলো কি না! কিছু হজ্জ এজেন্সিদের দেখা যায় তারা হাজীসাহেবদের বলে থাকেন যে; হজ্জে কোন ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে তাই একটা দমে-খাতা দিয়ে দিন, শতভাগ বিশুদ্ধ হয়ে যাবে আপনার হজ্জ।
■ কিন্তু এরূপ করা মারাত্মক অন্যায়। কেননা আপনার জ্ঞান অনুসারে হজ্জ শুদ্ধভাবে পালন করা সত্ত্বেও শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পরে হজ্জকে সন্দেহযুক্ত করছেন। আপনার যদি কোন বিষয় নিয়ে সত্যি সন্দেহ হয় তবে কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমকে আপনার হজ্জের সমস্যার কথা বলুন। তারা যদি দম দিতে বলেন তবেই দম দিন, অন্যথায় নয়। শুধু সন্দেহ/আন্দাজের উপর ভিত্তি করে দমে-খাতা দেওয়ার কোন বিধান ইসলামে নেই।
■ হজ্জের কোন ওয়াজিব বাদ পরে গেলে এবং হজ্জের পর দম দিতে হলে কাউকে বিশ্বাস করে রিয়াল দিয়ে ছেড়ে দিবেন না। মক্কাতে কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে অথবা কোন ব্যাংক এ গিয়ে দম এর জন্য অর্থ পরিশোধ করে দম দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। আবার একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে হারামের সীমানার ভিতরে 'কিলো আশারা' অথবা 'একাশিয়া' নামক স্থানে পশুর হাটে গিয়ে ৭০০-৮০০ রিয়াল এর মধ্যে পশু (ছাগল, ভেড়া, দুম্বা) কিনে ওখানে দম দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। দম যৌথভাবে বা ভাগে (উঠ, গরু) দেওয়া যায় না। দম না দিয়ে দেশে চলে আসা হলে পরে কারো মাধ্যম দিয়ে হারামের সীমানার ভিতরে দম দেওয়ার ব্যবস্থা করলে দম আদায় হয়ে যাবে。
📄 তাওয়াফুল বিদা/বিদায় তাওয়াফ
■ তাওয়াফুল বিদা হজ্জের শেষ ওয়াজিব কাজ। রাসূল(ﷺ) বিদায় তাওয়াফ আদায় করেছেন এবং বলেছেন, "বায়তুল্লাহয় শেষ তাওয়াফ না করে তোমাদের কেউ যেন না যায়।” অন্য এক বর্ণনা অনুসারে রাসূলুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলেছেন, লোকদেরকে বলো, তাদের শেষ কর্ম যেন হয় বায়তুল্লাহর সাথে সাক্ষাত, তবে তিনি মাসিক ঋতুবতী নারীর জন্য ছাড় দিয়েছেন। বুখারী-১৭৫৫, মুসলিম-৩১১০, আবু দাউদ-২০০২
■ হজ্জ শেষে এই তাওয়াফ আপনি মক্কা ছাড়ার আগ মুহূর্তে করবেন। মনে রাখবেন এটাই হবে মক্কায় আপনার শেষ কাজ। এই তাওয়াফের পর কোন সময়ক্ষেপনকারী কাজ করা যাবে না; যেমন, দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাবে না। ওজর ছাড়া বেশি সময় পার করলে আবারও তাওয়াফ করতে হবে। এই তাওয়াফের পর সাঈ করতে হবে না। এই তাওয়াফ সাধারণ নফল তাওয়াফের মত; তবে তাওয়াফ শেষে ২ রাকাআত স্বলাত আদায় করতে হবে। তাওয়াফ শেষে জমজম পানি পান করে বাহির হন। অনেকে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় সম্মান প্রদর্শন করে উল্টামুখী হয়ে বের হন যার কোন ভিত্তি নাই। মুসলিম-৩১৮৮, আবু দাউদ-২০২২
