📄 বৈশ্বিক যোগাযোগ
ইলেকট্রিক বা কাগজ- যে মাধ্যমেই তথ্যের আদান-প্রদান হোক না কেন, যেকোন সময় তা ঝুকির মুখে পড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ গোপন বার্তা ভুল মানুষের হাতে পড়া ঠেকাতে সাংকেতিক বার্তা প্রেরণ করা হয়, যেন সঠিক সংকেত জানা ব্যক্তিটি তার মর্মোদ্ধারে সক্ষম হয়।
সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারের এমন একটি ঘটনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ঘটেছিল, যখন জার্মানরা এনিগমা (Enigma) নামের টাইপ-রাইটার ব্যবহার করে রেডিওতে প্রচারের পূর্বে কিছু বার্তা এনক্রিপ্ট বা সংকেতযুক্ত করে পাঠাচ্ছিল। সাংকেতিক কোড ভাঙতে সক্ষম একদল পোলিশ সাইফার ব্যুরো এবং আরেকদল ব্রিটিশ ব্লেচলে পার্কে থেকে জার্মানদের ওই বাতার কোড ভেঙে ফেলে।
"সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার- এ বিদ্যার সূচনার জন্য প্রয়োজন এমন এক সমাজের, যারা তিনটি দিকে সমৃদ্ধির চূড়ায় আরোহণ করেছে, যথা: ভাষাতত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং গণিত। এই তিনটি শর্ত আল-কিন্দীর সময় সহজলভ্য হয়ে উঠে এবং এই তিন শাস্ত্রসহ আরও বহু বিষয়ে তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।" - ড. সাইমন সিং, The Code Book (১৯৯৯)
বিংশ শতাব্দির এই লোকগুলো বস্তুত কোড ভাঙার ওই ঐতিহ্যকে আগে বাড়িয়েছে, যা নিয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেছিলেন ৯ম শতাব্দির বহুবিদ্যায় সমান পারদর্শী বাগদাদের আল-কিন্দী। ওই সময় বার্তার আদান-প্রদান পাখির মাধ্যমে হওয়ায় সেগুলোকে ওজনে বেশ হালকা হতে হতো এবং গোপনীয় বার্তাগুলো সাংকেতিকভাবে পাঠানো হতো। "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা" (সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার বিষয়ক পুস্তিকা) লিখে ক্রিপ্টগ্রাফি শাস্ত্রে তিনি এক যুগান্তকারী বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। এই পুস্তকের একটি অংশে পুনরাবৃত্তি বা ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অর্থাৎ একটি সাধারণ বর্ণকে যদি ভিন্ন আরেকটি বর্ণ দিয়ে বদলানো থাকে, তবে ওই নতুন বর্ণটি মূল বর্ণের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে- বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন। আমরা যদি ইংরেজি ভাষার দিকে খেয়াল করি, তবে দেখবো বিভিন্ন শব্দে 'e' (ই) বর্ণটি অন্যসব বর্ণের চেয়ে ১৩% বেশি আবির্ভূত হয়েছে। তাই 'e' (ই) বর্ণটি যদি # সংকেত দ্বারা বদলে দেয়া হয়, তবে # পরিণত হবে সবচেয়ে বেশি আবির্ভূত সংকেতে এবং এটার ব্যবহারের হারও অন্যসব সংকেতের চেয়ে ১৩% বেশি হবে। একজন সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক (cryptanalyst) তখন বের করতে সক্ষম হবে যে, # সংকেতটি মূলত 'e'-এর প্রতিনিধিত্ব করছে।
কুরআনের আরবী ভাষ্য নিয়ে গবেষণার সময় বর্ণের ফ্রিকুয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তির বিষয়টি তার নজরে আসে, যা ছিল ক্রিপ্টগ্রাফির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মূল নিয়ামক। ইউরোপের রেনেসাঁ আমলে বহু সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক আল-কিন্দির প্রতিষ্ঠিত ভিতকে আরও সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম হয়। বড় রকমের সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার ও কোড ভাঙার পদ্ধতি যদিও ১১০০ বছর পূর্বে আল-কিন্দীর হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে, তথাপি 'cryptanalysis' (সাংকেতিক বার্তা পর্যবেক্ষণ) শব্দটি বেশ সাম্প্রতিক এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম ফ্রেডম্যান সর্বপ্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন।
ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ বর্তমানে ধ্রুপদী কোড ভাঙার মৌলিক হাতিয়ার, যা বর্ণমালার সাধারণ পঠনকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এই বিদ্যা ভাষার সাধারণ পাঠের সংখ্যা ও ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের পারদর্শীতার উপর নির্ভর করে। আধুনিক সংকেতগুলো বেশ জটিল, কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও আমেরিকা তাদের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে শব্দ সাজানোর ধাঁধা দিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো এবং দ্রুততম সময়ে যারা সেগুলো সমাধান করতো, তাদেরকে কোড ভাঙার কাজে নিয়োগ দেয়া হতো।
■ বিমান-ডাক
