📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন

📄 জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন


বেশ অনুপ্রেরণামূলক ভঙ্গিতে কুরআন বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনার উল্লেখ করেছে এবং মানবজাতি যেন মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে এসব প্রাকৃতিক ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে, সেদিকে আহ্বান জানিয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ,
২:১৬৪- "এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে, মানুষের জন্য উপকারী সামগ্রী বয়ে আনা সমুদ্রে চলা জাহাজে, ওই পানিতে যা আল্লাহ আসমান থেকে বর্ষণ করেন, আর তা দিয়ে মৃত জমিনকে তিনি আবার নয়া জীবন দেন এবং তাতে ছড়িয়ে দেন সব ধরনের জীবজন্তু; বাতাসের প্রবাহে, আসমান ও জমিনের মধ্যস্থ হুকুমের অনুগত মেঘে - বস্তুত আকল বা চিন্তার মাধ্যমে কাজ করা লোকদের জন্য এসবে রয়েছে বহু নিদর্শন।"
কুরআনে জ্যোতির্মণ্ডলীয় ঘটনাসমূহ বারবার উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং সময় গণনা ও নৌচালন প্রসঙ্গে এই ঘটনাগুলো জুড়ে দেয়া হয়েছে। কুরআন নিখুঁত অক্ষ ও গতিপথ নিয়ে কথা বলেছে এবং এসব প্রাকৃতিক ঘটনার পিছনে থাকা সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের পাশাপাশি এসব নিয়ে চিন্তা করতে মানুষদের উৎসাহিত করেছে। এখানে কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো:
৬:৯৭- "তিনিই সে জন, যিনি তোমাদের জন্য তারকা বানিয়েছেন, যেন তোমরা স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চলতে পারো। যারা জানতে চায়, আমরা তাদের জন্য আমাদের নিদর্শন খুলে খুলে বর্ণনা করি।"
১৬:১২- "রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদকে তিনিই তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন এবং তাঁরই আদেশে তারকারাজি তোমাদের সেবায় নিয়োজিত। নিশ্চিতভাবে, আকল বা চিন্তার মাধ্যমে কাজ করা লোকদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।"
২১:৩৩ - "হাকিকত হচ্ছে: তিনিই সে জন, যিনি রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন; এদের সকলে (নিজ নিজ) কক্ষপথে ঘূর্ণনরত।"
৫৫:৫- "(তোমরা নিদর্শন চাচ্ছো, তাহলে দেখো) সূর্য ও চাঁদ এক সুনির্দিষ্ট হিসেব মোতাবেক আবর্তন রত।"
বস্তুত, উপরে উদ্ধৃত আয়াতের ন্যায় অন্যান্য আয়াত মানুষের উদ্দেশ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যেন তারা আল্লাহর বিস্ময়কর নিদর্শনে সমৃদ্ধ মহাবিশ্ব অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে।
শুধু এটাই নয়, বরং একটি আয়াতে তো আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআ'লা মানবজাতিকে পৃথিবীর গণ্ডি পাড়ি দিয়ে মহাশূন্যে অনুসন্ধান চালাতে উৎসাহিত করেছেন, তবে সাথে সাথে এই সতর্কবাতা পেশ করেছেন যে, উপযুক্ত শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ হাসিল হলেই এটা সম্ভব হবে।
৫৫:৩৩- "হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, জমিন ও আসমানের সীমা অতিক্রম করে বেরিয়ে যেতে চাও, তবে বেরিয়ে যাও; তবে পরোয়ানা তথা শক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না।"
কুরআনের আয়াতে জ্যোতির্মণ্ডলীয় ঘটনার পিছনে থাকা সুসংহত ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ড. আহমাদ মুস্তাফা অঙ্কিত "দিন ও রাতের কুণ্ডলী"।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 চাঁদ

