📄 ইহরামের পর যেসব বিষয় নিষিদ্ধ
* চুল, নখ ও দাড়ি কাটা (মাথায় চিরুনি করার সময় যদি কোনো চুল অনিচ্ছাকৃতভাবে পরে যায় বা উঠে যায় অথবা ভুলক্রমে কেউ যদি নখ বা চুল কাটে, তাহলে সেটা ক্ষমাযোগ্য। তবে অসুস্থতা ও উকুনের কারণে যদি পুরো চুল ফেল দিতে হয় তবে ফিদইয়াহ দিতে হবে)। মুসলিম-২৭৬৭
* দেহে, কাপড়ে সুগন্ধী ও জাফরান ব্যবহার করা। সুগন্ধীযুক্ত সাবান, শ্যাম্পু ও পাউডার ব্যবহার করা। (ইহরাম করার আগের কোনো সুগন্ধী যদি দেহে থাকে তবে তাতে কোনো দোষ নেই, তবে কাপড়ের সুগন্ধী ধুয়ে ফেলতে হবে।) বুখারী-১৮৩৮, নাসাঈ-২৬৬৬, ২৭০২
* হারাম এলাকার মধ্যে কোনো গাছ কাটা, পাতা ছেঁড়া বা উপড়ে ফেলা। এটা হজ্জে আসা সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে ইহরাম অবস্থায় থাক বা না থাক। বুখারি-১৫৮7, নাসাঈ-২৮৭৪
* হারামের সীমানার মধ্যে কোন ধরনের স্থলচর প্রাণী শিকার করা বা বন্দুক তাক করা অথবা ধাওয়া করার মাধ্যমে শিকারে সহযোগিতা করা। এটাও হজ্জে আসা সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে ইহরাম অবস্থায় থাক বা না থাক। সূরা-মায়িদা ৫:৯৫-৯৬
* অন্যের হারিয়ে যাওয়া কোনো জিনিস বা পরিত্যক্ত কোনো বস্তু কুড়িয়ে নেয়া। তবে মূল মালিকের কাছে পৌছে দেয়ার উদ্দেশ্যে তুলে নেয়া যাবে। এটাও ইহরাম ও ইহরাম ছাড়া উভয় অবস্থার জন্যই প্রযোজ্য। নাসাঈ-২৮৭৪
* কোনো অস্ত্র বহন করা বা অন্য কোনো মুসলিমের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া, সংঘর্ষে জড়িয়ে যাওয়া অথবা খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করা। সূরা-বাকারা ২:১৯৭, বুখারী-১৮৩৪
* বিয়ে করা বা বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো বা অন্য কারো জন্য বিয়ের আয়োজন করা, হস্তমৈথুন করা, স্ত্রীকে উত্তেজনার সাথে আলিঙ্গন বা চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করা বা মহিলাদের প্রতি এমন কোনো ইঙ্গিত করা যা আকাঙ্খার উদ্রেক করে। নাসাঈ-২৮৪২
* মহিলারা ইহরাম অবস্থায় হাত মোজা ও নেকাব (মুখ ঢাকা) পরা। তবে সামনে কোনো বেগানা পুরুষ চলে আসলে মাথার কাপড়ের কিছু অংশ দিয়ে মুখ ঢাকতে পারেন। তিরমিযী-৮৩৩
* ইহরাম অবস্থায় পুরুষরা তাদের মাথায় ইহরামের কাপড় অথবা টুপি অথবা মাথায় কাপড় দিয়ে আবৃত করতে পারবে না। আর যদি অনিচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে কেউ মাথা ঢেকে ফেলে তাহলে মনে হওয়ার সাথে সাথে তা খুলে ফেলতে হবে। তবে এজন্য কোনো ফিদইয়া আদায় করতে হবে না। ইবনে মাজাহ-২৯২৯
* এছাড়া পুরুষরা ইহরাম অবস্থায় সেলাইযুক্ত কাপড় যেমন-জোব্বা, গেনজি, শার্ট, প্যান্ট, আন্ডারওয়ার পরা যাবে না। তিরমিযী-৮৩৩
* শরীরের কোনো অংশ বা দাঁত দিয়ে বেশি রক্ত প্রবাহিত হওয়া। সৌন্দর্যবর্ধন ও আভিজাত্য প্রকাশের জন্য দামি হাতঘড়ি, আংটি, রোদ চশমা পরা, চোখে কাজল দেয়া ইত্যাদি কাজ মাকরূহ。
📄 ইহরামের বিধান লঙ্ঘনের কাফফারা
■ ইহরাম অবস্থায় কারো সঙ্গে যৌন সঙ্গম করলে তার ইহরাম ভেঙে যাবে। উমরাহ/হজ্জ সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে। তাকে কাফফারা হিসেবে মক্কার হারাম এলাকার মধ্যে একটি দম (পশু জবেহ) করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। আবার পুনরায় নতুন করে উমরাহ/হজ্জ করতে হবে।
■ ইহরাম সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধের কোন বিষয় যদি ভুলক্রমে অথবা না জানার কারণে লঙ্ঘন হয় তাহলে তা ক্ষমাযোগ্য। এর জন্য কোনো ফিদইয়া দিতে হবে না। এজন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল। সূরা-বাকারা ২:২৮৬, সূরা-আহযাব ৩৩:৫
