📄 ১০ যিলহজ্জ : মুযদালিফার রাত
■ ১০ যিলহজ্জ রাতে করণীয়: মুযদালিফায় গমণ করে মাগরিব ও এশার স্বলাত একসাথে পরপর কসর করে আদায় করা ও মুযদালিফায় ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করা এবং ফজরের স্বলাতের পর জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে গমণ করা।
■ মুযদালিফায় অবস্থান নিঃস্ব ও উদবাস্তু জীবনযাপন, গৃহহীনতা ও অভাবের প্রতীক। মুযদালিফা এলাকা হারামের সীমানার ভিতরে অবস্থিত। আরাফার সীমানা শেষ হলেই মুযদালিফা শুরু হয় না। আরাফা থেকে ৬ কি.মি. অতিক্রম করার পর আসে মুযদালিফা। মুযদালিফার পর কিছু অংশ ওয়াদি আল-মুহাসসির উপত্যকা এলাকা তারপর মিনা সীমানা শুরু হয়।
■ আল্লাহ কুরআনে বলেন, "তোমরা যখন আরাফার ময়দান থেকে ফিরে আসবে তখন মাশআরুল হারামের (মুযদালিফায়) কাছে এসে আল্লাহকে স্মরণ করবে, তেমনি করে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনি করে তাঁকে স্মরন করবে, নিশ্চয়ই তোমরা পথভ্রষ্টদের দলে শামিল ছিলে"। সূরা-আল বাকারা, ২:১৯৮
■ রাসূল(ﷺ) মুযদালিফায় অবস্থানের ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা এই দিনে তোমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, তিনি গুনাহগারদেরকে সৎকাজকারীদের ওসীলায় ক্ষমা করেছেন। আর সৎকাজকারীরা যা চেয়েছে তা তিনি দিয়েছেন, অতএব আল্লাহর নাম নিয়ে ফিরে চলো”। ইবনে মাজাহ-৩০২৪
■ সূর্যাস্তের পর মাগরিবের স্বলাত না পড়েই আরাফার ময়দান ত্যাগ করে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। সূর্যাস্তের পূর্বে আরাফা ত্যাগ করা যাবে না, করলেই দম দিতে হবে। রাস্তায় যেতে যেতে তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখবেন। আরাফা থেকে সকল বাস প্রায় একই সময়ে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তাই রাস্তায় খুব যানজটের সৃষ্টি হয়। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকার চেষ্টা করবেন। এখানে দলছাড়া হয়ে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মুযদালিফায় পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য আলাদা একমুখী রাস্তা আছে, এই রাস্তায় কোন গাড়ি চলাচল করে না। তবে রাস্তা চেনা না থাকলে ও হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে বাসে যাওয়াই উত্তম। বুখারী-১৬৭১, আবু দাউদ-১৯২৫
■ মুযদালিফায় কোনো তাবুর ব্যবস্থা নেই। বাস এখানে পৌছানোর পর সবাইকে নামিয়ে দিয়ে বাস চলে যাবে। কিছু বাস থাকে ভাড়া করা তারা অবশ্য থেকে যায়। এরপর এখানে খোলা আকাশের নিচে পাথর মাটিতে ম্যাট বিছিয়ে স্বলাত পড়তে হবে ও রাতে থাকতে হবে। মুযদালিফার কিছু জায়গায় বড় ম্যাট কার্পেট বিতরণ করা হয় রাত্রিযাপন করার জন্য। দেখবেন কতো বিত্তশালীরা রাস্তার পাশে ফুটপাতে, পাহাড়ের ঢালে, বাথরুমের সামনে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছে। এখানে আশেপাশে টয়লেটের সংখ্যা খুবই সীমিত তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
■ মুযদালিফায় যখনই পৌছাবেন তখন প্রথম কাজ হলো মাগরিব ও এশার স্বলাত কসর করে পরপর আদায় করা। যদি জামআত করে পড়েন তবে প্রথমে একবার আযান ও তারপর এক ইকামতের পর মাগরিবের ৩ রাকাআত ফরয স্বলাত এবং তার পরপরই ইকামত দিয়ে এশার ২ রাকাআত ফরয জ্বলাত আদায় করবেন। এই দুই জ্বলাতের মাঝখানে কোনো সুন্নাত স্বলাত নেই। এশার স্বলাতের পর এক/তিন রাকাআত বিতর স্বলাত পড়তে পারেন যেহেতু রাসূল (ﷺ) মুক্তিম বা মুসাফির কোন অবস্থায়ও বিতর বাদ দিতেন না। বুখারী-১৬৭৩, ১৬৮৩, মুসলিম-৩০০২
