📄 উড্ডয়ন
উড্ডয়নের ধারণা হাজার বছর ধরে মানবজাতিকে মোহমুগ্ধ করে রাখার পাশাপাশি তাদের প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ফারাও রাজাদের পাখনায় ভর দিয়ে আকাশে উড়বার বহু চিত্র মিশরীয়রা রেখে গেছে, যা উড়বার প্রতি অসীম বাসনারই বহিঃপ্রকাশ। চীন ও গ্রিকদের যেমন রয়েছে উড্ডয়ন নিয়ে নানা রূপকথা ও কিংবদন্তী, ঠিক তেমনটি আরবদেরও ছিল।
এ ব্যাপারে সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপকথাটি ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত আল-ফিরদাউসীর "শাহনামা"-তে বর্ণিত হয়েছে। গল্পটি এরূপ: কায় কাউস নামের এক রাজা দুষ্টু আত্মাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে উড়াল সিংহাসনের সহায়তায় স্বর্গ দখল নিতে বেরিয়ে পড়ে। উড়াল এ সিংহাসনের সাথে উপরমুখী চারটি লম্বা দণ্ড বাঁধা ছিল। প্রতিটি দণ্ডের মাথায় মাংস রাখা ছিল এবং নিচে রাক্ষুসে ঈগল শিকল শৃঙ্খলিত ছিল। ঈগলগুলো মাংসের লোভে উপরে উড়াল দিতো এবং এভাবে সিংহাসনটি উড়তো। কিন্তু দীর্ঘযাত্রার পর ঈগলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে পুরো সিংহাসনটি বিধ্বস্ত হয়।
ইসলামপূর্ব আরবে উড়াল জাদুকর, অতিপ্রাকৃত শক্তি, পাখি কিংবা শুধু পালক নিয়ে বহু রূপকথা প্রচলিত থাকলেও মুসলিমদের জন্য উড্ডয়ন বহন করতো বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। ভালো কাজের মাধ্যমে নিষ্ঠাবান মুসলিমের আত্মা একটা স্তরে পৌঁছে সেখান থেকে একের পর এক রূহানী মনযিল পাড়ি দিয়ে আরও উচ্চে আরোহণ করে।
৯ম শতাব্দি কর্ডোবা নিবাসী আব্বাস ইবনে ফিরনাসই প্রথম মুসলিম এবং খুব সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি উড়ালযান নির্মাণ এবং উড়বার চেষ্টা করেছিলেন। বহুবিদ্যায় পারদর্শী এ মনীষী ছিলেন একাধারে ছিলেন তৎকালের অপ্রতিদ্বন্দ্বি জ্যোতির্বিদ, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং প্রখ্যাত কবি। কিন্তু তার খ্যাতি ছুঁয়ে আছে উড়ালযান নির্মাণের সাথে যা প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ নিয়ে আকাশে উড্ডয়ন করেছিল। স্পেনের কর্ডোবায় নেয়া তার দুটো বিখ্যাত উড্ডয়নের পূর্বে মরু এলাকায় তিনি বেশ কয়েকটি সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছিলেন, যেন এতে তার উড়ালযানের ডিজাইন কাঠামো যথাসম্ভব নিখুঁত করা যায়।
ঢিলেঢালা আলখাল্লায় ভারসাম্য কাঠের সাথে নিজেকে শক্তভাবে আটকে ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবা জামে মসজিদের মিনার থেকে তিনি প্রথমবারের মতো ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিন্তু তার এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার এ পতন পর্যাপ্ত ধীরগতির হওয়ায় এ যাত্রায় তিনি সামান্য কিছু আঘাত পেয়েছিলেন। তার এ উড্ডয়ন ব্যর্থ হলেও এটা ছিল প্যারাসুট জাম্প বা অবতরণের অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ। পশ্চিমা উৎসগুলো তাকে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের বদলে ভুলভাবে আরমান ফিরমান নামে অবহিত করে।
অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মানসিকতাসম্পন্ন ইবনে ফিরনাস তার পরবর্তী ডিজাইনের জন্য বেশ পরিশ্রম করেন। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও মধ্যযুগীয় পাণ্ডলিপির বিবরণ থেকে আমরা ওই উড়ালযান সম্পর্কে জানি যে, এটার বেশ
আল-ফিরদাউসীর শাহনামায় এক রাজার উড্ডয়ন চেষ্টার জনপ্রিয় একটি কাহিনী কবিতার ছন্দে বিবৃত হয়েছে। এখানে শাহনামার প্রচ্ছদ পাতা দৃশ্যমান।
রাজহাঁস পানির উপরে অবতরণ করছে। পাখিদের অবতরণ কৌশল পর্যবেক্ষণ করে আব্বাস ইবনে ফিরনাস নিরাপদে এবং নিখুঁতভাবে অবতরণে লেজের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। মাটিতে বিধ্বস্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন না।
