📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 ১০ যিলহজ্জ : বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপ

📄 ১০ যিলহজ্জ : বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপ


■ ১০ যিলহজ্জের দিনে করণীয়: এই দিনটি হজ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। রাসূল(ﷺ) এই দিনটিকে হজ্জের বড় দিন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এই দিনে ৫টি কাজ সম্পাদন করতে হবে; প্রথমত; বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপ করা, দ্বিতীয়ত; হাদী বা পশু জবেহ করা, তৃতীয়ত; কসর/হলকু করা, চতুর্থত; তাওয়াফুল ইফাদাহ করা ও পঞ্চমত; সাঈ করা। আর দাউদ-১৯৪৫, তিরমিযী-৯৫৮
■ জামারাত এলাকা দিয়ে ইবরাহীম (আঃ) ঈসমাইল (আঃ) কে যবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন ও ইবলিস শয়তান বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং তিনি শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন। জামারাতে শয়তানকে বেঁধে রাখা আছে এমন ধারণা ভুল ধারণা। মূলত, কংকর মারার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য পোষণ করা এবং শয়তানের আনুগত্য পরিত্যাগ করার অংগীকার ব্যক্ত করা। অনেকে জামারাতকে বড় শয়তান, ছোট শয়তান নামে ডাকে যা সঠিক নয়। জামারাত এলাকা মিনার সীমানার মধ্যে অবস্থিত। কংকর নিক্ষেপ বা রামি করা আল্লাহর নির্দেশ সমূহের অন্যতম। রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "বায়তুল্লাহ তাওয়াফ, সাফা মারওয়া সাঈ ও জামারাতে কংকর নিক্ষেপ আল্লাহর যিক্র কায়েমের উদ্দেশ্যে।" হাদীসে এসেছে "আর তোমার কংকর নিক্ষেপ, তা তো তোমার জন্য সঞ্চিত করে রাখা হয় (নেকী হিসাবে)"। তিরমিযী-৯০২
■ সূর্যোদয়ের আগেই তালবিয়াহ পাঠরত অবস্থায় মিনার উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করবেন। এসময় রাস্তায় প্রচুর মানুষের ভীড় হয়। কারণ এখন আর কোন বাস থাকবে না রাস্তায়, সবাইকে পায়ে হেঁটে জামারাত যেতে হবে। তাই এখান থেকে ৮-১০ কি.মি হাঁটার মন-মানসিকতা রাখতে হবে। এটিই হজ্জের অন্যতম সবচেয়ে কঠিন কাজ। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকবেন, কারণ এখানে অনেক লোক হারিয়ে দলছাড়া হয়ে যায়। যখন মুহাসসির উপত্যকা পার হবেন তখন একটু তাড়াতাড়ি হাঁটার চেষ্টা করবেন কারণ রাসূল (সাঃ) এমনটাই করেছেন যেহেতু এখানে আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল। জামারাত যাওয়ার পথে যদি মিনার তাবু পরে তবে তাবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ও কিছু খাওয়া দাওয়া করে তারপর জামারাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারেন। তালবিয়াহ বেশি বেশি করে পাঠ করা অব্যাহত রাখুন, কারণ তালবিয়াহ পাঠ করার সময় শেষ হয়ে আসছে। তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে থাকুন। এসময় দলনেতা একটি পতাকা সামনে নিয়ে সকলকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলে উত্তম হয়।
■ রাসূল (সাঃ) সূর্য উঠার ১-২ ঘন্টার মধ্যে কংকর মেরেছিলেন। সে হিসেবে সূর্য মধ্যম আকাশে ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করা সুন্নাত এবং উত্তম। তবে সূর্য উঠা থেকে শুরু করে ১১ যিলহজ্জ সুবহে সাদিক পর্যন্ত কংকর মারা যায়েজ। বর্তমানে যেহেতু ৩০ লক্ষাধিক হাজীর সুন্নাত সময়ের মধ্যে একসাথে কংকর মারা দুঃসাধ্য ও কষ্টকর তাই একটু দেরী করে কংকর মারতে গেলে সমস্যা নেই। বুখারী-১৭৩৫, নাসাঈ-৩০৬৩
নারী, শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধরা যারা মুযদালিফা থেকে মধ্যরাতে মিনায় চলে এসেছেন তারা ১০ যিলহজ্জ সূর্য উঠার আগে কংকর নিক্ষেপ করবেন না। তারা সূর্য উদয়ের পর অথবা বিকেল বেলায় বা রাতে জামারায় গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন কারণ এসময় জামারাহ ফাঁকা থাকে। নাসাঈ-৩০৬৫, তিরমিযী-৮৯৩
