📄 ৯ যিলহজ্জ : আরাফা দিবস
■ ৯ যিলহজ্জে করণীয় : সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফায় গমণ করে দ্বিপ্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা এবং দু'আ, যিকির, ইসতিগফার করা। আরাফায় যোহর-আছর স্বলাত একসাথে পর পর কসর করে আদায় করা এবং সূর্যাস্তের পর আরাফা ত্যাগ করে মুযদালিফায় গমণ করা।
■ এই দিন সবচেয়ে রহমতপ্রাপ্ত দিন কারণ এই দিনে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাশীলতা প্রকাশ করেন। আরাফার ময়দান হারামের সীমানার বাইরে অবস্থিত। আরাফার চর্তুদিকে সীমানা নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক/সাইনবোর্ড রয়েছে। ১০.৪ কি.মি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আরাফা ময়দান। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কি.মি দূরে অবস্থিত আরাফার ময়দান। এই আরাফার ময়দানে রাসূল (ﷺ) তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষন দিয়েছিলেন। আরাফার ময়দান চারপাশে বড় বড় পাহাড়ে ঘেরা, মাঝে অনেকটুকু সমতলভূমি ও ছোটখাটো টিলা পাহাড় আছে। বুখারী-১৭৪০
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক হাদীসে বলেছেন, "হজ্জ হলো আরাফায়"। নাসাঈ-৩০১৬
■ আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "আরাফা দিবস ব্যতীত আর কোনো দিবস নাই যেদিন আল্লাহ তাঁর অধিক বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন এবং এই দিন তিনি বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে বান্দাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, 'তারা কি উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছে/তারা আমার কাছে কী চায়?"। মুসলিম-৩১৭৯, নাসাঈ-৩০০৩
■ ইবলিশ শয়তান এই দিনে মুমিন বান্দাদের আল্লাহকে স্মরণ, দু'আ, যিকির ও ইসতিগফার করতে দেখে সবচেয়ে বেশি হীন ও লাঞ্ছিত হয়ে যায়। শয়তান অত্যধিক ক্রোধান্বিত ও দিশেহার হয়ে যায়।
■ ৯ যিলহজ্জ মিনায় ফজরের স্বলাত আদায়ের পর আরাফার উদ্দেশে রওনা হওয়া সুন্নাত। এসময় একাকি অথবা ছোট দল হয়ে পায়ে হেঁটে আরাফায় যাওয়ার চেয়ে বাসে যাওয়া উত্তম। ফজরের স্বলাতের পর থেকে তাকবীরে তাশরীক পড়া শুরু করবেন এবং ১৩ যিলহজ্জ আসরের জ্বলাত পর্যন্ত পরবেন। প্রতি ফরয স্বলাতের পর উচ্চস্বরে এটি পরবেন: বুখারী-১৬৫৯. মুসলিম-২৯৮৯, আবু দাউদ-১৯১৩
اللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ"।
"আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য"।
বর্তমানে হজ্জযাত্রী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ৯ যিলহজ্জ মধ্যরাত থেকে আরাফায় নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। যদিও এটি সুন্নাতের বিপরীত তবে যেহেতু সমস্যার কারণে এ কাজ করা হয় এবং আপনি যেহেতু হজ্জ ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল তাই এই সুন্নাতটি ছুটে গেলে হজ্জের কোন ক্ষতি হবে না। এমন ক্ষেত্রে মিনায় আর ফজরের স্বলাত পড়া হবে না যাতে কোন সমস্যা নেই।
