📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জের তাৎপর্য

📄 হজ্জের তাৎপর্য


হজ্জ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বুনিয়াদি স্তম্ভ। হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ; সংকল্প করা বা ইচ্ছা করা। এক হাদীসে হজ্জকে সর্বোত্তম ইবাদত বলা হয়েছে।
যিলহজ্জ মাসের ৮-১৩ তারিখে আরবের মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান করা এবং নির্দিষ্ট কিছু শরয়ী কর্মকান্ড সম্পাদন করার নামই হজ্জ।
৯ম বা ১০ম হিজরীতে হজ্জকে ফরয করা হয়। মুহাম্মাদ (ﷺ) ১০ম হিজরীতে স্বপরিবারে এবং এক লক্ষাধিক সাহাবী সাথে নিয়ে একবার হজ্জ পালন করেন।
হজ্জ মুসলিম জাতির এক মহাসম্মেলন। হজ্জ একজন মুসলিমের মাঝে শান্তি ও শুদ্ধি আনয়ন করে এবং সব পাপ মোচন করে জান্নাত লাভের সুযোগ করে দেয়।
হাদীসে হজ্জযাত্রীদের আল্লাহর মেহমান হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নারীদের জন্য হজ্জ হলো জিহাদের সমতুল্য এবং জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম।
কুরআন মাজীদে বিভিন্ন সূরাতে বিশেষত সূরা হাজ্জ (২২নং সূরা) নামে একটি সূরা রয়েছে, যেখানে হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচিত হয়েছে।
হজ্জ সফরে ইহরামের (কাফন) কাপড় পরে রওয়ানা হওয়া পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে পরকালের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইহরামের সাদা কাপড় স্মরণ করিয়ে দেয় সমস্ত গুনাহ ও পাপমুক্ত হয়ে এই কাপড়ের মতো স্বচ্ছ-সাদা হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।
হজ্জের সফরে দুনিয়াবী পাথেয় সঙ্গে নেওয়া আখেরাতের সফরে পরকালের পাথেয় সঙ্গে নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
হজ্জের তালবিয়াহ মুমিনকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসকে মজবুত করে এবং শিরকমুক্ত তাওহীদি ইবাদতে ও সুন্নাহ সমৃদ্ধ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
হজ্জের সফরে আল্লাহর বিধি নিষেধ মেনে চলা স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে মুমিনের জীবন লাগামহীন নয়, বরং মুমিনের জীবন আল্লাহর রশিতে বাঁধা।
বাইতুল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে মুমিন নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করে। মুমিনের ঈমানী চেতনা জাগ্রত হয়। অন্তর নরম হয় ও অন্তরে পরিবর্তন আসে।
আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে।
হজ্জের সফর একজন মুসলিমকে ইসলামের শিকড়ে নিয়ে যায় এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) এর রেখে যাওয়া ইসলামকে কাছ থেকে দেখা ও জানার সুযোগ করে দেয়।
হজ্জ মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর জন্য ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী এক মহাজাতিতে পরিণত হতে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
আরবের মরুপ্রান্তর, পর্বতমালা ও কবরস্থান দর্শনের মাধ্যমে ইসলামের স্বর্ণযুগের মানুষদের কষ্ট ও বিসর্জন এবং তাদের ঈমানী শক্তি অনুভব করা যায়।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 কাবা ও হজ্জের ইতিহাস

