📄 ভূ-বিজ্ঞান
মহাবিশ্ব, মানবতা ও জীবন নিয়ে মুসলিম সভ্যতার স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে লক্ষণীয়ভাবে। খনিজ পদার্থ, শিলা, পর্বত, ভূমিকম্প এবং পানির উৎস নিয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের পাশাপাশি এগুলো নিয়ে তাদের ভাবনার অন্ত ছিল না।
খনিজ পদার্থ, মূল্যবান রত্ন এবং মণি পাথরের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া, ভারত, গ্রিক এবং রোমের অধিবাসীরা অবগত ছিল। বস্তুত, এই অঞ্চলগুলোর অধিকাংশই পরবর্তীতে পরিণত হয় ইসলামী খিলাফতে। অন্যসব বিষয়ের মতো মূল্যবান রত্ন-পাথর ও খনিজ বিষয়ক রচনাবলী যখন ইসলামী বিশ্বের প্রথম ৩০০ বছরের মধ্যে আরবীতে অনুদিত হতে থাকে, তখন থেকেই মুসলিম বিজ্ঞানী ও অনুসন্ধানীগণ সেগুলোর উপর ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণা-যজ্ঞ শুরু করে দিয়েছিল।
ইসলামী বিশ্ব যে বিস্তৃত অঞ্চল নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিল, তার স্বাভাবিক তাৎপর্য হচ্ছে: মুসলিম পণ্ডিতগণ যে ধরনের ভূ-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাবেন, গ্রিকদের ন্যায় তা কেবল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকাগুলোকেও গবেষণার আওতায় নিয়ে আসবে। মালয় দ্বীপপুঞ্জের ন্যায় দূর-দূরান্ত থেকে খনিজ পদার্থ, উদ্ভিদরাজি ও জীবজন্তু বিষয়ক জ্ঞান আসতে থাকে এবং সেগুলো জায়গা করে নিতে থাকে মুসলিম মনীষীদের গ্রন্থসমূহে – ১১শ শতাব্দির পণ্ডিত ইবনে সীনার "আশ-শিফা" তেমনি এক গ্রন্থের নমুনা, বস্তুত যা ছিল দর্শন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বি বিশ্বকোষ।
পশ্চিমা মহলে আবিসিনা নামে পরিচিত ইবনে সীনা ছিলেন মুসলিম সভ্যতার অতুলনীয় বৈজ্ঞানিক সমৃদ্ধির এক আদর্শ সৃষ্টি, যদিও ভূ-বিজ্ঞানে অবদানের চেয়ে বর্তমানে তিনি চিকিৎসা ও দর্শনশাস্ত্রের জন্য সমধিক পরিচিত। তথাপি তার "আশ-শিফা” গ্রন্থে খনিজ ও আবহাওয়া-বিজ্ঞান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত আছে, যেখানে তিনি পৃথিবীতে কী কী ঘটে, তা নিয়ে তার সময় পর্যন্ত প্রচলিত জ্ঞানের একটা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন। লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে তা রেনেসাঁয় আলোকিত ইউরোপে পরিচিত হয়ে উঠে এবং তা পরিণত হয় ইউরোপের ভূতাত্ত্বিক চিন্তাবিদদের প্রধান অনুপ্রেরণার উৎসে – ১৫শ শতাব্দির লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, ১৭শ শতাব্দির নিকোলাস স্টিনো এবং ১৮শ শতাব্দির জেমস হাটন ছিলেন তেমনি কিছু দৃষ্টান্ত।
১১শ শতাব্দির শুরুর দিকের পণ্ডিত আল-বিরুনী তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ ভারতে কাটান। তিনি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে গঙ্গা নদীর অববাহিকার পাললিক গঠনের বিবরণ দিয়েছিলেন।
জ্ঞানের সীমাকে পাড়ি দেয়া একমাত্র মুসলিম পণ্ডিত ইবনে সীনাই ছিলেন না, বরং ভূ-বিজ্ঞানের এই তালিকায় আছেন ইবনে সীনার সমসাময়িক আরেক মনীষী আল-বিরুনী। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খাওয়ারিযমে জন্ম নেয়া আল- হিরুনীকে একটি শাস্ত্রে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, দর্শন, ইতিহাস, ফার্মাসি এবং ভূ-বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের বহু শাখায় তিনি পারদর্শী ছিলেন।
