📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 নৌচালন-বিদ্যা

📄 নৌচালন-বিদ্যা


এটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, ফেং শুই (চীনা ভবিষ্যৎ কথন-বিদ্যা)-তে ব্যবহারের জন্য চীনারা কম্পাসের বিকাশ ঘটায় এবং পরবর্তীতে নৌচালনাতে ব্যবহারের জন্য নাবিকরা এটার প্রভূত উন্নয়ন সাধন করে। মুহাম্মদ আল-আওফী কর্তৃক রচিত "মাজমুআ'তু কাসাসিয়া” (গল্প সংকলন) শীর্ষক পারসীয় গ্রন্থে চম্বুকীয় কম্পাস ব্যবহারের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়।

১২৩৩ খ্রিস্টাব্দ, লোহিত সাগর এবং পারস্য বা আরব উপসাগরের সমুদ্রযাত্রা সবে শেষ হলো। আর এ অভিযানের কোনো বিবরণীতে কম্পাস নিয়ে মন্তব্য করা হলো এভাবে: "ইস্পাতে তৈরি মাছ পালিশ করে চুম্বকীয় পাথরের সাথে আটকে তা পানি পূর্ণ পাত্রে স্থাপন করা হয়। এটা ঘুরতে থাকে, যতক্ষণ না দক্ষিণে মুখ করছে।"

নৌচালন-বিদ্যাতে চুম্বকীয় কম্পাস ব্যবহারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ইসলামী বিশ্বে সর্বপ্রথম বাইলাক আল-কিবজাকীর "কিতাব কানযুত তুজ্জার ফী মা'রিফাতিল আহজার" (ব্যবসায়ীদের জন্য পাথর বিষয়ক জ্ঞানের খনি) শীর্ষক গ্রন্থে পাওয়া যায়; গ্রন্থটি ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে মিশরে রচিত। ১২৪২ খ্রিস্টাব্দে লেবাননের ত্রিপলি থেকে আলেকজান্দ্রিয়া অভিমুখী এক সমুদ্র সফরে তিনি ভাসমান কম্পাসের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, "ইস্পাতের একটি সুচ একটি নলখাগড়ার সাথে আড়াআড়ি যুক্ত করে পানিপূর্ণ পাত্রের স্থাপন করা হয়। অতঃপর একটি চুম্বকীয় পাথর এই যন্ত্রের নিকটে আনা হলে চুম্বকীয় পাথরকে বহন করা হাত এটার উপর একটি চক্রাকার অবস্থা সৃষ্টি করে এবং এতে সুচ ও নলখাগড়া এই দিকে ঝুকে পড়ে। হঠাৎ করে চুম্বকীয় পাথরটি সরিয়ে নিলে সুচটি মধ্যরেখা বরাবর তাক হয়ে থাকে।”

চুম্বকীয় সুচবিশিষ্ট নমনীয় কাঠ অথবা কুমড়া-সদৃশ 'মাছের' সাজবিশিষ্ট কম্পাস নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। আলকাতরা বা মোম দিয়ে সীলগালা করে এগুলোকে পানি নিরোধক করা হতো, যেহেতু এগুলো পানিতে ভাসতো। এগুলো আর্দ্র কম্পাস নামে পরিচিত ছিল, এগুলোর পাশাপাশি শুষ্ক কম্পাসও ছিল। এখানে, কাগজের চাকতির বিপরীত পাশে দুটো সুচ রাখা হতো এবং মাঝে ফানেলের মতো কিছু একটা স্থাপন করা হতো। ফানেলটি একটি অক্ষে থেকে ঘুরতো। আবর্তনকীলক হিসেবে কাজ করা অক্ষটি বাক্সের মাঝ বরাবর অবস্থান করতো এবং কাগজের চাকতি যেন না পড়ে, সেজন্য তা কাচ দিয়ে সীলগালা করা হতো। কম্পাসের ব্যবহার এবং এ ধরনের নকশা সম্বলিত কম্পাসের প্রচলন মুসলিম বণিকদের দ্বারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা কম্পাসের প্রভূত উন্নয়ন ঘটায়।

■ মহাদক্ষ নাবিকদের প্রজন্ম
নৌচালন যন্ত্রে ব্যাপক উন্নতির পাশাপাশি নাবিক হিসেবে মুসলিমদের তুলনা কেবল তারাই ছিল। ১৫শ শতাব্দির আরবের নজদের ইবনে মাজিদ ছিলেন এমনই এক নাবিক। নৌচালন-বিদ্যায় তাদের পরিবারের আলাদা খ্যাতি ছিল। তার পিতা ও দাদা উভয়েই নৌচালন-বিদ্যার প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং লোহিত সাগরের খুঁটিনাটি ছিল তাদের নখদর্পণে। লোহিত সাগর থেকে পূর্ব আফ্রিকা এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সবগুলো সমুদ্রপথ সম্পর্কে তিনি সম্যকভাবে অবগত ছিলেন। সমুদ্রপথ নিয়ে গদ্য ও পদ্যের ছন্দে তিনি ৩৮-টির মতো প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার মধ্যে ২৫-টি এখনো টিকে আছে। জ্যোতিষশাস্ত্র ও নৌচালন-বিদ্যাসহ চাঁদের বিভিন্ন মনযিল, সমুদ্রপথ এবং বিভিন্ন পোতাশ্রয়ের অক্ষাংশ নিয়ে এই প্রবন্ধগুলোতে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।