📄 কাবা ও হজ্জের ইতিহাস


"নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদত গৃহটি (কাবা) নির্মিত হয় সেটি বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত। একে বরকতময় করা হয়েছে এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক করা হয়েছে"। সূরা-আলে ইমরান; ৩:৯৬
বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কাবাকে বাইতুল আতীক (প্রাচীন ঘর) বলা হয়, কারণ আল্লাহ এই ঘরকে কাফেরদের থেকে স্বাধীন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো - এই ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।
ইসলামি ঐতিহাসিকদের মত অনুযাযী কাবা ঘর নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে একাধিকবার; বিবিধ মত অনুযায়ী ৫ বার: (১) ফেরেশতা কর্তৃক (২) আদম (আঃ) কর্তৃক (৩) ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক (৪) জাহেলী যুগে কুরাইশদের কর্তৃক (৫) ইবনে যুবায়ের কর্তৃক।
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে বলেন, "আল্লাহ কাবা গৃহকে, ...মানুষের স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন"। সূরা-আল মায়িদা: ৫:৯৭
আল্লাহ তাআলা বলেন, "...এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাইল-কে আদেশ দিয়েছিলাম যে, তারা যেন আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র করে রাখে"। সূরা-আল বাকারা; ২:১২৫
কাবা ও হজ্জের ইতিহাসে রয়েছে ইবরাহীম (আঃ) এর মহৎ ইসলামী আখ্যান। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ) কে তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে নিয়ে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কার উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন - এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা স্বরূপ।
প্রচন্ড পানির পিপাসায় ইসমাইল (আঃ) এর প্রাণ যখন যায় যায়, তখন হাজেরা (আঃ) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ৭ বার ছুটাছুটি করেন। অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) এসে শিশু ইসমাইলের জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ - জমজম। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহীম ও ইসমাইল (আঃ) দুজনে জমজম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষে কাবার পুণনির্মাণ কাজ শুরু করলেন।
আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ) এর আনুগত্য দেখার জন্য আরেকটি পরীক্ষা নিলেন। তিনি ইবরাহীম (আঃ) কে স্বপ্নে দেখালেন যে, তিনি তাঁর পুত্রকে কুরবানি করছেন। আর এই স্বপ্নানুসারে ইবরাহীম (আঃ) যখন বাস্তবে তাঁর পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলেন তখন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন এবং ইবরাহীমের পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানি করিয়ে দিলেন। সেই থেকে হজ্জের সাথে সাথেও চলে আসছে এই প্রথা, মুসলিম বিশ্বে যা ঈদুল আযহা (কুরবানী ঈদ বা বকরা ঈদ) নামে পরিচিত।
ইসমাইল (আঃ) এর মৃত্যুর পর যুগে যুগে কাবা বিভিন্ন জাতির দখলে চলে আসে এবং কালের আর্বতনে তারা এর ভিতরে ও বাইরে মুর্তি রেখে মুর্তি পূজা শুরু করে এবং বিভিন্ন সময়ে উপত্যকা এলাকায় মৌসুমী বৃষ্টি ও বন্যার কবলে পড়ে কাবা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মক্কা বিজয়ের পর মুসলিমগণ কাবা ঘরের ভিতরের সকল মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন এবং কাবাকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের স্থান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রাসূল (সাঃ) এর যুগে কাবা সংস্কারের সময় জিব্রাইল (আঃ) জান্নাত থেকে একটি পাথর 'হাজারে আসওয়াদ' নিয়ে আসেন যা কাবার এক কোণে স্থাপন করা হয় মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে। কাবার এক পার্শ্বে একটি স্থান রয়েছে যার নাম 'মাকামে ইবরাহীম'; এখানে দাঁড়িয়ে ইবরাহীম (আঃ) কাবার নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পদছাপ রয়েছে। কাবা ঘরের উত্তর দিকে কাবা সংলগ্ন অর্ধ-বৃত্তাকার একটি উঁচু দেয়াল আছে যা কাবা ঘরেরই অংশ যার নাম 'হাতিম' বা হিজর। হাজরে আসওয়াদ ও কাবা ঘরের দরজার মাঝের স্থানকে 'মুলতাযম' বলা হয়। কাবা ঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালীর থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যা 'গিলাফ' নামে পরিচিত।
কাবা ঘরের মর্যাদার কারণে এর চারপাশে হারামের সীমানা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন যার পাহারায় নিয়োজিত আছে ফেরেশতাগণ। হারামের সীমানার মধ্যে বরকত, রহমত ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। আমরা মুসলিমরা কাবা ঘরের উপাসনা করি না বরং কাবার রবের ইবাদত করি। কাবা হচ্ছে 'কিবলা'-যা মুসলিমদের ইবাদতের দিক নির্ণায়ক। মুসলিমরা সম্মিলিতভাবে ঐক্কের লক্ষ্য কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি।
রাসূল (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা যেসব কাজ করে ও পথে ঘুরে হজ্জ পালন করেছেন এর মধ্যে রয়েছে; কাবা তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পর্বতের মধ্যে সাঈ করা, মিনায় অবস্থান করা ও আরাফায় উকুফ করা এবং মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা, জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা, ইবরাহীম (আঃ) এর ত্যাগের স্মৃতিচারণে পশু যবেহ করা ও আল্লাহর স্মরণকে বুলন্দ করা।
কাবার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতা: উচ্চতা ১৪ মিটার; মুলতাযমের দিকে দৈর্ঘ্য ১২.৮৪ মিঃ; হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য ১১.২৮ মিঃ; রুকনে ইয়েমানি ও হাতিমের মাঝে দৈর্ঘ্য ১২.১১ মিঃ; হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমানি মাঝে দৈর্ঘ্য ১১.৫২ মিঃ।
কাবা ও মক্কার ইতিহাস বিস্তারিত জানতে 'পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ শফীউর রহমান মোবারকপুরী' বইটি পড়ুন।