■ যদি এমন হয় মুযদালিফায় পৌঁছার পর এশার জ্বলাতের ওয়াক্ত না হয় তবে অপেক্ষা করতে হবে। আবার যদি প্রচন্ড যানজটের কারণে মধ্যরাতের আগে মুযদালিফায় পৌঁছতে না পারেন, তাহলে পথিমধ্যে কোথাও যাত্রাবিরতি করে অথবা বাসে বসে মাগরিব ও এশার স্বলাত পড়ে নিবেন। বুখারী-১৬৮৩
■ স্বলাত আদায়ের পর আর কোন কাজ নেই। এবার শুয়ে ঘুমিয়ে পরবেন। রাসূল (ﷺ) মুযদালিফার রাতে শুয়ে ঘুমিয়ে আরাম করেছেন। যেহেতু ১০ যিলহজ্জ দিনের বেলায় অনেকগুলো কাজ আছে এবং বেশ পরিশ্রম করতে হবে তাই মুযদালিফার রাতে ঘুমিয়ে বিশ্রাম করা উত্তম।
■ ঘুমানোর পূর্বে বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর সংগ্রহ করে নিতে পারেন। চাইলে ঘুম থেকে উঠে সকালেও কংকর কুড়িয়ে নিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অবশ্য মুযদালিফা থেকে মিনার মধ্যে কোন এক জায়গা থেকে কংকর নিয়েছেন। তাই মুযদালিফা থেকে কংকর নেওয়ায় কোন সমস্যা নেই তবে তা জরুরী মনে না করা ও মুযদালিফার কংকরের বিশেষ গুণ আছে এমন ধারনা পোষন না করা। পরবর্তীতে মিনা থেকে বা হারামের সীমানার ভিতরে যে কোন স্থান থেকে কংকর সংগ্রহ করতে পারবেন। নাসাঈ-৩০৫২
■ ইচ্ছা করলে এখান থেকে জামারাতে পরবর্তী ৩ দিন কংকর নিক্ষেপের জন্য (২১০৩=৬৩) কংকর সংগ্রহ করতে পারেন। তবে সব কংকরই এখান থেকে নেওয়া কোন বিধান মনে না করা, কারণ মিনা থেকেও কংকর সংগ্রহের সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়। যদিও মিনার চেয়ে মুযদালিফায় কংকর সহজলভ্য বেশি। মিনার কিছু জায়গায় অবশ্য কংকর খুঁজে পাওয়া একটু কষ্টকর। তিরমযি-৮৯৭
■ কংকর নিক্ষেপের জন্য সংগৃহিত পাথরের আকার বুটের দানা বা শিমের বিচির মতো হবে। কংকর মোছার বা ধুয়ার কোন নিয়ম হাদীসে পাওয়া যায় না। কিছু অতিরিক্ত কংকর নিবেন কারণ অনেক সময় কংকর হাত থেকে পরে হারিয়ে যেতে পারে। কংকরগুলো একটি ছোট ব্যাগ বা প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষণ করে রাখবেন। যদি মুযদালিফা বা মিনা থেকে কংকর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন তাহলে অন্য কারো কাছ থেকেও কংকর নিতে পারেন। এতে কোন সমস্যা নেই। এভাবে সবাই কংকর এখান থেকে নিলে একদিন মুযদালিফার সব কংকর শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে যদি সংশয় জাগে তবে আশ্বস্ত করতে চাই, এমনটি হবে না! কারণ হজ্জের পর আবার কংকরগুলো মুযদালিফায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মুসলিম-৩০৩১, নাসাঈ-৩০৫৭
■ মুযদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম ওয়াদী মুহাসসির। এটা মুযদালিফার অংশ নয়। তাই এখানে অবস্থান করা যাবে না। এই মুহাসসির এলাকায় আবরাহা রাজার হাতি বাহিনীকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি কংকর নিক্ষেপ করে নাস্তানাবুদ করেছিল। বর্তমানে মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহার করা হয় হজ্জযাত্রী সংকুলান না হওয়ার কারণে। তাই ঐ জায়গাটুকু মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হলেও যেহেতু মৌলিক অর্থে মিনায় পরিনত হয়নি, তাই ঐ অংশের তাবুতে রাত্রিযাপন করলে মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা হয়ে যাবে।
