📄 চাঁদ
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই-এপোলো ১১ চাঁদের বুকে পা রাখে এবং নেইল আর্মস্ট্রং পরিণত হন চাঁদে পা রাখা প্রথম ব্যক্তিতে। কিন্তু চাঁদের বুকে তার প্রথম পা রাখা এবং বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণের বহু পূর্বেই প্রতিভাধর মুসলিম পণ্ডিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পৃথিবীর নিকটতম এই জ্যোতির্মণ্ডলীয় প্রতিবেশী নিয়ে বিস্তর গবেষণায় জড়িত ছিলেন।
মুসলিমদের জন্য চাঁদ অত্যধিক তাৎপর্যপূর্ণ, যেহেতু হিজরী বর্ষপঞ্জি চাঁদের আবর্তন চক্র দ্বারা নির্ধারিত। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে: একটি চন্দ্রমাস প্রায় ২৯.৫ দিনের সমান, যা ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়; ১২-টি চন্দ্রমাস মিলে কেবল ৩৫৪ দিন গঠন করে।
খ্রিস্টান ও ইহুদিরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু এথেন্সের জ্যোতির্বিদ মেটন কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ -এ আবিষ্কৃত একটি পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা এটার একটা সুরাহা করেছিল। তিনি ১৯ বছরের একটি মেটনীয় চক্র উদ্ভাবন করেছিলেন। এটা ১২ চন্দ্রমাসের ১২ বছর এবং ১৩ চন্দ্রমাসের ৭ বছর দিয়ে গঠিত ছিল। ঋতুর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বর্ষপঞ্জিতে পর্যায়ক্রমে ১৩-তম মাস যুক্ত করা হতো।
মুসলিমরাও এ চক্রের অনুসরণ করতো, কিন্তু বিবেকবর্জিত (ইসলাম পূর্ব) কিছু শাসক নিজেদের সুবিধা মতো এতে ১৩-তম মাসের সংযোগ ঘটিয়ে বিষয়টি জটিল বানায়। তাই ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০ বছর শাসনকার্য চালানো ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনে খাত্তাব হিজরী বর্ষপঞ্জির সূচনা ঘটান, যা ইসলামী দেশগুলোতে আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই বর্ষপঞ্জি কঠোরভাবে চাঁদের আবর্তন চক্র মেনে চলে। সৌর বছর থেকে চন্দ্র বছর ১১ দিন কম; তাই রমযানের মতো পবিত্র মাস সারা ঋতু জুড়েই দুনিয়ার সর্বত্র আবর্তিত হয়। তাই প্রতিটি রমযান আগের রমযানের চেয়ে ১১ দিন আগে শুরু হয় এবং প্রতি ৩৩ সৌর বছরে রমযান মাস আবার ঠিক একই তারিখে ফিরে যায়।
নবচন্দ্র দর্শনের মাধ্যমে রমযান এবং অন্যান্য ইসলামী মাস শুরু হয়, তাই রমযান ঠিক কবে নাগাদ আরম্ভ হবে, রাতের আকাশে নবচন্দ্রের আগমনের আগ পর্যন্ত তা কেউই নিশ্চিতভাবে অবগত থাকে না।
ঠিক কখন নবচন্দ্র দৃশ্যমান হবে, তা আগাম বলে দেয়াটা মুসলিম গণিতজ্ঞ জ্যোতির্বিদদের সামনে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। নতুন চাঁদ উদয়ের পর থেকে চাঁদের চলাচল নিয়ে টলেমির তত্ত্ব বেশ নির্ভুল হলেও এই পর্যবেক্ষণ কেবল গ্রহণের অংশ হিসেবে চন্দ্রপথ বা চাঁদের সাপেক্ষে সূর্যের গমনপথের উপর নিবদ্ধ ছিল।
মুসলিমরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়ে যে, নবচন্দ্র দর্শনের আগাম সংবাদ দিতে গেলে, দিগন্তের সাপেক্ষে চাঁদের চলাচল নিয়ে গবেষণা আবশ্যক। এ সমস্যা সমাধানে বেশ জটিল প্রকৃতির গোলীয় জ্যামিতির প্রয়োজনীয়তা তখন ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
চাঁদের বিভিন্ন দশা মুসলিম বর্ষপঞ্জি বা হিজরী বর্ষপঞ্জি গঠনে ব্যবহৃত হয়।
বাগদাদে কর্মরত আল-কিন্দী ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যার হাতে গোলীয় জ্যামিতির বিকাশ ঘটেছিল এবং তিনি তার জ্যোতিষশাস্ত্রীয় কাজে এগুলোর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে কিবলা নির্ধারণ এবং কোন দিকে মসজিদের মুখ থাকবে, তা নির্ণয়েও গোলীয় জ্যামিতির অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সঠিকভাবে কিবলা ঠিক করার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন যুগের অতুলনীয় প্রতিভা আল-বিরুনী। বলতে গেলে আল-বিরুনী যেন আক্ষরিকভাবে সবকিছুতেই আগ্রহী ছিলেন এবং কখনো কখনো তাকে আখ্যায়িত করা হয়: তার যুগের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি হিসেবে। বর্তমান উজবেকিস্তানের 'কাছ' নগরে অবস্থানকালে