এদিকে, ১৬শ শতাব্দির নৌ-সেনাপতি পিরি রেইস নৌচালন-বিদ্যাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার লেখা ৪৫০ বছরের পুরানো নৌ-চালনার দিক নির্ণায়ক ম্যানুয়েল গ্রন্থ: "কিতাবুল বাহরিয়া"-এর অনুবাদ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যথা: The Book of the Mariner (নৌ সহায়িকা), The Naval Handbook (নৌ পুস্তিকা) এবং The Book of Sea Lore (সমুদ্র জ্ঞান বিষয়ক পুস্তক)। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গ্রন্থটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে, যাতে অটোমান তুর্কি ভাষায় লেখা মূল পাণ্ডুলিপির রঙিন ছাপার পাশাপাশি লাতিন, আধুনিক তুর্কি এবং ইংরেজি অনুবাদও শামিল রয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলের পথ-নির্দেশিকা তুল্য পিরি রেইসের "কিতাবুল বাহরিয়া" গ্রন্থটি আধুনিক সমুদ্র ভ্রমণে নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

নৌ-সারণী বা portolan হিসেবে পরিচিত গ্রন্থটি ছিল নাবিকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ নৌ-নির্দেশিকা, যেখানে উপকূল, জলপ্রবাহ, বন্দর ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে কিছুটা দূরবর্তী এলাকার মানচিত্র অন্তর্ভূক্ত ছিল। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল, দ্বীপপুঞ্জ, সংর্কীণ সমুদ্রপথ, প্রণালী, উপসাগর, উত্তাল সমুদ্রে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, বন্দরে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি ও নোঙ্গর করাসহ নাবিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনায় গ্রন্থটি ভরপুর ছিল। বিভিন্ন স্থানের দিক এবং সেগুলোর নিখুঁত দূরত্বের বিবরণও এটাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২১৯-টি বিস্তারিত সারণীসহ এটা ছিল ভূমধ্যসাগর ও আজিয়ান সাগর সংক্রান্ত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও অনবদ্য ম্যানুয়েল গ্রন্থ। প্রকৃতপক্ষে, পিরি রেইসের এই গ্রন্থের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় নাবিক ও পণ্ডিতদের ২০০ বছরের প্রচেষ্টা উৎকর্ষের চূড়ায় আরোহণ করেছিল। এই ম্যানুয়েল গ্রন্থের দুটো সংস্করণ ছিল, যার প্রথমটি ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের এবং পরেরটি এর পাঁচ বছরের পরের। প্রথম সংস্করণটি মুখ্যত নাবিকদের জন্য লেখা হলেও দ্বিতীয় সংস্করণটি ছিল পিরি রেইসের তরফ থেকে সুলতানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত উপহার। নিপুণ হস্তে আঁকা নকশা এবং দক্ষ ক্যালিগ্রাফি ও চিত্র শিল্পীদের তুলি রাঙা মানচিত্র সম্বলিত গ্রন্থটি খোদ ১৬শ শতাব্দিতেই পরিণত হয় সংগ্রাহকদের দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে। এক শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে গ্রন্থটির নানা সংস্করণ বের হতে থাকে এবং ঝড়ো আবহাওয়া, কম্পাস, নৌ-সারণী, নৌচালনায় জ্যোতির্বিদ্যার প্রয়োগ, সাগর-মহাসাগর এবং সেগুলো ঘিরে থাকা এলাকাগুলোর নিখুঁত ও অনবদ্য বিবরণ থাকায় প্রতিনিয়ত এটা দামী থেকে আরও দামী বস্তুতে পরিণত হতে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে এটাতে ইউরোপীয় অভিযান নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যার মধ্যে: ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের অভিযান এবং নতুন বিশ্ব আবিষ্কারে কলাম্বাসের অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

"শহর চিত্র, রীতি-নীতি, জাহাজ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর বিবরণ এবং বিশেষ কিছু মানচিত্রে আঁকা চিত্রগুলো রীতিমতো এগুলোকে শিল্পের স্থানে নিয়ে এসেছে।" - অধ্যক্ষ গুনসেল রেন্ডা, Hacettepe University, আঙ্কারা, তুরস্ক

ইউরোপের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে "কিতাবুল বাহরিয়া"-এর ৩০-টির মতো পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এগুলোর বেশিরভাগই প্রথম সংস্করণ। পিরি রেইস সম্পর্কে এই বিভাগের মানচিত্র অধ্যায়ে আরও তথ্য আলোচিত হয়েছে এবং একইসাথে সে অধ্যায়ে চীনা মুসলিম নৌ-সেনাপতি যেং হো নিয়ে কিছুটা আলোচনা রয়েছে।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 নৌ অভিযান

