📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 মানমন্দির

📄 মানমন্দির


মানুষের বোধদয়ের সূচনা থেকেই তারা আসমানের তারকারাজির আশ্চর্যজনক শামিয়ানা এবং আসমানে গতিশীল যেকোন কিছু দ্বারা বেশ বিস্মিত হয়ে আসছে। স্পষ্টত, আসমানে এক সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা বিদ্যমান এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাসের ধরন চিহ্নিত করতে বহু প্রচেষ্টাই অতীতে নেয়া হয়েছে।
জীবনের মানোন্নয়নে রয়েছে এসব পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং এসব পর্যবেক্ষণের কল্যাণে সূচিত হয়েছিল পূর্বাভাস বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা; এবং এর আশীর্বাদে আমরা এখন আকাশে চাঁদ ও সূর্যের অবস্থান, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের সময়, গ্রহ ও নক্ষত্রসমূহের পরিবর্তিত অবস্থান আগাম নির্ণয় করতে পারি।
উদ্ভাবনের এক স্বর্ণযুগে মুসলিম বিশ্বে বহু মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বিষয়টি এমন নয় যে, মুসলিমরাই প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা শুরু করেছিল, বরং মানমন্দিরে বৃহদাকার সব যন্ত্রের প্রচলনের মাধ্যমে তারাই প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বৃহৎ পরিমণ্ডলে নিয়ে আসে। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গবেষণা বেশ ব্যয়বহুল, দামী সব যন্ত্রের পাশাপাশি প্রয়োজন একাধিক জ্যোতির্বিদের পারস্পরিক সহায়তা। পূর্বের জটিল কাজগুলো ছোট ও সহজে বহনযোগ্য যন্ত্র দিয়ে সম্পন্ন করা হতো এবং টলেমিও তার পর্যবেক্ষণসমূহ এসব যন্ত্র দিয়েই করেছিল।
এক্ষেত্রে সবার আগে একজন মানুষের নাম আসবে খলীফা আল-মামুন, যিনি বাগদাদ থেকে ৮১৩ থেকে ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন মূলত এই মানুষের হাত ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞান পেয়েছে তার প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও চালিকাশক্তি, যার সুবাদে এটা পরিণত হয়েছিল বৃহৎ এক বিজ্ঞানে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বৃহৎ ও স্থির যন্ত্রপাতিসহ নির্দিষ্ট স্থানে কাজ করা, কাজের ধারা, একাধিক জ্যোতির্বিদ কর্তৃক সম্পাদিত বৈজ্ঞানিক কর্মযজ্ঞ এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা রাষ্ট্রের সাথে সম্পৃক্ততা এসমস্ত মহৎ ও অভিনব ধারণার প্রচলন আল-মামুনের হাতেই হয়েছিল। এসবের মাধ্যমে মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ যে অবদানের সূচনা করেছিল, পূর্বের কিছুই এর ধারে কাছেও ছিল না। আল-মামুন শুধু ইসলামের প্রথম মানমিন্দর প্রতিষ্ঠাতাই নন, খুব সম্ভবত তিনিই ইতিহাসের প্রথম মানমন্দির প্রতিষ্ঠাতা। প্রকৃতপক্ষে আল-মামুন ছিলেন আলোকিত এক নেতা, যিনি বিশ্বের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক একাডেমি 'বায়তুল হিকমা' প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বিদ্যালয় বিভাগে আপনি তার সম্পর্কে আরও তথ্য পাবেন।
একেবারে প্রথমদিকের মানমন্দিরগুলো বাগদাদের আশ-শামসিয়া এলাকা এবং দামেস্কের কাসিউন পর্বতে অবস্থিত ছিল এবং এসব প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বিশেষজ্ঞগণ সম্মিলিতভাবে কাজ করবে, এমন ধারণার প্রচলন ঘটে। এসব মানমন্দিরের প্রধান কাজ ছিল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সারণী প্রস্তুত করা। গ্রহমণ্ডলীর অবস্থান, চাঁদের বিভিন্ন দশা, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ নির্ণয় করা এবং বর্ষপঞ্জি বিষয়ক তথ্য প্রস্তুতে এসব সারণী বেশ সহায়ক ছিল। আল-মামুনের মানমন্দিরগুলো সৌর ও চন্দ্র সারণী প্রস্তুতের পাশাপাশি তারকারাজির তালিকা তৈরি এবং কিছু গ্রহমণ্ডলীয় পর্যবেক্ষণ নথিবদ্ধ করেছিল।
আশ-শামসিয়া মানমন্দিরে জ্যোতির্বিদগণ সূর্য, চাঁদ, বিভিন্ন গ্রহ এবং কিছু স্থির তারকা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এখানে যেসব গবেষণা সম্পন্ন হয়েছিল, তা "মুমতাহান যিজ" বা সত্যায়িত সারণী নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয় এবং বলা হয়ে যে, এর রচয়িতা ইবনে আবি মানসূর।
মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র আরও মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, যেমন: হুলাগু খান প্রতিষ্ঠিত মারাগা মানমিন্দর, উলুগ বেগের সমরকন্দ মানমন্দির, ইস্পাহানের মালিক শাহ মানমন্দির এবং গাযান খানের তাবরিজ মানমন্দির।
১২৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইরানের তাবরিজের দক্ষিণে মারাগা মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ভিত্তি আজও বর্তমান। মারাগা মানমন্দিরের প্রধান অবদান ছিল নতুন জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সারণী প্রস্তুত করা এবং এই প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে ৪০,০০০-এরও অধিক গ্রন্থ ছিল।
এই মানমন্দিরের সাথে জড়িত প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদদের মাঝে নাসিরউদ্দীন আত-তুসী এবং কুতুবুদ্দীন আশ-শিরাজী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রংধনুর প্রকৃত কারণ আবিষ্কারের কৃতিত্ব এই কুতুবুদ্দীন আশ-শিরাজীর। নাসিরউদ্দীন আত-তুসীর প্রস্তুতকৃত ইলখানাত (Ilkhanid) সারণী এবং স্থির তারকার তালিকা কয়েক শতাব্দি ধরে বিশ্বে ব্যবহৃত হয়। মারাগার একজন জ্যোতির্বিদকে চীনে পাঠানো হয়েছিল এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণে তার নকশাকৃত যন্ত্রের নির্মাণ কৌশল ইয়ান রাজবংশীয় ঘটনাপঞ্জিতে নথিবদ্ধ ছিল এবং সেটা চীনের মহাপ্রাচীরে খোদাই করা ছিল।
মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত তৈমুরী সাম্রাজ্যের একজন শাসক ছিলেন ১৫শ শতাব্দির উলুগ বেগ। সুলতান হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ ছিলেন, যা তাকে সৌর, চন্দ্র ও গ্রহমণ্ডলীয় পর্যবেক্ষণ সম্পাদনের জন্য সমরকন্দে তিনতলা একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