■ মুযদালিফার সীমানার ভিতর এই রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব।
■ বৃদ্ধ, দুর্বল, স্থূলদেহী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিগণ ওজর সাপেক্ষে মধ্যরাতের চাঁদ ডুবার পর মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারেন। অসুস্থ ও দূর্বলদের সাহায্যার্থে তাদের সাথে অভিভাবকরা বা সাহায্যকারীরাও যেতে পারবেন। ওজর ছাড়া মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনায় যাওয়া ঠিক হবে না। চলে গেলে দম দিতে হবে। বুখারী-১৬৭৯, মুসলিম-৩০০৯, ৩০১৯, নাসাঈ-৩০৪৮
■ মুযদালিফায় সুবহে সাদিকে ঘুম থেকে উঠে ফজরের আউয়াল ওয়াক্তেই ফজরের স্বলাত আদায় করবেন। ফজরের দুই রাকাআত সুন্নাত ও দুই রাকাআত ফরয স্বলাত আদায় করবেন। এবার দু'আ-যিক্র করবেন ঠিক যেমন আল্লাহ করতে বলেছেন সূরা-আল বাকারা,২:১৯৮ এবং সূরা-আল আরাফ, ৭:২০৫ আয়াতে। রাসূল(ﷺ) মুযদালিফায় একটি পাহাড়ের পাদদেশে উকুফ করেছেন। ঐ স্থানটি বর্তমানে আল-মাশার আল-হারাম মসজিদের সম্মুখ ভাগে অবস্থিত। মসজিদটি মুযদালিফার ৫নং রোডে অবস্থিত এবং ১২ হাজার মুসল্লী ধারন ক্ষমতা রাখে। কিন্তু রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আমি এখানে উকুফ করলাম তবে মুযদালিফার পুরোটাই উকুফের স্থান।" বুখারী-১৬৮২. মুসলিম-৩০০৭
■ এবার কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঠিয়ে বেশি বেশি তাসবিহ- তাহলীল ও দু'আ-যিক্র করতে থাকুন। এটা দু'আ কবুলের স্থান ও সময়।
■ মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করুন: "সুবহানাল্লাহ” - “আল্লাহ পবিত্রতাময়"। আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করুন: "আলহামদুলিল্লাহ” - "সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য"।
■ কালেমা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করুন: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"- "আল্লাহ ছাড়া (হক) কোনো ইলাহ নেই"।
■ তাকবীরের মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করুন: "আল্লাহু আকবার" "আল্লাহ সবচেয়ে বড়"।
■ এই যিক্রগুলো বারবার পাঠ করতে থাকবেন যতক্ষণ না আকাশ ফর্সা হয়। আপনার পছন্দ মতো অন্য দু'আ-যিকিরও পাঠ করতে পারেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের পূর্বেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, এটিকেই হাদীসে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বুখারী-১৬৮৪, নাসাঈ-৩০৪৭, আবু দাউদ-১৯৩৮, তিরমযি-৮৯৬
📄 মুযদালিফা সম্পর্কিত কিছু তথ্য
■ হজ্জের অন্যতম কঠিন ও কষ্টকর কাজ শুরু হয় আরাফা থেকে মুযদালিফা আসার পথে। সূর্যাস্তের পর আরাফাহ থেকে মুযদালিফার বাস ছাড়ে। কিন্তু রাস্তায় ভারী যানজটের কারণে বাস তেমন একটা অগ্রসর হতে পারে না। অনেক সময় যানজটের কারণে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়, এতে পরিবহন সঙ্কটে যাত্রীদের বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আপনার এজেন্সিকে পর্যাপ্ত পরিবহণের ব্যবস্থা রাখার জন্য সৌদি মুআল্লিম এর শরনাপন্ন হওয়ার অনুরোধ করবেন যাতে সব যাত্রী বাসে বসার সিট পায়।
