📄 মিনা সম্পর্কিত কিছু তথ্য
মিনার তাবুগুলো স্থায়ী, সারা বছর টাঙ্গানো থাকে কিন্তু ব্যবহার হয় না। শুধু হজ্জের সময় ৫-৬ দিন ব্যবহারের জন্য পরিষ্কার পরিছন্ন করা হয় এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত সৌদি মুয়াল্লিমদের বরাদ্দ দেওয়া হয় হজ্জ ব্যবস্থাপনার জন্য।
৮ যিলহজ্জ মিনার প্রথম দিনে রাস্তাঘাট ও তাবুতে খুব ভিড় থাকে। অনেক লোকজন মিনার প্রথম দিনে দল ছাড়া হয়ে হারিয়ে যায়।
মিনার সকল তাবুতে এয়ার কন্ডিশন/এয়ার কুলার সুবিধা রয়েছে। একটি তাবুতে প্রায় ৪০-৫০ জন হজ্জযাত্রী থাকতে পারে। প্রত্যেকের জন্য হাতের এক কুনুই মাপের ছোট ম্যাট্রেসের বিছানা, বালিশ ও কম্বল দেওয়া থাকে।
টয়লেট ব্যবস্থা খুবই সীমিত/অপর্যাপ্ত। টয়লেটে যাওয়ার জন্য প্রায় সবসময় ৫-১০ জনের পিছনে ২০-৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর এখানে বাথরুমে গোসল করার ব্যবস্থা কোথাও কোথাও আছে আবার কোথাও নেই।
মোবাইল ফোন চার্জ করার জন্য তাবুর খুঁটিতে ২/৩ পিনের মাল্টিপ্লাগ এর ব্যবস্থা আছে অবশ্য যার সংখ্যা খুব সীমিত/অপর্যাপ্ত। হজ্জের আইডি কার্ড ও তাবু কার্ড সবসময় আপনার সাথে রাখা উচিত।
আপনার তাবু নাম্বার, রোডের নাম ও নং এবং জোন নং মনে রাখবেন। কারণ মিনায় হারিয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। মিনার একটি ম্যাপ সংগ্রহ করে তাবুর লোকেশন চিনে রাখুন অথবা গুগল ম্যাপে লোকেশন পিন করে রাখুন।
আপনার সৌদি মুআল্লিম মিনায় তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া তাবুর বাইরে মেইন রোডের পাশে কিছু জায়গায় অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। সেখান থেকে খাবার কিনে খাওয়া যায়।
তাবুর বাইরে কন্টেইনার জারে খাবার পানি পাওয়া যাবে। কিছু বোতলে করে খাবার পানি ধরে রাখুন। পানির সংকট দেখা দেয় অনেক সময়।
হজ্জের সময় মিনায় ও আরাফায় আকাশে হেলিকপ্টার টহল দিতে থাকে। রাস্তায় অনেক গাড়ি থেকে পানি, জুস, লাবান ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয় হাজীদের জন্য। রাস্তায় পুলিশ টহল ও এম্বুলেন্স গাড়ি থাকে অনেক।
হজ্জ পালনের স্থানসমূহের এলাকা অর্থাৎ মিনা, আরাফা ও মুযদালিফা উচু সাইনবোর্ড দ্বারা চিহ্নিত করা থাকে। যেমন মিনায়: Mina starts here, Mina ends here. আরাফায়: Arafah starts here, Arafah ends here.