তার জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা সময় ভারতে অতিবাহিত হয়, যেখানে তিনি সেখানকার মানুষ, তাদের ধর্ম, কৃষ্টি- কালচার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সেখানের স্থানীয় ভাষা পর্যন্ত রপ্ত করেছিলেন। এই পুরো অভিজ্ঞতা তিনি তার "তাহকীক মা লিল-হিন্দ মিন মাকুলাতি মাকবুলাতি ফী আকলি আও মারযুলাতি" (ভারত তত্ত্ব) নামক গ্রন্থে জমা করেছেন। হিন্দি বলার পাশাপাশি তিনি গ্রিক, সংস্কৃত ও সিরিয়াক ভাষাও জানতেন, যদিও তার সমস্ত গ্রন্থ আরবী ও ফারসিতে রচিত। তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ভারতের প্রাকৃতিক ইতিহাস ও ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন; গঙ্গা নদীর অববাহিকার পাললিক গঠনের নির্ভুল বিবরণের মাঝে আমরা সেটার নমুনা দেখতে পাই। খনিজবিজ্ঞান বিষয়ে তার রচনা "আল-জামাহির ফী মারিফাতিল জাওয়াহির" (মূল্যবান রত্নপাথর চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি) তাকে এনে দেয় এই বিদ্যার অপ্রতিদ্বন্দ্বি বিজ্ঞানীর খেতাব।
"আমি ভারত থেকে অশোধিত কিছু শিলাখণ্ড নিয়ে আসি। সেসবের কয়েকটা উত্তপ্ত করলে সেগুলো আরও লাল বর্ণ ধারণ করে। একটি টুকরো লালচে এবং অপরটি তার চেয়ে কম লাল বর্ণের। ধাতু গলানোর পাত্রে আমি টুকরো দুটো রেখে ৫০ মিছক্কাল স্বর্ণ গলানোর সময় পর্যন্ত সেগুলো উত্তপ্ত করি। ঠাণ্ডা হলে টুকরো দুটো তুলে নিই। খেয়াল করি যে, অপেক্ষাকৃত কম লালচে পাথরটি গোলাপী লালবর্ণ ধারণ করে এবং আরও বেশি পরিশুদ্ধ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে অধিক গাঢ় লালচে পাথরটি বর্ণ হারিয়ে সারান্দিব (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) অঞ্চলের স্ফটিকের ন্যায় বর্ণ ধারণ করেছে। এরপর আমি পরীক্ষা করে দেখি যে, এটা ইয়াকুত বা রুরি চেয়েও নরম ... এবং আমি এই উপসংহারে আসি যে, উত্তাপের সাথে লালবর্ণ উদাও হলেও উত্তপ্ত ওই ধাতু ইয়াকুত নয়। এই ফলাফল উল্টানো সম্ভব নয়; অর্থাৎ উত্তপ্ত ধাতু যদি লাল রয়ে যায়, তথাপি এটা আবশ্যক নয় যে, তা ইয়াকুত, কারণ উত্তাপের পরও লোহা লাল রয়ে যায়।" - রুবি বা চুনি নিয়ে অনুসন্ধানকালে ১১শ শতাব্দির বিজ্ঞানী আল-বিরুনী তার "আল- জামাহির ফী মারিফাতিল জাওয়াহির" পুস্তকে তার এ অভিজ্ঞতার বিবরণটুকু তুলে ধরেছেন।
ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার পিছনে আরও বহু মুসলিম বিজ্ঞানীর রয়েছে অসামান্য অবদান।
ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়ী (মৃ. ৮৫৭)-এর রচনা: "আল- জাওয়াহির ওয়া সিফাতিহা" (মূল্যবান রত্নপাথর এবং তাদের বৈশিষ্ট্য)। আল-কিন্দী (মৃ. আনুমানিক ৮৭৩) লিখেছেন তিনটি প্রবন্ধ, যার মাঝে: "আল-জাওয়াহির ওয়াল আশবাহ" (মূল্যবান রত্নপাথর এবং সেগুলোর সদৃশ) সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেও তা আর এখন পাওয়া যায় না। ১০ম শতাব্দির পণ্ডিত আল-হামাদানী আরবের উপর তিনটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যেখানে তিনি স্বর্ণ, রুপা, অন্যান্য খনিজ ধাতু ও মূল্যবান পাথর অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও প্রাপ্তির স্থানের বিবরণ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ইখওয়ানুস সাফা বা পবিত্রতার ভ্রাতৃসংঘ নামে পরিচিত ১০ম শতাব্দির একদল পণ্ডিত "রাসাইল" নামে বিশ্বকোষতুল্য প্রবন্ধমালা রচনা করেছিল, যেখানে খনিজ পদার্থ এবং বিশেষভাবে সেগুলোর প্রকারভেদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।
খনিজ পদার্থ, পাথর এবং মূল্যবান রত্নপাথর নিয়ে অগণিত গ্রন্থ লেখা হয়েছে, যার অধিকাংশই কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। অল্পকিছু রচনাই কালের গণ্ডি পাড়ি দিয়ে টিকে থাকার পাশাপাশি মুদ্রিতও হয়েছে।
📄 প্রাকৃতিক ঘটনা
সচরাচর শিশুরাই আমাদের নানা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করে, যেমন: 'আকাশ নীল কেন?' 'রংধনুর শেষ কোথায় গিয়ে মিলেছে?' 'সমুদ্র কেন বালুর সাথে মিশেছে?' এসব প্রাকৃতিক ঘটনার অধিকাংশই আজ আমাদের নিকট সাধারণ মনে হলেও নিজেদের চারপাশ উপলব্ধি করতে ৯ম শতাব্দির মুসলিম প্রতিভাগণ কৌতূহলের সাথে এসব পর্যবেক্ষণে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিলেন। বস্তুত আল্লাহর সৃষ্টির গূঢ় হাকিকত জানার অদম্য স্পৃহা তাদেরকে এ পথে নামিয়েছিল।
