📄 হজ্জের শর্তাবলী ও যার উপর হজ্জ ফরয
কিছু শর্ত সাপেক্ষে হজ্জ একটি ফরয ইবাদাত। নিম্নোক্ত ৭/৮টি মৌলিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হজ্জ প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয; অর্থাৎ জীবনে অন্তত একবার পালন করা অত্যাবশ্যকীয়। (মুসলিম-৩১৪৮)
শর্তগুলো হলো: ১. মুমিন মুসলিম হওয়া। ২. প্রাপ্তবয়স্ক/বালিগ হওয়া (ঊর্ধ্বে ১৫ বছর)। ৩. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া (কৃতদাস না হওয়া)। ৪. শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম এবং মানসিক ভারসাম্য থাকা। ৫. হজ্জ সফরের সম্পূর্ণ খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা। ৬. হজ্জ সফরের যাত্রাপথের নিরাপত্তা থাকা। ৭. মহিলার সঙ্গে স্বামী অথবা মাহরাম থাকা। * হজ্জে থাকাকালীন সময়কালে পরিবারের ভরণপোষণের নিশ্চয়তা করা।
নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে বাইতুল্লাহ যাওয়ার খরচ বহনের ক্ষমতা হয়ে গেলেই হজ্জ ফরয হয়ে যায়। এমনকি কারো যদি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান থাকে, যে জমির ফসল বা বাড়ি/গাড়ি/দোকান ভাড়া না হলেও তার বছর চলে যায় তবে সেই জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান বিক্রয় করে হজ্জে যাওয়া ফরয হবে বলে অনেক ফকীহগণ মত দিয়েছেন। অতএব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, যার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে ব্যাংকে অথবা হাতে ৫/৬ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত জমা আছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে গেছে।
একজন মহিলার মাহরাম হলেন তার পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে এমন একজন পুরুষ যার সাথে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ বৈধ নয়। (দাদা, নানা, বাবা, চাচা, মামা, শ্বশুর, ভাই, ছেলে, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের স্বামী, নিজের নাতি, দুধ বাবা, দুধ ভাই) (আবু দাউদ-১৭২৬)
যদি কেউ কাউকে হজ্জ করার জন্য খরচ বা অর্থ (হালাল অর্থ) প্রদান করেন তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। যদি উক্ত টাকায় হজ্জ পালন করা হয় তবে পরবর্তীতে তার উপর হজ্জ আর বাধ্যতামূলক হবে না; এমনকি পরবর্তীতে সে যদি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানও হয়।
যদি কেউ নাবালেগ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে হজ্জে নিয়ে যায় তবে তা ঐচ্ছিক হজ্জ হিসেবে গণ্য হবে ও এই হজ্জের সাওয়াব তার অভিভাবক লাভ করবে। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানের উপর পুনরায় হজ্জ ফরয হবে, যদি সে আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান হয়। (আবু দাউদ-১৭৩৬)
যে নারীর হজ্জ করার মত নিজস্ব সম্পদ রয়েছে তার উপর হজ্জ ফরয যদিও তার স্বামীর হজ্জ করার মত যথেষ্ট সম্পদ না থাকে। সে কোন বৈধ মাহরামকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ করে ফেলতে পারে। কোন মহিলার যদি বৈধ মাহরাম না থাকে তবে হজ্জে যাওয়া তার জন্য প্রযোজ্য বা ফরজ নয়। তবে সে কাউকে দিয়ে তার বদলি হজ্জ করিয়ে নিবে। যদি কোনো মহিলা বৈধ মাহরাম ছাড়া কাউকে পাতানো ভাই বানিয়ে বা কোন মহিলা দলের সাথে হজ্জে চলে যায় তাহলে সে বড় গুনাহের কাজে লিপ্ত হল এবং তার হজ্জ হবে না বলে অধিকাংশ উলামাগণ মত প্রকাশ করেছেন। (আবু দাউদ-১৭২৩, ইবনে মাজাহ-২৮৯৮)