■ কেউ যদি কাউকে ইহরাম অবস্থায় কোনো একটি নিষিদ্ধ কাজ করতে বাধ্য করে অথবা অন্য কোনো কারণে বাধ্য হয়ে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তাহলেও তাকে কোনো ফিদইয়া দিতে হবে না।
■ ইহরাম অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে তাতে ইহরাম নষ্ট বা ভঙ্গ হবে না। ফরয গোসলের মাধ্যমে নাপাক ধুয়ে পবিত্র হতে হবে।
■ কেউ যদি সজ্ঞানে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তাহলে ক্ষতিপূরণ স্বরুপ ফিদইয়া আদায় করতে হবে। সূরা-বাকারা ২:১৯৬
■ দম: উমরাহর কোন এক বা একাধিক ওয়াজিব বাদ গেলে বা লঙ্ঘন হলে উমরাহ শেষ করে মক্কার হারাম এলাকার মধ্যে একটি পশু (ছাগল/ভেড়া) জবেহ দিতে হবে। গোশত গরীব-মিসকীনদের মাঝে সম্পূর্ণ বিতরণ করবে এবং এই গোশত থেকে নিজে কিছু ভক্ষণ করা যাবে না। অথবা পুনরায় নতুন করে ইহরাম করে উমরাহ পালন করে নিবে। দমের জন্য পশু (গরু, উঠ) ভাগে দেওয়া যায় না।
■ ফিদইয়া: ইহরামের কোন বিধান লঙ্ঘন হলে মক্কার হারাম এলাকার মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসাবে একটি পশু যবেহ (ছাগল/ভেড়া) করে সম্পূর্ণ গোশত গরীব-মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করবে অথবা ৩ দিন সিয়াম রাখবে অথবা ৬ জন গরীব-মিসকীন লোককে খাওয়াবে (প্রত্যেককে অন্তত অর্ধ সা'আ বা ১.২৫০ কেজি পরিমান খাবার দেয়া)। সূরা-বাকারা ২:১৯৬, আবু দাউদ-১৮৫৬
■ ইহরাম করার পর কেউ যদি বাধাপ্রাপ্ত বা অসুস্থ হয় এবং উমরাহ সম্পাদন করতে অপারগ হয়ে যায় তবে সে মাথার চুল কসর/হলক্ব করে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবে। পরবর্তীতে আবার অন্য কোন সময় উমরাহ পালন করে নিবে। সূরা-বাকারা ২:১৯৬, আবু দাউদ-১৮৬২, বুখারী-১৮০৯
■ মক্কার হারাম এলাকার সীমা: পূর্বে ১৬ কিলোমিটার (জুরানা), পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার (হুদায়বিয়াহ), উত্তরে ৭ কিলোমিটার (তানিম), দক্ষিণে ১২ কিলোমিটার (আদাহ), উত্তর-পূর্বে ১৪ কিলোমিটার (নাখালা উপত্যকা)।
📄 জেদ্দা বিমানবন্দর টার্মিনাল
■ হজ্জ সফরের আলোচনায় ইতিপূর্বে আমরা ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত আলোচনা করেছিলাম এরপর উমরাহর ইহরাম বিষয়ে আলোচনা করেছি, এখন আবার হজ্জ সফরের ধারাবাহিক আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি।
■ জেদ্দা বিমানবন্দরে যেসব সৌদি লোক কাজ করেন তারা খুব সময় নিয়ে কাজ করেন এবং আপনি কতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন বা কতটা ক্লান্ত তারা তা বিবেচনা করেন না। কারণ তারা প্রতিদিন এমন হাজার হাজার হজ্জযাত্রীকে সেবা দিচ্ছেন। তাদেরও নিয়ম-নীতি অনুসরণ করতে হয়, কম্পিউটারে এন্ট্রি দিতে হয়, ডাটা ভেরিফাই করতে হয়, সীল/স্ট্যাম্প দিতে হয়। তাই আপনাকে সেখানে ধৈর্যশীল থাকার পরামর্শ দিব।
■ জেদ্দা টার্মিনাল থেকে সৌদি সিম কিনতে পারবেন আবার মক্কা গিয়েও কিনতে পারেন। সিম কিনতে পাসপোর্ট ও ভিসার কপি দেখাতে হয় এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে হয়। এখানে সিমে ২০০-৩০০ মিনিট টকটাইম সহ ১০-১২ জিবি ইন্টারনেট প্যাকেজ ১১০-১২০ রিয়াল মতো দাম পড়বে। মেয়াদ ১-২ মাস পর্যন্ত থাকে। মোবিলি, জেইন, এসটিসি ইত্যাদি বিভিন্ন কোম্পানির সিম কিনতে পারেন। আপনার হজ্জ গাইডের নাম্বার ও বেশ কয়েকজন হজ্জযাত্রীদের নাম্বার মোবাইলে সেভ করে রাখুন।