কর্ডোবা নিবাসী ১০ম শতাব্দির অতুলনীয় প্রতিভা ইবনে হাযমের যুগে এবং তার পূর্ব পর্যন্ত জ্যোতির্বিদগণ এটা বিশ্বাস করতেন যে, তারকা ও গ্রহসমূহের আত্মা ও মন রয়েছে, তাই তারা মানুষদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। ইবনে হাযম এ ব্যাপারে সর্বাধিক বাস্তববাদী পন্থা অবলম্বন করে বলেন, "মহাকাশের এসব বস্তুর না আছে আত্মা বা মন। আর না তারা মানুষের ভবিষ্যৎ জানে আর না তাতে প্রভাব রাখে। মূলত বস্তুগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে এসব গ্রহ ও তারকা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যেমনিভাবে সূর্যের উত্তাপ ও আলো অন্যসব গ্রহের উপর প্রভাব রাখে এবং চাঁদ নিয়ন্ত্রণ করে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার গতি।" [আল-মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল]
১১শ শতাব্দির আরেক পণ্ডিত আল-বিরুনী চাঁদের বিভিন্ন মনযিল চক্রের ভিত্তিতে জোয়ার-ভাটার টানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি ভারতের সোমনাথ শহরের জোয়ার-ভাটার এক প্রাণবন্ত বিবরণ দেয়ার পাশাপাশি এর সাথে যে চাঁদের সম্পর্ক রয়েছে, তা সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।
আকাশ নিয়ে মুসলিমদের গবেষণা ছিল এবং আল-কিন্দীর ন্যায় কিছু পণ্ডিত আকাশের নীল রঙ হওয়ার কারণ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। "মাকালাত ফী ইল্লাতি লাওনি আল-আযওয়ার্দি আল্লাযী ইউরা ফীস সামায়ি ওয়া ইয়ুযান্নু আন্নাহ লাওনুস সামায়ি" (আকাশের রঙ নীল হওয়ার কারণ - যেখানে নীলবর্ণকে আকাশের রঙ ভাবা হয়) শীর্ষক লম্বা শিরোনামের ছোট প্রবন্ধে তিনি পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সহজভাবে বললে, এই প্রবন্ধে তিনি আসমানের রঙ নীল হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। আল-কিন্দী বলেন, "ধূলিকণা ও বাতাসে থাকা বাষ্প সূর্যের আলো দ্বারা আলোকিত হয়ে মহাকাশের অন্ধকারের সাথে মিলে রংধনু সৃষ্টি করে।" প্রবন্ধের শিরোনামের মতো তার লেখনী পুরো বিষয়টি পূর্ণরূপে তুলে ধরে: "আমাদের বায়ুমণ্ডলে থাকা বাতাস পৃথিবী ও তারকাদের থেকে আসা আলোর সাথে সম্মিলিত হয়ে আলো ও আঁধারের মাঝামাঝি নীল রঙ হিসেবে দৃশ্যমান হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এই রঙ আকাশের রঙ নয়, বরং তা আলো-আঁধারের মিথস্ক্রিয়ার ফলে আমাদের দৃষ্টির সামনে হাজির হয়।
ঠিক যেমনটি স্বচ্ছ কোনো বস্তুর পিছন থেকে উজ্জ্বল বস্তু দেখার সময় ঘটে, যেমন: সূর্যোদয়। ওই সময় সূর্যের আলোর সাথে স্বচ্ছ বস্তুর রঙের সংমিশ্রণ আমাদের দৃষ্টিতে আসে। কাচের পিছন থেকে যখন আমরা কিছু দেখি, প্রকৃতপক্ষে তখন আমরা কাচ এবং ওই বস্তুর রঙের সম্মিলনে সৃষ্ট একটি রঙ দেখি।"
উচ্চ শিক্ষিত মহলে জ্ঞান হিসেবে বহু অসম্ভব ও সংশয়ে ঘেরা মতবাদ প্রচলিত থাকলেও আল-কিন্দী ঠিক জায়গাতেই ছিলেন, কেননা আকাশ আসলেই নীল নয়। ৯ম শতাব্দির বাগদাদ নিবাসী সুপণ্ডিত এই মনীষী বিজ্ঞান, গণিত, সঙ্গীতবিদ্যায় সবার চেয়ে অগ্রগামী এবং একইসাথে দক্ষ চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে তিনি খুব সহজেই এসব মতবাদের সাথে পাল্লা দিতে পারতেন।
ইবনুল হাইছামও তার সময়ের প্রচলিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পিছিয়ে আসেননি। এক হাজার বছর পূর্বে খলীফার চাহিদা মাফিক নীলনদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে কায়রোতে গৃহবন্দী করা হয়। প্রাচীন মিশরীয়রা যা পারেনি, সেটা যে তিনিও পারবেন না, তা তিনি বেশ ভালোভাবেই বুঝে যান। তাই গা বাঁচানো এবং নিজের অধ্যয়ন চলমান রাখার জন্য তিনি পাগলের ভান ধরেন। বন্দীদশা তার জন্য উপকার বয়ে আনে, কেননা তার মানে দাঁড়াচ্ছে: জানালার শাটারের ছোট ছিদ্র দিয়ে আসা আলো পর্যবেক্ষণে কেউ আর তাকে বিরক্ত করবে না।
পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের এই সময়টুকুর বদৌলতে তিনি রংধনু, বর্ণবলয় প্রভাব এবং দিগন্তের কাছাকাছি আসলে চাঁদ ও সূর্যের আকৃতি বড় মনে হওয়ার মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি বলেন, বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে চাঁদ ও সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি আসলে তাদের আপাত দৃশ্যমান আকৃতি বড় মনে হয়। তিনি আরও যোগ করেন, চাঁদ ও সূর্যের এই বর্ধিত আকার আসলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে সৃষ্ট দৃষ্টির এক ভেল্কি মাত্র। তিনি দেখান যে, প্রতিসরণের মাধ্যমে সূর্যের আলো আমাদের নিকট পৌঁছায়, এমনকি তা যদি দিগন্তের ১৯ ডিগ্রি নিচেও অবস্থান করে এবং এর ভিত্তিতে তিনি বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা পরিমাপ করেন: ১০ মাইল।
১৩১৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী কামালুদ্দীন আল-ফারিসী কাচের গোলকের অভ্যন্তরে আলোকরশ্মির পথ পর্যবেক্ষণ করে হাইছামের কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটান এবং সেটার উন্নয়ন সাধন করেন। তিনি চেয়েছিলেন বৃষ্টির ফোঁটায় সূর্যরশ্মির প্রতিসরণ নির্ণয় করতে। পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি মুখ্য ও গৌন রংধনুর গঠনের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, বস্তুত এ পরীক্ষা প্রিজমের মাধ্যমে সাদাবর্ণের বিশ্লিষ্টকরণ মাত্র।
পরেরবার শিশু যখন আপনাকে 'কেন' প্রশ্নটি করবে, তখন মধ্যযুগীয় মুসলিমদের এসব কর্মকাণ্ডের উল্লেখ হবে আবিষ্কারের পথে শিশুর মানসিক অভিযাত্রার এক উত্তম সূচনা।
📄 ভূগোল
সাধারণভাবে বললে মুসলিমগণ এবং বিশেষভাবে বললে মুসলিম সভ্যতার পর্যটক, অনুসন্ধানী এবং বণিকগণ ছিলেন বহির্মুখো স্বভাবের। তারা তাদের নিকট-দূর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সংরক্ষণ করতেন সেসব বিবরণ। যে পরিবেশে বসবাস করতেন, তা ছিল ভূগোলে তাদের আগ্রহ জোগানের অন্যতম একটি কারণ। উন্নত ও সতেজ চারণভূমির অন্বেষণে তাদেরকে বেরিয়ে পড়তে হতো মূল্যবান পশুপাল নিয়ে, তাই নিজেদের চারপাশের উদ্ভিদ, লতাগুল্ম এবং বন্য প্রাণিদের ব্যাপারে তাদের আহরিত জ্ঞান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এমন পরিবেশে নিতান্ত ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার খাতিরেই বিকশিত হয়েছিল ভূগোলের ন্যায় বিজ্ঞান।
পবিত্র হজ্জ নিছক একটি ইবাদত ছিল না, বরং তা ছিল বিভিন্ন বস্তু ও পণ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক হজ্জযাত্রীই মক্কা ও মদীনায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মৌখিক বিবরণ অনুসরণ করতো। পরবর্তীতে এগুলোর লিখিত রূপ ভ্রমণ গাইড বা সহায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুসলিম বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে আসা হজ্জযাত্রীদের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রাকে সহজীকরণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে এসব ভ্রমণ সহায়িকা অন্যদের নিকট হস্তান্তরিত হতে থাকে।
প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জন্য মক্কায় অবস্থিত কাবাঘরের দিক নির্ণয় এবং মসজিদগুলোকে মক্কামুখী করা ছিল ভূগোল অধ্যয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সবশেষে, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং সম্প্রসারণশীল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ভূগোল চর্চায় আরেকটি মাত্রা এনেছিল।
অধিকতর নিখুঁত জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র গড়ে উঠায় ভূগোলের সমৃদ্ধিতে বড় ধরনের গবেষণা উদ্যোগ সম্ভবপর হয়েছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় মানচিত্রাঙ্কন পরিণত হয় ভূগোলের একটি সম্মানজনক শাখায়। ৯ম শতাব্দীর পারসীয় পণ্ডিত ও অত্যন্ত উঁচুমাপের গণিতজ্ঞ আল-खাওয়ারিযমী ছিলেন বর্ণনামূলক ভূগোলের শুরুর দিকের অন্যতম অগ্রনায়ক এবং এ কাজে তিনি বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করতেন। তার বিখ্যাত "সুরাতুল আরদ" (পৃথিবীর আকার) গ্রন্থটি মাটি খোঁড়া, পর্যবেক্ষণ এবং প্রাপ্ত ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংরক্ষণের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল বাগদাদ, মুসলিম স্পেন তথা আন্দালুসের মুসলিম অনুসন্ধানীদের এক প্রজন্মকে।
