📄 ইবাদত তথা হজ্জ কবুল হওয়ার শর্তসমূহ
■ এই বিষয়টি সর্বাগ্রে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৫-৬ লক্ষ টাকা খরচ করে করা হজ্জ, যা জীবনে একবারই হয়তোবা করবেন তা যদি কবুল হওয়ার শর্ত মোতাবেক না হয় তবে লাভ কি! সব টাকা, সব কষ্ট, সব প্রচেষ্টা বিফল।
■ হজ্জ ও উমরাহ ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদাতগুলোর অন্যতম। যে কোনো আমল ও ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য মৌলিক ৩টি শর্ত পূরণ করা প্রযোজ্য- (১) আল ঈমান; ঈমানের আরকান ও আহকাম, ঈমানের শাখা-প্রশাখা বিষয়ের উপর পূর্ণ জ্ঞান এবং সঠিক বিশ্বাস স্থাপন করা, (২) আল ইখলাস; নিয়ত পরিশুদ্ধ করা তথা ইবাদত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের জন্য করা, (৩) ইত্তিবাউস সুন্নাহ: রাসূল (স.) যে পদ্ধতিতে ইবাদত করেছেন ঠিক সেই পদ্ধতি বা নীতিমালায় ইবাদত করা।
■ এছাড়াও আরও কিছু শর্ত আছে যা পূরণ করা আবশ্যিক- (৪) শিরকমুক্ত ঈমান; অন্তরের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, কথা ও কাজের মধ্যে শিরক-কুফরী-নিফাক আছে কিনা সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে মুক্ত হওয়া বা তাওবা করা, (৫) বিদআতমুক্ত আমল; কৃত সকলপ্রকার আমল ও ইবাদতে কোন প্রকার বিদআতের মিশ্রন আছে কিনা তা গবেষণা করে জেনে তা থেকে আন্তরিকভাবে মুক্ত হওয়া বা তাওবা করা, (৬) হারাম মুক্ত উপার্জন ও ভক্ষণ; জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্জিত অর্থ সর্বপ্রকার অসাধুতা মুক্ত হওয়া এবং ইবাদতের জন্য ব্যয়কৃত অর্থ, পরিধেয় কাপড়, আনুষঙ্গিক সামগ্রী হালাল উপার্জনের মাধ্যমে হওয়া, (৭) রিয়া মুক্ত আমল; কোন আমল বা ইবাদত করার সময় অন্তরে তা যেন লোক দেখানোর বা মানুষকে জানানোর উদ্দেশ্যে না হয় কিংবা জনসম্মুখে অধিক উত্তমভাবে বা বেশি বেশি আমল করার মনোভাব না হয়।
■ ইসলামের যে কোন ইবাদত ও আমল করার পূর্বে তা যাচাই করার একটা মূলনীতি বা সূত্র আজ শিখে নিন আজীবনের জন্য। যখনই কোন আমল ও ইবাদতের কথা শুনবেন তখনই জিজ্ঞাসা করবেন- রাসূল (স.) ও সাহাবীগণ সেই আমলটি করেছেন কিনা!? এবং কি পদ্ধতিতে করেছেন!? এই দুটি প্রশ্নের বিশুদ্ধ হাদীসের দলিলভিত্তিক উত্তর পেয়ে গেলে আমলটি করুন। রাসূল (স.) ও সাহাবীগণের পন্থা ও নির্দেশনার বাইরে যে কোন আমল আল্লাহর কাছে অগ্রহণীয় ও বাতিল যা রাসূল (স.) এর কথা বা হাদীস দ্বারা স্বীকৃত। বুখারী-২৬৯৭