বর্তমানে মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং মিনায় দুই তলা বিশিষ্ট খাট ও তাবু ব্যবহার শুরু হয়েছে।
এই মিনাতেই ইবরাহীম (আঃ) ঈসমাইল (আঃ) কে যবেহ করতে নিয়ে গিয়েছিলেন ও ইবলিশ শয়তান জামারাত এলাকায় তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছিল।
■ মিনা ৭টি জোনে বিভক্ত এবং মিনায় ৩টি রেল স্টেশন আছে। মিনায় ৩টি সেতু বা ব্রিজ আছে: বাদশাহ খলিদ ব্রিজ ১৫ নং, বাদশাহ আব্দুল্লাহ ব্রিজ ২৫ নং ও বাদশাহ ফয়সাল ব্রিজ ৩৫ নং। মিনার বড় রাস্তাগুলো হলো: বাদশাহ ফয়সাল ৫০ নং রোড, আলজাওহারাত ৫৬ নং রোড, সুক্কল আরব ৬২ নং রোড, কিং ফাহাদ ৬৮ নং রোড।
📄 মিনায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* মিনার তাবুতে জায়গা দখল করা নিয়ে বা এসি সোজা ভালো জায়গা পাওয়ার জন্য একে অন্যের সাথে ঝগড়া ও মনোমালিন্য হয়ে থাকে।
* ইহরাম পরে তাবুর বাইরে গিয়ে অনেকে সিগারেট খায়, সেলফী তুলছে ও অনেকে ভিডিও ব-গ বানাচ্ছে হজ্জ অভিজ্ঞতার।
* তাবুতে অনেকে স্পীকার লাগিয়ে ওয়াজ করেন, দলবদ্ধ হয়ে মিলাদ পড়েন, উচ্চস্বরে দলবদ্ধ যিক্র করেন যা অন্যদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।
* অনেকে মিনায় কসর করে স্বলাত আদায় না করে পূর্ণ স্বলাত আদায় করেন এবং জুমাবার হলে তাবুর ভিতরে খুতবা দিয়ে জুমআর স্বলাত আদায় করেন।
* অনেকে মিনার তাবুর আশেপাশের নিম গাছ বা অন্য গাছের ডাল ভেঙ্গে মিসওয়াক করেন। অনেক পুরুষ মানুষ গিয়ে মহিলা টয়লেট দখল করে বসেন।
* তাবুতে অনেকে আলোচনা করেন; যাদের অনেকেরই ইসলাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই এবং তারা কোনো পীর/সূফি/তরীকার দিকে দাওয়াত দেন।
* তাবুতে অনেকে অনির্ভরযোগ্য দু'আ-অযিফা, ফাযায়েল ও আমলের বিভিন্ন বই পড়েন বা বয়ান করেন যাতে অনেক জাল ও যয়ীফ হাদীস থাকে।
* অনেক তাবুর মধ্যে ২/৩টি গ্রুপ হয়ে যায়। এক গ্রুপ হজ্জের বিষয়ে একরকম ফাতাওয়া দেয় আবার আরেক গ্রুপ অন্যভাবে ফাতাওয়া দেয়। এতে তাবুর মধ্যে সাধারণ মানুষ পড়ে যান দ্বিধা-দ্বন্দ্বে এবং শুরু হয়ে যায় বিভেদ।
* অনেকে সময় কাটানোর জন্য অনর্থক গল্পগুজবে মেতে উঠেন, আশেপাশে ঘুরাঘুরি করেন আবার অনেকে শুধু ঘুমিয়ে সময় কাটান।
* অনেকে মোবাইল ব্রাউজিং করে, চ্যাট করে ও ভিডিও কল করে ঘুরে ঘুরে সময়গুলোকে নষ্ট করেন। অনেকে ফ্রি খাবার সংগ্রহের তালে থাকেন।
* অনেক পুরুষ ঘন ঘন মহিলা তাবুতে গিয়ে তাদের পরিচিত মহিলাদের সাথে দেখা করেন, যা অন্য মহিলাদের পর্দার বেঘাত ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
* অনেক মহিলা তাবুর বাইরে বেপর্দা চলাফেরা করেন ও চিল্লাচিল্লি করে ডাকা- ডাকি করেন ও উচ্চস্বরে কথা বলেন তাবুর ভিতরে।
* অনেকে খাবার পানি দিয়ে ওযু করেন, প্লেট-গ্লাস ধুয়ে খাবার পানির সঙ্কট তৈরি করেন। অনেকে ডাস্টবিনে আবর্জনা না ফেলে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলেন।
* অনেকে মিনা থেকে পাথর ও বালি-মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যান বরকত লাভের আশায় বা তাবিজ বানিয়ে ব্যবহার করার জন্য。
📄 ৯ যিলহজ্জ : আরাফা দিবস
