📄 হজ্জের ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত বিষয়ে সচেতনতা
■ মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন মত ও দল বিভক্তির কারণে লক্ষ্য করা যায় হজ্জযাত্রীরা হজ্জের ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত বিষয়গুলো যার যার দলের ফিকহী মাসআলার আলোকে পালন করছেন। উদাহরণ স্বরুপ; মিনায় ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ রাতে অবস্থান করা; কিছু ফোকাহা বলছেন এটা ওয়াজিব! আবার কিছু ফোকাহা বলছেন এটা সুন্নাত! আবার সাফা-মারওয়া সাঈ করা কিছু ফোকাহা বলছেন ফরয আবার কেউ বলছেন ওয়াজিব!
■ এর ফলে সাধারণ হজ্জযাত্রীরা যারা হজ্জ সম্পর্কে খুব বেশি পড়াশোনা করেননি তারা দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যান এবং তারা যে এজেন্সির সাথে হজ্জ করতে এসেছেন অন্ধের মতো তাদের সবকিছু পালন করেন। হাজীদের উদ্দেশ্যে বার্তা হলো; এটা আপনার হজ্জ, আপনার ফরয ইবাদাত, আপনি অর্থ ব্যয় করেছেন, হয়তোবা জীবনে একবারই এটা পালন করবেন.. ধরুন, হজ্জ পালন করে আসার পর জানতে পারলেন হজ্জে আপনি একটি বিধান লঙ্ঘন/ভুল করেছেন, তখন আপনার কেমন লাগবে? এজন্য কি উত্তম নয় নিজে জ্ঞানার্জন করা ও সর্তকতা অবলম্বন করা ও নিরাপদ মাসআলা অনুসরণ করা?
■ এই বইয়ের শুরুতে বলেছিলাম, হজ্জ হতে হবে রাসূল (স) ও সাহাবীদের মতো যার বর্ণনা হাদীস গ্রন্থসমূহের সুস্পষ্ট বিদ্যমান। তাই হজ্জ পালনের আগে হজ্জ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা জরুরী। হজ্জ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বই থেকে জানুন এবং সে বইকে বিশুদ্ধ হাদীসের দলিলের আলোকে মিলিয়ে যাচাই করুন। অন্ধের মতো আমার বই বা কোন বই পড়ে অনুসরণ করবেন না। আপনার বিবেক, জ্ঞান ও বিচক্ষণতা দিয়ে সঠিক উপায়ে হজ্জ পালন করার চেষ্টা করুন।
■ হজ্জে যাওয়ার আগে হজ্জে কি কি কর্মকান্ড সম্পাদন করতে হবে সে সম্পর্কে মনে মনে নিশ্চিত হতে হবে। হজ্জের কোন গুরুত্বপূর্ন আমল আপনার জ্ঞান/বুঝ অনুসারে যদি এজেন্সি/আমীরের সাথে না মিলে বা সঠিক মনে না হয় তবে সেক্ষেত্রে প্রথমত এজেন্সিকে হিকমতের সাথে প্রশ্ন ও নসীহত করতে হবে এবং সর্বশেষ প্রয়োজনে আমীরের আনুগত্য আদবের সাথে পরিহার করে নিজ জ্ঞান অনুসারে আমল করতে হবে। ইনশাআল্লাহ আপনাকে কেউ কোন বিধান পালন করার জন্য ওখানে চাপ/জোর প্রদান করবে না। তবে কোন বিষয় নিয়ে এজেন্সির সাথে কথা বলতে গিয়ে বিরোধ বা কথা কাটাকাটি করা যাবে না।
■ মক্কা ও মদীনায় আপনার নিজ জ্ঞান ও বিবিধ মাসআলা সঠিক কি না তা প্রশ্ন করে যাচাই করে নেওয়ার পন্থা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। মক্কা ও মদীনায় বেশ কিছু ইসলামিক জ্ঞান আদান-প্রদান বুথ পাবেন যেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী বিদ্বান আলেম ব্যক্তি পাবেন যাদেরকে প্রশ্ন করে আপনি আপনার মনের সন্দেহ দূর করতে পারবেন। তাঁরা আপনার সাথে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস অনুসারেই কথা বলবেন এবং বিভিন্ন মাযহাবের ইমামদের মতামত উল্লেখ করে এর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে যথার্থ ও উত্তম তাও বলে দিবেন।