অসুস্থ্য ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষ, শিশুদের পক্ষ থেকে অন্য যে কেউ তার প্রতিনিধি হিসাবে রামি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি ব্যক্তি সেই বছর হজ্জ আদায়কারী হতে হবে এবং প্রথমে তার নিজের কংকর নিক্ষেপের পর অন্যের কংকর নিক্ষেপ করবেন। এমন লক্ষ্য করা যায়; বিশেষ করে নারীরা ক্ষীণ শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার ওযুহাতে রামি করতে না গিয়ে অন্যকে নিযুক্ত করেন ও মিনার তাবুতে থেকে যান। এমনটি করা অনুচিত। নিজের কংকর নিজে মারা উত্তম। একেবারে খুবই অসুস্থ, চলতে অপারগ বা ওখানে গেলে আরও অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন গুরুতর ওজর ছাড়া সকলেরই জামারাতে যাওয়া উচিত।
পায়ে হেঁটে একমুখি চলাচলের রাস্তা দিয়ে জামারাতের যে কোন ফ্লোরে উঠার ব্রীজ দিয়ে বা লিফট দিয়ে অথবা এস্কেলেটরে করে জামারাত বিল্ডিং কমপ্লেক্সে উঠবেন। আপনি যেহেতু মিনার মধ্য দিয়ে খাইফ মসজিদের পাশ দিয়ে জামারাতে ঢুকবেন সেহেতু প্রথমে ছোট জামারাহ (জামারাতুল সুগরা) ও তারপর মধ্যম জামারাহ (জামারাতুল উদ্ভা) অতিক্রম করবেন এবং অতঃপর সবশেষে পৌঁছাবেন বড় জামারাহ (জামারাতুল আকাবাহ)। আজকে ছোট ও মধ্যম জামারাতে কংকর নিক্ষেপ নেই। সোজাসুজি বড় জামারার দিকে কংকর মারতে না গিয়ে জামারার চারদিকে খানিকটা ঘোরা ফেরা করে ভিড় কম এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করুন অতঃপর জামারার যত কাছকাছি সম্ভব গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করবেন। বড় জামারার কাছে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিবেন। তালবিয়াহ পাঠ এখানেই শেষ। বুখারী-১৬৮৫, মুসলিম-২৯৭৮
যদি সম্ভব হয় জামারাকে সামনে রেখে কাবাকে হাতের বামে ও মিনাকে ডানে রেখে অথবা যে কোন ভাবে সুবিধামত দাঁড়িয়ে ডান হাত উঁচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করবেন এবং প্রতিবার নিক্ষেপের শুরুতে বলবেন: বুখারী-১৭৫০, মুসলিম-৩০২২, নাসাঈ-৩০৫৪
اللهُ أَكْبَرُ
"আল্লাহু আকবার"
"আল্লাহ সবচেয়ে বড়"।
জামারার হাউজ বা বেসিনে বুক লাগিয়ে অথবা ১-২ মিটার দূরত্ব থেকে জামারায় রামি বা কংকর নিক্ষেপ করবেন। কংকরগুলো যেন জামারার পিলার দেয়ালে আঘাত করে অথবা জামারার বেসিনের মধ্যে পরে সেটা নিশ্চিত করবেন। যদি কোন কংকর বেসিনের মধ্যে না পরে তবে তার পরিবর্তে আবার একটি কংকর নিক্ষেপ করবেন। সে কারণে সঙ্গে অতিরিক্ত কংকর নেওয়া ভালো। কংকর হাতের আংগুল দিয়ে যে কোনভাবে ধরে নিক্ষেপ করা যাবে। এজন্য নির্দিষ্ট কোন নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। নিজের কংকর নিক্ষেপ হয়ে গেলে ঠিক একই নিয়মে অন্যের পক্ষ থেকে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন।
লক্ষ্যনীয় বিষয়; ১০ যিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পূর্বে বড় জামারাহে কংকর মারা যাবে না। বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপের কাজটি ওয়াজিব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জামারায় কংকর মারতে ব্যর্থ হলে দম দিতে হবে। নাসাঈ-৩০৬৫
রামি করা শেষে এখানে দাঁড়িয়ে দু'আ করার কোন নিয়ম হাদীসে পাওয়া যায় না। জামারাত থেকে ব্রীজ দিয়ে মক্কার দিকে নামতে হবে। এরপর পরবর্তী কাজ হলো হাদী জবাই করা। হাদী করার জন্য যদি ব্যাংকে টাকা দিয়ে থাকেন, তবে আর আপনার করনীয় কিছু নেই। হাদী করার সময় পার হয়ে গেলে কসর/হলকু করে হালাল হয়ে যাবেন। আর যদি নিজ হাতে হাদী করার ইচ্ছা থাকে তবে মুআইসম চলে যাবেন হাদী করতে। আজ সৌদিআরবে ঈদের দিন, তবে এখানে হাজীদের ঈদের স্বলাত পড়া লাগবে না। এদিনের সকল স্বলাতসমূহ স্বলাতের আউয়াল ওয়াক্তে কসর করে আদায় করে নেওয়া। ইবনে মাজাহ-৩০৩২

