📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 মক্কায় অবস্থানকালে দৈনন্দিন আমল

📄 মক্কায় অবস্থানকালে দৈনন্দিন আমল


লক্ষ্য করেছি হজ্জ ও উমরাহ যাত্রীদের জন্য এই বিষয়ে কোন গাইড বইয়ে তেমন দিকনির্দেশনা দেওয়া নেই। কিন্তু বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মক্কার এই পবিত্র হারামের জমীনে অবস্থান করা প্রতিটি মুহুর্ত অনেক মূল্যবান এবং প্রতিটি আমল অত্যন্ত দামী। পরে দেশে ফিরে গিয়ে অনেকে আফসোস করেন; হায় হায় কি সময় পার করে আসলাম.. যদি ঐ ঐ আমলগুলো করতাম! এখানে আল্লাহর কাছে করা দু'আ কবুলের সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং এখানে করা বিবিধ আমলের নেকীও আল্লাহর কাছে অনেক বেশি হিসাবে গৃহীত হবে ইনশা-আল্লাহ। আপনি মক্কায় এসেছেন নেকী শপিং বা আমল কেনাকাটা করার জন্যই! আর এই শপিং করতে কোন টাকা লাগে না। শুধু জানতে হবে কোথায়, কখন, কি কি আমল করতে হবে। আগেভাগে এগুলো না জেনে গেলে ও প্রস্তুতি না নিয়ে গেলে কিভাবে করবেন এই শপিং? উমরাহ করতে লাগে মাত্র ২-৩ ঘন্টা আর পরে হজ্জ মূলত ৫/৬ দিন। তো সফরের বাকি দিনগুলো কিভাবে পার করবেন আর কি করবেন? এই বিষয়ে লক্ষ্য করেছি সাধারণ মানুষজন একদম বেখবর, কোন পরিকল্পনা নাই। একারণেই এই দীর্ঘ অধ্যায় রচনা করেছি যাতে হাজীসাহেবগণ মক্কায় কর্মবিহীন অবসর দিনগুলোতে এমন কিছু আমল শিখবেন আর চর্চা শুরু করবেন যাতে বাকি জীবন সেই আমল চর্চাগুলো ধরে রাখতে পারেন। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।
সাধারণত দেখা যায় বাংলাদেশী হজ্জযাত্রীরা মক্কায় পৌছে উমরাহ শেষ করার পর ১০-২০ দিন মক্কায় অবস্থান করেন। তারপর হয়তোবা মদীনায় যাওয়া হয় অথবা হজ্জ শুরু হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করা আমাদের দেশী হজ্জযাত্রীদের বেশিরভাগের চিত্র আগে আপনার সামনে তুলে ধরবো। বেশিরভাগ কাফেলা বা মুয়াল্লিম হজ্জযাত্রীদের উমরাহ শেষ করানোর পর সবাই কোন পথ দিয়ে মসজিদে যাবেন, কোথায় বাথরুম টয়লেট আছে, কেউ হারিয়ে গেলে কি করবেন, কোথায় কি কেনাকাটা করবেন এগুলো চিনিয়ে দেন। অতঃপর তারা হাজীসাহেবদের ৩ বেলা খাওয়া-দাওয়া যেন ঠিকমত হয়, মক্কায় জিয়ারার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ হয়ে গেলে হজ্জ মিশন অফিস বা হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া, মদীনা যাওয়ার বাস ঠিক করা ইত্যাদি বিবিধ ব্যবস্থাপনায় কাজ করে যান।
আর হজ্জযাত্রীরা ৫ ওয়াক্ত স্বলাতে দলবেঁধে মসজিদে যান, স্বলাত শেষে হোটেলে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া করেন আর ঘুমান, দেশের আত্মীয়স্বজনদের সাথে ফোনে কথা আর কথা চলে, হোটেল রুমে টিভি দেখা চলে, শপিংমলে ঘোরাঘুরি আর কেনা-কাটা করেন, কেনাকাটায় কে জিতলো আর কে ঠকলো এই নিয়ে গবেষণা চলে, হোটেলে কত রকমের আজগুবি গল্প-গুজব আর গীবত চলে, রাজনৈতিক গল্প আর নিজের ছেলে-মেয়ে ও বাড়ি-গাড়ির গর্বভরা গল্প চলে, এমনকি পান-জর্দার আসর বসে, হোটেলে মহিলাদের পর্দাবিহীন ঘোরাঘুরি আর অট্ট হাসা-হাসির গল্প চলে, অবাধে পুরুষ মহিলা রুমে যাতায়াত চলে, হোটেলের রুমের এসি কম-বেশি করা নিয়ে মনোমালিন্য চলে, খাওয়া-দাওয়ার মান নিয়ে সমালোচনা চলে, বাথরুম আগে-পরে যাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে, কাপড় ধুয়া আর শুকানো নিয়ে ঝামেলা চলে, ঘুমের সময় অন্যের মোবাইলে ফোন আসলে বিরক্ত লাগে, কেউ টয়লেট-বাথরুম করতে বেশি সময় নিলে মনে রাগ উঠে, হোটেল রুম বা বাথরুম অপরিষ্কার ও গন্ধ করে রাখলে এক অপরকে কথা শোনানো হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলোই হলো বাস্তবতা যার কিছু আপনি নিজে গেলে হয়তোবা ওখানে দেখতে পাবেন।
■ আর মসজিদের ভিতরে হজ্জযাত্রীদের দেখবেন চিল্লাচিল্লি করে কথা বলে এমনকি অনেকে ঝগড়া করে, ফোনে জোরে জোরে কথা বলে, ফোনে ভিডিও কল দিয়ে মসজিদের ভিতরে ঘোরাঘুরি করে এমনকি তাওয়াফ করে, বল্লাহীনভাবে সেলফি আর ছবি তোলে, মসজিদের ভিতরে যত্রতত্র শুয়ে গভীর ঘুম যায়, প্যান্ট বা পায়জামা টাখনুর নিচে পরিধান করে থাকে, এমন পাতলা সুতি সাদা পান্জাবী পরিধান করে যাতে শরীর দেখা/বুঝা যায়, শরীর/পোষাকের দুর্গন্ধ নিয়ে স্বলাত পড়ে, মসজিদে বসে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ দেখে, বসে বসে মানুষদের কাবা ঘর তাওয়াফ করতে দেখে, কাবা ঘর সোজা স্বলাতে দাঁড়িয়ে কাবার দিকে তাকিয়ে বা এদিক সেদিক তাকিয়ে স্বলাত পড়ে, চোখ বন্ধ করে স্বলাত পড়ে, মুখ বন্ধ করে অর্থাৎ ঠোঁট না নাড়িয়ে মনে মনে সূরা পড়ে স্বলাত পড়ে, ১০০ কি.মি বেগে স্বলাত পড়ে, মুরগীর ঠোক দেওয়ার মতো রুকু ও সিজদাহ করে স্বলাত পড়ে, স্বলাতরত মানুষদের সুতরার মধ্য দিয়ে অবাধে চলাফেরা করে, মসজিদে প্রবেশ করে তাহিয়‍্যাতুল মসজিদ স্বলাত না পড়ে বসে যায়, জানাযার স্বলাত চলা অবস্থায় জানাযা বাদ দিয়ে সুন্নাত বা নফল স্বলাত পড়ে, বেশিরভাগ মহিলারা জানাযার স্বলাতই পড়ে না, সামনে কাতার খালি রেখে পিছনে দাঁড়ায়, কাতারে ফাঁকা ফাঁকা হয়ে দাঁড়ায়, মসজিদের ভিতরে প্রবেশ না করে সবসময় বাইরের চত্বরে স্বলাত পড়ে, স্বলাতের মধ্যে দৃষ্টি উপরে/আকাশের দিকে তাকায়, স্বলাতের মধ্যে মুখ হা করে বড় করে খুলে এমনকি শব্দ করে হাই তোলে, স্বলাতে দাঁড়িয়ে হাতের আঙ্গুল ফুটায়, স্বলাতে অযথা ও অতিরিক্ত নড়াচড়া এবং কাপড় ঠিক করে, পুরুষরা জামার হাত গুটিয়ে স্বলাত পড়ে, শারীরিক/দাঁড়িয়ে সামর্থ্য থাকা সত্বেও সুন্নাত বা নফল স্বলাত বসে বসে পড়ে, পুরুষ-মহিলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্বলাত পড়ে, তন্দ্রাবস্থায় স্বলাত পড়ে, মহিলারা মাথার চুল, গলা ও পা খোলা রেখে স্বলাত পড়ে তথা পরিপূর্ণ পর্দা করে না, কিছু মহিলা ফ্যাশন বোরখা ও টাইট ফিটিং বোরখা পরে, কিছু মহিলা মেকআপ করে ও লিপষ্টিক দেয়, মাথায় স্টাইল করে হিজাব পরে, মহিলাদের গহনা তথা হাতের চুড়ি ও পায়ের নুপুরের শব্দ শোনা যায়, মহিলারা পারফিউম মেখে ঘোরাঘুরি করে ও মসজিদে যায়, অনেকে দৌড় দিয়ে গিয়ে স্বলাতের শুরু ধরে/রুকু ধরে, স্বলাতের মাকরুহ সময়ে নফল স্বলাত পড়তে থাকে, ইকামত হয়ে জামাআত শুরু হয়ে গেছে তবুও অনেকে সুন্নাত স্বলাত পরতে থাকে, স্বলাতের মধ্যে অনবরত মোবাইল রিং বাজতে থাকে যা বন্ধ করে না, সিজদায় কুকুরের মতো হাত বিছিয়ে সিজদা করে, নাক মাটিতে না লাগিয়ে তথা সাত অঙ্গের মাধ্যমে পরিপূর্ণ সিজদা করে না, ইমামের সিজদায় যাওয়ার তাকবীর শোনার আগেই সিজদার জন্য ঝুকে যায়, জ্বলাতে পড়ে এসে ইমামকে সিজদা অবস্থায় পেলে সিজদায় সামিল না হয়ে ইমামের দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করে, ইমামের সালাম ফিরানো শেষ করার আগেই সালাম ফিরিয়ে স্বলাত শেষ করে ফেলে, শর্টকার্ট/অপরিপূর্ণভাবে ওযু করে, প্রসাব করে কুলুক নিয়ে টয়লেটে ৪০ কদম হাঁটাহাটি/লাফালাফি করে, কিবলার দিকে থুথু/পানের পিক ফেলে, মসজিদের চত্তর পার করেই সিগারেট ধরায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলোই হলো বাস্তবতা। হজ্জযাত্রীদের সংশোধন ও কল্যাণের জন্যই এই কথাগুলো বলতে হচ্ছে।