বড় বড় ডানা ছিল। আজ থেকে ১২০০ বছর পূর্বে প্রায় ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্বাস ইবনে ফিরনাস রেশম ও ঈগলের পাখনা দিয়ে বানিয়ে ফেলেন তার পরবর্তী উড়ালযান।
কর্ডোবার উপকণ্ঠের রুসাফা এলাকার পর্বতে চড়ে ইবনে ফিরনাস জনতার সামনে উপস্থিত হন রেশম ও ঈগলের পাখনা দিয়ে বানানো পাখির বেশে। নিজের বাহুতে বসানো ডানায় ভর দিয়ে কীভাবে আকাশে উড়বেন, সেটা তিনি ছোট একটি কাগজ টুকরোতে তুলে ধরেছেন, তার ভাষ্য অনুযায়ী, "এখন আমি তোমাদের ছেড়ে উড়াল দেবো। উপর-নিচ ডানা ঝাপটিয়ে আমি উড়বো আর উড়বো যেন আমি পাখি। যদি সব ঠিক থাকে, তবে কিছু সময় উড়ার পর আমি তোমাদের মাঝে নিরাপদে নেমে আসবো।"
তিনি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় আরোহণ করেন এবং মাটিতে পড়ে ডানা ও নিজের মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভাঙার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ১০ মিনিটেরও বেশি সময় আকাশে ভেসে ছিলেন। এই ঘটনার পর ইবনে ফিরনাস লেজের ভূমিকা উপলব্ধি করেন; এবং মাটিতে নামার সময় পাখি যে লেজের ডগাতে ভর দিয়ে অবতরণ করে এ বিষয় তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের অবহিত করেন। কিন্তু হায়, লেজ না থাকায় তিনি ঠিকভাবে অবতরণ করতে পারেননি।
বর্তমানের সমস্ত উড়োজাহাজ পিছনের চাকায় ভর দিয়ে অবতরণ করে, যা ইবনে ফিরনাসের ভাবনাকে তার যুগের চেয়েও অগ্রগামী প্রমাণ করে। ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়নকে প্রত্যক্ষ করে একজন লিখেছেন, "তিনি বেশ ভালো দূরত্বেই উড়ছিলেন, মনে হচ্ছিল পাখি উড়ছে। কিন্তু তিনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানে অবতরণ করতে গিয়েই বিপত্তি ঘটে এবং তিনি তার পিছনে ভীষণ বাজেভাবে আঘাত পান। পাখিরা যে তাদের লেজে ভর দিয়ে অবতরণ করে, এটা না জানার কারণেই তিনি নিজের জন্য লেজ বানাতে ভুলে গিয়েছিলেন।"
এ ঘটনা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির উড়ালযানের নকশা অঙ্কন এবং রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়নের বহু বহু শতাব্দি পূর্বেকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইবনে ফিরনাসের গুরুতর আঘাত তাকে পরবর্তী কোনো উড্ডয়ন পরীক্ষণে নামতে দেয়নি। যাইহোক উদ্যোমী এই মনীষী হয়তো তার কোনো শিক্ষানবিশকে উড়ালযানের নয়া কোনো সংস্করণ নির্মাণে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
প্রথম মানব হিসেবে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের সফল উড্ডয়নের এক শৈল্পিক প্রকাশ।
এ ধরনের উড়ানযানের বিবরণ রজার বেকনের পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায়, যিনি এটাকে ornithopter (উড়ালপঙ্খী) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে রচিত On the Marvelous Powers of Art and Nature (শিল্প ও প্রকৃতির অনুপম ক্ষমতা) শীর্ষক গ্রন্থে বেকন উল্লেখ করেন যে, দুটো উপায়ে মানুষ উড়তে পারে। প্রথম উপায়টির সাদামাটা বিবরণ পরবর্তীতে ornithopter (উড়ালপঙ্খী) হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্যটি ছিল 'স্বর্গীয় বায়ুতে' সমৃদ্ধ একটি ভূ-গোলকের বিস্তারিত বিবরণ। বেকন দাবী করেন যে, "উড়বার একটি যন্ত্র রয়েছে, যা না আমি দেখেছি আর আমার জানা মতে কেউ দেখেছে, কিন্তু আমি ওই বিজ্ঞ মানুষের নাম ভাল করেই জানি, যিনি এটা উদ্ভাবন করেছেন।" এটা সুবিদিত যে, বেকন অধ্যয়ন করেছেন ইবনে ফিরনাসের আবাসভূমি কর্ডোবায়। এটা খুবই সম্ভব যে বেকনের দেয়া ornithopter-এর বিবরণটি তার সময়ের স্পেনের মুসলিম পাণ্ডুলিপি থেকে নেয়া, যেগুলোর হদিস ওই সময়ের পর থেকে আর পাওয়া যায় না।