আরাফার সীমানার ভিতর প্রবেশ করে উত্তম হলো নামিরা মসজিদে ইমামের খুতবা শোনা এবং যোহরের আযানের পর যোহরের আউয়াল ওয়াক্তেই যোহর-আসর স্বলাত কসর করে ইমামের পিছনে জামাআতে আদায় করা। তবে যেহেতু সকল লোকদের মসজিদে নামিরায় একত্রিত হওয়া সম্ভব নয় তাই আরাফার ময়দানের যে কোন স্থানে তাবুতে অবস্থান গ্রহণ করে ছোট ছোট জামাআত করে স্বলাত আদায় করে নেওয়া। মহিলারা একাকি জ্বলাত পড়ে নিবেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; নিশ্চিতভাবে আরাফার সীমানার ভেতরে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে অন্যথায় হজ্জ হবে না। আরাফার ময়দানের চর্তুদিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক বা সাইনবোর্ড রয়েছে যা আপনাকে অবস্থান নির্ণয়ে সাহায্য করবে। নামিরা মসজিদের সামনের দিকের কিছু অংশ আরাফার সীমানার বাইরে, তাই সেখানে সবসময় অবস্থান করা যাবে না। আরাফার ময়দানে প্রবেশের পর যদি ভুলক্রমে আরাফার সীমানার বাইরে চলে যাওয়া হয় বা কোন কারণে যদি আরাফার সীমানার বাইরে যেতে হয় তবে সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার আরাফার সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে হবে। ইবনে মাজাহ-৩০১২
এখানে স্বলাত আদায়ের নিয়ম হলো; যোহরের আউয়াল ওয়াক্তেই এক আযান ও দুই ইকামাতে যথাক্রমে যোহর (২ রাকাআত ফরয) ও আসর (২ রাকাআত ফরয) কসর করে পর পর আদায় করা। এই দুই স্বলাতের আগে, মধ্যে ও পরে কোনো সুন্নাত বা নফল জ্বলাত না পড়া। বুখারী-১৬৬২, আবু দাউদ-১৯১৩
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এভাবেই মক্কার মুকিম ও মুসাফিরদের নিয়ে কসর করে পরপর স্বলাত আদায় করেছেন। তিনি মুকিম ও মুসাফিরদের জন্য আলাদা কোন নিয়মের কথা উল্লেখ করেন নাই। নামিরা মসজিদের ইমামও এই ভাবেই স্বলাত পড়ান। কিন্তু এই স্বলাত দুটি পড়ার বিষয় নিয়ে দেখবেন মতভেদ দেখা দিবে। ৩ ধরনের ফাতাওয়া শুনবেন - ১. এই দুই স্বলাত পৃথক পৃথক সময়ে (যোহর ও আসরের সময়ে) কসরবিহীন পড়তে হবে, ২. এই দুই স্বলাত পরপর পড়া যাবে তবে কসর করে না, ৩. নামিরা মসজিদের ইমামের সাথে পড়লে পরপর কসর করে আর তাবুতে আলাদা জামআতে করে পড়লে পৃথক পৃথক সময়ে কসর বা কসরবিহীন পড়তে হবে! উপরের তিন পদ্ধতির আমলের দলিল হাদীস থেকে বা রাসূল (ﷺ) ও সাহাবীদের করা কোন আমলকে দলিল হিসাবে কেউ দেখাতে পারবেন না বরং তারা তাদের ইমামদের ফিকহী মাসআলার আলোকে ফিকহের কিতাব থেকে আমল করার দলিল দিবেন। ইতিপূর্বে রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহর আলোকে হজ্জ করার জন্য করণীয় কি তা আপনাকে জানিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি প্রত্যেকের সুচিন্তিত বিবেক ও জ্ঞানের উপর অর্পণ করে দিলাম। আরাফার দিনটি যদি জুমআর দিন হয় তবে জুমআর স্বলাত পড়ার দরকার নেই তবে কসর জ্বলাত আদায় করতে হবে। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৬১৭
আরাফার দিবসের সিয়াম/রোজা পূর্বের এক বছরের ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। তবে এ রোজা হাজীদের জন্য নয়, বরং যারা হজ্জ করতে আসেননি তাদের জন্য। তাই আপনার পরিবারবর্গকে দেশে এই দিনে রোজা রাখতে বলবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি। তিনি সবার সম্মুখে দুধ/শরবত পান করেছেন। বুখারী-১৬৫৮, ১৬৬১
আরাফার ময়দানে যে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়েও থাকতে পারেন। আরাফার ময়দানে এই অবস্থান করাকে বলা হয় উকুফে আরাফাহ। আরাফার দিনে জাবালে আরাফাহ পাহাড়ে উঠার বিষয়ে বিশেষ কোন ফযীলত হাদীসে কোথাও পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবশ্য জাবালে আরাফার এর পাশ্ববর্তী কোন এক জায়গায় উকুফ করেছেন কিন্তু তিনি বলেছেন, "আমি এখানে অবস্থান করলাম, কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকুফের স্থান"। আবু দাউদ-১৯০৭, বুখারী-১৬৬৪