■ উপরের এই ভুল-ত্রুটির বিষয়গুলো হওয়ার কারণ কি? এক; হজ্জ ও উমরাহ সফরের যাবতীয় মানসিক প্রস্তুতি ও বাস্তবতার বিষয়গুলো সম্পর্কে পূর্বে থেকে দিকনির্দেশনা না পাওয়া। দুই; সফরে গিয়ে করণীয় আমল বা সময়কে কাজে লাগানোর বিষয়ে সচেতন না হওয়া এবং তিন; সর্বোপরি ইসলামের সাধারণ মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা। এখন এর জন্য দায়ী কে? প্রথমত: আপনি নিজে, দ্বিতীয়ত: আপনার কাফেলা। হজ্জে যাওয়ার আগে স্বভাবতই পুরুষরা চাকুরী বা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত মানুষ, আর মহিলারা ঘর-সংসার। কোনমতে দৌড় দিয়ে হজ্জে চলে যায় আর হজ্জ থেকে ফিরে এসেই আবার দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যাওয়ার আগে তেমন কোন মানসিক প্রস্তুতি নেই বা জ্ঞানার্জন নেই এজন্য এসেও কোন পরিবর্তন নেই। এক অন্তরসার শূন্য হলিডে ট্যুর হয়ে গেল। আর হজ্জ কাফেলারা যে মানুষগুলোকে নিয়ে হজ্জে নিয়ে গেলেন তাদের মানসিক প্রস্তুতি এবং ঈমান, আমল, আখলাক পরিশুদ্ধ করার জন্য কোন কিছুই কি করার ছিল না? এমন কিছু হজ্জ কাফেলা দেখেছি যারা হজ্জে যাওয়ার পূর্বে হজ্জযাত্রীদের নিয়ে প্রস্তুতিমূলক এক/দুই দিন পুরো দিনব্যাপী তালিম বা প্রশিক্ষণ দেন এবং পুরো হজ্জ সফরজুড়ে প্রতিদিন বিষয়ভিত্তিক ইসলামি ক্লাস নেন, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব করেন, ক্লাস নোট দেন, হোম ওয়ার্ক দেন এবং সফর শেষে পরীক্ষা নিয়ে পুরস্কার দেন। ঠিক যেন এক ট্রেনিং প্রোগ্রাম বা শিক্ষা সফর!
■ মক্কায় অবস্থানকালে আমল ও নেকীর কাজে একে অপরের সাথে প্রতিযোগীতা করা উচিত। আর এমন সঙ্গীর সাথে থাকা ভালো যে নেক আমল করতে অগ্রগামী ও অন্যকে নেক আমলে উৎসাহিত করে। নেক আমলে প্রতিযোগীতা করা যায়েজ যা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। আপনি যখন জানবেন আপনার রুমের এক ভাই/বোন আজকে ৪টা তাওয়াফ করেছেন। তখন আপনি মনে মনে হিংসা করে ভাববেন কাল আমি ইনশা-আল্লাহ ৫টা তাওয়াফ করবো। এই হিংসা করাও যায়েজ। এটি আসলে একটি ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা। রাসূল (ﷺ) এর যুগে সাহাবীরা এমন কতো আমল নিয়ে হিংসা আর আমলের প্রতিযোগীতা করতেন গোপনে গোপনে। তবে আমল করে এসে সবাইকে বলে বেড়ানো যাবে না তাহলে আবার রিয়া (লোক দেখানো অহংকার/গর্ব) হয়ে যেতে পারে। আর রিয়া থেকে খুব সাবধান, কারণ রিয়া আমলসমূহেকে ধ্বংস করে দেয়। আবার নিজের স্বাস্থ্য ও সামর্থ্য বিবেচনা করে প্রতিযোগীতায় নামতে হবে। সাধ্যের বাইরে বেশি ইবাদত করতে গিয়ে নিজেকে অসুস্থ্য করে ফেলা যাবে না যেন পরবর্তীতে অন্যান্য ফরজ ইবাদত পালন করা কষ্টকর হয়ে যায়। এমন পরিকল্পনা বা টার্গেট করা উচিত যে; আপনি মক্কায় এই ১০-২০ দিন অবস্থানকালে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু আমল করবেন যা সবচেয়ে নেকীপূর্ণ এবং প্রতিদিন ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন।
■ এবার আসুন পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন আমলের কিছু দিকনির্দেশনা বিষয়ে আলোচনা করি:
■ আমল-১: তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল স্বলাত প্রতিদিন ভোররাতে মসজিদে গিয়ে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল স্বলাত আদায় করা। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে তাহাজ্জুদের আযানের (ফজরের আযানের ১ ঘন্টা আগে) আগে উঠে মসজিদে গিয়ে ২/৪/৬/৮.. যে কয় রাকাআত সম্ভব তাহাজ্জুদ স্বলাত পড়া। দেখা যায়, হোটেলের রুমে যিনি আগে বাথরুম করে ওযু করে পোষাক পরে রেডি হয়ে যান তিনি তার সঙ্গী সাথীদের রেডি হওয়ার জন্য ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করেন তারপর একসাথে মসজিদে রওয়ানা হন। অথচ এতক্ষণে মসজিদে গিয়ে ২/৪ রাকাআত তাহাজ্জুদ পড়া হয়ে যেত! তাই অন্যদের জন্য অপেক্ষা না করে নিজের স্বার্থের কথা ভেবে তাড়াতাড়ি একা বের হয়ে যাওয়া উত্তম। আপনারা সকলে মিলে আগেভাগে ঠিক করে রাখতে পারেন মসজিদের কোন গেটে দিয়ে ঢুকে কোথায় গিয়ে বসবেন বা পরে একসাথে কোথায় মিলিত হবেন। তবে সাথে অসুস্থ ও দুর্বল সাথী থাকলে একসাথে তাদের সহযোগীতা করে মসজিদে নিয়ে যাওয়া ভালো।
■ সকালে মসজিদে যাওয়ার সময় ভালো মতো বাথরুম করে পেট খালি করে যাওয়া উচিত কারণ মসজিদে পরবর্তী ৩-৪ ঘন্টা অতিবাহিত করতে হবে। সাথে ২/৩টি ছোট ৫০০ মিলি পানির খালি বোতল ও শুকনো কিছু খাবার ও ফল যেমন-বিস্কুট, কেক, খেজুর ইত্যাদি নিয়ে যাবেন সাময়িক ক্ষুধা নিবারনের জন্য। খালি বোতল এজন্য নিবেন যেন মসজিদ থেকে ফেরার সময় বোতল ভর্তি করে জমজম পানি নিয়ে রুমে আসতে পারেন তাহলে সবসময় জমজম পানি পান করতে পারবেন। এই খালি বোতল নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি প্রতি ওয়াক্তে স্বলাতের সময় অনুসরণ করলে মক্কায় অবস্থান করা পুরো সময় জমজমের বরকতময় পানি পান করার সুযোগ লাভ করতে পারবেন।
■ একটি পরীক্ষিত ও লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো মসজিদে একসাথে পরিচিত কয়েকজন মিলে বসলে গল্প ও অপ্রয়োজনীয় কথা হয় বেশি। মানুষ দেখানো আমল করার সম্ভাবনাও থাকে। তাই কিছু কিছু আমল করার সময় একাকী থাকাই উত্তম। আপনাকে কেউ চিনে না আর আপনিও কাউকে চিনেন না, এতো লোকের মাঝে নিজে যখন একা আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হবেন জ্বলাতের জন্য বা আল্লাহর জন্য চোখের পানি ফেলে দু'আ করবেন; দেখবেন এক অন্য রকম অনুভূতি কাজ করবে নিজের মাঝে। তখন ইবাদতে মনোযোগ বেশি দিতে পারবেন। তাই সকালে তাহাজ্জুদের সময় সম্ভব হলে একাকী থাকার চেষ্টা করবেন কারণ এই সময়টি বেশি বেশি ইবাদতের জন্য উপযুক্ত।
■ জীবনের সবচেয়ে সেরা তাহাজ্জুদ স্বলাত পড়ার চেষ্টা করতে হবে। স্বলাতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ কিরাত বা বড় সূরা পড়বেন। বড় সূরা মুখস্থ না থাকলে পরপর কয়েকটি ছোট ছোট সূরাই মিলিয়ে ধীরে ধীরে সুন্দর তিলাওয়াত করে পড়বেন। অতঃপর দীর্ঘ রুকু ও সিজদা করবেন। রুকু ও সিজদার তাসবীহগুলো ৫/৬/৭/৮/৯.. বার করে ধীরে ধীরে পড়বেন। অতঃপর সিজদায় আল্লাহর কাছে যা দু'আ করার আছে, যা চাওয়ার আছে তা করবেন। আরবীতে সম্ভব না হলে প্রয়োজনে সিজদায় মাতৃভাষায় দু'আ করুন যা বিশ্বের অধিকাংশ ফাতওয়া বোর্ড ও আলেমগণ মত দিয়েছেন। সিজদায় দু'আর সাথে একটু চোখের পানি আনার চেষ্টা করবেন। অতঃপর বৈঠকে তাশাহুদ ও দরুদের পরে সালাম ফিরানোর আগে আবার কিছুক্ষণ দু'আ করে সালাম ফিরান। ২ রাকাআত তাহাজ্জুদ স্বলাত পড়তে অন্তত ১০-১৫ মিনিট সময় ব্যয় করবেন। দেখবেন অন্তরে অনেক প্রশান্তি নেমে আসবে ইনশা-আল্লাহ। একটা বিষয় মনে রাখবেন, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন 'আহসান আমল'; উত্তম/সুন্দর আমল করার জন্য। 'আকসার আমল'; বেশি আমল বলেন নি কারণ আল্লাহর কাছে কোয়ান্টিটি-র (পরিমান) চেয়ে কোয়ালিটি (গুণমান) পছন্দ। এভাবে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত ২,২,.. রাকাআত করে যে কয় রাকাআত সম্ভব তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল পড়বেন। ফজরের আযানের যখন আর ৫-৭ মিনিট বাকি তখন ১/৩ রাকাআত বিতর স্বলাত পড়ে নিবেন।
■ আমল-২: আযানের জবাব ও দু'আ: এবার যখন ফজরের আযান শুরু হবে তখন আযানের সাথেসাথে আযানের জবাব দিবেন। মুয়ায্যিন আযানে যা বলছেন ঠিক তাই বলতে হবে শুধু 'হাইয়‍্যা আলাস সলাহ' ও 'হাইয়‍্যা আলাল ফালাহ' এরপর 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলতে হবে। এই আযানের জবাব দেওয়ার অভ্যাস আজীবনের জন্য গড়তে হবে। প্রত্যেক স্বলাতের আযান শুনলেই এরপর থেকে আযানের জবাব দিবেন সাথে সাথে। দেখা যায় আমরা অবজ্ঞায় ও বেখেয়াল হয়ে কথা বলি আযানের সময় অথচ কি বিশাল নেকী ও ফযীলত থেকে বঞ্চিত হই। আযান শেষ হওয়ার পরপরই দুরূদে ইবরাহীম পাঠ করবেন এবং আযানের একটি দু'আ আছে তা পাঠ করবেন। এই দু'আটি মুখস্থ থাকা জরুরী। দু'আটি হচ্ছে:
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدَانِ الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَّحْمُودَا نِ الَّذِي وَعَدْتَهُ.
