📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার

📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার


■ "এবং স্মরণ করো, যখন ইবরাহীমকে সে ঘরের (বাইতুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, স্বলাতে দন্ডায়মান এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য। এবং মানবজাতিকে হজ্জের কথা ঘোষণা করে দাও; তারা পায়ে হেঁটে ও শীর্ণ উটের পিঠে করে তোমার কাছে আসবে, তারা দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে (হজ্জ এর উদ্দেশ্যে)"। সুরা-আল হাজ্জঃ ২২:২৬,২৭
■ "..আর এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যে মাকামে ইব্রাহিমে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যার সামর্থ্য রয়েছে (শারীরিক ও আর্থিক) তার এই কাবায় এসে হজ্জ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য কর্তব্য (ফরজ), আর যদি কেউ এ বিধান (হজ্জ) কে অস্বীকার করে তবে; (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ বিশ্বজগতের কারো মুখাপেক্ষী নন"। সুরা-আলে ইমরান; ৩:৯৭
■ "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অর্ন্তগত, যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ্জ ও উমরাহ করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে প্রদক্ষিণ করা (সাঈ) দোষনীয় নয়, এবং কোন ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে, আল্লাহ কৃতজ্ঞতাপরায়ন ও সর্বজ্ঞাত"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৫৮
■ "এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর,..."। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৬
■ "হজ্জের মাসসমূহ সুনির্দিষ্ট। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্জ আরোপ (যাওয়ার ইচ্ছা) করে নিলো, তার জন্য অশ্লীল আচরণ, পাপ-অন্যায় কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা বৈধ নয়। আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও (হজ্জ যাত্রার জন্য), বস্তুত: সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা) এবং হে জ্ঞানীরা, তোমরা আমাকে ভয় কর"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৭
■ "..আর যে সেখানে (হারাম এলাকায়) অন্যায়ভাবে দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছা পোষণ করবে, তাকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব"। সুরা-আল হাজ্জ; ২২:২৫
■ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, “৫টি ভিত্তির উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। ১.এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহ ছাড়া (হক) কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল, ২.স্বলাত কায়েম করা, ৩. যাকাত আদায় করা, ৪. রমাদ্বানে সাওম পালন করা, ৫. বাইতুল্লাহয় হজ্জ পালন করা।" তিরমিযী- ২৬০৯
■ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও। কারণ আমি জানি না এ হজ্জের পর আমি আবার হজ্জ করতে পারবো কিনা"। মুসলিম-৩০২৮
■ রাসূল (স) এরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা সম্পাদন করে"। আবু দাউদ-১৭৩২
মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ একবার করা ফরয, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা তার জন্য নফল হবে"। আবু দাউদ-১৭২১
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তিনটি দল আল্লাহর মেহমান; আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজ্জকারী ও উমরাহ পালনকারী”। নাসাঈ-২৬২৫
এক হাদীসে এসেছে, "উত্তম আমল কি এই মর্মে রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞসা করা হল। উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হল, "তারপর কি?”, তিনি বললেন, আল্লাহ পথে জিহাদ। বলা হল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ্জ"। বুখারী-১৫১৯
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে হজ্জ/উমরাহ পালনের পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করবে সে তার পূর্ণ সওয়াব পাবে"। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৫৩৯
বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ পালনে অর্থ ব্যয় করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করার সমতুল্য। এক দিরহাম ব্যয় করলে উহাকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়"। মুসনাদে আহমদ-২২৪৯১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হজ্জ ও উমরাহ পালন কর কেননা আগুন যেভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহা থেকে খাঁদ দূর করে, তেমনি উহা তোমরা তোমাদের দারিদ্রতা ও পাপ মোচন করে দেয়”। নাসাঈ-২৬৩০, তিরমিযী-৮১০
একদা রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে প্রশ্ন করে আয়েশা বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিতো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল বলেছেন। আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, না, তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হল হজ্জ (তথা মাবরুর হজ্জ)"। বুখারী-১৫২০
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, "রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "বয়স্ক, দুর্বল, শিশু ও নারীর জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ পালন করা"। নাসাঈ-২৬২৬
ইবনু উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং হজ্জ ও উমরাহ পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন, তারা সে ডাকে সাড়া দিয়েছে। অতএব, তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাই তাদের দিয়ে দিবেন"। ইবনে মাজাহ-২৮৯৩
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ পালন করল এবং নিজেকে গর্হিত পাপ কাজ ও সকল অশালীন কথা থেকে বিরত রাখল তাহলে সে হজ্জ থেকে এমন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে ফিরে আসবে যেমন সে তার জন্মের সময় ছিল"। বুখারী-১৫২১
রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, "মাবরুর হজ্জের (কবুল হজ্জের) প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়"। বুখারী-১৭৭৩, নাসাঈ-২৬২৩

