📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 মসজিদের আদব এবং পালনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ

📄 মসজিদের আদব এবং পালনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ


নিম্নে সংক্ষেপে মসজিদের হক্ব ও আদব এবং মসজিদে পালনীয় ও বর্জনীয় সংক্রান্ত কতিপয় বিষয় আলোচনা করা হলো:
০১. মসজিদের মূল হক্ব আদায় হলো পুরুষরা ফরয স্বলাতসমূহ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করবে। সূরা আন নিসা; ৪:১০৩
০২. মসজিদে প্রত্যেকে ওয়াক্তে উত্তম ও ভালো পোষাক পরিধান করে স্বলাত পড়তে যাওয়া। সুর আল আরাফ: ৭:৩১
০৩. উত্তম হলো পবিত্রতা অর্জন করে মসজিদে প্রশান্তির সাথে ধীরস্থিরভাবে প্রবেশ করা। বুখারী-৬৩৬
০৪. মসজিদে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলে দরুদ ও দুআ পাঠ করে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা এবং বের হওয়ার সময় দরুদ ও দুআ পাঠ করে বাম পা দিয়ে বের হওয়া। মুসলিম-১৫৩৭, নাসায়ী-৭২৯
০৫. মসজিদের হক্ব আদায় তথা মসজিদে প্রবেশের পর ২ রাকাত তাহিয়াতুল মসজিদ স্বলাত পড়ে অতঃপর মসজিদে বসা। বুখারী-৪৪৪, ১১৬৩
০৬. জুমআর খুতবা চলাকালীন সময়েও ২ রাকাত তাহিয়াতুল মসজিদ স্বলাত পড়ে মসজিদে বসা। বুখারী-৯৩০
০৭. মহিলারা যথাযথ পর্দা করে ও সৌন্দর্য্য প্রকাশ না করে মসজিদে যাওয়া। সুরা নূরঃ ২৪:৩০, সূরা আহযাব: ৩৩:৩৩
০৮. কোন মহিলা মসজিদে আসতে চাইলে (এমনকি রাতে) তাকে মসজিদে আসতে অনুমতি দেওয়া। বুখারী-৮৬৫, ৮৭৩
০৯. মসজিদে ঢুকে যথাসম্ভব সামনের কাতারে যেখানে খালি জায়গা আছে সেখানে অবস্থান গ্রহন করা। আবু দাউদ-১১০৮
১০. মসজিদে জামাতের ইকামত হয়ে গেলে আর কোন স্বলাত (নফল, সুন্নত) নেই, প্রয়োজনে সুন্নত ছেড়ে জামাতে শামিল হওয়া বাঞ্চনীয়। মুসলিম-১৬৭৮, আবু দাউদ- ১২৬৭
১১. মসজিদে স্বলাতের জামাত চলাকালীন প্রয়োজনে মুসল্লীদের কাতারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়েজ। বুখারী-৪৯৩
১২. মসজিদে প্রয়োজনে বাম পাশে, পায়ের নিচে বা কাপড়ের ভাঁজে থুথু ফেলে তা মুছে ফেলা যায়েজ। বুখারী-৪০৫, ৪১৬
১৩. মসজিদে নফল (সুন্নাহ) পড়ার সময় সামনে কোন সুতরা (কাঠদন্ড, টুপি, জুতা, ব্যাগ) বা দেয়াল বা পিলারের সামনে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ানো। আবু দাউদ-৬৯৫
১৪. মসজিদে নফল নামাজরত অবস্থায় মুসল্লা বা সুতরার মধ্য দিয়ে কেউ গমণ করতে গেলে তাকে হাত দিয়ে বাধা দেওয়া। বুখারী-৫০৯, ইবনে মাযাহ-৯৫৪
১৫. মসজিদে জামাতে ফরজ স্বলাতের পর ইমাম ও মুসল্লী উভয়েই জায়গা পরিবর্তন করে নফল (সুন্নত) স্বলাত পড়া। আবু দাউদ-৬১৬, ১০০৬, ইবনে মাযাহ-১৪২৮
১৬. মসজিদে ছোট বাচ্চা ও শিশুকে কোলে ও কাঁধে নিয়ে ইমামতি করা ও স্বলাত পড়া যায়েজ। বুখারী-৫১৬
১৭. প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মাঝে নফল/সুন্নত স্বলাত পড়ার জন্য কিছু সময় বিরতি দেওয়া। বুখারী-৬২৪, নাসায়ী-৬৮১
১৮. জামাতের নামাজে ইমামের ভুল সংশোধনে পুরুষরা 'সুবহানআল্লাহ' বলে এবং মহিলারা 'হাত তালি' দিয়ে লুকমা দিবে। ইবনে মাযাহ-১০৩৬
১৯. জুমআর খুতবা চলাকালীন ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বা ইমামের দিকে মুখ করে বসা। ইবনে মাযাহ-১১৩৬, আবু দাউদ-১১০৮
২০. মসজিদে স্বলাতরত অবস্থায় প্রয়োজনে ক্ষতিকারক প্রাণী যথা- বিছা, সাপ, মশা মারা যায়েজ। ইবনে মাযাহ-১২৪৫
