📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার
■ "এবং স্মরণ করো, যখন ইবরাহীমকে সে ঘরের (বাইতুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, স্বলাতে দন্ডায়মান এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য। এবং মানবজাতিকে হজ্জের কথা ঘোষণা করে দাও; তারা পায়ে হেঁটে ও শীর্ণ উটের পিঠে করে তোমার কাছে আসবে, তারা দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে (হজ্জ এর উদ্দেশ্যে)"। সুরা-আল হাজ্জঃ ২২:২৬,২৭
■ "..আর এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যে মাকামে ইব্রাহিমে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যার সামর্থ্য রয়েছে (শারীরিক ও আর্থিক) তার এই কাবায় এসে হজ্জ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য কর্তব্য (ফরজ), আর যদি কেউ এ বিধান (হজ্জ) কে অস্বীকার করে তবে; (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ বিশ্বজগতের কারো মুখাপেক্ষী নন"। সুরা-আলে ইমরান; ৩:৯৭
■ "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অর্ন্তগত, যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ্জ ও উমরাহ করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে প্রদক্ষিণ করা (সাঈ) দোষনীয় নয়, এবং কোন ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে, আল্লাহ কৃতজ্ঞতাপরায়ন ও সর্বজ্ঞাত"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৫৮
■ "এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর,..."। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৬
■ "হজ্জের মাসসমূহ সুনির্দিষ্ট। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্জ আরোপ (যাওয়ার ইচ্ছা) করে নিলো, তার জন্য অশ্লীল আচরণ, পাপ-অন্যায় কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা বৈধ নয়। আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও (হজ্জ যাত্রার জন্য), বস্তুত: সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা) এবং হে জ্ঞানীরা, তোমরা আমাকে ভয় কর"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৭
■ "..আর যে সেখানে (হারাম এলাকায়) অন্যায়ভাবে দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছা পোষণ করবে, তাকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব"। সুরা-আল হাজ্জ; ২২:২৫
■ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, “৫টি ভিত্তির উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। ১.এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহ ছাড়া (হক) কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল, ২.স্বলাত কায়েম করা, ৩. যাকাত আদায় করা, ৪. রমাদ্বানে সাওম পালন করা, ৫. বাইতুল্লাহয় হজ্জ পালন করা।" তিরমিযী- ২৬০৯
■ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও। কারণ আমি জানি না এ হজ্জের পর আমি আবার হজ্জ করতে পারবো কিনা"। মুসলিম-৩০২৮
■ রাসূল (স) এরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা সম্পাদন করে"। আবু দাউদ-১৭৩২
মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ একবার করা ফরয, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা তার জন্য নফল হবে"। আবু দাউদ-১৭২১
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তিনটি দল আল্লাহর মেহমান; আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজ্জকারী ও উমরাহ পালনকারী”। নাসাঈ-২৬২৫
এক হাদীসে এসেছে, "উত্তম আমল কি এই মর্মে রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞসা করা হল। উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হল, "তারপর কি?”, তিনি বললেন, আল্লাহ পথে জিহাদ। বলা হল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ্জ"। বুখারী-১৫১৯
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে হজ্জ/উমরাহ পালনের পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করবে সে তার পূর্ণ সওয়াব পাবে"। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৫৩৯
বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ পালনে অর্থ ব্যয় করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করার সমতুল্য। এক দিরহাম ব্যয় করলে উহাকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়"। মুসনাদে আহমদ-২২৪৯১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হজ্জ ও উমরাহ পালন কর কেননা আগুন যেভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহা থেকে খাঁদ দূর করে, তেমনি উহা তোমরা তোমাদের দারিদ্রতা ও পাপ মোচন করে দেয়”। নাসাঈ-২৬৩০, তিরমিযী-৮১০
একদা রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে প্রশ্ন করে আয়েশা বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিতো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল বলেছেন। আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, না, তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হল হজ্জ (তথা মাবরুর হজ্জ)"। বুখারী-১৫২০
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, "রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "বয়স্ক, দুর্বল, শিশু ও নারীর জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ পালন করা"। নাসাঈ-২৬২৬
ইবনু উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং হজ্জ ও উমরাহ পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন, তারা সে ডাকে সাড়া দিয়েছে। অতএব, তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাই তাদের দিয়ে দিবেন"। ইবনে মাজাহ-২৮৯৩
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ পালন করল এবং নিজেকে গর্হিত পাপ কাজ ও সকল অশালীন কথা থেকে বিরত রাখল তাহলে সে হজ্জ থেকে এমন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে ফিরে আসবে যেমন সে তার জন্মের সময় ছিল"। বুখারী-১৫২১
রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, "মাবরুর হজ্জের (কবুল হজ্জের) প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়"। বুখারী-১৭৭৩, নাসাঈ-২৬২৩
📄 হজ্জ যাত্রার পূর্বে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত
* হজ্জ যাত্রার আগে মিলাদ দেওয়া, সংবর্ধনা দেওয়া, মিষ্টি বিতরণ করা, এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে কান্নাকাটি করা।
* হজ্জে যাওয়ার সময় আযান দেয়া বা সঙ্গীত বাজানো বা গজল গাওয়া।
* সুফীদের মতো 'এক আল্লাহকে সঙ্গী করে' একাই হজ্জ যাত্রায় রওনা হওয়া।
* সফর শুরু করার পূর্বে বিভিন্ন মানব রচিত দুআ পড়া যা হজ্জের অংশ মনে করা।
* হজ্জ সফরে বের হওয়ার আগে দরগা/মাজার যিয়ারত করে বের হওয়া বা ওলীবাবা/পীরবাবার দুআ বা আর্শিবাদ নিয়ে বের হওয়া।
* একজন মহিলা হজ্জযাত্রী কোনো অনাত্মীয়কে ভাই বা ধর্মের ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে মাহরাম করা।
* নারীর ক্ষেত্রে কোনো একটি মহিলা দলের সঙ্গে মাহরাম ছাড়াই হজ্জে যাওয়া এবং একইভাবে এমন কোনো পুরুষের সঙ্গে গমণ করা যিনি পুরো মহিলা দলের মাহরাম হিসেবে নিজেকে দাবি করেন।
* এ কথা মানা যে, হজ্জের পরিপূর্ণতা হচ্ছে নিজ ঘরে ইহরাম বাঁধা।
* হজ্জ যাত্রার নিয়ম মনে করে যাত্রা শুরুর পূর্ব মুহূর্তে ২ রাকাআত নফল স্বলাত পড়া এবং ১ম ও ২য় রাকাআতে সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস নির্ধারিতভাবে তেলাওয়াত করাকে হজ্জের নিয়ম মনে করা। তবে যে কোন সফরে বের হওয়ার পূর্বে নফল স্বলাত পড়ে বের হওয়া সুন্নাত।
* হজ্জ যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে অথবা বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানোর পর উচ্চস্বরে যিক্র করা এবং উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলা।
* এ কথা বিশ্বাস করা যে, পায়ে হজ্জ করার সওয়াব ৭০ হজ্জ আর বাহনে হজ্জ করলে ৩০ হজ্জের সওয়াব।
* প্রতি যাত্রাবিরতিতে দুই রাকাআত স্বলাত আদায় করা এবং এই কথা বলা, (হে আল্লাহ তুমি আমার জন্য এই যাত্রাবিরতির স্থানকে তোমার আশির্বাদপুষ্ট কর এবং তুমিই উত্তম আশ্রয়দাতা।)