■ ৯ যিলহজ্জে করণীয় : সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফায় গমণ করে দ্বিপ্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা এবং দু'আ, যিকির, ইসতিগফার করা। আরাফায় যোহর-আছর স্বলাত একসাথে পর পর কসর করে আদায় করা এবং সূর্যাস্তের পর আরাফা ত্যাগ করে মুযদালিফায় গমণ করা।
■ এই দিন সবচেয়ে রহমতপ্রাপ্ত দিন কারণ এই দিনে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাশীলতা প্রকাশ করেন। আরাফার ময়দান হারামের সীমানার বাইরে অবস্থিত। আরাফার চর্তুদিকে সীমানা নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক/সাইনবোর্ড রয়েছে। ১০.৪ কি.মি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আরাফা ময়দান। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কি.মি দূরে অবস্থিত আরাফার ময়দান। এই আরাফার ময়দানে রাসূল (ﷺ) তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষন দিয়েছিলেন। আরাফার ময়দান চারপাশে বড় বড় পাহাড়ে ঘেরা, মাঝে অনেকটুকু সমতলভূমি ও ছোটখাটো টিলা পাহাড় আছে। বুখারী-১৭৪০
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক হাদীসে বলেছেন, "হজ্জ হলো আরাফায়"। নাসাঈ-৩০১৬
■ আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "আরাফা দিবস ব্যতীত আর কোনো দিবস নাই যেদিন আল্লাহ তাঁর অধিক বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন এবং এই দিন তিনি বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে বান্দাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, 'তারা কি উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছে/তারা আমার কাছে কী চায়?"। মুসলিম-৩১৭৯, নাসাঈ-৩০০৩
■ ইবলিশ শয়তান এই দিনে মুমিন বান্দাদের আল্লাহকে স্মরণ, দু'আ, যিকির ও ইসতিগফার করতে দেখে সবচেয়ে বেশি হীন ও লাঞ্ছিত হয়ে যায়। শয়তান অত্যধিক ক্রোধান্বিত ও দিশেহার হয়ে যায়।
■ ৯ যিলহজ্জ মিনায় ফজরের স্বলাত আদায়ের পর আরাফার উদ্দেশে রওনা হওয়া সুন্নাত। এসময় একাকি অথবা ছোট দল হয়ে পায়ে হেঁটে আরাফায় যাওয়ার চেয়ে বাসে যাওয়া উত্তম। ফজরের স্বলাতের পর থেকে তাকবীরে তাশরীক পড়া শুরু করবেন এবং ১৩ যিলহজ্জ আসরের জ্বলাত পর্যন্ত পরবেন। প্রতি ফরয স্বলাতের পর উচ্চস্বরে এটি পরবেন: বুখারী-১৬৫৯. মুসলিম-২৯৮৯, আবু দাউদ-১৯১৩
اللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ"।
"আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য"।
বর্তমানে হজ্জযাত্রী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ৯ যিলহজ্জ মধ্যরাত থেকে আরাফায় নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। যদিও এটি সুন্নাতের বিপরীত তবে যেহেতু সমস্যার কারণে এ কাজ করা হয় এবং আপনি যেহেতু হজ্জ ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল তাই এই সুন্নাতটি ছুটে গেলে হজ্জের কোন ক্ষতি হবে না। এমন ক্ষেত্রে মিনায় আর ফজরের স্বলাত পড়া হবে না যাতে কোন সমস্যা নেই।
