📄 আস্তর্লাব
ইসলামের সূচনা থেকেই দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জন্য মুয়াযযিন আযান দিতো। সালাতের এই সময়গুলো দিন ও রাতের পরিবর্তনের আলোকে নির্ধারিত হতো, তাই এগুলোর সঠিক সময় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির আগমনের বহু পূর্বে এ কাজে সহায়তার জন্য মুসলিমরা আন্তর্লাব নামের এক নিখুঁত ও অসাধারণ যন্ত্রের সমৃদ্ধি সাধনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।
মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিদ (astrophysicist) ড. হারওল্ড উইলিয়ামস আন্তর্লাবের বিবরণ দিয়ে বলেন, "ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবনের পূর্ব পর্যন্ত আন্তর্লাব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা যন্ত্র এবং টেলিস্কোপের উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত আঙ্গুলাব ছিল সবচেয়ে মূল্যবান জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।”
আঙুর্লাবের আদি উৎস অজানা। তবে আলেকজান্দ্রিয়ার থিওন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দিতে আন্তর্লাব নিয়ে লিখেছিলেন এবং এ বিষয়ে টিকে থাকা সর্বাধিক প্রাচীন গ্রিক নথি ষষ্ঠ শতাব্দির। ইংরেজি astrolabe শব্দটি আরবী আঙ্গুলাব থেকে উৎসারিত এবং বলা হয়, এটা গ্রিক শব্দের আরবী প্রতিবর্ণায়ন। এর আদি উৎস যাইহোক না কেন, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সূচি নির্ধারণ এবং মক্কার অবস্থান নির্ণয়ের মতো অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর তাকিদে মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ এই যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি এটার ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করেছিল। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি ইসলামী বিশ্বে আঙুলাব বেশ জনপ্রিয় ছিল।
আন্তর্লাব নিয়ে নতুন নতুন প্রবন্ধ রচনার রেওয়াজ চালু হয় এবং ৯ম শতাব্দির শুরুর দিকে মাশাআল্লাহ আলী ইবনে ঈসা এবং আল-খাওয়ারিযমী এ ব্যাপারে প্রথম কলম ধরার খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এ পর্যন্ত টিকে থাকা এ যন্ত্রের ইসলামী সংস্করণের সময়কাল ১০ম শতাব্দির মাঝামাঝি, যা আলী ইবনে ঈসা নামের এক বাগদাদ নিবাসী শিক্ষানবিশের তৈরি। অষ্টম শতাব্দি থেকে স্পেনে মুসলিম উপস্থিতির সুবাদে আন্তর্লাবসহ ইসলামী জ্ঞানধারা পশ্চিমা ইউরোপে এমনভাবে প্রবেশ করেছিল যে, এ যন্ত্রের টিকে থাকা খ্রিস্টান বা পশ্চিমা সংস্করণ খুঁজতে গেলে আমাদেরকে ১৩শ শতাব্দির পর থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়।
যন্ত্রটির বেশ কিছু ধরনেরও বিকাশ ঘটেছিল, যেগুলোর মধ্যে Planisphere (মেরু অভিক্ষেপ-বিশিষ্ট) আন্তর্লাব সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল, যেটাতে বিষুবরেখা পৃষ্ঠে মহাকাশীয় গোলককে প্রক্ষিপ্ত করা হতো।
আন্তর্লাব মূলত আসমানের দ্বিমাত্রিক মডেল, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানের আকাশ কেমন দেখাবে, তা নিরূপণ করে। আন্তর্লাবের পৃষ্ঠতলে আসমান এঁকে এবং সহজে খুঁজে পাবার জন্য সেটাকে চিহ্নিত করে এ কাজ সম্পন্ন করা হতো। কিছু আঙ্গুলাব ছিল ছোট, কিছু ছিল হাতের তালুর সমান এবং বহনযোগ্য; আবার কিছু ছিল কয়েক মিটার ব্যাসের বিশাল এক যন্ত্র।
"ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবনের পূর্ব পর্যন্ত আন্তর্লাব ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা যন্ত্র এবং টেলিস্কোপের উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত এটা ছিল সবচেয়ে মূল্যবান জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।” – মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. হারওল্ড উইলিয়ামস
চন্দ্র ও সূর্যের ন্যায় মহাকাশীয় বস্তুগুলোর অবস্থান সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধান এবং সময় নির্ণয়ে পারদর্শী এসব আন্তর্লাব ছিল সে আমলের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনাযন্ত্র ও এনালগ কম্পিউটার। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো ছিল মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদদের পকেট ঘড়ি। দিগন্তরেখার উপরে সূর্যের কৌণিক দূরত্বের পরিমাপ, দিনে বা রাতে সময় বলে দেয়া, এমনকি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো মহাকাশীয় ঘটনাগুলোর সময় নির্ণয় কিংবা যেকোন তারার শীর্ষবিন্দু নির্ণয়ে এগুলো বেশ কার্যকর ছিল। সুনিপুণ কর্মদক্ষতার ছোঁয়ায় বানানো ছকগুলো আঙুর্লাবের বিপরীত পার্শ্বে ছাপানো থাকতো, যার সাহায্যে এতসব গণনার কাজ সম্পাদন করা হতো।
এসব ছকে অন্তর্ভুক্ত থাকতো—সময় পরিবর্তনের বক্রতা, যেকোন মাসের দিনকে গ্রহণরেখায় সূর্যের অবস্থানের সাপেক্ষে রূপান্তর করে—এমন বর্ষপঞ্জি, ত্রিকোণমিতিক স্কেল এবং ৩৬০ ডিগ্রির ক্রমবিন্যাস বিষয়ক তথ্যাদি।
গোলাকার মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আছে পৃথিবী এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সময়ে থেকে একজন কাল্পনিক পর্যবেক্ষক এই গোলাকার মহাবিশ্ব মডেলের দিকে তাকিয়ে আছেন, এমনটি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্লাব বানানো হতো। আকাশের প্রধান তারকাসমূহকে একটি ধাতব থালায় বিদ্ধ করা হতো, যেন তা সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর এই থালাকে ‘মাতির’ নামে পরিচিত একটি বৃহৎ সমতল ও বৃত্তাকার ধারকে রাখা হয়। থালায় তারকাগুলো বিদ্ধ থাকায় জ্যোতির্বিদগণ এর নিচে থাকা আরেকটি ধাতব থালা অনায়াসে দেখতে পেতেন। নিচে থাকা অপর ধাতব থালায় নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণায়ক রেখা আঁকা থাকতো। একটি আন্তর্লাবে একাধিক ধাতব থালা অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেন জ্যোতির্বিদ এক অক্ষাংশ থেকে আরেক অক্ষাংশে সহজে যেতে পারেন। দিগন্তরেখার উপরে কোনো তারকা বা সূর্যের কৌণিক দূরত্বের পরিমাপে থালার পিছনে থাকা দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র ব্যবহারের পর জ্যোতির্বিদ থালায় বিদ্ধ ‘তারকা-মানচিত্র’ নিজের অবস্থান অনুযায়ী ঘোরাতেন এবং এভাবে তিনি সময় হিসেব করে ফেলেন। বস্তুত, এটা দিয়ে সব ধরনের হিসাব-নিকাশই সম্ভব। মহাকাশীয় বস্তুর স্থানাংক আরও নিখুঁতভাবে নির্ণয়ে প্রয়োজন বিস্তারিত জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছকের এবং এ কাজে আন্তর্লাবের সাথে আরও প্রয়োজন বৃহদাকার কোয়াড্র্যান্ট ও পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলকের ন্যায় অন্যান্য যন্ত্রের।
আন্তর্লাবের দুটো স্থির ও আবর্তনশীল অংশ ছিল। রিতি (থালায় বিদ্ধ তারকা মানচিত্র)-কে ধারণকারী ‘মাতির’ মূলত ফাঁপা চাকতি এবং আবর্তনশীল থালাগুলো একে অপরের উপরে স্থাপন করা হয়। মাতিরের উল্টো পাশে থাকে
মুহাম্মদ যাকারিয়া কর্তৃক বানানো এমন একটি কার্যক্ষম আন্তর্লাব বানাতে প্রয়োজন বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডারের। প্রাচীন পদ্ধতি অবলম্বন করে এমন একটি আন্তর্লাব বানাতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে; নির্ভুল কাজ করে এমন আন্তর্লাব বানাতে প্রয়োজন: বিস্তৃত পরিসরের জ্যামিতিক হিসেব এবং নিখুঁত খোদাইকার্য।