■ কোন নারী যদি তাওয়াফে ইফাদাহ করার পর ঋতুবতী হন এবং তাওয়াফে বিদার জন্য অপেক্ষা করতে না পারেন তাহলে তিনি চলে যেতে পারেন। এর জন্য কোন দম দেওয়ার দরকার হবে না। বুখারী-১৭৫৫, ১৭৫৭, মুসলিম-৩১১১
■ এই তাওয়াফের মাধ্যমে আপনার হজ্জে তামাত্তু পূর্ণ সম্পন্ন হলো। মহান আল্লাহ তাআলার শুকরীয়া আদায় করুন তিনি আপনাকে পরিপূর্ণভাবে হজ্জ সম্পন্ন করার তাওফীক দান করেছেন。
📄 একনজরে উমরাহ ও হজ্জে তামাত্তুর সকল ধারাবাহিক কাজসমূহ
উমরাহ'র ধারাবাহিক কাজসমূহ:
৮ যিলহজ্জের পূর্বে বা মীকাত (মক্কায় প্রবেশের সময়) পূর্বে:
১. নিয়ম অনুযায়ী ইহরাম করা
মসজিদে হারাম:
১. বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা
২. তাওয়াফের পর ২ রাকাআত স্বলাত পড়া
৩. জমজমের পানি পান করা
৪. সাফা ও মারওয়া সাঈ করা
৫. কসর/হলকু করা
হজ্জের ধারাবাহিক কাজসমূহ:
১ যিলহজ্জের পূর্বে বা নিজ বাসস্থান:
১. হাত-পায়ের নখ, গোপনাঙ্গের চুল কাটা
৮ যিলহজ্জ (হজ্জের ১ম দিন) - মিনা:
১. হজ্জের ইহরাম করে সূর্য উদয়ের পর মিনায় চলে আসা
২. মিনায় যোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পর দিন ফজরের স্বলাত কসর করে আদায় করা
৩. মিনার তাবুতে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, তাসবীহ, ইসতিগফার করতে থাকা।
৯ যিলহজ্জ (হজ্জের ২য় দিন) - আরাফার ময়দান এবং মুযদালিফার ময়দান:
১. সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে বের হয়ে দ্বি-প্রহরের পূর্বে আরাফাতে চলে আসা।
২. তাকবীরে তাশরীক পড়া শুরু করা।
৩. যোহরের আউয়াল ওয়াক্তে যোহর ও আসর একত্রে কসর করে আদায় করা।
৪. আরাফার ময়দানে দু'আ, যিকির, তাসবীহ, ইসতেগফারে মশগুল থাকা।
৫. সূর্যাস্তের পর মুযদালিফায় রওনা হওয়া।
৬. মুযদালিফায় এশার ওয়াক্তে মাগরিব ও এশা একত্রে কসর করে আদায় করা।
৭. মুযদালিফায় রাতে ঘুমিয়ে কাটানো এবং কংকর সংগ্রহ করা।
১০ যিলহজ্জ (হজ্জের ৩য় দিন) - মুযদালিফা, মিনা ও মক্কা:
১. মুযদালিফায় ফজরের আউয়াল ওয়াক্তে ফজর স্বলাত পড়ে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত দু'আ করা।
২. সূর্যোদয়ের পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া
৩. দ্বি-প্রহরের পূর্বে বড় জামারায় গিয়ে ৭টি কংকর মারা।
৪. হাদী জবেহ করা।
৫. কসর/হলকু করে ইহরাম কাপড় খুলে সাধারণ পোশাক পরা।
৬. মসজিদে হারামে গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারাহ ও সাঈ করা।
৭. মধ্য রাতের পূর্বে মিনার তাবুতে ফিরে গিয়ে মিনায় রাত্রিযাপন করা।
৮. এদিনের সকল জ্বলাতসমূহ আউয়াল ওয়াক্তে কসর করে আদায় করে নেওয়া।
১১ যিলহজ্জ (হজ্জের ৪র্থ দিন) - মিনা:
১. আগের দিন কসর/হলক্ব, হাদী জবেহ এবং তাওয়াফে যিয়ারাহ ও সাঈ না করে থাকলে আজ ধারাবাহিকভাবে কাজগুলো সেরে ফেলা।
