📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 পর্যটক এবং অভিযাত্রী

📄 পর্যটক এবং অভিযাত্রী


১৩০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে মুসলিম বিশ্ব ছিল এক বৃহৎ সাম্রাজ্য, যার আওতায় ছিল ওই সময়ের জানা পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা এবং একতাবদ্ধ ছিল ইসলামের মূলনীতির সাথে। ১১শ শতাব্দির বহুশাস্ত্রবিদ আল-বিরুনী তার "তাহদীদ নিহায়াত আল-আমাকিন লি-তাসতীহ মাসাফাত আল-মাসাকিন" (শহরসমূহের স্থানাঙ্ক নির্ণয়) গ্রন্থে বলেন, "ইসলাম ইতোমধ্যেই দুনিয়ার প্রাচ্য থেকে পশ্চিমের শহরগুলোতে পৌঁছে গেছে। পশ্চিমে এটা পাড়ি দিয়েছে আন্দালুস পর্যন্ত, পূর্বে দিয়েছে একেবারে চীনের সীমা এবং ভারতের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত। দক্ষিণে এটা পৌঁছেছে আবিসিনিয়া ও যানজ শহর (নিম্ন সাহারা এলাকা) হতে মালি হয়ে কিলওয়া (তানযানিয়া) এবং মোরিতানিয়া থেকে ঘানা পর্যন্ত। পূর্বে এটা আরও পাড়ি দিয়েছে মালয় দ্বীপপুঞ্জ ও জাভা সীমা এবং উত্তরে এটার বিস্তৃতি গিয়ে ঠেকেছে তুরস্ক ও সার্বিয়া অবধি। পারস্পরিক আদান-প্রদানের ভিত্তিতে এভাবে একত্র হয়েছে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী, যা কেবল এক আল্লাহর কৃপা ছাড়া সম্ভব ছিল না।"

হজ্জে যাওয়ার পথ ও বাণিজ্য সড়ক সুবিশাল এ মুসলিম সাম্রাজ্যের বুকে ধমনীর ন্যায় ছড়িয়ে থেকে এটাতে করেছে প্রাণের সঞ্চার। সম্পর্কের জালে বিস্তৃত এই ব্যবস্থায় মুসলিম সুলতানগণ তাদের নিজ নিজ এলাকা শাসন করতেন, কিন্তু ১৩শ শতাব্দীর পর থেকে অন্তর্কলহে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে থাকে, তথাপি একজন সাধারণ মুসলিম এই বিশাল ভূখণ্ডের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত খুব সহজেই এক টুকরো পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র বহন করে যাতায়াত করতে পারতো।

সিরিয়া ভ্রমণের প্রাক্কালে ইবনে বতুতা বলেন, "ব্যক্তির সম্পদের নিরাপত্তা এবং মিঙ্গোল বিজিত ইরাকের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তিতে কোনো ব্যক্তি যে জড়িত নয়, তা নিশ্চিতে ছাড়পত্র ব্যতীত কেউ এই এলাকা পার হতে পারতো না ... এখান দিয়ে পার হওয়ার রাস্তা বেদুইনদের দখলে ছিল। সন্ধ্যা হলে তারা এ পথ বালি দিয়ে সমান করে দিতো, যেন কোনো চিহ্ন বাকি না থাকে। সকালে গভর্নর এসে বালি সরিয়ে দেখতো। যদি কোনো আরবের পায়ের চিহ্ন পাওয়া যেত, তবে তাকে হন্যে হয়ে খোঁজা হতো এবং খুব কম তার এ অনুসন্ধান থেকে রক্ষা পেত।"

মুসলিমরা স্বভাবতই ভ্রমণ পিয়াসু ছিল, যেহেতু ইসলামের নিয়ম মোতাবেক সামর্থ্যবান প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে অন্তত একবার হজ্জ পালনে মক্কায় আসাটা বাধ্যতামূলক। ৭ম শতাব্দি থেকে পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পায়ে হেঁটে হলেও ইসলামী সাম্রাজ্যের মক্কাতে পাড়ি জমাতে শুরু করে, আর একান্ত সৌভাগ্যবানেরা হয় উটের পিঠে, গরু-চালিত বাহনে করে কিংবা ঘোড়া ও গাধায় চড়ে এ পথটুকু পাড়ি দিতো। ভ্রমণের সাথে তারা তাদের সফরের বিবরণ লিখে রাখতো। এসব বিবরণের অনেকগুলোই ছিল আরবী ভ্রমণ সাহিত্যে প্রথম সৃষ্টির মতো, যেমন: চীনের বর্ণনা।

চীন সম্পর্কে প্রথম বর্ণনা ৯ম শতাব্দির দিকে পাওয়া যায়, মূলত তা পারস্য উপসাগরে চীনাদের বাণিজ্য বিবরণ। সিরাফের অধিবাসী আবু যায়েদ হাসান নামের এক মুসলিম বর্ণনা করেন যে, ইরাকের বসরা ও পারস্য উপসাগরের সিরাফ থেকে চীনের উদ্দেশ্যে নৌকা ছেড়ে যেত। মুসলিম নৌকার চেয়ে অতিকায় বৃহৎ চীনা নৌকাগুলো সিরাফেও আসতো এবং ওই নৌকাগুলোতে বসরা থেকে আসা মালামাল বোঝাই করা হতো।

হাজার বছর ধরে এসব নৌকা আরব উপকূল থেকে মাস্কাট হয়ে ওমানে যেত এবং সেখান থেকে তা ভারতে আসতো। পুরো পথ ধরে বাণিজ্য ও মালামালের আদান-প্রদান চলতো এবং শেষমেশ নৌকাগুলো গোয়াংজু (আরবীতে: খানফু) শহরে ভিড়তো, আর এই শহরেই গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম কলোনি। এখানে মুসলিম বণিকদের ছিল নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এবং তাতে সম্রাটের কর্মচারীদের সাথে বাণিজ্য চলতো - পণ্য পছন্দের ক্ষেত্রে এদের পছন্দ সবার আগে প্রাধান্য পেত। খানফু থেকে কিছু মুসলিম চীনা সাম্রাজ্যের রাজধানী ক্যান্টন পর্যন্ত চলে যেতো, যা ছিল দু'মাসের যাত্রাপথ।

"এবং তিনি জমিনে পাহাড় স্থাপন করেছেন, যেন তা তোমাদের নিয়ে হেলে-দুলে না পড়ে, আর তিনি বইয়ে দিয়েছেন নদী; ব্যবস্থা করেছেন রাস্তার, যেন তোমরা পথ পাও। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য আলামত এবং লোকেরা (আসমানের) তারকার সাহায্যেও পথ বের করে নেয়।" - কুরআন (১৬:১৫-১৬)

৯ম শতাব্দির বণিক ইবনে ওয়াহহাব বসরা থেকে চীনে আসেন এবং তার বিবরণ মোতাবেক: চীনের রাজধানী একটি লম্বা ও বেশ প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। রাস্তার এক পাশে সম্রাট, তার রাজ কর্মচারী এবং প্রশাসনিক কর্মচারীরা বসবাস করতো এবং অপর পাশে থাকতো ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষজন। দিনের শুরুতে রাজ কর্মচারী ও সেবাদাসগণ সম্রাটের আবাসিক এলাকা থেকে বেরিয়ে অপর পাশে এসে প্রয়োজন-মাফিক পণ্য কিনে ফিরে আসতো, অতঃপর সেখানে আর প্রবেশ করতো না।