সুহরাব নামের আরেক ভূগোলবিদ দশম শতাব্দীর শুরুর দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্র, দ্বীপ, হ্রদ, পর্বত এবং নদ-নদীর বিবরণ সম্বলিত গ্রন্থ রচনা করেন। ইউফ্রেটিস, তাইগ্রিস ও নীলনদ নিয়ে তার মন্তব্যগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তার দেয়া বাগদাদের খালগুলোর বিবরণ হচ্ছে ওই শহর পুনর্গঠনের মধ্যযুগীয় পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি।
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে গাই ল্যা স্ট্রেন্জ এই নগর পরিকল্পনার পুনর্গঠন করেন, তবে তিনি সুহরাবের নামের সাথে সুবিখ্যাত চিকিৎসক ইবনে সারাবিউন (বা লাতিনে ইবনে সেরাপিওন)-এর নাম গুলিয়ে ফেলেছিলেন। ল্যা স্ট্রেন্জ তার পুনর্গঠনে ৯ম শতাব্দীর আল-ইয়াকুবীর কাজকেও ব্যবহার করেছিলেন।
সুহরাবের দেয়া জল-ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্কের বিবরণ এবং আল-ইয়াকুবীর দেয়া বাগদাদ থেকে আসা প্রধান সড়কগুলোর বিবরণ মূলত একে অপরের উত্তম পরিপূরক।
১০ম শতাব্দির ভূগোলবিদ আল-মুকাদ্দিসী মুসলিম বিশ্ব ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ পর্যবেক্ষণ, প্রণয়ন ও নিরীক্ষণ, নোট নেয়া এবং লেখার কাজে সময় ব্যয় করেছিলেন। এত বছরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আলোকে ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয় "আহসানুত তাক্বাসীম ফী মা'রিফাতিল আকালীম" (বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞান লাভের সর্বোত্তম বিভাজন) নামক গ্রন্থ। পড়তে আনন্দায়ক এই গ্রন্থ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের নিকট আবেদন সৃষ্টি করেছিল। পূর্ব ও পরের বহু পণ্ডিতদের ন্যায় তার এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার পিছনে ঐশ্বরিক প্রেরণা কাজ করেছিল। আল্লাহকে ভালোভাবে জানার জন্য নিবেদিত তার এসব রচনা উপযুক্ত মূল্যায়নও পেয়েছিল। ভৌগোলিক পরিভাষা, জমি ভাগ করার বিভিন্ন পদ্ধতি এবং প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মুসলিম ভূগোলের নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিল।
অভিধানপ্রণেতা হিসেবে সুবিদিত মাহমূদ আল-কাশগরী ছিলেন শুরুর দিকের অন্যতম তুর্কি ভূগোলবিদ। ভাষাতত্ত্বের আলোকে দেখতে বেশ অদ্ভুত ও গোলাকার প্রকৃতির একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন। ১০৭৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত ব্যাকরণ বিষয়ক তার শ্রেষ্ঠকীর্তি "দিওয়ান লেহজাতুত তুর্ক” (তুর্কি উপভাষার তথ্য বিবরণী)-তে মানচিত্রটি রয়েছে। চীন, উত্তর আফ্রিকাসহ মধ্য এশিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ এই মানচিত্রে থাকলেও ভলগা নদী পেরিয়ে খুব অল্প তথ্যই এখানে এসেছে। তুর্কিদের পশ্চিম অভিমুখে যাত্রার পূর্বে রচিত হওয়ায় খুব সম্ভবত এমনটি হয়েছে।
১১শ ও ১২শ শতাব্দির দু'জন মুসলিম লেখক আল-বাকরী ও ইবনে জুবায়ের তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া তথ্য-উপাত্ত সংকলন ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সহজে পঠনযোগ্য গ্রন্থে জমা করেন। এই দু'জনের প্রথম ব্যক্তি স্পেনের হুয়েলবা এবং সলটেজ প্রদেশের গভর্নরের পুত্র ছিলেন। বহু কূটনৈতিক মিশন পরিচালনাকারী আল-বাকরী ছিলেন সেভিল রাজ দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