আল-কার্যবিনীর লেখা "আজায়িব আল-মাখলুকাত” (বিস্ময়কর সৃষ্টিকুল) শীর্ষক গ্রন্থের ১৬শ শতাব্দির শুরুর দিকের ফারসি অনুবাদ থেকে নেয়া একটি ডায়াগ্রাম।
তিনি ২৪শে মে, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ঘটা চন্দ্রগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বাগদাদেও এটা দেখা গিয়েছিল এবং এ বিষয়ে তিনি তার সহকর্মী জ্যোতির্বিদ আবুল ওফা আল-বুযানীর সাথে তথ্যের আদান-প্রদান করেন। চন্দ্রগ্রহণ সংগঠনের সময় হিসেবে করে তারা দুটো শহরের দ্রাঘিমারেখার পার্থক্য নিরূপণে সমর্থ হয়েছিলেন।
চাঁদ পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত তথ্যাদি লিখে রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এখনকার ন্যায় তখনও চাঁদ ছিল আকর্ষণ ও মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার অন্যতম উৎস। চাঁদের এ দশা এটা প্রতিষ্ঠিত করে যে, আসমানেও সুবিন্যস্ত একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। এসব পর্যবেক্ষণ হিজরী বর্ষপঞ্জির কাঠামো নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় যাবৎ।
চাঁদের তারতম্য
কায়রোর এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে চাঁদের গতির তৃতীয় অসমতা বা চাঁদের তারতম্য নামে বিষয়টি আবিষ্কার করেন। টলেমি প্রথম ও দ্বিতীয় অসমতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্যের আবিষ্কারক হলেন: আবুল ওফা আল-বুযানী।
নতুন চাঁদের উদয়কাল বা পূর্ণিমার সময় চাঁদ দ্রুত চলে এবং চন্দ্রমাসের প্রথম ও তৃতীয়-চতুর্থাংশে ধীর গতিতে চলে – চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্য ছয় শতাব্দি পরে ইউরোপে ট্যুকো ব্রাহে কর্তৃক ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।
📄 চাঁদের কলঙ্ক
খালি চোখে চাঁদের দিকে তাকালে আমরা এটাকে কালো ও হালকা দাগসহ অসম উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত হতে দেখি। চাঁদের এই বৈশিষ্ট্য চাঁদের কলঙ্ক বা দাগ (lunar formations) নামে পরিচিত।
১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে ইয়োহান ব্যাপটিস্টা রিকিউলি নামের এক ইতালীয় জ্যোতিষ ও দর্শনশাস্ত্রীয় অধ্যাপক চাঁদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সম্বলিত Almagestum Novum নামে একটি জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ওই গ্রন্থে তিনি মধ্যযুগের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদদের নামে চাঁদের কলঙ্কের নাম রেখেছিলেন, যেখানে দশজন মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞের নাম ছিল।
AD MAGNANIMUM PRINCIPEM HONORATVM II MONOFCI PRINCIPEM DUCEM VALENTINUM PAREM FRANCIA SOUVEN SA
ALMAGESTI NOVI PARS POSTERIOR TOMI PRIMI
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সংঘ (International Astronomical Union) কর্তৃক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ নামগুলোর ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছানো হয়। ৬৭২-টি চাঁদের কলঙ্কের ১৩-টির নামকরণ করা হয় মুসলিম জ্যোতির্বিদদের নামে এবং এরপর থেকে আরও বহু নাম এতে সংযুক্ত হয়েছে। এসব নামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
■ Messala - চাঁদের ১৩-তম বিভাগের সমভূমি, যা ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী মাশাআল্লাহের নামে নামকৃত। মিশরীয় এই ইহুদি ব্যক্তি আব্বাসী খলীফা আল-মানসূরের আমলে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন। ১৬শ শতাব্দিতে De Scientia Matus Orbis এবং De compositione et utilitate astrolabii শিরোনামে তার দুটো গ্রন্থ লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়।
■ Almanon - চাঁদের নবম বিভাগের একটি আগ্নেয় জ্বালামুখ, আলিফ লায়লা (আরব্য রজনী) খ্যাত খলীফা হারুন উর-রশিদের পুত্র আল-মামুনের নামে এটার নাম রাখা হয়। ৮২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে তিনি প্রথম মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার বায়তুল হিকমা মুখরিত ছিল তার যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের পদচারণায়।