■ আপনি যদি নিজ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হজ্জের কোন বিধানে কোন ভুল করে ফেলেন, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং সে ভুল ওয়াজিব পর্যায়ের হলে কাফফারা হিসাবে একটি দম দিয়ে দিবেন। আল্লাহ তাআলা আপনার মনের খবর জানেন - আপনি যে এখলাসের সাথে সঠিক নিয়মে সবকিছু করতে চেয়েছিলেন এবং আপনার জ্ঞান অনুসারে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন আল্লাহ তা জানেন। তাই আপনি যদি একনিষ্ঠভাবে ক্ষমা চান তাহলে ইনশা-আল্লাহ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন, কারণ তিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।
📄 ৮ যিলহজ্জ : তারবিয়াহ দিবস
■ ৮ যিলহজ্জে করণীয়: সূর্যোদয়ের পর হোটেল (মক্কা/আজিজিয়া/শির্শা) থেকে হজ্জের ইহরাম করে যোহরের পূর্বে মিনায় যাওয়া। মিনার তাবুতে দিন ও রাত্রি যাপন করা এবং পরবর্তী ৫ ওয়াক্ত স্বলাত মিনায় কসর করে আদায় করা। ইবনে মাজাহ-৩০০৪
■ ৮ যিলহজ্জ ইহরাম বাঁধার আগে আপনার ব্যাগ গুছিয়ে নিবেন। ছোট একটি ব্যাগ নিবেন যাতে সহজেই ব্যাগটি বহন করতে পারেন। কারণ এই ব্যাগ নিয়ে বেশ কয়েক মাইল হাঁটতেও হতে পারে। হোটেলে বড় লাগেজে মূল্যবান জিনিসপত্র ও অতিরিক্ত টাকা-পয়সা রেখে তালা দিয়ে ঘরে রেখে যাবেন অথবা সৌদি মুআল্লিম অফিসে জমা দিয়ে রশিদ/মেমো নিয়ে রাখবেন।
■ ৮ যিলহজ্জ ইহরামের কাপড় পরিধানের পূর্বে সাধারণ পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে ফেলবেন নখ কাটা, লজ্জাস্থানের চুল পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা। পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো করা মুস্তাহাব। উক্ত কাজগুলো অবশ্য ১ যিলহজ্জ এর আগে সেরে নিতে হবে। ইহরামের কাপড় পরার আগে গোসল করবেন, আর যদি গোসল করা সম্ভব না হয় তাহলে ওযু করবেন। ঋতুবতী মহিলারা গোসল করে ন্যাপকিনসহ সাধারণ কাপড় পরে নিবেন এবং হজ্জ এর সকল বিধিবিধান পালন করবেন। তবে ঋতু শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুধু মসজিদে প্রবেশ, কুরআন স্পর্শ, স্বলাত পড়া ও তাওয়াফ করা যাবে না। ঋতু শেষ হলে তাওয়াফ ও সাঈ করবেন ও স্বলাত পড়বেন। মুসলিম-২৭৯৯, নাসাঈ-২৭৬২
■ পুরুষরা ইহরামের কাপড় পরার আগে চুলে তেল বা তালবীদ দিতে পারেন এবং শরীরে, মাথায় ও দাড়িতে সুগন্ধী ব্যবহার করতে পারেন; তবে ইহরাম বাঁধার পর পারবেন না। সুগন্ধী যেন আবার ইহরামের কাপড়ে না লাগে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লেগে গেলে সে জায়গা ভালো করে ধুয়ে ফেলবেন। মহিলারা কখনই কোনো অবস্থাতেই সুগন্ধী ব্যবহার করবেন না। মহিলাদের সুগন্ধী ব্যবহার করে মসজিদে ও ঘরের বাইরে যাওয়া হারাম। বুখারী-১৫৩৬
