📄 হজ্জ ও উমরার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
■ দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে মক্কা-মদীনা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হজ্জ ও উমরাহর রীতিনীতি মৌখিক ও লিখিত আকারে মানুষের কাছে পৌছেছে। দুঃখের বিষয় হলো এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে কিছু লোক হজ্জের কিছু রীতিনীতির মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং এটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
■ কিছু মানুষ মক্কা-মদীনার প্রতি আবেগ ও ভালোবাসার কারণে বিভিন্ন মনগড়া বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছে যা ইসলামি শরীয়াহ সম্মত নয়। কেউ কেউ হজ্জ ও উমরাহর কিছু রীতিনীতি ভুলভাবে বা তাদের মন মতো বুঝেছে এবং তারা তাদের সেই বোধ থেকেই হজ্জের রীতিনীতি পালন করছে। অনেকে হজ্জের সহজ বা হালকা কোন বিষয়কে অতি ভক্তির দরুন কঠিন ও শক্ত করে দিয়েছে। অনেকে আবার বেশি পরহেজগারিতার দরুন হজ্জের পদ্ধতিতে নতুন কিছু দু'আ যোগ করেছে। সাধারণদৃষ্টিতে দেখলে এসব রীতিনীতি সব সঠিক ও সব ভালো আমল বলে মনে হবে এবং কোন ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
■ কিন্তু কথা হলো; কেন এসব ভ্রান্ত রীতি বা অতিরিক্ত রীতি পালন করবেন? রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ্জে যা যা করেছেন তার থেকে বেশি কিছু করে আপনি কি বেশি সাওয়াব অর্জন করতে পারবেন বলে মনে করেন? রাসূল (ﷺ) যেভাবে যা করেছেন এবং যা করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন সে সম্পর্কে যতটুক শুদ্ধ ভাবে জানা যায় ততটুকুই জ্ঞান অনুসারে আমল করাই কি উত্তম নয়? আপনি কি জানেন, ইবাদতে বা আমলে নতুন রীতি তৈরি অথবা নতুন কিছু যোগ করার ফলে আপনার ইবাদতই বাতিল হয়ে যেতে পারে; কেননা তা বিদআত!
■ এখন প্রশ্ন আসতে পারে; রাসূল (ﷺ) এর হজ্জের নিয়ম-কানুন আমি কোথায় পাবো বা কিভাবে জানবো? উত্তর সহজ: বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ-র হজ্জ অধ্যায়ের হাদীসগুলো পড়ুন। সব হাদীসগ্রন্থ এখন বাংলায় অনুবাদ হয়ে গেছে। যদি সব হাদীস পড়ার মতো যথেষ্ট সময় না পান বা সকল হাদীস বই না থাকে তাহলে নির্ভরযোগ্য সুপরিচিত আলেমদের হাদীসের বিশুদ্ধ দলিলভিত্তিক লেখা বই পড়ুন। কয়েকটি বই পড়ে যাচাই করুন। হজ্জের শুদ্ধ রীতিনীতির সবকিছুই বিভিন্ন বই থেকে পেয়ে যাবেন।
■ আরবের আলেমগণ যুগযুগ ধরে হজ্জ ও উমরাহর বিষয়ে বহু কিতাব লিখে যাচ্ছেন এবং হজ্জ ও উমরাহ করতে আসা আল্লাহর মেহমানদের কাছে বিনয়ের সাথে এসব ভুলত্রুটি ও বিদ'আত বিষয়গুলো তুলে ধরছেন এমনকি বিনামূল্যে বই বিতরণ করছেন এগুলো সংশোধন করার জন্য। আল্লাহ তাআলা যাকে হেদায়েত করছেন সে সংশোধন হচ্ছে আর যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলেছে সে সন্দেহে পতিত হয়ে তার মতোই ভুলত্রুটি ও বিদ'আত করে যাচ্ছে।
রাসূল (ﷺ) স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, "তোমরা হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও আমার কাছ থেকে”। (মুসলিম-৩০২৮)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, "আমি যখন তোমাদের কোন কাজের আদেশ দেই তখন তা তোমরা সাধ্যানুযায়ী পালন করো। আর যখন কোন কাজ করতে নিষেধ করি, তখন তা পরিত্যাগ করো"। (নাসাঈ-২৬১৯)
মুহাম্মাদ (ﷺ) আরও বলেছেন, "যে দ্বীনের মধ্যে এমন কাজ করবে যার প্রতি আমার নির্দেশনা বা অনুমোদন নাই তা প্রত্যাখ্যাত (বাতিল)"। (বুখারী-২৬৯৭)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, "সর্বোত্তম কালাম হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হলো মুহাম্মাদ (ﷺ) এর আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো (দ্বীনের মধ্যে) নব-উদ্ভাবিত (বিদআত) বিষয়”। (বুখারী-৭২৭৭)