📄 চাঁদ


১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই-এপোলো ১১ চাঁদের বুকে পা রাখে এবং নেইল আর্মস্ট্রং পরিণত হন চাঁদে পা রাখা প্রথম ব্যক্তিতে। কিন্তু চাঁদের বুকে তার প্রথম পা রাখা এবং বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণের বহু পূর্বেই প্রতিভাধর মুসলিম পণ্ডিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পৃথিবীর নিকটতম এই জ্যোতির্মণ্ডলীয় প্রতিবেশী নিয়ে বিস্তর গবেষণায় জড়িত ছিলেন।
মুসলিমদের জন্য চাঁদ অত্যধিক তাৎপর্যপূর্ণ, যেহেতু হিজরী বর্ষপঞ্জি চাঁদের আবর্তন চক্র দ্বারা নির্ধারিত। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে: একটি চন্দ্রমাস প্রায় ২৯.৫ দিনের সমান, যা ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়; ১২-টি চন্দ্রমাস মিলে কেবল ৩৫৪ দিন গঠন করে।
খ্রিস্টান ও ইহুদিরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু এথেন্সের জ্যোতির্বিদ মেটন কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ -এ আবিষ্কৃত একটি পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা এটার একটা সুরাহা করেছিল। তিনি ১৯ বছরের একটি মেটনীয় চক্র উদ্ভাবন করেছিলেন। এটা ১২ চন্দ্রমাসের ১২ বছর এবং ১৩ চন্দ্রমাসের ৭ বছর দিয়ে গঠিত ছিল। ঋতুর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বর্ষপঞ্জিতে পর্যায়ক্রমে ১৩-তম মাস যুক্ত করা হতো।
মুসলিমরাও এ চক্রের অনুসরণ করতো, কিন্তু বিবেকবর্জিত (ইসলাম পূর্ব) কিছু শাসক নিজেদের সুবিধা মতো এতে ১৩-তম মাসের সংযোগ ঘটিয়ে বিষয়টি জটিল বানায়। তাই ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০ বছর শাসনকার্য চালানো ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনে খাত্তাব হিজরী বর্ষপঞ্জির সূচনা ঘটান, যা ইসলামী দেশগুলোতে আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই বর্ষপঞ্জি কঠোরভাবে চাঁদের আবর্তন চক্র মেনে চলে। সৌর বছর থেকে চন্দ্র বছর ১১ দিন কম; তাই রমযানের মতো পবিত্র মাস সারা ঋতু জুড়েই দুনিয়ার সর্বত্র আবর্তিত হয়। তাই প্রতিটি রমযান আগের রমযানের চেয়ে ১১ দিন আগে শুরু হয় এবং প্রতি ৩৩ সৌর বছরে রমযান মাস আবার ঠিক একই তারিখে ফিরে যায়।
নবচন্দ্র দর্শনের মাধ্যমে রমযান এবং অন্যান্য ইসলামী মাস শুরু হয়, তাই রমযান ঠিক কবে নাগাদ আরম্ভ হবে, রাতের আকাশে নবচন্দ্রের আগমনের আগ পর্যন্ত তা কেউই নিশ্চিতভাবে অবগত থাকে না।
ঠিক কখন নবচন্দ্র দৃশ্যমান হবে, তা আগাম বলে দেয়াটা মুসলিম গণিতজ্ঞ জ্যোতির্বিদদের সামনে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। নতুন চাঁদ উদয়ের পর থেকে চাঁদের চলাচল নিয়ে টলেমির তত্ত্ব বেশ নির্ভুল হলেও এই পর্যবেক্ষণ কেবল গ্রহণের অংশ হিসেবে চন্দ্রপথ বা চাঁদের সাপেক্ষে সূর্যের গমনপথের উপর নিবদ্ধ ছিল।
মুসলিমরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়ে যে, নবচন্দ্র দর্শনের আগাম সংবাদ দিতে গেলে, দিগন্তের সাপেক্ষে চাঁদের চলাচল নিয়ে গবেষণা আবশ্যক। এ সমস্যা সমাধানে বেশ জটিল প্রকৃতির গোলীয় জ্যামিতির প্রয়োজনীয়তা তখন ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
চাঁদের বিভিন্ন দশা মুসলিম বর্ষপঞ্জি বা হিজরী বর্ষপঞ্জি গঠনে ব্যবহৃত হয়।