"আল্লাহুম্মা রববা হাযিহিদ দা'ওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালা তিল ক্বাইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াব'আছহু মাক্বামাম মাহমুদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ।” বুখারী-৬১৪।
■ এই আযানের জবাব ও দু'আ পড়ার বিশুদ্ধ ফযীলত রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "তোমরা যখন মুয়ায্যিনকে আযান দিতে শোন তখন সে যা বলে তোমরা তাই বলো। অতঃপর আমার উপর দুরূদ পাঠ করো। কেননা, যে আমার উপর একবার দুরূদ পাঠ করে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। অতঃপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ওয়াসীলাহ প্রার্থনা কর। কেননা ওয়াসীলাহ জান্নাতের একটি সম্মানজনক স্থান। এটা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজনকেই দেয়া হবে। আমি আশা করি, আমি হব সে বান্দা। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আমার জন্য ওয়াসীলাহ প্রার্থনা করবে হাশরের ময়দানে তার জন্য আমার শাফায়াত করা ওয়াজিব (আবশ্যকীয়) হয়ে যাবে।" মুসলিম-৭৩৫,৭৩৬। উল্লেখ্য, উক্ত দু'আর মধ্যে ও শেষে কিছু বাড়তি কথার সংযোজন লক্ষ্য করা যায় যা নিতান্তই দুর্বল হাদীসের উপর ভিত্তি করে সুতরাং তা আমলযোগ্য নয়। এবার ফজরের ফরজ জ্বলাতের পূর্বের দুই রাকাআত সুন্নাত পড়ে নিবেন। উত্তম ও সুন্নাহ পদ্ধতি হলো সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস দ্বারা এই স্বলাত পড়া।
■ আমল-৩: আযান ও ইকামতের মাঝে দু'আ: এবার দু'আ করার জন্য ৫-১০ মিনিট সময় পেয়ে যাবেন ফরজ জ্বলাতের আগে। এখন দু'আ কবুলের সময়। মনে রাখবেন, প্রত্যেক স্বলাতের আযান ও ইকামতের মাঝের সময়টি হলো দু'আ কবুলের সময়। হাদীসে এসেছে এসময়ের দু'আ প্রত্যাখান করা হয় না। এটি শুধু এই মক্কার মসজিদের আযানের জন্য নয় বরং সমগ্র পৃথিবীর যে কোন জায়গার আযান ও ইকামতের মাঝের সময়টি হলো দু'আ কবুলের খুবই ফযীলতপূর্ণ সময়। অথচ এই বিষয়টি আমরা জানিও না, আমলও করি না। পাশাপাশি আরও একটি বিষয় বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা স্বীকৃত রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "মহামহিম আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর নিকটবর্তী প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং তিনি ঘোষনা করতে থাকেন; কে আছো এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছো এমন, যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছো এমন, যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।" বুখারী-১১৪৫। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আপনার নিকটবর্তী হয়ে আপনাকে ডাকছেন, আপনি কি তাঁর ডাকে সারা দিবেন না? আপনি এই যে এতক্ষণ তাহাজ্জুদ পড়লেন আর সিজদায় দু'আ করলেন আর এখন আবার আল্লাহর কাছে দু'আ করবেন এই পুরো সময়টি জুড়ে আল্লাহ প্রথম আসমানে এসে আপনাকে দেখছেন ও আপনার কথা শুনছেন। ও আল্লাহর মেহমানগণ, এমনভাবে আল্লাহকে ডাকুন যেন তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেন। এটাই সময়।
■ আমরা বাঙালিরা আসলে ভালোমতো নিজেরা দু'আ করতে জানি না, এটা আমাদের ব্যর্থতা স্বীকার করতেই হবে কারণ আমরা হুজুর ভাড়া করে দু'আ-মুনাজাত করাই আর আখেরী মুনাজাত ধরি। আমরা ভাবি; আমি গুনাহগার বান্দা আল্লাহ হয়তো আমার কথা শুনবে না কিন্তু হুজুরেরা তো আল্লাহওয়ালা মানুষ, তারা আল্লাহর কাছে আমার কথা বললে আল্লাহ শুনবেন! আমরা নিজেদেরকে অবমূল্যায়ণ করে রেখেছি। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন এই আযান ও ইকামতের মাঝে কতো দেশের কতো সাধারণ লোক বসে কিংবা দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তুলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে কিভাবে দু'আ করছে। তারা জানে কখন কিভাবে আল্লাহকে ডাকতে হয়। আমরা বাঙালিরা অবশ্য এসময় স্বলাত শুরু হওয়ার আগে ঝিমায় ঝিমায় একটু ঘুম দিয়ে নেই অথবা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অন্যদের দু'আ করা দেখি। এরপর ফজরের স্বলাতের ইকামত হয়ে গেলে যথারীতি ফজর স্বলাত জামাআতের সাথে আদায় করবেন।
■ আমল-৪: ফরজ স্বলাতের পর দুআ ও তাসবীহ ইমামের সালাম ফিরানোর পরপরই বেশকিছু তাসবীহ, দু'আ ও যিকির আছে সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত যা করতে হবে। এই তাসবীহ, দু'আ ও যিকিরগুলো এখন থেকে প্রত্যেক ফরজ স্বলাতের সালাম ফিরানোর পরপরই করার অভ্যাস গড়ে তুলবেন আজীবনের জন্য। এটাই সর্বোত্তম সুন্নাহ পদ্ধতি। অশেষ নেকী ফযীলত নিহীত আছে এর মধ্যে। এই তাসবীহ, দু'আ ও যিকিরগুলো করতে আনুমানিক ৭-৮ মিনিট সময় লাগবে। এই মাসনূন দু'আ ও যিকির করার মাঝে জানাযার জ্বলাত হতে পারে। জানাযা আদায় করে দু'আ ও যিকিরসমূহ শেষ করবেন।
■ আমল-৫: সকাল-সন্ধ্যার দুআ ও যিকির জানাযার পর জ্বলাতের জায়গায় বসেই তাসবীহ, তাহলীল, দু'আ এবং বেশকিছু সকাল ও সন্ধ্যার যিকির আছে যেগুলো পাঠ করে পার করতে হবে পরবর্তী ১ ঘন্টা সময়। সূর্য পূর্ণ উদয় হওয়া পর্যন্ত এই দু'আ ও যিকির জারি রাখতে হবে। হিসনুল মুসলিম মোবাইল এ্যাপসের যিকর-ঘুম অধ্যায়ের ২৭ নং (সকাল ও বিকালের যিকরসমূহ) ধারাবাহিকভাবে সবগুলো পড়তে পারেন। অথবা "তাফসীরুল উশরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম" বইয়ের ১৬৩-১৬৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সকল দু'আ-যিকিরগুলো পড়তে পারেন।
■ আমল-৬ : ইশরাক জ্বলাত সূর্য উদয় হওয়া থেকে শুরু করে ১৭/১৮ মিনিট পর অর্থাৎ সূর্য পূর্ণ উদয় হওয়ার পর ২ রাকাআত যোহা/ইশরাক (নফল) স্বলাত পড়তে হবে। দেখবেন মসজিদে সময়ের ঘড়িতে ইশরাক লিখে সময় দেওয়া আছে। ঐ ইশরাক সময় হলো সূর্য উদয় হওয়ার সময়। তার সাথে আরও ১৭/১৮ মিনিট যোগ করে নিবেন। আপনার সাথে যদি স্বলাতের সময়ের মোবাইল এ্যাপস থাকে তবে সহজেই বুঝতে পারবেন।
■ ইশরাক জ্বলাতের ফযীলত; রাসূল(স) বলেছেন, "সকাল হতেই তোমাদের প্রত্যেকের শরীরের প্রতিটা অস্থির জন্য সাদাকাহ দেওয়া অবশ্য দায়িত্ব। অতএব প্রতিটা তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ বলা সাদাকাহ, প্রতিটা তাহমীদ অর্থাৎ আলহামদুলিল্লাহ বলা সাদাকাহ, প্রতিটা তাহলীল অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা সাদাকাহ, প্রতিটা তাকবীর অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলা সাদাকাহ। নেক কাজের নির্দেশ করা সাদাকাহ। মন্দ কাজের নিষেধ করা সাদাকাহ। আর এসবের পরিবর্তে যোহার দুই রাকাআত স্বলাত আদায় করে নেওয়া যথেষ্ট।” মিশকাতুল মাসাবিহ-১৩১১। আরও বড় একটি ফযীলত শুনুন; রাসূল (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ফজরের স্বলাত জামআতে আদায় করে তারপর সূর্য উঠা পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর যিকির করে, তারপর দুই রাকাআত নামায আদায় করে তার জন্য একটি হজ্জ ও একটি উমরাহর সাওয়াব রয়েছে। আনাস(রা.) বলেন, রাসূল(স) বলেছেন: পূর্ণ, পূর্ণ, পূর্ণ (হজ্জ ও উমরাহর সাওয়াব)।" তিরমিযী-৫৮৬।