■ মহিলারা মুখমন্ডল এবং হাতের কব্জি খোলা রাখবেন। নেকাব দ্বারা মুখমন্ডল সবসময় ঢেকে রাখা যাবে না। তবে গায়ের মাহরাম পুরুষদের সামনে বা মাঝে গেলে তখন চাইলে মুখমন্ডল আবৃত করতে পারবেন। আবু দাউদ-১৮২৫
■ পুরুষরা ইহরামের কাপড় সুবিধামত এমনভাবে পরবেন যাতে নাভির উপর থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত আবৃত হয়ে যায় এবং ইহরামের কাপড় দিয়ে কাঁধ ও শরীর ঢেকে যায়। ইহরাম বাঁধার জন্য সেলাইযুক্ত বেল্ট ব্যবহার করা যাবে।
■ উত্তম সুন্নাহ পদ্ধতি হলো কোন ফরয জ্বলাতের পূর্বে ইহরামের কাপড় পরা ও ফরয স্বলাত আদায় করা এবং সাওয়ারীর উপর উঠে তারপর ইহরাম করা তথা হজ্জ শুরু করার নিয়ত করা বা স্বীকৃতি দিয়ে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করা। আর কোন ফরয স্বলাতের সময় না হলে ওযু করে ইহরামের কাপড় পরে তাহিয়্যাতুল ওযুর ২ রাকাআত জ্বলাত পড়া যাবে। এবং উক্ত স্বলাতের পর ইহরাম করা মুস্তাহাব। যদি কোন ফরয জ্বলাতের পর ইহরাম করা হয়, তাহলে আর আলাদা কোন স্বলাতের প্রয়োজন নেই। অন্য সময় ইহরাম বাঁধলে ২ রাকাআত স্বলাত আদায় করা যেতে পারে। যদি কোন সমস্যা বা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে ওযু করা বা স্বলাত আদায় করার সুযোগ না পাওয়া যায় তাতেও কোন সমস্যা নেই। শুধু ইহরামের কাপড় পরে হজ্জ শুরু করার নিয়ত বা স্বীকৃতি দিয়ে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করা যাবে।
■ রাসূল (ﷺ) এর পালনীয় নিয়ম অনুযায়ী সুন্নাহ হলো ৮ যিলহজ্জ মক্কায় ফজরের স্বলাত আদায় করার পর সকালে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা। কিন্তু বর্তমানে ২৫- ৩০ লক্ষ হজ্জযাত্রী যখন সকাল বেলায় ৯-১০ হাজার গাড়ি/বাস নিয়ে মিনার দিকে ৭-৮ কি.মি রাস্তা যাওয়ার চেষ্টা করেন তখন কেমন যানজট আর অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তা সহজেই অনুমেয়।
■ তাই সৌদি মুআল্লিমগণ সৌদি আলেমগণের ফাতাওয়ার আলোকে ৮ যিলহজ্জ মধ্যরাত হতেই হজ্জযাত্রীদের মিনায় নিয়ে যাওয়া শুরু করেন। এই কাজটি সুন্নাতের খেলাফ তবে যেহেতু ওজরবশত করা হচ্ছে সেহেতু হজ্জের কোন ক্ষতি হবে না। মধ্যরাত থেকে পরবর্তী দিন সকাল পর্যন্ত হজ্জযাত্রীদের ধীরে ধীরে মিনায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাই জেনে নিন কখন মিনায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন আপনার সৌদি মুআল্লিম। সে অনুযায়ী ইহরাম বাঁধার প্রস্তুতি নিবেন। যাত্রা শুরু করার ২-৩ ঘন্টা আগে ইহরাম বাঁধার কাজ শুরু করা উত্তম।
■ মক্কা/মিনার কাছাকাছি আপনার হোটেল বা বাসা থেকে ইহরামের কাপড় পরবেন এবং এখান থেকেই আপনি হজ্জের জন্য ইহরাম করবেন। এমনটি করা ওয়াজিব। ইহরাম করার জন্য আপনাকে এখন কোন মীকাতে যেতে হবে না। হারামের সীমানার ভিতরের স্থানীয় লোকেরাও তাদের নিজ নিজ আবাসস্থল থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম করবেন। শুধুমাত্র যারা মীকাতের বাইরে থেকে আসবেন তারা মীকাত থেকে হজ্জের ইহরাম করে প্রবেশ করবেন। বুখারী-১৫২৪