অ্যালিড্যাড (দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র) এবং বিভিন্ন ত্রিকোণমিতিক ছক। এ হিসেবে, আঙ্গুলাবকে এক ধরনের চিত্রময় বা গ্রাফিক কম্পিউটার বলা যায়।
ইসলামী নির্মাতাগণ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্লাবের প্রস্তুতে অবদান রেখেছিলেন, যেমন: গোলীয় আন্তর্লাব এবং রৈখিক আঙ্গুলাব, কিন্তু এগুলোর কোনটাই বিস্তৃতভাবে প্রচলিত হয়নি। নাবিক আন্তর্লাব (Mariner's astrolabe) ১৫শ শতাব্দির শেষার্ধে এবং ১৬শ শতাব্দির দিকে পর্তুগিজ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
১১শ শতাব্দিতে টলেডোতে নির্মিত হয় অত্যাধুনিক ও জটিল কলাকৌশলে সমৃদ্ধ বৈশ্বিক আস্তর্ণাব, যা তারকামণ্ডলীর মানচিত্রায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। ঔষধবিক্রেতা বা ভেষজজীবী আলী ইবনে খালাফ আল-শাক্কায় এবং জ্যোতির্বিদ আয-যারকালী ছিলেন এই নয়া পরিবর্তনের দু'জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আন্তর্লাবের ইতিহাসে বৈশ্বিক আন্তর্লাব নবযুগের সূচনা ঘটিয়েছিল, যেহেতু যেকোন অবস্থানে এটা কার্যক্ষম। নির্দিষ্ট স্থানের ভিত্তিতে নকশাকৃত অক্ষাংশ নির্ভর সাধারণ আন্তর্লাবে স্থান পরিবর্তনে ভিন্ন অক্ষাংশের থালা ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে।
"আঙুর্লাব বিষয়ক প্রবন্ধ" Canterbury Tales-এর রচয়িতা চসার তার ১০ বছরের পুত্র লুইসের জন্য ১৩৮৭ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্লাব নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি যা বলেছেন, তার খানিকটা এখানে তুলে ধরা হলো:
"ছোট্ট লুইস, পুত্র আমার, আমি তোমার উদ্বিগ্নতা এবং আন্তর্লাব সম্পর্কে জানার বিশেষ অনুরোধ আমলে নিয়েছি ... আর তাই আমি তোমাকে আমাদের দিগন্তের জন্য কার্যকর একটি আঙুলাব দিচ্ছি, যা অক্সফোর্ডের অক্ষাংশের জন্য বানানো। এই ছোট প্রবন্ধে আমি তোমাকে এ জাতীয় যন্ত্রের কিছু সিদ্ধান্ত শিক্ষা দেবো। আমি কিছু সিদ্ধান্তের কথা বলছি - তিনটি কারণে। প্রথমটি হচ্ছে: বিস্ময়কর এই যন্ত্র আঙ্গুলাব নিয়ে এ পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে বা পাওয়া যাবে, তার কিছুই এই অঞ্চলের লোকেরা পূর্ণাঙ্গভাবে জানে না, যেমনটি আমি মনে করি।"
বৈশ্বিক আন্তর্লাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: এটার Stereographic projection (সমতল পৃষ্ঠে গোলকের অভিক্ষেপণ) বাসন্তী কিংবা শারদীয় বিষুবকে অয়নতলে অভিক্ষেপণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জুলিও সামসো বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe-এ রাগেহ উমরের সাথে আলোচনাকালে বলেন যে, মুসলিমগণ নতুন ধরনের বিভিন্ন গণনা যন্ত্র ব্যবহার করতো এবং "তাদের নকশাকৃত বৈশ্বিক আঙ্গুর্লাবের এমনকিছু প্রয়োগ ছিল, যা সাধারণ আন্তর্ণাব দিয়ে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল।"
আন্তর্লাব নিয়ে যেকোন আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি তাতে তরুণ নারী প্রকৌশলী এবং জ্যোতির্বিদ মারইয়াম আল-ই'জলিয়া আল-আঙুলাবীর উল্লেখ না থাকে। ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার আলেপ্পোতে জন্ম নেয়া এ মহিয়সী নারী জ্যোতির্বিদ ও যন্ত্র নির্মাতাদের পরিবারেই বেড়ে উঠেন। আন্তর্লাব নির্মাণে অত্যন্ত পারদর্শী মারইয়াম শাসক সাইফুদৌলার পৃষ্ঠপোষকতায় বিখ্যাত আলেপ্পো দুর্গে কর্মরত ছিলেন। ৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বেশ অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই নারী প্রতিভা।