■ আমল-৭: নফল তাওয়াফ ইশরাক স্বলাত পড়া হয়ে গেলে অতঃপর ১টি নফল তাওয়াফ করার জন্য এখন তাওয়াফের গ্রাউন্ড ফ্লোর মাতাফে চলে আসবেন। সাধারণত দেখা যায় ইশরাকের পর তাওয়াফের ভীড় কম থাকে। এ সময়ে ৭ চক্কর দিয়ে ১টি তাওয়াফ শেষ করতে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগতে পারে। অবশ্য হজ্জ এর সময় নিকটবর্তী হলে তখন ১টি তাওয়াফ করতে ১ ঘন্টাও লেগে যায়। তাওয়াফ একাকী করবেন অথবা সাথে মহিলা থাকলে সাথে নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে করবেন। মানুষজনের সাথে পাল্লা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বা ঠেলা-ঠেলি করে আগে যাওয়ার তাড়না নিয়ে তাওয়াফ না করা উত্তম। প্রশান্তির সাথে দু'আ- যিকির ও তিলাওয়াত করতে করতে স্বভাবিকভাবে হেঁটে হেঁটে তাওয়াফ করবেন। তাওয়াফে চোখের পানি নিয়ে আসুন। এই নফল তাওয়াফে কোন ইযতেবা নেই, রমল নেই উমরাহর প্রথম তাওয়াফ করার মতো। শুধুই সাধারণ ভাবে হাঁটা। বাকি তাওয়াফ করার অন্যান্য সকল নিয়ম প্রযোজ্য হবে উমরাহ'র তাওয়াফ করার মতো। তাওয়াফ শেষে ২ রাকাআত নফল স্বলাত পড়তে হবে। ১টি তাওয়াফ করার পর যদি শরীরে সামর্থ্য থাকে তবে চাইলে আরও ১/২টি তাওয়াফ করা যেতে পারে। তাওয়াফ করার নেকী অপরিসীম। দেশে ফিরে এসে স্বলাত অনেক পড়া যাবে কিন্তু এই তাওয়াফ আর করা যাবে না। তাই একটু কষ্ট করে তাওয়াফ করার চেষ্টা করতে পারেন। যেহেতু তখনো তাওয়াফের ফ্লোরে সূর্যের তেমন আলো পড়ে নাই এবং লোকের ভীড় কম থাকে তাই তখনই তাওয়াফ করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এবার তাওয়াফ ও স্বলাত শেষ করে খালি বোতলগুলো জমজমের পানি ভরে নিয়ে এবং পেট ভর্তি করে জমজমের পানি পান করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। এভাবে দৈনন্দিন আমলের সকালের প্রথম পর্ব সম্পন্ন হলো।
■ আমল-৮: চাশত ও আউয়াবিনের স্বলাত হোটেলে এসে সকালের চা-নাস্তা খেয়ে এবার একটা ঘুম দিবেন অথবা বিশ্রাম নিবেন। সম্ভব হলে সকাল ৮.৩০/৯.০০ টার পর ২ রাকাআত যোহা/চাশতের স্বলাত পড়বেন। এরপর সম্ভব হলে সূর্য মধ্যম আকাশে পৌঁছনোর আগে অর্থাৎ যোহরের ওয়াক্ত হওয়ার একটু আগে ২ রাকাআত যোহা/আউয়াবিনের জ্বলাত পড়বেন। যোহার স্বলাতের ফযীলত বর্ণনায় রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "এক স্বলাতের পড়ে আরেক স্বলাত যার মধ্যবর্তী সময়ে কোন গুনাহ হয়নি, তা ইল্লীয়িয়নে (উচ্চ মর্যাদায়) লিপিবদ্ধ করা হয়।” আর দাউদ-১২৮৮। এই সুন্নাহ আমলগুলো আমাদের একদম অজানা ও অপ্রচলিত। এই মৃত সুন্নাহগুলো জানুন এবং পালন করে তা জীবিত করুন। রাসূল (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার একটি (মৃত) সুন্নাতকে জীবিত করলো এবং লোকেরা তদানুযায়ী আমল করলো, সেও আমলকারীদের সমপরিমান পুরষ্কার পাবে এবং তাতে আমলকারীদের পুরস্কার আদৌ হ্রাস পাবে না..।" ইবনে মাজাহ-২০৯।
■ আমল-৯: তাহিয়াতুল মসজিদের জ্বলাত যোহরের জ্বলাতের সময় মসজিদে প্রবেশ করে আযান না হয়ে থাকলে অবশ্যই ২ রাকাআত তাহিয়‍্যাতুল মসজিদ স্বলাত পড়ে অতঃপর মসজিদে বসতে হবে। এই সুন্নাহ আমলটির চর্চা আমাদের মাঝে একদম নাই বললেই চলে বরং আমরা এর বিপরীত আমল করি। অর্থাৎ আগে মসজিদে ঢুকে একটু বসি তারপর উঠে স্বলাত পড়ি অথচ এমন করা সুষ্পষ্ট হাদীসের বিপরীত কাজ। যে কোন মসজিদে প্রবেশ করলে আগে মসজিদের হকু আদায় করে (২ রাকাআত স্বলাত পড়ে) বসতে হবে, এমনটাই রাসূল(ﷺ) এর নির্দেশ; যদি না কোন ফরজ স্বলাতের ইকামত/জামাআত শুরু হয়ে যায়। এমনকি স্বলাতের মাকরুহ সময়ে ও জুমআর খুতবা চলাকালিন মসজিদে প্রবেশ করা সাহাবীকে রাসূল(১) ২ রাকাআত স্বলাত পড়ে তারপর বসতে বলেছেন। রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বসার পূর্বে দুই রাকাআত স্বলাত আদায় করে নেয়।" বুখারী-৪৪৪, মুসলিম-৭৩০। অতএব রাসূল(ﷺ) এর উম্মত হিসাবে এখন থেকে এই চর্চা গড়ে তুলুন বাকি জীবনের জন্য। যদি আযান হয়ে যাওয়ার পর মসজিদে প্রবেশ করে যোহরের ৪ রাকাআত সুন্নাত পড়া শুরু করে দেওয়া হয় তবে উক্ত স্বলাত দ্বারাই তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় হয়ে যায়। আর আলাদা তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার প্রয়োজন নাই। যোহরের আযান ও ইকামতের মাঝে দু'আ কবুলের সময় হাত তুলে কিছুক্ষণ দু'আ করা।
■ আমল-১০: তাহিয়াতুল ওযুর স্বলাত আরও একটি আমল করতে পারেন - তাহিয়‍্যাতুল ওযুর ২ রাকাআত স্বলাত পড়ুন। এটিও একটি মৃত সুন্নাত। মাঝেমাঝে ওযু করার পর ২ রাকাআত স্বলাত পড়বেন। এসব ছোট ছোট আমলকে মোটেই তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। না জানি কোন আমলের ওসিলায় আল্লাহ আপনার উপর খুশি হয়ে যান, না জানি কোন আমলের ওসিলায় আল্লাহ আপনাকে মাফ করে দেন। তাহিয়‍্যাতুল ওযুর ফযীলত নিয়ে একটি হাদীস শুনুন - রাসূল(ﷺ) ঊর্ধ্বগগণে মিরাজে গিয়ে জান্নাত দেখেছেন তখন তিনি জান্নাতের ভিতরে বেলাল (রাঃ) এর পায়ের হাঁটার শব্দ শুনতে পেয়েছেন। পরবর্তীতে এসে তিনি বেলাল (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তুমি এমন কি আমল করো যার কারণে তোমার পায়ের হাঁটার শব্দ আমি জান্নাতে শুনতে পেলাম। বেলাল(রাঃ) বলেছিলেন, আমি তো তেমন ব্যতিক্রমী আমল কিছু করি না, তবে আমি যখন ওযু করি তখন সবসময় ২ রাকাআত তাহিয়্যতুল ওযুর স্বলাত পড়ি।
■ আমল-১১: সকাল-সন্ধ্যার দুআ ও যিকির যোহরের স্বলাতের পর হোটেলে ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে একটু শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে বা সংক্ষিপ্ত ঘুম দেওয়া যেতে পারে। এরপর আসরের স্বলাতের জন্য প্রস্তুতি। এমন প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে একেবারে আসর, মাগরিব ও এশা পড়ে হোটেলে ফেরা হবে। কারণ এই স্বলাতগুলোর মাঝে সময় কম থাকে। প্রতি ওয়াক্তে বারবার হোটেলে যাওয়া আসা করলে যাওয়া-আসাতে অনেক সময় চলে যায়। আর দিনের ২য় পর্বের দৈনন্দিন আমল করার বিষয় আছে। তাই সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসরের স্বলাতের সময় বের হতে হবে। আসরের স্বলাতের পর থেকে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত তাসবীহ, তাহলীল, দু'আ, ইসতিগফার ও কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে এবং সকাল ও বিকালের যিকিরগুলো করে পার করতে হবে পরবর্তী ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট সময়। বিশেষ করে জুমআর দিন আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টুকু দু'আ কবুলের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়। এসময় বেশি বেশি দুরূদ পড়বেন ও দু'আ করবেন আল্লাহর কাছে। আসর থেকে মাগরিবের মাঝে চাইলে ১টি তাওয়াফও করে ফেলা যেতে পারে যেহেতু এসময় সূর্যের তাপ কমে যায় এবং ভীড় কিছুটা কম থাকে। তবে মাগরিবের পর থেকে তাওয়াফের চাপ বাড়তে থাকে।
■ আমল-১২: তাওবা-ইসতেগফার ইতিপূর্বে হজ্জের পূর্বপ্রস্তুতির সময় বলা হয়েছিল সাথে করে কবীরাহ গুনাহের লিষ্ট করে নিয়ে আসার জন্য। জীবনে করা কবীরাহ গুনাহের বিষয়ে একাকী তাওবা ইসতিগফার করার উত্তম সময় এটি। নিজের গুনাহের বিষয় গোপনীয় রাখতে হবে এবং কারো কাছে তা প্রকাশ করা যাবে না। মক্কায় মদীনায় এবং হজ্জের সময় মিনা ও আরাফায় কবীরাহ গুনাহের থেকে তাওবা ইসতিগফার করবেন।