মুসলিম বণিকদের নিকট চীন ছিল নিরাপদ ও আইনের শাসনে শাসিত এক ভূখণ্ড এবং পর্যটকদের সাথে সম্পৃক্ত আইনের বদৌলতে নজরদারীর পাশাপাশি তারা বেশ নিরাপত্তাও ভোগ করতো। ইবনে বতুতা বলেন, "পর্যটকদের জন্য চীন সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বোত্তম দেশ। এমনকি যেকেউ চাইলে কোনো ভয়-ডর ছাড়াই বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে সেখান থেকে একলা ঘুরে আসতে পারে।"

ভূগোলবিদ আল-মুকাদ্দিসী (আনুমানিক ৯৪৫-১০০০ খ্রিঃ) ইবনে বতুতার বহু আগেই নিজ গৃহ জেরুজালেম থেকে বেরিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে শেষ করেছিলেন। তিনি প্রায় মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চল ঘুরে দেখেছেন এবং ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন করেন তার অনবদ্য গ্রন্থ: "আহসানুত তাক্বাসীম ফী মা'রিফাতিল আকালীম" (বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞান লাভের সর্বোত্তম বিভাজন)।

এমন বহু মুসলিম পর্যটক ছিলেন, যারা ইসলামী বিশ্ব ও তার বাহিরের এলাকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হাসিল করেছিলেন। বহু বছরের ভ্রমণ শেষে ৮৯১ খ্রিস্টাব্দে আল-ইয়াকূবী রচনা করেন: "কিতাবুল বুলদান" (শহর-নগর বিষয়ক পুস্তক) - যেখানে তিনি বিভিন্ন শহর, দেশ ও সেখানকার শাসকদের নাম; স্থানীয় শহর ও নগরের দূরত্ব, কর-ব্যবস্থা, স্থান-বিবরণী ও পানির উৎস্যের বর্ণনাও দিয়েছেন। ৯১২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ইবনে খুৱাদাযবিহ তার "আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক" (যাত্রাপথ ও সাম্রাজ্য) গ্রন্থে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান বাণিজ্য-পথের বিবরণ দেয়ার পাশাপাশি চীন, কোরিয়া ও জাপান থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূল হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী, আন্দামান দীপপুঞ্জ, মালয় ও জাভা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার বিবরণও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

১৩শ শতাব্দির ভূগোলবিদ ইয়াকৃত আল-হামাবী লিখেছেন বিশ্বকোষ-তুল্য গ্রন্থ "মু'জামুল বুলদান" (শহর ও নগরের অভিধান) – যেখানে তিনি তার দেখা প্রতিটি দেশ, এলাকা, নগর ও শহরের বর্ণানুক্রমিক বিবরণের পাশাপাশি সেগুলোর প্রকৃত অবস্থান, এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকার পুরাকীর্তি, অর্থনীতি, ইতিহাস, জনসংখ্যা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের হাল-হাকিকতও তুলে ধরেছেন। আবুল ফিদার লেখা ১৩শ শতাব্দির "তাকয়ীমুল বুলদান" (দেশসমূহের সমীক্ষা) শীর্ষক গ্রন্থটি পশ্চিম ইউরোপে এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে, ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার খাওয়ারিযম ও ট্রান্সঅক্সানিয়া নিয়ে এটার দেয়া বিবরণের নির্বাচিত অংশ লন্ডনে থেকে প্রকাশ পর্যন্ত পায়।

মুসলিম পর্যটক এবং তাদের রেখে যাওয়া কাজগুলো পশ্চিমা পণ্ডিতদের দ্বারা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়নি; বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে গ্যাব্রিয়েল ফারনান্দ ৭ম ও ৯ম শতাব্দির মুসলিম পর্যটকদের সুদূর প্রাচ্যের সফরনামা নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। উক্ত গবেষণাতে ৩৯-টি ভ্রমণবৃত্তান্ত অন্তর্ভূত ছিল, যার ৩৩-টি আরবী, ৫-টি ফারসি এবং ১-টি তুর্কি ভাষার। এই গবেষণায় যাদের রচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাদের মাধ্যে ৯ম শতাব্দির পর্যটক আল-ইয়াকূবী অন্যতম; তিনি লিখেছেন, "চীন বিশাল এক দেশ, যেখানে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয়। প্রতিটি সমুদ্রের রয়েছে নিজস্ব রঙ, বাতাস, মাছ এবং প্রফুল্লতার পরিবেশ, যা আরেকটি সমুদ্রে পাওয়া যায় না। এমন সাত সমুদ্রের অন্যতম মালয় দ্বীপপুঞ্জ দ্বারা বেষ্টিত কাংকাহ সমুদ্র। এ সমুদ্র দক্ষিণের বাতাস দিয়ে পাড়ি দিতে হয়।”

"কেউ যদি বের হয় জ্ঞান অর্জনের সফরে, তবে আল্লাহ তাকে জান্নাত অভিমুখী যেকোন একটি রাস্তা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" - নবী মুহাম্মদ (ﷺ), আবু দারদা সূত্রে বর্ণিত

৯ম ও ১০ শতাব্দির আরেক পর্যটক ইবনুল ফাকীহ চীন ও ভারতের কৃষ্টি-কালচার, খাদ্যভাস, পোশাক পরিধান রীতি, ধর্মীয় আচার এবং সেখানের কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণির তুলনামূলক গবেষণা তুলে ধরেছিলেন। ইবনে রুশতাহ এক মদ্যপ রাজা (মালিকুল খামির) নিয়ে লিখেছিলেন, যাকে ঘিরে থাকতো ৮০-জন বিচারক। মদ্যপ অবস্থায় ওই রাজার নেয়া বিভিন্ন হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখলেও ইবনে রুশতাহ এটা উল্লেখ করতে ভুলেননি যে, এই রাজা মুসলিমদের প্রতি বেশ সদয় ছিল। আবু যায়েদও মদ্যপদের দেশ (আরদুল খামির) এবং এর বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে আলোকপাতের সময় মন্তব্য করেন যে, এই অঞ্চলে অশ্লীলতা নেই। আবুল ফারাজের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ভারত ও সেখানকার মানুষের কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় বিষয়াদি। চীন সম্পর্কেও তিনি লিখেছেন যে, এর রয়েছে ৩০০-টি শহর এবং কেউ যদি চীন ভ্রমণ করতে চায়, তবে তার নাম, ভ্রমণ তারিখ, বংশ, পরিচয়, বয়স, সাথে বহন করা মালামাল ও তার সাথিদের বিষয়াদি নথিখাতায় নথিভুক্ত করতে হয়। এই নথি ওই ব্যক্তির ভ্রমণ নিরাপদে সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হতো। পর্যটকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সম্রাটের মান রক্ষার্থেই এমনটি করা হতো।

১৩শ শতাব্দির পর্যটক যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মদ আল-কাজবিনীর দেখা চীনা সমুদ্রে বেড়ে উঠা প্রকাণ্ড মাছ (সম্ভবত তিমি মাছ), বিশালাকার কচ্ছপ এবং সমুদ্র উপকূলে এসে আস্ত মহিষ ও হাতি গিলে খাওয়া দানবাকৃতি সাপের বিবরণও ফারনান্দ তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, নিজের ভ্রমণ করা প্রতিটি অঞ্চলের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা উল্লেখকারী ইবনে সাঈদ আল-মাগরিবীর বেশিরভাগ সময় ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং ভারতীয় উপকূলবর্তী শহর ও নগরে কেটেছে।