আরাফার সীমানার ভিতর প্রবেশ করে উত্তম হলো নামিরা মসজিদে ইমামের খুতবা শোনা এবং যোহরের আযানের পর যোহরের আউয়াল ওয়াক্তেই যোহর-আসর স্বলাত কসর করে ইমামের পিছনে জামাআতে আদায় করা। তবে যেহেতু সকল লোকদের মসজিদে নামিরায় একত্রিত হওয়া সম্ভব নয় তাই আরাফার ময়দানের যে কোন স্থানে তাবুতে অবস্থান গ্রহণ করে ছোট ছোট জামাআত করে স্বলাত আদায় করে নেওয়া। মহিলারা একাকি জ্বলাত পড়ে নিবেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; নিশ্চিতভাবে আরাফার সীমানার ভেতরে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে অন্যথায় হজ্জ হবে না। আরাফার ময়দানের চর্তুদিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক বা সাইনবোর্ড রয়েছে যা আপনাকে অবস্থান নির্ণয়ে সাহায্য করবে। নামিরা মসজিদের সামনের দিকের কিছু অংশ আরাফার সীমানার বাইরে, তাই সেখানে সবসময় অবস্থান করা যাবে না। আরাফার ময়দানে প্রবেশের পর যদি ভুলক্রমে আরাফার সীমানার বাইরে চলে যাওয়া হয় বা কোন কারণে যদি আরাফার সীমানার বাইরে যেতে হয় তবে সূর্যাস্তের পূর্বেই আবার আরাফার সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে হবে। ইবনে মাজাহ-৩০১২
এখানে স্বলাত আদায়ের নিয়ম হলো; যোহরের আউয়াল ওয়াক্তেই এক আযান ও দুই ইকামাতে যথাক্রমে যোহর (২ রাকাআত ফরয) ও আসর (২ রাকাআত ফরয) কসর করে পর পর আদায় করা। এই দুই স্বলাতের আগে, মধ্যে ও পরে কোনো সুন্নাত বা নফল জ্বলাত না পড়া। বুখারী-১৬৬২, আবু দাউদ-১৯১৩
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এভাবেই মক্কার মুকিম ও মুসাফিরদের নিয়ে কসর করে পরপর স্বলাত আদায় করেছেন। তিনি মুকিম ও মুসাফিরদের জন্য আলাদা কোন নিয়মের কথা উল্লেখ করেন নাই। নামিরা মসজিদের ইমামও এই ভাবেই স্বলাত পড়ান। কিন্তু এই স্বলাত দুটি পড়ার বিষয় নিয়ে দেখবেন মতভেদ দেখা দিবে। ৩ ধরনের ফাতাওয়া শুনবেন - ১. এই দুই স্বলাত পৃথক পৃথক সময়ে (যোহর ও আসরের সময়ে) কসরবিহীন পড়তে হবে, ২. এই দুই স্বলাত পরপর পড়া যাবে তবে কসর করে না, ৩. নামিরা মসজিদের ইমামের সাথে পড়লে পরপর কসর করে আর তাবুতে আলাদা জামআতে করে পড়লে পৃথক পৃথক সময়ে কসর বা কসরবিহীন পড়তে হবে! উপরের তিন পদ্ধতির আমলের দলিল হাদীস থেকে বা রাসূল (ﷺ) ও সাহাবীদের করা কোন আমলকে দলিল হিসাবে কেউ দেখাতে পারবেন না বরং তারা তাদের ইমামদের ফিকহী মাসআলার আলোকে ফিকহের কিতাব থেকে আমল করার দলিল দিবেন। ইতিপূর্বে রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহর আলোকে হজ্জ করার জন্য করণীয় কি তা আপনাকে জানিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি প্রত্যেকের সুচিন্তিত বিবেক ও জ্ঞানের উপর অর্পণ করে দিলাম। আরাফার দিনটি যদি জুমআর দিন হয় তবে জুমআর স্বলাত পড়ার দরকার নেই তবে কসর জ্বলাত আদায় করতে হবে। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৬১৭
আরাফার দিবসের সিয়াম/রোজা পূর্বের এক বছরের ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। তবে এ রোজা হাজীদের জন্য নয়, বরং যারা হজ্জ করতে আসেননি তাদের জন্য। তাই আপনার পরিবারবর্গকে দেশে এই দিনে রোজা রাখতে বলবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি। তিনি সবার সম্মুখে দুধ/শরবত পান করেছেন। বুখারী-১৬৫৮, ১৬৬১