■ ইহরামের কাপড় পরে যখন গাড়ি/বাসে উঠে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া শুরু করবেন তখন হজ্জের ইহরাম করবেন অর্থাৎ হজ্জ শুরু করার মৌখিক স্বীকৃতি বা নিয়ত করবেন। এমনকি ঋতুবতী মহিলারাও গোসল করে ন্যাপকিন বেঁধে হজ্জের ইহরাম করবেন।
■ হজ্জের ইহরাম করতে বলবেন:
لَبَّيْكَ حَجَّا
"লাব্বাইকা হাজ্জাহ"-
"আমি হজ্জ করার জন্য হাজির"।
■ এবার স্বশব্দে তাওহীদ সম্বলিত তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন এবং ১০ যিলহজ্জ জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়াহ পাঠ করবেন।
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
"লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক"।
"আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, তোমার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নেয়ামত তোমারই এবং রাজত্বও তোমারই, তোমার কোনো শরীক নেই"। বুখারী-১৫৪৯, মুসলিম-২৭০১, তিরমিযী-৮২৬
■ হজ্জ সম্পন্ন করতে না পারার ভয় থাকলে (যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা বা অসুস্থতার কারণ দেখা দেয়) তবে এই দু'আটি পাঠ করবেন: তিরমিযী-৯৪১
فَإِنْ حَبَسَنِي حَابِسٌ فَمَحِلِّي حَيْثُ حَبَسْتَنِي
"ফাইন হাবাসানী হা-বিসুন, ফা মাহিলী হায়ছু হাবাসতানি"।
"যদি কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হই, তাহলে যেখানে তুমি আমাকে বাধা দিবে, সেখানেই আমার হালাল হওয়ার স্থান হবে"। আবু দাউদ-১৭৭৬
■ তালবিয়াহ হালকা উচ্চস্বরে পাঠ করা উত্তম। তবে তালবিয়াহ খুব উচ্চস্বরে অথবা সমস্বরে পাঠ করবেন না যা অন্যদের অসুবিধার কারণ হয়। আর মহিলারা তালবিয়াহ পাঠ করবেন নিচু স্বরে অথবা মনে মনে। তালবিয়াহ বেশি বেশি পড়া মুস্তাহাব। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, ওজু, বে-ওজু; সর্বাবস্থায় তালবিয়াহ পাঠ করা যায়। এখন আপনার হজ্জের ইহরাম করা হয়ে গেছে, এই ইহরাম করার কাজটি ছিল ফরয।
■ মনে রাখবেন এখন আপনি ইহরাম করা অবস্থায় আছেন। এখন আপনার উপর ইহরামের সকল বিধি-বিধান প্রযোজ্য। ইহরাম অবস্থায় কি কি কাজ অনুমোদিত আর কি কি কাজ নিষিদ্ধ তা পৃষ্ঠা নং: ৫৪ থেকে দেখে মনে রাখবেন।
■ ইহরাম করার পরে ৮ যিলহজ্জ কাবা ঘর তাওয়াফ বা সাফা-মারওয়া সাঈ করার ব্যাপারেও কোনো নির্দেশনা হাদীসে কোথাও পাওয়া যায় না। তাই এমন অতিরিক্ত কিছু ভিত্তিহীন আমল নেকীর আশায় করতে যাওয়া ঠিক হবে না।
■ হজ্জের শুরুতেই ইবলিশ শয়তান খুব সক্রিয় হয়ে যায় ও হাজীদের হজ্জকে নষ্ট করার জন্য সকলের মনে দ্বন্দ্ব, বিভেদ, রাগ, ক্ষোভ, অহংকার, গীবত, বেপর্দা, গোমরাহী, ভ্রষ্টতা ও গায়রে সুন্নাহ কাজে লিপ্ত করতে কুমন্ত্রনা দিতে থাকে।
■ আপনি যখন হজ্জ সফরের জন্য আপনার বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন তখন আপনাকে কিন্তু ৩টি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ব্যাগে নিতে বলা হয়েছিল! ধৈর্য্য, ত্যাগ ও ক্ষমা! আপনার হজ্জকে সফল করার জন্য এখন এই ৩টি বিষয় প্রয়োগ করার খুব বেশি প্রয়োজন পরবে। হজ্জের দিনগুলোতে এজেন্সির বিভিন্ন দলের লোকের সাথে একসাথে থাকতে হয় তাই অনেক সময় অনেক কথা ও কাজে মতপার্থক্য হয়। তাই রাগারাগি বা কথা কাটাকাটি না করে ধৈর্য্যের সাথে চলতে হবে।
■ হজ্জ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কিছু তথ্য আপনাকে জানাতে চাই যাতে আপনি এই সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বুঝতে পারেন। হজ্জের পূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন হজ্জ এজেন্সিগুলো হজ্জের বিভিন্ন সেবা বিষয়ে চুক্তি করেন সৌদি সরকার কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিভিন্ন সৌদি মুআল্লিমের সাথে। তাই এই হজ্জ এজেন্সির কাজের পরিধি সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে অবস্থানকালে এই হজ্জ এজেন্সি হোটেল ভাড়া, ভিসা, বিমান টিকিট এর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যখনই সৌদিআরবে যাবেন তখন এই হজ্জ এজেন্সি আবার সকল বিষয়ের ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ভরশীল সৌদি মুআল্লিমের উপর। বাস সার্ভিস, খাওয়া-দাওয়া, হোটেল, মিনার তাবু ইত্যাদি সৌদি মুআল্লিম এর ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। একজন সৌদি মুআল্লিম ৮/১০টি এজেন্সি ম্যানেজ করেন। তাই অনেক সময় আপনার এজেন্সি তার দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন না সৌদি মুআল্লিমের কারণে। যেমন উদাহরন: সৌদি মুআল্লিম আপনাদের হজ্জ গাইডকে বলবেন, আপনার সকল হাজীদের প্রস্তুত হতে বলেন, মিনায় যাওয়ার বাস আসবে রাত ২টায়। এরপর দেখবেন ৫টা বেজে গেছে কিন্তু বাসের খবর নেই! আপনি দোষ দিবেন গাইডকে, কিন্তু গাইডের কোন কিছু করার নেই। গাইড খুব জোর মুআল্লিমকে একটু ফোন করবেন, খবর নিবেন, একটু অনুরোধ করবেন এই যা।
■ ৮ যিলহজ্জ বাসে করে আপনার এজেন্সি দল সহ মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন এবং আশা করা যায় ১-২ ঘন্টার মধ্যেই তাবুতে পৌছে যাবেন। অনেকে পায়ে হেঁটে প্যডেস্ট্রিয়ান টানেলের (সুরঙ্গ পথ) রাস্তা দিয়ে মিনায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদি তাবু জামারাতের কাছাকাছি হয় ও সাথে পূর্বে হজ্জ করা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক থাকে তবে তার সাথে পায়ে হেঁটে যেতে পারেন। তবে বেশি দূরের পথ পায়ে হেঁটে না যাওয়াই উত্তম, কারণ এতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। রাস্তায় চলতে চলতে তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকবেন। এ সময় অনেক লোক দলছাড়া হয়ে হারিয়ে যায়। তাই সাবধান থাকবেন। তাবুতে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিবেন ও কিছু খাবার গ্রহণ করবেন।