কোন ব্যক্তি টাকা ধার/কর্জ করেও হজ্জ পালন করতে পারবে, যদি সে সেই টাকা ভবিষ্যতে পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য রাখে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ধার/কর্জ করে হজ্জ করা জরুরী নয়।
যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও হজ্জ পালন না করেই মারা যায়, তাহলে অন্য যে কেউ তার পক্ষে বদলী হজ্জ করতে পারবে। এক্ষেত্রে বদলী হজ্জকারী সর্বপ্রথম সে তার নিজের হজ্জ পালন করেছে এমন হতে হবে।
একটি ধারণা প্রচলিত আছে, যার ঘরে অবিবাহিত কন্যা রয়েছে সেই কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার উপর হজ্জ ফরয নয়। আবার ব্যাংকে লোন থাকলে লোন পরিশোধ না করা পর্যন্ত হজ্জে যাওয়া ঠিক হবে না বলে অনেকে মনে করেন। এগুলো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কথা।
যে মুসলিমের উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে তার উপর উমরাহও ফরজ হয়ে যায়। যদিও অনেক উলামা উমরাহ পালন করাকে ওয়াজিব বলেছেন। যার হজ্জ করার মতো সামর্থ্য হয় নাই কিন্তু উমরাহ করার মতো সামর্থ্য হয়েছে এবং সে চাইলে বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে পারে শুধু উমরাহ করার উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে হজ্জ পালন করে নিতে পারে।
অনেকে ভুল করে বলে থাকে যে, যে উমরাহ করেছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে যায়। কিন্তু হজ্জ সেই ব্যক্তির উপর ফরয নয় যার হজ্জ পালন করার মত যথেষ্ট সামর্থ্য হয় নাই, এমনকি সে যদি হজ্জের মাসেও উমরাহ পালন করে।
যার উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে সেও চাইলে শুধু উমরাহ পালন করতে পারবে যদি সে অদূর ভবিষ্যতে হজ্জ করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প ও নিয়ত পোষণ করে থাকে। তবে তার উমরাহ করার চেয়ে হজ্জ পালন করাই উত্তম।
কেউ যদি হজ্জকে ইসলামের রুকন নয় বলে মনে করে কিংবা হজ্জ করা জরুরী নয়/প্রয়োজন নেই বলে মনে করে কিংবা হজ্জের কোন বিধানকে অসংগতিপূর্ণ বা কোন কিছুকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করলো তবে সে কুফরী করলো।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১,২৫,০০০ এর অধিক মানুষ হজ্জ করতে যায় এবং হজ্জ সফর সম্পাদন করতে প্যাকেজভেদে ১০-৪০ দিন সময় লাগে।
📄 হজ্জ পালনে বিলম্ব করা ও তার পরিণাম
অনেক মানুষ সামর্থ্য হওয়ার পরও মনে করে কেন কম বয়সে/যৌবনে হজ্জ করবো! হজ্জ করলে তো হজ্জ ধরে রাখতে হবে! পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম অনুসরণ না করা পর্যন্ত তো হজ্জে যাওয়া ঠিক হবে না! মেয়ে/ছেলের বিয়ে দিয়ে তারপর হজ্জে যাবো! হজ্জ করার পর যদি কোন খারাপ কাজ করি তাহলে লোকেই বা কী বলবে! ... সুতরাং এখন যা উল্টা-পাল্টা করার আছে করি তারপর বৃদ্ধ বয়সে যখন কোনো কিছু করার থাকবে না তখন গিয়ে হজ্জ করে আসব। তখন আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার অতীতের সকল পাপ মাফ করে দেবেন এবং আমি ইনশা-আল্লাহ জান্নাতে যেতে পারবো! কি চতুর আর বুদ্ধিমান তারা চিন্তা করেছেন! আল্লাহ কি তাদের অন্তরের বিষয় জানেন না? হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ক্ষমা করো ও হেদায়েত দান করো। আমরা যদি মনে করি, আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সঙ্গে চালাকি ও ধোকাবাজি করবো, তাহলে মনে রাখতে হবে এর মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজেদেরকেই বোকা বানাচ্ছি, দোষী করছি এবং নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো।