ইবনে ফিরনাস ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার কোনো কর্মই আজকের দিন পর্যন্ত টিকে নেই। তার সময়কার বিভিন্ন ধারাবিবরণীকারের যৎ-সামান্য বর্ণনা থেকে তার জীবনী পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ইবনে ফিরনাসের পর বহু মুসলিম ও অমুসলিম উড্ডয়নের চেষ্টায় নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিল এবং বেশ কিছু উড্ডয়ন প্রচেষ্টাও নেয়া হয়েছিল। কাঠ ও দড়ির সাহায্যে নির্মিত ডানায় করে আল-জুহারী নামের এক শিক্ষক ১০০২ খ্রিস্টাব্দে উলু মসজিদের মিনার থেকে উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দিয়ে ঘটনাস্থলেই আঘাত পেয়ে মারা যান। ১১শ শতাব্দীর ভেনেডিক্ট তরিকার ইংরেজ সন্নাসী ইলমার মালমেসবুরিও লেজের ব্যবহার করতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং ১০১০ খ্রিস্টাব্দে উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ১৮৩ মিটার (৬০০ ফুট) উঁচু টাওয়ার থেকে ঝাঁপ দিয়ে দু'পা হারান।
"উপর-নিচ ডানা ঝাপটিয়ে আমি উড়বো আর উড়বো যেন আমি পাখি। যদি সব ঠিক থাকে, তবে কিছু সময় উড়ার পর আমি তোমাদের মাঝে নিরাপদে নেমে আসবো।" - আব্বাস ইবনে ফিরনাস, উড্ডয়নের পথিকৃৎ
উড্ডয়নের যথাযথ বৈজ্ঞানিক ভাবনা নির্মাণে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভিঞ্চি নিজে কখনো উড়বার চেষ্টা না করলেও পাখির ডানাবিশিষ্ট উড়ালপঙ্খী (ornithopter)-সহ উড্ডয়নের সাথে সম্পৃক্ত বহু নকশা তিনি কাগজে অঙ্কন করেছিলেন। উড়ালপঙ্খীটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল, যেন তা কারো পিঠে বেঁধে ব্যবহার করা যায়। অন্যান্য নকশার মাঝে ইঞ্জিনবিহীন বিমান অন্যতম এবং কিছু ব্যাখ্যা মোতাবেক তিনি হেলিকপ্টারের নকশা পর্যন্ত এঁকেছিলেন।
১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে লাগারী হাসান চেলেবী নামের এক তুর্ক প্রথম মনুষ্যবাহী রকেট উদ্ভাবন করেছিলেন, যা ৩০০ পাউন্ড ওজনের গানপাউডার দিয়ে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এই ঘটনা এক শিল্পীর রঙ তুলিতে আশ্রয় করে সংরক্ষিত হয়ে আছে। উইলিয়াম-ই-বারোস তার This New Ocean: The Story of the First Space Age (এই নয়া সমুদ্র: প্রথম মহাকাশ যুগের গল্প) শীর্ষক গ্রন্থে বলেন, "সুলতান চতুর্থ মুরাদের কন্যা কায়া সুলতানের জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষ্যে লাগারী হাসান চেলেবী নামের এক তুর্ককে রকেট ভরে আকাশে নিক্ষেপ করা হয়, ওই রকেটে চুয়ান্ন পাউন্ডের গানপাউডার ছিল। রকেটটি চেলেবীকে নিয়ে বেশ উচ্চতায় পৌঁছায়, যেখানে তিনি তার ডানাগুলো মেলে ধরেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ডানা ঝাপটিয়ে রাজকীয় প্রাসাদের সামনে নিরাপদে অবতরণ করেন। পুরস্কারস্বরূপ এক থলে স্বর্ণমুদ্রার পাশাপাশি চেলেবীর ভাগ্যে জুটে চৌকষ সরকারি চাকরি। বলা হয় যে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে তিনি নিহত হয়েছিলেন।"
হাযারফেন আহমদ চেলেবী নামের ১৭শ শতাব্দির আরেক তুর্ক নিজের উড্ডয়ন ডানার সাথে ঈগলের পাখনাযুক্ত করে উড়বার চেষ্টা করেছিলেন। ৯-বারের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর তিনি তার ডানার আকৃতি ও ভারসাম্য উন্নয়নে আরও মনোযোগ দেন এবং ফলশ্রুতিতে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার বিখ্যাত উড্ডয়ন অভিযানে সফল হন। ইস্তাম্বুলের বসফরাসের নিকটবর্তী গালাতা টাওয়ার থেকে তিনি উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেন এবং বসফরাস প্রণালীর অপর পাশে সফলভাবে অবতরণ করেন। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তুর্কি ঐতিহাসিক ইভলিয়া চেলেবী তার "সিয়াহেতনামা" (সফরনামা) গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেছেন: তুর্কির এই বিখ্যাত উড়াল মানব কিছু সংশোধনীসহ আল-জুহারীর গণনা পদ্ধতি এবং ঈগলের উড্ডয়ন কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সফলভাবে উড়তে পেরেছিলেন। হাযারফেন এ অবদানস্বরূপ জিতে নিয়েছিলেন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং এই ঐতিহাসিক উড্ডয়নকে সম্মান জানিয়ে তুর্কি ডাকবিভাগ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেছিল।