আন্তর্লাব বিশেষভাবে বৈশ্বিক আঙ্গুলাবের বিকাশ ও বহুল ব্যবহার ছিল তৎকালের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম নিদর্শন, যা আসমান নিয়ে বিমোহিত এবং সেটার রহস্য উন্মোচনে নিদারুণ আগ্রহী মুসলিম জ্যোতির্বিদদের সৃজনশীলতা ও উদ্যমের ফসল। নিদারুণ পরিশ্রমী এসব জ্যোতির্বিদদের কল্যাণেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর ইউরোপে আন্তর্লাবের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
মুহাম্মদ যাকারিয়া কর্তৃক নির্মিত আস্তর্লাবের দুটো নিকটদৃশ্য।
এটার জটিল নির্মাণশৈলী তুলে ধরেছে।
আগুলাব জাদুর কলকজা
সময় ও মহাকাশকে হাতের তালুতে এনে দেয়া বিস্ময় জাগানিয়া এক যন্ত্র
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: ১৭শ শতাব্দিতে সেক্সট্যান্টের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত আঙুর্লাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ডিভাইস (যন্ত্র)
অবস্থান: বাগদাদ, ইরাক
তারিখ: ১৩শ শতাব্দির শেষার্ধ
নির্মাতা: ইবনে শাওখা আল-বাগদাদী
আলো জ্বলজ্বল পিতলে তৈরি এবং তাতে তারকার নাম খোদাই করে বসানো আন্তর্লাব দেখলেই মনে হতো এটা কোনো জাদুকরের জাদুর চাকতি। বস্তুত এটা একভাবে জাদুর চাকতির মতোই। ঘড়ি ও হাতঘড়ির ব্যাপক প্রচলনের বহু পূর্বেই মুসলিম প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিদগণ আন্তর্লাব নির্মাণ করেছিলেন, যার সুবাদে সময় ও মহাকাশ একত্র হয়েছিল হাতের তালুতে রাখা যায় এমন যন্ত্রে।
আলেকজান্দ্রিয়ার থিওন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দিতে আঙুর্লাব নিয়ে লিখেছিলেন এবং এ বিষয়ে প্রাচীন গ্রিকদের লেখাও রয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সূচি নির্ধারণ এবং মক্কার অবস্থান নির্ণয়ের মতো অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর তাকিদ মুসলিম সভ্যতাকে আরও কার্যক্ষম ও অত্যাধুনিক যন্ত্র নির্মাণে বাধ্য করেছিল। মুসলিম বিশ্বে এ পর্যন্ত টিকে থাকা আঙুর্লাবের সময়কাল ১০ম শতাব্দি এবং তা নির্মাণস্থল বাগদাদ।
দিন ও রাতের সময় বলে দেয়া, জমিনে চলতে সহায়তার পাশাপাশি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নিরূপণে আন্তর্লাবের জুড়ি মেলা ভার।
গুরুত্বপূর্ণ তারকাগুলোকে ধাতব থালায় বিদ্ধ করে বসানো, এরপর যেকোন তারকা বা সূর্যের কোণ নির্ণায়ক দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত এবং নির্ভুল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় হিসাবের জন্য তথ্য ছক থাকা সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্লাব ছিল কম্পিউটারের শতাব্দিকাল পূর্বের অত্যাধুনিক গণনা যন্ত্র। ১০ম শতাব্দির জ্যোতির্বিদ আস-সূফীর মতে, জ্যোতির্বিদ্যা, নৌচালন এবং জরিপ কাজসহ হাজারো কাজ আন্তর্লাব দিয়ে করা সম্ভব।
আন্তর্লাবের আগের সংস্করণ তথা সাধারণ আঙুর্লাবে পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানের অক্ষাংশ জানা আবশ্যক, কিন্তু ১১শ শতাব্দির পণ্ডিত আয-যারকালী এ সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবন করেছিলেন বৈশ্বিক আন্তর্লাবের। আরবী 'সাফিহা' (থালা) থেকে এটা পরিচিত হয়ে উঠে saphea arzachelis হিসেবে এবং এটা পৃথিবীর যেকোন স্থান থেকেই কার্যক্ষম ছিল।