■ মিনায় তাবুতে আউয়াল ওয়াক্তে সকল স্বলাত কসর করে আদায় করতে হবে। এই কসর করা কোন সফরের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি হজ্জের কসর। হজ্জের দিনগুলোতে (৮-১৩ যিলহজ্জ) রাসূল(ﷺ) মক্কার ভিতরের ও মীকাতের বাইরের থেকে আসা লোকদের নিয়ে কসর করে সকল স্বলাত পড়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি মুকিম ও মুসাফিরের মধ্যে স্বলাতের কোন পার্থক্য করেননি অর্থাৎ মক্কার স্থানীয় লোকদের আলাদাভাবে পূর্ণ স্বলাত পড়ার কোন নির্দেশনা দেননি। এমন কসর করে জ্বলাত পড়া সুন্নাত। সকল চার রাকাআত বিশিষ্ট ফরয স্বলাতসমূহকে দুই রাকাআতে সংক্ষিপ্ত করে কসর করে পড়া (মাগরিব ও ফজর ব্যতীত)। মাগরিব ও ফজর যথারীতি তিন ও দুই রাকাআত করে পড়তে হবে। কসর অবস্থায় কোন সুন্নাত/নফল স্বলাত আদায়ের প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং এ সময় সুন্নাত না পড়াই সুন্নাত। মিনায় অবস্থানকালে স্বলাত কাযা করে অথবা দুই ওয়াক্তের স্বলাতকে একত্রে জমা করে পড়া যাবে না। শুধুমাত্র ফজরের দুই রাকাআত সুন্নাত এবং এশার পরে এক/তিন রাকাআত বিতর স্বলাত আদায় করা যাবে। তাবুর ভিতরে সকলে মিলে গ্রুপ জামাআত করা উত্তম অথবা খাইফ মসজিদের কাছাকাছি তাবুর অবস্থান হলে মসজিদে গিয়ে জামাআতে স্বলাত আদায় করা যায়। বুখারী-১৬৫৭, আবু দাউদ-১৯১১, তিরমিযী-৮৮২
কিছু মানুষ উপরের মাসআলার বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন মত পোষন করেন ও তারা মিনায় সকল স্বলাত কসর না করে পূর্ণ আদায় করেন কারণ তারা কসর স্বলাত এর দূরত্ব ও সময়ের বিষয়ে নির্দিষ্ট একটি মত অনুসরণ করেন। এই বিষয়ে তারা হাদীস থেকে রাসূল (ﷺ) বা সাহাবীদের করা কোন আমলকে দলিল হিসাবে দেখাতে পারেন না বরং তারা তাদের ইমামদের ফিকহী মাসআলার আলোকে আমল করেন। এমন ক্ষেত্রে আপনার জন্য করণীয় কি তার দিকনির্দেশনা ইতিপূর্বে দিয়ে দিয়েছি। আপনি যদি সুন্নাহর আলোকে রাসূল (ﷺ) বা সাহাবীদের মতো হজ্জ করতে চান তবে প্রয়োজনে কসরবিহীন জামাআত পরিত্যাগ করে একাকী বা কয়েকজনে মিলে কসর করে জামাআত করে স্বলাত আদায় করবেন। বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে দন্দ্ব বা কথা কাটাকাটি না করে হিকমত ও বিনয়ের সাথে নিজ নিজ আমল পালন করবেন।
৯ যিলহজ্জ সূর্যোদয় পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করা সুন্নাত। তারপর আরাফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে। মিনায় অবস্থান করে স্বলাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলিল, ইসতিগফার, দু'আ ও যিক্র করা ছাড়া আর বিশেষ কোন কাজ নেই। তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন। মিনায় অবস্থান করা সাদা-সিধে জীবন যাপনের প্রতীক। তাবুর মধ্যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অথবা গল্পগুজব ও ঘুরাঘুরি না করে মিনার এই মূল্যবান সময়গুলোকে কাজে লাগানো উত্তম।
