📄 সাঈ’র তাৎপর্য ও সাঈ করার পদ্ধতি
সাঈ করা অর্থ; সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে হাঁটা বা দৌড়ানো।
ক্বাবা ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সাফা পাহাড় এবং পূর্ব-উত্তর দিকে মারওয়া পাহাড় অবস্থিত। এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সাঈ করার স্থানকে মাস'আ বলা হয়। দুই পাহাড়ের উপর গম্বুজ নির্মিত আছে।
বেজমেন্ট/প্রথম তলা/দ্বিতীয় তলা/ছাদের উপরও প্রয়োজনে সাঈ করা যায়। তবে সাফা মারওয়ার মাস'আ এলাকার বাইরে দিয়ে সাঈ করা যাবে না।
প্রাচীন সাফা ও মারওয়া পাহাড় কাঁচের ঘেরা দিয়ে সংরক্ষিত আছে। সাঈ করার সময় এই পাহাড় দেখা যায়। সাঈ'র সময় দু'আ কবুল হয়।
হাজেরা (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) এর ইতিহাসের প্রতিফলনে সাঈ করা। এটা আল্লাহ তাআলার প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, সংগ্রাম ও ধৈর্য্যের সাদৃশ্য ঘটায়।
পায়ে হেঁটে অথবা হুইল চেয়ারে করে সাঈ করা যাবে। হুইল চেয়ারে সাঈ করার জন্য মাঝখানে একটি রাস্তা নির্ধারণ করা আছে। সাঈ করার জন্য ওযু করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে মুস্তাহাব। সাঈ করার মধ্যবর্তী স্থানে একটি সবুজ আলো চিহ্নিত স্থান আছে যেখান দিয়ে শুধু পুরুষদের দ্রুত হাঁটতে হয়।
তাওয়াফের পরপরই সাঈ করতে হবে। তাওয়াফের আগে সাঈ করা যাবে না। কেউ ভুলে আগে সাঈ করে ফেললে উমরাহর ফরজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার কারণে উমরাহ বাতিল হয়ে যাবে।
সাঈ করার সময় সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে অথবা মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে গিয়ে কিছুটা বিশ্রাম করা অনুমোদিত, এমনকি সেটা যদি দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অবস্থায়ও হয়। মাঝে জমজমের পানিও পান করা যাবে।
প্রথমে সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে সোজা মারওয়া পাহাড়ে হাঁটা শেষ হলে এক পাল্লা বা দূরত্ব গণনা করা হয়। আবার মারওয়া পাহাড় থেকে সাফা পাহাড় হাঁটা শেষ হলে দুই পাল্লা বা দূরত্ব গণনা করা হবে। সাঈ সম্পন্ন করার জন্য এভাবে সাত পাল্লা হাঁটতে হবে অর্থাৎ সপ্তম পাল্লা শেষ হবে মারওয়া পাহাড়ে।
ঋতুবতী মহিলারা সাঈ করতে পারবেন, কারণ সাঈ এলাকা মসজিদুল হারামের কোনো অংশ নয়। তবে মসজিদুল হারামের সীমানার ভিতরে প্রবেশ করা যাবে না। সাঈ করা উমরাহর একটি ফরয কাজ। বুখারী-১৬৪৩
সাঈ'র পদ্ধতি
সাঈ করার জন্য মনে ইচ্ছা/নিয়ত পোষণ করাই যথেষ্ট। সাঈ করতে যাবার পূর্বে হাজরে আসওয়াদ পাথর 'ইস্তিলাম' (চুম্বন-স্পর্শ) করা উত্তম তবে ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে কোন সমস্যা নেই, সরাসরি সাফা পাহাড়ের দিকে রওনা হয়ে পড় ন। তবে এ সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরের দিকে হাত তুলে ইশারা করা বা তাকবীর বলার কোন বিধান নেই। নাসাঈ-২৯৭৪
সাফা পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব উঠে বা কাছাকাছি পৌঁছে এই দু'আটি শুধুমাত্র এখন একবারই পড়বেন: সূরা-আল বাকারা, ২:১৫৮, তিরমিযী-৮৬২, নাসাঈ-২৯৭৪
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
"ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা'আয়িরিল্লাহ"।
"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম।”
এবার কাবা ঘরের দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে দু'আ/মুনাজাত করার মত এই দু'আটি তিনবার পাঠ করবেন: নাসাঈ-২৯৭১
اللهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ - لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - أَنْجَزَ وَعْدَهُ - وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু, ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন কুদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়াদাহু ওয়া নাসারা আবদাহু, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু”।
"আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহান। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু দেন। তিনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং দুষ্কর্মের সহযোগীদের পরাস্ত করেছেন"। নাসাঈ-২৯৭৪
পদ্ধতি এমন হবে যে, প্রথমে তিন তাকবীর দিবেন অতঃপর উক্ত দু'আটি একবার পাঠ করে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য আরও কিছু দু'আ করবেন। ফের উক্ত দু'আটি পড়ে আবার অন্যান্য কিছু দু'আ পড়বেন। শেষ আর একবার এভাবে দু'আ পড়বেন। অর্থাৎ তিন বার এভাবে করবেন। নাসাঈ-২৯৭২
দু'আ শেষ করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলতে শুরু করবেন। এখানে কাবাকে উদ্দেশ্য করে তাওয়াফের মত হাত উঠিয়ে তাকবীর বলা কিংবা হাতের তালুতে চুম্বন করার কোনো নিয়ম নেই। নাসাঈ-২৯৮১
সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ের দিকে হাতের ডানের রাস্তা দিয়ে স্রোতের সাথে দলে দলে হাঁটা শুরু করবেন। সাঈ করার সময় তাওয়াফের মতো দু'আ করতে পারেন। আপনি চাইলে কুরআন তিলাওয়াত, দু'আ, যিকর, ইসতিগফার করতে পারেন আপনার নিজের ইচ্ছা মত। আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোন দু'আ পাঠ করার বিধান নেই।
সাফা পাহাড় থেকে কিছু দূর এগিয়ে উপরে সবুজ আলোর লম্বা বাতি দেখবেন। এই সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে শুধু পুরুষরা রমল এর মত জগিং করে দৌড়াবেন। সবুজ আলো অতিক্রম করার পর আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন। সাঈ করার সময় যতবারই এই সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবার রমল করবেন। কিন্তু মহিলা এখানে দৌড়াবেন না বরং সবসময় স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন। বুখারী-১৬১৭,১৬৪৯, ইবনে মাজাহ-২৯৮৮
সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে দৌড়ানোর সময় এই দু'আটি পড়বেন:
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ
"রাব্বিগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ'আযযুল আকরাম"
"হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বাধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।" ইবনে শায়বাহ-৩/৪২০, তাবারানী-৮৭০
সাফা থেকে হেঁটে মারওয়া পাহাড় এসে পৌঁছলে ১ পাল্লা বা দূরত্ব সম্পন্ন হল। মারওয়া পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব উঠে বা মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আবার কাবার দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে উপরোক্ত বড় দু'আটি ৩বার পড়ুন; ঠিক একই পদ্ধতিতে যেমন সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। শুধু এখন ৩ তাকবীর দিবেন না। এবার পুনরায় মারওয়া থেকে সাফার দিকে হাঁটা শুরু করবেন এবং মাঝখানে সবুজ জায়গাটুকুতে দৌড়ে পার হবেন। মারওয়া থেকে হেঁটে সাফা পাহাড়ে পৌঁছলে ২ পাল্লা বা দূরত্ব সম্পন্ন হল। এভাবে আরও ৫ পাল্লা সম্পন্ন করার পর মারওয়া পাহাড়ে এসে সাঈ শেষ করবেন। কেউ যদি সাফা মারওয়ার দুই প্রান্তে গিয়ে কোন দু'আ না পড়ে শুধু ঘুরে চলে আসে তবুও তার সাঈ হয়ে যাবে তবে সে দু'আর নেকি থেকে বঞ্চিত হবে। নাসাঈ-২৯৮৫