আরাফার ময়দানে যে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়েও থাকতে পারেন। আরাফার ময়দানে এই অবস্থান করাকে বলা হয় উকুফে আরাফাহ। আরাফার দিনে জাবালে আরাফাহ পাহাড়ে উঠার বিষয়ে বিশেষ কোন ফযীলত হাদীসে কোথাও পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবশ্য জাবালে আরাফার এর পাশ্ববর্তী কোন এক জায়গায় উকুফ করেছেন কিন্তু তিনি বলেছেন, "আমি এখানে অবস্থান করলাম, কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকুফের স্থান"। আবু দাউদ-১৯০৭, বুখারী-১৬৬৪
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গেলে (অর্থাৎ যোহর-আছর স্বলাতের পর) অত্যন্ত বিনয়ী ও তাকওয়ার সাথে আল্লাহর কাছে দু'আ করা শুরু করবেন। এখন আল্লাহর কাছে আপনার আবেদন জানানোর সময়। এই দু'আ করার জন্যই আরাফায় আসা। কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত সামনে উচু করে প্রসারিত করে বগল উন্মুক্ত করে চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, ক্ষমা চান, দয়া কামনা করুন, আপনার মনের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ তাআলার কাছে ব্যক্ত করুন। আল্লাহর গুনবাচক নামসমূহ, দুরূদ, তালবিয়াহ, তাকবীর, যিক্র, ইসতিগফার ও দু'আ করতে থাকুন বেশি বেশি করে। প্রথমে নিজের জন্য ও পরে পরিবার-আত্মীয়স্বজনদের জন্য অতঃপর প্রতিবেশী-পরিচিতজনদের জন্য এবং শেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দু'আ করবের। দু'আ শেষে আমিন বলুন। দু'আর সুন্নাহ পদ্ধতি ও আদাব পৃষ্ঠা নং: ১০৩ থেকে দেখে নিন। নাসাঈ-৩০১১, তিরমিযী-৮৮৩, ৩৬০৩
সব দু'আ-যিক্র যে আরবীতে করতে হবে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, বাংলা ভাষাতেই দু'আ করবেন। তবে মনে রাখবেন; আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে দু'আ করা সুন্নাত নিয়ম এর অর্ন্তভূক্ত নয়। এতে অন্যদের মনযোগ নষ্ট হয়। দু'আ করবেন আবেগ ও মিনতির সাথে চুপে চুপে মনে মনে। আরাফায় দু'আর সময় ওযু অবস্থায় থাকা উত্তম তবে ওযুবিহীন অবস্থায় থাকলেও সমস্যা নেই। এই বইয়ের শেষে পৃষ্ঠা নং: ১৯১-২০৫ থেকে কুরআন ও হাদীস এর বেশ কিছু দু'আ সংযোজন করা হয়েছে যা আরাফার ময়দানে পড়তে পারেন। যে সব মহিলারা ঋতু অবস্থায় থাকবেন তারাও অন্যান্য হাজীদের মত দু'আ-যিকর করবেন, তারা শুধু স্বলাত আদায় করা, কুরআন স্পর্শ করা ও কাবা তাওয়াফ করা থেকে বিরত থাকবেন। সূরা আল আরাফ-৭:২০৫
■ আরাফার দিনের সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ দু'আ এটি যা পূর্ববর্তী নবীগণও পড়েছেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرِ
"লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াহদাহু, লা শারীকালাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন কুদীর।"
"আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ের উপর সর্বশক্তিমান"। তিরমিযী-৩৫৮৫
■ ৯ যিলহজ্জ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরয। দুপুরের সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে আরাফাতে অবস্থানের প্রকৃত সময় শুরু হয়। আরাফার ময়দানে কেউ প্রবেশ করলে অতঃপর সেখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। কারো পক্ষে হতে অন্য কাউকে আরাফায় পাঠানো যাবে না, প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বশরীরে আরাফায় উপস্থিত হতে হবে। যদি কেউ সূর্যাস্তের আগে আরাফা ত্যাগ করে চলে যায় তবে তাকে কাফফারা স্বরুপ একটি দম (পশু জবেহ) দিতে হবে।