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জের শর্তাবলী ও যার উপর হজ্জ ফরয

📄 হজ্জের শর্তাবলী ও যার উপর হজ্জ ফরয


কিছু শর্ত সাপেক্ষে হজ্জ একটি ফরয ইবাদাত। নিম্নোক্ত ৭/৮টি মৌলিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হজ্জ প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয; অর্থাৎ জীবনে অন্তত একবার পালন করা অত্যাবশ্যকীয়। (মুসলিম-৩১৪৮)

শর্তগুলো হলো: ১. মুমিন মুসলিম হওয়া। ২. প্রাপ্তবয়স্ক/বালিগ হওয়া (ঊর্ধ্বে ১৫ বছর)। ৩. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া (কৃতদাস না হওয়া)। ৪. শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম এবং মানসিক ভারসাম্য থাকা। ৫. হজ্জ সফরের সম্পূর্ণ খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা। ৬. হজ্জ সফরের যাত্রাপথের নিরাপত্তা থাকা। ৭. মহিলার সঙ্গে স্বামী অথবা মাহরাম থাকা। * হজ্জে থাকাকালীন সময়কালে পরিবারের ভরণপোষণের নিশ্চয়তা করা।

নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে বাইতুল্লাহ যাওয়ার খরচ বহনের ক্ষমতা হয়ে গেলেই হজ্জ ফরয হয়ে যায়। এমনকি কারো যদি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান থাকে, যে জমির ফসল বা বাড়ি/গাড়ি/দোকান ভাড়া না হলেও তার বছর চলে যায় তবে সেই জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান বিক্রয় করে হজ্জে যাওয়া ফরয হবে বলে অনেক ফকীহগণ মত দিয়েছেন। অতএব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, যার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে ব্যাংকে অথবা হাতে ৫/৬ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত জমা আছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে গেছে।

একজন মহিলার মাহরাম হলেন তার পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে এমন একজন পুরুষ যার সাথে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ বৈধ নয়। (দাদা, নানা, বাবা, চাচা, মামা, শ্বশুর, ভাই, ছেলে, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের স্বামী, নিজের নাতি, দুধ বাবা, দুধ ভাই) (আবু দাউদ-১৭২৬)

যদি কেউ কাউকে হজ্জ করার জন্য খরচ বা অর্থ (হালাল অর্থ) প্রদান করেন তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। যদি উক্ত টাকায় হজ্জ পালন করা হয় তবে পরবর্তীতে তার উপর হজ্জ আর বাধ্যতামূলক হবে না; এমনকি পরবর্তীতে সে যদি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানও হয়।

যদি কেউ নাবালেগ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে হজ্জে নিয়ে যায় তবে তা ঐচ্ছিক হজ্জ হিসেবে গণ্য হবে ও এই হজ্জের সাওয়াব তার অভিভাবক লাভ করবে। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানের উপর পুনরায় হজ্জ ফরয হবে, যদি সে আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান হয়। (আবু দাউদ-১৭৩৬)

যে নারীর হজ্জ করার মত নিজস্ব সম্পদ রয়েছে তার উপর হজ্জ ফরয যদিও তার স্বামীর হজ্জ করার মত যথেষ্ট সম্পদ না থাকে। সে কোন বৈধ মাহরামকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ করে ফেলতে পারে। কোন মহিলার যদি বৈধ মাহরাম না থাকে তবে হজ্জে যাওয়া তার জন্য প্রযোজ্য বা ফরজ নয়। তবে সে কাউকে দিয়ে তার বদলি হজ্জ করিয়ে নিবে। যদি কোনো মহিলা বৈধ মাহরাম ছাড়া কাউকে পাতানো ভাই বানিয়ে বা কোন মহিলা দলের সাথে হজ্জে চলে যায় তাহলে সে বড় গুনাহের কাজে লিপ্ত হল এবং তার হজ্জ হবে না বলে অধিকাংশ উলামাগণ মত প্রকাশ করেছেন। (আবু দাউদ-১৭২৩, ইবনে মাজাহ-২৮৯৮)

কোন ব্যক্তি টাকা ধার/কর্জ করেও হজ্জ পালন করতে পারবে, যদি সে সেই টাকা ভবিষ্যতে পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য রাখে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ধার/কর্জ করে হজ্জ করা জরুরী নয়।

যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও হজ্জ পালন না করেই মারা যায়, তাহলে অন্য যে কেউ তার পক্ষে বদলী হজ্জ করতে পারবে। এক্ষেত্রে বদলী হজ্জকারী সর্বপ্রথম সে তার নিজের হজ্জ পালন করেছে এমন হতে হবে।

একটি ধারণা প্রচলিত আছে, যার ঘরে অবিবাহিত কন্যা রয়েছে সেই কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার উপর হজ্জ ফরয নয়। আবার ব্যাংকে লোন থাকলে লোন পরিশোধ না করা পর্যন্ত হজ্জে যাওয়া ঠিক হবে না বলে অনেকে মনে করেন। এগুলো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কথা।

যে মুসলিমের উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে তার উপর উমরাহও ফরজ হয়ে যায়। যদিও অনেক উলামা উমরাহ পালন করাকে ওয়াজিব বলেছেন। যার হজ্জ করার মতো সামর্থ্য হয় নাই কিন্তু উমরাহ করার মতো সামর্থ্য হয়েছে এবং সে চাইলে বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে পারে শুধু উমরাহ করার উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে হজ্জ পালন করে নিতে পারে।

অনেকে ভুল করে বলে থাকে যে, যে উমরাহ করেছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে যায়। কিন্তু হজ্জ সেই ব্যক্তির উপর ফরয নয় যার হজ্জ পালন করার মত যথেষ্ট সামর্থ্য হয় নাই, এমনকি সে যদি হজ্জের মাসেও উমরাহ পালন করে।

যার উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে সেও চাইলে শুধু উমরাহ পালন করতে পারবে যদি সে অদূর ভবিষ্যতে হজ্জ করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প ও নিয়ত পোষণ করে থাকে। তবে তার উমরাহ করার চেয়ে হজ্জ পালন করাই উত্তম।

কেউ যদি হজ্জকে ইসলামের রুকন নয় বলে মনে করে কিংবা হজ্জ করা জরুরী নয়/প্রয়োজন নেই বলে মনে করে কিংবা হজ্জের কোন বিধানকে অসংগতিপূর্ণ বা কোন কিছুকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করলো তবে সে কুফরী করলো।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১,২৫,০০০ এর অধিক মানুষ হজ্জ করতে যায় এবং হজ্জ সফর সম্পাদন করতে প্যাকেজভেদে ১০-৪০ দিন সময় লাগে।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জ পালনে বিলম্ব করা ও তার পরিণাম

📄 হজ্জ পালনে বিলম্ব করা ও তার পরিণাম


অনেক মানুষ সামর্থ্য হওয়ার পরও মনে করে কেন কম বয়সে/যৌবনে হজ্জ করবো! হজ্জ করলে তো হজ্জ ধরে রাখতে হবে! পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম অনুসরণ না করা পর্যন্ত তো হজ্জে যাওয়া ঠিক হবে না! মেয়ে/ছেলের বিয়ে দিয়ে তারপর হজ্জে যাবো! হজ্জ করার পর যদি কোন খারাপ কাজ করি তাহলে লোকেই বা কী বলবে! ... সুতরাং এখন যা উল্টা-পাল্টা করার আছে করি তারপর বৃদ্ধ বয়সে যখন কোনো কিছু করার থাকবে না তখন গিয়ে হজ্জ করে আসব। তখন আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার অতীতের সকল পাপ মাফ করে দেবেন এবং আমি ইনশা-আল্লাহ জান্নাতে যেতে পারবো! কি চতুর আর বুদ্ধিমান তারা চিন্তা করেছেন! আল্লাহ কি তাদের অন্তরের বিষয় জানেন না? হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ক্ষমা করো ও হেদায়েত দান করো। আমরা যদি মনে করি, আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সঙ্গে চালাকি ও ধোকাবাজি করবো, তাহলে মনে রাখতে হবে এর মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজেদেরকেই বোকা বানাচ্ছি, দোষী করছি এবং নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো।

যারা সামর্থ্য হওয়ার পরও হজ্জকে মুলতবি করে রেখেছেন তাদের জন্য বড় সতর্কবাণী হলো; উমর (রা) বলেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পরিত্যাগ করল, সে ইয়াহুদি হয়ে মরুক অথবা নাসারা হয়ে মরুক - তাতে কিছু যায় আসে না"। (বায়হাকী-৮৯২৩ - সনদ ত্রুটিযুক্ত)