■ Alfraganus - চাঁদের দ্বিতীয় বিভাগে অবস্থিত আগ্নেয় জ্বালামুখ, ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-ফারগানীর নামে এটা নামকৃত। আল-মামুনের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গবেষণা দলের একজন তিনি। "জাওয়ামি ইলম আন-নুজুম ওয়াল হারাকাতিস সামাইয়্যা" (সৌরগতি এবং নক্ষত্রবিজ্ঞানের বিশ্বকোষ) তার বিখ্যাত গ্রন্থ, যা ইতালীয় কবি দান্তের উপর সরাসরি প্রভাব রেখেছিল।
■ Albategnius – চাঁদের প্রথম বিভাগের সমভূমি, যা ৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-বাত্তানীর নামে নামকৃত। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু পরিমাপ তিনি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন।
■ Thabit - চাঁদের অষ্টম বিভাগের বড় একটি সমভূমি, ৯০১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ছাবিত ইবনে কুরার নামে এটার নাম রাখা হয়। গ্রিক ও সিরীয় ভাষার রচিত বিজ্ঞান বিষয়ক বহু রচনার আরবী অনুবাদক এই ছাবিত। বিশুদ্ধ গণিতে তার বড় ধরনের অবদান ছিল।
■ Azophi - চাঁদের নবম বিভাগের পর্বত-সদৃশ্য বৃত্ত, যা ১০ম শতাব্দির আব্দুর রহমান আস-সূফীর নামে নামকৃত। মধ্যযুগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবহারিক জ্যোতির্বিদ। তার লেখা "সুয়ারুল কাওয়াকিব আছ-ছামানিয়া ওয়াল আলবায়িন" (স্থির তারকা) শীর্ষক গ্রন্থটি নাক্ষত্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠকীর্তি।
■ Alhazen - চাঁদের দ্বাদশ বিভাগের বৃত্তাকার সমভূমি, যা আবু আলী আল-হাসান ইবনুল হাইছামের নামে নামকৃত, ইবনুল হাইছাম হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। ৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে বসরায় জন্ম নেয়া এ মনীষীর কর্ম জীবনের অধিকাংশ সময় মিশরেই কাটে এবং ১০৩৯ খ্রিস্টাব্দে এখানেই তার জীবনাবসান ঘটে। তার একশ'র অধিক গ্রন্থের মাঝে আজ কেবল ৫৫-টি টিকে আছে, যার সবগুলোই গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞান নিয়ে লেখা। তিনি ছিলেন আলোকবিজ্ঞানের প্রধান অনুসন্ধানী পথিকৃৎ এবং তার লেখা "কিতাব আল-মানাযির" ইউরোপীয় বিজ্ঞানের উপর অপরিসীম প্রভাব রেখেছিল।
■ Arzachel - চাঁদের অষ্টম বিভাগের সমভূমি, যা ১১০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আয-যারকালীর নামে নামকৃত। আন্দালুসে তিনি মুসলিম ও ইহুদি জ্যোতির্বিদদের সাথে মিলে প্রস্তুত করেছিলেন বিখ্যাত টলেডীয় ছক। তার কাজ খুব সম্ভবত কপার্নিকাসের উপর প্রভাব রেখেছিল।
■ Geber - চাঁদের নবম বিভাগের বৃত্তাকার, মসৃণ সমভূমি, যা ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী জাবির ইবনে আফলাহের নামে নামকৃত। স্পেনীয় এ আরব মহাকাশীয় বস্তুসমূহের স্থানাংক নির্ণয়ে প্রথম বহনযোগ্য মহাকাশীয় গোলক প্রস্তুত করেছিরেন, যা টরকুয়েটাম নামে পরিচিত।
■ Nasireddin - ৩০ মাইল ব্যাসের আগ্নেয় জ্বালামুখ, যা ১২০১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী নাসিরউদ্দীন আত-তুসীর নামে নামকৃত। ১২৫৬ থেকে ১২৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পারস্যের ইলখানাত সাম্রাজ্যের শাসক হালাকু খানের একজন মন্ত্রী ছিলেন। হালাকু খান কর্তৃক মারাগাতে প্রতিষ্ঠিত মানমন্দিরের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয় এবং সেখানে ইলখানত ছক প্রস্তুতের পাশাপাশি তিনি কিছু স্থির নক্ষত্র নথিভুক্ত করেছিলেন। এগুলো চীন থেকে পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত কয়েক শতাব্দি যাবৎ ব্যবহৃত হয়।