বাগদাদে কর্মরত আল-কিন্দী ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যার হাতে গোলীয় জ্যামিতির বিকাশ ঘটেছিল এবং তিনি তার জ্যোতিষশাস্ত্রীয় কাজে এগুলোর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে কিবলা নির্ধারণ এবং কোন দিকে মসজিদের মুখ থাকবে, তা নির্ণয়েও গোলীয় জ্যামিতির অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সঠিকভাবে কিবলা ঠিক করার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন যুগের অতুলনীয় প্রতিভা আল-বিরুনী। বলতে গেলে আল-বিরুনী যেন আক্ষরিকভাবে সবকিছুতেই আগ্রহী ছিলেন এবং কখনো কখনো তাকে আখ্যায়িত করা হয়: তার যুগের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি হিসেবে। বর্তমান উজবেকিস্তানের 'কাছ' নগরে অবস্থানকালে
আল-কার্যবিনীর লেখা "আজায়িব আল-মাখলুকাত” (বিস্ময়কর সৃষ্টিকুল) শীর্ষক গ্রন্থের ১৬শ শতাব্দির শুরুর দিকের ফারসি অনুবাদ থেকে নেয়া একটি ডায়াগ্রাম।
তিনি ২৪শে মে, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ঘটা চন্দ্রগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বাগদাদেও এটা দেখা গিয়েছিল এবং এ বিষয়ে তিনি তার সহকর্মী জ্যোতির্বিদ আবুল ওফা আল-বুযানীর সাথে তথ্যের আদান-প্রদান করেন। চন্দ্রগ্রহণ সংগঠনের সময় হিসেবে করে তারা দুটো শহরের দ্রাঘিমারেখার পার্থক্য নিরূপণে সমর্থ হয়েছিলেন।
চাঁদ পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত তথ্যাদি লিখে রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এখনকার ন্যায় তখনও চাঁদ ছিল আকর্ষণ ও মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার অন্যতম উৎস। চাঁদের এ দশা এটা প্রতিষ্ঠিত করে যে, আসমানেও সুবিন্যস্ত একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। এসব পর্যবেক্ষণ হিজরী বর্ষপঞ্জির কাঠামো নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় যাবৎ।

চাঁদের তারতম্য
কায়রোর এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে চাঁদের গতির তৃতীয় অসমতা বা চাঁদের তারতম্য নামে বিষয়টি আবিষ্কার করেন। টলেমি প্রথম ও দ্বিতীয় অসমতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্যের আবিষ্কারক হলেন: আবুল ওফা আল-বুযানী।
নতুন চাঁদের উদয়কাল বা পূর্ণিমার সময় চাঁদ দ্রুত চলে এবং চন্দ্রমাসের প্রথম ও তৃতীয়-চতুর্থাংশে ধীর গতিতে চলে – চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্য ছয় শতাব্দি পরে ইউরোপে ট্যুকো ব্রাহে কর্তৃক ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 চাঁদের কলঙ্ক

📄 চাঁদের কলঙ্ক


খালি চোখে চাঁদের দিকে তাকালে আমরা এটাকে কালো ও হালকা দাগসহ অসম উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত হতে দেখি। চাঁদের এই বৈশিষ্ট্য চাঁদের কলঙ্ক বা দাগ (lunar formations) নামে পরিচিত।
১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে ইয়োহান ব্যাপটিস্টা রিকিউলি নামের এক ইতালীয় জ্যোতিষ ও দর্শনশাস্ত্রীয় অধ্যাপক চাঁদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সম্বলিত Almagestum Novum নামে একটি জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ওই গ্রন্থে তিনি মধ্যযুগের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদদের নামে চাঁদের কলঙ্কের নাম রেখেছিলেন, যেখানে দশজন মুসলিম জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞের নাম ছিল।
AD MAGNANIMUM PRINCIPEM HONORATVM II MONOFCI PRINCIPEM DUCEM VALENTINUM PAREM FRANCIA SOUVEN SA
ALMAGESTI NOVI PARS POSTERIOR TOMI PRIMI