■ হজ্জ-উমরায় যাওয়ার আগে এসব ইবাদত কবুলের শর্তের কথাগুলো খুব কম মানুষজন কিংবা আপনার কাফেলা বা এজেন্সি আপনাকে বলবে। অনেক সাধারণ মুসলিম আজকাল ঈমান বিরোধী ও ইসলাম বিদ্বেষী চেতনা মনে লালন করে। নিজের অজান্তে কুফরী, শিরক, মুনাফেকী, ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাস্তিকতার বীজ অন্তরে ঢুকে গেছে। এসব বিষয় তো ইবাদত কবুল হওয়ার অন্তরায়। বিষ না বুঝে পান করলেও বিষের ফল তো ভোগ করতেই হয়। তাই আমি আপনাকে জ্ঞানহীন-প্রস্তুতিবিহীন, সন্তা-সর্টকাট, অপরিপূর্ণ-বিফল হজ্জ করানোর পক্ষে নই। আপনি কিন্তু ভালো করেই জানেন দুঃখজনকভাবে আজকাল আমাদের দেশে প্রায় বেশিরভাগ পেশার মানুষেরা কিভাবে সাধারণ জনগনকে মিথ্যা ধোকা দিচ্ছে ও অনৈতিক কাজ করছে। তবে আপনি কিভাবে নিশ্চিত হয়ে গেলেন হজ্জ-উমরায় আপনাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিপূর্ণ প্রস্তুতিসহ শুদ্ধভাবে সকল নিয়মকানুন পালন করানো হবে এবং প্রতিশ্রুত সকল বিষয়ে যথার্থ সেবা দেওয়া হবে? আমি কিন্তু আপনারই পক্ষে এবং আপনার কল্যানের উদ্দেশ্যে, আপনার অর্থ ও শ্রমের মূল্যায়ন যেন হয় সেজন্য সচেতনতামূলক এত কথা বলছি।
বাংলাদেশী হাজীরা বেশির ভাগই ৫০-৬০ বছর বয়সের পর হজ্জ করতে যান। বেশিরভাগ লোকজন ভাবেন এতো বছর পর আমাকে ঈমান, শিরক, বিদআত, পবিত্রতা শিখতে হবে! আসলে জ্ঞান অর্জনের ও আত্মশুদ্ধির জন্য কোন বয়স নেই। এতে কোন লজ্জাও নেই। তাই পুনরায় একটু নতুন করে বিষয়গুলো সম্পর্কে জানুন। একটু শ্রম ও সময় দিন আপনার জন্য উত্তম ফলাফল রয়েছে যা আল্লাহ কুরআনে ঘোষনা করেছেন। সূরা আল আলা; ৮৭:১৪, সূরা আস শামস: ৯১:৯।
কুরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম শব্দ ও প্রথম আদেশ ছিল ইকরা (পড়)। অথচ আমরা পড়ি না শুধু শুনি আর দেখি! আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে প্রিন্টমিডিয়া ও ইন্টারনেটের প্রসারের কারণে সকলপ্রকার বই-পুস্তক এখন হাতের নাগালে। তাই অনুরোধ করবো শুধু হজ্জের বই নয় বরং আরও কিছু বই কিনে অথবা ডাউনলোড করে পড়ুন তাওহীদ ও শিরক বিষয়ে, সুন্নাত ও বিদআত বিষয়ে, হারাম ও কবিরা গুনাহ বিষয়ে। আমাদের দেশের লেখকদের লেখা দলিলভিত্তিক বইয়ের পাশাপাশি বর্হিবিশ্বের লেখকদের লেখা (বাংলা অনুবাদিত) বইগুলো খুঁজে সংগ্রহ করে পড়ুন।
আমাদের দেশে নাহি আনিল মুনকার (মন্দ বা পাপ কাজ থেকে নিষেধ করা) বিষয়ে কথাবলা খুব কঠিন কারণ আমরা প্রায় সবাই এর সাথে জড়িয়ে আছি। আমাদের আলেম সমাজ অনেক সময় ভয়ে সব কথা বলতে পারেন না সাধারণ জনগনকে। অনেক সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় ও হজ্জ পরিপূর্ণ হয় না গাইড বা আলেমদের সঠিক নির্দেশনা না পাওয়ার কারণে। দেখা যায় অনেকে হজ্জ করতে গিয়ে শিরক ও বিদআত করে আসেন এবং শিরক ও বিদআতকে ইবাদত মনে করেন। তাই নিজেকে বাঁচাতে হলে আল্লাহ প্রদত্ত আকল (বিবেক) দিয়ে জ্ঞানার্জন করে অতঃপর আমল করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। হে আল্লাহ! আমাদের সিরাতল মুস্তাকিমের পথে হেদায়েত করুন এবং ইসলামকে জানার ও মানার জন্য মনকে উন্মুক্ত করে দিন। আমিন!