১৪শ শতাব্দির পর্যটক আদ-দিমাস্কী লিপিবদ্ধ করেছিলেন আল-কুমর দ্বীপ তথা মালয় দ্বীপপুঞ্জের বিস্তারিত বিবরণ। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, বহু নগর-বন্দরে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে বেশ ঘন বনজঙ্গল রয়েছে এবং সেখানে বেশ উঁচু গাছপালা ও সাদা হাতি দেখা যায়। সেখানে 'রুখ' নামের এক দানবাকৃতি পাখি বাস করতো, যার ডিম ছোট গম্বুজের ন্যায় বড় ছিল।

মুসলিম সমাজে বহুল পরিচিত নীতিবাক্য: "জ্ঞানের অন্বেষণে বের হও, এমনকি তার জন্য সুদূর চীনে যেতে হলেও।"

রুখ পাখি নিয়ে একটি কাহিনী প্রচলিত যে, কিছু নাবিক তার ডিম ভেঙে খেয়ে ফেলে এবং এতে সে বেজায় চটে গিয়ে বড় বড় পাথর পায়ে নিয়ে তাদের সমুদ্র পর্যন্ত ধাওয়া করতে থাকে এবং নাবিকদের দিকে ওই পাথরগুলো সজোরে নিক্ষেপ করতে থাকে। ভয়ার্ত এই নাবিকরা রাত নামলে পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। এই গল্প এবং পর্যটকদের থেকে বর্ণিত অন্যান্য গল্প ইসলামী সাহিত্যে "নাবিক সিন্দাবাদের অভিযান" এবং "আলিফ লায়লা"-সহ বহু উপাখ্যানের রসদ জুগিয়েছিল। "আলিফ লায়লা" কল্পকাহিনীর উৎকর্ষ কারো অজানা নয়; বহু লেখক এটাকে উপজীব্য করে গল্প লিখেছেন, আবার কেউ বানিয়েছেন ফিল্ম ও ড্রামা-সিরিজ। আরব ধারা-বিবরণীকার ইবনে ফাদলানকে ৯২১ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের খলীফা মধ্য ভোলগার বুলগেরীয় রাজার নিকট রাজদূত হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। "কিতাব ইলা মালিক আস-সাকালিবা" নামের সফরনামায় ইবনে ফাদলান তার এই অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন। ইবনে বতুতার সফরনামার ন্যায় এটার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম, যেহেতু এতে রয়েছে উত্তর ইউরোপ ও সেখানকার মানুষ বিশেষভাবে সুইডেনের রুস জনগোষ্ঠীর বিবরণ।

তিনি লিখেছেন, "বাণিজ্য যাত্রায় আসা রুসদের আমি দেখেছি এবং দেখেছি ভোলগায় তাদের তাঁবু পাততে। এদের ন্যায় এমন সুঠام দেহের মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি, খেজুর গাছের ন্যায় লম্বা, সোনালি চুল এবং লালিমামণ্ডিত। না জোব্বা আর না কটিবন্ধনযুক্ত প্রশস্ত জামা তারা পরতো, তবে তাদের পুরুষেরা বিশেষ আলখাল্লা পরতো, যা তাদের দেহের একপাশ ঢেকে দিতো এবং একটি হাত খোলা রাখতো।"

এই গ্রন্থ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ঔপন্যাসিক মাইকেল ক্রিচটল রচনা করেন Eaters of the Dead (মৃত খাদক), যার কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয় The 13th Warrior চলচিত্রটি। আধুনিক সময়ের বহু মানুষই মুসলিম পর্যটকদের দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত। ইবনে বতুতার কিংবদন্তী প্রদর্শনের মাঝে উল্লেখযোগ্য: দুবাইয়ে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ শপিংমল, যা তার নামে নামকৃত; এছাড়া 'Beat from Baghdad' গানসহ জার্মান ব্যান্ড এমব্রিও (Embryo)-এর মিউজিক সিডি উল্লেখ করার মতো।

■ ইবনে বতুতা
১৩ জুন, ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২১ বছর বয়সে নিজের গাধার পিঠে চড়ে ইবনে বতুতা মরক্কোর তানজাহ থেকে মক্কা অভিমুখে তার ৩০০০ মাইলের যাত্রা শুরু করেন। নিজের পরিবার, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও শহর থেকে দীর্ঘ ২৯ বছর পরবাসে থাকা এই ব্যক্তি নিজভূমে ফিরে আসলেও পাননি অনেকের সাক্ষাত, যেহেতু তার ফেরার আগেই প্লেগের ভয়াল থাবা গ্রাস করেছিল তার লোকালয়কে।

তার সফরনামা আমাদের সামনে তুলে এনেছে মধ্যযুগীয় বিশ্বের নানা চিত্র, আমরা জেনেছি: স্বর্ণতুল্য এই মানুষ ভ্রমণ করেছেন আফ্রিকার সাহারার দক্ষিণভূমি থেকে মিশর ও সিরিয়া; হজ্জের জন্য প্রতিনিয়ত গিয়েছেন মক্কায়; মালদ্বীপের খোলস থেকে চষে বেরিয়েছেন উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত, আর সুদূর চীন থেকে আনা মৃৎসামগ্রী ও কাগজের মুদ্রা তার সাথে করে পৌঁছে যায় পশ্চিমে। পশমি ও সুতি বস্ত্র, স্বর্ণ ও তরমুজ, হাতির দাঁত ও রেশম, শায়খ ও সুলতান, বিজ্ঞ পণ্ডিত ও সতীর্থ হজ্জযাত্রী - কত কিছুরই না অভিজ্ঞতা ইবনে বতুতা তার এ দীর্ঘ যাত্রায় জমা করেছিলেন। সুলতান ও সম্রাটদের দরবারে তিনি ছিলেন প্রধান বিচারপতি এবং ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে তার এসবের পিছনে ঈমানের অনুপ্রেরণা সচল ছিল। কায়রো ও দামেস্কের ন্যায় ইসলামী শহরগুলো ঘুরে বেড়ানো এবং তার সময়ের আলোকিত মানুষদের থেকে জ্ঞান হাসিল করে অতিবাহিত করেছেন নিজের গোটা জীবন।

"জ্ঞানের অন্বেষণে বের হও, এমনকি তার জন্য সুদূর চীনে যেতে হলেও" - নবী মুহাম্মদ (ﷺ) থেকে প্রমাণিত নয়, তথাপি মুসলিম সমাজের লোকমুখে প্রচলিত এই নীতিবাক্যকে ইবনে বতুতা একেবারে আক্ষরিক রূপ দিয়েছিলেন। তার এই যাত্রা পরিণত হয়েছিল এক শিক্ষাসফরে, যেখানে ধর্মাচার, বাণিজ্য থেকে রোমাঞ্চ – সবই ছিল। ১৪শ শতাব্দীর ইউরেশিয়ার বিভিন্ন আচার-সংস্কৃতি, সমতা, অর্থদান, বাণিজ্য, আদর্শ নাগরিক, জ্ঞানের অন্বেষণ এবং বিশ্বাস ইতাদি বহু বিষয়ই তিনি সম্যকভাবে অবগত হয়েছিলেন।

তিন যুগ পরে নিজ দেশে ফিরে তিনি পরিণত হন বিখ্যাত পরিব্রাজকে – যিনি দূর-দূরান্ত ও পরদেশের বিভিন্ন গল্পে সকলকে মাতিয়ে রাখতেন। তিনি যখন তার এসব অভিজ্ঞতার গল্প শোনাতেন, তখন অনেকের কাছে এগুলো অবিশ্বাস্য মনে হতো। ফেযের তৎকালীন সুলতান আবু ই'নান তাকে তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করার আদেশ দেন এবং শ্রুতি লিখনের কাজে তিনি রাজকীয় অনুলেখক ইবনে জুযাঈকে নিয়োগ দেন। ২ বছর সময় নিয়ে ইবনে জুযাঈ এ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।