সাঈ করার সময় কোনো স্বলাতের ইকামত হলে সঙ্গে সঙ্গে স্বলাত আদায় করে নিবেন এবং যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে ফের শুরু করবেন। সাঈ করার সময় প্রয়োজন ব্যতিরেকে কথা না বলাই শ্রেয়। তবে সাঈ করার সময় প্রয়োজনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া বা পাশে নল থেকে জমজম এর পানি পান করা যায়েজ।
সাঈর ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্যনীয়:
সাঈ পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য নিম্নের ৭টি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক: ১. অন্তরে সাঈর নিয়ত করা, ২. স্বশরীরে সাঈ করা, ৩. প্রথমে তাওয়াফ ও পরে সাঈ করা, ৪. সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় গিয়ে ৭ পাল্লা পূর্ণ শেষ করা, ৫. সাফা ও মারওয়ার পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম করা, ৬. সাঈ করার স্থানেই সাঈ করা, ৭. জাগ্রত অবস্থায় সাঈ করা। এই শর্তগুলোর কোন একটি ছুটে গেলে সাঈ বাতিল হয়ে যাবে এবং পুনরায় নতুন করে সাঈ করতে হবে।
সাঈ শেষ করে মসজিদুল হারাম দিয়ে বের হওয়ার সময় বাম পা আগে দিয়ে বের হোন এবং নিম্নোক্ত দু'আ পাঠ করবেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ
"আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক"।
“হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি”। নাসাঈ-৭২৯
📄 কসর/হালক্ব
■ সাঈ শেষ করার পর মাথার সব অংশ থেকে সমানভাবে ছোট করে চুল ছেঁটে (কসর) ফেলতে পারেন। তবে পুরো মাথা মুড়ানো বা সেভ করা (হলক্ব) উত্তম কাজ। টাক মাথার লোকও খালি মাথা ক্ষুর বা ব্লেড দিয়ে সেভ করে নিবে।
■ আল্লাহ বলেন, "তোমরা মহান আল্লাহর ইচ্ছায় মাথা মুন্ডন করে ও চুল কেটে নির্ভয়ে অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ কর।” সূরা-আল ফাতাহঃ ৪৮:২৭
■ রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "হে আল্লাহ, মাথা মুন্ডনকারীদের মাফ করে দাও। সাহাবীরা বললেন, চুল কর্তনকারীদের? তিনি বললেন, হে আল্লাহ, মাথা মুন্ডনকারীদের মাফ করে দাও। তারা বললেন, চুল কর্তনকারীদের? তিনি তৃতীয়বার বললেন, হে আল্লাহ, মাথা মুন্ডনকারীদের মাফ করে দাও। এরপর বললেন, চুল কর্তনকারীদেরও মাফ করে দাও।" বুখারী-১৭২৮
■ মহিলারা সমস্ত মাথার চুল একসাথে ধরে চুলের অগ্রভাগ থেকে ১ ইঞ্চি পরিমাণ চুল কেটে ফেলবে। মহিলাদের মাথা মুড়ানোর (হলক্ব) কোন বিধান নেই।
■ উমরাহর সময় কসর/হলকু করা ওয়াজিব। প্রয়োজনে নিজের চুল নিজে কেটে ফেলা যায়। কিংবা একে অন্যের চুল কেটে ফেলা যায় এক্ষেত্রে চুল কর্তনকারীর চুল আগে কাটা হওয়া লাগবে এমন কোন শর্ত বা নিয়ম নেই। নাসাঈ-২৯৮৭
■ হজ্জ নিকটবর্তী হলে উমরাহকারীর জন্য মাথা মুন্ডনের চেয়ে চুল কসর করে কাটা উত্তম। অতঃপর হজ্জ শেষে মাথা মুন্ডন করে নিবে।
■ মসজিদুল হারামের আশেপাশে পুরুষদের অনেক চুল কাটার সেলুন পাওয়া যাবে। ১০-১৫ রিয়াল এর মধ্যে চুল কাটার কাজ হয়ে যায়।
■ নাপিতকে ডান দিক দিয়ে চুল কাটা শুরু করতে বলবেন। মহিলারা বাসায় একে অপরের চুল কাটাতে পারে বা কোন পুরুষ কোন মহিলার চুল কেটে দিতে পারে