📄 নৌ অভিযান


আজ থেকে ৬৩০ বছরেরও আগে এমন এক মানবের জন্ম হয়েছিল, সমুদ্র অভিযানে যিনি ছিলেন কিংবদন্তীদের জনক।

যেং হো নামে পরিচিত এই ব্যক্তি পরিণত হয়েছিলেন 'চীনা নৌবহরের সেনাপতি'-তে। যেং হো-কে নিয়ে লেখা "১৪২১" গ্রন্থের রচয়িতা গ্যাভিন ম্যানজিয়েসের তথ্য মোতাবেক, পুরো ভারত মহাসাগরে অভিযান চালনার পাশাপাশি মক্কা, পারস্য উপসাগর, পূর্ব আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও আরব অঞ্চল জুড়ে তার অভিযানের ব্যাপ্তি ছিল। ক্রিস্টোফার কলাম্বাস কিংবা ভাস্কো দ্য গামার অভিযানের বহু যুগ আগেই তিনি সমুদ্র জয়ে নেমেছিলেন, অন্যদিকে কলাম্বাস ও ভাস্কো দ্য গামা যে আকৃতির জাহাজ নিয়ে অভিযানে নেমেছিলেন, তার আকৃতি যেং হোর জাহাজের এক-চতুথাংশেরও সমান নয়।

বিশ্বের দরবারে চীনকে শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে যেং হো নামের এই মুসলিমের ছিল অসামান্য অবদান। ২৮ বছরের ভ্রমণকালে তিনি বাণিজ্য ও কূটনীতির নামে প্রায় ৩৭-টি দেশ সফর করেছিলেন। এই অভিযানগুলো ৫০,০০০ কিলোমিটার (৩১,০০০ মাইল)-এরও অধিক দূরত্ব পাড়ি দিয়েছিল। তার প্রথম নৌবহরে অন্তর্ভূক্ত ৩১৭-টি জাহাজে পুরুষের সংখ্যা ছিল: ২৭,৮৭০। এ যেন ছোট একটি নগর বা গোটা ফুটবল স্টেডিয়াম সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্পূর্ণ অজানা জল-সীমায় এমন প্রকাণ্ড নৌবহর চালাতে নৌযান পরিচালনাতে ব্যাপক দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যবস্থাপনা কাজে পারদর্শীতা এবং এ কাজে যেং হোর নৈপুণ্যের কোনো কমতি ছিল না। ওই সময়ে তিনি যা অর্জন করেছিলেন, তার সাথে বর্তমানের কিছুর যদি তুলনা দিতে হয়, তবে তা কেবলই: চন্দ্র অভিযান।

যেং হো মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন এবং তার নাম ছিল মা হো। তার পিতা ও দাদা হজ্জ পালনের জন্য মক্কা গিয়েছিলেন, সে সুবাদে তিনি আরবী ও চীনা ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। আক্রমণকারী চীনা মিং রাজবংশ বালক বয়সে তাকে তার শহর কুনমিং থেকে মঙ্গোলিয়ায় নিয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে তার জননাঙ্গ কেটে দেয়া হয় এবং এতে তিনি পরিণত হন খোজা পুরুষে। রাজ পরিবারে তিনি কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পান এবং তিনি যুবরাজ ডিউক ইয়ান বা যু-দির বিশ্বস্ত অনুচরে পরিণত হন। যু-দি পরবর্তীতে ক্ষমতার মসনদ দখল করলে বনে যান সম্রাট ইয়ং লি-তে।

গ্যাভিন ম্যানজিয়েস বলেন, "দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হওয়ার পাশাপাশি যেং হো অত্যন্ত ধার্মিক মুসলিম ছিলেন এবং তিনি যু-দির ঘনিষ্ঠ পরামর্শকে পরিণত হন। শক্তিমান এই ব্যক্তি যু-দির চেয়েও লম্বা ছিলেন; কিছু বর্ণনা মতে, 'বাঘের ন্যায় পদক্ষেপ ফেলা' এই ব্যক্তি দুই মিটারের চেয়েও লম্বা ছিলেন এবং তার ওজন ছিল একশ কেজির ঊর্ধ্বে।"

নিবেদিত সেবা এবং নৃপতির সবগুলো সফল সামরিক অভিযানে সঙ্গদান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য মা হো-কে রাজ পরিবারের সামরিক মহাঅধিনায়েকের খেতাব দেয়া হয় এবং 'যেং' পদবীতে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও তিনি তিন-খোজা-মণি (সান-পাও থাই-চীয়েন) হিসেবেও সমধিক পরিচিত ছিলেন, যা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সম্পর্ক (যদিও তিনি মুসলিম) এবং উচ্চ প্রাসাদ পরিষদের সম্মানসূচক মুকুটের প্রতিনিধিত্ব করে।