📄 হজ্জের তাৎপর্য
হজ্জ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বুনিয়াদি স্তম্ভ। হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ; সংকল্প করা বা ইচ্ছা করা। এক হাদীসে হজ্জকে সর্বোত্তম ইবাদত বলা হয়েছে।
যিলহজ্জ মাসের ৮-১৩ তারিখে আরবের মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান করা এবং নির্দিষ্ট কিছু শরয়ী কর্মকান্ড সম্পাদন করার নামই হজ্জ।
৯ম বা ১০ম হিজরীতে হজ্জকে ফরয করা হয়। মুহাম্মাদ (ﷺ) ১০ম হিজরীতে স্বপরিবারে এবং এক লক্ষাধিক সাহাবী সাথে নিয়ে একবার হজ্জ পালন করেন।
হজ্জ মুসলিম জাতির এক মহাসম্মেলন। হজ্জ একজন মুসলিমের মাঝে শান্তি ও শুদ্ধি আনয়ন করে এবং সব পাপ মোচন করে জান্নাত লাভের সুযোগ করে দেয়।
হাদীসে হজ্জযাত্রীদের আল্লাহর মেহমান হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নারীদের জন্য হজ্জ হলো জিহাদের সমতুল্য এবং জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম।
কুরআন মাজীদে বিভিন্ন সূরাতে বিশেষত সূরা হাজ্জ (২২নং সূরা) নামে একটি সূরা রয়েছে, যেখানে হজ্জের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচিত হয়েছে।
হজ্জ সফরে ইহরামের (কাফন) কাপড় পরে রওয়ানা হওয়া পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে পরকালের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইহরামের সাদা কাপড় স্মরণ করিয়ে দেয় সমস্ত গুনাহ ও পাপমুক্ত হয়ে এই কাপড়ের মতো স্বচ্ছ-সাদা হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।
হজ্জের সফরে দুনিয়াবী পাথেয় সঙ্গে নেওয়া আখেরাতের সফরে পরকালের পাথেয় সঙ্গে নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
হজ্জের তালবিয়াহ মুমিনকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসকে মজবুত করে এবং শিরকমুক্ত তাওহীদি ইবাদতে ও সুন্নাহ সমৃদ্ধ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
হজ্জের সফরে আল্লাহর বিধি নিষেধ মেনে চলা স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে মুমিনের জীবন লাগামহীন নয়, বরং মুমিনের জীবন আল্লাহর রশিতে বাঁধা।
বাইতুল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে মুমিন নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করে। মুমিনের ঈমানী চেতনা জাগ্রত হয়। অন্তর নরম হয় ও অন্তরে পরিবর্তন আসে।
আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে।
হজ্জের সফর একজন মুসলিমকে ইসলামের শিকড়ে নিয়ে যায় এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) এর রেখে যাওয়া ইসলামকে কাছ থেকে দেখা ও জানার সুযোগ করে দেয়।
হজ্জ মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর জন্য ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী এক মহাজাতিতে পরিণত হতে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
আরবের মরুপ্রান্তর, পর্বতমালা ও কবরস্থান দর্শনের মাধ্যমে ইসলামের স্বর্ণযুগের মানুষদের কষ্ট ও বিসর্জন এবং তাদের ঈমানী শক্তি অনুভব করা যায়।
📄 কাবা ও হজ্জের ইতিহাস
"নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদত গৃহটি (কাবা) নির্মিত হয় সেটি বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত। একে বরকতময় করা হয়েছে এবং বিশ্বজগতের জন্য পথপ্রদর্শক করা হয়েছে"। সূরা-আলে ইমরান; ৩:৯৬
বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কাবাকে বাইতুল আতীক (প্রাচীন ঘর) বলা হয়, কারণ আল্লাহ এই ঘরকে কাফেরদের থেকে স্বাধীন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো - এই ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।
ইসলামি ঐতিহাসিকদের মত অনুযাযী কাবা ঘর নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে একাধিকবার; বিবিধ মত অনুযায়ী ৫ বার: (১) ফেরেশতা কর্তৃক (২) আদম (আঃ) কর্তৃক (৩) ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক (৪) জাহেলী যুগে কুরাইশদের কর্তৃক (৫) ইবনে যুবায়ের কর্তৃক।
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে বলেন, "আল্লাহ কাবা গৃহকে, ...মানুষের স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন"। সূরা-আল মায়িদা: ৫:৯৭
আল্লাহ তাআলা বলেন, "...এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাইল-কে আদেশ দিয়েছিলাম যে, তারা যেন আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র করে রাখে"। সূরা-আল বাকারা; ২:১২৫
কাবা ও হজ্জের ইতিহাসে রয়েছে ইবরাহীম (আঃ) এর মহৎ ইসলামী আখ্যান। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ) কে তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও পুত্র ইসমাইল (আঃ) কে নিয়ে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কার উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন - এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা স্বরূপ।