২১. মসজিদে মানুষজনকে আসতে না দেওয়া বা মসজিদে আল্লাহর ইবাদতে বাধা দেওয়া। সূরা আল বাকারাহ; ২:১১৪
২২. মসজিদে আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি অন্য কাউকে ডেকে বা শরীক করে ইবাদত না করা। সূরা আল জীন; ৭২:১৮
২৩. মসজিদে অপবিত্র, কষ্টদায়ক ও দূর্গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনা ও কফ-থুথু না ফেলা। বুখারী-৪১৫, নাসায়ী-৭২৩
২৪. বড় নাপাকী অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া এবং মসজিদে শরীরের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত না করা। বুখারী-৪৪২
২৫. মসজিদে উচ্চ আওয়াজে কথা, চিৎকার, হৈচৈ, শোর-গোল না করা। মুসলিম-১০০২, বুখারী-৪৭০
২৬. কাঁচা পিয়াজ ও রসুন খেয়ে মসজিদে না যাওয়া। অনুরুপ শরীর, বস্ত্র ও মুখ দূর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া। বুখারী-৮৫৪
২৭. মসজিদে তাড়াহুড়া করে প্রবেশ না করা বা দ্রুত দৌড় দিয়ে গিয়ে রুকু বা জামাত না ধরার চেষ্টা করা। বুখারী-৬৩৬
২৮. মসজিদে প্রবেশ করে (বিশেষত জুমআর দিন) মানুষের কাঁধ ডিঙ্গিয়ে সামনের কাতারে এগিয়ে না যাওয়া। ইবনে মাযাহ-১১১৫
২৯. মসজিদে উচ্চস্বরে শব্দ করে কুরআন তিলাওয়াত না করা যাতে জ্বলাত আদায়কারীর কষ্ট হয়। আবু দাউদ-১৩৩২
৩০. মসজিদে কোন হারানো বস্তুর খোঁজ না করা বা হারানো বস্তুর ঘোষনা না করা। তিরমিযী-১৩২১, নাসায়ী-৭১৭
৩১. মসজিদের ভেতরে বা মাইকে ঘোষনা করে মানুষের মৃত্যু সংবাদ প্রচার না করা। তিরমিযী-৯৮৬, ইবনে মাযাহ-১৪৭৬
৩২. মসজিদে বেচা-কেনা না করা বেচা- কেনার ঘোষনা না করা বা ব্যবসায়িক টাকা-পয়সা লেনদেন না করা। তিরমিযী-১৩২১
৩৩. মসজিদের কোন একটি স্থানকে নির্ধারিত করে সেখানে সবসময় স্বলাত না পড়া। আবু দাউদ-৮৬২, ইবনে মাযাহ-১৪২৯
৩৪. মসজিদে চেয়ার, জায়নামাজ দিয়ে কারো জন্য কোন নির্ধারিত জায়গা দখল বা বরাদ্দ করে না রাখা। আবু দাউদ-৮৬২
৩৫. ইসলামী শরীয়তের শান্তির সাজাসমূহ বা যে কোন প্রকার শান্তি মসজিদের ভিতরে কায়েম না করা। ইবনে মাযাহ-৭৪৮
৩৬. মসজিদকে দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ী ঘুমানোর জায়গা হিসাবে ব্যবহার না করা। বুখারী-৪৪২
৩৭. মহিলারা কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে ও ঘরের বাইরে না যাওয়া। মুসলিম-৪৪৩
৩৮. মহিলারা হায়েজ ও নেফাক অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া। আবু দাউদ-২৬১
৩৯. মসজিদে পুরুষ-মহিলা পাশাপাশি না দাঁড়ানো বা মহিলার পিছনে পুরুষ দাঁড়িয়ে স্বলাত না পড়া。
৪০. মসজিদে জুমআর দিনে খুতবা চলাকালীন পায়ের হাঁটু উচু করে জড়িয়ে ধরে না বসা। আবু দাউদ-১১০, তিরমিযী-৫১৪
৪১. মসজিদে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য ইতিকাফ করা আবশ্যক। বুখারী-২০৩৩
৪২. সমাজের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যক্তিগণ মসজিদে ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসা। মুসলিম-৮৫৮
৪৩. কবরের উপর মসজিদ বা মসজিদের সীমানার ভিতর কবর বা কোন কবর কেন্দ্রিক মসজিদ নির্মাণ না করা। বুখারী-৪৩৭, মুসলিম-১০৭৫
৪৪. মসজিদে থাকা অবস্থায় আযান হয়ে গেলে বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয়ে না যাওয়া। মুসলিম-১৩৭৭