■ ভারী যানজটের কারণে অনেকে বাস ছেড়ে দিয়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করেন, কারণ তারা মধ্যরাতের আগে মুযদালিফা পৌঁছাতে পারবেন কিনা সন্দেহে পরে যান। আপনিও যদি এই অবস্থায় পরেন তবে বাস ছাড়বেন, কি ছাড়বেন না এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ যদি বাস একবার ছেড়ে দেন তবে পরে আর বাস খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন বাকি পুরো পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে।
■ কিছু লোক পথিমধ্যে কোন পাহাড়ি উপত্যকা এলাকাকে মুযদালিফা মনে করে অন্যদের দেখাদেখি মাঝপথে মাগরিব-এশা পড়ে রাত্রিযাপন করে ফেলেন। অতঃপর সকালে মুযদালিফার সীমানায় এসে সাইনবোর্ড দেখে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আক্ষেপ করেন। এভাবে হজ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় অনেক হাজীর এবং দম দিতে হয়।
■ এজেন্সি থেকে রাতের খাবার দিতে পারবে কিনা তা আগেভাগে জেনে নিন। খাবার না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি কারণ এখানে ব্যবস্থা করার কোন উপায় নেই। এখানে খাবার ও পানি কেনার জন্য আশেপাশে তেমন দোকানও পাবেন না। এ কারণে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় মজুদ রাখলে ভালো হয় মুযদালিফার জন্য। টয়লেট/বাথরুম সীমিত হওয়ার কারণে বা পানি সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে ফজরের স্বলাত আদায় করার জন্য মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নিবেন。
📄 মুযদালিফায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা ত্যাগ করার সময় তাড়াহুড়া করা।
* মুযদালিফায় রাত কাটানোর জন্য গোসল করা জরুরী মনে করা।
* মুযদালিফাকে পবিত্র এলাকা গণ্য করে পায়ে হেঁটে এলাকায় প্রবেশ করা।
* মুযদালিফায় পৌঁছার পর এই দু'আ করা সুন্নাত মনে করা, (হে আল্লাহ এই মুযদালিফা, এখানে একত্রে অনেক ভাষা এসেছে..।)
* দুই স্বলাতের মাঝে মাগরিবের সুন্নাত স্বলাত পড়া ও এশার পর সুন্নাত পড়া।
* মুযদালিফায় পৌছে মাগরিব ও এশার স্বলাত পড়ার আগে কংকর নিক্ষেপের কংকর সংগ্রহ করা।
* কংকর শুধু মুযদালিফা থেকে সংগ্রহ করতে হবে এই ধারণা পোষণ করা।
* মুযদালিফায় জাগ্রত অবস্থায় রাত কাটানো।
* পুরো রাত যাপন করা ছাড়াই কিছুক্ষণ অবস্থান করে কোন ওজর ছাড়া মুযদালিফায় থেকে বের হয়ে যাওয়া।
* 'আল মাশার আল হারাম' পৌঁছার পর এই দু'আ পাঠ করা নিয়ম মনে করা, (হে আল্লাহ আমি এই রাতের মাধ্যমে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি..।)
* মুযদালিফা থেকে কংকর নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর নেয়া এবং বাকি সব কংকর মুহাসসিরের তীর থেকে নেয়া রীতি মনে করা。
📄 ১০ যিলহজ্জ : বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপ
■ ১০ যিলহজ্জের দিনে করণীয়: এই দিনটি হজ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। রাসূল(ﷺ) এই দিনটিকে হজ্জের বড় দিন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এই দিনে ৫টি কাজ সম্পাদন করতে হবে; প্রথমত; বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপ করা, দ্বিতীয়ত; হাদী বা পশু জবেহ করা, তৃতীয়ত; কসর/হলকু করা, চতুর্থত; তাওয়াফুল ইফাদাহ করা ও পঞ্চমত; সাঈ করা। আর দাউদ-১৯৪৫, তিরমিযী-৯৫৮