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সংঘ (International Astronomical Union) কর্তৃক আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ নামগুলোর ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছানো হয়। ৬৭২-টি চাঁদের কলঙ্কের ১৩-টির নামকরণ করা হয় মুসলিম জ্যোতির্বিদদের নামে এবং এরপর থেকে আরও বহু নাম এতে সংযুক্ত হয়েছে। এসব নামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
■ Messala - চাঁদের ১৩-তম বিভাগের সমভূমি, যা ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী মাশাআল্লাহের নামে নামকৃত। মিশরীয় এই ইহুদি ব্যক্তি আব্বাসী খলীফা আল-মানসূরের আমলে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন। ১৬শ শতাব্দিতে De Scientia Matus Orbis এবং De compositione et utilitate astrolabii শিরোনামে তার দুটো গ্রন্থ লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়।
■ Almanon - চাঁদের নবম বিভাগের একটি আগ্নেয় জ্বালামুখ, আলিফ লায়লা (আরব্য রজনী) খ্যাত খলীফা হারুন উর-রশিদের পুত্র আল-মামুনের নামে এটার নাম রাখা হয়। ৮২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে তিনি প্রথম মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার বায়তুল হিকমা মুখরিত ছিল তার যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের পদচারণায়।
■ Alfraganus - চাঁদের দ্বিতীয় বিভাগে অবস্থিত আগ্নেয় জ্বালামুখ, ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-ফারগানীর নামে এটা নামকৃত। আল-মামুনের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গবেষণা দলের একজন তিনি। "জাওয়ামি ইলম আন-নুজুম ওয়াল হারাকাতিস সামাইয়্যা" (সৌরগতি এবং নক্ষত্রবিজ্ঞানের বিশ্বকোষ) তার বিখ্যাত গ্রন্থ, যা ইতালীয় কবি দান্তের উপর সরাসরি প্রভাব রেখেছিল।
■ Albategnius – চাঁদের প্রথম বিভাগের সমভূমি, যা ৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-বাত্তানীর নামে নামকৃত। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু পরিমাপ তিনি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন।
■ Thabit - চাঁদের অষ্টম বিভাগের বড় একটি সমভূমি, ৯০১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ছাবিত ইবনে কুরার নামে এটার নাম রাখা হয়। গ্রিক ও সিরীয় ভাষার রচিত বিজ্ঞান বিষয়ক বহু রচনার আরবী অনুবাদক এই ছাবিত। বিশুদ্ধ গণিতে তার বড় ধরনের অবদান ছিল।
■ Azophi - চাঁদের নবম বিভাগের পর্বত-সদৃশ্য বৃত্ত, যা ১০ম শতাব্দির আব্দুর রহমান আস-সূফীর নামে নামকৃত। মধ্যযুগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবহারিক জ্যোতির্বিদ। তার লেখা "সুয়ারুল কাওয়াকিব আছ-ছামানিয়া ওয়াল আলবায়িন" (স্থির তারকা) শীর্ষক গ্রন্থটি নাক্ষত্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠকীর্তি।
■ Alhazen - চাঁদের দ্বাদশ বিভাগের বৃত্তাকার সমভূমি, যা আবু আলী আল-হাসান ইবনুল হাইছামের নামে নামকৃত, ইবনুল হাইছাম হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। ৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে বসরায় জন্ম নেয়া এ মনীষীর কর্ম জীবনের অধিকাংশ সময় মিশরেই কাটে এবং ১০৩৯ খ্রিস্টাব্দে এখানেই তার জীবনাবসান ঘটে। তার একশ'র অধিক গ্রন্থের মাঝে আজ কেবল ৫৫-টি টিকে আছে, যার সবগুলোই গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞান নিয়ে লেখা। তিনি ছিলেন আলোকবিজ্ঞানের প্রধান অনুসন্ধানী পথিকৃৎ এবং তার লেখা "কিতাব আল-মানাযির" ইউরোপীয় বিজ্ঞানের উপর অপরিসীম প্রভাব রেখেছিল।