ইবনে বতুতা আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল, বিশেষত উত্তর আফ্রিকার মালি সম্পর্কে তার দেয়া বিবরণ আমাদের নিকট ওই এলাকার একমাত্র মধ্যযুগীয় নথি। বস্তুত তার এ সফরনামায় চড়ে আমরা খুব সহজেই ফিরে যেতে পারি ১৪শ শতাব্দির দুনিয়ায়।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 নৌচালন-বিদ্যা

📄 নৌচালন-বিদ্যা


এটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, ফেং শুই (চীনা ভবিষ্যৎ কথন-বিদ্যা)-তে ব্যবহারের জন্য চীনারা কম্পাসের বিকাশ ঘটায় এবং পরবর্তীতে নৌচালনাতে ব্যবহারের জন্য নাবিকরা এটার প্রভূত উন্নয়ন সাধন করে। মুহাম্মদ আল-আওফী কর্তৃক রচিত "মাজমুআ'তু কাসাসিয়া” (গল্প সংকলন) শীর্ষক পারসীয় গ্রন্থে চম্বুকীয় কম্পাস ব্যবহারের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায়।

১২৩৩ খ্রিস্টাব্দ, লোহিত সাগর এবং পারস্য বা আরব উপসাগরের সমুদ্রযাত্রা সবে শেষ হলো। আর এ অভিযানের কোনো বিবরণীতে কম্পাস নিয়ে মন্তব্য করা হলো এভাবে: "ইস্পাতে তৈরি মাছ পালিশ করে চুম্বকীয় পাথরের সাথে আটকে তা পানি পূর্ণ পাত্রে স্থাপন করা হয়। এটা ঘুরতে থাকে, যতক্ষণ না দক্ষিণে মুখ করছে।"

নৌচালন-বিদ্যাতে চুম্বকীয় কম্পাস ব্যবহারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ইসলামী বিশ্বে সর্বপ্রথম বাইলাক আল-কিবজাকীর "কিতাব কানযুত তুজ্জার ফী মা'রিফাতিল আহজার" (ব্যবসায়ীদের জন্য পাথর বিষয়ক জ্ঞানের খনি) শীর্ষক গ্রন্থে পাওয়া যায়; গ্রন্থটি ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে মিশরে রচিত। ১২৪২ খ্রিস্টাব্দে লেবাননের ত্রিপলি থেকে আলেকজান্দ্রিয়া অভিমুখী এক সমুদ্র সফরে তিনি ভাসমান কম্পাসের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, "ইস্পাতের একটি সুচ একটি নলখাগড়ার সাথে আড়াআড়ি যুক্ত করে পানিপূর্ণ পাত্রের স্থাপন করা হয়। অতঃপর একটি চুম্বকীয় পাথর এই যন্ত্রের নিকটে আনা হলে চুম্বকীয় পাথরকে বহন করা হাত এটার উপর একটি চক্রাকার অবস্থা সৃষ্টি করে এবং এতে সুচ ও নলখাগড়া এই দিকে ঝুকে পড়ে। হঠাৎ করে চুম্বকীয় পাথরটি সরিয়ে নিলে সুচটি মধ্যরেখা বরাবর তাক হয়ে থাকে।”

চুম্বকীয় সুচবিশিষ্ট নমনীয় কাঠ অথবা কুমড়া-সদৃশ 'মাছের' সাজবিশিষ্ট কম্পাস নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। আলকাতরা বা মোম দিয়ে সীলগালা করে এগুলোকে পানি নিরোধক করা হতো, যেহেতু এগুলো পানিতে ভাসতো। এগুলো আর্দ্র কম্পাস নামে পরিচিত ছিল, এগুলোর পাশাপাশি শুষ্ক কম্পাসও ছিল। এখানে, কাগজের চাকতির বিপরীত পাশে দুটো সুচ রাখা হতো এবং মাঝে ফানেলের মতো কিছু একটা স্থাপন করা হতো। ফানেলটি একটি অক্ষে থেকে ঘুরতো। আবর্তনকীলক হিসেবে কাজ করা অক্ষটি বাক্সের মাঝ বরাবর অবস্থান করতো এবং কাগজের চাকতি যেন না পড়ে, সেজন্য তা কাচ দিয়ে সীলগালা করা হতো। কম্পাসের ব্যবহার এবং এ ধরনের নকশা সম্বলিত কম্পাসের প্রচলন মুসলিম বণিকদের দ্বারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয়রা কম্পাসের প্রভূত উন্নয়ন ঘটায়।

■ মহাদক্ষ নাবিকদের প্রজন্ম
নৌচালন যন্ত্রে ব্যাপক উন্নতির পাশাপাশি নাবিক হিসেবে মুসলিমদের তুলনা কেবল তারাই ছিল। ১৫শ শতাব্দির আরবের নজদের ইবনে মাজিদ ছিলেন এমনই এক নাবিক। নৌচালন-বিদ্যায় তাদের পরিবারের আলাদা খ্যাতি ছিল। তার পিতা ও দাদা উভয়েই নৌচালন-বিদ্যার প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং লোহিত সাগরের খুঁটিনাটি ছিল তাদের নখদর্পণে। লোহিত সাগর থেকে পূর্ব আফ্রিকা এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সবগুলো সমুদ্রপথ সম্পর্কে তিনি সম্যকভাবে অবগত ছিলেন। সমুদ্রপথ নিয়ে গদ্য ও পদ্যের ছন্দে তিনি ৩৮-টির মতো প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার মধ্যে ২৫-টি এখনো টিকে আছে। জ্যোতিষশাস্ত্র ও নৌচালন-বিদ্যাসহ চাঁদের বিভিন্ন মনযিল, সমুদ্রপথ এবং বিভিন্ন পোতাশ্রয়ের অক্ষাংশ নিয়ে এই প্রবন্ধগুলোতে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।

এদিকে, ১৬শ শতাব্দির নৌ-সেনাপতি পিরি রেইস নৌচালন-বিদ্যাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার লেখা ৪৫০ বছরের পুরানো নৌ-চালনার দিক নির্ণায়ক ম্যানুয়েল গ্রন্থ: "কিতাবুল বাহরিয়া"-এর অনুবাদ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যথা: The Book of the Mariner (নৌ সহায়িকা), The Naval Handbook (নৌ পুস্তিকা) এবং The Book of Sea Lore (সমুদ্র জ্ঞান বিষয়ক পুস্তক)। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গ্রন্থটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে, যাতে অটোমান তুর্কি ভাষায় লেখা মূল পাণ্ডুলিপির রঙিন ছাপার পাশাপাশি লাতিন, আধুনিক তুর্কি এবং ইংরেজি অনুবাদও শামিল রয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলের পথ-নির্দেশিকা তুল্য পিরি রেইসের "কিতাবুল বাহরিয়া" গ্রন্থটি আধুনিক সমুদ্র ভ্রমণে নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