৪৫. প্রতিযোগীতামূলক বা সুনামের জন্য নকশা ও কারুকার্যখচিত করে মসজিদ নির্মাণ না করা। আবু দাউদ-৪৪৮, নাসায়ী-৬৮৯

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 দু‘আর আদব ও সুন্নাহ পদ্ধতি এবং দু‘আ কবুলের সময় ও স্থানসমূহ

📄 দু‘আর আদব ও সুন্নাহ পদ্ধতি এবং দু‘আ কবুলের সময় ও স্থানসমূহ


■ দু'আ সম্পর্কে রাসূল (স) বলেছেন, দু'আই ইবাদত। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সকল আবেদন ও চাওয়া ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (স) দু'আর বিষয়ে তাগিদ দিয়ে আরও বলেছেন; ছোট ছোট প্রয়োজন পূরণের জন্য তোমরা আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়, এমনকি তা যদি জুতার ফিতা চাওয়ার মত সামান্য বিষয় হয়। দু'আ মুমিনের ভাগ্যকে পরিবর্তন করার একমাত্র হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার করা দু'আকে অত্যাধিক পছন্দ করেন। যে আল্লাহর কাছে চায় না আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন। রাসূল (স) বলেছেন, যে মুসলিমই দু'আ করবে, তাতে কোন গুনাহ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকলে আল্লাহ তাকে ৩টি জিনিসের কোন একটি অবশ্যই দান করবেন: ১. আল্লাহ হয় তার দু'আ দ্রুত কবুল করবেন, ২. তার দু'আ পরকালের জন্য সঞ্চিত করে রাখবেন প্রতিদান হিসাবে, ৩. দু'আয় সে যতটা লাভের প্রত্যাশা করেছিল, তার আমল থেকে ততটা খারাবি দূর করে দেওয়া হবে। আহমদ-১০৭০৯।
■ দু'আর আদব: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে খালেস অন্তর দিয়ে দু'আ করা। সুন্নাহ পদ্ধতি অনুযায়ী দু'আ করা। একাগ্রচিত্তে দু'আ করা। সম্ভব হলে ওযু করার পর দু'আ করা। সুখ ও দুঃখ সর্বাবস্থায় দু'আ করা। কাকুতি-মিনতী এবং ভয়-ভীতি সহকারে দু'আ করা। একাকী দুই হাত প্রসারিত করে তুলে দু'আ করা। মৃদু-নমনীয় স্বরে দু'আ করা। কিবলামুখী হয়ে দু'আ করা। হাদীসে যেসব দু'আ ৩ বার করে করতে বলা হয়েছে সেগুলো ৩ বার পুনরাবৃত্তি করা। ছোট-বড় সবকিছুই আল্লাহর কাছে চাওয়া। আল্লাহর নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া। আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ বা নিজের কোন নেক আমলের ওসীলায় দু'আ করা। দু'আ কবুল হবে এমন আস্থা রাখা। বারবার দু'আ করা ও দু'আ পুনরাবৃত্তি করা।
■ দু'আর পদ্ধতি: প্রথমত; দু'আর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও বড়ত্বের কথা বলা, আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং আল্লাহর গুনবাচক কিছু নাম দিয়ে আল্লাহকে ডেকে দু'আ শুরু করা উত্তম। যেমন - সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করা ভালো। অথবা বলা - "সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।” এরপর কালেমা শাহাদাত (আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ) বা কালেমা তাওহীদ (লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াহদাহু, লা শারীকালাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন ক্বদীর) পাঠ করা। অতঃপর আল্লাহর স্বীকৃত ৯৯টি নামের মধ্যে কিছু নাম যেমন- ইয়া রহমান, ইয়া রহিম, ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, ইয়া রাজ্জাক, ইয়া গাফফার, ইয়া রব্বাল আলামিন ইত্যাদি বলা।
■ দ্বিতীয়ত; এরপর রাসূল (স) এর উপর দুরূদ পাঠ করা। উত্তম হলো দুরূদে ইবরাহীম পাঠ করা।