■ Arzachel - চাঁদের অষ্টম বিভাগের সমভূমি, যা ১১০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আয-যারকালীর নামে নামকৃত। আন্দালুসে তিনি মুসলিম ও ইহুদি জ্যোতির্বিদদের সাথে মিলে প্রস্তুত করেছিলেন বিখ্যাত টলেডীয় ছক। তার কাজ খুব সম্ভবত কপার্নিকাসের উপর প্রভাব রেখেছিল।
■ Geber - চাঁদের নবম বিভাগের বৃত্তাকার, মসৃণ সমভূমি, যা ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী জাবির ইবনে আফলাহের নামে নামকৃত। স্পেনীয় এ আরব মহাকাশীয় বস্তুসমূহের স্থানাংক নির্ণয়ে প্রথম বহনযোগ্য মহাকাশীয় গোলক প্রস্তুত করেছিরেন, যা টরকুয়েটাম নামে পরিচিত।
■ Nasireddin - ৩০ মাইল ব্যাসের আগ্নেয় জ্বালামুখ, যা ১২০১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী নাসিরউদ্দীন আত-তুসীর নামে নামকৃত। ১২৫৬ থেকে ১২৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পারস্যের ইলখানাত সাম্রাজ্যের শাসক হালাকু খানের একজন মন্ত্রী ছিলেন। হালাকু খান কর্তৃক মারাগাতে প্রতিষ্ঠিত মানমন্দিরের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয় এবং সেখানে ইলখানত ছক প্রস্তুতের পাশাপাশি তিনি কিছু স্থির নক্ষত্র নথিভুক্ত করেছিলেন। এগুলো চীন থেকে পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত কয়েক শতাব্দি যাবৎ ব্যবহৃত হয়।
■ Alpetragius - চাঁদের অষ্টম বিভাগের একটি আগ্নেয় জ্বালামুখ, মরক্কোতে জন্ম নেয়া নূরুদ্দীন ইবনে ইসহাক আল-বিতরুযির নামে এটার নাম রাখা হয়। মরক্কোতে জন্ম হলেও সেভিল নিবাসী আল-বিতরুযি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। টলেমির গ্রহমণ্ডলীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে তিনি কঠোর শ্রম দিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে আল-বিতরুযির লেখা "কিতাবুল হিয়াতু" লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে ১৩শ শতাব্দির ইউরোপে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
■ Abulfeda - চাঁদের নবম বিভাগের বৃত্তকার সমভূমি, ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় জন্ম নেয়া আবুল ফিদার নামে নামকৃত। খলীফা আল-মামুনের প্রতিষ্ঠিত ধারায় দীক্ষিত তিনিই ছিলেন সর্বশেষ ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ। ইতিহাসবেত্তা হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি কুড়ানো এ মনীষীর সর্বাধিক বিখ্যাত কর্ম: "তাকয়ীমুল বুলদান" (দেশসমূহের সমীক্ষা)।
■ Ulugh Beigh - ডিম্বাকৃতি বিশিষ্ট চাঁদের ১৮-তম বিভাগের এ অংশের নাম ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া উলুগ বেগের নামে রাখা হয়। ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুবিশাল মানমন্দির, যা ছিল অত্যন্ত উন্নত ও নির্ভুল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রে সজ্জিত। তারকারাজির নতুন তালিকা প্রণয়ন তার সর্বাধিক প্রশংসনীয় ও চিরস্মরণীয় কাজ।
আজ রাতে যখনই চাঁদের দিকে তাকাবেন, তখন চাঁদের বিভিন্ন আগ্নেয় জ্বালামুখ, ডিম্বাকৃতি অংশ এবং সমভূমিতে যেসব ব্যক্তি অমর হয়ে আছেন, তাদের স্মরণ করবেন। এই ব্যক্তিরাই আমাদের জীবনে উপহার দিয়েছেন জ্ঞান ও আলোর এক বিরাট অংশ।