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গেলে (অর্থাৎ যোহর-আছর স্বলাতের পর) অত্যন্ত বিনয়ী ও তাকওয়ার সাথে আল্লাহর কাছে দু'আ করা শুরু করবেন। এখন আল্লাহর কাছে আপনার আবেদন জানানোর সময়। এই দু'আ করার জন্যই আরাফায় আসা। কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত সামনে উচু করে প্রসারিত করে বগল উন্মুক্ত করে চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, ক্ষমা চান, দয়া কামনা করুন, আপনার মনের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ তাআলার কাছে ব্যক্ত করুন। আল্লাহর গুনবাচক নামসমূহ, দুরূদ, তালবিয়াহ, তাকবীর, যিক্র, ইসতিগফার ও দু'আ করতে থাকুন বেশি বেশি করে। প্রথমে নিজের জন্য ও পরে পরিবার-আত্মীয়স্বজনদের জন্য অতঃপর প্রতিবেশী-পরিচিতজনদের জন্য এবং শেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দু'আ করবের। দু'আ শেষে আমিন বলুন। দু'আর সুন্নাহ পদ্ধতি ও আদাব পৃষ্ঠা নং: ১০৩ থেকে দেখে নিন। নাসাঈ-৩০১১, তিরমিযী-৮৮৩, ৩৬০৩
সব দু'আ-যিক্র যে আরবীতে করতে হবে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, বাংলা ভাষাতেই দু'আ করবেন। তবে মনে রাখবেন; আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে দু'আ করা সুন্নাত নিয়ম এর অর্ন্তভূক্ত নয়। এতে অন্যদের মনযোগ নষ্ট হয়। দু'আ করবেন আবেগ ও মিনতির সাথে চুপে চুপে মনে মনে। আরাফায় দু'আর সময় ওযু অবস্থায় থাকা উত্তম তবে ওযুবিহীন অবস্থায় থাকলেও সমস্যা নেই। এই বইয়ের শেষে পৃষ্ঠা নং: ১৯১-২০৫ থেকে কুরআন ও হাদীস এর বেশ কিছু দু'আ সংযোজন করা হয়েছে যা আরাফার ময়দানে পড়তে পারেন। যে সব মহিলারা ঋতু অবস্থায় থাকবেন তারাও অন্যান্য হাজীদের মত দু'আ-যিকর করবেন, তারা শুধু স্বলাত আদায় করা, কুরআন স্পর্শ করা ও কাবা তাওয়াফ করা থেকে বিরত থাকবেন। সূরা আল আরাফ-৭:২০৫
■ আরাফার দিনের সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ দু'আ এটি যা পূর্ববর্তী নবীগণও পড়েছেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرِ
"লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াহদাহু, লা শারীকালাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন কুদীর।"
"আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ের উপর সর্বশক্তিমান"। তিরমিযী-৩৫৮৫
■ ৯ যিলহজ্জ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরয। দুপুরের সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে আরাফাতে অবস্থানের প্রকৃত সময় শুরু হয়। আরাফার ময়দানে কেউ প্রবেশ করলে অতঃপর সেখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। কারো পক্ষে হতে অন্য কাউকে আরাফায় পাঠানো যাবে না, প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বশরীরে আরাফায় উপস্থিত হতে হবে। যদি কেউ সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করে চলে যায় তবে তাকে কাফফারা স্বরুপ একটি দম (পশু জবেহ) দিতে হবে।
■ কোন কারণবশত যদি আরাফায় দিনের বেলায় পৌঁছা না যায় এবং সন্ধ্যার পর রাতের বেলায় পৌঁছায় তবে রাতের কিছু অংশ আরাফায় অবস্থান করে সূর্য উদয়ের পূর্বে মুযদালিফায় গিয়ে রাতের বাকি অংশ যাপন করলে হজ্জ হয়ে যাবে। তবে এজন্য কোন দম দিতে হবে না। কমপক্ষে সূর্য উদয়ের পূর্বে আরাফায় পৌঁছাতে না পারলে হজ্জ বাতিল। নাসাঈ-৩০১৬.৩০৩৯, তিরমিযী-৮৮৯, ইবনে মাজাহ-৩০১৫