■ আমল-১৩: ইসলামী জ্ঞান আহোরণ মাগরিব থেকে এশা পর্যন্ত সময় জ্ঞান অন্বেষণে ও পড়াশুনায় ব্যয় করা যেতে পারে। মসজিদের দ্বিতীয় তলার লাইব্রেরীতে অথবা মসজিদের যে কোন জায়গায় বসে কুরআন অধ্যয়ন করা। মসজিদের কিং ফাহাদ গেট (৭৯ নং গেট) এর ডানপাশের সিড়ি দিয়ে উপরে দ্বিতীয় তলায় উঠে গেলে একটি লাইব্রেরী দেখতে পাবেন। সেখানে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রচুর বই, অডিও, ভিডিও দেখতে পাবেন যেগুলো নিয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা করতে পারেন। লাইব্রেরী সকলের জন্য উন্মুক্ত। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে রাখা আছে। বাংলা বইও আছে ওখানে বেশ কিছু। লাইব্রেরীতে দারুস সালাম প্রকাশনীর বাংলা কুরআন ও হাদীসগ্রন্থসমূহ পেয়ে যাবেন।
■ আমল-১৪: কুরআন পড়া ও মুখস্ত আগেই অবগত করেছিলাম এই পুরো হজ্জ সফরে টার্গেট রাখতে হবে পুরো কুরআনের অর্থ বুঝে পড়ে শেষ করতে হবে। অতএব সেভাবে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা করে বুঝে কুরআন পড়তে হবে। মসজিদের ভিতরে বুক শেলফে মদিনার কিং ফাহাদ প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপানো ২ খন্ডের বাংলা অর্থসহ আবু বকর জাকারিয়া'র সংক্ষিপ্ত তাফসীর দেখতে পাবেন। সেটি নিয়েও পড়তে পারেন। আবার যেসব নতুন সূরা ও দু'আ মুখস্থ করার টার্গেট নিয়ে এসেছেন সেগুলো মুখস্থ করতে পারেন।
■ আমল-১৫: দারস/হালাকা অংশগ্রহণ এছাড়াও মসজিদের ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় বাংলা/উর্দু/ইংরেজী/আরবী ভাষায় হালাকা/দারস বা আলোচনা হয়। যে ভাষার আলোচনা আপনার বুঝার সামর্থ্য আছে সেখানে বসে কিছুক্ষণ আলোচনা শুনুন। কিছু না বুঝলেও কিছুক্ষণ বসে দেখুন আরবের আলেমগণ কিভাবে ও কেমন আলোচনা করেন। কুরআনের ও দ্বীনের আলোচনায় বসলে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা বেষ্টন করে থাকেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত নাযিল হতে থাকে। অতএব এই সুযোগগুলো গ্রহণ করবেন।
■ আমল-১৬: ইসলামি বই সংগ্রহ ও বিতরণ মসজিদের ভিতরে ও বাইরে বেশ কিছু বুথ থেকে ফ্রি বই ও লিফলেট বিতরণ করে বিভিন্ন ভাষার। ওখানে গিয়ে শুধু বলবেন 'বাংলা'। বাংলা বই থাকলে আপনাকে কয়েক কপি দিয়ে দিবে। বই না থাকলে পরে আবার অন্য সময় গিয়ে খোঁজ করবেন। কিছু সুপ্রসিদ্ধ বই "হাজ্জীদের সম্বল", "হিসনুল মুসলিম", "তাওহীদ সংরক্ষণ", "তাওহিদী দূর্গ”, "আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ এর আক্বীদা", "হজ্জ, উমরাহ ও মসজিদে রাসূল যিয়ারাহ গাইড" ইত্যাদি পাবেন। "তাফসীরুল উশরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম" এই বইটি অবশ্যই সংগ্রহ করবেন। ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও আমলসমূহ ও প্রচুর সহীহ দু'আ পাবেন এই বইটিতে। মক্কা লাইব্রেরী (রাসূল (ﷺ)এর কথিত জন্মস্থান) থেকে আসর-মাগরিব স্বলাতের পর প্রচুর পরিমানে বই বিতরণ করে। এছাড়াও ওখানে আশেপাশে অনেক বইয়ের দোকানে দারুস সালাম প্রকাশনীর ছাপানো বাংলায় বেশ কিছু ভালো ভালো বই পাবেন যা ক্রয় করে পড়তে পারেন। কিছু বই সংগ্রহ করে নিজে পড়বেন ও অন্যদের মাঝেও বই বিতরণ করবেন। বই বিতরণ মানেই জ্ঞান বিতরণ। যে ঐ বই পড়ে আমল করবে তখন তার আমলের নেকীর সমপরিমান আপনি কমিশন পাবেন!
■ আমল-১৭: নফল তাওয়াফ এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে দুআ ও যিকির এশার স্বলাতের পর বিতর স্বলাত পড়বেন না যেহেতু ভোররাতে তাহাজ্জুদ পড়বেন। কারণ বিতর হলো রাতের শেষ স্বলাত যা তাহাজ্জুদ পড়ার পর পড়বেন। এশার পর চাইলে একটা তাওয়াফ করে হোটেলে ফিরতে পারেন। এশার পর অন্তত ১ ঘন্টা তাওয়াফের ভীড় থাকে। এই ভীড়ের মধ্যে তাওয়াফ করে ফেলতে পারেন। সাধারণত এশার পর ধীরে ধীরে সবাই রাতের খাবার খাওয়ার জন্য মসজিদ ছেড়ে চলে যায়। হোটেল কাছাকাছি হলে রাতের খাবার খেয়ে এসে একটা তাওয়াফ করতে পারেন। তখন একদম হালকা পাবেন তাওয়াফের ভীড়। রাতে ঘুমানোর পূর্বে ঘুমানোর সুন্নতি আমল ও বিবিধ যিকির করার মাধ্যমে ঘুমাতে যাবেন যেন রাতের পুরো ঘুমটি ইবাদত হিসাবে পরিগনিত হয়। ঘুমানোর পূর্বের আমলগুলো আপনার জন্য হোম ওয়ার্ক হিসাবে দিয়ে দিলাম।
■ আলহামদুলিল্লাহ, এভাবে যদি অন্তত আপনি দিন অতিবাহিত করার পরিকল্পনা করেন তবে আশা করা যায় আপনি সময়ের সদ্ব্যবহার করেছেন এবং উত্তম আমল দ্বারা দিন অতিবাহিত করেছেন। আপনাকে আরও বেশি আমল করতে নিষেধ করবো না। আপনি যদি সাধ্যমত আরও অন্য কিছু বা বেশি আমল করতে পারেন তবে অবশ্যই করবেন। সুন্নাহর আলোকে উত্তম পন্থা হলো কম আমল কিন্তু বিশুদ্ধ আমল এবং প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে করা।
■ নিম্নে কিছু ব্যতিক্রমী আমলের কথা উল্লেখ করছি যা করার পরিকল্পনা রাখতে পারেন। যেমন -
■ আমল-১৮: ইতেকাফ এক রাত ও এক দিন (২৪ ঘন্টা) মসজিদে নফল ইতেকাফ করতে পারেন। ইতেকাফ এর নিয়তে প্রস্তুতি নিয়ে মাগরিবের আযানের আগে মসমজিদে প্রবেশ করে পর দিন মাগরিবের পর মসজিদ থেকে বের হবেন। ইতেকাফকালীন সময়ে মসজিদে অবস্থান করে বেশি বেশি আমল করতে পারবেন। মহিলারাও মসজিদে ইতেকাফ করতে পারেন। আপনার অন্য হজ্জ সাথীরা আপনার জন্য মসজিদে হালকা কিছু খাবার নিয়ে আসতে পারে যা খেয়ে আপনি থাকতে পারেন।
■ আমল-১৯: সোমবার ও বৃহস্পতিবার সিয়াম: সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়াম বা রোজা রাখতে পারেন। দেখবেন অনেক লোক এই দুইদিন রোজা রাখে এবং মসজিদে মাগরিবের আগে প্রচুর ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়।
■ আমল-২০: স্বলাতুল কুসূফ ও খুসূফ এবং ইসতিসকার স্বলাত স্বলাতুল কুসূফ (সূর্যগ্রহণ) ও খুসূফ (চন্দ্রগ্রহণ) এর স্বলাত পড়া। যদি আপনার সফরের মাঝে কোন গ্রহণ হয় তবে দেখবেন ঐ সময়ে দীর্ঘ ২ রাকাত স্বলাত জামাআতে পড়া হবে। ২ রাকাআত স্বলাত পড়তে ৩০-৪০ মিনিট সময় নিয়ে থাকে সাধারণত। এই স্বলাতের নিয়ম কিছুটা ভিন্ন। এমন বিরল সুন্নাহ পালন করার সুযোগ পেলে অবশ্যই তা গ্রহণ করবেন। আবার ইসতিসকার স্বলাত (বৃষ্টি প্রার্থনা) পড়ার সুযোগ পেলে অবশ্যই পড়বেন।
■ আমল-২১: সাদাকা সামর্থ্য থাকলে একটি চেয়ার বা কয়েক কেজি খেজুর বা যে কোন খাবার বা কিছু মিসওয়াক কিনে মসজিদের ভিতরে বা বাইরে লোকজনের মাঝে বিতরণ করবেন। এটা একটি সাদাকাহ হিসাবে বিবেচিত হবে। কত লোককে দেখবেন এমন কাজ করছে ওখানে।
■ আমল-২২: পানি পান করানো জমজম পানি ও টিস্যু বিতরণ করতে পারেন তাওয়াফরত বা সাঈরত মানুষদের মাঝে। আপনি গেলেই দেখবেন এমন তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র কাজ করছে কত আল্লাহর বান্দা ওখানে অথচ খোঁজ নিয়ে দেখবেন কত বড় পেশাজীবি বা অর্থসম্পদের মালিক সেই মানুষগুলো। মানুষকে পানি করানোর উত্তম আমল এবং এর নেকী অপরিসীম।