■ তৃতীয়ত; নিজে গুনাহগার ও নাফসের উপর জুলুমকারী তা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ছোট ও নত হওয়া। যেমন বলা "রব্বানা জ্বলামনা আন ফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতার হামনা লানা কুনান্না মিনাল খুসিরিন।" অথবা বলা- "আস্তাগফিরুল্লাহ হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহ।" বা দু'আ মাসূরা পড়া আল্লাহুম্মা ইন্নী যলামতু নাফসী জুলমান...।
■ এরপর নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর কাছে যাবতীয় আকাংক্ষার বিষয় চাওয়া। প্রথমে নিজের জন্য অতঃপর পিতা-মাতা ও পরিবার, অতঃপর আত্মীয় ও প্রতিবেশী, অতঃপর সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিশেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দু'আ করা। শুধু দুনিয়া বা আখিরাতের জন্য নয় বরং উভয় জগতের জন্য দু'আ করা। দু'আর সময় চোখের পানি নিয়ে আসার চেষ্টা করা। দু'আর শেষ প্রান্তে এসে আবার দুরূদ পাঠ করা আল্লাহর প্রশংসা করা এবং সব শেষে দু'আ কবুলের আবেদন জানিয়ে দু'আ শেষ করা।
■ দু'আর সতর্কতা: আল্লাহ ছাড়া কোন ব্যক্তি বা বস্তু বা কবরের নিকট না চাওয়া। আল্লাহর কাছেও চাওয়া আবার পাশাপাশি অন্য কোন কিছুর কাছে চাওয়া যা তার দেওয়ার সামর্থ্য নাই। কোন ব্যক্তি বা বস্তু বা কবরকে এমনকি রাসূল (স) কে মাধ্যম/ওসীলা সাব্যস্ত করে দু'আ না করা। উচ্চস্বরে দু'আ না করা। দু'আ কবুল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা ও অধৈর্য হওয়া যাবে না। দু'আ কবুল হলো না মনে করে হতাশাগ্রস্থ হওয়া ও দু'আ করা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, নিজের ও সম্পদের বিরুদ্ধে বদদু'আ না করা। অবান্তর, অমূলক ও বাড়াবাড়িপূর্ণ কোন দু'আ না করা। কোন গুনাহ বা পাপ কাজের জন্য দু'আ না করা। নিজের মৃত্যুর বা শান্তি পাওয়ার জন্য দু'আ না করা। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দু'আ না করা। কারো দ্বারা মাজলুম হওয়া ব্যতীরেকে তার উপর বদদু'আ না করা। হালাল উপার্জন ব্যতীরেকে দু'আ কবুল হয় না।
■ দু'আ কবুলের সময় ও অবস্থা: সিজদারত অবস্থায়। স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরানোর আগে। আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে। ফরজ স্বলাতের পর। জুমআর দিন আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। বৃষ্টিবর্ষণের সময়। মোরগের ডাক দেওয়ার সময়। সুরা ফাতিহা শেষে আমিন বলার সময়। ইফতারের পূর্বে। রমাজান মাসে কদরের রাতে। যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে। জমজম পানি পান করার সময়। মুসাফির অবস্থায়। জিহাদরত অবস্থায়। মাজলুম বা অত্যাচারিত অবস্থায়। বিপদগ্রস্থ বা নিরুপায় অবস্থায়। রোজাদার অবস্থায়। অসুস্থ রোগীর নিকট দু'আ অবস্থায়। হজ্জ ও উমরাহ পালন করা অবস্থায়। অসাক্ষাতে এক মুসলিম অপর মুসলিমের জন্য দু'আ করলে। সন্তানের জন্য পিতা- মাতার দু'আ এবং পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দু'আ।
■ দু'আ কবুলের স্থানসমূহ: কাবা ঘরের ভিতরে। কাবা ঘরের হাতীমে। তাওয়াফ করার স্থান মাতাফে। সাঈ করার স্থান মাসআতে। হাজরে আসওয়াদ ও কাবা ঘরের দরজা এর মাঝের স্থান মুলতাজমে। বাইতুল্লাহতে। মাকামে ইবরাহীমের পিছনে। জমজম পানির কুপ এর কাছে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে। আরাফার ময়দানে। মুযদালিফার ময়দানে। মিনার ময়দানে। জামারাতে।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 তাওবা বা ইসতিগফার করার পদ্ধতি