■ কোন কারণবশত যদি আরাফায় দিনের বেলায় পৌঁছা না যায় এবং সন্ধ্যার পর রাতের বেলায় পৌঁছায় তবে রাতের কিছু অংশ আরাফায় অবস্থান করে সূর্য উদয়ের পূর্বে মুযদালিফায় গিয়ে রাতের বাকি অংশ যাপন করলে হজ্জ হয়ে যাবে। তবে এজন্য কোন দম দিতে হবে না। কমপক্ষে সূর্য উদয়ের পূর্বে আরাফায় পৌঁছাতে না পারলে হজ্জ বাতিল। নাসাঈ-৩০১৬.৩০৩৯, তিরমিযী-৮৮৯, ইবনে মাজাহ-৩০১৫
■ আরাফার ময়দানে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের স্বলাত আদায় না করেই মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। মাগরিব স্বলাত আদায় করবেন মুযদালিফায় গিয়ে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনটাই করেছেন। অনেকে সূর্যাস্ত হওয়ার একটু আগেই রাস্তার যানজট কাটানোর জন্য আগেই বাসে উঠে রওনা হয়ে যান আর আরাফার ময়দান পার হতে হতে সূর্যাস্ত করেন। ইবাদতের বিষয়ে এমন শর্টকাট, চটজলদি বা চালাকি বেশি খাটানো উচিত হবে না। আরাফার প্রতিটি সময় গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সেহেতু এখানে একটু বেশি সময় নেওয়াই ভালো। তাই আগেভাগে এজেন্সিকে বলে রাখা উত্তম তারা যেন এমন কাজ না করে। বুখারী-১৬৬৮, নাসাঈ- ৩০১৯
📄 আরাফা সম্পর্কিত কিছু তথ্য
■ আরাফার তাবুগুলো অস্থায়ী, শুধুমাত্র একদিনের জন্য টাঙ্গানো হয়। আরাফার তাবুগুলোতেও এয়ার কুলার ব্যবস্থা থাকে। আরফার তাবু আকারে বড় হয় তবে মিনার তাবুর মতো মজবুদ নয়। তাবুতে ম্যাট্রেস বিছানা বা কার্পেট থাকতে পারে। আরাফার তাবুর চারদিকে অনেক নিম গাছ ও আরও অন্যান্য গাছ রয়েছে, এই গাছগুলো ভালো শীতল ছায়া দেয়। একটি কথা প্রচলিত যে; ১ লাখ নিম গাছ চারা নাকি বাংলাদেশ থেকে উপহারস্বরূপ সৌদিকে দেওয়া হয়েছিল আরাফার ময়দানে রোপন করার জন্য!
■ এখানেও টয়লেট ও ওযুর ব্যবস্থা খুবই সীমিত/অপর্যাপ্ত। টয়লেটে যাওয়ার জন্য প্রায় সবসময় ৫-১০ জনের পিছনে ২০-৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখানে মোবাইল ফোনে চার্জ দেয়ার ব্যবস্থা খুবই সীমিত।
■ সৌদি মুআল্লিম আরাফায় দুই/তিনবেলা খাবার দিবেন। এছাড়াও এখানে তাবুর বাইরে রোডের পাশে অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। রাস্তায় অনেক ট্রাক বা গাড়ি থেকে বিনামূল্যে খাবার/পানি বিতরণ করা হয়। ইচ্ছা করলে এই খাবার নেওয়া যায়। তবে ধাক্কাধাক্কি করে এসব খাবার আনতে না যাওয়াই উত্তম কারণ এতে আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
■ মিনা থেকে আরাফা ও মুযদালিফায় যাওয়ার জন্য শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়। রেলওয়ের প্লাটফরম সবসময়ই হজ্জযাত্রীদের ভিড়ে জনাকীর্ণ থাকে। সিঁড়ি বেয়ে রেলওয়ের প্লাটফরমে উঠতে হয়, এতে ধাক্কাধাক্কিতে অনেকে আহত হন।
■ হাজীরা যেদিন আরাফায় থাকেন সেদিন সকাল বেলা কাবা ঘরের গিলাফ বা চাদর পরিবর্তন করে নতুন গিলাফ লাগানো হয়। বছরে সবসময় এই দিনেই একবার এই গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। হাজীরা হজ্জ শেষে কাবা তাওয়াফ করতে এসে নতুন গিলাফে বাইতুল্লাহেকে দেখতে পায়。