■ চুল কাটার মাধ্যমে আপনার ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা শেষ হলো। এবার ইহরামের কাপড় খুলে ফেলবেন ও গোসল করে নিতে পারেন। আপনার উমরাহও সম্পন্ন হয়ে গেল। এখন আপনি সাধারণ পোশাক পরতে পারবেন।
■ আল্লাহ তাআলা যে আপনাকে উমরাহ সম্পন্ন করার তৌফিক দান করেছেন সে জন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন。
📄 সাঈ করার ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* সাঈর প্রতি কদমে ৭০ হাজার সাওয়াব লেখা হবে এই আশায় ওযু করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ শুরু করা।
* সাফা/মারওয়ার পাহাড়ের কাছে পৌঁছানোর আগেই ঘুরে চলে যাওয়া।
* সাঈ করার সময় অনেকে সাফা-মারওয়ার দিকে হাত উঁচু করে দু'আ করেন।
* সাফা থেকে নামার সময় নির্দিষ্ট এই দু'আ করা; হে আল্লাহ আপনি আমার কর্মকান্ড রাসূলের সুন্নাত সমর্থিত করে দিন ও দ্বীনের উপর রেখেই মৃত্যু দিন।
* সাঈ করার সময় নির্দিষ্ট দু'আ; (হে আল্লাহ আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন এবং আমার যেসব বিষয় আপনি জানেন তা গোপন করুন।)
* ১৪ বার চক্কর দিয়ে সাঈ শেষ করা। উমরাহ করে পরে এমনি সাঈ করা।
* ঋতুবতী মহিলারা তাওয়াফ না করেই আগে সাঈ করে ফেলা।
* সাঈ শেষ করে দুই রাকাআত স্বলাত আদায় করা।
* জ্বলাতের ইকামাত হওয়ার পরও সাফা মারওয়ার মাঝে সাঈ চলমান রাখা।
* দলের সামনে দলনেতা কর্তৃক দু'আ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করা এবং সে অনুসারে দলের সবাই মিলে সমবেত কণ্ঠে সেই দু'আ পাঠ করা।
* পরিপূর্ণ কসর/হলকু না করে কাঁচি দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশ থেকে সামান্য কিছু চুল কেটে ফেলা।
* একটি সতর্কতা: তাওয়াফ বা সাঈ করার সময় হুইল চেয়ার থেকে সতর্ক থাকবেন কারণ অনেকে জোরে হুইল চেয়ার চালিয়ে এসে পায়ের পিছনে ঠোকা লাগিয়ে দেন ফলে পা জখম বা কেটে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
উমরাহ করার পর যা করবেন
■ উমরাহ সম্পন্ন করার পর থেকে হজ্জ এর পূর্ব পর্যন্ত আর কোন হজ্জ বিষয়ক কর্মকান্ড নেই। উমরাহ সম্পন্ন করার পর যতো বেশি পারেন মসজিদুল হারামে ফরয ও নফল স্বলাত আদায় করবেন এবং সম্ভব হলে বেশি বেশি নফল তাওয়াফ করবেন। তবে আর কোন পৃথক সাঈ করতে যাবেন না। নাসাঈ-২৯৮৬
■ হজ্জ এজেন্সি একদিন বাসে করে মক্কার নিকটবর্তী কিছু ইসলামিক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখিয়ে নিয়ে আসবে আর আপনারা চাইলে গাড়ি ভাড়া করে দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখে আসতে পারেন। মহিলারা মাহরাম ছাড়া বাইরে কোথাও একাকী কেনাকাটা বা ঘুরাঘুরি করতে যাবেন না। হজ্জযাত্রীদের তায়েফ, জেদ্দা ও মক্কার সীমানার বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। এসময় ব্যাংক থেকে হজ্জের জন্য হাদীর টিকেট কিনে ফেলতে পারেন。
📄 হজ্জ/উমরাহ সফরে কসর ত্বলাতের বিধান
হজ্জ ও উমরাহযাত্রীদের মাঝে এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় দেখা যায় কারণ বিভিন্নজন বিভিন্ন মত দিয়ে থাকেন। বিষয়টি দ্বিমত হওয়ার মতই কারণ কসর স্বলাতের বিষয়ে সকল হাদীসগুলো একত্রিত করে গবেষণা করলে দেখা যায় রাসূল (ﷺ) ও সাহাবীদের চর্চায় শুধু একধরনের আমল ছিল না। মূল কথা হলো রাসূল (ﷺ) তাঁর কথা বা কাজের মাধ্যমে কোন এক প্রকার আমলকে সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত করে দিয়ে যাননি। এর মধ্যেই হিকমত নিহিত আছে। প্রায় সব হাদীসগুলোর বর্ণনায় দেখা যায় সাহাবীরা রাসূল (ﷺ) এর সাথে সফরে রাসূল (ﷺ) কে কিভাবে স্বলাত/নামায পড়তে দেখেছেন অথবা সাহাবীরা সফরে কেমনভাবে কসর করে স্বলাত পড়েছেন তার বর্ণনা পাওয়া যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রত্যেক সফরের স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।