উমার ইবনে খাত্তাব (রা) বলেছেন, "আমার ইচ্ছা হয় যে, কিছু লোককে রাজ্যের শহরগুলিতে প্রেরণ করি এবং তারা খুঁজে দেখুক ঐ সমস্ত লোককে যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্জ পালন করে না তাদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করা হোক। কেননা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা হজ্জ পালন করে না তারা মুসলিম নয়, তারা মুসলিম নয়"। (সাঈদ ইবনে মনসুর-সুনান গ্রন্থে - অনির্ণীত)

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন, "যে হজ্জ পালন করতে ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন দ্রুত তা পালন করে। কারণ পরবর্তীতে সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা সামর্থ্য হারিয়ে ফেলতে পারে বা কোন সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে"। (ইবনে মাজাহ-২৮৮৩)

কেবলমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই হজ্জে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হজ্জের সামর্থ্য হওয়ার সাথে সাথেই হজ্জ পালন করা উচিত। কারণ মৃত্যু কখন চলে আসতে পারে তা জানা নেই। বাস্তবে এমন অনেক দেখা যায় হজ্জ করবো করবো করে আর হজ্জ করা হয়ে উঠে না অনেকেরই। অলসতা ও গাফিলতির কারণে একটি ফরয ইবাদত বাকি রেখে মৃত্যু বরণ করলে আল্লাহর কাছে এর জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে এবং শাস্তি পেতে হতে পারে।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জ পূর্বপ্রস্তুতি : এজেন্সি নির্বাচন ও হজ্জ রেজিস্ট্রেশন

📄 হজ্জ পূর্বপ্রস্তুতি : এজেন্সি নির্বাচন ও হজ্জ রেজিস্ট্রেশন


হজ্জে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করার পর প্রথম কাজ হলো দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করা, কারণ একটু দেরিতে নিবন্ধন করায় হজ্জে যাওয়া ১ বছর পিছিয়ে যেতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় অথবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যে কোন সরকার অনুমোদিত বৈধ হজ্জ এজেন্সি/কাফেলার মাধ্যমে হজ্জের রেজিস্ট্রেশন করা যায়। হজ্জ সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকার ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নির্দেশনা ও আপডেট পেতে চোখ রাখুন এই ওয়েবসাইটে: www.hajj.gov.bd

হজ্জের পূর্বপ্রস্তুতির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি ভালো হজ্জ এজেন্সি/কাফেলা নির্বাচন করা, কারণ এর উপর হজ্জের অনেক কিছু নির্ভর করে। অ-অনুমোদিত বা লাইসেন্স-বিহীন বা ভায়া হজ্জ এজেন্সি বিষয়ে সতর্ক থাকুন, কারণ এতে প্রতারিত হওয়ার বা যথাযথ সেবা না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেসরকারি কয়েকটি হজ্জ এজেন্সির খোঁজ নিন এবং তাদের হজ্জ প্যাকেজ ও সার্ভিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। কারো পরিচিতিতে প্রভাবিত হবেন না।

হজ্জ এজেন্সিকে নিম্নের বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করে জেনে নেওয়া ভালো: কোন আলেমের তত্ত্বাবধানে হজ্জ পালন করা হবে, হজ্জ এজেন্সির লাইসেন্স নং কত/কোন এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া হবে, হজ্জ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে কিনা, হজ্জ প্যাকেজ কত দিনের এবং খরচ কত, মক্কায় কতদিন থাকা আর মদিনায় কতদিন থাকা হবে, হজ্জ প্যাকেজ কি ফিতরা সিস্টেম (বাড়ি শিফটিং) নাকি ফিতরাবিহীন, মক্কা ও মদীনায় মসজিদের কতো নিকটবর্তী হোটেল নাকি ফ্লাটবাড়ী হবে তার সম্ভাব্য বিবরণ জানা, ৩ বেলা খাবার ব্যবস্থা কেমন হবে, কোন এয়ারলাইন্সে ফ্লাইট হবে, হজ্জের ফ্লাইট শুরুর হওয়ার কতো দিন পর ফ্লাইট হতে পারে, হজ্জের আগে মদীনা যাবে নাকি হজ্জ শেষ করে মদীনা যাবে, হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কতটুকু হাঁটতে হবে, এজেন্সির মাধ্যমে হাদী করার ব্যবস্থা হবে কিনা, দর্শনীয় স্থানসমূহ যিয়ারত করার ব্যবস্থা থাকবে কিনা, জমজমের পানি কিভাবে দেশে আনা যাবে, কেউ দুর্বল/অসুস্থ থাকলে তার জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা কিভাবে হবে ইত্যাদি সম্পর্কে জানা।