বৈশ্বিক আন্তর্লাব ১৭শ শতাব্দিতে সেক্সট্যান্ট উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত নৌচালনার জন্য অপরিহার্য একটি উপকরণ ছিল। যান্ত্রিক ঘড়ি এবং জটিল গাণিতিক কৌশল আন্তর্লাবের জায়গা দখল করে নিলেও জ্যোতির্বিদদের জন্য সাধারণ আন্তর্লাব আজও বানানো হয়।
ইবনে শাওখা আল-বাগদাদী ১৩শ শতাব্দিতে এই আন্তর্লাব নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিটি আন্তর্লাবে অদলবদলযোগ্য একাধিক থালা থাকে। থালাগুলো মাঝে অবস্থান করে, যা মাতির নামে পরিচিত। ভিন্ন ভিন্ন থালা ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে সম্পৃক্ত।
আস্তর্লাভে খোদাই করা তথ্য- ছক আপনাকে বিভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, রাত্রিকালীন সময় বের করতে আপনাকে যেকোন একটি তারকা বরাবর আস্তর্লাভের পিঠে একটি রেখা টানতে হবে এবং এতে করে দিগন্তরেখার উপরে সে তারকার কৌণিক দূরত্ব বের হবে। এরপর রিতিকে ঘোরাতে থাকবেন যতক্ষণ না তারকা নির্দেশক-টি সঠিক কৌণিক দূরত্ব রেখা বরাবর থালায় বসছে। এবার আপনি সময় জেনে নিতে পারেন।
বায়ে, উপরে এবং ডানে: প্রতিটি থালায় খোদাই করা রেখাগুলো মাথার উপরে থাকা আকাশ গোলকের অভিক্ষেপণ। প্রতিটি থালাতে খুব সীমিত অক্ষাংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ অবস্থান)।
কেন্দ্রে: কয়েকটি থালাকে ধারণ করতে সক্ষম আস্তর্লাভের ফাঁপা চাকতি, যা মাতির নামে পরিচিত।
নিচে: রিতিতে রয়েছে- আকাশ জুড়ে সূর্যের গমনপথ নির্ণায়ক চক্র এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র নির্দেশক। ছোরা বা খঞ্জর আকৃতির নির্দেশক ছিল প্রথম দিককার ইসলামী আস্তর্লাভের বৈশিষ্ট্য।
📄 আর্মিলারি গোলক
মহাকাশীয় বস্তুসমূহের আবর্তনের পূর্বাভাষ দেয়াকে সহজতর করার লক্ষ্যে বহু উন্নত সভ্যতা আমাদের দেখা আকাশের বিভিন্ন মডেল প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়েছে। কেন্দ্রে পৃথিবী এবং তারকারাজি এটাকে ঘিরে সাজিয়েছে বৃত্তাকার পরিমণ্ডল – এই ধারণার ভিত্তিতে এসব মডেল বানানো হতো। তেমনি একটি মডেল: আর্মিলারি গোলক।
আকাশ এবং গ্রহমণ্ডলীর আবর্তনের প্রতিরূপ আর্মিলারি গোলকে প্রদর্শন করে মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ সৃষ্টিতে প্রয়াস পেয়েছিলেন এবং তাদের এ প্রচেষ্টা আমাদের বর্তমান মডেলের বেশ নিকটতর ছিল। এগুলো কোনো কঠিন ভূ-গোলক ছিল না, বরং এককেন্দ্রিক বৃত্ত ছিল, যেখানে পৃথিবী কেন্দ্রে এবং বাদবাকি মহাকাশীয় বস্তুগুলো ছিল পৃথিবীকে ঘিরে।
আর্মিলারি গোলকের নির্মাণ এবং ব্যবহার ৮ম শতাব্দি থেকে বিস্তৃতি লাভ করে, যখন আল-ফারাজী কর্তৃক বাগদাদে এ নিয়ে প্রথম রচিত হয়: "আল-আমালু বিল-আঙ্গুলাবাত যাতিল হালকি" (গোলীয় অবয়ব সম্বলিত যন্ত্র) শীর্ষক প্রবন্ধ। কিন্তু ১০ম শতাব্দিতে এগুলো সমৃদ্ধির উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছে এবং তখন থেকে এগুলো দুটো প্রধান মডেলে প্রস্তুত হতে থাকে।
প্রথম ধরনের প্রদর্শনী আর্মিলারি গোলকগুলোতে পৃথিবী ছিল প্রধান এবং বেশ ছোট মডেলের এই ভূ-গোলককে ঘিরে থাকতো গ্রহণরেখা চক্র [পৃথিবীর চারপাশে সূর্যের পরিভ্রমণ পথ], বিষুবরেখা, ক্রান্তিরেখা ও মেরুবৃত্ত। একটি ক্রমবিভক্ত মাধ্যাহ্নিক চক্রে এগুলো স্থাপন করা হতো এবং বিষুবরেখা সংলগ্ন অক্ষ বরাবর গোলকটি ঘুরতো। এসব মডেলে চাঁদ, গ্রহ ও তারকারাজি অন্তর্ভূক্ত না থাকলেও এরা পৃথিবীর চারপাশে থাকা মহাকাশীয় বস্তুসমূহের আপেক্ষিক গতি প্রদর্শন করতো।