ইহরাম অবস্থায় ইহরামের কোন বিধান লঙ্ঘন হলে পরবর্তীতে ফিদইয়া দিতে হবে এবং হজ্জ সম্পাদনে বাধাপ্রাপ্ত হলে বা কোন কারনে হজ্জ সম্পাদন শেষ না করতে পারলে সে কসর/হলকু করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে। পরবর্তীতে আবার নতুন করে হজ্জ করবে。
📄 মিনা সম্পর্কিত কিছু তথ্য
মিনার তাবুগুলো স্থায়ী, সারা বছর টাঙ্গানো থাকে কিন্তু ব্যবহার হয় না। শুধু হজ্জের সময় ৫-৬ দিন ব্যবহারের জন্য পরিষ্কার পরিছন্ন করা হয় এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত সৌদি মুয়াল্লিমদের বরাদ্দ দেওয়া হয় হজ্জ ব্যবস্থাপনার জন্য।
৮ যিলহজ্জ মিনার প্রথম দিনে রাস্তাঘাট ও তাবুতে খুব ভিড় থাকে। অনেক লোকজন মিনার প্রথম দিনে দল ছাড়া হয়ে হারিয়ে যায়।
মিনার সকল তাবুতে এয়ার কন্ডিশন/এয়ার কুলার সুবিধা রয়েছে। একটি তাবুতে প্রায় ৪০-৫০ জন হজ্জযাত্রী থাকতে পারে। প্রত্যেকের জন্য হাতের এক কুনুই মাপের ছোট ম্যাট্রেসের বিছানা, বালিশ ও কম্বল দেওয়া থাকে।
টয়লেট ব্যবস্থা খুবই সীমিত/অপর্যাপ্ত। টয়লেটে যাওয়ার জন্য প্রায় সবসময় ৫-১০ জনের পিছনে ২০-৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর এখানে বাথরুমে গোসল করার ব্যবস্থা কোথাও কোথাও আছে আবার কোথাও নেই।
মোবাইল ফোন চার্জ করার জন্য তাবুর খুঁটিতে ২/৩ পিনের মাল্টিপ্লাগ এর ব্যবস্থা আছে অবশ্য যার সংখ্যা খুব সীমিত/অপর্যাপ্ত। হজ্জের আইডি কার্ড ও তাবু কার্ড সবসময় আপনার সাথে রাখা উচিত।
আপনার তাবু নাম্বার, রোডের নাম ও নং এবং জোন নং মনে রাখবেন। কারণ মিনায় হারিয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। মিনার একটি ম্যাপ সংগ্রহ করে তাবুর লোকেশন চিনে রাখুন অথবা গুগল ম্যাপে লোকেশন পিন করে রাখুন।
আপনার সৌদি মুআল্লিম মিনায় তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া তাবুর বাইরে মেইন রোডের পাশে কিছু জায়গায় অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। সেখান থেকে খাবার কিনে খাওয়া যায়।
তাবুর বাইরে কন্টেইনার জারে খাবার পানি পাওয়া যাবে। কিছু বোতলে করে খাবার পানি ধরে রাখুন। পানির সংকট দেখা দেয় অনেক সময়।
হজ্জের সময় মিনায় ও আরাফায় আকাশে হেলিকপ্টার টহল দিতে থাকে। রাস্তায় অনেক গাড়ি থেকে পানি, জুস, লাবান ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয় হাজীদের জন্য। রাস্তায় পুলিশ টহল ও এম্বুলেন্স গাড়ি থাকে অনেক।
হজ্জ পালনের স্থানসমূহের এলাকা অর্থাৎ মিনা, আরাফা ও মুযদালিফা উচু সাইনবোর্ড দ্বারা চিহ্নিত করা থাকে। যেমন মিনায়: Mina starts here, Mina ends here. আরাফায়: Arafah starts here, Arafah ends here.