কসর জ্বলাতের দুটি মূল বিষয় হচ্ছে দূরত্ব এবং সময়। হাদীসে বিভিন্ন সংখ্যার দূরত্ব ও বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। অতএব কোন একটিকে নির্ধারিত করে সেটিই সঠিক এমন কথা বলার অবকাশ নেই। তাহলে অন্য হাদীসগুলোকে অস্বীকার করা হয়ে যায়। ইসলাম মানুষের জন্য কল্যাণকামী ও বাস্তবতামূখী জীবনবিধান। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীনকে সহজ করে দিয়েছেন এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার জন্য বলেছেন। একারণেই জমহুর ফকীহ এবং আলেমগণ সুন্নাহর আলোকে এমন মত দিয়েছেন যে কোন ব্যক্তি দূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সফর শুরু করে তার পরিচিত লোকালয়/অঞ্চল থেকে বের হয়ে যখন যাত্রাপথে অপরিচিত এলাকায় প্রবেশ করবে তখন থেকে সে মুসাফির বলে গন্য হবে এবং কসর স্বলাত তার উপর প্রযোজ্য হবে। এবং সফরকালে কোথাও কিছু দিন অবস্থান করে যদি ফেরত আসার নিয়ত থাকে তবে সে ততদিন মুসাফির হিসাবে গন্য হবে, যদি না সে সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থানের ইচ্ছা পোষণ করে। তবে তার জন্য ভিন্ন কথা রয়েছে। অতএব উক্ত মাসআলার আলোকে যে কেউ সফরে এলাকা ও সময়ের ভিত্তিতে কসর করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ওয়াল্লাহু আ'লামু বিস সাওয়াব।
কসর জ্বলাত আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড় যা তিনি বান্দাকে উপহার দিয়েছেন। তাই আল্লাহর উপহার গ্রহণ করা উচিত এবং এক্ষেত্রে বেশি পরহেজগারিতা দেখানো বর্জন করাই হবে একজন মুমিনের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। সফরে ৫ ওয়াক্ত স্বলাতের আগে ও পরের সুন্নাত স্বলাতগুলো বর্জন করাই সুন্নাত। রাসূল (ﷺ) সফরে কখনোই ফজরের পূর্বে দুই রাকাআত সুন্নাত ও এশার পরে বিতর ছাড়া কোন সুন্নাত স্বলাত পড়তেন না। সকল ৪ রাকাআত বিশিষ্ট ফরজ স্বলাতগুলো (যোহর, আসর, এশা) সংক্ষেপ করে ২ রাকাআত পড়েছেন এবং ফজর ও মাগরিব জ্বলাত যথারীতি ২ ও ৩ রাকাআত পড়েছেন। তাই সফরে একাকী স্বলাত পড়লে কিংবা সফরসঙ্গীরা একত্রে জামআত করলে কসর করে পড়া উত্তম। আর যদি কোন মুকিম বা স্থানীয় ইমামের পিছনে জামআতে সামিল হওয়া হয় তবে ইমাম যা পড়ছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। মুসাফির অবস্থায় প্রয়োজনে যোহর-আসর কে একত্রিত করে যোহর বা আসরের সময় পড়া যায়। আবার মাগরিব-এশাকে একত্রিত করে মাগবির বা এশার সময় পড়া যায়। এই পদ্ধতিকে 'জামাআন কাসরান' বলা হয়। অবশ্য আমাদের দেশে এই সুন্নাহ আমলটির চর্চা খুবই কম লক্ষ্য করা যায়।
তবে সফরে চাইলে অন্যান্য নফল স্বলাত সুবিধা ও ইচ্ছামত পড়া যায়েজ। সুন্নাত স্বলাত না পড়ার ঘাটতি পূরনের চিন্তা মাথায় রেখে আবার নফল স্বলাত পড়া ঠিক হবে না। যেহেতু উমরাহ ও হজ্জ সচারাচর সফরের মতো নয় বরং এটি ব্যতিক্রমী একটি ফযীলতময় সফর। এই সফরে হারামের মসজিদগুলোতে স্বলাতের নেকীর পরিমাণ অনেক বেশি সেহেতু হজ্জ ও উমরাহ সফরে আল্লাহর মেহমানগণ সকল সুন্নাত ও নফল স্বলাত পড়তে পারেন ইচ্ছা করলে। এখানে হজ্জ বা উমরাহযাত্রী হয়ে যতদিন অবস্থান করবেন ততদিন মুসাফির অবস্থায় আছেন। এটাই সুন্নাহর আলোকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও উত্তম মত।