📄 তাওবা বা ইসতিগফার করার পদ্ধতি


■ বান্দার গুনাহ মাফের জন্য কিংবা পাপ কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুলকারী। তিনি তাওবাকারীকে পছন্দ করেন। বান্দার ছোট ছোট সগীরা গুনাহ আল্লাহ বিভিন্ন ভালো নেকীর/সাওয়াবের কাজের মাধ্যমে অথবা দুঃখ/কষ্ট/অসুস্থতার মাধ্যমে দুনিয়াতে পাপ মোচন করে দেন। কিন্তু কবীরাহ গুনাহ তাওবা ছাড়া আল্লাহ মাফ করেন না। ৭০-১০০টি পর্যন্ত কবীরাহ গুনাহের বিষয় আছে। প্রতিটি কবীরাহ গুনাহের জন্য আলাদা আলাদাভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এক তওবায় সকল কবীরাহ গুনাহের ক্ষমা চাওয়া যায় না কারণ প্রত্যেক গুনাহর বৈশিষ্ট্য, ব্যপকতা ও সম্পৃক্ততা ভিন্ন। সমাজে অনেকে গুনাহ করে মুখে শুধু তাওবা তাওবা বলে আর দুই গালে হাত দিয়ে বাড়ি দেয়। এসব হলো অজ্ঞতা এবং ধর্মকে হাস্যকর বানানোর কাজ। অনেক জায়গায় মানুষ মারা যাওয়ার সময় হুজুর ডেকে তাওবা পড়ানো হয়। অথচ তাওবা করার বিষয়, পড়ানোর বিষয় নয়। যার তাওবা তাকে নিজে করতে হবে। তবে কেউ কারো জন্য আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য দু'আ করতে পারে। কেউ যদি কোন প্রকার হারাম বা গুনাহের বিষয়কে নিয়ে তাচ্ছিল্য রুপে মজা করে বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে অথবা কোন গুনাহের বিষয়কে গুনাহ না মনে করে তবে সে কুফরী করলো। সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।
■ তাওবার শর্ত ও পদ্ধতি: গুনাহ থেকে তাওবা করার জন্য ৪টি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। শর্তগুলো হলো: (১) গুনাহ সম্পাদন স্বীকার করে গুনাহ থেকে বিরত থাকা, (২) গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হওয়া, (৩) পরবর্তীতে আবার গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা এবং (৪) আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এই উপরোক্ত তাওবার শর্তগুলো বান্দা ও আল্লাহর হজ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যদি এমন গুনাহ হয় যার মাধ্যমে অন্য কোন ব্যক্তি সম্পৃক্ত অর্থাৎ কেউ অত্যাচারিত হয়েছে, কাউকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, কারো হক্ব নষ্ট করা হয়েছে তবে আল্লাহ সেই গুনাহ ক্ষমা করবেন না যতক্ষন না ঐ ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে। তাই অন্য ব্যক্তির সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে উক্ত ৪ শর্তের সাথে আরও একটি শর্ত পূরণ করতে হবে তা হলো: (৫) অত্যাচারিত বা মাজলুম ব্যক্তির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। এবং কোন ব্যক্তির হক/অর্থ/দ্রব্যাদি আত্মসাৎ বা নষ্ট করে থাকলে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তাকে পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিশদের নিকট তা ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি কাউকে না খুঁজে পাওয়া যায় তবে তার নামে দান-সাদকা করে দিতে হবে।