দ্বিতীয় ধরনের পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলক বেশ ভিন্নধর্মী ছিল, যেহেতু পৃথিবীকে কেন্দ্রে না রেখে দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র সেখানে রাখা হয়েছিল। এই গোলকগুলো বেশ বড় ছিল এবং স্থানাংকসহ অন্যান্য মান বের করতে এগুলো ব্যবহৃত হতো।
পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলক নিয়ে বহু মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী কলম ধরেছিলেন, যাদের মাঝে সেভিলের জাবির ইবনে আফলাহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১২শ শতাব্দীর মধ্যভাগের এই মনীষী পশ্চিমে জিবার নামে পরিচিত ছিলেন (রসায়বিদ জিবারের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না)।
আকাশ ও পৃথিবী অধ্যয়নে বিভিন্ন মানমন্দিরে আর্মিলারি গোলক ব্যবহৃত হতো, এদের মাঝে ১৩শ শতাব্দীর মারাগা মানমন্দির, ১৫শ শতাব্দীর সমরকন্দ মানমন্দির এবং ১৬শ শতাব্দীর ইস্তাম্বুল মানমন্দিরের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলে পুনর্মুদ্রিত “জিহানুমা” (বৈশ্বিক ভূগোল) গ্রন্থ থেকে নেয়া একটি খোদাইকর্মে চিত্রিত আর্মিলারি গোলক। মূল “জিহানুমা” গ্রন্থটি ১৭শ শতাব্দীর পণ্ডিত কাতিব চেলেবী (হাজী খলীফা) কর্তৃক রচিত।
১৬শ শতাব্দীর পাণ্ডুলিপিতে দেখা যাচ্ছে, আসমানের সমতল ছক তৈরির জন্য জ্যোতির্বিদগণ নির্দিষ্ট তারকার সাথে আর্মিলারি গোলকের বিভিন্ন অংশ সারিবদ্ধ করে সাজাচ্ছেন। তারকা ব্যবহার করে পথ চলতে এগুলো বেশ সহায়ক।
কেন্দ্রীয় দোলক বা পেন্ডুলাম দিয়ে সমতল পৃষ্ঠে তারকা ও গ্রহসমূহের বক্র পথ আঁকা হতো।
📄 জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন
বেশ অনুপ্রেরণামূলক ভঙ্গিতে কুরআন বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনার উল্লেখ করেছে এবং মানবজাতি যেন মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে এসব প্রাকৃতিক ঘটনার গভীরে প্রবেশ করে, সেদিকে আহ্বান জানিয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ,
২:১৬৪- "এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে, মানুষের জন্য উপকারী সামগ্রী বয়ে আনা সমুদ্রে চলা জাহাজে, ওই পানিতে যা আল্লাহ আসমান থেকে বর্ষণ করেন, আর তা দিয়ে মৃত জমিনকে তিনি আবার নয়া জীবন দেন এবং তাতে ছড়িয়ে দেন সব ধরনের জীবজন্তু; বাতাসের প্রবাহে, আসমান ও জমিনের মধ্যস্থ হুকুমের অনুগত মেঘে - বস্তুত আকল বা চিন্তার মাধ্যমে কাজ করা লোকদের জন্য এসবে রয়েছে বহু নিদর্শন।"
কুরআনে জ্যোতির্মণ্ডলীয় ঘটনাসমূহ বারবার উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং সময় গণনা ও নৌচালন প্রসঙ্গে এই ঘটনাগুলো জুড়ে দেয়া হয়েছে। কুরআন নিখুঁত অক্ষ ও গতিপথ নিয়ে কথা বলেছে এবং এসব প্রাকৃতিক ঘটনার পিছনে থাকা সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের পাশাপাশি এসব নিয়ে চিন্তা করতে মানুষদের উৎসাহিত করেছে। এখানে কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো:
৬:৯৭- "তিনিই সে জন, যিনি তোমাদের জন্য তারকা বানিয়েছেন, যেন তোমরা স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ চলতে পারো। যারা জানতে চায়, আমরা তাদের জন্য আমাদের নিদর্শন খুলে খুলে বর্ণনা করি।"
১৬:১২- "রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদকে তিনিই তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন এবং তাঁরই আদেশে তারকারাজি তোমাদের সেবায় নিয়োজিত। নিশ্চিতভাবে, আকল বা চিন্তার মাধ্যমে কাজ করা লোকদের জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।"
২১:৩৩ - "হাকিকত হচ্ছে: তিনিই সে জন, যিনি রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন; এদের সকলে (নিজ নিজ) কক্ষপথে ঘূর্ণনরত।"