জরিপ রোমান জরিপকারীরা 'জমির সমতা বা ভারসাম্য' পরিমাপের জন্য ওলনদড়িসহ একটি ত্রিকোণাকার স্থিতি ব্যবহার করতো। এই কৌশল মুসলিম ও খ্রিস্টান স্পেনেও চালু ছিল।
কিন্তু রোমানরা triangulation (ট্রায়াঙ্গুলেশন জানা কোণের সাহায্যে অজানা বিন্দুর অবস্থান নির্ণয়) সম্পর্কে অবহিত ছিল না, যে পদ্ধতিটি আজও জরিপ ও মানচিত্র প্রস্তুতের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রাচ্যে উদ্ভূত এ পদ্ধতির বিবরণ মাসলামা এবং ইবনুস সাফ্ফার নামের দু'জন স্পেনীয় পণ্ডিতের আঙুর্লাব বিষয়ক প্রবন্ধে পাওয়া যায়। মাসলামার গ্রন্থটি সেভিলের জন ১২শ শতাব্দিতে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।
১০ম শতাব্দিতে লেখা "জ্যামিতি” গ্রন্থে আন্তর্লাবে প্রয়োগযোগ্য ট্রায়াঙ্গুলেশনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া বিশেষত বড় জমিতে সোজা সীমারেখা প্রস্তুতের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
আজকের দিনের নির্মাণ কাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ জরিপ।
বর্তমানে সেচ-প্রণালীসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পের জরিপ কাজ জরিপকারী দল দিয়ে সমাধা করা হয়। আন্দালুসে জরিপকারী দলকে মুহান্দিস বলা হলেও পূর্ব স্পেনে এরা soguejador (সোগিউযেডর) নামে পরিচিত ছিল।
সমতল ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে আজও অজানা বিন্দুর অবস্থান নির্ণয়ে ট্রায়াঙ্গুলেশন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তবে এর সাথে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যেমন: বিশ্বজনীন অবস্থান নির্ণায়ক ব্যবস্থা বা জিপিএস (GPS)।
দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি একজন সফল পণ্ডিত ও প্রাবন্ধিক ছিলেন। বিভিন্ন স্থানের নামসহ আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক বিবরণ সমৃদ্ধ “আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক” (যাত্রাপথ এবং সাম্রাজ্য) নামের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তারই রচনা। বর্ণানুক্রমিক ধারায় রচিত এই গ্রন্থে বিভিন্ন শহর, গ্রাম, উপত্যকা এবং পাহাড়-পর্বতের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তৎকালের জানা পৃথিবী নিয়ে তার ছিল বিশ্বকোষ তুল্য আরেকটি মূল্যবান গ্রন্থ।
গ্রানাডার গভর্নরের অধীনে সচিবের দায়িত্ব পালনকারী ভ্যালেন্সিয়ার ইবনে জুবায়ের ওইসব মানুষের অন্যতম, যারা হজ্জ পালনের জন্য নিজেদের মক্কা অভিমুখী সফরনামা লিখে রাখতেন। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত ৭০০ বছরের পুরানো এসব গ্রন্থ অনেকটা সাময়িকীর ন্যায় ছিল। তার এই সফরনামা কেবল ভূগোলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তাতে উদ্ভিদ, লতাগুল্ম, রন্ধনশিল্প ও ভ্রমণ বিষয়ে বেশ উপকারী উপদেশ পর্যন্ত অন্তর্ভূক্ত ছিল।
সফরনামা নথিবদ্ধ করার মনোবৃত্তি মুসলিম স্পেনে বেশ বলিষ্ঠ ছিল এবং এটা আল-ইদরিসীর মতো গুণী পণ্ডিতের পক্ষে সম্ভব করেছিল তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র প্রস্তুত করা। ১১৩৯ খ্রিস্টাব্দে সিসিলির নরম্যান রাজা দ্বিতীয় রজার মানচিত্র প্রস্তুতের জন্য আল-ইদরিসীকে নিয়োগ দেন। কর্ডোবা থেকে সিসিলি এসে সুদীর্ঘ ১৫ বছর তিনি এ কাজে ব্যয় করেন। নরম্যান রাজার পালেরমো দরবারে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে অবস্থান করে হাজারো পর্যটকদের সাক্ষাৎকার নেয়াসহ তিনি ৭০-টি নির্ভুল মানচিত্র সম্বলিত “কিতাব রজার” রচনা করেছিলেন, যাতে এমনকিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত হয়, যা পূর্বে মানচিত্রভুক্ত ছিল না।
পূর্ববর্তী লেখকদের দেয়া তথ্য এবং সিসিলিতে অবস্থানকালে তিনি যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন, উভয়ের ভিত্তিতে তিনি গ্রন্থটি লিখেছিলেন। পৃথিবী গোলাকার, এটার পুনর্ব্যক্তকরণের পাশাপাশি তিনি বলেন, পৃথিবী "মহাকাশে ডিমের কুসুমের ন্যায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।" এছাড়াও ছিল এতে উত্তর-দক্ষিণ গোলার্ধ, জলবায়ু, সাগর- মহাসাগর ও উপসাগর নিয়ে বিস্তর আলোচনা। এশিয়া ও আফ্রিকার অত্যন্ত দূরবর্তী বহু অঞ্চলের চমকপ্রদ বিবরণের আকর হিসেবে এ গ্রন্থের জুড়ি মেলা ভার।