■ আল্লাহ তাআলা তাওবাকারী প্রত্যেক বান্দার অন্তরের নিয়ত ও মনের খবর জানেন এবং তিনি পরম দয়ালু ও অসীম ক্ষমাশীল। কোন গুনাহের বিষয় যদি সুনির্দিষ্টভাবে মনে না থাকে তবে আল্লাহর কাছে নিজের অজ্ঞতা ও ভুলে যাওয়ার বিষয় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবা করতে হবে। গুনাহ ক্ষমা করার এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর হাতে। রাসূল প্রত্যহ ৭০ এর অধিক; অন্য বর্ণনায় প্রত্যহ ১০০ বার তাওবা-ইসতিগফার এর দু'আ পড়তেন।
■ তাওবার সবচেয়ে ছোট দু'আ: "আস্তাগফিরুল্লাহ।” এই দু'আও বলা যায় "আসস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহ।" প্রকাশ থাকে যে, ইসতিগফার এর অপর একটি দু'আ প্রচলিত আছে যার মাঝে এরুপ ... রাব্বি মিন কুল্লি জামবিউ.. আছে। উক্ত দু'আটি নিতান্তই দুর্বল হাদীস ভিত্তিক যা আমলযোগ্য নয়।
■ ইসতেগফারের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ দু'আ হলো সাইয়েদুল ইসতিগফার। এই দু'আটি মুখস্থ করে হজ্জ ও উমরায় যাওয়া খুব জরুরী। দু'আটি হলো
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ.
"আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাকতানী, অ আনা আব্দুকা অ আনা আলা আহদিকা অ অ'দিকা মাসতাতা'তু, আউযুবিকা মিন শারি মা সানা'তু, আবূউ লাকা বিনি'মাতিকা আলায়য়‍্যা অ আবূউ বিযামবী ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা য়‍্যাগফিরুয যুনুবা ইল্লা আন্তা।"
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছো, আমি তোমার দাস। আমি তোমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর যথাসাধ্য প্রতিষ্ঠিত আছি। আমি যা করেছি, তার মন্দ থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার উপর তোমার যে সম্পদ রয়েছে, তা আমি স্বীকার করছি এবং আমার অপরাধও আমি স্বীকার করছি। সুতরাং তুমি আমাকে মার্জনা করে দাও, যেহেতু তুমি ছাড়া আর কেউ পাপ মার্জনা করতে পারে না।”
■ এই ইসতেগফারের দু'আ পড়ার বিশুদ্ধ ফযীলত - রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি দিনে (সকালে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর ভোর হওয়ার আগেই যে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে।” বুখারী-৬৩০৬। এই দু'আটি ফজর ও মাগরিবের আযান ও ইকামতের মাঝে পড়া উত্তম。

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 জানাযা ত্বলাতের পদ্ধতি

📄 জানাযা ত্বলাতের পদ্ধতি


■ জানাযার স্বলাতের পদ্ধতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো - প্রথমত জানাযার স্বলাত পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য একই পদ্ধতি। এই স্বলাতে কোন রুকু ও সিজদাহ নেই। আমাদের দেশের মহিলাদের বিশেষ করে জানাযা পড়ার তেমন কোন অভিজ্ঞতাই নেই। এ কারণে তারা ওখানে জানাযাকে গুরুত্ব দেন না এবং পড়েন না। অথচ এই জানাযার স্বলাতের যে কি পরিমান নেকী আছে তা আপনি জানলে অবাক হয়ে যাবেন। হারামাইনের মসজিদসমূহে ফরজ স্বলাতের সালাম ফিরানোর পর মুয়ায্যিন জানাযার ঘোষনা দেন। অতঃপর ইমাম কাবা ঘরের সামনে থেকে রওয়ানা হয়ে ইসমাইল গেট এর স্কেলেটর দিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে মাইয়্যাতকে সামনে রেখে জানাযার জ্বলাত পড়া শুরু করেন।