■ জামারাত এলাকা দিয়ে ইবরাহীম (আঃ) ঈসমাইল (আঃ) কে যবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন ও ইবলিস শয়তান বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং তিনি শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন। জামারাতে শয়তানকে বেঁধে রাখা আছে এমন ধারণা ভুল ধারণা। মূলত, কংকর মারার মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য পোষণ করা এবং শয়তানের আনুগত্য পরিত্যাগ করার অংগীকার ব্যক্ত করা। অনেকে জামারাতকে বড় শয়তান, ছোট শয়তান নামে ডাকে যা সঠিক নয়। জামারাত এলাকা মিনার সীমানার মধ্যে অবস্থিত। কংকর নিক্ষেপ বা রামি করা আল্লাহর নির্দেশ সমূহের অন্যতম। রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "বায়তুল্লাহ তাওয়াফ, সাফা মারওয়া সাঈ ও জামারাতে কংকর নিক্ষেপ আল্লাহর যিক্র কায়েমের উদ্দেশ্যে।" হাদীসে এসেছে "আর তোমার কংকর নিক্ষেপ, তা তো তোমার জন্য সঞ্চিত করে রাখা হয় (নেকী হিসাবে)"। তিরমিযী-৯০২
■ সূর্যোদয়ের আগেই তালবিয়াহ পাঠরত অবস্থায় মিনার উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করবেন। এসময় রাস্তায় প্রচুর মানুষের ভীড় হয়। কারণ এখন আর কোন বাস থাকবে না রাস্তায়, সবাইকে পায়ে হেঁটে জামারাত যেতে হবে। তাই এখান থেকে ৮-১০ কি.মি হাঁটার মন-মানসিকতা রাখতে হবে। এটিই হজ্জের অন্যতম সবচেয়ে কঠিন কাজ। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকবেন, কারণ এখানে অনেক লোক হারিয়ে দলছাড়া হয়ে যায়। যখন মুহাসসির উপত্যকা পার হবেন তখন একটু তাড়াতাড়ি হাঁটার চেষ্টা করবেন কারণ রাসূল (সাঃ) এমনটাই করেছেন যেহেতু এখানে আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল। জামারাত যাওয়ার পথে যদি মিনার তাবু পরে তবে তাবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ও কিছু খাওয়া দাওয়া করে তারপর জামারাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারেন। তালবিয়াহ বেশি বেশি করে পাঠ করা অব্যাহত রাখুন, কারণ তালবিয়াহ পাঠ করার সময় শেষ হয়ে আসছে। তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে থাকুন। এসময় দলনেতা একটি পতাকা সামনে নিয়ে সকলকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলে উত্তম হয়।
■ রাসূল (সাঃ) সূর্য উঠার ১-২ ঘন্টার মধ্যে কংকর মেরেছিলেন। সে হিসেবে সূর্য মধ্যম আকাশে ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করা সুন্নাত এবং উত্তম। তবে সূর্য উঠা থেকে শুরু করে ১১ যিলহজ্জ সুবহে সাদিক পর্যন্ত কংকর মারা যায়েজ। বর্তমানে যেহেতু ৩০ লক্ষাধিক হাজীর সুন্নাত সময়ের মধ্যে একসাথে কংকর মারা দুঃসাধ্য ও কষ্টকর তাই একটু দেরী করে কংকর মারতে গেলে সমস্যা নেই। বুখারী-১৭৩৫, নাসাঈ-৩০৬৩
নারী, শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধরা যারা মুযদালিফা থেকে মধ্যরাতে মিনায় চলে এসেছেন তারা ১০ যিলহজ্জ সূর্য উঠার আগে কংকর নিক্ষেপ করবেন না। তারা সূর্য উদয়ের পর অথবা বিকেল বেলায় বা রাতে জামারায় গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন কারণ এসময় জামারাহ ফাঁকা থাকে। নাসাঈ-৩০৬৫, তিরমিযী-৮৯৩
অসুস্থ্য ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষ, শিশুদের পক্ষ থেকে অন্য যে কেউ তার প্রতিনিধি হিসাবে রামি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি ব্যক্তি সেই বছর হজ্জ আদায়কারী হতে হবে এবং প্রথমে তার নিজের কংকর নিক্ষেপের পর অন্যের কংকর নিক্ষেপ করবেন। এমন লক্ষ্য করা যায়; বিশেষ করে নারীরা ক্ষীণ শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার ওযুহাতে রামি করতে না গিয়ে অন্যকে নিযুক্ত করেন ও মিনার তাবুতে থেকে যান। এমনটি করা অনুচিত। নিজের কংকর নিজে মারা উত্তম। একেবারে খুবই অসুস্থ, চলতে অপারগ বা ওখানে গেলে আরও অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন গুরুতর ওজর ছাড়া সকলেরই জামারাতে যাওয়া উচিত।