৫৫:৫- "(তোমরা নিদর্শন চাচ্ছো, তাহলে দেখো) সূর্য ও চাঁদ এক সুনির্দিষ্ট হিসেব মোতাবেক আবর্তন রত।"
বস্তুত, উপরে উদ্ধৃত আয়াতের ন্যায় অন্যান্য আয়াত মানুষের উদ্দেশ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যেন তারা আল্লাহর বিস্ময়কর নিদর্শনে সমৃদ্ধ মহাবিশ্ব অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে।
শুধু এটাই নয়, বরং একটি আয়াতে তো আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআ'লা মানবজাতিকে পৃথিবীর গণ্ডি পাড়ি দিয়ে মহাশূন্যে অনুসন্ধান চালাতে উৎসাহিত করেছেন, তবে সাথে সাথে এই সতর্কবাতা পেশ করেছেন যে, উপযুক্ত শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ হাসিল হলেই এটা সম্ভব হবে।
৫৫:৩৩- "হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, জমিন ও আসমানের সীমা অতিক্রম করে বেরিয়ে যেতে চাও, তবে বেরিয়ে যাও; তবে পরোয়ানা তথা শক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না।"
কুরআনের আয়াতে জ্যোতির্মণ্ডলীয় ঘটনার পিছনে থাকা সুসংহত ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ড. আহমাদ মুস্তাফা অঙ্কিত "দিন ও রাতের কুণ্ডলী"।
📄 চাঁদ
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই-এপোলো ১১ চাঁদের বুকে পা রাখে এবং নেইল আর্মস্ট্রং পরিণত হন চাঁদে পা রাখা প্রথম ব্যক্তিতে। কিন্তু চাঁদের বুকে তার প্রথম পা রাখা এবং বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণের বহু পূর্বেই প্রতিভাধর মুসলিম পণ্ডিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পৃথিবীর নিকটতম এই জ্যোতির্মণ্ডলীয় প্রতিবেশী নিয়ে বিস্তর গবেষণায় জড়িত ছিলেন।
মুসলিমদের জন্য চাঁদ অত্যধিক তাৎপর্যপূর্ণ, যেহেতু হিজরী বর্ষপঞ্জি চাঁদের আবর্তন চক্র দ্বারা নির্ধারিত। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে: একটি চন্দ্রমাস প্রায় ২৯.৫ দিনের সমান, যা ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়; ১২-টি চন্দ্রমাস মিলে কেবল ৩৫৪ দিন গঠন করে।
খ্রিস্টান ও ইহুদিরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু এথেন্সের জ্যোতির্বিদ মেটন কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ -এ আবিষ্কৃত একটি পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা এটার একটা সুরাহা করেছিল। তিনি ১৯ বছরের একটি মেটনীয় চক্র উদ্ভাবন করেছিলেন। এটা ১২ চন্দ্রমাসের ১২ বছর এবং ১৩ চন্দ্রমাসের ৭ বছর দিয়ে গঠিত ছিল। ঋতুর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বর্ষপঞ্জিতে পর্যায়ক্রমে ১৩-তম মাস যুক্ত করা হতো।
মুসলিমরাও এ চক্রের অনুসরণ করতো, কিন্তু বিবেকবর্জিত (ইসলাম পূর্ব) কিছু শাসক নিজেদের সুবিধা মতো এতে ১৩-তম মাসের সংযোগ ঘটিয়ে বিষয়টি জটিল বানায়। তাই ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০ বছর শাসনকার্য চালানো ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনে খাত্তাব হিজরী বর্ষপঞ্জির সূচনা ঘটান, যা ইসলামী দেশগুলোতে আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই বর্ষপঞ্জি কঠোরভাবে চাঁদের আবর্তন চক্র মেনে চলে। সৌর বছর থেকে চন্দ্র বছর ১১ দিন কম; তাই রমযানের মতো পবিত্র মাস সারা ঋতু জুড়েই দুনিয়ার সর্বত্র আবর্তিত হয়। তাই প্রতিটি রমযান আগের রমযানের চেয়ে ১১ দিন আগে শুরু হয় এবং প্রতি ৩৩ সৌর বছরে রমযান মাস আবার ঠিক একই তারিখে ফিরে যায়।