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার

📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার


■ "এবং স্মরণ করো, যখন ইবরাহীমকে সে ঘরের (বাইতুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, স্বলাতে দন্ডায়মান এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য। এবং মানবজাতিকে হজ্জের কথা ঘোষণা করে দাও; তারা পায়ে হেঁটে ও শীর্ণ উটের পিঠে করে তোমার কাছে আসবে, তারা দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে (হজ্জ এর উদ্দেশ্যে)"। সুরা-আল হাজ্জঃ ২২:২৬,২৭
■ "..আর এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যে মাকামে ইব্রাহিমে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যার সামর্থ্য রয়েছে (শারীরিক ও আর্থিক) তার এই কাবায় এসে হজ্জ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য কর্তব্য (ফরজ), আর যদি কেউ এ বিধান (হজ্জ) কে অস্বীকার করে তবে; (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ বিশ্বজগতের কারো মুখাপেক্ষী নন"। সুরা-আলে ইমরান; ৩:৯৭
■ "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অর্ন্তগত, যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ্জ ও উমরাহ করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে প্রদক্ষিণ করা (সাঈ) দোষনীয় নয়, এবং কোন ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে, আল্লাহ কৃতজ্ঞতাপরায়ন ও সর্বজ্ঞাত"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৫৮
■ "এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর,..."। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৬
■ "হজ্জের মাসসমূহ সুনির্দিষ্ট। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্জ আরোপ (যাওয়ার ইচ্ছা) করে নিলো, তার জন্য অশ্লীল আচরণ, পাপ-অন্যায় কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা বৈধ নয়। আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও (হজ্জ যাত্রার জন্য), বস্তুত: সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা) এবং হে জ্ঞানীরা, তোমরা আমাকে ভয় কর"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৭
■ "..আর যে সেখানে (হারাম এলাকায়) অন্যায়ভাবে দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছা পোষণ করবে, তাকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব"। সুরা-আল হাজ্জ; ২২:২৫
■ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, “৫টি ভিত্তির উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। ১.এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহ ছাড়া (হক) কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল, ২.স্বলাত কায়েম করা, ৩. যাকাত আদায় করা, ৪. রমাদ্বানে সাওম পালন করা, ৫. বাইতুল্লাহয় হজ্জ পালন করা।" তিরমিযী- ২৬০৯
■ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও। কারণ আমি জানি না এ হজ্জের পর আমি আবার হজ্জ করতে পারবো কিনা"। মুসলিম-৩০২৮
■ রাসূল (স) এরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা সম্পাদন করে"। আবু দাউদ-১৭৩২
মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ একবার করা ফরয, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা তার জন্য নফল হবে"। আবু দাউদ-১৭২১
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তিনটি দল আল্লাহর মেহমান; আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজ্জকারী ও উমরাহ পালনকারী”। নাসাঈ-২৬২৫
এক হাদীসে এসেছে, "উত্তম আমল কি এই মর্মে রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞসা করা হল। উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হল, "তারপর কি?”, তিনি বললেন, আল্লাহ পথে জিহাদ। বলা হল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ্জ"। বুখারী-১৫১৯
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে হজ্জ/উমরাহ পালনের পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করবে সে তার পূর্ণ সওয়াব পাবে"। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৫৩৯
বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ পালনে অর্থ ব্যয় করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করার সমতুল্য। এক দিরহাম ব্যয় করলে উহাকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়"। মুসনাদে আহমদ-২২৪৯১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হজ্জ ও উমরাহ পালন কর কেননা আগুন যেভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহা থেকে খাঁদ দূর করে, তেমনি উহা তোমরা তোমাদের দারিদ্রতা ও পাপ মোচন করে দেয়”। নাসাঈ-২৬৩০, তিরমিযী-৮১০
একদা রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে প্রশ্ন করে আয়েশা বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিতো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল বলেছেন। আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, না, তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হল হজ্জ (তথা মাবরুর হজ্জ)"। বুখারী-১৫২০
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, "রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "বয়স্ক, দুর্বল, শিশু ও নারীর জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ পালন করা"। নাসাঈ-২৬২৬
ইবনু উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং হজ্জ ও উমরাহ পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন, তারা সে ডাকে সাড়া দিয়েছে। অতএব, তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাই তাদের দিয়ে দিবেন"। ইবনে মাজাহ-২৮৯৩
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ পালন করল এবং নিজেকে গর্হিত পাপ কাজ ও সকল অশালীন কথা থেকে বিরত রাখল তাহলে সে হজ্জ থেকে এমন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে ফিরে আসবে যেমন সে তার জন্মের সময় ছিল"। বুখারী-১৫২১
রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, "মাবরুর হজ্জের (কবুল হজ্জের) প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়"। বুখারী-১৭৭৩, নাসাঈ-২৬২৩