■ জানাযার স্বলাতের শুরুতে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ইমাম প্রথমে একবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলে অনুরুপ তাকবীর দিয়ে হাত বাঁধতে হবে। অতঃপর আঊযুবিল্লাহ... ও বিসমিল্লাহ... বলে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। সানা পড়ার বিষয়ে অপর একটি দুর্বল মত আছে কিন্তু সূরা ফাতিহা পড়া অধিকতর শুদ্ধ ও উত্তম। বুখারী-১৩৩৫, নাসাঈ-১৯৮৭, আবু দাউদ-৩১৯৮, তিরমিযী-১০২৭। অতঃপর ইমাম দ্বিতীয় তাকবীর দিলে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিতে হবে। পরবর্তী ২য়, ৩য়, ৪র্থ তাকবীরের সময় হাত উঠানো বা হাত না উঠানোর দুই বিষয়েরই বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান আছে। অতএব যে কোনটির উপর আমল করা যেতে পারে। তবে হাত উঠানো অধিকতর উত্তম। দ্বিতীয় তাকবীরের পর দুরূদে ইবরাহীম পাঠ করতে হবে। অতঃপর আবার তৃতীয় তাকবীর দিতে হবে। এরপর মৃত ব্যক্তির জন্য জানাযার দু'আ পড়তে হবে। মুখস্থ থাকলে দুআটি পড়বেন নতুবা চুপ থাকবেন। অতঃপর ইমাম চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডানে একবার সালাম ফিরালে শুধু একবার ডানে সালাম ফিরিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে স্বলাত শেষ করতে হবে।
■ উল্লেখ্য যে, ডানে-বামে দুই পাশে সালাম ফিরানোর বিষয়েও বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান আছে। অতএব যে ইমাম যেটি পালন করবে আপনি তার অনুসরণ করুন। এখানে লক্ষ্য রাখবেন ইমাম যেহেতু একপাশে সালাম ফিরাবেন সেহেতু ইমামের অনুসরণে আপনিও শুধু ডান পাশে সালাম ফিরাবেন। দুই পাশে নয়। ইমামের অতিরিক্ত কোন কাজ করা যাবে না। এবার জানাযার স্বলাতে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য জানাযার দু'আটি জেনে নিন -
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحِيْنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ، اَللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلَا تُضِلَّنَا بَعْدَهُ
“আল্লাহুম মাগফির লি হায়ি‍্যনা ওয়া মায়ি‍্যতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা, ওয়া সগীরিনা ওয়া কাবীরিনা, ওয়া যাকারীনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফা'আহয়িহি 'আলাল ইসলাম, ওয়ামান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহু 'আলাল ঈমান। আল্লাহুম্মা লা তাহরিমনা আজরাহু ওয়ালা তুদ্বিল্লানা বা'দাহু।” আবু দাউদ-৩২০১।
■ সহীহ মুসলিম এর ২১২১ নং হাদীসে আরও একটি দু'আ আছে যা পড়াও উত্তম। এবার জানাযার স্বলাতের ফযীলত রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি মৃতের জন্য স্বালাত আদায় করা পর্যন্ত জানাযায় উপস্থিত থাকবে, তার জন্য এক ক্বীরাত্ব, আর যে ব্যক্তি মৃতের দাফন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে তার জন্য দুই ক্বীরাত্ব। জিজ্ঞেস করা হলো, দুই ক্বীরাত্ব কি? তিনি বললেন, দুটি বিশাল পর্বত সমতুল্য (সাওয়াব)।” বুখারী-১৩২৫, মুসলিম-২০৮২।
■ এই পর্বত মদীনার উত্তরে উহুদ পর্বতকে সম্বোধন করা হয়েছে। উহুদ পাহাড় কয়েকটি পর্বতের সমন্বয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার লম্বা ও ৩ কিলোমিটার চওড়া। ভূমির উপর উচ্চতা ১ হাজার মিটারের চেয়ে উচু ও ভুমির নিচে গভীরতার পরিমান অজানা। অতএব জানাযার স্বলাতের পূর্ণ ১ উহুদ পর্বত সমান নেকী নিতে চাইলে ঐ দু'আটি মুখস্থ করে ফেলাই উত্তম。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00