২. দ্বি-প্রহরের পর তিন জামারাতে গিয়ে ৭টি করে মোট ২১টি কংকর মারা।
৩. মিনায় অবস্থান, রাত্রিযাপন এবং তাবুতে দু'আ, যিকির, তাসবীহ ও ইসতিগফার করা।
৪. তাবুতে সকল স্বলাতসমূহ আউয়াল ওয়াক্তে কসর করে আদায় করা।
১২ যিলহজ্জ (হজ্জের ৫ম দিন) - মিনা:
১. আগের দিন কসর/হলকু, হাদী জবেহ এবং তাওয়াফে যিয়ারাহ ও সাঈ না করে থাকলে আজ ধারাবাহিকভাবে কাজগুলো সেরে ফেলা।
২. দ্বি-প্রহরের পর তিন জামারাতে গিয়ে ৭টি করে মোট ২১টি কংকর মারা।
৩. প্রয়োজনে সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা ত্যাগ করে চলে আসা অন্যথায় মিনায় রাত্রিযাপন করে তাবুতে দু'আ, যিকির ও ইসতিগফার করা।
৪. তাবুতে সকল স্বলাতসমূহ আউয়াল ওয়াক্তে কসর করে আদায় করা।
১৩ যিলহজ্জ (হজ্জের ৬ষ্ঠ দিন) - মিনা:
১. দ্বি-প্রহরের পর তিন জামারাতে গিয়ে ৭টি করে মোট ২১টি কংকর মারা।
২. অতঃপর মিনা ত্যাগ করে চলে আসা। মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করা।
📄 যারা হজ্জে ক্বিরান করবেন
৮ যিলহজ্জের আগে:
■ মীকাতের বাহির থেকে আগত ব্যক্তিগণ মীকাত থেকে উমরাহ ও হজ্জের নিয়তে ইহরাম করবেন, (মক্কার অধিবাসীরা তাদের বাসস্থান থেকে করবে) একইসঙ্গে হজ্জ ও উমরাহ শুরু করার স্বীকৃতি দিবেন এবং তালবিয়া পাঠ করতে থাকবেন। মুসলিম-২৯১৮
“লাব্বাইকা উমরাতান ওয়া হাজ্জান"।
■ তাওয়াফুল কুদুম করতে পারেন। এটা বাধ্যতামুলক নয়, সুন্নাত।
■ তাওয়াফুল কুদুমের সঙ্গে সাঈও করতে পারেন তবে সাঈর পর মাথা মুন্ডন করবেন না। আবার কেউ যদি সাঈ না করেই হজ্জ করতে চলে যান তাহলে তাকে তাওয়াফুল ইফাদার পরে অবশ্যই সাঈ করতে হবে। ইবনে মাজাহ-২৯৭২, তিরমিযী-৯৪৮
■ তাওয়াফুল কুদুম ও সাঈ শেষ করার পর থেকে ৮ যিলহজ্জ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে এবং ইহরামের সকল বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে।
৮ যিলহজ্জ:
■ যেহেতু আপনি ইহরাম অবস্থায়ই আছেন, তাই মিনায় চলে যাবেন এবং হজ্জে তামাতুর মত সকল বিধান পালন করবেন, তবে নতুন করে হজ্জ শুরু করার স্বীকৃতি দিবেন না, কারণ ইহরাম করার সময় আপনি হজ্জ শুরু করার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবনে মাজাহ-২৯৭৫
৯ যিলহজ্জ:
■ হজ্জে তামাতুর মত সকল বিধান পালন করবেন।
১০ যিলহজ্জ:
■ হজ্জে তামাতুর মতোই সকল বিধান পালন করবেন, তবে কিছু বিষয় লক্ষ্য করতে হবে।
■ তাওয়াফুল কুদুমের পর সাঈ করে না থাকলে তাওয়াফে ইফাদার পরে তা করতে হবে। তবে কেউ যদি তাওয়াফে কুদুমের সময় সাঈ করে থাকেন তাহলে তা আর করতে হবে না। এতে কোন ক্ষতি নেই। বুখারী-১৬৩৮, নাসাঈ-২৯৮৬
১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ:
■ হজ্জে তামাতুর মতো সকল বিধান পালন করবেন। বিদায় তাওয়াফের ক্ষেত্রে হজ্জে তামাতুর মতো একই নিয়ম প্রযোজ্য。