বিশাল মাধ্যাহ্নিক যন্ত্রে সজ্জিত এবং পাথরে নির্মিত সমরকন্দ মানমন্দির ছিল প্রকাণ্ড এক দালান, যা দীর্ঘকাল ব্যাপী টিকে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিল আদর্শ মানমন্দিরের উচ্চতায়। মাধ্যাহ্নিক রেখা বরাবর একটি পাহাড়ে ২ মিটার (৬.৬ ফুট) প্রন্থের একটি গর্ত খনন করা হয় এবং এটার মধ্যে যন্ত্রটির একটি খণ্ডিত চাপ স্থাপন করা হয়। মাধ্যাহ্নিক চাপের ব্যাস ইস্তাম্বুলের হাগিয়া সোফিয়া মসজিদের গম্বুজের উচ্চতার সমান এবং তা ছিল: প্রায় ৫০ মিটার (১৬৪ ফুট)। সৌর ও গ্রহমণ্ডলীয় পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত এ মানমন্দির তৎকালের সর্বাধিক সূক্ষ্ম বিভিন্ন পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে সজ্জিত ছিল, এর মধ্যে ৪০.৪ মিটার (১৩২.৫ ফুট) ব্যাসের ফাখরী সেক্সট্যান্ট যন্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটা এ ধরনের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রসমূহের মাঝে সর্ববহৃৎ ছিল। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয়সহ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়াদি হিসেব করাটাই ছিল সেক্সট্যান্ট যন্ত্র ব্যবহারের মুখ্য উদ্দেশ্য। অন্যান্য যন্ত্রের মাঝে আর্মিলারি গোলক এবং আন্তর্লাব উল্লেখযোগ্য এদের সম্পর্কে আপনি এই বিভাগে আরও তথ্য পাবেন।
উলুগ বেগের কাজ তার যুগের সাপেক্ষে বেশ অগ্রগামী হওয়ার পাশাপাশি আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলো বেশ নিখুঁতও ছিল। নক্ষত্রীয় বছরের ক্ষেত্রে তার গণনা ছিল: ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ১০ মিনিট এবং ৮ সেকেন্ড; বর্তমান হিসেবে থেকে এটা ৬২ সেকেন্ড কম, যা শতকরা ০.০০০২ ভাগ নির্ভুল সত্যই এটা খুবই অসাধারণ।
চলমান পর্যবেক্ষণ কর্মযজ্ঞ মিলিয়ে এসব মানমন্দির বেশ বড় প্রতিষ্ঠান ছিল, যা সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো। মূলত জ্যোতির্বিদগণই তাদের কাজে সহায়ক অন্য কর্মীদের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধান করতো।

পশ্চিমের মানমন্দির
১৩শ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধের স্পেনীয় রাজা দশম আলফোনসো মানমন্দির প্রতিষ্ঠার মুসলিম ঐতিহ্যকে চলমান রাখার চেষ্টা করেন। তিনি পশ্চিম ইউরোপে মানমন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও সফল হতে পারেননি, গির্জা কর্তৃপক্ষ জ্যোতিষশাস্ত্রকে বরদাশত করেনি এবং এর উপকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় সম্ভবত এমনটি হয়েছে। চার শতাব্দি পরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে যায় এবং ইউরোপের বুকে অবশেষে জ্যোতিষশাস্ত্র স্বস্তির নিশ্বাস নিতে শুরু করে। মুসলিম বিশ্ব জ্যোতিষশাস্ত্রে যত পথ পাড়ি দিয়েছে, ইউরোপ তার সবই একে একে নিজেদের করে নিতে শুরু করে। আত্তীকরণের এই ধাপ এতটাই প্রকট ছিল যে, ১৬শ শতাব্দির পর্যবেক্ষণধর্মী বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ট্যুকো ব্রাহের ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো ঠিক তার পূর্বে মুসলিম জ্যোতিবিদদের ব্যবহৃত যন্ত্রের অনুরূপ ছিল। তার বিখ্যাত দেয়ালস্থ কোয়াডর‍্যান্ট যন্ত্রটি প্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে নির্মিত যন্ত্রের অনুরূপ ছিল।
জ্যোতির্বিদগণ চাঁদ ও তারকা নিয়ে গবেষণায় রত আছেন, এমন দৃশ্যের শৈল্পিক চিত্রায়ন ফুটে উঠেছে অটোমান ভঙ্গিতে আঁকা এই চিত্রকর্মে।
পরবর্তীকালের মানমন্দিরগুলোতে পরিচালক, কোষাধক্ষ, কেরানি, গ্রন্থকারিক এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক কর্মীবাহিনী পর্যন্ত ছিল।
আল-মামুনের আশ-শামসিয়া এবং কাসিউন মানমন্দিরের প্রধান কাজ যদিও ছিল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছক প্রস্তুত করা, তথাপি এখানে কিছু মৌলিক ও নবযুগ সৃষ্টি করে এমনকিছু আবিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছিল, যেমন: সৌর শিখর (apogee)-এর গতিশীলতা আবিষ্কার। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার সম্পর্কে আপনি এ বিভাগের অন্যান্য অধ্যায়ে আরও তথ্য পাবেন।
১৬শ শতাব্দিতে তাকিউদ্দীনের জন্য নির্মিত মানমন্দিরটি বেশ চমকপ্রদ হলেও তা স্বল্প সময়ের জন্য টিকে ছিল। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিশিষ্ট এ বিজ্ঞানী তার নতুন সুলতান তৃতীয় মুরাদকে ইস্তাম্বুল মানমন্দির প্রতিষ্ঠাতে সম্মত করতে সফল হয়েছিলেন এবং এটার নির্মাণ কাজ ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে সমাপ্ত হয়েছিল।
উপর থেকে তাকালে ইস্তাম্বুলের আনাতোলীয় অংশকে দেখা যায়, এমন সুবিধাসহ উঁচু পাহাড়ে দুটো সুরম্য ভবন নিয়ে নির্মিত এ মানমন্দির থেকে কোনো বাঁধা ছাড়াই রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করা যেত। আধুনিক মানমন্দিরের ন্যায় মূল ভবনটি গ্রন্থাগার ও প্রযুক্তিগত বিষয়াদির জন্য নিবেদিত ছিল এবং ছোট ভবনটি তাকিউদ্দীনের বানানো যন্ত্রপাতির দৃষ্টিনন্দন সংগ্রহে পূর্ণ ছিল। এসব যন্ত্রের মাঝে উল্লেখযোগ্য: বিশাল আর্মিলারি গোলক এবং গ্রহসমূহের অবস্থান ও চলাচল পরিমাপের যান্ত্রিক ঘড়ি।
গ্রহ, সূর্য এবং চাঁদের গতির বিবরণযুক্ত করে তাকিউদ্দীন প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছকগুলোর আধুনিকায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্লেগ ও অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ রাজনীতির মারপ্যাচে সুলতান তার এই মানমন্দির ধ্বংস করে দেয়। এতকিছুর পরেও জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও প্রকৌশল নিয়ে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে তাকিউদ্দীন নিজের কীর্তিকে অমর করে রেখেছেন।
প্রথম মানমন্দির প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক সময়ে সৃষ্টিশীলতার আলোয় আলোকিত ৯ম শতাব্দির কর্ডোবা নিবাসী এক মনীষী তৈরি করেছিলেন: নক্ষত্রশালা। আসমান গবেষণার জন্য নিবেদিত মানমন্দিরের চেয়ে নক্ষত্রশালা কিছুটা আলাদা। নক্ষত্রশালা (গম্বুজসদৃশ বৃহৎ এক) কক্ষ, যেখানে প্রক্ষিপ্ত আলোকবিন্দুর সাহায্যে সূর্য, গ্রহ এবং অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। উড্ডয়ন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য বিখ্যাত ইবনে ফিরনাস তার নিজ গৃহে কাচ থেকে একটি নক্ষত্রশালা বানিয়েছিলেন, যাতে ওই সময়কার রাতের আকাশ প্রদর্শিত হয়েছে। আজকের দিনের নক্ষত্রশালার সাথে এটার বেশ সাদৃশ্য ছিল এবং সত্যিকার আবহ সৃষ্টির জন্য তিনি তার এ নক্ষত্রশালায় কৃত্রিম বজ্রধ্বনি এবং বিজলিচমকের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছিলেন।