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 জামারাত সম্পর্কিত কিছু তথ্য

📄 জামারাত সম্পর্কিত কিছু তথ্য


জামারাত ৫তলা বিশিষ্ট একটি বিল্ডিং কমপ্লেক্স। হজ্জের ১০-১৩ যিলহজ্জ ব্যবহারের জন্য এটি খোলা হয়। বাকি সারা বছর জামারাত বন্ধ থাকে। মিনা, আজিজিয়া ও শিশা থেকে জামারাতে যাওয়ার বিভিন্ন সংযোগ রাস্তা আছে। অনেক এজেন্সি যারা ফিতরা (বাড়ি সিফটিং) হজ্জ প্যাকেজে করেন তারা জামারাতের পার্শ্ববর্তী আজিজিয়া ও শিশা এলাকায় থাকেন। জামারাতের একপাশে ট্রেন স্টেশন আছে। জামারাত থেকে মিনা-মুযদালিফার সীমানা পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা আছে。
কয়েক বছর আগেও জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করতে গিয়ে অনেক লোক পদদলিত হয়ে মারা যেত। সে কারণে অনেকে জামারাতে যেতে ভয় করত। কিন্তু বর্তমানে কংকর নিক্ষেপের নিরাপদ ও সহজ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করতে যাওয়ার সকল রাস্তা একমুখি। যদি মিনা থেকে জামারাতের দিকে যায় হয় তবে বড় ব্রিজ বা এস্কেলেটরে উপরের দিকে আরোহন করতে হবে। কংকর নিক্ষেপের পর জামারাতের অপর প্রান্তের দিকে নামিয়ে দেয়া হবে, অর্থাৎ মক্কার দিকে।
■ জামারাতে অনেক নিরাপত্তাকর্মী ও হজ্জযাত্রী ব্যবস্থাপনার লোক দেখতে পাবেন। বড় ব্যাগ মাথায় বা কাঁধে নিয়ে জামারাতে যাবেন না, তাহলে নিরাপত্তাকর্মীরা আপনাকে আটকিয়ে দেবে এবং আপনাকে ভেতরে নাও যেতে দিতে পারে। তবে ছোট হাত ব্যাগ বা কাঁধ ব্যাগ থাকলে সমস্যা নাই।
■ জামারাত বিল্ডিংয়ের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পথে বিশাল আকারের অনেকগুলো এয়ারকুলার ফ্যান দেখতে পাবেন, হজ্জযাত্রীদের শীতল বাতাস প্রদানের জন্য এখানে ফ্যানের ব্যবস্থা করা আছে। জামারাতের চারপাশে অনেক কংকর ও প্লাস্টিকের বোতল পড়ে থাকতে দেখবেন। অনেক লোক এখানে কংকর মারতে এসে হারিয়ে যান, তাই সবসময় আপনার দলের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করবেন। দলনেতার হাতে ছোট পতাকা থাকলে ভাল হয়।
■ একটি বিষয় মনে রাখবেন, এরপর পরবর্তী তিন দিন কংকর নিক্ষেপের জন্য আপনাকে আবার মিনা থেকে হেঁটে জামারাতে আসতে হবে এবং হেঁটেই আবার জামারাত থেকে মিনার তাবুতে ফিরে যেতে হবে। তাই হাঁটার জন্য প্রস্তুতি রাখবেন। জামারাত এলাকায় কোন প্রকার যানবাহন চলাচল করে না। যাদের শাটল ট্রেনের টিকিট আছে তারা মিনা থেকে সহজেই ট্রেনে জামারাতে এসে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন। কিছু ভিআইপি হজ্জযাত্রীকে কংকর নিক্ষেপের করার জন্য হেলিকপ্টারে করে জামারাত ভবনের ছাদে অবতরণ করতে দেখবেন。