নবচন্দ্র দর্শনের মাধ্যমে রমযান এবং অন্যান্য ইসলামী মাস শুরু হয়, তাই রমযান ঠিক কবে নাগাদ আরম্ভ হবে, রাতের আকাশে নবচন্দ্রের আগমনের আগ পর্যন্ত তা কেউই নিশ্চিতভাবে অবগত থাকে না।
ঠিক কখন নবচন্দ্র দৃশ্যমান হবে, তা আগাম বলে দেয়াটা মুসলিম গণিতজ্ঞ জ্যোতির্বিদদের সামনে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। নতুন চাঁদ উদয়ের পর থেকে চাঁদের চলাচল নিয়ে টলেমির তত্ত্ব বেশ নির্ভুল হলেও এই পর্যবেক্ষণ কেবল গ্রহণের অংশ হিসেবে চন্দ্রপথ বা চাঁদের সাপেক্ষে সূর্যের গমনপথের উপর নিবদ্ধ ছিল।
মুসলিমরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়ে যে, নবচন্দ্র দর্শনের আগাম সংবাদ দিতে গেলে, দিগন্তের সাপেক্ষে চাঁদের চলাচল নিয়ে গবেষণা আবশ্যক। এ সমস্যা সমাধানে বেশ জটিল প্রকৃতির গোলীয় জ্যামিতির প্রয়োজনীয়তা তখন ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
চাঁদের বিভিন্ন দশা মুসলিম বর্ষপঞ্জি বা হিজরী বর্ষপঞ্জি গঠনে ব্যবহৃত হয়।
বাগদাদে কর্মরত আল-কিন্দী ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যার হাতে গোলীয় জ্যামিতির বিকাশ ঘটেছিল এবং তিনি তার জ্যোতিষশাস্ত্রীয় কাজে এগুলোর প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে কিবলা নির্ধারণ এবং কোন দিকে মসজিদের মুখ থাকবে, তা নির্ণয়েও গোলীয় জ্যামিতির অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সঠিকভাবে কিবলা ঠিক করার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন যুগের অতুলনীয় প্রতিভা আল-বিরুনী। বলতে গেলে আল-বিরুনী যেন আক্ষরিকভাবে সবকিছুতেই আগ্রহী ছিলেন এবং কখনো কখনো তাকে আখ্যায়িত করা হয়: তার যুগের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি হিসেবে। বর্তমান উজবেকিস্তানের 'কাছ' নগরে অবস্থানকালে
আল-কার্যবিনীর লেখা "আজায়িব আল-মাখলুকাত” (বিস্ময়কর সৃষ্টিকুল) শীর্ষক গ্রন্থের ১৬শ শতাব্দির শুরুর দিকের ফারসি অনুবাদ থেকে নেয়া একটি ডায়াগ্রাম।
তিনি ২৪শে মে, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ঘটা চন্দ্রগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বাগদাদেও এটা দেখা গিয়েছিল এবং এ বিষয়ে তিনি তার সহকর্মী জ্যোতির্বিদ আবুল ওফা আল-বুযানীর সাথে তথ্যের আদান-প্রদান করেন। চন্দ্রগ্রহণ সংগঠনের সময় হিসেবে করে তারা দুটো শহরের দ্রাঘিমারেখার পার্থক্য নিরূপণে সমর্থ হয়েছিলেন।
চাঁদ পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত তথ্যাদি লিখে রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এখনকার ন্যায় তখনও চাঁদ ছিল আকর্ষণ ও মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার অন্যতম উৎস। চাঁদের এ দশা এটা প্রতিষ্ঠিত করে যে, আসমানেও সুবিন্যস্ত একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। এসব পর্যবেক্ষণ হিজরী বর্ষপঞ্জির কাঠামো নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় যাবৎ।
চাঁদের তারতম্য
কায়রোর এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে চাঁদের গতির তৃতীয় অসমতা বা চাঁদের তারতম্য নামে বিষয়টি আবিষ্কার করেন। টলেমি প্রথম ও দ্বিতীয় অসমতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্যের আবিষ্কারক হলেন: আবুল ওফা আল-বুযানী।
নতুন চাঁদের উদয়কাল বা পূর্ণিমার সময় চাঁদ দ্রুত চলে এবং চন্দ্রমাসের প্রথম ও তৃতীয়-চতুর্থাংশে ধীর গতিতে চলে – চাঁদের গতির এই তৃতীয় তারতম্য ছয় শতাব্দি পরে ইউরোপে ট্যুকো ব্রাহে কর্তৃক ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।