আমাদের লোকসমাজে ফরজ, সুন্নাত ও নফল স্বলাতের বিষয়ে একটি ব্যতিক্রমী ধারনা বিরাজমান আছে। বিষয়টি একটু পরিস্কার করার প্রয়োজন অনুভব করছি। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত স্বলাতের ২+৪+৪+৩+৪=১৭ রাকাআত ফরজ স্বলাতগুলো হলো মূল স্বলাত যা আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর ফরজ করেছেন। হাশরের মাঠে সর্বপ্রথম এই ১৭ রাকাআত জ্বলাতের হিসাব নেওয়া হবে। যদি ঘাটতি পরে তবে অন্যান্য নফল/সুন্নাত স্বলাত দ্বারা পূরণ করা হবে। শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া এই ১৭ রাকাআত স্বলাত মসজিদে গিয়ে জামাআতে পড়া পুরুষদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বা ওয়াজিব। কেউ যদি সারা জীবন কোন সুন্নাত ও নফল না পড়ে শুধু এই ১৭ রাকাআত ফরজ স্বলাত পড়ে এবং তা কবুল হয় তবে হাশরের মাঠে সে জ্বলাতের হিসাবে পার পেয়ে যাবে ইনশা-আল্লাহ। অনেকেই স্বলাত পড়ে না এই চিন্তায় যে স্বলাতে গেলে কত সময় লাগবে ফরজ, সুন্নাত ও নফল স্বলাত পড়তে। অনেকে বলে, এশার স্বলাত নাকি ১৭ রাকাআত! এতো স্বলাত কষ্ট করে পড়ার চিন্তায় অনেকে স্বলাতই বাদ দিয়ে দিয়েছে। অথচ কেউ যদি একটু বুঝাতো যে ৪ রাকাআত ফরজ স্বলাতটুকু পড়লেই পার পেয়ে যাবে তবে এই দেশের মসজিদগুলোতে নামাযীর সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পেত। এই ১৭ রাকাআত স্বলাত জামআতে পড়তে সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট লাগে মাত্র। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে আল্লাহর (স্বলাতের) জন্য বরাদ্দ মাত্র ৪৫ মিনিট সময়। আমরা কি দিচ্ছি এই সময় আল্লাহকে!? কেমন কৃতজ্ঞ বান্দা হলাম তবে আমরা !?
এই ১৭ রাকাআত ফরজ স্বলাত বাদে বাকি সকল স্বলাত হলো ঐচ্ছিক বা নফল স্বলাত। অর্থাৎ স্বলাত পড়লে নেকী, না পড়লে কোন গুনাহ নেই। বিতর জ্বলাতের বিষয় নিয়ে যদিও কিছু মতভেদ আছে। মূল কথা হলো, ফরজ স্বলাত বাদে সকল স্বলাতের নাম হলো 'নফল' আর কিছু নফল স্বলাতের গুরুত্বের কারণে তার মান হলো 'সুন্নাত'। ৫ ওয়াক্ত স্বলাতের আগে ও পরে রাসূল (ﷺ) সচারাচর যে ১২ রাকাআত স্বলাতগুলো সবসময় পড়তেন সেগুলো আমরা সুন্নাত হিসাবে জানি। অনেকে সুন্নাতে রাতেবা বা সুন্নাতে মুআক্কাদা ইত্যাদি নামে ডেকে থাকেন। এই স্বলাতগুলোর গুরুত্বের কারণে এর মান বৃদ্ধি পেয়েছে তাই সুন্নাত নামে ডাকা হচ্ছে কিন্তু স্বলাতটি মূলত ঐচ্ছিক বা নফল। মূল কথা হলো সকল সুন্নাত স্বলাত হলো নফল স্বলাত আবার সকল নফল জ্বলাতই সুন্নাত, কারণ রাসূল (ﷺ) এর পালন করা প্রতিটি আমলই হলো তাঁর সুন্নাত। শেষ কথা; সুন্নাত ও নফল দুটি আলাদা স্তরের স্বলাত নয়, বরং একই স্তরের যা মূলত নফল।
■ আল্লাহর তাআলার নিকটবর্তী হওয়ার এবং আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম হলো নফল স্বলাত। নফলকে মোটেই কম গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত নয়। বরং বেশি বেশি নফল পড়া উচিত। ইচ্ছাকৃতভাবে নফল বর্জন করে থাকা মোটেই কাম্য নয়। তবে ফরজ এর হক্ব আদায়ের পর সম্ভব হলে নফল পড়তে হবে। সমাজে এমন অনেক নামাযী দেখা যায় যাদের ফরজের খবর নাই কিন্তু তারাবীহর স্বলাত পড়াকে খুব গুরুত্ব দেন। এগুলো হলো আমাদের অজ্ঞতা। আর সকল সুন্নাত বা নফল জ্বলাত মসজিদে পড়ার চেয়ে বাড়িতে পড়া অধিক ফযিলতের কারণ রাসূল (ﷺ) এমন করতেন।