বর্তমানে মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং মিনায় দুই তলা বিশিষ্ট খাট ও তাবু ব্যবহার শুরু হয়েছে।
এই মিনাতেই ইবরাহীম (আঃ) ঈসমাইল (আঃ) কে যবেহ করতে নিয়ে গিয়েছিলেন ও ইবলিশ শয়তান জামারাত এলাকায় তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছিল।
■ মিনা ৭টি জোনে বিভক্ত এবং মিনায় ৩টি রেল স্টেশন আছে। মিনায় ৩টি সেতু বা ব্রিজ আছে: বাদশাহ খলিদ ব্রিজ ১৫ নং, বাদশাহ আব্দুল্লাহ ব্রিজ ২৫ নং ও বাদশাহ ফয়সাল ব্রিজ ৩৫ নং। মিনার বড় রাস্তাগুলো হলো: বাদশাহ ফয়সাল ৫০ নং রোড, আলজাওহারাত ৫৬ নং রোড, সুক্কল আরব ৬২ নং রোড, কিং ফাহাদ ৬৮ নং রোড।
📄 মিনায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* মিনার তাবুতে জায়গা দখল করা নিয়ে বা এসি সোজা ভালো জায়গা পাওয়ার জন্য একে অন্যের সাথে ঝগড়া ও মনোমালিন্য হয়ে থাকে।
* ইহরাম পরে তাবুর বাইরে গিয়ে অনেকে সিগারেট খায়, সেলফী তুলছে ও অনেকে ভিডিও ব-গ বানাচ্ছে হজ্জ অভিজ্ঞতার।
* তাবুতে অনেকে স্পীকার লাগিয়ে ওয়াজ করেন, দলবদ্ধ হয়ে মিলাদ পড়েন, উচ্চস্বরে দলবদ্ধ যিক্র করেন যা অন্যদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।
* অনেকে মিনায় কসর করে স্বলাত আদায় না করে পূর্ণ স্বলাত আদায় করেন এবং জুমাবার হলে তাবুর ভিতরে খুতবা দিয়ে জুমআর স্বলাত আদায় করেন।
* অনেকে মিনার তাবুর আশেপাশের নিম গাছ বা অন্য গাছের ডাল ভেঙ্গে মিসওয়াক করেন। অনেক পুরুষ মানুষ গিয়ে মহিলা টয়লেট দখল করে বসেন।
* তাবুতে অনেকে আলোচনা করেন; যাদের অনেকেরই ইসলাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই এবং তারা কোনো পীর/সূফি/তরীকার দিকে দাওয়াত দেন।
* তাবুতে অনেকে অনির্ভরযোগ্য দু'আ-অযিফা, ফাযায়েল ও আমলের বিভিন্ন বই পড়েন বা বয়ান করেন যাতে অনেক জাল ও যয়ীফ হাদীস থাকে।
* অনেক তাবুর মধ্যে ২/৩টি গ্রুপ হয়ে যায়। এক গ্রুপ হজ্জের বিষয়ে একরকম ফাতাওয়া দেয় আবার আরেক গ্রুপ অন্যভাবে ফাতাওয়া দেয়। এতে তাবুর মধ্যে সাধারণ মানুষ পড়ে যান দ্বিধা-দ্বন্দ্বে এবং শুরু হয়ে যায় বিভেদ।
* অনেকে সময় কাটানোর জন্য অনর্থক গল্পগুজবে মেতে উঠেন, আশেপাশে ঘুরাঘুরি করেন আবার অনেকে শুধু ঘুমিয়ে সময় কাটান।
* অনেকে মোবাইল ব্রাউজিং করে, চ্যাট করে ও ভিডিও কল করে ঘুরে ঘুরে সময়গুলোকে নষ্ট করেন। অনেকে ফ্রি খাবার সংগ্রহের তালে থাকেন।
* অনেক পুরুষ ঘন ঘন মহিলা তাবুতে গিয়ে তাদের পরিচিত মহিলাদের সাথে দেখা করেন, যা অন্য মহিলাদের পর্দার বেঘাত ও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
* অনেক মহিলা তাবুর বাইরে বেপর্দা চলাফেরা করেন ও চিল্লাচিল্লি করে ডাকা- ডাকি করেন ও উচ্চস্বরে কথা বলেন তাবুর ভিতরে।
* অনেকে খাবার পানি দিয়ে ওযু করেন, প্লেট-গ্লাস ধুয়ে খাবার পানির সঙ্কট তৈরি করেন। অনেকে ডাস্টবিনে আবর্জনা না ফেলে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলেন।
* অনেকে মিনা থেকে পাথর ও বালি-মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যান বরকত লাভের আশায় বা তাবিজ বানিয়ে ব্যবহার করার জন্য。