নিচে: প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের নামে নামকৃত চাঁদের কলঙ্কের একটি মানচিত্র।
পূর্বের পৃষ্ঠার শীর্ষে: চাঁদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সম্বলিত Almagestum Novum গ্রন্থটি। বিশেষ খ্রিস্টীয় ধর্মীয় সংঘ জেসুইটের সদস্য ইতালীয় পণ্ডিত ইয়োহান ব্যাপটিস্টা রিকিউলি ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে এটা সংকলন করেছিলেন।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 নক্ষত্রপুঞ্জ

📄 নক্ষত্রপুঞ্জ


মানমন্দিরের উত্থান এবং রাতের আকাশের প্রতি সীমাহীন আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ৯ম শতাব্দি থেকে মুসলিম জ্যোতির্বিদদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় রাতের আকাশ এবং একে একে তারা উপহার দিতে থাকে তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে নানা টেকসই কর্ম। ১০ম শতাব্দীর পারসীয় জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আস-সূফী ছিলেন সত্যিকার নক্ষত্র-পর্যবেক্ষক। ৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির বিবরণ দিতে গিয়ে এটাকে তিনি 'ছোট মেঘ' বলে আখ্যায়িত করেন।
এটাই ছিল আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি বহির্ভূত কোনো তারকা ব্যবস্থার প্রথম লিখিত নথি। প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জ ধরে ধরে তিনি তার ফলাফল লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। তারকারাজির বিবরণ, আকার, রঙ এবং প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জের জন্য তিনি দুটো অঙ্কিত চিত্র প্রদান করতেন, যার একটি: মহাকাশীয় গোলকের বহির্ভাগ থেকে এবং অপরটি: অভ্যন্তর থেকে। তিনি আন্তর্লাব নিয়েও লিখেছেন এবং এটার হাজারো ব্যবহারের ফিরিস্তি দিয়েছে।
তার এই কঠোর শ্রমের ফলে বহু তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জের বিবরণ সংরক্ষিত হয়, যেগুলো আজও তাদের আরবী নামেই পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতির্বিদগণ প্রায় ১০২২-টি তারকার নাম ও তাদের তুলনামূলক উজ্জ্বলতা নির্ধারণ করেছেন। বর্তমানে ১৬৫-টিরও বেশি তারকার নামে আরবী চিহ্ন স্পষ্টত দৃশ্যমান, যেমন: 'Aldebaran (الديران)' যার অর্থ: সুরিয়া তারকার 'অনুগামী' এবং 'Altair (نسر طائر)' শব্দের অর্থ: 'উড়ন্ত ঈগল'।
মুসলিমগণ তারকা মানচিত্র এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছকও প্রস্তুত করেছিল, যেগুলো কয়েক শতাব্দি ধরে ইউরোপ ও দূর-প্রাচ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহত হয়। মহাজগতের মানচিত্র বিভিন্ন শৈল্পিক কাজেও দেখা যেত, যেমন: ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত জর্ডানের কুসাইর আমরায় অবস্থিত হাম্মামখানা বা স্নানাগারের গম্বুজে বিশাল অর্ধমণ্ডলীয় মহাকাশীয় মানচিত্র আঁকা ছিল। এই দেয়ালচিত্রের টিকে থাকা খণ্ডিত অংশে ৩৭-টি নক্ষত্রপুঞ্জ ও ৪০০-টি তারকা দৃশ্যমান।
উপরে: ড্রাগন নক্ষত্রপুঞ্জ বা আরবীতে আত-তানীন।
নিচে থেকে বামে: সিফিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জ (Constellation Cepheus) বা আরবীতে কিফাউ'স।
নিচে থেকে ডানে: মুস্তাফা ইবনে আবদুল্লাহ কর্তৃক তুর্কি ভাষায় রচিত মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্য বিষয়ক ম্যানুয়েল।
আরবীতে আছ-ছুরিয়া নামে পরিচিত প্লাইয়েডস (Pleiades) নক্ষত্রমালা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00