১৩শ শতাব্দিতে ইয়াকৃত আল-হামাবী ইরাকের মাওসুল থেকে সিরিয়ার আলেপ্পো, এরপর ফিলিস্তিন, মিশর এবং পারস্য পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। দুঃখজনকভাবে এই মনীষীর মাত্র চারটি কর্ম টিকে আছে, যার মধ্যে "মু'জামুল বুলদান" (শহর ও নগরের অভিধান) গ্রন্থটি সর্বাধিক পরিচিত। প্রত্নতত্ত্ব, মানব জাতির বৈজ্ঞানিক বিবরণ, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, ভূগোল এবং প্রতিটি স্থানের স্থানাঙ্ক প্রদানসহ এই ভূগোল বিশ্বকোষে তৎকালীন সময়ের জানা পৃথিবীর প্রায় সকল মধ্যযুগীয় জ্ঞানের সন্নিবেশ ঘটেছে। প্রতিটি শহর- জনপদের নাম ও বিবরণের পাশাপাশি তিনি এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুরাকীর্তি, অর্থনীতি, ইতিহাস, জনসংখ্যা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অবস্থাও অন্তর্ভূক্ত করেছেন।
গোলাকার পৃথিবী "(পৃথিবী যে গোলাকার) আরব বিজ্ঞানীরা তা বেশ আগে থেকে জানলেও ইউরোপীয়রা এই বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে ছিল যে, পৃথিবী সমতল ... (আল-ইদরিসীর এ গ্রন্থে) একটি ভ্রমণ সহায়িকা ও মানচিত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে যা কলাম্বাসের আগ পর্যন্ত ৩৫০ বছর ধরে নির্ভুল ছিল। এ গ্রন্থে ইংল্যান্ডকে 'চিরস্থায়ী শীতের কবলে আটকা' দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ... এটা ছিল ইসলামী পাণ্ডিত্যের এক অপরিহার্য উপাদান, যা ইউরোপের সভ্যতা বিকাশে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিল।" - বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe-এ ১২শ শতাব্দির ভূগোলিবিদ আল-ইদরিসীর ব্যাপারে রাগেহ উমর এই মন্তব্য করেন
পৃথিবী গোলাকার বিষয়ে মুসলিম ভূগোলবিদগণ একমত ছিলেন এবং তারা এই ভূগোলকের বিশদ পরিমাপ বের করার পিছনে ব্যাপক ঘাম ঝরিয়েছিলেন।
"মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ভূগোল গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত (আল-ইদরিসীর এ গ্রন্থে) একটি ভ্রমণ সহায়িকা ও মানচিত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে যা কলাম্বাসের আগ পর্যন্ত ৩৫০ বছর ধরে নির্ভুল ছিল। এ গ্রন্থে ইংল্যান্ডকে 'চিরস্থায়ী শীতের কবলে আটকা' দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ... এটা ছিল ইসলামী পাণ্ডিত্যের এক অপরিহার্য উপাদান, যা ইউরোপের সভ্যতা বিকাশে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিল।" - রাগেহ উমর, বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার মতো ভূগোলে অবদান রেখেছেন, এমন ব্যক্তিদের তালিকা করতে গেলে তা আর শেষ হবে না। এদের অনেকেই চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ, জ্ঞান আহরণ, উপলব্ধি ও কৌতূহলের আজন্ম তৃষ্ণা মেটাতে ঘর ছেড়ে পৃথিবী ছড়িয়ে পড়েছিলেন; এবং তারা এমনসব তথ্য ও উপাত্ত রেখে গেছেন, যা আজও আমাদের কল্যাণে ভূমিকা রাখছে।
আজ আমরা ম্যাগাজিন, স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিমিষেই দুনিয়া সম্পর্কে জানতে পারি। এরপরেও অনেকেই আনন্দ উপভোগের জন্য সশরীরে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আরাম কেদারায় বসে 'পেশাদারদের' থেকে আমরা শেখা ও বোঝার চেষ্টা করি। অন্যদিকে গত সহস্রাব্দে কৌতূহল ও ঈমান দ্বারা চালিত একদল মানুষ তাদের চারিপাশ উপলব্ধির জন্য কতশত পথই না পাড়ি দিয়েছিল, তা ভাবতেই অবাক লাগে।
📄 মানচিত্র