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত

📄 কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত


* কংকর নিক্ষেপের জন্য গোসল বা ওযু করা।
* কংকর নিক্ষেপের আগে কংকর ধুয়ে নেয়া।
* একসাথে ২/৩টি বা ৭টি কংকর একত্রে নিক্ষেপ করা।
* তাকবীরের স্থলে সুবহানাল্লাহ বা অন্য কোনো যিক্র করা। তাকবীরের সাথে কোনো কিছু যোগ করে বলা।
* অনেকের ধারণা তারা ইবলিশ শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করছেন, এজন্য তারা খুব রাগান্বিত হয়ে ওই জামরাতকে গালাগালি করেন।
* জামরাতে বড় কংকর বা সেন্ডেল বা কাঠের খন্ড নিক্ষেপ করেন - এ ধরনের কাজ করা বাড়াবাড়ি, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন।
* কংকর কাছ থেকে মারার জন্য ঠেলাঠেলি বা ধাক্কাধাক্কি করা।
* কংকর নিক্ষেপের জন্য নির্দিষ্ট পন্থা: অনেকের বক্তব্য: ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনির কেন্দ্রের উপর রেখে (চিমটি করে লবণ নেয়ার মত করে) এবং কংকরটি তার বৃদ্ধাঙ্গুলির পিছনের দিকে রেখে নিক্ষেপ করতে হবে।
* আবার অনেকে বলেন: তর্জনী বাঁকা করে বৃত্তের মতো বানিয়ে বৃদ্ধাগুলির জোড়া-সন্ধিতে লাগিয়ে দিতে হবে, দেখতে অনেকটা ১০ এর মতো হবে।
* কংকর নিক্ষেপের জন্য দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা অথবা জামরাত ও ব্যক্তির মাঝে অন্তত পাঁচ হাত দূরত্ব থাকতে হবে এমন ধারনা পোষন করা。