■ Alpetragius - চাঁদের অষ্টম বিভাগের একটি আগ্নেয় জ্বালামুখ, মরক্কোতে জন্ম নেয়া নূরুদ্দীন ইবনে ইসহাক আল-বিতরুযির নামে এটার নাম রাখা হয়। মরক্কোতে জন্ম হলেও সেভিল নিবাসী আল-বিতরুযি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। টলেমির গ্রহমণ্ডলীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে তিনি কঠোর শ্রম দিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে আল-বিতরুযির লেখা "কিতাবুল হিয়াতু" লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে ১৩শ শতাব্দির ইউরোপে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
■ Abulfeda - চাঁদের নবম বিভাগের বৃত্তকার সমভূমি, ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় জন্ম নেয়া আবুল ফিদার নামে নামকৃত। খলীফা আল-মামুনের প্রতিষ্ঠিত ধারায় দীক্ষিত তিনিই ছিলেন সর্বশেষ ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ। ইতিহাসবেত্তা হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি কুড়ানো এ মনীষীর সর্বাধিক বিখ্যাত কর্ম: "তাকয়ীমুল বুলদান" (দেশসমূহের সমীক্ষা)।
■ Ulugh Beigh - ডিম্বাকৃতি বিশিষ্ট চাঁদের ১৮-তম বিভাগের এ অংশের নাম ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া উলুগ বেগের নামে রাখা হয়। ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুবিশাল মানমন্দির, যা ছিল অত্যন্ত উন্নত ও নির্ভুল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রে সজ্জিত। তারকারাজির নতুন তালিকা প্রণয়ন তার সর্বাধিক প্রশংসনীয় ও চিরস্মরণীয় কাজ।
আজ রাতে যখনই চাঁদের দিকে তাকাবেন, তখন চাঁদের বিভিন্ন আগ্নেয় জ্বালামুখ, ডিম্বাকৃতি অংশ এবং সমভূমিতে যেসব ব্যক্তি অমর হয়ে আছেন, তাদের স্মরণ করবেন। এই ব্যক্তিরাই আমাদের জীবনে উপহার দিয়েছেন জ্ঞান ও আলোর এক বিরাট অংশ।
নিচে: প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের নামে নামকৃত চাঁদের কলঙ্কের একটি মানচিত্র।
পূর্বের পৃষ্ঠার শীর্ষে: চাঁদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সম্বলিত Almagestum Novum গ্রন্থটি। বিশেষ খ্রিস্টীয় ধর্মীয় সংঘ জেসুইটের সদস্য ইতালীয় পণ্ডিত ইয়োহান ব্যাপটিস্টা রিকিউলি ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে এটা সংকলন করেছিলেন।
📄 নক্ষত্রপুঞ্জ
মানমন্দিরের উত্থান এবং রাতের আকাশের প্রতি সীমাহীন আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ৯ম শতাব্দি থেকে মুসলিম জ্যোতির্বিদদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় রাতের আকাশ এবং একে একে তারা উপহার দিতে থাকে তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে নানা টেকসই কর্ম। ১০ম শতাব্দীর পারসীয় জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আস-সূফী ছিলেন সত্যিকার নক্ষত্র-পর্যবেক্ষক। ৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির বিবরণ দিতে গিয়ে এটাকে তিনি 'ছোট মেঘ' বলে আখ্যায়িত করেন।
এটাই ছিল আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি বহির্ভূত কোনো তারকা ব্যবস্থার প্রথম লিখিত নথি। প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জ ধরে ধরে তিনি তার ফলাফল লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। তারকারাজির বিবরণ, আকার, রঙ এবং প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জের জন্য তিনি দুটো অঙ্কিত চিত্র প্রদান করতেন, যার একটি: মহাকাশীয় গোলকের বহির্ভাগ থেকে এবং অপরটি: অভ্যন্তর থেকে। তিনি আন্তর্লাব নিয়েও লিখেছেন এবং এটার হাজারো ব্যবহারের ফিরিস্তি দিয়েছে।
তার এই কঠোর শ্রমের ফলে বহু তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জের বিবরণ সংরক্ষিত হয়, যেগুলো আজও তাদের আরবী নামেই পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতির্বিদগণ প্রায় ১০২২-টি তারকার নাম ও তাদের তুলনামূলক উজ্জ্বলতা নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে ১৬৫-টিরও বেশি তারকার নামে আরবী চিহ্ন স্পষ্টত দৃশ্যমান, যেমন: 'Aldebaran (الديران)' যার অর্থ: সুরিয়া তারকার 'অনুগামী' এবং 'Altair (نسر طائر)' শব্দের অর্থ: 'উড়ন্ত ঈগল'।