বায়ে: ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলের বসফরাসের নিকটবর্তী গালাতা টাওয়ার থেকে নেয়া হাযারফেন আহমদ চেলেবীর উড্ডয়নের চিত্রায়ন।
ডানে: প্রথম মনুষ্যবাহী রকেট উৎক্ষেপণের শৈল্পিক চিত্রায়ন, ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের এ উৎক্ষেপণে রকেটে ছিলেন লাগারী হাসান। সাতটি ডানাবাহী রকেটে করে লাগারী হাসানকে আকাশে ছোঁড়া হয়; এই রকেটের জ্বালানী ছিল গানপাউডারের মিশ্রণ।
বসফরাসের উপর দিয়ে মন্টগলফিয়ার ভাইদের সফল উড্ডয়নের পর তারা জনসম্মুখে একটি ভেড়া, হাঁস ও মোরগকে যাত্রী বানিয়ে উষ্ণ বায়ুর বেলুন উৎক্ষেপণ করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর বিজ্ঞান শিক্ষক জিন ফ্রাসেয়ো পিলাত্রে ডি রেজিয়ের এবং পদাতিক কর্মকর্তা মারকুইস ডি-আরলান্দেজ উষ্ণ বায়ুর বেলুন করে প্রথম মানব হিসেবে প্যারিসের উপর দিয়ে ৯ কিলোমিটার (৫.৬ মাইল) পাড়ি দিয়েছিলেন।
উনবিংশ শতাব্দির বিমান চালনাবিদ্যায় জার্মানির অটো লিলিয়েনথাল অসমান্য ভূমিকা রেখেছিলেন; বস্তুত তিনি ভূপৃষ্ঠের উত্তোলন ক্ষমতা, ডানার বক্রতার সর্বোত্তম গঠন এবং উড়োজাহাজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক তথা বিভিন্ন ডানার কোণের সাপেক্ষে কেন্দ্রীভূত চাপের পরিবর্তন নিয়ে বেশ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইঞ্জিনবিহীন বিমানে করে তিনি বেশ দক্ষতার সাথে উড়তে পারতেন, কিন্তু ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন পর্বত থেকে উড্ডয়নকালে আচমকা ঝড়ো বাতাস তার উড়ালযানকে আঘাত করে, আর এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের পহেলা ডিসেম্বর রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড্ডয়ন ছিল বিমানচালনার ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। ইবনে ফিরনাসের মতো উইলবুর রাইট পাখিদের উড্ডয়ন কৌশলে ব্যাপক মনোযোগী ছিলেন। উইলবুর এটা উপলব্ধিতে সক্ষম হন যে, ডানাকে নিয়ন্ত্রণ করে পাখি পার্শীয় ভারসাম্য বজায় রাখে। এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি ঘুড়ি নির্মাণ করেন, যা ইচ্ছে মতো দোলানো যেত।
শক্তিচালিত উড়োজাহাজের বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ইঞ্জিনবিহীন উড়ালযান ব্যবহার করতো, যেন "দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনের আগ পর্যন্ত দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যায়।" রাডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছন্দে মোড় নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিগুলো তাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। উইলবুর রাইট ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তার বিমান উড়ান এবং এর এক বছর পার না হতেই হেনরি ফারম্যান ও লুইস ব্লেরিয়ট চালু করেন ব্যাপকভিত্তিক ফ্লাইট বা বিমান-ভ্রমণ সেবা।
বিমানচালনা- এমনকি মহাকাশ ভ্রমণের এ সমস্ত ইতিহাসের বিনম্র সূচনাটা হয়েছিল আব্বাস ইবনে ফিরনাসের হাত ধরে- যে মানুষটি ঈগলের পাখনা ও রেশমে নির্মিত ডানায় ভর দিয়ে উড়বার চেষ্টা করেছিলেন; চেয়েছিলেন নিজের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়নের একটি আলোকচিত্র।
১৯শে জানুয়ারি, ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের লিওনের উপর দিয়ে বয়ে চলা ‘Le Flesselles’ বেলুনের একটি চিত্রায়ন। জোসেফ মন্টগলফিয়ার এবং জিন ফ্রাসোঁয়া পিলাত্রে ডি রেজিয়েরসহ এই বেলুনে সাতজন যাত্রী ছিল।