যারা সামর্থ্য হওয়ার পরও হজ্জকে মুলতবি করে রেখেছেন তাদের জন্য বড় সতর্কবাণী হলো; উমর (রা) বলেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পরিত্যাগ করল, সে ইয়াহুদি হয়ে মরুক অথবা নাসারা হয়ে মরুক - তাতে কিছু যায় আসে না"। (বায়হাকী-৮৯২৩ - সনদ ত্রুটিযুক্ত)
উমার ইবনে খাত্তাব (রা) বলেছেন, "আমার ইচ্ছা হয় যে, কিছু লোককে রাজ্যের শহরগুলিতে প্রেরণ করি এবং তারা খুঁজে দেখুক ঐ সমস্ত লোককে যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পালন করে না তাদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করা হোক। কেননা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা হজ্জ পালন করে না তারা মুসলিম নয়, তারা মুসলিম নয়"। (সাঈদ ইবনে মনসুর-সুনান গ্রন্থে - অনির্ণীত)
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন, "যে হজ্জ পালন করতে ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন দ্রুত তা পালন করে। কারণ পরবর্তীতে সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা সামর্থ্য হারিয়ে ফেলতে পারে বা কোন সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে"। (ইবনে মাজাহ-২৮৮৩)
কেবলমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই হজ্জে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হজ্জের সামর্থ্য হওয়ার সাথে সাথেই হজ্জ পালন করা উচিত। কারণ মৃত্যু কখন চলে আসতে পারে তা জানা নেই। বাস্তবে এমন অনেক দেখা যায় হজ্জ করবো করবো করে আর হজ্জ করা হয়ে উঠে না অনেকেরই। অলসতা ও গাফিলতির কারণে একটি ফরয ইবাদত বাকি রেখে মৃত্যু বরণ করলে আল্লাহর কাছে এর জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে এবং শাস্তি পেতে হতে পারে।
📄 হজ্জ পূর্বপ্রস্তুতি : এজেন্সি নির্বাচন ও হজ্জ রেজিস্ট্রেশন
হজ্জে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করার পর প্রথম কাজ হলো দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করা, কারণ একটু দেরিতে নিবন্ধন করায় হজ্জে যাওয়া ১ বছর পিছিয়ে যেতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় অথবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যে কোন সরকার অনুমোদিত বৈধ হজ্জ এজেন্সি/কাফেলার মাধ্যমে হজ্জের রেজিস্ট্রেশন করা যায়। হজ্জ সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকার ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নির্দেশনা ও আপডেট পেতে চোখ রাখুন এই ওয়েবসাইটে: www.hajj.gov.bd
হজ্জের পূর্বপ্রস্তুতির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি ভালো হজ্জ এজেন্সি/কাফেলা নির্বাচন করা, কারণ এর উপর হজ্জের অনেক কিছু নির্ভর করে। অ-অনুমোদিত বা লাইসেন্স-বিহীন বা ভায়া হজ্জ এজেন্সি বিষয়ে সতর্ক থাকুন, কারণ এতে প্রতারিত হওয়ার বা যথাযথ সেবা না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেসরকারি কয়েকটি হজ্জ এজেন্সির খোঁজ নিন এবং তাদের হজ্জ প্যাকেজ ও সার্ভিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। কারো পরিচিতিতে প্রভাবিত হবেন না।