পায়ে হেঁটে একমুখি চলাচলের রাস্তা দিয়ে জামারাতের যে কোন ফ্লোরে উঠার ব্রীজ দিয়ে বা লিফট দিয়ে অথবা এস্কেলেটরে করে জামারাত বিল্ডিং কমপ্লেক্সে উঠবেন। আপনি যেহেতু মিনার মধ্য দিয়ে খাইফ মসজিদের পাশ দিয়ে জামারাতে ঢুকবেন সেহেতু প্রথমে ছোট জামারাহ (জামারাতুল সুগরা) ও তারপর মধ্যম জামারাহ (জামারাতুল উদ্ভা) অতিক্রম করবেন এবং অতঃপর সবশেষে পৌঁছাবেন বড় জামারাহ (জামারাতুল আকাবাহ)। আজকে ছোট ও মধ্যম জামারাতে কংকর নিক্ষেপ নেই। সোজাসুজি বড় জামারার দিকে কংকর মারতে না গিয়ে জামারার চারদিকে খানিকটা ঘোরা ফেরা করে ভিড় কম এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করুন অতঃপর জামারার যত কাছকাছি সম্ভব গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করবেন। বড় জামারার কাছে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিবেন। তালবিয়াহ পাঠ এখানেই শেষ। বুখারী-১৬৮৫, মুসলিম-২৯৭৮
যদি সম্ভব হয় জামারাকে সামনে রেখে কাবাকে হাতের বামে ও মিনাকে ডানে রেখে অথবা যে কোন ভাবে সুবিধামত দাঁড়িয়ে ডান হাত উঁচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করবেন এবং প্রতিবার নিক্ষেপের শুরুতে বলবেন: বুখারী-১৭৫০, মুসলিম-৩০২২, নাসাঈ-৩০৫৪
اللهُ أَكْبَرُ
"আল্লাহু আকবার"
"আল্লাহ সবচেয়ে বড়"।
জামারার হাউজ বা বেসিনে বুক লাগিয়ে অথবা ১-২ মিটার দূরত্ব থেকে জামারায় রামি বা কংকর নিক্ষেপ করবেন। কংকরগুলো যেন জামারার পিলার দেয়ালে আঘাত করে অথবা জামারার বেসিনের মধ্যে পরে সেটা নিশ্চিত করবেন। যদি কোন কংকর বেসিনের মধ্যে না পরে তবে তার পরিবর্তে আবার একটি কংকর নিক্ষেপ করবেন। সে কারণে সঙ্গে অতিরিক্ত কংকর নেওয়া ভালো। কংকর হাতের আংগুল দিয়ে যে কোনভাবে ধরে নিক্ষেপ করা যাবে। এজন্য নির্দিষ্ট কোন নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। নিজের কংকর নিক্ষেপ হয়ে গেলে ঠিক একই নিয়মে অন্যের পক্ষ থেকে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন।
লক্ষ্যনীয় বিষয়; ১০ যিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পূর্বে বড় জামারাহে কংকর মারা যাবে না। বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপের কাজটি ওয়াজিব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জামারায় কংকর মারতে ব্যর্থ হলে দম দিতে হবে। নাসাঈ-৩০৬৫
রামি করা শেষে এখানে দাঁড়িয়ে দু'আ করার কোন নিয়ম হাদীসে পাওয়া যায় না। জামারাত থেকে ব্রীজ দিয়ে মক্কার দিকে নামতে হবে। এরপর পরবর্তী কাজ হলো হাদী জবাই করা। হাদী করার জন্য যদি ব্যাংকে টাকা দিয়ে থাকেন, তবে আর আপনার করনীয় কিছু নেই। হাদী করার সময় পার হয়ে গেলে কসর/হলকু করে হালাল হয়ে যাবেন। আর যদি নিজ হাতে হাদী করার ইচ্ছা থাকে তবে মুআইসম চলে যাবেন হাদী করতে। আজ সৌদিআরবে ঈদের দিন, তবে এখানে হাজীদের ঈদের স্বলাত পড়া লাগবে না। এদিনের সকল স্বলাতসমূহ স্বলাতের আউয়াল ওয়াক্তে কসর করে আদায় করে নেওয়া। ইবনে মাজাহ-৩০৩২