মুসলিমগণ তারকা মানচিত্র এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছকও প্রস্তুত করেছিল, যেগুলো কয়েক শতাব্দি ধরে ইউরোপ ও দূর-প্রাচ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহত হয়। মহাজগতের মানচিত্র বিভিন্ন শৈল্পিক কাজেও দেখা যেত, যেমন: ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত জর্ডানের কুসাইর আমরায় অবস্থিত হাম্মামখানা বা স্নানাগারের গম্বুজে বিশাল অর্ধমণ্ডলীয় মহাকাশীয় মানচিত্র আঁকা ছিল। এই দেয়ালচিত্রের টিকে থাকা খণ্ডিত অংশে ৩৭-টি নক্ষত্রপুঞ্জ ও ৪০০-টি তারকা দৃশ্যমান।
উপরে: ড্রাগন নক্ষত্রপুঞ্জ বা আরবীতে আত-তানীন।
নিচে থেকে বামে: সিফিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জ (Constellation Cepheus) বা আরবীতে কিফাউ'স।
নিচে থেকে ডানে: মুস্তাফা ইবনে আবদুল্লাহ কর্তৃক তুর্কি ভাষায় রচিত মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্য বিষয়ক ম্যানুয়েল।
আরবীতে আছ-ছুরিয়া নামে পরিচিত প্লাইয়েডস (Pleiades) নক্ষত্রমালা।
📄 উড্ডয়ন
উড্ডয়নের ধারণা হাজার বছর ধরে মানবজাতিকে মোহমুগ্ধ করে রাখার পাশাপাশি তাদের প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ফারাও রাজাদের পাখনায় ভর দিয়ে আকাশে উড়বার বহু চিত্র মিশরীয়রা রেখে গেছে, যা উড়বার প্রতি অসীম বাসনারই বহিঃপ্রকাশ। চীন ও গ্রিকদের যেমন রয়েছে উড্ডয়ন নিয়ে নানা রূপকথা ও কিংবদন্তী, ঠিক তেমনটি আরবদেরও ছিল।
এ ব্যাপারে সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপকথাটি ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত আল-ফিরদাউসীর "শাহনামা"-তে বর্ণিত হয়েছে। গল্পটি এরূপ: কায় কাউস নামের এক রাজা দুষ্টু আত্মাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে উড়াল সিংহাসনের সহায়তায় স্বর্গ দখল নিতে বেরিয়ে পড়ে। উড়াল এ সিংহাসনের সাথে উপরমুখী চারটি লম্বা দণ্ড বাঁধা ছিল। প্রতিটি দণ্ডের মাথায় মাংস রাখা ছিল এবং নিচে রাক্ষুসে ঈগল শিকল শৃঙ্খলিত ছিল। ঈগলগুলো মাংসের লোভে উপরে উড়াল দিতো এবং এভাবে সিংহাসনটি উড়তো। কিন্তু দীর্ঘযাত্রার পর ঈগলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে পুরো সিংহাসনটি বিধ্বস্ত হয়।
ইসলামপূর্ব আরবে উড়াল জাদুকর, অতিপ্রাকৃত শক্তি, পাখি কিংবা শুধু পালক নিয়ে বহু রূপকথা প্রচলিত থাকলেও মুসলিমদের জন্য উড্ডয়ন বহন করতো বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। ভালো কাজের মাধ্যমে নিষ্ঠাবান মুসলিমের আত্মা একটা স্তরে পৌঁছে সেখান থেকে একের পর এক রূহানী মনযিল পাড়ি দিয়ে আরও উচ্চে আরোহণ করে।
৯ম শতাব্দি কর্ডোবা নিবাসী আব্বাস ইবনে ফিরনাসই প্রথম মুসলিম এবং খুব সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি উড়ালযান নির্মাণ এবং উড়বার চেষ্টা করেছিলেন। বহুবিদ্যায় পারদর্শী এ মনীষী ছিলেন একাধারে ছিলেন তৎকালের অপ্রতিদ্বন্দ্বি জ্যোতির্বিদ, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং প্রখ্যাত কবি। কিন্তু তার খ্যাতি ছুঁয়ে আছে উড়ালযান নির্মাণের সাথে যা প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ নিয়ে আকাশে উড্ডয়ন করেছিল। স্পেনের কর্ডোবায় নেয়া তার দুটো বিখ্যাত উড্ডয়নের পূর্বে মরু এলাকায় তিনি বেশ কয়েকটি সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছিলেন, যেন এতে তার উড়ালযানের ডিজাইন কাঠামো যথাসম্ভব নিখুঁত করা যায়।
ঢিলেঢালা আলখাল্লায় ভারসাম্য কাঠের সাথে নিজেকে শক্তভাবে আটকে ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবা জামে মসজিদের মিনার থেকে তিনি প্রথমবারের মতো ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিন্তু তার এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার এ পতন পর্যাপ্ত ধীরগতির হওয়ায় এ যাত্রায় তিনি সামান্য কিছু আঘাত পেয়েছিলেন। তার এ উড্ডয়ন ব্যর্থ হলেও এটা ছিল প্যারাসুট জাম্প বা অবতরণের অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ। পশ্চিমা উৎসগুলো তাকে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের বদলে ভুলভাবে আরমান ফিরমান নামে অবহিত করে।
অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মানসিকতাসম্পন্ন ইবনে ফিরনাস তার পরবর্তী ডিজাইনের জন্য বেশ পরিশ্রম করেন। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও মধ্যযুগীয় পাণ্ডলিপির বিবরণ থেকে আমরা ওই উড়ালযান সম্পর্কে জানি যে, এটার বেশ
আল-ফিরদাউসীর শাহনামায় এক রাজার উড্ডয়ন চেষ্টার জনপ্রিয় একটি কাহিনী কবিতার ছন্দে বিবৃত হয়েছে। এখানে শাহনামার প্রচ্ছদ পাতা দৃশ্যমান।
রাজহাঁস পানির উপরে অবতরণ করছে। পাখিদের অবতরণ কৌশল পর্যবেক্ষণ করে আব্বাস ইবনে ফিরনাস নিরাপদে এবং নিখুঁতভাবে অবতরণে লেজের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। মাটিতে বিধ্বস্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন না।
বড় বড় ডানা ছিল। আজ থেকে ১২০০ বছর পূর্বে প্রায় ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্বাস ইবনে ফিরনাস রেশম ও ঈগলের পাখনা দিয়ে বানিয়ে ফেলেন তার পরবর্তী উড়ালযান।
কর্ডোবার উপকণ্ঠের রুসাফা এলাকার পর্বতে চড়ে ইবনে ফিরনাস জনতার সামনে উপস্থিত হন রেশম ও ঈগলের পাখনা দিয়ে বানানো পাখির বেশে। নিজের বাহুতে বসানো ডানায় ভর দিয়ে কীভাবে আকাশে উড়বেন, সেটা তিনি ছোট একটি কাগজ টুকরোতে তুলে ধরেছেন, তার ভাষ্য অনুযায়ী, "এখন আমি তোমাদের ছেড়ে উড়াল দেবো। উপর-নিচ ডানা ঝাপটিয়ে আমি উড়বো আর উড়বো যেন আমি পাখি। যদি সব ঠিক থাকে, তবে কিছু সময় উড়ার পর আমি তোমাদের মাঝে নিরাপদে নেমে আসবো।"
তিনি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় আরোহণ করেন এবং মাটিতে পড়ে ডানা ও নিজের মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভাঙার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ১০ মিনিটেরও বেশি সময় আকাশে ভেসে ছিলেন। এই ঘটনার পর ইবনে ফিরনাস লেজের ভূমিকা উপলব্ধি করেন; এবং মাটিতে নামার সময় পাখি যে লেজের ডগাতে ভর দিয়ে অবতরণ করে এ বিষয় তিনি তার ঘনিষ্ঠজনদের অবহিত করেন। কিন্তু হায়, লেজ না থাকায় তিনি ঠিকভাবে অবতরণ করতে পারেননি।
বর্তমানের সমস্ত উড়োজাহাজ পিছনের চাকায় ভর দিয়ে অবতরণ করে, যা ইবনে ফিরনাসের ভাবনাকে তার যুগের চেয়েও অগ্রগামী প্রমাণ করে। ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়নকে প্রত্যক্ষ করে একজন লিখেছেন, "তিনি বেশ ভালো দূরত্বেই উড়ছিলেন, মনে হচ্ছিল পাখি উড়ছে। কিন্তু তিনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানে অবতরণ করতে গিয়েই বিপত্তি ঘটে এবং তিনি তার পিছনে ভীষণ বাজেভাবে আঘাত পান। পাখিরা যে তাদের লেজে ভর দিয়ে অবতরণ করে, এটা না জানার কারণেই তিনি নিজের জন্য লেজ বানাতে ভুলে গিয়েছিলেন।"
এ ঘটনা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির উড়ালযানের নকশা অঙ্কন এবং রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়নের বহু বহু শতাব্দি পূর্বেকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইবনে ফিরনাসের গুরুতর আঘাত তাকে পরবর্তী কোনো উড্ডয়ন পরীক্ষণে নামতে দেয়নি। যাইহোক উদ্যোমী এই মনীষী হয়তো তার কোনো শিক্ষানবিশকে উড়ালযানের নয়া কোনো সংস্করণ নির্মাণে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
প্রথম মানব হিসেবে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের সফল উড্ডয়নের এক শৈল্পিক প্রকাশ।
এ ধরনের উড়ানযানের বিবরণ রজার বেকনের পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায়, যিনি এটাকে ornithopter (উড়ালপঙ্খী) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে রচিত On the Marvelous Powers of Art and Nature (শিল্প ও প্রকৃতির অনুপম ক্ষমতা) শীর্ষক গ্রন্থে বেকন উল্লেখ করেন যে, দুটো উপায়ে মানুষ উড়তে পারে। প্রথম উপায়টির সাদামাটা বিবরণ পরবর্তীতে ornithopter (উড়ালপঙ্খী) হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্যটি ছিল 'স্বর্গীয় বায়ুতে' সমৃদ্ধ একটি ভূ-গোলকের বিস্তারিত বিবরণ। বেকন দাবী করেন যে, "উড়বার একটি যন্ত্র রয়েছে, যা না আমি দেখেছি আর আমার জানা মতে কেউ দেখেছে, কিন্তু আমি ওই বিজ্ঞ মানুষের নাম ভাল করেই জানি, যিনি এটা উদ্ভাবন করেছেন।" এটা সুবিদিত যে, বেকন অধ্যয়ন করেছেন ইবনে ফিরনাসের আবাসভূমি কর্ডোবায়। এটা খুবই সম্ভব যে বেকনের দেয়া ornithopter-এর বিবরণটি তার সময়ের স্পেনের মুসলিম পাণ্ডুলিপি থেকে নেয়া, যেগুলোর হদিস ওই সময়ের পর থেকে আর পাওয়া যায় না।