হজ্জ এজেন্সিকে নিম্নের বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করে জেনে নেওয়া ভালো: কোন আলেমের তত্ত্বাবধানে হজ্জ পালন করা হবে, হজ্জ এজেন্সির লাইসেন্স নং কত/কোন এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া হবে, হজ্জ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে কিনা, হজ্জ প্যাকেজ কত দিনের এবং খরচ কত, মক্কায় কতদিন থাকা আর মদিনায় কতদিন থাকা হবে, হজ্জ প্যাকেজ কি ফিতরা সিস্টেম (বাড়ি শিফটিং) নাকি ফিতরাবিহীন, মক্কা ও মদীনায় মসজিদের কতো নিকটবর্তী হোটেল নাকি ফ্লাটবাড়ী হবে তার সম্ভাব্য বিবরণ জানা, ৩ বেলা খাবার ব্যবস্থা কেমন হবে, কোন এয়ারলাইন্সে ফ্লাইট হবে, হজ্জের ফ্লাইট শুরুর হওয়ার কতো দিন পর ফ্লাইট হতে পারে, হজ্জের আগে মদীনা যাবে নাকি হজ্জ শেষ করে মদীনা যাবে, হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কতটুকু হাঁটতে হবে, এজেন্সির মাধ্যমে হাদী করার ব্যবস্থা হবে কিনা, দর্শনীয় স্থানসমূহ যিয়ারত করার ব্যবস্থা থাকবে কিনা, জমজমের পানি কিভাবে দেশে আনা যাবে, কেউ দুর্বল/অসুস্থ থাকলে তার জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা কিভাবে হবে ইত্যাদি সম্পর্কে জানা।
যেসব হজ্জ এজেন্সি বিজ্ঞ তাওহীদ ও সুন্নাহপন্থী আলেম দ্বারা পরিচালিত তাদের হজ্জ প্যাকেজ বেছে নেওয়া উত্তম। হজ্জ শুদ্ধ ও মকবুল হওয়ার জন্য এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল আলেমগণ তাদের কথায় শিরক ও বিদআত বর্জন করার কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা খুব সস্তা হজ্জ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না, কারণ কথায় বলে 'সস্তার তিন অবস্থা'। পরে কষ্ট আর দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে। আর ধনীরাও শুধু ৫/৪ স্টার হোটেলের হজ্জ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না, কারণ এটা হলিডে ট্যুর নয়। বেশি স্বাচ্ছন্দ্য যেন ইবাদত থেকে গাফেল করে না দেয়।
বর্তমানে হজ্জে যাওয়ার জন্য সৌদি সরকার নির্ধারিত কোটা পদ্ধতিতে সরকারের ই-হজ্জ সিস্টেমে প্রায় ১ বছর পূর্বেই প্রাক-নিবন্ধন/প্রি-রেজিস্ট্রেশন করতে হয় সরকারি অথবা বেসরকারি হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে। হজ্জের প্রি-রেজিস্ট্রেশনের জন্য ২ কপি পাসপোর্ট ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ (১৮ বছরের নীচে), মোবাইল নম্বর ও প্রাক নিবন্ধনের টাকা এজেন্সির মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রি-রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়। ব্যাংকে টাকা জমা হলে মোবাইলে মেসেজ আসবে এবং মেসেজে ট্র্যাকিং নং ও প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল নং থাকে যা যত্ন করে সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন। এই ট্র্যাকিং নং ও প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল নং দিয়ে www.hajj.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রাক-নিবন্ধন নিশ্চিত হওয়া চেক করে দেখা যায়। পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশনা/সারকুলার অনুযায়ী হজ্জ এজেন্সি যাবতীয় কর্মকাণ্ড যথাসময়ে অবহিত করবে এবং সম্পাদন করতে সহযোগিতা করবে। প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল চলতি বছরে হজ্জে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হলে ও হজ্জের পুরো টাকা জমা সাপেক্ষে মোবাইলে মেসেজ আসবে এবং PID/ পিলগ্রিম আইডি পাওয়া যাবে যা উক্ত ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করে দেখা যায়।
হজ্জে যাওয়ার জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের মেয়াদ হজ্জের ভিসা করার পূর্বে নূন্যতম ৬ মাস থাকতে হবে অন্যথায় পাসপোর্ট নবায়ন করে নিতে হবে। হজ্জের ভিসা করার পূর্বে জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ড বা হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রতিষেধক টিকা নিতে হবে।