■ আমল-২৩: বিপদগ্রস্থকে সাহায্য করা মসজিদে প্রথমবার এসে অনেক বয়স্ক মানুষ দল ছাড়া হয়ে হারিয়ে যান। দেখা যায় তারা মসজিদে ঘোরাফেরা করে মানুষের কাছে ঠিকানা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এমন কাউকে পেলে যথাসাধ্য তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবেন। তার হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবেন অথবা সৌদি পুলিশের কাছে পৌঁছে দিবেন। পুলিশ তার এজেন্সী খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
■ আমল-২৪: মিসওয়াক, ওযু ও সালাম চর্চা: প্রত্যেক ওযুর পূর্বে মিসওয়াক করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। সর্বদা পাক পবিত্রতা অবলম্বনের জন্য ওযু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা উত্তম। যখনই প্রসাব-পায়খানা করবেন তখনই ওযু করে ওয়াসরুম থেকে বের হবেন। পরিচিত কি অপরিচিত সকলের সাথে বেশি বেশি সালাম আদান-প্রদান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সালাম যে কত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আমল তা একটু পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করবেন।
■ আমল-২৫: দৈনন্দিন দুআ চর্চা: দৈনন্দিন সাধারণ কাজকর্মের ক্ষেত্রে কিছু সুন্নাহ আমল ও দু'আ চর্চা শুরু করবেন। যেমন ঘুম থেকে উঠার পর দু'আ, বাথরুম প্রবেশ ও বের হওয়ার দু'আ, পানাহারের শুরু ও শেষে দু'আ পড়া, পোষাক পরিধানের দু'আ, ঘর থেকে বের হওয়া ও প্রবেশের সময় দু'আ, হাঁচিদাতা ও শ্রোতার জন্য দু'আ, ঘুমাতে যাওয়ার সময় দু'আ ইত্যাদি।
■ আমল-২৬: ইসলাহ ও তাবলীগ আপনি দৈনন্দিন যে আমলগুলো করবেন তা অন্যদের শিক্ষা দিন। উদ্দেশ্য হবে আপনি কি আমল করেন তার প্রচার করা নয় বরং আপনি অন্যদের কোন আমলগুলো এখানে করলে বেশি সাওয়াব অর্জন করা যাবে সেই বিষয়ে তাগীদ দিবেন। পাশাপাশি আপনি দৈনন্দিন পড়াশুনার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করবেন তা অন্যদের সাথে শেয়ার করবেন, ইসলামের বিষয় নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করবেন। নিজেদের আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনমুখি হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আপোষে আলোচনা করবেন।
■ উপরোক্ত যে আমলগুলো জানলেন ও করলেন তা শুধু এই মক্কার দিনগুলোর জন্য নয় বরং মদিনায় অবস্থান করা দিনগুলোর জন্যও। এমনকি হজ্জ শেষে জীবনের বাকি দিনগুলোতে এই আমলগুলো প্রতিনিয়ত করার জন্য আল্লাহর কাছে তৌফিক কামনা করবেন এবং দেশে ফিরে এসে আমলগুলো করার বিষয়ে সচেষ্ট হবেন। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন!

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 মসজিদের আদব এবং পালনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ

📄 মসজিদের আদব এবং পালনীয় ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ


নিম্নে সংক্ষেপে মসজিদের হক্ব ও আদব এবং মসজিদে পালনীয় ও বর্জনীয় সংক্রান্ত কতিপয় বিষয় আলোচনা করা হলো:
০১. মসজিদের মূল হক্ব আদায় হলো পুরুষরা ফরয স্বলাতসমূহ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করবে। সূরা আন নিসা; ৪:১০৩
০২. মসজিদে প্রত্যেকে ওয়াক্তে উত্তম ও ভালো পোষাক পরিধান করে স্বলাত পড়তে যাওয়া। সুর আল আরাফ: ৭:৩১
০৩. উত্তম হলো পবিত্রতা অর্জন করে মসজিদে প্রশান্তির সাথে ধীরস্থিরভাবে প্রবেশ করা। বুখারী-৬৩৬
০৪. মসজিদে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলে দরুদ ও দুআ পাঠ করে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা এবং বের হওয়ার সময় দরুদ ও দুআ পাঠ করে বাম পা দিয়ে বের হওয়া। মুসলিম-১৫৩৭, নাসায়ী-৭২৯
০৫. মসজিদের হক্ব আদায় তথা মসজিদে প্রবেশের পর ২ রাকাত তাহিয়াতুল মসজিদ স্বলাত পড়ে অতঃপর মসজিদে বসা। বুখারী-৪৪৪, ১১৬৩
০৬. জুমআর খুতবা চলাকালীন সময়েও ২ রাকাত তাহিয়াতুল মসজিদ স্বলাত পড়ে মসজিদে বসা। বুখারী-৯৩০
০৭. মহিলারা যথাযথ পর্দা করে ও সৌন্দর্য্য প্রকাশ না করে মসজিদে যাওয়া। সুরা নূরঃ ২৪:৩০, সূরা আহযাব: ৩৩:৩৩
০৮. কোন মহিলা মসজিদে আসতে চাইলে (এমনকি রাতে) তাকে মসজিদে আসতে অনুমতি দেওয়া। বুখারী-৮৬৫, ৮৭৩
০৯. মসজিদে ঢুকে যথাসম্ভব সামনের কাতারে যেখানে খালি জায়গা আছে সেখানে অবস্থান গ্রহন করা। আবু দাউদ-১১০৮
১০. মসজিদে জামাতের ইকামত হয়ে গেলে আর কোন স্বলাত (নফল, সুন্নত) নেই, প্রয়োজনে সুন্নত ছেড়ে জামাতে শামিল হওয়া বাঞ্চনীয়। মুসলিম-১৬৭৮, আবু দাউদ- ১২৬৭
১১. মসজিদে স্বলাতের জামাত চলাকালীন প্রয়োজনে মুসল্লীদের কাতারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়েজ। বুখারী-৪৯৩
১২. মসজিদে প্রয়োজনে বাম পাশে, পায়ের নিচে বা কাপড়ের ভাঁজে থুথু ফেলে তা মুছে ফেলা যায়েজ। বুখারী-৪০৫, ৪১৬
১৩. মসজিদে নফল (সুন্নাহ) পড়ার সময় সামনে কোন সুতরা (কাঠদন্ড, টুপি, জুতা, ব্যাগ) বা দেয়াল বা পিলারের সামনে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ানো। আবু দাউদ-৬৯৫
১৪. মসজিদে নফল নামাজরত অবস্থায় মুসল্লা বা সুতরার মধ্য দিয়ে কেউ গমণ করতে গেলে তাকে হাত দিয়ে বাধা দেওয়া। বুখারী-৫০৯, ইবনে মাযাহ-৯৫৪
১৫. মসজিদে জামাতে ফরজ স্বলাতের পর ইমাম ও মুসল্লী উভয়েই জায়গা পরিবর্তন করে নফল (সুন্নত) স্বলাত পড়া। আবু দাউদ-৬১৬, ১০০৬, ইবনে মাযাহ-১৪২৮
১৬. মসজিদে ছোট বাচ্চা ও শিশুকে কোলে ও কাঁধে নিয়ে ইমামতি করা ও স্বলাত পড়া যায়েজ। বুখারী-৫১৬
১৭. প্রত্যেক আযান ও ইকামতের মাঝে নফল/সুন্নত স্বলাত পড়ার জন্য কিছু সময় বিরতি দেওয়া। বুখারী-৬২৪, নাসায়ী-৬৮১
১৮. জামাতের নামাজে ইমামের ভুল সংশোধনে পুরুষরা 'সুবহানআল্লাহ' বলে এবং মহিলারা 'হাত তালি' দিয়ে লুকমা দিবে। ইবনে মাযাহ-১০৩৬
১৯. জুমআর খুতবা চলাকালীন ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বা ইমামের দিকে মুখ করে বসা। ইবনে মাযাহ-১১৩৬, আবু দাউদ-১১০৮
২০. মসজিদে স্বলাতরত অবস্থায় প্রয়োজনে ক্ষতিকারক প্রাণী যথা- বিছা, সাপ, মশা মারা যায়েজ। ইবনে মাযাহ-১২৪৫
২১. মসজিদে মানুষজনকে আসতে না দেওয়া বা মসজিদে আল্লাহর ইবাদতে বাধা দেওয়া। সূরা আল বাকারাহ; ২:১১৪
২২. মসজিদে আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি অন্য কাউকে ডেকে বা শরীক করে ইবাদত না করা। সূরা আল জীন; ৭২:১৮
২৩. মসজিদে অপবিত্র, কষ্টদায়ক ও দূর্গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনা ও কফ-থুথু না ফেলা। বুখারী-৪১৫, নাসায়ী-৭২৩
২৪. বড় নাপাকী অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া এবং মসজিদে শরীরের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত না করা। বুখারী-৪৪২
২৫. মসজিদে উচ্চ আওয়াজে কথা, চিৎকার, হৈচৈ, শোর-গোল না করা। মুসলিম-১০০২, বুখারী-৪৭০
২৬. কাঁচা পিয়াজ ও রসুন খেয়ে মসজিদে না যাওয়া। অনুরুপ শরীর, বস্ত্র ও মুখ দূর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া। বুখারী-৮৫৪
২৭. মসজিদে তাড়াহুড়া করে প্রবেশ না করা বা দ্রুত দৌড় দিয়ে গিয়ে রুকু বা জামাত না ধরার চেষ্টা করা। বুখারী-৬৩৬
২৮. মসজিদে প্রবেশ করে (বিশেষত জুমআর দিন) মানুষের কাঁধ ডিঙ্গিয়ে সামনের কাতারে এগিয়ে না যাওয়া। ইবনে মাযাহ-১১১৫
২৯. মসজিদে উচ্চস্বরে শব্দ করে কুরআন তিলাওয়াত না করা যাতে জ্বলাত আদায়কারীর কষ্ট হয়। আবু দাউদ-১৩৩২