রাসূল (ﷺ) বলেন, "তোমাদের মধ্যে যারা আমার পর জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতানৈক্য দেখতে পাবে। তোমরা (দ্বীনের) নবপ্রচলিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো। কেননা নতুন বিষয় (বিদআত) গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা। তখন তোমরা আমার ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকো এবং তদানুযায়ী অবিচল থাকো। তোমরা সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর"। (তিরমিযী-২৬৭৬)
মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, "সাবধান, দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, কেননা তোমাদের পূর্বে ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি তাদের ধ্বংস করেছে"। (নাসাঈ-৩০৫৭)
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আজ তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতও পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকেই মনোনিত করলাম"। (সুরা আল মায়েদাহঃ ৫:৩)
ইসলামের যে কোনো ইবাদাত ও আমল রাসূল (ﷺ) এর কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে। কারো নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করার কোন সুযোগ ও অধিকার নেই। আমাদের শুধু রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহ তথা কর্মপদ্ধতি পদে পদে অনুসরণ করা দরকার।
এই বইয়ে হজ্জ ও উমরাহর বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিবিধ ভুলত্রুটি ও বিদ'আত বিষয়গুলো সংযোজন করেছি কারণ এগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে হজ্জযাত্রীরা এগুলোকে হজ্জ ও উমরাহর সাধারণ রীতিনীতি হিসাবে মনে করতে পারেন। এই ভুলত্রুটি ও বিদ'আত বিষয়গুলো ড. আহমাদ ইবন উসমান আল-মাযইয়াদ এর 'হজ্জের সাথে সংশ্লিষ্ট আকীদাগত ভুল-ভ্রান্তিসমূহ' বই এবং শাইখ মোহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানীর 'আহায্যকা সাহিহুন' (আপনার হজ্জ শুদ্ধ হচ্ছে কি?) ও Innovations of Hajj, Umrah & Visiting Madinah বই থেকে সংকলন করেছি।
📄 হজ্জ যাত্রার পূর্বে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* হজ্জ যাত্রার আগে মিলাদ দেওয়া, সংবর্ধনা দেওয়া, মিষ্টি বিতরণ করা, এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে কান্নাকাটি করা।
* হজ্জে যাওয়ার সময় আযান দেয়া বা সঙ্গীত বাজানো বা গজল গাওয়া।
* সুফীদের মতো 'এক আল্লাহকে সঙ্গী করে' একাই হজ্জ যাত্রায় রওনা হওয়া।
* সফর শুরু করার পূর্বে বিভিন্ন মানব রচিত দুআ পড়া যা হজ্জের অংশ মনে করা।
* হজ্জ সফরে বের হওয়ার আগে দরগা/মাজার যিয়ারত করে বের হওয়া বা ওলীবাবা/পীরবাবার দুআ বা আর্শিবাদ নিয়ে বের হওয়া।
* একজন মহিলা হজ্জযাত্রী কোনো অনাত্মীয়কে ভাই বা ধর্মের ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে মাহরাম করা।
* নারীর ক্ষেত্রে কোনো একটি মহিলা দলের সঙ্গে মাহরাম ছাড়াই হজ্জে যাওয়া এবং একইভাবে এমন কোনো পুরুষের সঙ্গে গমণ করা যিনি পুরো মহিলা দলের মাহরাম হিসেবে নিজেকে দাবি করেন।
* এ কথা মানা যে, হজ্জের পরিপূর্ণতা হচ্ছে নিজ ঘরে ইহরাম বাঁধা।
* হজ্জ যাত্রার নিয়ম মনে করে যাত্রা শুরুর পূর্ব মুহূর্তে ২ রাকাআত নফল স্বলাত পড়া এবং ১ম ও ২য় রাকাআতে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস নির্ধারিতভাবে তেলাওয়াত করাকে হজ্জের নিয়ম মনে করা। তবে যে কোন সফরে বের হওয়ার পূর্বে নফল স্বলাত পড়ে বের হওয়া সুন্নাত।
* হজ্জ যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে অথবা বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানোর পর উচ্চস্বরে যিক্র করা এবং উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলা।
* এ কথা বিশ্বাস করা যে, পায়ে হজ্জ করার সওয়াব ৭০ হজ্জ আর বাহনে হজ্জ করলে ৩০ হজ্জের সওয়াব।
* প্রতি যাত্রাবিরতিতে দুই রাকাআত স্বলাত আদায় করা এবং এই কথা বলা, (হে আল্লাহ তুমি আমার জন্য এই যাত্রাবিরতির স্থানকে তোমার আশির্বাদপুষ্ট কর এবং তুমিই উত্তম আশ্রয়দাতা।)
* প্রচলিত জাল হাদীস নিজের পিতা-মাতার দিকে স্নেহ ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালে এক হজ্জের সমান নেকী পাওয়া যায়।