নৌ-সারণী বা portolan হিসেবে পরিচিত গ্রন্থটি ছিল নাবিকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ নৌ-নির্দেশিকা, যেখানে উপকূল, জলপ্রবাহ, বন্দর ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে কিছুটা দূরবর্তী এলাকার মানচিত্র অন্তর্ভূক্ত ছিল। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল, দ্বীপপুঞ্জ, সংর্কীণ সমুদ্রপথ, প্রণালী, উপসাগর, উত্তাল সমুদ্রে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, বন্দরে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি ও নোঙ্গর করাসহ নাবিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনায় গ্রন্থটি ভরপুর ছিল। বিভিন্ন স্থানের দিক এবং সেগুলোর নিখুঁত দূরত্বের বিবরণও এটাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২১৯-টি বিস্তারিত সারণীসহ এটা ছিল ভূমধ্যসাগর ও আজিয়ান সাগর সংক্রান্ত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও অনবদ্য ম্যানুয়েল গ্রন্থ। প্রকৃতপক্ষে, পিরি রেইসের এই গ্রন্থের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় নাবিক ও পণ্ডিতদের ২০০ বছরের প্রচেষ্টা উৎকর্ষের চূড়ায় আরোহণ করেছিল। এই ম্যানুয়েল গ্রন্থের দুটো সংস্করণ ছিল, যার প্রথমটি ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের এবং পরেরটি এর পাঁচ বছরের পরের। প্রথম সংস্করণটি মুখ্যত নাবিকদের জন্য লেখা হলেও দ্বিতীয় সংস্করণটি ছিল পিরি রেইসের তরফ থেকে সুলতানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত উপহার। নিপুণ হস্তে আঁকা নকশা এবং দক্ষ ক্যালিগ্রাফি ও চিত্র শিল্পীদের তুলি রাঙা মানচিত্র সম্বলিত গ্রন্থটি খোদ ১৬শ শতাব্দিতেই পরিণত হয় সংগ্রাহকদের দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে। এক শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে গ্রন্থটির নানা সংস্করণ বের হতে থাকে এবং ঝড়ো আবহাওয়া, কম্পাস, নৌ-সারণী, নৌচালনায় জ্যোতির্বিদ্যার প্রয়োগ, সাগর-মহাসাগর এবং সেগুলো ঘিরে থাকা এলাকাগুলোর নিখুঁত ও অনবদ্য বিবরণ থাকায় প্রতিনিয়ত এটা দামী থেকে আরও দামী বস্তুতে পরিণত হতে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে এটাতে ইউরোপীয় অভিযান নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যার মধ্যে: ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের অভিযান এবং নতুন বিশ্ব আবিষ্কারে কলাম্বাসের অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

"শহর চিত্র, রীতি-নীতি, জাহাজ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর বিবরণ এবং বিশেষ কিছু মানচিত্রে আঁকা চিত্রগুলো রীতিমতো এগুলোকে শিল্পের স্থানে নিয়ে এসেছে।" - অধ্যক্ষ গুনসেল রেন্ডা, Hacettepe University, আঙ্কারা, তুরস্ক

ইউরোপের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে "কিতাবুল বাহরিয়া"-এর ৩০-টির মতো পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এগুলোর বেশিরভাগই প্রথম সংস্করণ। পিরি রেইস সম্পর্কে এই বিভাগের মানচিত্র অধ্যায়ে আরও তথ্য আলোচিত হয়েছে এবং একইসাথে সে অধ্যায়ে চীনা মুসলিম নৌ-সেনাপতি যেং হো নিয়ে কিছুটা আলোচনা রয়েছে।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 নৌ অভিযান

📄 নৌ অভিযান


আজ থেকে ৬৩০ বছরেরও আগে এমন এক মানবের জন্ম হয়েছিল, সমুদ্র অভিযানে যিনি ছিলেন কিংবদন্তীদের জনক।

যেং হো নামে পরিচিত এই ব্যক্তি পরিণত হয়েছিলেন 'চীনা নৌবহরের সেনাপতি'-তে। যেং হো-কে নিয়ে লেখা "১৪২১" গ্রন্থের রচয়িতা গ্যাভিন ম্যানজিয়েসের তথ্য মোতাবেক, পুরো ভারত মহাসাগরে অভিযান চালনার পাশাপাশি মক্কা, পারস্য উপসাগর, পূর্ব আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও আরব অঞ্চল জুড়ে তার অভিযানের ব্যাপ্তি ছিল। ক্রিস্টোফার কলাম্বাস কিংবা ভাস্কো দ্য গামার অভিযানের বহু যুগ আগেই তিনি সমুদ্র জয়ে নেমেছিলেন, অন্যদিকে কলাম্বাস ও ভাস্কো দ্য গামা যে আকৃতির জাহাজ নিয়ে অভিযানে নেমেছিলেন, তার আকৃতি যেং হোর জাহাজের এক-চতুথাংশেরও সমান নয়।

বিশ্বের দরবারে চীনকে শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করাতে যেং হো নামের এই মুসলিমের ছিল অসামান্য অবদান। ২৮ বছরের ভ্রমণকালে তিনি বাণিজ্য ও কূটনীতির নামে প্রায় ৩৭-টি দেশ সফর করেছিলেন। এই অভিযানগুলো ৫০,০০০ কিলোমিটার (৩১,০০০ মাইল)-এরও অধিক দূরত্ব পাড়ি দিয়েছিল। তার প্রথম নৌবহরে অন্তর্ভূক্ত ৩১৭-টি জাহাজে পুরুষের সংখ্যা ছিল: ২৭,৮৭০। এ যেন ছোট একটি নগর বা গোটা ফুটবল স্টেডিয়াম সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্পূর্ণ অজানা জল-সীমায় এমন প্রকাণ্ড নৌবহর চালাতে নৌযান পরিচালনাতে ব্যাপক দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যবস্থাপনা কাজে পারদর্শীতা এবং এ কাজে যেং হোর নৈপুণ্যের কোনো কমতি ছিল না। ওই সময়ে তিনি যা অর্জন করেছিলেন, তার সাথে বর্তমানের কিছুর যদি তুলনা দিতে হয়, তবে তা কেবলই: চন্দ্র অভিযান।

যেং হো মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন এবং তার নাম ছিল মা হো। তার পিতা ও দাদা হজ্জ পালনের জন্য মক্কা গিয়েছিলেন, সে সুবাদে তিনি আরবী ও চীনা ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। আক্রমণকারী চীনা মিং রাজবংশ বালক বয়সে তাকে তার শহর কুনমিং থেকে মঙ্গোলিয়ায় নিয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে তার জননাঙ্গ কেটে দেয়া হয় এবং এতে তিনি পরিণত হন খোজা পুরুষে। রাজ পরিবারে তিনি কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পান এবং তিনি যুবরাজ ডিউক ইয়ান বা যু-দির বিশ্বস্ত অনুচরে পরিণত হন। যু-দি পরবর্তীতে ক্ষমতার মসনদ দখল করলে বনে যান সম্রাট ইয়ং লি-তে।

গ্যাভিন ম্যানজিয়েস বলেন, "দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হওয়ার পাশাপাশি যেং হো অত্যন্ত ধার্মিক মুসলিম ছিলেন এবং তিনি যু-দির ঘনিষ্ঠ পরামর্শকে পরিণত হন। শক্তিমান এই ব্যক্তি যু-দির চেয়েও লম্বা ছিলেন; কিছু বর্ণনা মতে, 'বাঘের ন্যায় পদক্ষেপ ফেলা' এই ব্যক্তি দুই মিটারের চেয়েও লম্বা ছিলেন এবং তার ওজন ছিল একশ কেজির ঊর্ধ্বে।"