৩০. মসজিদে কোন হারানো বস্তুর খোঁজ না করা বা হারানো বস্তুর ঘোষনা না করা। তিরমিযী-১৩২১, নাসায়ী-৭১৭
৩১. মসজিদের ভেতরে বা মাইকে ঘোষনা করে মানুষের মৃত্যু সংবাদ প্রচার না করা। তিরমিযী-৯৮৬, ইবনে মাযাহ-১৪৭৬
৩২. মসজিদে বেচা-কেনা না করা বেচা- কেনার ঘোষনা না করা বা ব্যবসায়িক টাকা-পয়সা লেনদেন না করা। তিরমিযী-১৩২১
৩৩. মসজিদের কোন একটি স্থানকে নির্ধারিত করে সেখানে সবসময় স্বলাত না পড়া। আবু দাউদ-৮৬২, ইবনে মাযাহ-১৪২৯
৩৪. মসজিদে চেয়ার, জায়নামাজ দিয়ে কারো জন্য কোন নির্ধারিত জায়গা দখল বা বরাদ্দ করে না রাখা। আবু দাউদ-৮৬২
৩৫. ইসলামী শরীয়তের শান্তির সাজাসমূহ বা যে কোন প্রকার শান্তি মসজিদের ভিতরে কায়েম না করা। ইবনে মাযাহ-৭৪৮
৩৬. মসজিদকে দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ী ঘুমানোর জায়গা হিসাবে ব্যবহার না করা। বুখারী-৪৪২
৩৭. মহিলারা কোন প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে ও ঘরের বাইরে না যাওয়া। মুসলিম-৪৪৩
৩৮. মহিলারা হায়েজ ও নেফাক অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া। আবু দাউদ-২৬১
৩৯. মসজিদে পুরুষ-মহিলা পাশাপাশি না দাঁড়ানো বা মহিলার পিছনে পুরুষ দাঁড়িয়ে স্বলাত না পড়া。
৪০. মসজিদে জুমআর দিনে খুতবা চলাকালীন পায়ের হাঁটু উচু করে জড়িয়ে ধরে না বসা। আবু দাউদ-১১০, তিরমিযী-৫১৪
৪১. মসজিদে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য ইতিকাফ করা আবশ্যক। বুখারী-২০৩৩
৪২. সমাজের জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যক্তিগণ মসজিদে ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসা। মুসলিম-৮৫৮
৪৩. কবরের উপর মসজিদ বা মসজিদের সীমানার ভিতর কবর বা কোন কবর কেন্দ্রিক মসজিদ নির্মাণ না করা। বুখারী-৪৩৭, মুসলিম-১০৭৫
৪৪. মসজিদে থাকা অবস্থায় আযান হয়ে গেলে বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয়ে না যাওয়া। মুসলিম-১৩৭৭
৪৫. প্রতিযোগীতামূলক বা সুনামের জন্য নকশা ও কারুকার্যখচিত করে মসজিদ নির্মাণ না করা। আবু দাউদ-৪৪৮, নাসায়ী-৬৮৯

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 দু‘আর আদব ও সুন্নাহ পদ্ধতি এবং দু‘আ কবুলের সময় ও স্থানসমূহ

📄 দু‘আর আদব ও সুন্নাহ পদ্ধতি এবং দু‘আ কবুলের সময় ও স্থানসমূহ


■ দু'আ সম্পর্কে রাসূল (স) বলেছেন, দু'আই ইবাদত। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে সকল আবেদন ও চাওয়া ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (স) দু'আর বিষয়ে তাগিদ দিয়ে আরও বলেছেন; ছোট ছোট প্রয়োজন পূরণের জন্য তোমরা আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়, এমনকি তা যদি জুতার ফিতা চাওয়ার মত সামান্য বিষয় হয়। দু'আ মুমিনের ভাগ্যকে পরিবর্তন করার একমাত্র হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার করা দু'আকে অত্যাধিক পছন্দ করেন। যে আল্লাহর কাছে চায় না আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হন। রাসূল (স) বলেছেন, যে মুসলিমই দু'আ করবে, তাতে কোন গুনাহ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকলে আল্লাহ তাকে ৩টি জিনিসের কোন একটি অবশ্যই দান করবেন: ১. আল্লাহ হয় তার দু'আ দ্রুত কবুল করবেন, ২. তার দু'আ পরকালের জন্য সঞ্চিত করে রাখবেন প্রতিদান হিসাবে, ৩. দু'আয় সে যতটা লাভের প্রত্যাশা করেছিল, তার আমল থেকে ততটা খারাবি দূর করে দেওয়া হবে। আহমদ-১০৭০৯।
■ দু'আর আদব: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে খালেস অন্তর দিয়ে দু'আ করা। সুন্নাহ পদ্ধতি অনুযায়ী দু'আ করা। একাগ্রচিত্তে দু'আ করা। সম্ভব হলে ওযু করার পর দু'আ করা। সুখ ও দুঃখ সর্বাবস্থায় দু'আ করা। কাকুতি-মিনতী এবং ভয়-ভীতি সহকারে দু'আ করা। একাকী দুই হাত প্রসারিত করে তুলে দু'আ করা। মৃদু-নমনীয় স্বরে দু'আ করা। কিবলামুখী হয়ে দু'আ করা। হাদীসে যেসব দু'আ ৩ বার করে করতে বলা হয়েছে সেগুলো ৩ বার পুনরাবৃত্তি করা। ছোট-বড় সবকিছুই আল্লাহর কাছে চাওয়া। আল্লাহর নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া। আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ বা নিজের কোন নেক আমলের ওসীলায় দু'আ করা। দু'আ কবুল হবে এমন আস্থা রাখা। বারবার দু'আ করা ও দু'আ পুনরাবৃত্তি করা।
■ দু'আর পদ্ধতি: প্রথমত; দু'আর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও বড়ত্বের কথা বলা, আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং আল্লাহর গুনবাচক কিছু নাম দিয়ে আল্লাহকে ডেকে দু'আ শুরু করা উত্তম। যেমন - সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করা ভালো। অথবা বলা - "সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।” এরপর কালেমা শাহাদাত (আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ) বা কালেমা তাওহীদ (লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াহদাহু, লা শারীকালাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন ক্বদীর) পাঠ করা। অতঃপর আল্লাহর স্বীকৃত ৯৯টি নামের মধ্যে কিছু নাম যেমন- ইয়া রহমান, ইয়া রহিম, ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, ইয়া রাজ্জাক, ইয়া গাফফার, ইয়া রব্বাল আলামিন ইত্যাদি বলা।
■ দ্বিতীয়ত; এরপর রাসূল (স) এর উপর দুরূদ পাঠ করা। উত্তম হলো দুরূদে ইবরাহীম পাঠ করা।
■ তৃতীয়ত; নিজে গুনাহগার ও নাফসের উপর জুলুমকারী তা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ছোট ও নত হওয়া। যেমন বলা "রব্বানা জ্বলামনা আন ফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতার হামনা লানা কুনান্না মিনাল খুসিরিন।" অথবা বলা- "আস্তাগফিরুল্লাহ হাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহ।" বা দু'আ মাসূরা পড়া আল্লাহুম্মা ইন্নী যলামতু নাফসী জুলমান...।
■ এরপর নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর কাছে যাবতীয় আকাংক্ষার বিষয় চাওয়া। প্রথমে নিজের জন্য অতঃপর পিতা-মাতা ও পরিবার, অতঃপর আত্মীয় ও প্রতিবেশী, অতঃপর সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিশেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দু'আ করা। শুধু দুনিয়া বা আখিরাতের জন্য নয় বরং উভয় জগতের জন্য দু'আ করা। দু'আর সময় চোখের পানি নিয়ে আসার চেষ্টা করা। দু'আর শেষ প্রান্তে এসে আবার দুরূদ পাঠ করা আল্লাহর প্রশংসা করা এবং সব শেষে দু'আ কবুলের আবেদন জানিয়ে দু'আ শেষ করা।
■ দু'আর সতর্কতা: আল্লাহ ছাড়া কোন ব্যক্তি বা বস্তু বা কবরের নিকট না চাওয়া। আল্লাহর কাছেও চাওয়া আবার পাশাপাশি অন্য কোন কিছুর কাছে চাওয়া যা তার দেওয়ার সামর্থ্য নাই। কোন ব্যক্তি বা বস্তু বা কবরকে এমনকি রাসূল (স) কে মাধ্যম/ওসীলা সাব্যস্ত করে দু'আ না করা। উচ্চস্বরে দু'আ না করা। দু'আ কবুল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা ও অধৈর্য হওয়া যাবে না। দু'আ কবুল হলো না মনে করে হতাশাগ্রস্থ হওয়া ও দু'আ করা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, নিজের ও সম্পদের বিরুদ্ধে বদদু'আ না করা। অবান্তর, অমূলক ও বাড়াবাড়িপূর্ণ কোন দু'আ না করা। কোন গুনাহ বা পাপ কাজের জন্য দু'আ না করা। নিজের মৃত্যুর বা শান্তি পাওয়ার জন্য দু'আ না করা। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দু'আ না করা। কারো দ্বারা মাজলুম হওয়া ব্যতীরেকে তার উপর বদদু'আ না করা। হালাল উপার্জন ব্যতীরেকে দু'আ কবুল হয় না।