বায়ে: উজবেকিস্তানের উলুগ বেগ মানমিন্দরের অভ্যন্তরে থাকা মার্বেলে তৈরি বিশাল এক সেক্সট্যান্ট যন্ত্র।
ডানে: উলুগ বেগ মানমন্দিরের মাধ্যাহ্নিক চাপের ব্যাস ইস্তাম্বুলের হাগিয়া সোফিয়া মসজিদের গম্বুজের উচ্চতার সমান।

তাকিউদ্দীনের মানমন্দির
আসমানি পরিমণ্ডল
প্রাচ্য ও পশ্চিমের সমৃদ্ধ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রয়াস
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: জ্যোতিষশাস্ত্রীয় তথ্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার, ছয়-সিলিন্ডারের পাম্প এবং যান্ত্রিক ঘড়ি
অবস্থান: ইস্তাম্বুল, তুরস্ক
তারিখ: ১৬শ শতাব্দি
প্রধান ব্যক্তিত্ব: তাকিউদ্দীন
রাতের তারায় শোভিত আকাশের বিস্ময় ও মহিমা মুসলিম সভ্যতার পণ্ডিতদের কেবল মনোমুগ্ধই করেনি - বরং এটা তাদেরকে এক ধাপ এগিয়ে তাদের দেখা জিনিসে বিন্যাস ও যৌক্তিকতার অন্বেষণে ধাবিত করেছিল। অত্যাধুনিক যন্ত্র এবং নতুন গাণিতিক কৌশলের মাধ্যমে জ্যোতির্বিদগণ মহাবিশ্ব উপলব্ধিতে এক নব দুয়ারের উন্মোচন করেছিল। গ্রিকদের রেখে যাওয়া তত্ত্বগুলোকে সমৃদ্ধ করে যৌথ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের এক সুবিশাল ইমারত নির্মাণ করে, যার নিদর্শন আমরা বহু তারকার আরবী ও গ্রিক নামে খুঁজে পাই।
বাগদাদ এবং কাসিউন মানমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ৯ম শতাব্দিতে খলীফা আল-মামুন মানমন্দির প্রতিষ্ঠার ইসলামী ঐতিহ্য চালু করেছিলেন। ১১শ শতাব্দির শেষার্ধে সুলতান মালিক শাহ ইস্পাহানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম বৃহৎ পরিসরের মানমন্দির।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৩শ শতাব্দির জ্যোতির্বিদ নাসিরউদ্দীন আত-তুসী কর্তৃক ইরানের মারাগাতে। এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মানমন্দিরের তালিকায় থাকা এ মানমন্দিরের ভিত্তি আজও দৃশ্যমান। ঐতিহাসিক চীনা নথি আমাদেরকে জানাচ্ছে, ১৩শ শতাব্দির মারাগা মানমন্দিরের সাথে জড়িত জামালুদ্দীন নামের এক জ্যোতির্বিদ ১২৬৭ খ্রিস্টাব্দে বেইজিং রাজ দরবার সফর করেছিলেন এবং তিনি তার সাথে করে একাধিক জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র চীনে এনেছিলেন। বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠা এ জ্যোতির্বিদ চীনের মানুষদের নিকট চা-মা-লু-তিং নামে পরিচিত হয়ে উঠেন।
কোয়াডর‍্যান্ট এবং সেক্সট্যান্ট হচ্ছে মুসলিম সভ্যতার দুটো প্রধান জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র, পণ্ডিতরা এগুলো দিয়ে মহাকাশীয় বস্তুসমূহের দূরত্ব পরিমাপ করতেন। দূরত্ব একবার নিশ্চিত হয়ে গেলে আল-বাত্তানীর নির্মিত যন্ত্রসমূহ দ্বারা মহাকাশীয় গোলকে ওই নক্ষত্রের বিস্তারিত নাক্ষত্রিক স্থানাংক নির্ণয় করা যায়। তার ১০ম শতাব্দির একটি রচনায় তিনি 'আল-বায়দাতু' বা 'ডিম' নামে বিশেষ এক যন্ত্রের বিবরণ দিয়েছেন, যা মূলত ভারী মাহাকাশীয় গোলকের সাথে অন্যান্য সাধারণ আর্মিলারি গোলকের সম্মিলনে তৈরি এবং এ যন্ত্রের সাহায্যে তিনি বিপুল সংখ্যক তারকার অবস্থান নির্ণয়ে সফল হয়েছিলেন।
যেকোন মানমন্দিরের সুনাম ধরে রাখার জন্য নির্ভুল পরিমাপ বজায় রাখা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ভুলের মাত্রা হ্রাসে বৃহৎ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র নির্মাণে মনোযোগী হয়েছিলেন। ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে উলুগ বেগ উজবেকিস্তানে নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত এক মানমন্দির, যেখানে তিনতলার অধিক গভীরতায় একটি সেক্সট্যান্ট যন্ত্র প্রোথিত ছিল। মূলত ভূমিকম্প থেকে রক্ষার জন্যই এমনটি করা হয়েছিল।
১৬শ শতাব্দির জ্যোতির্বিদ তাকিউদ্দীন ইস্তাম্বুলে এক জাঁকজমকপূর্ণ মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে পর্যবেক্ষণ কর্মযজ্ঞ পরিচালনা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছক হালনাগাদের জন্য ছিল অত্যাধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন যন্ত্রের সারি। সেক্সট্যান্ট যন্ত্রসহ বেশ কিছু যন্ত্রের বৃহৎ সংস্করণও সেখানে ছিল।
প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতদের থেকে পাওয়া বেশ কিছু তত্ত্বকে মুসলিম সভ্যতার জ্যোতির্বিদগণ চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণ এবং গাণিতিক গবেষণা তাদেরকে নতুন মডেল উদ্ভাবনে সক্ষম করেছিল, যা অনুবাদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় পশ্চিমা জ্যোতির্বিদদের নিকট। বৈজ্ঞানিক পাঠ্যপুস্তক, তথ্য ছক এবং যন্ত্রের বিবরণ আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে তা ভিত গড়ে দেয় পশ্চিমাদের আধুনিক পূর্ব এবং গোড়ার দিকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের, আর এসবের বদৌলতে নিকোলাস কপার্নিকাস সক্ষম হয়েছিলেন ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে তার সূর্যকেন্দ্রিক সৌর মডেল তত্ত্ব প্রকাশ করে।

১৬শ শতাব্দীর “কিতাবুল মালুক” (বাদশাহ) গ্রন্থের তুর্কি পাণ্ডুলিপিতে দেখা যাচ্ছে, তাকিউদ্দীন ও অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাঁদের মানমন্দিরে গবেষণায় মত্ত আছেন।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র

📄 জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র


মহাকাশ গবেষণায় নিবেদিত বৃহদাকার যন্ত্রের নকশা তৈরিতে মুসলিমদের তুলনা কেবল তারাই ছিল এবং অতিকায় এসব যন্ত্র ব্যবহারের সুবাদে তারা তাদের পরিমাপে ভুলের শতকরা হার কমাতে দারুণভাবে সফল হয়। দামেস্কের মানমন্দিরে একটি ৬ মিটার (২০ ফুট) কোয়াডর‍্যান্ট এবং একটি ১৭ মিটার (৫৬ ফুট) সেক্সট্যান্ট যন্ত্র ছিল, যা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত একটি সাধারণ আকৃতির গাড়ির সমান। কোয়াডর‍্যান্ট, আর্মিলারি গোলক ও আঙ্গুর্লাবসহ মারাগা মানমন্দিরে ছিল বহু বৃহদাকার যন্ত্র।