নিবেদিত সেবা এবং নৃপতির সবগুলো সফল সামরিক অভিযানে সঙ্গদান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য মা হো-কে রাজ পরিবারের সামরিক মহাঅধিনায়েকের খেতাব দেয়া হয় এবং 'যেং' পদবীতে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও তিনি তিন-খোজা-মণি (সান-পাও থাই-চীয়েন) হিসেবেও সমধিক পরিচিত ছিলেন, যা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সম্পর্ক (যদিও তিনি মুসলিম) এবং উচ্চ প্রাসাদ পরিষদের সম্মানসূচক মুকুটের প্রতিনিধিত্ব করে।

'গুপ্তধন অনুসন্ধানী' সাতটি সমুদ্র অভিযানে নামার পিছনে বহু কারণ ছিল। মুক্তা, খনিজ পদার্থ, উদ্ভিদ, লতা-গুল্ম, জীবজন্তু, ঔষধ, বিভিন্ন চিকিৎসা কৌশল ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার অনুসন্ধান ছিল এই অভিযানগুলোর প্রধান কারণ এবং অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সম্রাট চেয়েছিলেন বিশ্বের নৌচালন এবং মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে সমৃদ্ধ করতে; এছাড়া বাকি বিশ্বের কাছে চীনকে অন্যতম সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি বেশ সচেষ্ট ছিলেন। এজন্য তখন বহির্বাণিজ্যে উৎসাহ দেয়া হতো, অর্থাৎ এতে অন্য দেশগুলো প্রকাণ্ড চীনা জাহাজগুলো দেখবে এবং এতে চীনা প্রতিপত্তির খ্যাতি সবদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সাম্রাজ্যিক পরাশক্তির প্রকাণ্ড 'শক্তিধর জাহাজগুলো'র শক্তিমত্তাকে স্বীকৃতি দিয়ে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নেতাগণ বশ্যতা মেনে নেয়, অন্যদিকে কূটনৈতিক সম্পর্কের বদৌলতে অন্যান্য জাতিগুলো চীনের সাথে আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন করে। আনুগত্যের সমর্থন হিসেবে দেশগুলো সম্রাটের নিকট দূত পাঠাতো।

১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে যেং হো তার এই মহাঅভিযানগুলো পরিচালনা করেছিলেন এবং তার সাথে ছিল আরও দু'জন দক্ষ খোজা নেতা - হাউ হসিয়েন এবং ওয়াং চীং হাং। শৃঙ্খলার সাথে পরিচালিত অতিকায় ও প্রকাণ্ড সব জাহাজ ছিল এই অভিযানের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক। যেং হো লিখেছেন, "৬২-টি অতিকায় জাহাজ ছিল ৪৪০ ফুট লম্বা এবং দীর্ঘতম প্রন্থ ১৮০ ফুট।" এগুলো মিং সাম্রাজ্যের পরিমাপের একক (০.৩১ মিটার অথবা ১.০২ ফুট), তাই এগুলো আমাদের পরিমাপে হবে: লম্বায় ১৩৭ মিটার (৪৪৯ ফুট) এবং প্রন্থে ৫৬ মিটার (১৮৪ ফুট)। যেং হো আরও লিখেছেন যে, নাবিক, কেরানি, দোভাষী, সৈনিক, শিল্পী, চিকিৎসক এবং আবহাওয়াবিদসহ তার প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ জন মানুষ ছিলেন। চতুর্থ অভিযানে তিনি ৩০,০০০ মানুষ নিয়ে আরব ও লোহিত সাগরের দ্বারপ্রান্তে গিয়েছিলেন।

চীনা জাহাজ নির্মাতাগণ ঠিক বুঝে ছিলেন যে, প্রকাণ্ড আকৃতির কারণে এসব জাহাজ থেকে রণকৌশল পরিচালনা বেশ কঠিন হবে। তাই তারা জাহাজগুলোতে 'ভারসাম্য রাডার' স্থাপন করে, যা ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনে উপরে ও নিচে নেমে যায়। আজকের জাহাজ নির্মাতাগণ এখনও এটার কুল কিনার করতে পারেননি যে, ইস্পাতের কাঠামো ছাড়া কীভাবে ৪০০ ফুট লম্বা এসব জাহাজ সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অনেকে তো এ ধরনের জাহাজের অস্তিত্ব নিয়ে দ্বিধায় পর্যন্ত পড়ে গিয়েছে।

কিন্তু ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে নানচিং-এর একটি নৌবন্দরের ধ্বংসস্তুপে 'গুপ্তধন অনুসন্ধানী' জাহাজের রাডার পোস্ট উদ্ধার হয়। সাধারণ ঐতিহ্যবাহী সমতল পাটাতনের চীনা নৌকাগুলোর অনুপাতের সাহায্যে উল্টো হিসাবের মাধ্যমে এই রাডারের আনুমানিক পরিমাপ দাঁড়ায়: ১৫২ মিটার (৫০০ ফুট)।

পাটাতনের দিক দিয়ে প্রকাণ্ড এই জাহাজগুলো ছিল কার্গো (পণ্যবাহী জাহাজ)-তুল্য, যেগুলো রেশমি ও সুতি বস্ত্র, চীনামাটির বাসনকোসন, স্বর্ণ ও রৌপ্য সামগ্রী, তামার গৃহস্থালী সরঞ্জাম এবং লোহার হাতিয়ারে বোঝাই ছিল। জিরাফ, জেব্রা বা 'স্বর্গীয় ঘোড়া', আফ্রিকার কৃষ্ণসার মৃগ বা 'স্বর্গীয় হরিণ' এবং উটপাখির ন্যায় জীবজন্তু বহনের পাশাপাশি জীবন্ত মাছ রাখা ও গোসলের জন্য জাহাজে জলরোধী বেষ্টনীরও ব্যবস্থা ছিল।

ভাসমান জলাধারের মাধ্যমে এই জাহাজগুলো পানি নিষ্কাশন করতো এবং যোগাযোগের জন্য এরা ব্যবহার করতো: পতাকা, লণ্ঠন, ঘণ্টা, ধাতুর তৈরি চাকতির ন্যায় ঘণ্টা, বাহক কবুতর এবং ঝাণ্ডা। অভিযানগুলো নিয়ে মিং আমলের একটি বর্ণনা, "দক্ষিণ সমুদ্রে যাত্রা করা জাহাজগুলো ছিল বাড়ির ন্যায়। যখন এদের পালগুলো নজরে আসতো, তখন তা মনে হতো আকাশের মেঘ।" এই জাহাজগুলো সামষ্ঠিকভাবে 'সাতারু ড্রাগন' নামে পরিচিত ছিল, যেহেতু 'দেখা'-র সুবিধার জন্য এসব জাহাজের সামনের অংশে ড্রাগনের চোখের ন্যায় বিন্দু আঁকা ছিল।

যেং হোর সাতটি অভিযানের শেষে চীন নৌ-প্রযুক্তি ও প্রতিপত্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠে এবং এর পাশাপাশি বহু বিচিত্র প্রাণী প্রথমবারের মতো চীনে প্রবেশ করে, যেমন: আফ্রিকা থেকে আসা জিরাফ। প্রথমদিকে ভুলভাবে এটাকে চীনা রূপকথার প্রধান ইউনিকর্ন বা অদ্ভুত কাল্পনিক জন্তু কিলিন মনে করা হতো। কনফুসীয় ঐতিহ্যে কিলিন ছিল চূড়ান্ত প্রজ্ঞার ঋষি এবং তার উপস্থিতি দয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হতো।