■ দু'আ কবুলের সময় ও অবস্থা: সিজদারত অবস্থায়। স্বলাতের শেষ বৈঠকে সালাম ফিরানোর আগে। আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে। ফরজ স্বলাতের পর। জুমআর দিন আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। বৃষ্টিবর্ষণের সময়। মোরগের ডাক দেওয়ার সময়। সুরা ফাতিহা শেষে আমিন বলার সময়। ইফতারের পূর্বে। রমাজান মাসে কদরের রাতে। যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে। জমজম পানি পান করার সময়। মুসাফির অবস্থায়। জিহাদরত অবস্থায়। মাজলুম বা অত্যাচারিত অবস্থায়। বিপদগ্রস্থ বা নিরুপায় অবস্থায়। রোজাদার অবস্থায়। অসুস্থ রোগীর নিকট দু'আ অবস্থায়। হজ্জ ও উমরাহ পালন করা অবস্থায়। অসাক্ষাতে এক মুসলিম অপর মুসলিমের জন্য দু'আ করলে। সন্তানের জন্য পিতা- মাতার দু'আ এবং পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দু'আ।
■ দু'আ কবুলের স্থানসমূহ: কাবা ঘরের ভিতরে। কাবা ঘরের হাতীমে। তাওয়াফ করার স্থান মাতাফে। সাঈ করার স্থান মাসআতে। হাজরে আসওয়াদ ও কাবা ঘরের দরজা এর মাঝের স্থান মুলতাজমে। বাইতুল্লাহতে। মাকামে ইবরাহীমের পিছনে। জমজম পানির কুপ এর কাছে। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে। আরাফার ময়দানে। মুযদালিফার ময়দানে। মিনার ময়দানে। জামারাতে।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড > 📄 তাওবা বা ইসতিগফার করার পদ্ধতি

📄 তাওবা বা ইসতিগফার করার পদ্ধতি


■ বান্দার গুনাহ মাফের জন্য কিংবা পাপ কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুলকারী। তিনি তাওবাকারীকে পছন্দ করেন। বান্দার ছোট ছোট সগীরা গুনাহ আল্লাহ বিভিন্ন ভালো নেকীর/সাওয়াবের কাজের মাধ্যমে অথবা দুঃখ/কষ্ট/অসুস্থতার মাধ্যমে দুনিয়াতে পাপ মোচন করে দেন। কিন্তু কবীরাহ গুনাহ তাওবা ছাড়া আল্লাহ মাফ করেন না। ৭০-১০০টি পর্যন্ত কবীরাহ গুনাহের বিষয় আছে। প্রতিটি কবীরাহ গুনাহের জন্য আলাদা আলাদাভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এক তওবায় সকল কবীরাহ গুনাহের ক্ষমা চাওয়া যায় না কারণ প্রত্যেক গুনাহর বৈশিষ্ট্য, ব্যপকতা ও সম্পৃক্ততা ভিন্ন। সমাজে অনেকে গুনাহ করে মুখে শুধু তাওবা তাওবা বলে আর দুই গালে হাত দিয়ে বাড়ি দেয়। এসব হলো অজ্ঞতা এবং ধর্মকে হাস্যকর বানানোর কাজ। অনেক জায়গায় মানুষ মারা যাওয়ার সময় হুজুর ডেকে তাওবা পড়ানো হয়। অথচ তাওবা করার বিষয়, পড়ানোর বিষয় নয়। যার তাওবা তাকে নিজে করতে হবে। তবে কেউ কারো জন্য আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য দু'আ করতে পারে। কেউ যদি কোন প্রকার হারাম বা গুনাহের বিষয়কে নিয়ে তাচ্ছিল্য রুপে মজা করে বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে অথবা কোন গুনাহের বিষয়কে গুনাহ না মনে করে তবে সে কুফরী করলো। সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।
■ তাওবার শর্ত ও পদ্ধতি: গুনাহ থেকে তাওবা করার জন্য ৪টি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। শর্তগুলো হলো: (১) গুনাহ সম্পাদন স্বীকার করে গুনাহ থেকে বিরত থাকা, (২) গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হওয়া, (৩) পরবর্তীতে আবার গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা এবং (৪) আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এই উপরোক্ত তাওবার শর্তগুলো বান্দা ও আল্লাহর হজ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যদি এমন গুনাহ হয় যার মাধ্যমে অন্য কোন ব্যক্তি সম্পৃক্ত অর্থাৎ কেউ অত্যাচারিত হয়েছে, কাউকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, কারো হক্ব নষ্ট করা হয়েছে তবে আল্লাহ সেই গুনাহ ক্ষমা করবেন না যতক্ষন না ঐ ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে। তাই অন্য ব্যক্তির সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে উক্ত ৪ শর্তের সাথে আরও একটি শর্ত পূরণ করতে হবে তা হলো: (৫) অত্যাচারিত বা মাজলুম ব্যক্তির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। এবং কোন ব্যক্তির হক/অর্থ/দ্রব্যাদি আত্মসাৎ বা নষ্ট করে থাকলে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তাকে পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিশদের নিকট তা ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি কাউকে না খুঁজে পাওয়া যায় তবে তার নামে দান-সাদকা করে দিতে হবে।
■ আল্লাহ তাআলা তাওবাকারী প্রত্যেক বান্দার অন্তরের নিয়ত ও মনের খবর জানেন এবং তিনি পরম দয়ালু ও অসীম ক্ষমাশীল। কোন গুনাহের বিষয় যদি সুনির্দিষ্টভাবে মনে না থাকে তবে আল্লাহর কাছে নিজের অজ্ঞতা ও ভুলে যাওয়ার বিষয় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবা করতে হবে। গুনাহ ক্ষমা করার এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর হাতে। রাসূল প্রত্যহ ৭০ এর অধিক; অন্য বর্ণনায় প্রত্যহ ১০০ বার তাওবা-ইসতিগফার এর দু'আ পড়তেন।
■ তাওবার সবচেয়ে ছোট দু'আ: "আস্তাগফিরুল্লাহ।” এই দু'আও বলা যায় "আসস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহ।" প্রকাশ থাকে যে, ইসতিগফার এর অপর একটি দু'আ প্রচলিত আছে যার মাঝে এরুপ ... রাব্বি মিন কুল্লি জামবিউ.. আছে। উক্ত দু'আটি নিতান্তই দুর্বল হাদীস ভিত্তিক যা আমলযোগ্য নয়।
■ ইসতেগফারের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ দু'আ হলো সাইয়েদুল ইসতিগফার। এই দু'আটি মুখস্থ করে হজ্জ ও উমরায় যাওয়া খুব জরুরী। দু'আটি হলো
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ.
"আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাকতানী, অ আনা আব্দুকা অ আনা আলা আহদিকা অ অ'দিকা মাসতাতা'তু, আউযুবিকা মিন শারি মা সানা'তু, আবূউ লাকা বিনি'মাতিকা আলায়য়‍্যা অ আবূউ বিযামবী ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা য়‍্যাগফিরুয যুনুবা ইল্লা আন্তা।"
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছো, আমি তোমার দাস। আমি তোমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর যথাসাধ্য প্রতিষ্ঠিত আছি। আমি যা করেছি, তার মন্দ থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আমার উপর তোমার যে সম্পদ রয়েছে, তা আমি স্বীকার করছি এবং আমার অপরাধও আমি স্বীকার করছি। সুতরাং তুমি আমাকে মার্জনা করে দাও, যেহেতু তুমি ছাড়া আর কেউ পাপ মার্জনা করতে পারে না।”
■ এই ইসতেগফারের দু'আ পড়ার বিশুদ্ধ ফযীলত - রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি দিনে (সকালে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইসতিগফার পড়বে আর ভোর হওয়ার আগেই যে মারা যাবে, সে জান্নাতি হবে।” বুখারী-৬৩০৬। এই দু'আটি ফজর ও মাগরিবের আযান ও ইকামতের মাঝে পড়া উত্তম。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00