■ আরাফার ময়দানে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের স্বলাত আদায় না করেই মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। মাগরিব স্বলাত আদায় করবেন মুযদালিফায় গিয়ে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনটাই করেছেন। অনেকে সূর্যাস্ত হওয়ার একটু আগেই রাস্তার যানজট কাটানোর জন্য আগেই বাসে উঠে রওনা হয়ে যান আর আরাফার ময়দান পার হতে হতে সূর্যাস্ত করেন। ইবাদতের বিষয়ে এমন শর্টকাট, চটজলদি বা চালাকি বেশি খাটানো উচিত হবে না। আরাফার প্রতিটি সময় গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সেহেতু এখানে একটু বেশি সময় নেওয়াই ভালো। তাই আগেভাগে এজেন্সিকে বলে রাখা উত্তম তারা যেন এমন কাজ না করে। বুখারী-১৬৬৮, নাসাঈ- ৩০১৯
📄 আরাফা সম্পর্কিত কিছু তথ্য
■ আরাফার তাবুগুলো অস্থায়ী, শুধুমাত্র একদিনের জন্য টাঙ্গানো হয়। আরাফার তাবুগুলোতেও এয়ার কুলার ব্যবস্থা থাকে। আরফার তাবু আকারে বড় হয় তবে মিনার তাবুর মতো মজবুদ নয়। তাবুতে ম্যাট্রেস বিছানা বা কার্পেট থাকতে পারে। আরাফার তাবুর চারদিকে অনেক নিম গাছ ও আরও অন্যান্য গাছ রয়েছে, এই গাছগুলো ভালো শীতল ছায়া দেয়। একটি কথা প্রচলিত যে; ১ লাখ নিম গাছ চারা নাকি বাংলাদেশ থেকে উপহারস্বরূপ সৌদিকে দেওয়া হয়েছিল আরাফার ময়দানে রোপন করার জন্য!
■ এখানেও টয়লেট ও ওযুর ব্যবস্থা খুবই সীমিত/অপর্যাপ্ত। টয়লেটে যাওয়ার জন্য প্রায় সবসময় ৫-১০ জনের পিছনে ২০-৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখানে মোবাইল ফোনে চার্জ দেয়ার ব্যবস্থা খুবই সীমিত।
■ সৌদি মুআল্লিম আরাফায় দুই/তিনবেলা খাবার দিবেন। এছাড়াও এখানে তাবুর বাইরে রোডের পাশে অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। রাস্তায় অনেক ট্রাক বা গাড়ি থেকে বিনামূল্যে খাবার/পানি বিতরণ করা হয়। ইচ্ছা করলে এই খাবার নেওয়া যায়। তবে ধাক্কাধাক্কি করে এসব খাবার আনতে না যাওয়াই উত্তম কারণ এতে আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
■ মিনা থেকে আরাফা ও মুযদালিফায় যাওয়ার জন্য শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়। রেলওয়ের প্লাটফরম সবসময়ই হজ্জযাত্রীদের ভিড়ে জনাকীর্ণ থাকে। সিঁড়ি বেয়ে রেলওয়ের প্লাটফরমে উঠতে হয়, এতে ধাক্কাধাক্কিতে অনেকে আহত হন।
■ হাজীরা যেদিন আরাফায় থাকেন সেদিন সকাল বেলা কাবা ঘরের গিলাফ বা চাদর পরিবর্তন করে নতুন গিলাফ লাগানো হয়। বছরে সবসময় এই দিনেই একবার এই গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। হাজীরা হজ্জ শেষে কাবা তাওয়াফ করতে এসে নতুন গিলাফে বাইতুল্লাহেকে দেখতে পায়。
📄 আরাফায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* আরাফার সীমানার বাইরে অবস্থান করা। আরাফার সীমানার বাইরে উরানাহ উপত্যকা এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করা।
* সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করে মুযদালিফা চলে যাওয়া, যারা এই কাজ করবে তাদের কাফফারা স্বরুপ দম হিসাবে একটি পশু যবেহ করতে হবে।
* আরাফায় জাবালে আরাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহনের চেষ্টা করা এবং সেখানে পাহাড়ের গায়ে হাত ও কাপড় ঘষা ও সিজদা দিয়ে দু'আ করা।
* দু'আ করার সময় জাবালে আরাফা পাহাড়ের দিকে হাত উঠিয়ে দু'আ করা।