যেসব হজ্জ এজেন্সি বিজ্ঞ তাওহীদ ও সুন্নাহপন্থী আলেম দ্বারা পরিচালিত তাদের হজ্জ প্যাকেজ বেছে নেওয়া উত্তম। হজ্জ শুদ্ধ ও মকবুল হওয়ার জন্য এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল আলেমগণ তাদের কথায় শিরক ও বিদআত বর্জন করার কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা খুব সস্তা হজ্জ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না, কারণ কথায় বলে 'সস্তার তিন অবস্থা'। পরে কষ্ট আর দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে। আর ধনীরাও শুধু ৫/৪ স্টার হোটেলের হজ্জ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না, কারণ এটা হলিডে ট্যুর নয়। বেশি স্বাচ্ছন্দ্য যেন ইবাদত থেকে গাফেল করে না দেয়।

বর্তমানে হজ্জে যাওয়ার জন্য সৌদি সরকার নির্ধারিত কোটা পদ্ধতিতে সরকারের ই-হজ্জ সিস্টেমে প্রায় ১ বছর পূর্বেই প্রাক-নিবন্ধন/প্রি-রেজিস্ট্রেশন করতে হয় সরকারি অথবা বেসরকারি হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে। হজ্জের প্রি-রেজিস্ট্রেশনের জন্য ২ কপি পাসপোর্ট ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ (১৮ বছরের নীচে), মোবাইল নম্বর ও প্রাক নিবন্ধনের টাকা এজেন্সির মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রি-রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়। ব্যাংকে টাকা জমা হলে মোবাইলে মেসেজ আসবে এবং মেসেজে ট্র্যাকিং নং ও প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল নং থাকে যা যত্ন করে সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন। এই ট্র্যাকিং নং ও প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল নং দিয়ে www.hajj.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রাক-নিবন্ধন নিশ্চিত হওয়া চেক করে দেখা যায়। পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশনা/সারকুলার অনুযায়ী হজ্জ এজেন্সি যাবতীয় কর্মকাণ্ড যথাসময়ে অবহিত করবে এবং সম্পাদন করতে সহযোগিতা করবে। প্রি-রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল চলতি বছরে হজ্জে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত হলে ও হজ্জের পুরো টাকা জমা সাপেক্ষে মোবাইলে মেসেজ আসবে এবং PID/ পিলগ্রিম আইডি পাওয়া যাবে যা উক্ত ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করে দেখা যায়।

হজ্জে যাওয়ার জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের মেয়াদ হজ্জের ভিসা করার পূর্বে নূন্যতম ৬ মাস থাকতে হবে অন্যথায় পাসপোর্ট নবায়ন করে নিতে হবে। হজ্জের ভিসা করার পূর্বে জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ড বা হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রতিষেধক টিকা নিতে হবে।

বেসরকারি হজ্জ এজেন্সিগুলো হজ্জের সময় হাজীদের প্রতিশ্রুত সেবা দিতে পারে কিনা সেটাই মূল বিষয়। এজেন্সির প্রতি প্রত্যাশা কম রাখা ভালো। তারা ন্যূনতম কি সেবা দিতে পারবে আর কি পারবে না, তা যেন তারা পরিষ্কার খোলাখুলি আগেভাগে জানিয়ে দেয়। তাদের কথা আর কাজের যেন মিল থাকে এবং কোনো লুকোচুরি যেন না থাকে। তারা যেন এমন কোনো বিষয় গোপন না করে যা হজ্জের সময় আপনার কষ্ট বা ক্ষোভের কারণ হতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে হজ্জ এজেন্সি তাদের প্রত্যাশিত কিছু সেবা নাও দিতে পারে, সেক্ষেত্রে এজেন্সির সঙ্গে খারাপ আচরণ করা ঠিক হবে না।

শুধু উমরাহ বছরের যে কোন সময় সরকার অনুমোদিত যে কোন উমরাহ লাইসেন্সধারী এজেন্সির মাধ্যমে করতে হবে। এজেন্সি যাবতীয় ভিসা, টিকেট, হোটেল বুকিং এবং সফরের ব্যবস্থাপনা করেন। তবে অদূর ভবিষ্যতে কোন এজেন্সি ছাড়াই ব্যক্তিগতভবে সব কিছু ম্যানেজ করে উমরাহ করার সিস্টেম চালু হবে বলে আশা করা যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية