📄 কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* কংকর নিক্ষেপের জন্য গোসল বা ওযু করা।
* কংকর নিক্ষেপের আগে কংকর ধুয়ে নেয়া।
* একসাথে ২/৩টি বা ৭টি কংকর একত্রে নিক্ষেপ করা।
* তাকবীরের স্থলে সুবহানাল্লাহ বা অন্য কোনো যিক্র করা। তাকবীরের সাথে কোনো কিছু যোগ করে বলা।
* অনেকের ধারণা তারা ইবলিশ শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করছেন, এজন্য তারা খুব রাগান্বিত হয়ে ওই জামরাতকে গালাগালি করেন।
* জামরাতে বড় কংকর বা সেন্ডেল বা কাঠের খন্ড নিক্ষেপ করেন - এ ধরনের কাজ করা বাড়াবাড়ি, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন।
* কংকর কাছ থেকে মারার জন্য ঠেলাঠেলি বা ধাক্কাধাক্কি করা।
* কংকর নিক্ষেপের জন্য নির্দিষ্ট পন্থা: অনেকের বক্তব্য: ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনির কেন্দ্রের উপর রেখে (চিমটি করে লবণ নেয়ার মত করে) এবং কংকরটি তার বৃদ্ধাঙ্গুলির পিছনের দিকে রেখে নিক্ষেপ করতে হবে।
* আবার অনেকে বলেন: তর্জনী বাঁকা করে বৃত্তের মতো বানিয়ে বৃদ্ধাগুলির জোড়া-সন্ধিতে লাগিয়ে দিতে হবে, দেখতে অনেকটা ১০ এর মতো হবে।
* কংকর নিক্ষেপের জন্য দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা অথবা জামরাত ও ব্যক্তির মাঝে অন্তত পাঁচ হাত দূরত্ব থাকতে হবে এমন ধারনা পোষন করা。
📄 ১০ যিলহজ্জ : হাদী জবেহ করা
■ ১০ যিলহজ্জের দিনে করণীয়: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হাজীগণ যে উঠ, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি পশু জবেহ করে থাকেন তাকে হাদী বলা হয়। অনেকে বলেন এটা হজ্জের কুরবানি, কিন্তু আসলে হজ্জের ক্ষেত্রে এর নাম হলো হাদী। কুরবানি (উদহিয়া), হাদী, দম ও ফিদইয়া এগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কুরবানীর উপলক্ষ হলো ঈদ-উল-আযহা, হাদীর উপলক্ষ্য হজ্জ আর দমের উপলক্ষ্য হলো কাফফারা আদায় আর ফিদইয়া হচ্ছে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কুরবানী পৃথিবীর যে কোন জায়গায় করা যায়। কিন্তু হাদী, দম ও ফিদইয়া শুধুমাত্র হারামের সীমানার ভিতর আদায় করতে হবে। হাদী ও কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া যাবে কিন্তু দম ও ফিদইয়ার গোশত নিজে খাওয়া যাবে না। যারা হজ্জের সময় হাদী করছেন তাদের আর সেই বছর কুরবানী করা জরুরী নয়, তবে চাইলে করতে পারেন। ১০ যিলহজ্জ সূর্যোদয় থেকে শুরু করে ১৩ যিলহজ্জ সূর্যান্ত পর্যন্ত হাদী করা যায়। হজ্জে তামাতু ও হজ্জে কীরান হজ্জকারীদের হাদী জবেহ করা ওয়াজিব।
■ আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জের দিনগুলোর মধ্যে হজ্জের সাথে উমরাহ আদায়ের ফায়দা লাভ করতে চায়, সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহজলভ্য পশু জবেহ করবে।” সুরা আল বাকারা: ২:১৯৬
■ কারো হাদী জবেহ করার সামর্থ্য না থাকলে এর পরিবর্তে তিনি হজ্জের পর মক্কাতে ৩ দিন এবং দেশে ফিরে ৭ দিন (ধারাবাহিকভাবে অথবা ভেঙ্গে ভেঙ্গে) রোজা রাখবেন। মক্কাবাসীদের হাদী করা ওয়াজিব নয়, এমনকি রোজাও রাখতে হবে না। বুখারী-১৯৯৭, ১৯৯৮
■ হারাম এলাকা তথা মক্কা ও মিনার যে কোনো অংশে পশু যবেহ করা যাবে, কারণ রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, আমি এখানে যবেহ করেছি এবং মিনার সকল স্থানই যবেহ করার জায়গা। আবু দাউদ-১৯০৭, ইবনে মাজাহ-৩০৪৮
■ হাদীর পশু পুরুষ অথবা স্ত্রী দুটিই হতে পারে। প্রাণীর বয়স কমপক্ষে: দুম্বা- ১বছর, ভেড়া ১বছর, ছাগল ১বছর, গরু ২বছর ও উট ৫বছর। প্রাণী একচোখ ওয়ালা, অসুস্থ, খোঁড়া পা ওয়ালা, খুবই দুর্বল, ভাঙা শিং ওয়ালা ও কান কাটা হওয়া যাবে না। ইবনে মাজাহ-৩১৪৪, তিরমিযী-১৪৯৭
■ উঠ বা গরু হলে একটা পশু সর্বোচ্চ সাতজনে বা এর কম সংখ্যায় (জোড় বা বিজোড়) অংশ নিতে পারবেন। আর ভেড়া বা ছাগল হলে একজনের পক্ষ হতে একটা পশু যবেহ করতে হবে। যবেহ করা পশুর গোশত চাইলে নিজে খাওয়া যাবে এবং সাথে করে দেশেও নিয়ে আসা যাবে। বুখারী-১৬৮৮, ১৭১৯, মুসলিম-৩০৭৬
■ হাদী তিন পদ্ধতিতে আদায় করতে পারেন। প্রথমত, ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী যবেহ করার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে। তৃতীয়ত, নিজে হাটে গিয়ে হাদী কিনে করা যায়। মিনায় তাবু এলাকায় কোথাও হাদী করা দেখতে পাবেন না। হাদী করার জন্য নির্ধারিত আলাদা জায়গা আছে মুআইসম নামক এলাকায় যা মিনার সীমানার ভিতর অবস্থিত।
■ ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী করা সবচেয়ে উত্তম পন্থা। হজ্জের পূর্বে আল-রাজী ব্যাংক বা অন্য কোন ব্যাংক থেকে হাদীর জন্য ৭০০-৮০০ রিয়াল জমা দিয়ে রশিদ বা টিকিট সংগ্রহ করবেন। টিকিটে হাদী করার আনুমানিক সময় (সকাল ১০টা/ ১১টা) লেখা থাকে। সাধারণত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১০ যিলহজ্জ সকাল থেকে হাদী জবেহ করা শুরু করেন এবং টিকিটে লিখিত সময়ের আগে বা পরে হাদী জবেহ করেন। মক্কা ও মদীনায় অনেক হাদীর টাকা জমা দেওয়ার ছোট ছোট ব্যাংক বুথ দেখতে পাবেন। হজ্জের একটু আগেভাগেই টিকেট ক্রয় করা উত্তম, নইলে পরে হাদী টিকেট পাওয়া যায় না।
■ আবার আপনার হজ্জ এজেন্সিকে হাদীর টাকা দিয়ে দিতে পারেন। আপনার হজ্জ এজেন্সি আগেভাগেই মিনায় হাদী ক্রয় করে জবেহ করার ব্যবস্থা করতে পারেন। আবার আপনি নিজে মিনায় হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করে জবেহ করতে পারেন। এমন করলে আপনি কিছু গোশত খাওয়ার জন্য নিয়ে আসতে পারেন। তবে সাধারণ হাজীদের পক্ষে হাটে যাওয়া সম্ভব নয় এবং এতে অনেক কষ্ট ও বিড়ম্বনা পোহাতে হয়, তাই প্রথম দুইটির যে কোন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো।
■ নিজ হাতে অবশ্য যবেহ করা সুন্নাত। রাসূল (ﷺ) হজ্জে ৭টি উঠ জবেহ করেছিলেন। যবেহ করার সময় পশুর মুখ থাকবে দক্ষিণ দিকে এবং পশুকে বাম দিকে কাত করে শোয়াতে হবে ও এর পাগুলো থাকবে ডান দিকে অতঃপর কিবলামুখি হয়ে ছুরি চালাতে হবে। বুখারী-১৭১২
■ যবেহ করার সময় এই দু'আ পাঠ করা:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي
"বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর, আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী"।
"আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হে আল্লাহ! আমার তরফ থেকে আপনি কবুল করুন"।
■ সতর্কতা: হজ্জের সময় কিছু অসাধু লোক মিনার তাবুতে এসে হাদী করানোর নামে ভূয়া রশিদ দিয়ে অর্থ নিয়ে প্রতারণা করে। হাদী যবেহ না করেই ফোন করে জানিয়ে দেন হাদী জবাই হয়ে গেছে! আবার কিছু হজ্জ এজেন্সিও একই ধরনের প্রতারনা করে। তাই এজেন্সির মাধ্যমে হাদীর ব্যবস্থা করলে দলের কয়েকজন লোক এজেন্সির সাথে সরেজমিনে গিয়ে সকলের হাদী যবেহ করা দেখে আসা উচিত。