অন্যান্য যন্ত্রের মাঝে মহাকাশীয় গোলক, কোয়াডর‍্যান্ট এবং সেক্সট্যান্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য [আন্তর্লাব ও আর্মিলারি গোলক সম্পর্কে আপনি বিশদ তথ্য এই বিভাগের স্বতন্ত্র অধ্যায়ে পাবেন]। নির্ভুল পরিমাপ নিশ্চিতের জন্য মানমন্দিরে এসব যন্ত্র ব্যবহার করা হতো, কেননা মানবমন্দিরের সুখ্যাতি তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের উপর নির্ভরশীল ছিল।
১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী স্পেন নিবাসী জাবির ইবনে আফলাহ মহাকাশীয় স্থানাংক পরিমাপের জন্য (টরকুয়েটাম নামে পরিচিত) প্রথম বহনযোগ্য মহাকাশীয় গোলকের নকশা প্রস্তুত করলেও ইরাকে কর্মরত ১০ম শতাব্দির জ্যোতির্বিদ আল-বাত্তানী মহাকাশীয় গোলক নিয়ে বিস্তর লিখেছিলেন। তিনি তার গোলককে কেবল পর্যবেক্ষণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং তিনি এটার সাহায্যে নির্ভুল মহাকাশীয় তথ্য নথিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। পাঁচটি বৃত্তাকার অবয়ব থেকে ঝুলন্ত 'আল-বায়দাতু' বা 'ডিম' নামে পরিচিত একটি যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণের পাশাপাশি এটা দিয়ে কীভাবে ১০২২ তারকার স্থানাংক নির্ণয় করতে হয়, তাও তিনি সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। তার প্রবন্ধ বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু গোলকে তারকা চিহ্নিতকরণের কায়দা-কানুন এতে বর্ণিত হয়েছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে: ওই সময়ের যন্ত্র নির্মাতাগণ এই গোলকের কাঠামোকে আর্দশ ধরে যন্ত্র প্রস্তুত করতো।
পাঁচটি সমান্তরাল নিরক্ষরেখা এবং নক্ষত্রপুঞ্জের রূপরেখা-সমৃদ্ধ টলেমি পূর্ব নকশা থেকে আল-বাত্তানীর প্রবন্ধ বেশ ভিন্ন। টলেমি পূর্ব মডেলের পরিবর্তে গ্রহণরেখা ও নিরক্ষ রেখার প্রয়োগ এবং সেগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে আল-বাত্তানী তারকারাজির তালিকা প্রস্তুতের অধিকতর নিখুঁত কৌশলের প্রয়োগ ঘটান। এই পদ্ধতির সাহায্যে তারকার স্থানাংক অত্যধিক নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।
জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র ও উপকরণ নির্মাণে মুসলিমগণ বেশ পারদর্শী ছিল। ৯০৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া আব্দুর রহমান সূফী ছিলেন তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশীয় গোলক নির্মাতা। মহাকাশীয় গোলক নির্মাতাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জের প্রতিচ্ছবির নকশা সমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ লেখেন, যা মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি ইউরোপেও ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। তার লিখিত অন্যান্য প্রবন্ধের মাঝে: আন্তর্লাব এবং মহাকাশীয় গোলক ব্যবহারের নিয়ম উল্লেখযোগ্য।
১৬শ শতাব্দি পর্যন্ত বহু গোলক নির্মিত হয়েছে, যার অনেকগুলোই এখনো টিকে আছে, তবে ১১শ শতাব্দির পূর্বের কোনো গোলকই আজ আর টিকে নেই।
জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র নিয়ে লিখেছেন, এমন লেখকদের মাঝে ১৩২৯ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার সিরকাতে মৃত্যুবরণকারী আবু বকর ইবনুল সাব্রায আল-হামাবী অন্যতম।
মুহাম্মদ ইবনে হিলাল ১৩শ শতাব্দিতে ইরানের মারাগাতে পিতলের এই মহাকাশীয় গোলক নির্মাণ করেছিলেন।
বা থেকে: সিরিয়ার দামেস্কের উমাইয়া জামে মসজিদে সরকারি সময় গণনাকারী আহমাদ আল মিয্যী কর্তৃক নির্মিত ১৪শ শতাব্দির আন্তর্লাব কোয়াডর‍্যান্টের বিপরীত পাশ এবং সামনের অংশ।
বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাদি ও জ্যামিতিক সমস্যা নিয়ে গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি তিনি "আল-মুকান্তারাতুল ইউসরা" নামে নতুন আরেকটি কোয়াডর‍্যান্ট উদ্ভাবন করেছিলেন (Almucantar- মহাকাশীয় গোলকে থাকা দিগন্তের সমান্তরাল বৃত্ত)। তার অধিকাংশ সময় কোয়াডর‍্যান্ট নিয়ে লেখাতে ব্যয় হয়েছিল এবং "মাকালাতু ফী আমালিয়াত মাআ' রবিয়াতিল খফিয়া" (লুকানো কোয়াডর‍্যান্টের ক্রিয়া বিষয়ক প্রবন্ধ) ও "আদ-দুরুল গারিব ফী আমালি বি-দায়িরাতিত তীব" (সাইন [Sine] নির্ণয়ে বৃত্তের ক্রিয়া বিষয়ক দুর্লভ মুক্তা)-এর ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ তার এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি প্রস্তুতে তার এত অর্জন থাকলেও তাকে এবং তার কাজ নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি।
১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী সিরিয়ার আলেপ্পোর জ্যোতির্বিদ আহমাদ আল-হালাবী এমন আরেক ব্যক্তিত্ব। "বি- গায়াতিত তুল্লাব ফী আমালি বি-রবিয়িল আন্তর্লাব" (আঙ্গুলাব কোয়াডর‍্যান্টের ক্রিয়া নির্ণয়ে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য) শীর্ষক গ্রন্থে তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্র নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন।
তার সমসাময়িক ইযযুদ্দীন আল-ওফায়ী ছিলেন একেধারে গণিতজ্ঞ, মুয়াযযিন এবং কায়রোর উমাইয়া মসজিদের সময় গণনাকারী। পাটিগণিত, ষষ্ঠিক অনুপাতের সাথে ক্রিয়াসহ গণিত বিষয়ে ৪০-টি দুর্দান্ত প্রবন্ধ লিখার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন যন্ত্র নির্মাণে বেশ শ্রম দিয়েছিলেন। "আন-নুজুময যাহিরাত ফী আমালি বি-রবিয়িল মুকান্তারাত” (আলমুকান্তার কোয়াডর‍্যান্টের ক্রিয়া) তার উল্লেখযোগ্য কর্ম।
দিগন্তের উপরে থাকা মহাকাশীয় বস্তুসমূহের দূরত্ব নির্ণয়ে সেক্সট্যান্ট এবং কোয়াডর‍্যান্ট ব্যবহৃত হতো। মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ বিশেষভাবে কোয়াডর‍্যান্ট ব্যবহারে আগ্রহী ছিল এবং তারা এ যন্ত্রের প্রভূত উন্নয়নে অংশও নিয়েছিল।
মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ বেশ কিছু কোয়াডর‍্যান্ট উদ্ভাবনও করেছিল। ত্রিকোণমিতিক সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত সাইন [Sine] কোয়াডর‍্যান্টের বিকাশ ঘটেছিল ৯ম শতাব্দি বাগদাদে; যেকোন অক্ষাংশের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত সার্বজনীন কোয়াডর‍্যান্টের বিকাশ ১৪শ শতাব্দির সিরিয়াতে হয়েছিল। সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত সময় নির্ণায়ক হোরারে কোয়াডর‍্যান্ট এবং আন্তর্ণাব/আলমুকান্তার কোয়াডর‍্যান্টও মুসলিমদের উদ্ভাবন। এসবের অধিকাংশই আন্তর্লাবের সাথে মিলিয়ে ব্যবহৃত হতো।
গ্রহণরেখার বক্রতা, পৃথিবীর বিষুবরেখার সমতল ও সূর্যের গ্রহণরেখার সমতলের মধ্যস্থ কোণ পরিমাপে ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আল-খুজান্দী একটি যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, যেটা সম্পর্কে তার দাবী যে, তিনিই সেটার উদ্ভাবক। এটা ফাখরী সেক্সট্যান্ট নামে পরিচিত ছিল, যেহেতু ইস্পাহানের ভূইয়া রাজবংশের শাসক ফাখর আদ-দৌলা ছিল তার পৃষ্ঠপোষক। খুজান্দী দাবী করেন যে, তিনি এ ধরনের পূর্ববর্তী যন্ত্রগুলোর প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছেন। আগের যন্ত্রগুলো দিয়ে যেখানে ডিগ্রি ও মিনিট পাঠ করা যেত, সেখানে তার যন্ত্র দিয়ে সেকেন্ড পাঠ করা যায়।
এই যন্ত্রে মধ্যরেখা ও উত্তর-দক্ষিণ রেখা অভিমুখী দেয়ালে একটি ৬০ ডিগ্রি চাপ সংযুক্ত রয়েছে। আল-খুজান্দী নির্মিত ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) ব্যাসের এ যন্ত্র এ ধরনের পূর্ববর্তী যন্ত্রগুলো থেকে বেশ বড়।
আল-খুজান্দীর ফাখরী সেক্সট্যান্ট ব্যবহারের চেয়ে দেয়ালস্থ কোয়াডর‍্যান্ট নামে পঞ্চম আরেক কোয়াডর‍্যান্ট ব্যবহারে তাকিউদ্দীন বেশি স্বাচ্ছদ্য বোধ করতেন। এই দেয়ালস্থ কোয়াডর‍্যান্টে দুটো ক্রমবিভক্ত পিতলের চাপ ছিল, যেগুলোর মোট ব্যাস ৬ মিটার (১৯.৭ ফুট), যা আল-খুজান্দীর যন্ত্রের চেয়ে ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) ছোট। এই চাপগুলো মধ্যরেখা বরাবর একটি দেয়ালে স্থাপিত ছিল। পাঠ নেয়ার জন্য জ্যোতির্বিদগণ কোয়াডর‍্যান্টে থাকা রড বা দণ্ডকে মহাকাশীয় বস্তু যেমন: চাঁদ বা সূর্য - বরাবর তাক করতো এবং দেয়ালস্থ কোয়াডর‍্যান্ট থেকে কোণের পরিমাপ নিতো।
নৌচালনের জন্য ব্যবহৃত হলেও সেক্সট্যান্ট যন্ত্র দিয়ে প্রধানত তারকা ও দিগন্তের মধ্যস্থ কোণ পরিমাপ করা হতো।
এ ধরনের অতিকায় জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রসমূহের আকার আধুনিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেলেও এসব যন্ত্রের প্রযুক্তি সহজে বহনযোগ্য আধুনিক সেক্সট্যান্ট যন্ত্রের ভিত রচনাতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল এবং জিপিএস ব্যবস্থা উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত এগুলোই ছিল প্রধান নৌচালন যন্ত্র।
ট্যুকো ব্রাহে কর্তৃক ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি দেয়ালস্থ কোয়াডর‍্যান্ট। তারকাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব মাপা হতো। বস্তুত এই দুই সৃজনশীল প্রতিভার উদ্ভাবিত সেক্সট্যান্ট যন্ত্রগুলোকে ১৬শ শতাব্দির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

উদ্ভাবনী যন্ত্র
১৬শ শতাব্দির দু'জন প্রভাবশালী জ্যোতির্বিদের একজন ইস্তাম্বুলের তাকিউদ্দীন এবং অপরজন ট্যুকো ব্রাহে, যিনি ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের পৃষ্ঠাপোষকতায় একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তৎকালের শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত যন্ত্রাদি দিয়ে সজ্জিত এই মানমন্দির ত্রুটিহীন পর্যবেক্ষণে বেশ সহায়ক ছিল এবং ট্যুকো ব্রাহের সহযোগী ইয়োহান কেপলারের আবিষ্কারে এটার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
তাকিউদ্দীন এবং ট্যুকো ব্রাহের মানমন্দিরের অধিকাংশ যন্ত্রে যে অদ্ভুত সাদৃশ্য ছিল, তা সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে (মানমন্দির অধ্যায়ে আপনি এ ব্যাপারে আরও তথ্য পাবেন)। মজার ব্যাপার হলো: উভয়েই প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রে তেমন একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। সেক্সট্যান্ট, কাঠের কোয়াডর‍্যান্ট ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ঘড়ির ন্যায় নব আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলো ব্যবহারে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ পেতেন।
তাকিউদ্দীনের সেক্সট্যান্টটি 'মুশাব্বাহ বিল মানাতিক' (ক্ষেত্রফলের প্রতিলিপি) নামের তিনটি স্কেল বা মাপনী দিয়ে নির্মিত ছিল। দুটো স্কেল তিনপ্রান্ত বিশিষ্ট সেক্সট্যান্টের প্রান্ত গঠন করতো। শেষপ্রান্তে ছিল একটি চাপ, যা একটি স্কেলের সাথে সংযুক্ত ছিল এবং তা দিয়ে দিগন্তের মধ্যস্থ কোণ পরিমাপ করা হতো।
শিল্পীর তুলিতে ফুটে উঠেছে: ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলে প্রতিষ্ঠিত নিজের মানমন্দিরে তাকিউদ্দীন তার 'মুশাব্বাহ বিল মানাতিক' নামের সেক্সট্যান্ট নিয়ে পর্যবেক্ষণে রত থাকার দৃশ্য।
"আলাত-ই-রাসাদিয়া লি যিজ-ই শাহেনশাহিয়া” (জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র) নামের পাণ্ডুলিপি থেকে ছবিটি নেয়া।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 আস্তর্লাব

📄 আস্তর্লাব


ইসলামের সূচনা থেকেই দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জন্য মুয়াযযিন আযান দিতো। সালাতের এই সময়গুলো দিন ও রাতের পরিবর্তনের আলোকে নির্ধারিত হতো, তাই এগুলোর সঠিক সময় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির আগমনের বহু পূর্বে এ কাজে সহায়তার জন্য মুসলিমরা আন্তর্লাব নামের এক নিখুঁত ও অসাধারণ যন্ত্রের সমৃদ্ধি সাধনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।
মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিদ (astrophysicist) ড. হারওল্ড উইলিয়ামস আন্তর্লাবের বিবরণ দিয়ে বলেন, "ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবনের পূর্ব পর্যন্ত আন্তর্লাব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা যন্ত্র এবং টেলিস্কোপের উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত আঙ্গুলাব ছিল সবচেয়ে মূল্যবান জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।”