বেসরকারি হজ্জ এজেন্সিগুলো হজ্জের সময় হাজীদের প্রতিশ্রুত সেবা দিতে পারে কিনা সেটাই মূল বিষয়। এজেন্সির প্রতি প্রত্যাশা কম রাখা ভালো। তারা ন্যূনতম কি সেবা দিতে পারবে আর কি পারবে না, তা যেন তারা পরিষ্কার খোলাখুলি আগেভাগে জানিয়ে দেয়। তাদের কথা আর কাজের যেন মিল থাকে এবং কোনো লুকোচুরি যেন না থাকে। তারা যেন এমন কোনো বিষয় গোপন না করে যা হজ্জের সময় আপনার কষ্ট বা ক্ষোভের কারণ হতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে হজ্জ এজেন্সি তাদের প্রত্যাশিত কিছু সেবা নাও দিতে পারে, সেক্ষেত্রে এজেন্সির সঙ্গে খারাপ আচরণ করা ঠিক হবে না।
শুধু উমরাহ বছরের যে কোন সময় সরকার অনুমোদিত যে কোন উমরাহ লাইসেন্সধারী এজেন্সির মাধ্যমে করতে হবে। এজেন্সি যাবতীয় ভিসা, টিকেট, হোটেল বুকিং এবং সফরের ব্যবস্থাপনা করেন। তবে অদূর ভবিষ্যতে কোন এজেন্সি ছাড়াই ব্যক্তিগতভবে সব কিছু ম্যানেজ করে উমরাহ করার সিস্টেম চালু হবে বলে আশা করা যায়।
📄 হজ্জ পূর্বপ্রস্তুতি : মানসিক ও শিক্ষামূলক প্রস্তুতি
হজ্জের রেজিস্ট্রেশনের পর থেকেই ধীরে ধীরে হজ্জের জন্য মনে মনে মানসিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষামূলক প্রস্তুতি শুরু করতে হবে কারণ রেজিস্ট্রেশনের পর থেকে ১ বছর মতো সময় পাওয়া যাবে নিজেকে হজ্জের জন্য প্রস্তুত করার। হজ্জের প্রথম মানসিক ও শিক্ষামূলক প্রস্তুতি হলো; ঈমানকে তাওহিদী ঈমান এবং আকীদাকে ইসলামের স্বর্ণযুগের তথা পূর্বসূরী ব্যক্তিদের মতো বিশুদ্ধ করা। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'র মানহাজে বিশুদ্ধ আকীদা জ্ঞান শিক্ষা করা।
ঈমান ও আমল ধ্বংসকারী সকল প্রকার ভ্রান্ত আকীদা, কুফরী, শিরক, তাগুত, মুনাফেকী ও বিদআত সম্পর্কে জানা এবং তা থেকে তাওবা করে মুক্ত হওয়া। কারণ ১টি মাত্র কুফরী ও শিরক সকল আমল ও ইবাদত নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। হজ্জের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা। কারণ নিয়তের উপর আমল নির্ভরশীল। খ্যাতি, হলিডে ট্যুর বা কারো মাহরাম হওয়ার জন্য হজ্জের নিয়ত করা যাবে না। একনিষ্ঠভাবে হজ্জ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের জন্য করতে হবে।
হজ্জ কার মতো পদ্ধতিতে পালন করা হবে সে মানদণ্ড বা নীতি আগে ঠিক করা। হজ্জ কি রাসূল (সা) ও সাহাবীদের পদ্ধতি মতো হবে? নাকি হজ্জ কোন ইমাম সাহেব হুজুরের কথা মতো হবে বা কোন হজ্জ বইয়ের লেখা মতো হবে! হজ্জের ছোট-বড় সকল কাজ সহীহ সুন্নাহ/হাদীস মোতাবেক সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব জ্ঞান ও বিবেক দ্বারা পরিপূর্ণভাবে পালন করার জন্য তৎপর হতে হবে। কোন কাজ কতো কম করে পার পাওয়া যায়, এমন চিন্তা করা যাবে না। হজ্জ মানেই মনে রাখতে হবে টাকা দিয়ে কষ্ট কেনা ও অব্যবস্থাপনার আতিথেয়তা নেওয়া। হজ্জের জন্য ৫-৬ লক্ষ টাকা দিয়েছেন বলে যে সব ভালো ও সহজ হবে আর কোন কষ্ট হবে না তা কখনোই আশা করা যাবে না।
হজ্জের এই সফর জীবনের প্রথম ও শেষ হজ্জ সফর মনে করা। সুতরাং এই যাত্রাকে জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। এই হজ্জ যেন বাকি জীবনের কার্যকলাপ পরিবর্তনকারী হয় এমন ইচ্ছা পোষণ করা। কবিরা গুনাহর বই থেকে দেখে নিজের সম্পাদিত অতীতের সকল বড় গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং গুনাহের লিস্ট করে হজ্জে নিয়ে যাওয়া উচিত এবং ওখানে গিয়ে ফের গুনাহের জন্য ইস্তিগফার করা। নিজের চারিত্রিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা - মুখ, চোখ, হাত, পা ও কান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা। নিজকে সংযত ও মার্জিত করা। ধৈর্যশীল হওয়া, কষ্টের সময় নিজকে মানিয়ে নিতে, রাগকে দমন করতে ও ত্যাগ স্বীকারকারী হওয়া।