'গুপ্তধন অনুসন্ধানী' সাতটি সমুদ্র অভিযানে নামার পিছনে বহু কারণ ছিল। মুক্তা, খনিজ পদার্থ, উদ্ভিদ, লতা-গুল্ম, জীবজন্তু, ঔষধ, বিভিন্ন চিকিৎসা কৌশল ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অনুসন্ধান ছিল এই অভিযানগুলোর প্রধান কারণ এবং অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সম্রাট চেয়েছিলেন বিশ্বের নৌচালন এবং মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে সমৃদ্ধ করতে; এছাড়া বাকি বিশ্বের কাছে চীনকে অন্যতম সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি বেশ সচেষ্ট ছিলেন। এজন্য তখন বহির্বাণিজ্যে উৎসাহ দেয়া হতো, অর্থাৎ এতে অন্য দেশগুলো প্রকাণ্ড চীনা জাহাজগুলো দেখবে এবং এতে চীনা প্রতিপত্তির খ্যাতি সবদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সাম্রাজ্যিক পরাশক্তির প্রকাণ্ড 'শক্তিধর জাহাজগুলো'র শক্তিমত্তাকে স্বীকৃতি দিয়ে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নেতাগণ বশ্যতা মেনে নেয়, অন্যদিকে কূটনৈতিক সম্পর্কের বদৌলতে অন্যান্য জাতিগুলো চীনের সাথে আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন করে। আনুগত্যের সমর্থন হিসেবে দেশগুলো সম্রাটের নিকট দূত পাঠাতো।

১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে যেং হো তার এই মহাঅভিযানগুলো পরিচালনা করেছিলেন এবং তার সাথে ছিল আরও দু'জন দক্ষ খোজা নেতা - হাউ হসিয়েন এবং ওয়াং চীং হাং। শৃঙ্খলার সাথে পরিচালিত অতিকায় ও প্রকাণ্ড সব জাহাজ ছিল এই অভিযানের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক। যেং হো লিখেছেন, "৬২-টি অতিকায় জাহাজ ছিল ৪৪০ ফুট লম্বা এবং দীর্ঘতম প্রন্থ ১৮০ ফুট।" এগুলো মিং সাম্রাজ্যের পরিমাপের একক (০.৩১ মিটার অথবা ১.০২ ফুট), তাই এগুলো আমাদের পরিমাপে হবে: লম্বায় ১৩৭ মিটার (৪৪৯ ফুট) এবং প্রন্থে ৫৬ মিটার (১৮৪ ফুট)। যেং হো আরও লিখেছেন যে, নাবিক, কেরানি, দোভাষী, সৈনিক, শিল্পী, চিকিৎসক এবং আবহাওয়াবিদসহ তার প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ জন মানুষ ছিলেন। চতুর্থ অভিযানে তিনি ৩০,০০০ মানুষ নিয়ে আরব ও লোহিত সাগরের দ্বারপ্রান্তে গিয়েছিলেন।

চীনা জাহাজ নির্মাতাগণ ঠিক বুঝে ছিলেন যে, প্রকাণ্ড আকৃতির কারণে এসব জাহাজ থেকে রণকৌশল পরিচালনা বেশ কঠিন হবে। তাই তারা জাহাজগুলোতে 'ভারসাম্য রাডার' স্থাপন করে, যা ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনে উপরে ও নিচে নেমে যায়। আজকের জাহাজ নির্মাতাগণ এখনও এটার কুল কিনার করতে পারেননি যে, ইস্পাতের কাঠামো ছাড়া কীভাবে ৪০০ ফুট লম্বা এসব জাহাজ সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অনেকে তো এ ধরনের জাহাজের অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধায় পর্যন্ত পড়ে গিয়েছে।

কিন্তু ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে নানচিং-এর একটি নৌবন্দরের ধ্বংসস্তুপে 'গুপ্তধন অনুসন্ধানী' জাহাজের রাডার পোস্ট উদ্ধার হয়। সাধারণ ঐতিহ্যবাহী সমতল পাটাতনের চীনা নৌকাগুলোর অনুপাতের সাহায্যে উল্টো হিসাবের মাধ্যমে এই রাডারের আনুমানিক পরিমাপ দাঁড়ায়: ১৫২ মিটার (৫০০ ফুট)।

পাটাতনের দিক দিয়ে প্রকাণ্ড এই জাহাজগুলো ছিল কার্গো (পণ্যবাহী জাহাজ)-তুল্য, যেগুলো রেশমি ও সুতি বস্ত্র, চীনামাটির বাসনকোসন, স্বর্ণ ও রৌপ্য সামগ্রী, তামার গৃহস্থালী সরঞ্জাম এবং লোহার হাতিয়ারে বোঝাই ছিল। জিরাফ, জেব্রা বা 'স্বর্গীয় ঘোড়া', আফ্রিকার কৃষ্ণসার মৃগ বা 'স্বর্গীয় হরিণ' এবং উটপাখির ন্যায় জীবজন্তু বহনের পাশাপাশি জীবন্ত মাছ রাখা ও গোসলের জন্য জাহাজে জলরোধী বেষ্টনীরও ব্যবস্থা ছিল।