আঙুর্লাবের আদি উৎস অজানা। তবে আলেকজান্দ্রিয়ার থিওন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দিতে আন্তর্লাব নিয়ে লিখেছিলেন এবং এ বিষয়ে টিকে থাকা সর্বাধিক প্রাচীন গ্রিক নথি ষষ্ঠ শতাব্দির। ইংরেজি astrolabe শব্দটি আরবী আঙ্গুলাব থেকে উৎসারিত এবং বলা হয়, এটা গ্রিক শব্দের আরবী প্রতিবর্ণায়ন। এর আদি উৎস যাইহোক না কেন, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সূচি নির্ধারণ এবং মক্কার অবস্থান নির্ণয়ের মতো অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর তাকিদে মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ এই যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি এটার ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করেছিল। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি ইসলামী বিশ্বে আঙুলাব বেশ জনপ্রিয় ছিল।
আন্তর্লাব নিয়ে নতুন নতুন প্রবন্ধ রচনার রেওয়াজ চালু হয় এবং ৯ম শতাব্দির শুরুর দিকে মাশাআল্লাহ আলী ইবনে ঈসা এবং আল-খাওয়ারিযমী এ ব্যাপারে প্রথম কলম ধরার খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এ পর্যন্ত টিকে থাকা এ যন্ত্রের ইসলামী সংস্করণের সময়কাল ১০ম শতাব্দির মাঝামাঝি, যা আলী ইবনে ঈসা নামের এক বাগদাদ নিবাসী শিক্ষানবিশের তৈরি। অষ্টম শতাব্দি থেকে স্পেনে মুসলিম উপস্থিতির সুবাদে আন্তর্লাবসহ ইসলামী জ্ঞানধারা পশ্চিমা ইউরোপে এমনভাবে প্রবেশ করেছিল যে, এ যন্ত্রের টিকে থাকা খ্রিস্টান বা পশ্চিমা সংস্করণ খুঁজতে গেলে আমাদেরকে ১৩শ শতাব্দির পর থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়।
যন্ত্রটির বেশ কিছু ধরনেরও বিকাশ ঘটেছিল, যেগুলোর মধ্যে Planisphere (মেরু অভিক্ষেপ-বিশিষ্ট) আন্তর্লাব সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল, যেটাতে বিষুবরেখা পৃষ্ঠে মহাকাশীয় গোলককে প্রক্ষিপ্ত করা হতো।
আন্তর্লাব মূলত আসমানের দ্বিমাত্রিক মডেল, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানের আকাশ কেমন দেখাবে, তা নিরূপণ করে। আন্তর্লাবের পৃষ্ঠতলে আসমান এঁকে এবং সহজে খুঁজে পাবার জন্য সেটাকে চিহ্নিত করে এ কাজ সম্পন্ন করা হতো। কিছু আঙ্গুলাব ছিল ছোট, কিছু ছিল হাতের তালুর সমান এবং বহনযোগ্য; আবার কিছু ছিল কয়েক মিটার ব্যাসের বিশাল এক যন্ত্র।
"ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবনের পূর্ব পর্যন্ত আন্তর্লাব ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা যন্ত্র এবং টেলিস্কোপের উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত এটা ছিল সবচেয়ে মূল্যবান জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।” – মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. হারওল্ড উইলিয়ামস
চন্দ্র ও সূর্যের ন্যায় মহাকাশীয় বস্তুগুলোর অবস্থান সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধান এবং সময় নির্ণয়ে পারদর্শী এসব আন্তর্লাব ছিল সে আমলের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনাযন্ত্র ও এনালগ কম্পিউটার। প্রকৃতপক্ষে, এগুলো ছিল মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদদের পকেট ঘড়ি। দিগন্তরেখার উপরে সূর্যের কৌণিক দূরত্বের পরিমাপ, দিনে বা রাতে সময় বলে দেয়া, এমনকি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো মহাকাশীয় ঘটনাগুলোর সময় নির্ণয় কিংবা যেকোন তারার শীর্ষবিন্দু নির্ণয়ে এগুলো বেশ কার্যকর ছিল। সুনিপুণ কর্মদক্ষতার ছোঁয়ায় বানানো ছকগুলো আঙুর্লাবের বিপরীত পার্শ্বে ছাপানো থাকতো, যার সাহায্যে এতসব গণনার কাজ সম্পাদন করা হতো।
এসব ছকে অন্তর্ভুক্ত থাকতো—সময় পরিবর্তনের বক্রতা, যেকোন মাসের দিনকে গ্রহণরেখায় সূর্যের অবস্থানের সাপেক্ষে রূপান্তর করে—এমন বর্ষপঞ্জি, ত্রিকোণমিতিক স্কেল এবং ৩৬০ ডিগ্রির ক্রমবিন্যাস বিষয়ক তথ্যাদি।
গোলাকার মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আছে পৃথিবী এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব ও সময়ে থেকে একজন কাল্পনিক পর্যবেক্ষক এই গোলাকার মহাবিশ্ব মডেলের দিকে তাকিয়ে আছেন, এমনটি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্লাব বানানো হতো। আকাশের প্রধান তারকাসমূহকে একটি ধাতব থালায় বিদ্ধ করা হতো, যেন তা সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর এই থালাকে ‘মাতির’ নামে পরিচিত একটি বৃহৎ সমতল ও বৃত্তাকার ধারকে রাখা হয়। থালায় তারকাগুলো বিদ্ধ থাকায় জ্যোতির্বিদগণ এর নিচে থাকা আরেকটি ধাতব থালা অনায়াসে দেখতে পেতেন। নিচে থাকা অপর ধাতব থালায় নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণায়ক রেখা আঁকা থাকতো। একটি আন্তর্লাবে একাধিক ধাতব থালা অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেন জ্যোতির্বিদ এক অক্ষাংশ থেকে আরেক অক্ষাংশে সহজে যেতে পারেন। দিগন্তরেখার উপরে কোনো তারকা বা সূর্যের কৌণিক দূরত্বের পরিমাপে থালার পিছনে থাকা দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র ব্যবহারের পর জ্যোতির্বিদ থালায় বিদ্ধ ‘তারকা-মানচিত্র’ নিজের অবস্থান অনুযায়ী ঘোরাতেন এবং এভাবে তিনি সময় হিসেব করে ফেলেন। বস্তুত, এটা দিয়ে সব ধরনের হিসাব-নিকাশই সম্ভব। মহাকাশীয় বস্তুর স্থানাংক আরও নিখুঁতভাবে নির্ণয়ে প্রয়োজন বিস্তারিত জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ছকের এবং এ কাজে আন্তর্লাবের সাথে আরও প্রয়োজন বৃহদাকার কোয়াড্র‍্যান্ট ও পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলকের ন্যায় অন্যান্য যন্ত্রের।
আন্তর্লাবের দুটো স্থির ও আবর্তনশীল অংশ ছিল। রিতি (থালায় বিদ্ধ তারকা মানচিত্র)-কে ধারণকারী ‘মাতির’ মূলত ফাঁপা চাকতি এবং আবর্তনশীল থালাগুলো একে অপরের উপরে স্থাপন করা হয়। মাতিরের উল্টো পাশে থাকে
মুহাম্মদ যাকারিয়া কর্তৃক বানানো এমন একটি কার্যক্ষম আন্তর্লাব বানাতে প্রয়োজন বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডারের। প্রাচীন পদ্ধতি অবলম্বন করে এমন একটি আন্তর্লাব বানাতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে; নির্ভুল কাজ করে এমন আন্তর্লাব বানাতে প্রয়োজন: বিস্তৃত পরিসরের জ্যামিতিক হিসেব এবং নিখুঁত খোদাইকার্য।