ইবনে ফিরনাস ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার কোনো কর্মই আজকের দিন পর্যন্ত টিকে নেই। তার সময়কার বিভিন্ন ধারাবিবরণীকারের যৎ-সামান্য বর্ণনা থেকে তার জীবনী পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ইবনে ফিরনাসের পর বহু মুসলিম ও অমুসলিম উড্ডয়নের চেষ্টায় নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিল এবং বেশ কিছু উড্ডয়ন প্রচেষ্টাও নেয়া হয়েছিল। কাঠ ও দড়ির সাহায্যে নির্মিত ডানায় করে আল-জুহারী নামের এক শিক্ষক ১০০২ খ্রিস্টাব্দে উলু মসজিদের মিনার থেকে উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দিয়ে ঘটনাস্থলেই আঘাত পেয়ে মারা যান। ১১শ শতাব্দীর ভেনেডিক্ট তরিকার ইংরেজ সন্নাসী ইলমার মালমেসবুরিও লেজের ব্যবহার করতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং ১০১০ খ্রিস্টাব্দে উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ১৮৩ মিটার (৬০০ ফুট) উঁচু টাওয়ার থেকে ঝাঁপ দিয়ে দু'পা হারান।
"উপর-নিচ ডানা ঝাপটিয়ে আমি উড়বো আর উড়বো যেন আমি পাখি। যদি সব ঠিক থাকে, তবে কিছু সময় উড়ার পর আমি তোমাদের মাঝে নিরাপদে নেমে আসবো।" - আব্বাস ইবনে ফিরনাস, উড্ডয়নের পথিকৃৎ
উড্ডয়নের যথাযথ বৈজ্ঞানিক ভাবনা নির্মাণে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভিঞ্চি নিজে কখনো উড়বার চেষ্টা না করলেও পাখির ডানাবিশিষ্ট উড়ালপঙ্খী (ornithopter)-সহ উড্ডয়নের সাথে সম্পৃক্ত বহু নকশা তিনি কাগজে অঙ্কন করেছিলেন। উড়ালপঙ্খীটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল, যেন তা কারো পিঠে বেঁধে ব্যবহার করা যায়। অন্যান্য নকশার মাঝে ইঞ্জিনবিহীন বিমান অন্যতম এবং কিছু ব্যাখ্যা মোতাবেক তিনি হেলিকপ্টারের নকশা পর্যন্ত এঁকেছিলেন।
১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে লাগারী হাসান চেলেবী নামের এক তুর্ক প্রথম মনুষ্যবাহী রকেট উদ্ভাবন করেছিলেন, যা ৩০০ পাউন্ড ওজনের গানপাউডার দিয়ে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এই ঘটনা এক শিল্পীর রঙ তুলিতে আশ্রয় করে সংরক্ষিত হয়ে আছে। উইলিয়াম-ই-বারোস তার This New Ocean: The Story of the First Space Age (এই নয়া সমুদ্র: প্রথম মহাকাশ যুগের গল্প) শীর্ষক গ্রন্থে বলেন, "সুলতান চতুর্থ মুরাদের কন্যা কায়া সুলতানের জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষ্যে লাগারী হাসান চেলেবী নামের এক তুর্ককে রকেট ভরে আকাশে নিক্ষেপ করা হয়, ওই রকেটে চুয়ান্ন পাউন্ডের গানপাউডার ছিল। রকেটটি চেলেবীকে নিয়ে বেশ উচ্চতায় পৌঁছায়, যেখানে তিনি তার ডানাগুলো মেলে ধরেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ডানা ঝাপটিয়ে রাজকীয় প্রাসাদের সামনে নিরাপদে অবতরণ করেন। পুরস্কারস্বরূপ এক থলে স্বর্ণমুদ্রার পাশাপাশি চেলেবীর ভাগ্যে জুটে চৌকষ সরকারি চাকরি। বলা হয় যে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে তিনি নিহত হয়েছিলেন।"
হাযারফেন আহমদ চেলেবী নামের ১৭শ শতাব্দির আরেক তুর্ক নিজের উড্ডয়ন ডানার সাথে ঈগলের পাখনাযুক্ত করে উড়বার চেষ্টা করেছিলেন। ৯-বারের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর তিনি তার ডানার আকৃতি ও ভারসাম্য উন্নয়নে আরও মনোযোগ দেন এবং ফলশ্রুতিতে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার বিখ্যাত উড্ডয়ন অভিযানে সফল হন। ইস্তাম্বুলের বসফরাসের নিকটবর্তী গালাতা টাওয়ার থেকে তিনি উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেন এবং বসফরাস প্রণালীর অপর পাশে সফলভাবে অবতরণ করেন। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তুর্কি ঐতিহাসিক ইভলিয়া চেলেবী তার "সিয়াহেতনামা" (সফরনামা) গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেছেন: তুর্কির এই বিখ্যাত উড়াল মানব কিছু সংশোধনীসহ আল-জুহারীর গণনা পদ্ধতি এবং ঈগলের উড্ডয়ন কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সফলভাবে উড়তে পেরেছিলেন। হাযারফেন এ অবদানস্বরূপ জিতে নিয়েছিলেন এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং এই ঐতিহাসিক উড্ডয়নকে সম্মান জানিয়ে তুর্কি ডাকবিভাগ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেছিল।