* প্রচলিত জাল হাদীস নিজের পিতা-মাতার দিকে স্নেহ ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালে এক হজ্জের সমান নেকী পাওয়া যায়।
* হজ্জে গিয়ে যদি আর ফেরা না হয় তাই যাওয়ার পূর্বে কোন ওয়ারীসকে সম্পত্তির কোন অংশ অগ্রীম লেখে দিয়ে যাওয়া।
* কিছু দেশের লোকেরা হজ্জে যাওয়ার আগে চেহারায় বা শরীরে উল্কি আকায় যাতে কোন ক্ষতি না হয় বা কোন নজর না লাগে।
📄 সফরের কতিপয় সুন্নাহ ও আদব
■ একজন মুসলিমের সকল কাজ যেহেতু ইবাদত, সেহেতু সফর একটি ইবাদত। তাই ইসলাম ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা ও বাস্তবসম্মত নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দিয়েছে। মানুষ ভ্রমণ করে আল্লাহর সৃষ্টি জীব ও প্রকৃতি দেখার মাধ্যমে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞানার্জন করতে পারে এবং এর মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়। সূরা আনকাবুত: ২৯:২৩, সূরা রুমঃ ৩০:৯, সূরা গশিয়াহঃ ৮৮:১৭
■ সফর আযাবের একটি অংশ কারন সফর অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাপন, পানাহার ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সফরে মানুষের আসল চরিত্র ও বৈশিষ্ট প্রকাশ পায়। সফরে মানুষের দুআ কবুল হয়। সফর করলে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।
■ সফরের ধরন বা প্রকারভেদের উপর ভিত্তি করে সফরকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা - আবশ্যিক সফর, পছন্দনীয় সফর, বৈধ সফর, অপছন্দনীয় সফর, নিষিদ্ধ সফর। হজ্জ ও উমরাহর সফর আবশ্যিক ও পছন্দনীয় সফরের অন্তভূক্ত।
📄 সফরের বের হওয়ার পূর্বে সুন্নাহ ও আদবসমূহ
■ সফরের পূর্বে বিশুদ্ধ নিয়ত করা। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ও ভালো কাজের নিয়তে সফর করা। সূরা যুমার: ৩৯:২, সূরা বাইয়েনাহ: ৯৮:৫, সূরা গাফির; ৪০:৬৫
■ সফরে বের হওয়ার পূর্বে সফর স্থান সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও ভালো মানুষদের কাছ থেকে উপদেশ ও পরামর্শ নেওয়া। তিরমিযী-৩৪৪৫
■ দুই রাকাত ইস্তেখারা (কল্যাণ কামনা) স্বলাত পড়ে মন সফরের দিকে ধাবিত হলে সফর করা। বুখারী-১১৬২
■ সফরে যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও সফরের জন্য হালাল পাথেয় সাথে নেওয়া। মুসলিম-১০১৫
■ অসিয়তযোগ্য সম্পদ বা কোন দেন-পাওনা থাকলে অসিয়ত লিখে রেখে সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৭৩৮
■ পিতা-মাতা জীবিত থাকলে তাঁদের অনুমতি নিয়ে এবং মহিলা হলে সাথে একজন মাহরাম (দাদা, নানা, বাবা, মামা, শ্বশুর, ভাই, ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের স্বামী, নিজের নাতি, দুধ বাবা, দুধ ভাই) নিয়ে সফর করা। বুখারী-১৮৬২, আবু দাউদ-১৭২৬
■ সম্ভব হলে সাথে স্ত্রীকে নিয়ে বা ২/৩ জন নেককার উত্তম সঙ্গীকে সাথে নিয়ে সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৯৯৮, আবু দাউদ-২৬০৭
■ উত্তম হচ্ছে বৃহস্পতিবার ও সকাল বেলা হওয়া। প্রয়োজনে রাতেও সফরে বের হওয়া। বুখারী-২৯৪৯, আবু দাউদ-২৬০৬, ২৫৭১
■ সফরকারী পরিবারের প্রধান হলে বিদায়কালে পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া ও ভালো-মন্দের অছিয়ত করে বের হওয়া। বুখারী-২৪০৯
■ সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় পরিবারের উদ্দেশ্যে এই দুআ পাঠ করা:
أَسْتَوْدِعُكُمُ اللَّهُ الَّذِي لَا تَضِيعُ وَدَائِعُهُ
"আসতাওদি'উকুমুল্লা-হুল্লাযী লা তাযী'উ ওয়াদায়ী উহ”।
"আমি তোমাদেরকে আল্লাহর হেফাজতে রেখে যাচ্ছি যার হেফাজতে থাকা কেউই ক্ষতিগ্রস্থ হয় না"। ইবনে মাজাহ-২৮২৫
■ সফরের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দুআ পাঠ করা:
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
"বিসমিল্লাহি তাওক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"।
"আল্লাহর নামে, সকল ভরসা তাঁরই উপর এবং আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া কারোর ভালো কর্ম করার এবং খারাপ কর্ম থেকে ফিরে আসার সামর্থ্য নেই"। আবু দাউদ-৫০৯৫