* জাবালে আরাফা পাহাড়ের উপরস্থ লম্বা পাথর (ডোম) স্পর্শ করা এবং এখানে স্বলাত পড়া ও ডোম তাওয়াফ করা।
* মসজিদে নামিরাতে ইমামের খুতবা শেষ করার আগেই যোহর ও আসরের স্বলাত পড়ে নেওয়া।
* অনেকে যোহরের স্বলাতের পর বয়ান, দোয়া, যিকির ও মিলাদ করে দীর্ঘ সময় পর আসরের ওয়াক্তে আসরের স্বলাত পড়া।
* অনেকের ধারণা জুমুআর দিনে আরাফা হলে ৭২টি হজ্জযাত্রার সমান নেকী বা এক আকবরি হজ্জ বলে; যার কোন দলীল নেই।
* সূর্যাস্তের সময় আরাফা পাহাড়ের উপর আগুন অথবা মোমবাতি জ্বালানো।
* অনেকে দলবদ্ধ হয়ে মিলাদ পড়েন, বিনামূল্যের খাবার অনুসন্ধান করেন এবং কোলাকুলি ও মুসাফাহ করেন।
* অনেক হাজী বেশি ফযীলত মনে করে আরাফার দিনে রোযা রাখেন। অথচ তা সুন্নাহর বিপরীত কাজ।
* অনেকে এই শোনা কথা বিশ্বাস করেন যে, আদম ও হাওয়া এই আরাফার ময়দানে মিলিত হয়েছিলেন; যার ইসলামি কোন বিশুদ্ধ দলিল বা প্রমাণ নেই।
* অনেকের ধারনা এই আরাফার ময়দানই কিয়ামতের পর হাশর হবে; বস্তুত এমন কোন কথা কুরআন-হাদীসে উল্লেখ নেই।
📄 ১০ যিলহজ্জ : মুযদালিফার রাত
■ ১০ যিলহজ্জ রাতে করণীয়: মুযদালিফায় গমণ করে মাগরিব ও এশার স্বলাত একসাথে পরপর কসর করে আদায় করা ও মুযদালিফায় ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করা এবং ফজরের স্বলাতের পর জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে গমণ করা।
■ মুযদালিফায় অবস্থান নিঃস্ব ও উদবাস্তু জীবনযাপন, গৃহহীনতা ও অভাবের প্রতীক। মুযদালিফা এলাকা হারামের সীমানার ভিতরে অবস্থিত। আরাফার সীমানা শেষ হলেই মুযদালিফা শুরু হয় না। আরাফা থেকে ৬ কি.মি. অতিক্রম করার পর আসে মুযদালিফা। মুযদালিফার পর কিছু অংশ ওয়াদি আল-মুহাসসির উপত্যকা এলাকা তারপর মিনা সীমানা শুরু হয়।
■ আল্লাহ কুরআনে বলেন, "তোমরা যখন আরাফার ময়দান থেকে ফিরে আসবে তখন মাশআরুল হারামের (মুযদালিফায়) কাছে এসে আল্লাহকে স্মরণ করবে, তেমনি করে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনি করে তাঁকে স্মরন করবে, নিশ্চয়ই তোমরা পথভ্রষ্টদের দলে শামিল ছিলে"। সূরা-আল বাকারা, ২:১৯৮
■ রাসূল(ﷺ) মুযদালিফায় অবস্থানের ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা এই দিনে তোমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, তিনি গুনাহগারদেরকে সৎকাজকারীদের ওসীলায় ক্ষমা করেছেন। আর সৎকাজকারীরা যা চেয়েছে তা তিনি দিয়েছেন, অতএব আল্লাহর নাম নিয়ে ফিরে চলো”। ইবনে মাজাহ-৩০২৪
■ সূর্যাস্তের পর মাগরিবের স্বলাত না পড়েই আরাফার ময়দান ত্যাগ করে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। সূর্যাস্তের পূর্বে আরাফা ত্যাগ করা যাবে না, করলেই দম দিতে হবে। রাস্তায় যেতে যেতে তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখবেন। আরাফা থেকে সকল বাস প্রায় একই সময়ে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তাই রাস্তায় খুব যানজটের সৃষ্টি হয়। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকার চেষ্টা করবেন। এখানে দলছাড়া হয়ে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মুযদালিফায় পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য আলাদা একমুখী রাস্তা আছে, এই রাস্তায় কোন গাড়ি চলাচল করে না। তবে রাস্তা চেনা না থাকলে ও হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে বাসে যাওয়াই উত্তম। বুখারী-১৬৭১, আবু দাউদ-১৯২৫