📘 হজ্জ ও উমরাহ সফরে সহজ গাইড 📄 হজ্জের শর্তাবলী ও যার উপর হজ্জ ফরয

📄 হজ্জের শর্তাবলী ও যার উপর হজ্জ ফরয


কিছু শর্ত সাপেক্ষে হজ্জ একটি ফরয ইবাদাত। নিম্নোক্ত ৭/৮টি মৌলিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হজ্জ প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয; অর্থাৎ জীবনে অন্তত একবার পালন করা অত্যাবশ্যকীয়। (মুসলিম-৩১৪৮)

শর্তগুলো হলো: ১. মুমিন মুসলিম হওয়া। ২. প্রাপ্তবয়স্ক/বালিগ হওয়া (ঊর্ধ্বে ১৫ বছর)। ৩. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া (কৃতদাস না হওয়া)। ৪. শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম এবং মানসিক ভারসাম্য থাকা। ৫. হজ্জ সফরের সম্পূর্ণ খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা। ৬. হজ্জ সফরের যাত্রাপথের নিরাপত্তা থাকা। ৭. মহিলার সঙ্গে স্বামী অথবা মাহরাম থাকা। * হজ্জে থাকাকালীন সময়কালে পরিবারের ভরণপোষণের নিশ্চয়তা করা।

নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে বাইতুল্লাহ যাওয়ার খরচ বহনের ক্ষমতা হয়ে গেলেই হজ্জ ফরয হয়ে যায়। এমনকি কারো যদি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান থাকে, যে জমির ফসল বা বাড়ি/গাড়ি/দোকান ভাড়া না হলেও তার বছর চলে যায় তবে সেই জমি/বাড়ি/গাড়ি/দোকান বিক্রয় করে হজ্জে যাওয়া ফরয হবে বলে অনেক ফকীহগণ মত দিয়েছেন। অতএব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, যার নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে ব্যাংকে অথবা হাতে ৫/৬ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত জমা আছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে গেছে।

একজন মহিলার মাহরাম হলেন তার পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে এমন একজন পুরুষ যার সাথে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ বৈধ নয়। (দাদা, নানা, বাবা, চাচা, মামা, শ্বশুর, ভাই, ছেলে, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের স্বামী, নিজের নাতি, দুধ বাবা, দুধ ভাই) (আবু দাউদ-১৭২৬)

যদি কেউ কাউকে হজ্জ করার জন্য খরচ বা অর্থ (হালাল অর্থ) প্রদান করেন তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। যদি উক্ত টাকায় হজ্জ পালন করা হয় তবে পরবর্তীতে তার উপর হজ্জ আর বাধ্যতামূলক হবে না; এমনকি পরবর্তীতে সে যদি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানও হয়।