অ্যালিড্যাড (দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র) এবং বিভিন্ন ত্রিকোণমিতিক ছক। এ হিসেবে, আঙ্গুলাবকে এক ধরনের চিত্রময় বা গ্রাফিক কম্পিউটার বলা যায়।
ইসলামী নির্মাতাগণ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্লাবের প্রস্তুতে অবদান রেখেছিলেন, যেমন: গোলীয় আন্তর্লাব এবং রৈখিক আঙ্গুলাব, কিন্তু এগুলোর কোনটাই বিস্তৃতভাবে প্রচলিত হয়নি। নাবিক আন্তর্লাব (Mariner's astrolabe) ১৫শ শতাব্দির শেষার্ধে এবং ১৬শ শতাব্দির দিকে পর্তুগিজ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
১১শ শতাব্দিতে টলেডোতে নির্মিত হয় অত্যাধুনিক ও জটিল কলাকৌশলে সমৃদ্ধ বৈশ্বিক আস্তর্ণাব, যা তারকামণ্ডলীর মানচিত্রায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। ঔষধবিক্রেতা বা ভেষজজীবী আলী ইবনে খালাফ আল-শাক্কায় এবং জ্যোতির্বিদ আয-যারকালী ছিলেন এই নয়া পরিবর্তনের দু'জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আন্তর্লাবের ইতিহাসে বৈশ্বিক আন্তর্লাব নবযুগের সূচনা ঘটিয়েছিল, যেহেতু যেকোন অবস্থানে এটা কার্যক্ষম। নির্দিষ্ট স্থানের ভিত্তিতে নকশাকৃত অক্ষাংশ নির্ভর সাধারণ আন্তর্লাবে স্থান পরিবর্তনে ভিন্ন অক্ষাংশের থালা ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে।
"আঙুর্লাব বিষয়ক প্রবন্ধ" Canterbury Tales-এর রচয়িতা চসার তার ১০ বছরের পুত্র লুইসের জন্য ১৩৮৭ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্লাব নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি যা বলেছেন, তার খানিকটা এখানে তুলে ধরা হলো:
"ছোট্ট লুইস, পুত্র আমার, আমি তোমার উদ্বিগ্নতা এবং আন্তর্লাব সম্পর্কে জানার বিশেষ অনুরোধ আমলে নিয়েছি ... আর তাই আমি তোমাকে আমাদের দিগন্তের জন্য কার্যকর একটি আঙুলাব দিচ্ছি, যা অক্সফোর্ডের অক্ষাংশের জন্য বানানো। এই ছোট প্রবন্ধে আমি তোমাকে এ জাতীয় যন্ত্রের কিছু সিদ্ধান্ত শিক্ষা দেবো। আমি কিছু সিদ্ধান্তের কথা বলছি - তিনটি কারণে। প্রথমটি হচ্ছে: বিস্ময়কর এই যন্ত্র আঙ্গুলাব নিয়ে এ পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে বা পাওয়া যাবে, তার কিছুই এই অঞ্চলের লোকেরা পূর্ণাঙ্গভাবে জানে না, যেমনটি আমি মনে করি।"
বৈশ্বিক আন্তর্লাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: এটার Stereographic projection (সমতল পৃষ্ঠে গোলকের অভিক্ষেপণ) বাসন্তী কিংবা শারদীয় বিষুবকে অয়নতলে অভিক্ষেপণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জুলিও সামসো বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe-এ রাগেহ উমরের সাথে আলোচনাকালে বলেন যে, মুসলিমগণ নতুন ধরনের বিভিন্ন গণনা যন্ত্র ব্যবহার করতো এবং "তাদের নকশাকৃত বৈশ্বিক আঙ্গুর্লাবের এমনকিছু প্রয়োগ ছিল, যা সাধারণ আন্তর্ণাব দিয়ে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল।"
আন্তর্লাব নিয়ে যেকোন আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি তাতে তরুণ নারী প্রকৌশলী এবং জ্যোতির্বিদ মারইয়াম আল-ই'জলিয়া আল-আঙুলাবীর উল্লেখ না থাকে। ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার আলেপ্পোতে জন্ম নেয়া এ মহিয়সী নারী জ্যোতির্বিদ ও যন্ত্র নির্মাতাদের পরিবারেই বেড়ে উঠেন। আন্তর্লাব নির্মাণে অত্যন্ত পারদর্শী মারইয়াম শাসক সাইফুদৌলার পৃষ্ঠপোষকতায় বিখ্যাত আলেপ্পো দুর্গে কর্মরত ছিলেন। ৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বেশ অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই নারী প্রতিভা।
আন্তর্লাব বিশেষভাবে বৈশ্বিক আঙ্গুলাবের বিকাশ ও বহুল ব্যবহার ছিল তৎকালের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম নিদর্শন, যা আসমান নিয়ে বিমোহিত এবং সেটার রহস্য উন্মোচনে নিদারুণ আগ্রহী মুসলিম জ্যোতির্বিদদের সৃজনশীলতা ও উদ‍্যমের ফসল। নিদারুণ পরিশ্রমী এসব জ্যোতির্বিদদের কল্যাণেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর ইউরোপে আন্তর্লাবের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
মুহাম্মদ যাকারিয়া কর্তৃক নির্মিত আস্তর্লাবের দুটো নিকটদৃশ্য।
এটার জটিল নির্মাণশৈলী তুলে ধরেছে।

আগুলাব জাদুর কলকজা
সময় ও মহাকাশকে হাতের তালুতে এনে দেয়া বিস্ময় জাগানিয়া এক যন্ত্র
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: ১৭শ শতাব্দিতে সেক্সট্যান্টের আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত আঙুর্লাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ডিভাইস (যন্ত্র)
অবস্থান: বাগদাদ, ইরাক
তারিখ: ১৩শ শতাব্দির শেষার্ধ
নির্মাতা: ইবনে শাওখা আল-বাগদাদী
আলো জ্বলজ্বল পিতলে তৈরি এবং তাতে তারকার নাম খোদাই করে বসানো আন্তর্লাব দেখলেই মনে হতো এটা কোনো জাদুকরের জাদুর চাকতি। বস্তুত এটা একভাবে জাদুর চাকতির মতোই। ঘড়ি ও হাতঘড়ির ব্যাপক প্রচলনের বহু পূর্বেই মুসলিম প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিদগণ আন্তর্লাব নির্মাণ করেছিলেন, যার সুবাদে সময় ও মহাকাশ একত্র হয়েছিল হাতের তালুতে রাখা যায় এমন যন্ত্রে।
আলেকজান্দ্রিয়ার থিওন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দিতে আঙুর্লাব নিয়ে লিখেছিলেন এবং এ বিষয়ে প্রাচীন গ্রিকদের লেখাও রয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সূচি নির্ধারণ এবং মক্কার অবস্থান নির্ণয়ের মতো অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর তাকিদ মুসলিম সভ্যতাকে আরও কার্যক্ষম ও অত্যাধুনিক যন্ত্র নির্মাণে বাধ্য করেছিল। মুসলিম বিশ্বে এ পর্যন্ত টিকে থাকা আঙুর্লাবের সময়কাল ১০ম শতাব্দি এবং তা নির্মাণস্থল বাগদাদ।
দিন ও রাতের সময় বলে দেয়া, জমিনে চলতে সহায়তার পাশাপাশি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নিরূপণে আন্তর্লাবের জুড়ি মেলা ভার।