প্রচন্ড পানির পিপাসায় ইসমাইল (আঃ) এর প্রাণ যখন যায় যায়, তখন হাজেরা (আঃ) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ৭ বার ছুটাছুটি করেন। অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) এসে শিশু ইসমাইলের জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ - জমজম। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহীম ও ইসমাইল (আঃ) দুজনে জমজম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষে কাবার পুণনির্মাণ কাজ শুরু করলেন।
আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আঃ) এর আনুগত্য দেখার জন্য আরেকটি পরীক্ষা নিলেন। তিনি ইবরাহীম (আঃ) কে স্বপ্নে দেখালেন যে, তিনি তাঁর পুত্রকে কুরবানি করছেন। আর এই স্বপ্নানুসারে ইবরাহীম (আঃ) যখন বাস্তবে তাঁর পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলেন তখন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন এবং ইবরাহীমের পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানি করিয়ে দিলেন। সেই থেকে হজ্জের সাথে সাথেও চলে আসছে এই প্রথা, মুসলিম বিশ্বে যা ঈদুল আযহা (কুরবানী ঈদ বা বকরা ঈদ) নামে পরিচিত।
ইসমাইল (আঃ) এর মৃত্যুর পর যুগে যুগে কাবা বিভিন্ন জাতির দখলে চলে আসে এবং কালের আর্বতনে তারা এর ভিতরে ও বাইরে মুর্তি রেখে মুর্তি পূজা শুরু করে এবং বিভিন্ন সময়ে উপত্যকা এলাকায় মৌসুমী বৃষ্টি ও বন্যার কবলে পড়ে কাবা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে মক্কা বিজয়ের পর মুসলিমগণ কাবা ঘরের ভিতরের সকল মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন এবং কাবাকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের স্থান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রাসূল (সাঃ) এর যুগে কাবা সংস্কারের সময় জিব্রাইল (আঃ) জান্নাত থেকে একটি পাথর 'হাজারে আসওয়াদ' নিয়ে আসেন যা কাবার এক কোণে স্থাপন করা হয় মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে। কাবার এক পার্শ্বে একটি স্থান রয়েছে যার নাম 'মাকামে ইবরাহীম'; এখানে দাঁড়িয়ে ইবরাহীম (আঃ) কাবার নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পদছাপ রয়েছে। কাবা ঘরের উত্তর দিকে কাবা সংলগ্ন অর্ধ-বৃত্তাকার একটি উঁচু দেয়াল আছে যা কাবা ঘরেরই অংশ যার নাম 'হাতিম' বা হিজর। হাজরে আসওয়াদ ও কাবা ঘরের দরজার মাঝের স্থানকে 'মুলতাযম' বলা হয়। কাবা ঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালীর থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যা 'গিলাফ' নামে পরিচিত।
কাবা ঘরের মর্যাদার কারণে এর চারপাশে হারামের সীমানা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন যার পাহারায় নিয়োজিত আছে ফেরেশতাগণ। হারামের সীমানার মধ্যে বরকত, রহমত ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। আমরা মুসলিমরা কাবা ঘরের উপাসনা করি না বরং কাবার রবের ইবাদত করি। কাবা হচ্ছে 'কিবলা'-যা মুসলিমদের ইবাদতের দিক নির্ণায়ক। মুসলিমরা সম্মিলিতভাবে ঐক্কের লক্ষ্য কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি।
রাসূল (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা যেসব কাজ করে ও পথে ঘুরে হজ্জ পালন করেছেন এর মধ্যে রয়েছে; কাবা তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পর্বতের মধ্যে সাঈ করা, মিনায় অবস্থান করা ও আরাফায় উকুফ করা এবং মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা, জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা, ইবরাহীম (আঃ) এর ত্যাগের স্মৃতিচারণে পশু যবেহ করা ও আল্লাহর স্মরণকে বুলন্দ করা।
কাবার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতা: উচ্চতা ১৪ মিটার; মুলতাযমের দিকে দৈর্ঘ্য ১২.৮৪ মিঃ; হাতিমের দিকে দৈর্ঘ্য ১১.২৮ মিঃ; রুকনে ইয়েমানি ও হাতিমের মাঝে দৈর্ঘ্য ১২.১১ মিঃ; হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমানি মাঝে দৈর্ঘ্য ১১.৫২ মিঃ।
কাবা ও মক্কার ইতিহাস বিস্তারিত জানতে 'পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ শফীউর রহমান মোবারকপুরী' বইটি পড়ুন।
📄 হজ্জের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার
■ "এবং স্মরণ করো, যখন ইবরাহীমকে সে ঘরের (বাইতুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, স্বলাতে দন্ডায়মান এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য। এবং মানবজাতিকে হজ্জের কথা ঘোষণা করে দাও; তারা পায়ে হেঁটে ও শীর্ণ উটের পিঠে করে তোমার কাছে আসবে, তারা দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে (হজ্জ এর উদ্দেশ্যে)"। সুরা-আল হাজ্জঃ ২২:২৬,২৭
■ "..আর এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যে মাকামে ইব্রাহিমে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যার সামর্থ্য রয়েছে (শারীরিক ও আর্থিক) তার এই কাবায় এসে হজ্জ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য কর্তব্য (ফরজ), আর যদি কেউ এ বিধান (হজ্জ) কে অস্বীকার করে তবে; (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ বিশ্বজগতের কারো মুখাপেক্ষী নন"। সুরা-আলে ইমরান; ৩:৯৭