সদা আল্লাহর স্মরণ ও যিকিরের মাধ্যমে অন্তরকে আন্দোলিত রাখার অভ্যাস করা। অন্তরে তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা আনয়নে সচেষ্ট হওয়া। হজ্জের সফরে সকল অসুবিধা, বিপদ, কষ্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করতে হবে। আর ইবলিশ শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। সব সমস্যা সমাধানের জন্য আগে একমাত্র আল্লাহর কাছে ধর্ণা দিতে হবে। হজ্জে গিয়ে মানুষের দেখাদেখি বা মানুষের মুখের কথা শুনে কোন কাজ না করার বিষয়ে সতর্ক থাকা। হজ্জে গিয়ে ইসলামের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দেখে আবেগে ভুল (শিরক/বিদআত) কিছু করা না হয়ে যায় সে বিষয়ে সজাগ থাকা।
হজ্জ সফরে হাজীদের একটা কমন কাজ হলো ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা এবং অন্যের নামে/এজেন্সির নামে গীবত চর্চা করা। তাই হজ্জ সফরে গিয়ে সংযত, উত্তম আচরণকারী ও বিনয়ী আল্লাহর এক বান্দা হতে হবে। হজ্জ সফরে ধৈর্য, ত্যাগ ও ক্ষমার চর্চা করতে হবে। সহযাত্রীদের কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। তাদের পক্ষ থেকে আগত যাবতীয় মন্দের জবাব ভালোর মাধ্যমে দিতে হবে। সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতে হবে। হজ্জ সফরে পরোপকারী ও সাহায্যকারী মনোভাব রাখতে হবে। সকল দেশের মুসলিম ভাই-ভাই মনে করতে হবে। অপর মুসলিম ভাইয়ের সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-আপদ নিজের মনে করে অপরের সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
হজ্জে যাওয়ার পূর্বে ইসলামের মৌলিক কিছু আমলীয় বিষয় যেমন - পবিত্রতা, ওযু, গোসল, নামায ও প্রতিনিয়ত পালনীয় দু'আ-যিকির শিক্ষা করে যাওয়া। হজ্জে গিয়ে প্রয়োজনে আমলসমূহ যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের উন্মুক্ত মানসিকতা রাখা। হজ্জে যাওয়ার আগে সাওয়াব কামাই/নেকী শপিংয়ের টার্গেট করা। কিভাবে হজ্জের পুরো সময়টিকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে বেশি নেকী অর্জনকারী হওয়া যায় এবং নিষ্পাপ শিশু হয়ে ফেরত আসা যায় সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
হজ্জ ও উমরাহ সম্পর্কে কয়েকটি দলিল ভিত্তিক সহীহ বই থেকে জ্ঞানার্জন করা এবং হজ্জের কিছু প্রয়োজনীয় দু'আ মুখস্থ করা। পূর্বে হজ্জ করেছে এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে হজ্জের কিছু বাস্তবতার বিষয় সম্পর্কে জানা। হজ্জ সফরে অর্থ বুঝে পুরো কুরআন পড়ে খতম করার এবং কিছু নতুন সূরা বা দু'আ মুখস্থ করার টার্গেট করা। প্রতিদিন কি কি আমল, দু'আ ও ইবাদত করতে হবে তা মনে মনে স্থির করা এবং তা লিখে তালিকা করে নিয়ে যাওয়া।
বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন দু'আ-অজিফার বই; যেগুলোতে বিশুদ্ধ হাদীসের দলিল নেই এবং বিভিন্ন স্বলাতের নিয়ত, বিভিন্ন দুরূদ, বিভিন্ন খতম ও লক্ষ-কোটি নেকীর ফযীলত বর্ণনা থাকে সেগুলো আমল করার জন্য পরিহার করা। মানুষজনকে সৎ কাজে আদেশ (আমর বিল মারুফ) ও মন্দ কাজে নিষেধ (নাহি আনিল মুনকার) এর মৌলিক দায়িত্ব হিকমত ও নম্রতার সাথে পালন করা। শেষ কথা হলো; হজ্জে যাওয়ার সময় অবশ্যই পাথেয় হিসাবে সূরা বাকারার ১৯৭নং আয়াতকে অন্তরে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া!