গুরুত্বপূর্ণ তারকাগুলোকে ধাতব থালায় বিদ্ধ করে বসানো, এরপর যেকোন তারকা বা সূর্যের কোণ নির্ণায়ক দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত এবং নির্ভুল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় হিসাবের জন্য তথ্য ছক থাকা সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্লাব ছিল কম্পিউটারের শতাব্দিকাল পূর্বের অত্যাধুনিক গণনা যন্ত্র। ১০ম শতাব্দির জ্যোতির্বিদ আস-সূফীর মতে, জ্যোতির্বিদ্যা, নৌচালন এবং জরিপ কাজসহ হাজারো কাজ আন্তর্লাব দিয়ে করা সম্ভব।
আন্তর্লাবের আগের সংস্করণ তথা সাধারণ আঙুর্লাবে পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানের অক্ষাংশ জানা আবশ্যক, কিন্তু ১১শ শতাব্দির পণ্ডিত আয-যারকালী এ সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবন করেছিলেন বৈশ্বিক আন্তর্লাবের। আরবী 'সাফিহা' (থালা) থেকে এটা পরিচিত হয়ে উঠে saphea arzachelis হিসেবে এবং এটা পৃথিবীর যেকোন স্থান থেকেই কার্যক্ষম ছিল।
বৈশ্বিক আন্তর্লাব ১৭শ শতাব্দিতে সেক্সট্যান্ট উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত নৌচালনার জন্য অপরিহার্য একটি উপকরণ ছিল। যান্ত্রিক ঘড়ি এবং জটিল গাণিতিক কৌশল আন্তর্লাবের জায়গা দখল করে নিলেও জ্যোতির্বিদদের জন্য সাধারণ আন্তর্লাব আজও বানানো হয়।
ইবনে শাওখা আল-বাগদাদী ১৩শ শতাব্দিতে এই আন্তর্লাব নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিটি আন্তর্লাবে অদলবদলযোগ্য একাধিক থালা থাকে। থালাগুলো মাঝে অবস্থান করে, যা মাতির নামে পরিচিত। ভিন্ন ভিন্ন থালা ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে সম্পৃক্ত।
আস্তর্লাভে খোদাই করা তথ্য- ছক আপনাকে বিভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, রাত্রিকালীন সময় বের করতে আপনাকে যেকোন একটি তারকা বরাবর আস্তর্লাভের পিঠে একটি রেখা টানতে হবে এবং এতে করে দিগন্তরেখার উপরে সে তারকার কৌণিক দূরত্ব বের হবে। এরপর রিতিকে ঘোরাতে থাকবেন যতক্ষণ না তারকা নির্দেশক-টি সঠিক কৌণিক দূরত্ব রেখা বরাবর থালায় বসছে। এবার আপনি সময় জেনে নিতে পারেন।

বায়ে, উপরে এবং ডানে: প্রতিটি থালায় খোদাই করা রেখাগুলো মাথার উপরে থাকা আকাশ গোলকের অভিক্ষেপণ। প্রতিটি থালাতে খুব সীমিত অক্ষাংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ অবস্থান)।
কেন্দ্রে: কয়েকটি থালাকে ধারণ করতে সক্ষম আস্তর্লাভের ফাঁপা চাকতি, যা মাতির নামে পরিচিত।
নিচে: রিতিতে রয়েছে- আকাশ জুড়ে সূর্যের গমনপথ নির্ণায়ক চক্র এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র নির্দেশক। ছোরা বা খঞ্জর আকৃতির নির্দেশক ছিল প্রথম দিককার ইসলামী আস্তর্লাভের বৈশিষ্ট্য।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 আর্মিলারি গোলক

📄 আর্মিলারি গোলক


মহাকাশীয় বস্তুসমূহের আবর্তনের পূর্বাভাষ দেয়াকে সহজতর করার লক্ষ্যে বহু উন্নত সভ্যতা আমাদের দেখা আকাশের বিভিন্ন মডেল প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়েছে। কেন্দ্রে পৃথিবী এবং তারকারাজি এটাকে ঘিরে সাজিয়েছে বৃত্তাকার পরিমণ্ডল – এই ধারণার ভিত্তিতে এসব মডেল বানানো হতো। তেমনি একটি মডেল: আর্মিলারি গোলক।
আকাশ এবং গ্রহমণ্ডলীর আবর্তনের প্রতিরূপ আর্মিলারি গোলকে প্রদর্শন করে মুসলিম জ্যোতির্বিদগণ মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তার ত্রিমাত্রিক প্রতিরূপ সৃষ্টিতে প্রয়াস পেয়েছিলেন এবং তাদের এ প্রচেষ্টা আমাদের বর্তমান মডেলের বেশ নিকটতর ছিল। এগুলো কোনো কঠিন ভূ-গোলক ছিল না, বরং এককেন্দ্রিক বৃত্ত ছিল, যেখানে পৃথিবী কেন্দ্রে এবং বাদবাকি মহাকাশীয় বস্তুগুলো ছিল পৃথিবীকে ঘিরে।
আর্মিলারি গোলকের নির্মাণ এবং ব্যবহার ৮ম শতাব্দি থেকে বিস্তৃতি লাভ করে, যখন আল-ফারাজী কর্তৃক বাগদাদে এ নিয়ে প্রথম রচিত হয়: "আল-আমালু বিল-আঙ্গুলাবাত যাতিল হালকি" (গোলীয় অবয়ব সম্বলিত যন্ত্র) শীর্ষক প্রবন্ধ। কিন্তু ১০ম শতাব্দিতে এগুলো সমৃদ্ধির উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছে এবং তখন থেকে এগুলো দুটো প্রধান মডেলে প্রস্তুত হতে থাকে।
প্রথম ধরনের প্রদর্শনী আর্মিলারি গোলকগুলোতে পৃথিবী ছিল প্রধান এবং বেশ ছোট মডেলের এই ভূ-গোলককে ঘিরে থাকতো গ্রহণরেখা চক্র [পৃথিবীর চারপাশে সূর্যের পরিভ্রমণ পথ], বিষুবরেখা, ক্রান্তিরেখা ও মেরুবৃত্ত। একটি ক্রমবিভক্ত মাধ্যাহ্নিক চক্রে এগুলো স্থাপন করা হতো এবং বিষুবরেখা সংলগ্ন অক্ষ বরাবর গোলকটি ঘুরতো। এসব মডেলে চাঁদ, গ্রহ ও তারকারাজি অন্তর্ভূক্ত না থাকলেও এরা পৃথিবীর চারপাশে থাকা মহাকাশীয় বস্তুসমূহের আপেক্ষিক গতি প্রদর্শন করতো।
দ্বিতীয় ধরনের পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলক বেশ ভিন্নধর্মী ছিল, যেহেতু পৃথিবীকে কেন্দ্রে না রেখে দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র সেখানে রাখা হয়েছিল। এই গোলকগুলো বেশ বড় ছিল এবং স্থানাংকসহ অন্যান্য মান বের করতে এগুলো ব্যবহৃত হতো।
পর্যবেক্ষণধর্মী আর্মিলারি গোলক নিয়ে বহু মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী কলম ধরেছিলেন, যাদের মাঝে সেভিলের জাবির ইবনে আফলাহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১২শ শতাব্দীর মধ্যভাগের এই মনীষী পশ্চিমে জিবার নামে পরিচিত ছিলেন (রসায়বিদ জিবারের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না)।
আকাশ ও পৃথিবী অধ্যয়নে বিভিন্ন মানমন্দিরে আর্মিলারি গোলক ব্যবহৃত হতো, এদের মাঝে ১৩শ শতাব্দীর মারাগা মানমন্দির, ১৫শ শতাব্দীর সমরকন্দ মানমন্দির এবং ১৬শ শতাব্দীর ইস্তাম্বুল মানমন্দিরের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলে পুনর্মুদ্রিত “জিহানুমা” (বৈশ্বিক ভূগোল) গ্রন্থ থেকে নেয়া একটি খোদাইকর্মে চিত্রিত আর্মিলারি গোলক। মূল “জিহানুমা” গ্রন্থটি ১৭শ শতাব্দীর পণ্ডিত কাতিব চেলেবী (হাজী খলীফা) কর্তৃক রচিত।
১৬শ শতাব্দীর পাণ্ডুলিপিতে দেখা যাচ্ছে, আসমানের সমতল ছক তৈরির জন্য জ্যোতির্বিদগণ নির্দিষ্ট তারকার সাথে আর্মিলারি গোলকের বিভিন্ন অংশ সারিবদ্ধ করে সাজাচ্ছেন। তারকা ব্যবহার করে পথ চলতে এগুলো বেশ সহায়ক।
কেন্দ্রীয় দোলক বা পেন্ডুলাম দিয়ে সমতল পৃষ্ঠে তারকা ও গ্রহসমূহের বক্র পথ আঁকা হতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00