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 ১০ যিলহজ্জ : হাদী জবেহ করা

📄 ১০ যিলহজ্জ : হাদী জবেহ করা


■ ১০ যিলহজ্জের দিনে করণীয়: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হাজীগণ যে উঠ, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি পশু জবেহ করে থাকেন তাকে হাদী বলা হয়। অনেকে বলেন এটা হজ্জের কুরবানি, কিন্তু আসলে হজ্জের ক্ষেত্রে এর নাম হলো হাদী। কুরবানি (উদহিয়া), হাদী, দম ও ফিদইয়া এগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কুরবানীর উপলক্ষ হলো ঈদ-উল-আযহা, হাদীর উপলক্ষ্য হজ্জ আর দমের উপলক্ষ্য হলো কাফফারা আদায় আর ফিদইয়া হচ্ছে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কুরবানী পৃথিবীর যে কোন জায়গায় করা যায়। কিন্তু হাদী, দম ও ফিদইয়া শুধুমাত্র হারামের সীমানার ভিতর আদায় করতে হবে। হাদী ও কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া যাবে কিন্তু দম ও ফিদইয়ার গোশত নিজে খাওয়া যাবে না। যারা হজ্জের সময় হাদী করছেন তাদের আর সেই বছর কুরবানী করা জরুরী নয়, তবে চাইলে করতে পারেন। ১০ যিলহজ্জ সূর্যোদয় থেকে শুরু করে ১৩ যিলহজ্জ সূর্যান্ত পর্যন্ত হাদী করা যায়। হজ্জে তামাতু ও হজ্জে কীরান হজ্জকারীদের হাদী জবেহ করা ওয়াজিব।
■ আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জের দিনগুলোর মধ্যে হজ্জের সাথে উমরাহ আদায়ের ফায়দা লাভ করতে চায়, সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহজলভ্য পশু জবেহ করবে।” সুরা আল বাকারা: ২:১৯৬
■ কারো হাদী জবেহ করার সামর্থ্য না থাকলে এর পরিবর্তে তিনি হজ্জের পর মক্কাতে ৩ দিন এবং দেশে ফিরে ৭ দিন (ধারাবাহিকভাবে অথবা ভেঙ্গে ভেঙ্গে) রোজা রাখবেন। মক্কাবাসীদের হাদী করা ওয়াজিব নয়, এমনকি রোজাও রাখতে হবে না। বুখারী-১৯৯৭, ১৯৯৮
■ হারাম এলাকা তথা মক্কা ও মিনার যে কোনো অংশে পশু যবেহ করা যাবে, কারণ রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, আমি এখানে যবেহ করেছি এবং মিনার সকল স্থানই যবেহ করার জায়গা। আবু দাউদ-১৯০৭, ইবনে মাজাহ-৩০৪৮
■ হাদীর পশু পুরুষ অথবা স্ত্রী দুটিই হতে পারে। প্রাণীর বয়স কমপক্ষে: দুম্বা- ১বছর, ভেড়া ১বছর, ছাগল ১বছর, গরু ২বছর ও উট ৫বছর। প্রাণী একচোখ ওয়ালা, অসুস্থ, খোঁড়া পা ওয়ালা, খুবই দুর্বল, ভাঙা শিং ওয়ালা ও কান কাটা হওয়া যাবে না। ইবনে মাজাহ-৩১৪৪, তিরমিযী-১৪৯৭
■ উঠ বা গরু হলে একটা পশু সর্বোচ্চ সাতজনে বা এর কম সংখ্যায় (জোড় বা বিজোড়) অংশ নিতে পারবেন। আর ভেড়া বা ছাগল হলে একজনের পক্ষ হতে একটা পশু যবেহ করতে হবে। যবেহ করা পশুর গোশত চাইলে নিজে খাওয়া যাবে এবং সাথে করে দেশেও নিয়ে আসা যাবে। বুখারী-১৬৮৮, ১৭১৯, মুসলিম-৩০৭৬
■ হাদী তিন পদ্ধতিতে আদায় করতে পারেন। প্রথমত, ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী যবেহ করার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে। তৃতীয়ত, নিজে হাটে গিয়ে হাদী কিনে করা যায়। মিনায় তাবু এলাকায় কোথাও হাদী করা দেখতে পাবেন না। হাদী করার জন্য নির্ধারিত আলাদা জায়গা আছে মুআইসম নামক এলাকায় যা মিনার সীমানার ভিতর অবস্থিত।
■ ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী করা সবচেয়ে উত্তম পন্থা। হজ্জের পূর্বে আল-রাজী ব্যাংক বা অন্য কোন ব্যাংক থেকে হাদীর জন্য ৭০০-৮০০ রিয়াল জমা দিয়ে রশিদ বা টিকিট সংগ্রহ করবেন। টিকিটে হাদী করার আনুমানিক সময় (সকাল ১০টা/ ১১টা) লেখা থাকে। সাধারণত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১০ যিলহজ্জ সকাল থেকে হাদী জবেহ করা শুরু করেন এবং টিকিটে লিখিত সময়ের আগে বা পরে হাদী জবেহ করেন। মক্কা ও মদীনায় অনেক হাদীর টাকা জমা দেওয়ার ছোট ছোট ব্যাংক বুথ দেখতে পাবেন। হজ্জের একটু আগেভাগেই টিকেট ক্রয় করা উত্তম, নইলে পরে হাদী টিকেট পাওয়া যায় না।
■ আবার আপনার হজ্জ এজেন্সিকে হাদীর টাকা দিয়ে দিতে পারেন। আপনার হজ্জ এজেন্সি আগেভাগেই মিনায় হাদী ক্রয় করে জবেহ করার ব্যবস্থা করতে পারেন। আবার আপনি নিজে মিনায় হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করে জবেহ করতে পারেন। এমন করলে আপনি কিছু গোশত খাওয়ার জন্য নিয়ে আসতে পারেন। তবে সাধারণ হাজীদের পক্ষে হাটে যাওয়া সম্ভব নয় এবং এতে অনেক কষ্ট ও বিড়ম্বনা পোহাতে হয়, তাই প্রথম দুইটির যে কোন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো।
■ নিজ হাতে অবশ্য যবেহ করা সুন্নাত। রাসূল (ﷺ) হজ্জে ৭টি উঠ জবেহ করেছিলেন। যবেহ করার সময় পশুর মুখ থাকবে দক্ষিণ দিকে এবং পশুকে বাম দিকে কাত করে শোয়াতে হবে ও এর পাগুলো থাকবে ডান দিকে অতঃপর কিবলামুখি হয়ে ছুরি চালাতে হবে। বুখারী-১৭১২
■ যবেহ করার সময় এই দু'আ পাঠ করা:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي
"বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর, আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী"।
"আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হে আল্লাহ! আমার তরফ থেকে আপনি কবুল করুন"।
■ সতর্কতা: হজ্জের সময় কিছু অসাধু লোক মিনার তাবুতে এসে হাদী করানোর নামে ভূয়া রশিদ দিয়ে অর্থ নিয়ে প্রতারণা করে। হাদী যবেহ না করেই ফোন করে জানিয়ে দেন হাদী জবাই হয়ে গেছে! আবার কিছু হজ্জ এজেন্সিও একই ধরনের প্রতারনা করে। তাই এজেন্সির মাধ্যমে হাদীর ব্যবস্থা করলে দলের কয়েকজন লোক এজেন্সির সাথে সরেজমিনে গিয়ে সকলের হাদী যবেহ করা দেখে আসা উচিত。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00