ভাসমান জলাধারের মাধ্যমে এই জাহাজগুলো পানি নিষ্কাশন করতো এবং যোগাযোগের জন্য এরা ব্যবহার করতো: পতাকা, লণ্ঠন, ঘণ্টা, ধাতুর তৈরি চাকতির ন্যায় ঘণ্টা, বাহক কবুতর এবং ঝাণ্ডা। অভিযানগুলো নিয়ে মিং আমলের একটি বর্ণনা, "দক্ষিণ সমুদ্রে যাত্রা করা জাহাজগুলো ছিল বাড়ির ন্যায়। যখন এদের পালগুলো নজরে আসতো, তখন তা মনে হতো আকাশের মেঘ।" এই জাহাজগুলো সামষ্ঠিকভাবে 'সাতারু ড্রাগন' নামে পরিচিত ছিল, যেহেতু 'দেখা'-র সুবিধার জন্য এসব জাহাজের সামনের অংশে ড্রাগনের চোখের ন্যায় বিন্দু আঁকা ছিল।

যেং হোর সাতটি অভিযানের শেষে চীন নৌ-প্রযুক্তি ও প্রতিপত্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠে এবং এর পাশাপাশি বহু বিচিত্র প্রাণী প্রথমবারের মতো চীনে প্রবেশ করে, যেমন: আফ্রিকা থেকে আসা জিরাফ। প্রথমদিকে ভুলভাবে এটাকে চীনা রূপকথার প্রধান ইউনিকর্ন বা অদ্ভুত কাল্পনিক জন্তু কিলিন মনে করা হতো। কনফুসীয় ঐতিহ্যে কিলিন ছিল চূড়ান্ত প্রজ্ঞার ঋষি এবং তার উপস্থিতি দয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হতো।

এটা ধারণা করা হয় যে, ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে ফিরতি যাত্রায় যেং হো ভারতে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এবং কনফুসীয় দর্শনের পুনর্জাগরণের ফলে চীনা সাম্রাজ্য অন্তর্মুখী হয়ে উঠে এবং শেষমেশ সমুদ্রগামী বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়। একশ বছরেরও কম সময়ে, চীন থেকে বহু মাস্তুলের জাহাজে করে সমুদ্র যাত্রায় বের হওয়াটা রীতিমতো বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনা সম্রাট সব ধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। হায়! ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌ-বাহিনী, এককালে যার ছিল ৩,৫০০ জাহাজ (বর্তমানে মার্কিন নৌ-বাহিনীতে প্রায় ৪৯০-টি জাহাজ রয়েছে), সাম্রাজ্যের এমন নীতিতে তা হারিয়ে গেল।

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে যেং হোর অভিযানের ৫৮০-তম বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তার সমাধি সংস্কার করা হয় এবং নানচিং-এ থাকা তার কবর ইসলামী রীতিতে সংস্কার করে নতুন সমাধি স্থাপন করা হয়। তার সমাধি স্থলের প্রবেশদ্বার মিং রীতিতে নির্মিত এবং সেখানে মেমোরিয়াল হলটি অবস্থিত। হলের অভ্যন্তরে রয়েছে এই মহামানবের বিভিন্ন ছবি, ভাস্কর্য এবং তার নৌচালনের বিভিন্ন মানচিত্র।

"আমরা সমুদ্রে দেখছিলাম পর্বততুল্য ঢেউ আসমান ছুঁয়ে আমাদের উপর আছড়ে পড়ছে এবং সেইসাথে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখছিলাম দূর-দূরান্তের অঞ্চলগুলোর দিকে, আড়াল হয়ে আছে যা মৃদু বাষ্পের নীল স্বচ্ছতার পশ্চাতে। ওদিকে আমাদের জাহাজগুলো মেঘের ন্যায় বাতাসে ভাসছে; দিনে ও রাতে চলমান রেখেছে তাদের যাত্রাপথ দ্রুত ধাবমান তারকার গতিতে; অগ্রসর হচ্ছে বুনো তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে, যেন আমরা মাড়িয়ে চলছি লোকারণ্যে ভরা সড়ক।" -নিজের আত্মজীবনী "মিং শিহ" (Ming Shih)-তে যেং হোর বক্তব্য

তার সমাধিস্থল অভিমুখী পথ নতুন করে পাথরে বাঁধানো হয় এবং তাতে বসানো হয় সারি সারি সোপান ও ধাপ। সমাধিস্থলের দিকে চলে যাওয়া সিঁড়িপথ চারটি সমান ভাগে বিভক্ত ২৮-টি পাথরের ধাপ দিয়ে সাজানো, যা বস্তুত যেং হোর পশ্চিম অভিমুখী সাতটি অভিযানের প্রতীকী রূপায়ন। তার সমাধির উপরে খোদাই করে লিখা আছে: আল্লাহু আকবার আল্লাহ-ই মহান।