* হজ্জে গিয়ে যদি আর ফেরা না হয় তাই যাওয়ার পূর্বে কোন ওয়ারীসকে সম্পত্তির কোন অংশ অগ্রীম লেখে দিয়ে যাওয়া।
* কিছু দেশের লোকেরা হজ্জে যাওয়ার আগে চেহারায় বা শরীরে উল্কি আকায় যাতে কোন ক্ষতি না হয় বা কোন নজর না লাগে।
📄 সফরের কতিপয় সুন্নাহ ও আদব
■ একজন মুসলিমের সকল কাজ যেহেতু ইবাদত, সেহেতু সফর একটি ইবাদত। তাই ইসলাম ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা ও বাস্তবসম্মত নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দিয়েছে। মানুষ ভ্রমণ করে আল্লাহর সৃষ্টি জীব ও প্রকৃতি দেখার মাধ্যমে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞানার্জন করতে পারে এবং এর মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। সূরা আনকাবুত: ২৯:২৩, সূরা রুমঃ ৩০:৯, সূরা গশিয়াহঃ ৮৮:১৭
■ সফর আযাবের একটি অংশ কারন সফর অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন, পানাহার ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সফরে মানুষের আসল চরিত্র ও বৈশিষ্ট প্রকাশ পায়। সফরে মানুষের দুআ কবুল হয়। সফর করলে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।
■ সফরের ধরন বা প্রকারভেদের উপর ভিত্তি করে সফরকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা - আবশ্যিক সফর, পছন্দনীয় সফর, বৈধ সফর, অপছন্দনীয় সফর, নিষিদ্ধ সফর। হজ্জ ও উমরাহর সফর আবশ্যিক ও পছন্দনীয় সফরের অন্তভূক্ত।
📄 সফরের বের হওয়ার পূর্বে সুন্নাহ ও আদবসমূহ
■ সফরের পূর্বে বিশুদ্ধ নিয়ত করা। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ও ভালো কাজের নিয়তে সফর করা। সূরা যুমার: ৩৯:২, সূরা বাইয়েনাহ: ৯৮:৫, সূরা গাফির; ৪০:৬৫
■ সফরে বের হওয়ার পূর্বে সফর স্থান সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও ভালো মানুষদের কাছ থেকে উপদেশ ও পরামর্শ নেওয়া। তিরমিযী-৩৪৪৫
■ দুই রাকাত ইস্তেখারা (কল্যাণ কামনা) স্বলাত পড়ে মন সফরের দিকে ধাবিত হলে সফর করা। বুখারী-১১৬২
■ সফরে যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও সফরের জন্য হালাল পাথেয় সাথে নেওয়া। মুসলিম-১০১৫
■ অসিয়তযোগ্য সম্পদ বা কোন দেন-পাওনা থাকলে অসিয়ত লিখে রেখে সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৭৩৮
■ পিতা-মাতা জীবিত থাকলে তাঁদের অনুমতি নিয়ে এবং মহিলা হলে সাথে একজন মাহরাম (দাদা, নানা, বাবা, মামা, শ্বশুর, ভাই, ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের স্বামী, নিজের নাতি, দুধ বাবা, দুধ ভাই) নিয়ে সফর করা। বুখারী-১৮৬২, আবু দাউদ-১৭২৬
■ সম্ভব হলে সাথে স্ত্রীকে নিয়ে বা ২/৩ জন নেককার উত্তম সঙ্গীকে সাথে নিয়ে সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৯৯৮, আবু দাউদ-২৬০৭
■ উত্তম হচ্ছে বৃহস্পতিবার ও সকাল বেলা হওয়া। প্রয়োজনে রাতেও সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৯৪৯, আবু দাউদ-২৬০৬, ২৫৭১
■ সফরকারী পরিবারের প্রধান হলে বিদায়কালে পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া ও ভালো-মন্দের অছিয়ত করে বের হওয়া। বুখারী-২৪০৯
■ সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় পরিবারের উদ্দেশ্যে এই দুআ পাঠ করা:
أَسْتَوْدِعُكُمُ اللَّهُ الَّذِي لَا تَضِيعُ وَدَائِعُهُ
"আসতাওদি'উকুমুল্লা-হুল্লাযী লা তাযী'উ ওয়াদায়ী উহ”।
"আমি তোমাদেরকে আল্লাহর হেফাজতে রেখে যাচ্ছি যার হেফাজতে থাকা কেউই ক্ষতিগ্রস্থ হয় না"। ইবনে মাজাহ-২৮২৫
■ সফরের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দুআ পাঠ করা:
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
"বিসমিল্লাহি তাওক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"।
"আল্লাহর নামে, সকল ভরসা তাঁরই উপর এবং আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া কারোর ভালো কর্ম করার এবং খারাপ কর্ম থেকে ফিরে আসার সামর্থ্য নেই"। আবু দাউদ-৫০৯৫