■ সৌদি হজ্জ কর্তৃপক্ষ আপনাদের পরিবহন জন্য বাস নির্ধারণ করবেন। বাসে উঠে বসুন। এবার বাস ড্রাইভার ও সুপারভাইজার সকল যাত্রীর পাসপোর্ট নিয়ে নিবেন। সব পাসপোর্ট সৌদি মুআল্লিম অফিসে জমা রাখা হবে। হজ্জ শেষে ফিরতি যাত্রার সময় আপনি পাসপোর্ট ফেরত পাবেন। যারা বছরের যে কোন সময় শুধু উমরাহ করতে যাবেন তাদের পাসপোর্ট নিয়ে রাখা হয় না। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি সন্দেহ করে কেউ উমরাহ করতে এসে অবৈধভাবে থেকে যেতে পারে তবে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে।
■ সবসময় দলবদ্ধ হয়ে সকল কাজ করবেন। কখনই দলছাড়া হবেন না, দলছাড়া হলে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ও সমস্যায় পরতে পারেন।
■ জেদ্দা থেকে বাস যাত্রা করে মক্কা পৌছাতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। হাজীদের আপ্যায়ন হিসাবে রাস্তায় চেকপোষ্টে নাস্তা ও পানি বিতরণ করা হয়। রাস্তায় তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন।
■ বছরের যে কোন সময় শুধু উমরাহ করা যাত্রীরা তাদের উমরাহ এজেন্সীর মাধ্যমে তাদের জন্য ভাড়া করা নির্ধারিত গাড়ি/বাস এর মাধ্যমে মক্কার পথে রওনা হবেন।
📄 মক্কায় পৌঁছানো ও আইডি কার্ড সংগ্রহ
■ মক্কায় পৌঁছানোর পর পরিবহন বাস হজ্জযাত্রীদের প্রথমেই নিয়ে যাবে মক্কা সৌদি মুআল্লিম অফিসে। সেখানে তারা আপনাকে কিছু ছোট উপহার দিবেন ও আপ্যায়ন করতে পারেন।
■ মুআল্লিম অফিস সকলের পাসপোর্ট পরীক্ষা এবং গণনা করবেন। তারা আপনার পাসপোর্ট রেখে দিবেন এবং এর পরিবর্তে পরিচয়ের জন্য আপনাকে হাতের ব্যান্ড ও হজ্জ পরিচয়পত্র (সাময়িক আইডি কার্ড) প্রদান করবেন। পরবর্তীতে ছবি সহ একটি স্থায়ী আইডি কার্ড প্রদান করা হবে।
■ এই হাতের ব্যান্ড ও আইডি কার্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার মক্কা মুআল্লিমের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর আরবিতে লেখা রয়েছে। আপনি যদি হারিয়ে যান তাহলে এটা আপনার মুআল্লিমকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।
■ এরপর মক্কায় হোটেল/বাড়িতে গিয়ে উঠবেন। হোটেলে অথবা ভাড়া করা বাড়িতে পৌছানোর সাথে সাথে আপনার রুমে উঠে পড়ুন। আপনার হজ্জ এজেন্সি আপনাদের আবাসনের জন্য বিভিন্ন রুম বরাদ্দ করে দিবেন।
■ দেখা যায় অনেক হজ্জযাত্রী নিজের রুমের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারেন না এবং তারা রুম পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। যদি সম্ভব হয় তাহলে পরিবর্তন করুন, আর তা না হলে বিষয়টি এখানেই ছেড়ে দিন। কিন্তু বিষয়টিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনি যা পেয়েছেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন।
■ রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন, গোসল করুন ও খাবার গ্রহণ করুন। তবে এ সময়ে কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
■ আপনি যে ইহরাম অবস্থায় আছেন সেটা ভুলে যাবেন না, তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন। এরপর আপনার হজ্জ গাইড যে কোনো সময় সবাইকে একত্রিত করে পরবর্তী কাজ তাওয়াফ সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন।
■ হজ্জ ও উমরাহ সফরের যে ধারাবাহিক বর্ণনা এখানে করা হয়েছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে একটি বাস্তব সফর সম্পর্কে ধারনা দিতে চেষ্টা করা হয়েছে। গাইডে আলোচিত কোন বিষয় আপনার জন্য ব্যতিক্রম হতে পারে, এটি সম্পূর্ণ হজ্জ ও উমরাহ ব্যবস্থাপনা বা প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে। হজ্জ ও উমরাহর কিছু প্রক্রিয়া বছরান্তে পরিবর্তনও হতে পারে। পাঠকবৃন্দের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখবো আপনাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়ে আমাকে সহযোগিতা করবেন।