যেং হোর ন্যায় এত বিশাল নৌবহর কিংবা তার জাহাজের ন্যায় এত মাল্গুলের জাহাজের নজির বিশ্বে নেই বললেই চলে। সমুদ্রে চলার সময় এই নৌবহরকে মনে হতো ভাসমান শহর। এই জাহাজগুলোর অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে নানচিংয়ের নিকটবর্তী ড্রাগন বে শিপইয়ার্ডে, যার ধ্বংসাবশেষ আজও দৃশ্যমান।

■ যেং হোর সাত মহাকাব্যিক অভিযান ১. ১৪০৫-১৪০৭: এ অভিযানে তিনি চম্পা (ইন্দোচীন), জাভা ও সুমাত্রা, সিলন এবং ভারতের কলকাতা ভ্রমণ করেন। ২. ১৪০৭-১৪০৯: এ অভিযানে সিয়াম (Siam) এবং ভারত ভ্রমণ করেন এবং কচিতে যাত্রা বিরতি দেন। ৩. ১৪০৯-১৪১১: মালাকা-কে কেন্দ্রে রেখে পূর্ব ভারতের বহু স্থান ভ্রমণসহ তিনি এ অভিযানে প্রথমবারের মতো ভারতের কিউলন (Quilon)-এ যান। ৪. ১৪১৩-১৪১৫: এই অভিযানে নৌবহর বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি অংশ আবারও পূর্ব ভারত এবং অপর অংশ সিলনকে কেন্দ্রে রেখে বাংলা, মালদ্বীপ ও হরমুজের পারস্য সালতানাত পর্যন্ত যায়। এই যাত্রা এতটাই উদ্দীপন সৃষ্টি করেছিল যে, ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে দূতদের একটি বিশাল বহর নানচিং পর্যন্ত সফর করে। পরবর্তী বছর বিশাল নৌবহরে করে তাদেরকে তাদের দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়। ৫. ১৪১৬-১৪১৯: শান্তিকামী নৌবহরগুলো এই অভিযানে জাভা, রিউকু দ্বীপপুঞ্জ ও ব্রুনাই সফরে যায়। অন্যসব নৌবহর ভারতকে কেন্দ্রে রেখে হরমুজ, এডেন, মোগাদিসু, মোম্বাসা ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দরে যায়। এই অভিযান থেকেই চীনে প্রথম জিরাফ নেয়া হয়। ৬. ১৪২১-১৪২২: একই সমুদ্রপথ ধরে পূর্ববর্তী অঞ্চলগুলোর সাথে এই যাত্রায় যোগ হয় দক্ষিণ আরব ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দর। পূর্বের বোর্নিও থেকে পশ্চিমে জানজিবার পর্যন্ত এই নৌবহর দুই বছরে ৩৬-টি দেশ ঘুরে। এ থেকে সহজে অনুমিত হয় যে, নৌবহরগুলো আগের অভিযানের মতো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয় এবং মালাকা বন্দর ছিল তাদের জাহাজগুলোর প্রধান মিলনস্থল। রেডিও ব্যবহারের আগ পর্যন্ত কোনো বন্দরকে প্রধান মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহারের নজির স্থাপনে এটা ছিল বিস্ময়কর অর্জন। ৭. ১৪৩১-১৪৩৩: সর্বশেষ এই অভিযানে যেং হো ছিলেন ষাটে পা দেয়া ব্যক্তি, যিনি ইতোমধ্যেই সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন জাভা থেকে মক্কা ও পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত ২০-এরও অধিক দেশ ও সাম্রাজ্যের সাথে। এই চীনা নৌবহরগুলো পূর্ব আফ্রিকার কতটুকু গিয়েছিল, তা কেউ না জানলেও কিছু বর্ণনামতে, এরা উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত চক্কর দিয়েছিল।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বৈশ্বিক যোগাযোগ

📄 বৈশ্বিক যোগাযোগ


ইলেকট্রিক বা কাগজ- যে মাধ্যমেই তথ্যের আদান-প্রদান হোক না কেন, যেকোন সময় তা ঝুকির মুখে পড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ গোপন বার্তা ভুল মানুষের হাতে পড়া ঠেকাতে সাংকেতিক বার্তা প্রেরণ করা হয়, যেন সঠিক সংকেত জানা ব্যক্তিটি তার মর্মোদ্ধারে সক্ষম হয়।

সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারের এমন একটি ঘটনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ঘটেছিল, যখন জার্মানরা এনিগমা (Enigma) নামের টাইপ-রাইটার ব্যবহার করে রেডিওতে প্রচারের পূর্বে কিছু বার্তা এনক্রিপ্ট বা সংকেতযুক্ত করে পাঠাচ্ছিল। সাংকেতিক কোড ভাঙতে সক্ষম একদল পোলিশ সাইফার ব্যুরো এবং আরেকদল ব্রিটিশ ব্লেচলে পার্কে থেকে জার্মানদের ওই বাতার কোড ভেঙে ফেলে।

"সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার- এ বিদ্যার সূচনার জন্য প্রয়োজন এমন এক সমাজের, যারা তিনটি দিকে সমৃদ্ধির চূড়ায় আরোহণ করেছে, যথা: ভাষাতত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং গণিত। এই তিনটি শর্ত আল-কিন্দীর সময় সহজলভ্য হয়ে উঠে এবং এই তিন শাস্ত্রসহ আরও বহু বিষয়ে তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।" - ড. সাইমন সিং, The Code Book (১৯৯৯)

বিংশ শতাব্দির এই লোকগুলো বস্তুত কোড ভাঙার ওই ঐতিহ্যকে আগে বাড়িয়েছে, যা নিয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেছিলেন ৯ম শতাব্দির বহুবিদ্যায় সমান পারদর্শী বাগদাদের আল-কিন্দী। ওই সময় বার্তার আদান-প্রদান পাখির মাধ্যমে হওয়ায় সেগুলোকে ওজনে বেশ হালকা হতে হতো এবং গোপনীয় বার্তাগুলো সাংকেতিকভাবে পাঠানো হতো। "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা" (সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার বিষয়ক পুস্তিকা) লিখে ক্রিপ্টগ্রাফি শাস্ত্রে তিনি এক যুগান্তকারী বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। এই পুস্তকের একটি অংশে পুনরাবৃত্তি বা ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অর্থাৎ একটি সাধারণ বর্ণকে যদি ভিন্ন আরেকটি বর্ণ দিয়ে বদলানো থাকে, তবে ওই নতুন বর্ণটি মূল বর্ণের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে- বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন। আমরা যদি ইংরেজি ভাষার দিকে খেয়াল করি, তবে দেখবো বিভিন্ন শব্দে 'e' (ই) বর্ণটি অন্যসব বর্ণের চেয়ে ১৩% বেশি আবির্ভূত হয়েছে। তাই 'e' (ই) বর্ণটি যদি # সংকেত দ্বারা বদলে দেয়া হয়, তবে # পরিণত হবে সবচেয়ে বেশি আবির্ভূত সংকেতে এবং এটার ব্যবহারের হারও অন্যসব সংকেতের চেয়ে ১৩% বেশি হবে। একজন সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক (cryptanalyst) তখন বের করতে সক্ষম হবে যে, # সংকেতটি মূলত 'e'-এর প্রতিনিধিত্ব করছে।

কুরআনের আরবী ভাষ্য নিয়ে গবেষণার সময় বর্ণের ফ্রিকুয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তির বিষয়টি তার নজরে আসে, যা ছিল ক্রিপ্টগ্রাফির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মূল নিয়ামক। ইউরোপের রেনেসাঁ আমলে বহু সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক আল-কিন্দির প্রতিষ্ঠিত ভিতকে আরও সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম হয়। বড় রকমের সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার ও কোড ভাঙার পদ্ধতি যদিও ১১০০ বছর পূর্বে আল-কিন্দীর হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে, তথাপি 'cryptanalysis' (সাংকেতিক বার্তা পর্যবেক্ষণ) শব্দটি বেশ সাম্প্রতিক এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম ফ্রেডম্যান সর্বপ্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন।

ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ বর্তমানে ধ্রুপদী কোড ভাঙার মৌলিক হাতিয়ার, যা বর্ণমালার সাধারণ পঠনকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এই বিদ্যা ভাষার সাধারণ পাঠের সংখ্যা ও ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের পারদর্শীতার উপর নির্ভর করে। আধুনিক সংকেতগুলো বেশ জটিল, কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও আমেরিকা তাদের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে শব্দ সাজানোর ধাঁধা দিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো এবং দ্রুততম সময়ে যারা সেগুলো সমাধান করতো, তাদেরকে কোড ভাঙার কাজে নিয়োগ দেয়া হতো।

■ বিমান-ডাক
বর্তমানে আমাদের নিকট ডাক যোগাযোগ মামুলি হলেও একটা সময় পায়রা-ডাক বা প্রশিক্ষিত কবুতর দিয়ে বার্তার অপব্দ-প্রদানই ছিল একমাত্র সহজলভ্য 'বিমান-ডাক'।

বার্তাবাহক কবুতর নিয়ে লেখা এক গ্রন্থে মুসলিম পণ্ডিত ইবনে আবদ আয-যাহির লিখেছেন, তৎকালীন যোগাযোগের সবুকেন্দ্র কায়রোর নগরদুর্গে সাধারণত ১,৯০০-এর মতো কবুতর থাকতো।