■ মুযদালিফায় কোনো তাবুর ব্যবস্থা নেই। বাস এখানে পৌছানোর পর সবাইকে নামিয়ে দিয়ে বাস চলে যাবে। কিছু বাস থাকে ভাড়া করা তারা অবশ্য থেকে যায়। এরপর এখানে খোলা আকাশের নিচে পাথর মাটিতে ম্যাট বিছিয়ে স্বলাত পড়তে হবে ও রাতে থাকতে হবে। মুযদালিফার কিছু জায়গায় বড় ম্যাট কার্পেট বিতরণ করা হয় রাত্রিযাপন করার জন্য। দেখবেন কতো বিত্তশালীরা রাস্তার পাশে ফুটপাতে, পাহাড়ের ঢালে, বাথরুমের সামনে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছে। এখানে আশেপাশে টয়লেটের সংখ্যা খুবই সীমিত তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
■ মুযদালিফায় যখনই পৌছাবেন তখন প্রথম কাজ হলো মাগরিব ও এশার স্বলাত কসর করে পরপর আদায় করা। যদি জামআত করে পড়েন তবে প্রথমে একবার আযান ও তারপর এক ইকামতের পর মাগরিবের ৩ রাকাআত ফরয স্বলাত এবং তার পরপরই ইকামত দিয়ে এশার ২ রাকাআত ফরয জ্বলাত আদায় করবেন। এই দুই জ্বলাতের মাঝখানে কোনো সুন্নাত স্বলাত নেই। এশার স্বলাতের পর এক/তিন রাকাআত বিতর স্বলাত পড়তে পারেন যেহেতু রাসূল (ﷺ) মুক্তিম বা মুসাফির কোন অবস্থায়ও বিতর বাদ দিতেন না। বুখারী-১৬৭৩, ১৬৮৩, মুসলিম-৩০০২
■ যদি এমন হয় মুযদালিফায় পৌঁছার পর এশার জ্বলাতের ওয়াক্ত না হয় তবে অপেক্ষা করতে হবে। আবার যদি প্রচন্ড যানজটের কারণে মধ্যরাতের আগে মুযদালিফায় পৌঁছতে না পারেন, তাহলে পথিমধ্যে কোথাও যাত্রাবিরতি করে অথবা বাসে বসে মাগরিব ও এশার স্বলাত পড়ে নিবেন। বুখারী-১৬৮৩
■ স্বলাত আদায়ের পর আর কোন কাজ নেই। এবার শুয়ে ঘুমিয়ে পরবেন। রাসূল (ﷺ) মুযদালিফার রাতে শুয়ে ঘুমিয়ে আরাম করেছেন। যেহেতু ১০ যিলহজ্জ দিনের বেলায় অনেকগুলো কাজ আছে এবং বেশ পরিশ্রম করতে হবে তাই মুযদালিফার রাতে ঘুমিয়ে বিশ্রাম করা উত্তম।
■ ঘুমানোর পূর্বে বড় জামারায় কংকর নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর সংগ্রহ করে নিতে পারেন। চাইলে ঘুম থেকে উঠে সকালেও কংকর কুড়িয়ে নিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অবশ্য মুযদালিফা থেকে মিনার মধ্যে কোন এক জায়গা থেকে কংকর নিয়েছেন। তাই মুযদালিফা থেকে কংকর নেওয়ায় কোন সমস্যা নেই তবে তা জরুরী মনে না করা ও মুযদালিফার কংকরের বিশেষ গুণ আছে এমন ধারনা পোষন না করা। পরবর্তীতে মিনা থেকে বা হারামের সীমানার ভিতরে যে কোন স্থান থেকে কংকর সংগ্রহ করতে পারবেন। নাসাঈ-৩০৫২
■ ইচ্ছা করলে এখান থেকে জামারাতে পরবর্তী ৩ দিন কংকর নিক্ষেপের জন্য (২১০৩=৬৩) কংকর সংগ্রহ করতে পারেন। তবে সব কংকরই এখান থেকে নেওয়া কোন বিধান মনে না করা, কারণ মিনা থেকেও কংকর সংগ্রহের সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়। যদিও মিনার চেয়ে মুযদালিফায় কংকর সহজলভ্য বেশি। মিনার কিছু জায়গায় অবশ্য কংকর খুঁজে পাওয়া একটু কষ্টকর। তিরমযি-৮৯৭
■ কংকর নিক্ষেপের জন্য সংগৃহিত পাথরের আকার বুটের দানা বা শিমের বিচির মতো হবে। কংকর মোছার বা ধুয়ার কোন নিয়ম হাদীসে পাওয়া যায় না। কিছু অতিরিক্ত কংকর নিবেন কারণ অনেক সময় কংকর হাত থেকে পরে হারিয়ে যেতে পারে। কংকরগুলো একটি ছোট ব্যাগ বা প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষণ করে রাখবেন। যদি মুযদালিফা বা মিনা থেকে কংকর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন তাহলে অন্য কারো কাছ থেকেও কংকর নিতে পারেন। এতে কোন সমস্যা নেই। এভাবে সবাই কংকর এখান থেকে নিলে একদিন মুযদালিফার সব কংকর শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে যদি সংশয় জাগে তবে আশ্বস্ত করতে চাই, এমনটি হবে না! কারণ হজ্জের পর আবার কংকরগুলো মুযদালিফায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মুসলিম-৩০৩১, নাসাঈ-৩০৫৭
■ মুযদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম ওয়াদী মুহাসসির। এটা মুযদালিফার অংশ নয়। তাই এখানে অবস্থান করা যাবে না। এই মুহাসসির এলাকায় আবরাহা রাজার হাতি বাহিনীকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি কংকর নিক্ষেপ করে নাস্তানাবুদ করেছিল। বর্তমানে মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহার করা হয় হজ্জযাত্রী সংকুলান না হওয়ার কারণে। তাই ঐ জায়গাটুকু মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হলেও যেহেতু মৌলিক অর্থে মিনায় পরিনত হয়নি, তাই ঐ অংশের তাবুতে রাত্রিযাপন করলে মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা হয়ে যাবে।
■ মুযদালিফার সীমানার ভিতর এই রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব।
■ বৃদ্ধ, দুর্বল, স্থূলদেহী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিগণ ওজর সাপেক্ষে মধ্যরাতের চাঁদ ডুবার পর মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারেন। অসুস্থ ও দূর্বলদের সাহায্যার্থে তাদের সাথে অভিভাবকরা বা সাহায্যকারীরাও যেতে পারবেন। ওজর ছাড়া মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনায় যাওয়া ঠিক হবে না। চলে গেলে দম দিতে হবে। বুখারী-১৬৭৯, মুসলিম-৩০০৯, ৩০১৯, নাসাঈ-৩০৪৮
■ মুযদালিফায় সুবহে সাদিকে ঘুম থেকে উঠে ফজরের আউয়াল ওয়াক্তেই ফজরের স্বলাত আদায় করবেন। ফজরের দুই রাকাআত সুন্নাত ও দুই রাকাআত ফরয স্বলাত আদায় করবেন। এবার দু'আ-যিক্র করবেন ঠিক যেমন আল্লাহ করতে বলেছেন সূরা-আল বাকারা,২:১৯৮ এবং সূরা-আল আরাফ, ৭:২০৫ আয়াতে। রাসূল(ﷺ) মুযদালিফায় একটি পাহাড়ের পাদদেশে উকুফ করেছেন। ঐ স্থানটি বর্তমানে আল-মাশার আল-হারাম মসজিদের সম্মুখ ভাগে অবস্থিত। মসজিদটি মুযদালিফার ৫নং রোডে অবস্থিত এবং ১২ হাজার মুসল্লী ধারন ক্ষমতা রাখে। কিন্তু রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আমি এখানে উকুফ করলাম তবে মুযদালিফার পুরোটাই উকুফের স্থান।" বুখারী-১৬৮২. মুসলিম-৩০০৭
■ এবার কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঠিয়ে বেশি বেশি তাসবিহ- তাহলীল ও দু'আ-যিক্র করতে থাকুন। এটা দু'আ কবুলের স্থান ও সময়।
■ মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করুন: "সুবহানাল্লাহ” - “আল্লাহ পবিত্রতাময়"। আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করুন: "আলহামদুলিল্লাহ” - "সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য"।
■ কালেমা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করুন: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"- "আল্লাহ ছাড়া (হক) কোনো ইলাহ নেই"।
■ তাকবীরের মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করুন: "আল্লাহু আকবার" "আল্লাহ সবচেয়ে বড়"।
■ এই যিক্রগুলো বারবার পাঠ করতে থাকবেন যতক্ষণ না আকাশ ফর্সা হয়। আপনার পছন্দ মতো অন্য দু'আ-যিকিরও পাঠ করতে পারেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের পূর্বেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন, এটিকেই হাদীসে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বুখারী-১৬৮৪, নাসাঈ-৩০৪৭, আবু দাউদ-১৯৩৮, তিরমযি-৮৯৬