এটা ধারণা করা হয় যে, ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে ফিরতি যাত্রায় যেং হো ভারতে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এবং কনফুসীয় দর্শনের পুনর্জাগরণের ফলে চীনা সাম্রাজ্য অন্তর্মুখী হয়ে উঠে এবং শেষমেশ সমুদ্রগামী বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়। একশ বছরেরও কম সময়ে, চীন থেকে বহু মাস্তুলের জাহাজে করে সমুদ্র যাত্রায় বের হওয়াটা রীতিমতো বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনা সম্রাট সব ধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। হায়! ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌ-বাহিনী, এককালে যার ছিল ৩,৫০০ জাহাজ (বর্তমানে মার্কিন নৌ-বাহিনীতে প্রায় ৪৯০-টি জাহাজ রয়েছে), সাম্রাজ্যের এমন নীতিতে তা হারিয়ে গেল।

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে যেং হোর অভিযানের ৫৮০-তম বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তার সমাধি সংস্কার করা হয় এবং নানচিং-এ থাকা তার কবর ইসলামী রীতিতে সংস্কার করে নতুন সমাধি স্থাপন করা হয়। তার সমাধি স্থলের প্রবেশদ্বার মিং রীতিতে নির্মিত এবং সেখানে মেমোরিয়াল হলটি অবস্থিত। হলের অভ্যন্তরে রয়েছে এই মহামানবের বিভিন্ন ছবি, ভাস্কর্য এবং তার নৌচালনের বিভিন্ন মানচিত্র।

"আমরা সমুদ্রে দেখছিলাম পর্বততুল্য ঢেউ আসমান ছুঁয়ে আমাদের উপর আছড়ে পড়ছে এবং সেইসাথে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখছিলাম দূর-দূরান্তের অঞ্চলগুলোর দিকে, আড়াল হয়ে আছে যা মৃদু বাষ্পের নীল স্বচ্ছতার পশ্চাতে। ওদিকে আমাদের জাহাজগুলো মেঘের ন্যায় বাতাসে ভাসছে; দিনে ও রাতে চলমান রেখেছে তাদের যাত্রাপথ দ্রুত ধাবমান তারকার গতিতে; অগ্রসর হচ্ছে বুনো তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে, যেন আমরা মাড়িয়ে চলছি লোকারণ্যে ভরা সড়ক।" -নিজের আত্মজীবনী "মিং শিহ" (Ming Shih)-তে যেং হোর বক্তব্য

তার সমাধিস্থল অভিমুখী পথ নতুন করে পাথরে বাঁধানো হয় এবং তাতে বসানো হয় সারি সারি সোপান ও ধাপ। সমাধিস্থলের দিকে চলে যাওয়া সিঁড়িপথ চারটি সমান ভাগে বিভক্ত ২৮-টি পাথরের ধাপ দিয়ে সাজানো, যা বস্তুত যেং হোর পশ্চিম অভিমুখী সাতটি অভিযানের প্রতীকী রূপায়ন। তার সমাধির উপরে খোদাই করে লিখা আছে: আল্লাহু আকবার আল্লাহ-ই মহান।

যেং হোর ন্যায় এত বিশাল নৌবহর কিংবা তার জাহাজের ন্যায় এত মাল্গুলের জাহাজের নজির বিশ্বে নেই বললেই চলে। সমুদ্রে চলার সময় এই নৌবহরকে মনে হতো ভাসমান শহর। এই জাহাজগুলোর অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে নানচিংয়ের নিকটবর্তী ড্রাগন বে শিপইয়ার্ডে, যার ধ্বংসাবশেষ আজও দৃশ্যমান।

■ যেং হোর সাত মহাকাব্যিক অভিযান ১. ১৪০৫-১৪০৭: এ অভিযানে তিনি চম্পা (ইন্দোচীন), জাভা ও সুমাত্রা, সিলন এবং ভারতের কলকাতা ভ্রমণ করেন। ২. ১৪০৭-১৪০৯: এ অভিযানে সিয়াম (Siam) এবং ভারত ভ্রমণ করেন এবং কচিতে যাত্রা বিরতি দেন। ৩. ১৪০৯-১৪১১: মালাকা-কে কেন্দ্রে রেখে পূর্ব ভারতের বহু স্থান ভ্রমণসহ তিনি এ অভিযানে প্রথমবারের মতো ভারতের কিউলন (Quilon)-এ যান। ৪. ১৪১৩-১৪১৫: এই অভিযানে নৌবহর বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি অংশ আবারও পূর্ব ভারত এবং অপর অংশ সিলনকে কেন্দ্রে রেখে বাংলা, মালদ্বীপ ও হরমুজের পারস্য সালতানাত পর্যন্ত যায়। এই যাত্রা এতটাই উদ্দীপন সৃষ্টি করেছিল যে, ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে দূতদের একটি বিশাল বহর নানচিং পর্যন্ত সফর করে। পরবর্তী বছর বিশাল নৌবহরে করে তাদেরকে তাদের দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়। ৫. ১৪১৬-১৪১৯: শান্তিকামী নৌবহরগুলো এই অভিযানে জাভা, রিউকু দ্বীপপুঞ্জ ও ব্রুনাই সফরে যায়। অন্যসব নৌবহর ভারতকে কেন্দ্রে রেখে হরমুজ, এডেন, মোগাদিসু, মোম্বাসা ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দরে যায়। এই অভিযান থেকেই চীনে প্রথম জিরাফ নেয়া হয়। ৬. ১৪২১-১৪২২: একই সমুদ্রপথ ধরে পূর্ববর্তী অঞ্চলগুলোর সাথে এই যাত্রায় যোগ হয় দক্ষিণ আরব ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দর। পূর্বের বোর্নিও থেকে পশ্চিমে জানজিবার পর্যন্ত এই নৌবহর দুই বছরে ৩৬-টি দেশ ঘুরে। এ থেকে সহজে অনুমিত হয় যে, নৌবহরগুলো আগের অভিযানের মতো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয় এবং মালাকা বন্দর ছিল তাদের জাহাজগুলোর প্রধান মিলনস্থল। রেডিও ব্যবহারের আগ পর্যন্ত কোনো বন্দরকে প্রধান মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহারের নজির স্থাপনে এটা ছিল বিস্ময়কর অর্জন। ৭. ১৪৩১-১৪৩৩: সর্বশেষ এই অভিযানে যেং হো ছিলেন ষাটে পা দেয়া ব্যক্তি, যিনি ইতোমধ্যেই সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন জাভা থেকে মক্কা ও পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত ২০-এরও অধিক দেশ ও সাম্রাজ্যের সাথে। এই চীনা নৌবহরগুলো পূর্ব আফ্রিকার কতটুকু গিয়েছিল, তা কেউ না জানলেও কিছু বর্ণনামতে, এরা উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত চক্কর দিয়েছিল।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বৈশ্বিক যোগাযোগ

📄 বৈশ্বিক যোগাযোগ


ইলেকট্রিক বা কাগজ- যে মাধ্যমেই তথ্যের আদান-প্রদান হোক না কেন, যেকোন সময় তা ঝুকির মুখে পড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ গোপন বার্তা ভুল মানুষের হাতে পড়া ঠেকাতে সাংকেতিক বার্তা প্রেরণ করা হয়, যেন সঠিক সংকেত জানা ব্যক্তিটি তার মর্মোদ্ধারে সক্ষম হয়।

সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারের এমন একটি ঘটনা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ঘটেছিল, যখন জার্মানরা এনিগমা (Enigma) নামের টাইপ-রাইটার ব্যবহার করে রেডিওতে প্রচারের পূর্বে কিছু বার্তা এনক্রিপ্ট বা সংকেতযুক্ত করে পাঠাচ্ছিল। সাংকেতিক কোড ভাঙতে সক্ষম একদল পোলিশ সাইফার ব্যুরো এবং আরেকদল ব্রিটিশ ব্লেচলে পার্কে থেকে জার্মানদের ওই বাতার কোড ভেঙে ফেলে।

"সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার- এ বিদ্যার সূচনার জন্য প্রয়োজন এমন এক সমাজের, যারা তিনটি দিকে সমৃদ্ধির চূড়ায় আরোহণ করেছে, যথা: ভাষাতত্ত্ব, পরিসংখ্যান এবং গণিত। এই তিনটি শর্ত আল-কিন্দীর সময় সহজলভ্য হয়ে উঠে এবং এই তিন শাস্ত্রসহ আরও বহু বিষয়ে তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।" - ড. সাইমন সিং, The Code Book (১৯৯৯)

বিংশ শতাব্দির এই লোকগুলো বস্তুত কোড ভাঙার ওই ঐতিহ্যকে আগে বাড়িয়েছে, যা নিয়ে সর্বপ্রথম কলম ধরেছিলেন ৯ম শতাব্দির বহুবিদ্যায় সমান পারদর্শী বাগদাদের আল-কিন্দী। ওই সময় বার্তার আদান-প্রদান পাখির মাধ্যমে হওয়ায় সেগুলোকে ওজনে বেশ হালকা হতে হতো এবং গোপনীয় বার্তাগুলো সাংকেতিকভাবে পাঠানো হতো। "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা" (সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার বিষয়ক পুস্তিকা) লিখে ক্রিপ্টগ্রাফি শাস্ত্রে তিনি এক যুগান্তকারী বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। এই পুস্তকের একটি অংশে পুনরাবৃত্তি বা ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অর্থাৎ একটি সাধারণ বর্ণকে যদি ভিন্ন আরেকটি বর্ণ দিয়ে বদলানো থাকে, তবে ওই নতুন বর্ণটি মূল বর্ণের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে- বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন। আমরা যদি ইংরেজি ভাষার দিকে খেয়াল করি, তবে দেখবো বিভিন্ন শব্দে 'e' (ই) বর্ণটি অন্যসব বর্ণের চেয়ে ১৩% বেশি আবির্ভূত হয়েছে। তাই 'e' (ই) বর্ণটি যদি # সংকেত দ্বারা বদলে দেয়া হয়, তবে # পরিণত হবে সবচেয়ে বেশি আবির্ভূত সংকেতে এবং এটার ব্যবহারের হারও অন্যসব সংকেতের চেয়ে ১৩% বেশি হবে। একজন সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক (cryptanalyst) তখন বের করতে সক্ষম হবে যে, # সংকেতটি মূলত 'e'-এর প্রতিনিধিত্ব করছে।

কুরআনের আরবী ভাষ্য নিয়ে গবেষণার সময় বর্ণের ফ্রিকুয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তির বিষয়টি তার নজরে আসে, যা ছিল ক্রিপ্টগ্রাফির ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মূল নিয়ামক। ইউরোপের রেনেসাঁ আমলে বহু সাংকেতিক তথ্য বিশ্লেষক আল-কিন্দির প্রতিষ্ঠিত ভিতকে আরও সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম হয়। বড় রকমের সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার ও কোড ভাঙার পদ্ধতি যদিও ১১০০ বছর পূর্বে আল-কিন্দীর হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে, তথাপি 'cryptanalysis' (সাংকেতিক বার্তা পর্যবেক্ষণ) শব্দটি বেশ সাম্প্রতিক এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম ফ্রেডম্যান সর্বপ্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন।

ফ্রিকুয়েন্সি পর্যবেক্ষণ বর্তমানে ধ্রুপদী কোড ভাঙার মৌলিক হাতিয়ার, যা বর্ণমালার সাধারণ পঠনকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এই বিদ্যা ভাষার সাধারণ পাঠের সংখ্যা ও ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের পারদর্শীতার উপর নির্ভর করে। আধুনিক সংকেতগুলো বেশ জটিল, কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও আমেরিকা তাদের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে শব্দ সাজানোর ধাঁধা দিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো এবং দ্রুততম সময়ে যারা সেগুলো সমাধান করতো, তাদেরকে কোড ভাঙার কাজে নিয়োগ দেয়া হতো।

■ বিমান-ডাক
বর্তমানে আমাদের নিকট ডাক যোগাযোগ মামুলি হলেও একটা সময় পায়রা-ডাক বা প্রশিক্ষিত কবুতর দিয়ে বার্তার অপব্দ-প্রদানই ছিল একমাত্র সহজলভ্য 'বিমান-ডাক'।

বার্তাবাহক কবুতর নিয়ে লেখা এক গ্রন্থে মুসলিম পণ্ডিত ইবনে আবদ আয-যাহির লিখেছেন, তৎকালীন যোগাযোগের সবুকেন্দ্র কায়রোর নগরদুর্গে সাধারণত ১,৯০০-এর মতো কবুতর থাকতো।

মুসলিম কাহিনীকার আন-নুয়াইরী ১০ম শতাব্দির আজিজ নামে পরিচিত এক ফাতিমী খলীফা সম্পর্কে লিখেছেন: কায়রোতে থাকাকালে তার একবার এন্টিয়কের সতেজ চেরিফল খাওয়ার বাসনা জাগে। এন্টিয়কের নিকটস্থ বালবেকে বার্তাবাহক কবুতর দিয়ে আদেশ পাঠানো হয়। তখন প্রতিটি কবুতরের পায়ে একটি চেরিফল মোড়ানো রেশমি খালে আটকে দিয়ে প্রায় ৬০০ কবুতর কায়রো পাঠানো হয়। ইচ্ছা করার তিনদিনের মাথায় বিশেষ 'বিমান-ডাক' ডেলিভারির মাধ্যমে খলীফার সামনে আনা হয় লেবানন থেকে পাঠানো ১,২০০ সতেজ চেরিফলের এক বিশাল পাত্র।

কোড ভাঙা "এনক্রিপ্ট করা বা সাংকেতিক বার্তা পাঠোদ্ধারের একটি পথ হচ্ছে: আমরা যদি এটার ভাষ্য জানি, তবে ওই একই ভাষার বিকল্প সহজবোধ্য পাঠ বের করা, এরপর প্রতিটি বর্ণের পুনরাবৃত্তি গণনা করা। যে সংখ্যাটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, আমরা সেটাকে 'প্রথম', এরপরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে দ্বিতীয়', পরেরটি 'তৃতীয়' এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা নমুনাতে সাধারণ পাঠটির সবগুলো ভিন্ন বর্ণ লিখছি... এরপর আমরা যে প্রতীকী বার্তার পাঠোদ্ধার করতে চাই, সেটাতে মনোযোগ দিয়ে সেটার প্রতীকগুলো শ্রেণিবদ্ধ করবো। যে প্রতীকটির পুনরাবৃত্তি সর্বাধিক হবে, সেটাকে আমরা আমাদের সহজবোধ্য পাঠের 'প্রথম' বর্ণ দ্বারা বদলে নেবো, পরের সর্বাধিক পুনরাবৃত্তিময় সংখ্যাকে আমরা 'দ্বিতীয়' বর্ণ দ্বারা বদলে দেব এবং এভাবে চলবে, যতক্ষণ না আমরা আমাদের সাংকেতিক বার্তার পুরো প্রতীকটি পাচ্ছি।" -আল-কিন্দী রচিত ৯ম শতাব্দির "রিসালা ইসতিখরাজুল মুআ'ম্মা"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00