📄 ১০ যিলহজ্জ : কসর/হালক্ব করা
■ ১০ যিলহজ্জের দিনে করণীয়: হাদী জবেহ হয়ে যাওয়ার পর মাথার সকল অংশ থেকে সমানভাবে ছোট করে চুল ছেঁটে ফেলা (কসর) অথবা সম্পূর্ণ মাথা মুন্ডন করা (হলক্ব)। তবে মুন্ডন করাই উত্তম। কুরআনে মাথা মুন্ডন করার কথা আগে এসেছে আর ছোট করার কথা পরে। রাসূল (ﷺ) ও বেশিরভাগ সাহাবীরাই সমস্ত মাথা মুন্ডন করেছিলেন। আবু দাউদ-১৯৮০
■ হজ্জে যারা মাথা মুন্ডন করেছিলেন তাদের জন্য রাসূল (ﷺ) রহমত ও মাগফিরাতের দু'আ করেছেন তিন বার। আর যারা চুল ছোট করেছিলেন তাদের জন্য দু'আ করেছেন একবার। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, "তোমাদের কেউ মাথা মুন্ডন করবে ও কেউ কেউ চুল ছোট করবে।" হাদীসে এসেছে, "আর তোমরা মাথা মুন্ডন কর, এতে প্রত্যেক চুলের বিনিময়ে একটি সাওয়াব ও একটি গুনাহের ক্ষমা রয়েছে।" সুরা আল-ফাতাহ, ৪৮:২৭. বুখারী-১৭২৮, মুসলিম-৩০৪১
■ এসময় দেখবেন রাস্তায় অনেকে হাতে ইলেকট্রিক রেজার বা ট্রিমার বা ক্ষুর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হজ্জের এই সময়ে চুল কাটাতে ২০-৩০ রিয়াল পর্যন্ত দাবি করে থাকে। ২-৪মিনিটে আপনার মাথার পুরো চুল ফেলে দিবে। নাপিতকে ডান দিক থেকে চুল কাটা শুরু করতে বলবেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে এমনটি করেছেন। নিজেদের কাছে রেজার বা ক্ষুর থাকলে আপনারা একে অপরের চুল ফেলে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি কারো চুল ফেলবেন তার চুল আগে ফেলা থাকা জরুরী নয়। মুসলিম-৩০৪৩, আবু দাউদ-১৯৮২, তিরমিযী-৯১২
■ মহিলারা তাদের মাথার সমগ্র চুলের অগ্রভাগ হতে তর্জনী আঙ্গুলের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ কাটবেন (প্রায় এক ইঞ্চি)। নারীদের জন্য হলক নেই। নারীদের মাথা মুন্ডন করা যায়েজ নয়। আবু দাউদ-১৯৮৪
■ এবার ইহরামের কাপড় খুলে ফেলবেন এবং প্রয়োজনে গোসল করতে পারেন। এখন সাধারণ কাপড় পরবেন। ইহরাম থেকে হালাল হওয়া হজ্জের ওয়াজিব কাজ। একে বলে তাহালুল আল আসগার বা প্রাথমিক হালাল। এখন আপনার উপর থেকে যৌন সঙ্গম ছাড়া ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল। আপনি এখন দেহে সুগন্ধীও ব্যবহার করতে পারবেন। নাসাঈ-৩০৮৪
■ হালাল হওয়ার পর ইচ্ছা করলে ১০ যিলহজ্জ মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাদাহ ও সাঈ করে মধ্য রাতের আগেই মিনায় চলে আসবেন। আর যদি ঐ দিন বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েন তবে রাতটি মিনায় অবস্থান করবেন এবং পরবর্তী ১১/১২ যিলহজ্জ কোন এক সময় মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ ও সাঈ করে আসতে পারেন। তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা অব্যাহত রাখুন।
📄 হাদী ও কসর/হালক্ব করার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* হাদী না করে এর সমপরিমাণ অর্থ সেবামূলক খাতে দান করে দেয়া।
* মাথার চুল ছাঁটানোর ক্ষেত্রে বাম দিক দিয়ে শুরু করা।
* মাথার কিছু অংশ মুড়ানো এবং আর কিছু অংশ কসর করা।
* মাথা মুড়ানোর সময় কিবলার দিকে মুখ করে বসা নিয়ম মনে করা।
* কাচি দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশ থেকে কিছু চুল কেটে বক্সে সংরক্ষণ করে রাখা।