বর্তমানে আমাদের নিকট ডাক যোগাযোগ মামুলি হলেও একটা সময় পায়রা-ডাক বা প্রশিক্ষিত কবুতর দিয়ে বার্তার অপব্দ-প্রদানই ছিল একমাত্র সহজলভ্য 'বিমান-ডাক'।
বার্তাবাহক কবুতর নিয়ে লেখা এক গ্রন্থে মুসলিম পণ্ডিত ইবনে আবদ আয-যাহির লিখেছেন, তৎকালীন যোগাযোগের সবুকেন্দ্র কায়রোর নগরদুর্গে সাধারণত ১,৯০০-এর মতো কবুতর থাকতো।
মুসলিম কাহিনীকার আন-নুয়াইরী ১০ম শতাব্দির আজিজ নামে পরিচিত এক ফাতিমী খলীফা সম্পর্কে লিখেছেন: কায়রোতে থাকাকালে তার একবার এন্টিয়কের সতেজ চেরিফল খাওয়ার বাসনা জাগে। এন্টিয়কের নিকটস্থ বালবেকে বার্তাবাহক কবুতর দিয়ে আদেশ পাঠানো হয়। তখন প্রতিটি কবুতরের পায়ে একটি চেরিফল মোড়ানো রেশমি খালে আটকে দিয়ে প্রায় ৬০০ কবুতর কায়রো পাঠানো হয়। ইচ্ছা করার তিনদিনের মাথায় বিশেষ 'বিমান-ডাক' ডেলিভারির মাধ্যমে খলীফার সামনে আনা হয় লেবানন থেকে পাঠানো ১,২০০ সতেজ চেরিফলের এক বিশাল পাত্র।
কোড ভাঙা "এনক্রিপ্ট করা বা সাংকেতিক বার্তা পাঠোদ্ধারের একটি পথ হচ্ছে: আমরা যদি এটার ভাষ্য জানি, তবে ওই একই ভাষার বিকল্প সহজবোধ্য পাঠ বের করা, এরপর প্রতিটি বর্ণের পুনরাবৃত্তি গণনা করা। যে সংখ্যাটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, আমরা সেটাকে 'প্রথম', এরপরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে দ্বিতীয়', পরেরটি 'তৃতীয়' এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা নমুনাতে সাধারণ পাঠটির সবগুলো ভিন্ন বর্ণ লিখছি... এরপর আমরা যে প্রতীকী বার্তার পাঠোদ্ধার করতে চাই, সেটাতে মনোযোগ দিয়ে সেটার প্রতীকগুলো শ্রেণিবদ্ধ করবো। যে প্রতীকটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, সেটাকে আমরা আমাদের সহজবোধ্য পাঠের 'প্রথম' বর্ণ দ্বারা বদলে নেবো, পরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে আমরা 'দ্বিতীয়' বর্ণ দ্বারা বদলে দেব এবং এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা আমাদের সাংকেতিক বার্তার পুরো প্রতীকটি পাচ্ছি।" -আল-কিন্দী রচিত ৯ম শতাব্দির "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা"
📄 যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র
১৩শ শতাব্দির সামরিক বিষয়াদি নিহায়েৎ জটিল ছিল না, বরং তা ছিল অত্যাধুনিক। গ্রেনেড, সালফার বোমা, কামান, রকেট এবং টর্পেডো ছিল সামরিক আলোচনার অন্তর্ভূত। সামরিক প্রযুক্তি বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা ছিল সিরীয় পণ্ডিত হাসান আর-রাম্মাহর "কিতাবুল ফুরূসিয়াত ওয়াল মানাসিবুল হারবিয়্যা” (অশ্বচালন নৈপুণ্য ও অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র) শীর্ষক গ্রন্থটি, যা ১২৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত। রকেটের প্রথম লিখিত দলিলসহ গ্রন্থটি ছিল বিভিন্ন যুদ্ধান্ত্রের ডায়াগ্রামে পূর্ণ। এই গ্রন্থে বর্ণিত রকেটের একটি ডিজাইন ওয়াশিংটন ডিসির জাতীয় বিমান ও মহাকাশ জাদুঘরে প্রদর্শিত অবস্থায় রয়েছে।
চীনারা প্রথম গানপাউডার উদ্ভাবন করেছিল এবং কেবল আতশবাজিতে ব্যবহারের জন্য তারা গানপাউডারের অন্যতম উপাদান সল্টপিটারের ব্যাপক উন্নয়ন করেছিল। আমানি যেইন বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র What the Ancients Did for Us-এ বলেন, "গবেষণা দেখাচ্ছে যে, মুসলিম রসায়নবিদগণ শক্তিশালী গানপাউডার তৈরির এক কার্যকর সূত্র উদ্ভাবন করেছিল এবং অনেকেই তাদের প্রথম আগ্নেয়াস্ত্রে সেটার ব্যবহারও করেছিল।"
সঠিক অনুপাত বের করতে না পারা এবং পটাশিয়াম নাইট্রেট পরিশুদ্ধ করতে না পারার কারণে চীনারা এটাকে বিস্ফোরনে ব্যবহার করতে পারছিল না। ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে বিস্ফোরকের অনুপাত বিষয়ে প্রথম চীনা গ্রন্থ হো লাং চীং কর্তৃক রচিত হয়। এর প্রায় একশ বছর পূর্বে হাসান আর-রাম্মাহর গ্রন্থ প্রথমবারের মতো পটাশিয়াম নাইট্রেট বিশোধনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে এবং সেইসাথে বিস্ফোরক গানপাউডার তৈরির বহু রেসিপির বিবরণ দেয়।
"আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাইবারসের নেতৃত্বাধীন মুসলিম সেনাদলের গানপাউডারের ব্যবহার যুদ্ধের নিয়তি মুসলিমদের অনুকূলে নিয়ে আসে। মিশরের আল-মানসূরা যুদ্ধে মুসলিমদের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো এতটাই ভয়ানক এবং ধ্বংসাত্মক ছিল যে, ফরাসি ক্রুসেডার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় এবং রাজা নবম লুইস তাতে বন্দি হন" বিবিসি
📄 সমাজ বিজ্ঞান এবং অর্থনীতি
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।