■ "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অর্ন্তগত, যে ব্যক্তি এই গৃহে হজ্জ ও উমরাহ করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে প্রদক্ষিণ করা (সাঈ) দোষনীয় নয়, এবং কোন ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে, আল্লাহ কৃতজ্ঞতাপরায়ন ও সর্বজ্ঞাত"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৫৮
■ "এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর,..."। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৬
■ "হজ্জের মাসসমূহ সুনির্দিষ্ট। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্জ আরোপ (যাওয়ার ইচ্ছা) করে নিলো, তার জন্য অশ্লীল আচরণ, পাপ-অন্যায় কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা বৈধ নয়। আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও (হজ্জ যাত্রার জন্য), বস্তুত: সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা) এবং হে জ্ঞানীরা, তোমরা আমাকে ভয় কর"। সূরা-আল বাকারা: ২:১৯৭
■ "..আর যে সেখানে (হারাম এলাকায়) অন্যায়ভাবে দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছা পোষণ করবে, তাকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব"। সুরা-আল হাজ্জ; ২২:২৫
■ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, “৫টি ভিত্তির উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। ১.এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহ ছাড়া (হক) কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল, ২.স্বলাত কায়েম করা, ৩. যাকাত আদায় করা, ৪. রমাদ্বানে সাওম পালন করা, ৫. বাইতুল্লাহয় হজ্জ পালন করা।" তিরমিযী- ২৬০৯
■ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, "তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও। কারণ আমি জানি না এ হজ্জের পর আমি আবার হজ্জ করতে পারবো কিনা"। মুসলিম-৩০২৮
■ রাসূল (স) এরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত তা সম্পাদন করে"। আবু দাউদ-১৭৩২
মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ একবার করা ফরয, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা তার জন্য নফল হবে"। আবু দাউদ-১৭২১
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তিনটি দল আল্লাহর মেহমান; আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজ্জকারী ও উমরাহ পালনকারী”। নাসাঈ-২৬২৫
এক হাদীসে এসেছে, "উত্তম আমল কি এই মর্মে রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞসা করা হল। উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হল, "তারপর কি?”, তিনি বললেন, আল্লাহ পথে জিহাদ। বলা হল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ্জ"। বুখারী-১৫১৯
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে হজ্জ/উমরাহ পালনের পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করবে সে তার পূর্ণ সওয়াব পাবে"। মিশকাতুল মাসাবিহ-২৫৩৯
বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "হজ্জ পালনে অর্থ ব্যয় করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) ব্যয় করার সমতুল্য। এক দিরহাম ব্যয় করলে উহাকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়"। মুসনাদে আহমদ-২২৪৯১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হজ্জ ও উমরাহ পালন কর কেননা আগুন যেভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহা থেকে খাঁদ দূর করে, তেমনি উহা তোমরা তোমাদের দারিদ্রতা ও পাপ মোচন করে দেয়”। নাসাঈ-২৬৩০, তিরমিযী-৮১০
একদা রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে প্রশ্ন করে আয়েশা বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনিতো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল বলেছেন। আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, না, তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হল হজ্জ (তথা মাবরুর হজ্জ)"। বুখারী-১৫২০
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, "রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "বয়স্ক, দুর্বল, শিশু ও নারীর জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ পালন করা"। নাসাঈ-২৬২৬
ইবনু উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল(ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং হজ্জ ও উমরাহ পালনকারীরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন, তারা সে ডাকে সাড়া দিয়েছে। অতএব, তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাই তাদের দিয়ে দিবেন"। ইবনে মাজাহ-২৮৯৩
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ পালন করল এবং নিজেকে গর্হিত পাপ কাজ ও সকল অশালীন কথা থেকে বিরত রাখল তাহলে সে হজ্জ থেকে এমন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে ফিরে আসবে যেমন সে তার জন্মের সময় ছিল"। বুখারী-১৫২১
রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন, "মাবরুর হজ্জের (কবুল হজ্জের) প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়"। বুখারী-১৭৭৩, নাসাঈ-২৬২৩