মুসলিম কাহিনীকার আন-নুয়াইরী ১০ম শতাব্দির আজিজ নামে পরিচিত এক ফাতিমী খলীফা সম্পর্কে লিখেছেন: কায়রোতে থাকাকালে তার একবার এন্টিয়কের সতেজ চেরিফল খাওয়ার বাসনা জাগে। এন্টিয়কের নিকটস্থ বালবেকে বার্তাবাহক কবুতর দিয়ে আদেশ পাঠানো হয়। তখন প্রতিটি কবুতরের পায়ে একটি চেরিফল মোড়ানো রেশমি খালে আটকে দিয়ে প্রায় ৬০০ কবুতর কায়রো পাঠানো হয়। ইচ্ছা করার তিনদিনের মাথায় বিশেষ 'বিমান-ডাক' ডেলিভারির মাধ্যমে খলীফার সামনে আনা হয় লেবানন থেকে পাঠানো ১,২০০ সতেজ চেরিফলের এক বিশাল পাত্র।

কোড ভাঙা "এনক্রিপ্ট করা বা সাংকেতিক বার্তা পাঠোদ্ধারের একটি পথ হচ্ছে: আমরা যদি এটার ভাষ্য জানি, তবে ওই একই ভাষার বিকল্প সহজবোধ্য পাঠ বের করা, এরপর প্রতিটি বর্ণের পুনরাবৃত্তি গণনা করা। যে সংখ্যাটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, আমরা সেটাকে 'প্রথম', এরপরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে দ্বিতীয়', পরেরটি 'তৃতীয়' এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা নমুনাতে সাধারণ পাঠটির সবগুলো ভিন্ন বর্ণ লিখছি... এরপর আমরা যে প্রতীকী বার্তার পাঠোদ্ধার করতে চাই, সেটাতে মনোযোগ দিয়ে সেটার প্রতীকগুলো শ্রেণিবদ্ধ করবো। যে প্রতীকটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, সেটাকে আমরা আমাদের সহজবোধ্য পাঠের 'প্রথম' বর্ণ দ্বারা বদলে নেবো, পরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে আমরা 'দ্বিতীয়' বর্ণ দ্বারা বদলে দেব এবং এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা আমাদের সাংকেতিক বার্তার পুরো প্রতীকটি পাচ্ছি।" -আল-কিন্দী রচিত ৯ম শতাব্দির "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা"

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র

📄 যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র


১৩শ শতাব্দির সামরিক বিষয়াদি নিহায়েৎ জটিল ছিল না, বরং তা ছিল অত্যাধুনিক। গ্রেনেড, সালফার বোমা, কামান, রকেট এবং টর্পেডো ছিল সামরিক আলোচনার অন্তর্ভূত। সামরিক প্রযুক্তি বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা ছিল সিরীয় পণ্ডিত হাসান আর-রাম্মাহর "কিতাবুল ফুরূসিয়াত ওয়াল মানাসিবুল হারবিয়্যা” (অশ্বচালন নৈপুণ্য ও অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র) শীর্ষক গ্রন্থটি, যা ১২৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত। রকেটের প্রথম লিখিত দলিলসহ গ্রন্থটি ছিল বিভিন্ন যুদ্ধান্ত্রের ডায়াগ্রামে পূর্ণ। এই গ্রন্থে বর্ণিত রকেটের একটি ডিজাইন ওয়াশিংটন ডিসির জাতীয় বিমান ও মহাকাশ জাদুঘরে প্রদর্শিত অবস্থায় রয়েছে।

চীনারা প্রথম গানপাউডার উদ্ভাবন করেছিল এবং কেবল আতশবাজিতে ব্যবহারের জন্য তারা গানপাউডারের অন্যতম উপাদান সল্টপিটারের ব্যাপক উন্নয়ন করেছিল। আমানি যেইন বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র What the Ancients Did for Us-এ বলেন, "গবেষণা দেখাচ্ছে যে, মুসলিম রসায়নবিদগণ শক্তিশালী গানপাউডার তৈরির এক কার্যকর সূত্র উদ্ভাবন করেছিল এবং অনেকেই তাদের প্রথম আগ্নেয়াস্ত্রে সেটার ব্যবহারও করেছিল।"

সঠিক অনুপাত বের করতে না পারা এবং পটাশিয়াম নাইট্রেট পরিশুদ্ধ করতে না পারার কারণে চীনারা এটাকে বিস্ফোরনে ব্যবহার করতে পারছিল না। ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে বিস্ফোরকের অনুপাত বিষয়ে প্রথম চীনা গ্রন্থ হো লাং চীং কর্তৃক রচিত হয়। এর প্রায় একশ বছর পূর্বে হাসান আর-রাম্মাহর গ্রন্থ প্রথমবারের মতো পটাশিয়াম নাইট্রেট বিশোধনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে এবং সেইসাথে বিস্ফোরক গানপাউডার তৈরির বহু রেসিপির বিবরণ দেয়।

"আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাইবারসের নেতৃত্বাধীন মুসলিম সেনাদলের গানপাউডারের ব্যবহার যুদ্ধের নিয়তি মুসলিমদের অনুকূলে নিয়ে আসে। মিশরের আল-মানসূরা যুদ্ধে মুসলিমদের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো এতটাই ভয়ানক এবং ধ্বংসাত্মক ছিল যে, ফরাসি ক্রুসেডার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় এবং রাজা নবম লুইস তাতে বন্দি হন" বিবিসি

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00