যদি কেউ নাবালেগ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে হজ্জে নিয়ে যায় তবে তা ঐচ্ছিক হজ্জ হিসেবে গণ্য হবে ও এই হজ্জের সাওয়াব তার অভিভাবক লাভ করবে। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানের উপর পুনরায় হজ্জ ফরয হবে, যদি সে আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান হয়। (আবু দাউদ-১৭৩৬)

যে নারীর হজ্জ করার মত নিজস্ব সম্পদ রয়েছে তার উপর হজ্জ ফরয যদিও তার স্বামীর হজ্জ করার মত যথেষ্ট সম্পদ না থাকে। সে কোন বৈধ মাহরামকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ করে ফেলতে পারে। কোন মহিলার যদি বৈধ মাহরাম না থাকে তবে হজ্জে যাওয়া তার জন্য প্রযোজ্য বা ফরজ নয়। তবে সে কাউকে দিয়ে তার বদলি হজ্জ করিয়ে নিবে। যদি কোনো মহিলা বৈধ মাহরাম ছাড়া কাউকে পাতানো ভাই বানিয়ে বা কোন মহিলা দলের সাথে হজ্জে চলে যায় তাহলে সে বড় গুনাহের কাজে লিপ্ত হল এবং তার হজ্জ হবে না বলে অধিকাংশ উলামাগণ মত প্রকাশ করেছেন। (আবু দাউদ-১৭২৩, ইবনে মাজাহ-২৮৯৮)

কোন ব্যক্তি টাকা ধার/কর্জ করেও হজ্জ পালন করতে পারবে, যদি সে সেই টাকা ভবিষ্যতে পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য রাখে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ধার/কর্জ করে হজ্জ করা জরুরী নয়।

যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও হজ্জ পালন না করেই মারা যায়, তাহলে অন্য যে কেউ তার পক্ষে বদলী হজ্জ করতে পারবে। এক্ষেত্রে বদলী হজ্জকারী সর্বপ্রথম সে তার নিজের হজ্জ পালন করেছে এমন হতে হবে।

একটি ধারণা প্রচলিত আছে, যার ঘরে অবিবাহিত কন্যা রয়েছে সেই কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার উপর হজ্জ ফরয নয়। আবার ব্যাংকে লোন থাকলে লোন পরিশোধ না করা পর্যন্ত হজ্জে যাওয়া ঠিক হবে না বলে অনেকে মনে করেন। এগুলো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কথা।

যে মুসলিমের উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে তার উপর উমরাহও ফরজ হয়ে যায়। যদিও অনেক উলামা উমরাহ পালন করাকে ওয়াজিব বলেছেন। যার হজ্জ করার মতো সামর্থ্য হয় নাই কিন্তু উমরাহ করার মতো সামর্থ্য হয়েছে এবং সে চাইলে বাইতুল্লাহ যিয়ারত করতে পারে শুধু উমরাহ করার উদ্দেশ্যে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করে হজ্জ পালন করে নিতে পারে।

অনেকে ভুল করে বলে থাকে যে, যে উমরাহ করেছে তার উপর হজ্জ ফরয হয়ে যায়। কিন্তু হজ্জ সেই ব্যক্তির উপর ফরয নয় যার হজ্জ পালন করার মত যথেষ্ট সামর্থ্য হয় নাই, এমনকি সে যদি হজ্জের মাসেও উমরাহ পালন করে।

যার উপর হজ্জ ফরজ হয়ে গেছে সেও চাইলে শুধু উমরাহ পালন করতে পারবে যদি সে অদূর ভবিষ্যতে হজ্জ করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প ও নিয়ত পোষণ করে থাকে। তবে তার উমরাহ করার চেয়ে হজ্জ পালন করাই উত্তম।

কেউ যদি হজ্জকে ইসলামের রুকন নয় বলে মনে করে কিংবা হজ্জ করা জরুরী নয়/প্রয়োজন নেই বলে মনে করে কিংবা হজ্জের কোন বিধানকে অসংগতিপূর্ণ বা কোন কিছুকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করলো তবে সে কুফরী করলো।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১,২৫,০০০ এর অধিক মানুষ হজ্জ করতে যায় এবং হজ্জ সফর সম্পাদন করতে প্যাকেজভেদে ১০-৪০ দিন সময় লাগে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px