বায়ে: ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলের বসফরাসের নিকটবর্তী গালাতা টাওয়ার থেকে নেয়া হাযারফেন আহমদ চেলেবীর উড্ডয়নের চিত্রায়ন।
ডানে: প্রথম মনুষ্যবাহী রকেট উৎক্ষেপণের শৈল্পিক চিত্রায়ন, ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের এ উৎক্ষেপণে রকেটে ছিলেন লাগারী হাসান। সাতটি ডানাবাহী রকেটে করে লাগারী হাসানকে আকাশে ছোঁড়া হয়; এই রকেটের জ্বালানী ছিল গানপাউডারের মিশ্রণ।
বসফরাসের উপর দিয়ে মন্টগলফিয়ার ভাইদের সফল উড্ডয়নের পর তারা জনসম্মুখে একটি ভেড়া, হাঁস ও মোরগকে যাত্রী বানিয়ে উষ্ণ বায়ুর বেলুন উৎক্ষেপণ করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর বিজ্ঞান শিক্ষক জিন ফ্রাসেয়ো পিলাত্রে ডি রেজিয়ের এবং পদাতিক কর্মকর্তা মারকুইস ডি-আরলান্দেজ উষ্ণ বায়ুর বেলুন করে প্রথম মানব হিসেবে প্যারিসের উপর দিয়ে ৯ কিলোমিটার (৫.৬ মাইল) পাড়ি দিয়েছিলেন।
উনবিংশ শতাব্দির বিমান চালনাবিদ্যায় জার্মানির অটো লিলিয়েনথাল অসমান্য ভূমিকা রেখেছিলেন; বস্তুত তিনি ভূপৃষ্ঠের উত্তোলন ক্ষমতা, ডানার বক্রতার সর্বোত্তম গঠন এবং উড়োজাহাজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক তথা বিভিন্ন ডানার কোণের সাপেক্ষে কেন্দ্রীভূত চাপের পরিবর্তন নিয়ে বেশ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইঞ্জিনবিহীন বিমানে করে তিনি বেশ দক্ষতার সাথে উড়তে পারতেন, কিন্তু ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন পর্বত থেকে উড্ডয়নকালে আচমকা ঝড়ো বাতাস তার উড়ালযানকে আঘাত করে, আর এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের পহেলা ডিসেম্বর রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড্ডয়ন ছিল বিমানচালনার ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। ইবনে ফিরনাসের মতো উইলবুর রাইট পাখিদের উড্ডয়ন কৌশলে ব্যাপক মনোযোগী ছিলেন। উইলবুর এটা উপলব্ধিতে সক্ষম হন যে, ডানাকে নিয়ন্ত্রণ করে পাখি পার্শীয় ভারসাম্য বজায় রাখে। এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি ঘুড়ি নির্মাণ করেন, যা ইচ্ছে মতো দোলানো যেত।
শক্তিচালিত উড়োজাহাজের বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ইঞ্জিনবিহীন উড়ালযান ব্যবহার করতো, যেন "দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনের আগ পর্যন্ত দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যায়।" রাডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছন্দে মোড় নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিগুলো তাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। উইলবুর রাইট ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তার বিমান উড়ান এবং এর এক বছর পার না হতেই হেনরি ফারম্যান ও লুইস ব্লেরিয়ট চালু করেন ব্যাপকভিত্তিক ফ্লাইট বা বিমান-ভ্রমণ সেবা।
বিমানচালনা- এমনকি মহাকাশ ভ্রমণের এ সমস্ত ইতিহাসের বিনম্র সূচনাটা হয়েছিল আব্বাস ইবনে ফিরনাসের হাত ধরে- যে মানুষটি ঈগলের পাখনা ও রেশমে নির্মিত ডানায় ভর দিয়ে উড়বার চেষ্টা করেছিলেন; চেয়েছিলেন নিজের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড্ডয়নের একটি আলোকচিত্র।
১৯শে জানুয়ারি, ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের লিওনের উপর দিয়ে বয়ে চলা ‘Le Flesselles’ বেলুনের একটি চিত্রায়ন। জোসেফ মন্টগলফিয়ার এবং জিন ফ্রাসোঁয়া পিলাত্রে ডি রেজিয়েরসহ এই বেলুনে সাতজন যাত্রী ছিল।