প্রায় তিনহাজার পাঁচশত বছর ধরে মানুষ তাদের পথ খুঁজে নিতে মানচিত্রের ব্যবহার করে আসছে। একেবারে শুরুর দিকে কাদামাটির ফলকে মানচিত্র খোদাই করা হতো। কাগজের ব্যবহার যেমন মানচিত্রাঙ্কনে এক সময় এনেছিল নবজোয়ার, ঠিক তেমনি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (GIS)-এর উদ্ভাবন মানচিত্রাঙ্কনে এনে দিয়েছে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাজ্যে প্রথম বৃহদাকার কম্পিউটারাইজড এবং ডিজিটাল মানচিত্রের দেখা মেলে এবং ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে অধিকাংশ শিল্পায়িত বিশ্ব পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে উঠে।
স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ব্যবহার এবং রিসিভার বা গ্রাহকের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোন বিন্দুর অবস্থান নির্ণয়ের আধুনিক প্রযুক্তির পূর্বে মানচিত্র প্রস্তুত করা হতো পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের প্রত্যক্ষ বিবরণের ভিত্তিতে।
ভ্রমণ পিপাসু ৭ম শতাব্দির মুসলিমগণ বাণিজ্য ও ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি নিজেদের আশেপাশের দুনিয়া অনুসন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে। কখনো তারা পথের পর পথ পাড়ি দিয়েছে নতুন স্থান সম্পর্কে জানার জন্য এবং যাত্রা শেষে তারা সেসব এলাকা, মানুষ ও দর্শনীয় স্থানসমূহের বিবরণ সংরক্ষণ করতো। প্রথম দিকে তা মৌখিক হলেও ৮ম শতাব্দিতে বাগদাদে কাগজের প্রচলন হলে প্রথম কাগুজে মানচিত্র প্রস্তুতসহ একে একে ভ্রমণ সহায়িকাগুলো আবির্ভূত হতে থাকে।
নিজেদের সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়তা করতে আব্বাসী খলীফাগণ পোস্টমাস্টার বা ডাকমুন্সীদের জন্য বহু প্রতিবেদক নিয়োগ দেয়। প্রতিবেদকদের দেয়া বিবরণের ভিত্তিতে "আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক" (যাত্রাপথ ও সাম্রাজ্য) শ্রেণির গ্রন্থসমূহ রচিত হতে থাকে এবং তা দূর-দূরান্ত ও ভিনদেশী এলাকাগুলোর বিবরণ, সেখানের ভূ-বিন্যাস, উৎপাদন ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তথ্যাদি সংগ্রহে উদ্দীপনার এক নব জোয়ার নিয়ে আসে।
মুসলিমরা যখন দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছিল, তখন (৮ম থেকে ১১শ শতাব্দির) ভাইকিংদের কথা বাদ দিলে খুব অল্প ইউরোপীয়রাই এমন দূরত্বে ভ্রমণ করতো এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষদের বানানো মানচিত্রের সুবাদে চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে গড়পড়তা ইউরোপীয়দের জ্ঞান নিজেদের এলাকা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলামী বিশ্বের ভূগোলবিদ এবং মানচিত্রকাররা না থাকলে ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দির বিখ্যাত ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের যাত্রা কখনো আলোর মুখ দেখতো কিনা, তা ভাববার বিষয়।
আমরা যেসব মানচিত্র ব্যবহার করি, সেগুলো ইউরোপীয় রীতির এবং কয়েক শতাব্দি পুরানো। গতানুগতিক ধারায় 'উত্তর'-কে মানচিত্রের উপরে রাখার কারণটা বেশ অদ্ভুত; আসলে ধ্রুবতারা (নর্থ স্টার) এবং চৌম্বকীয় কম্পাস ব্যবহার করে ইউরোপীয় নাবিকরা তাদের নৌ-অভিযানের সূচনা করায় তারা 'উত্তর'-কে মানচিত্রের উপরে স্থান দিয়েছে। এর আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় মানচিত্রের শীর্ষে 'পূর্ব'-এর অবস্থান ছিল, বস্তুত এটা থেকেই orientation (অভিমুখ) শব্দের উৎপত্তি। মধ্যযুগীয় ইউরোপে সাধারণত জেরুজালেমকে উপরে বা কেন্দ্রে রাখা হতো, যেহেতু এটা তাদের নিকট পবিত্রভূমি তুল্য ছিল।
ইউরোপীয় মানচিত্র এবং মুসলিম মানচিত্রের মাঝে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হচ্ছে: মুসলিমরা দক্ষিণকে উপরে এবং উত্তরকে নিচে রাখতো। অধিকতর নিখুঁত জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র গড়ে উঠার বদৌলতে মুসলিমদের নিকট মানচিত্রাঙ্কন পরিণত হয় এক সম্মানজনক বিজ্ঞানে। পশ্চিমা মানচিত্রকাররা পরবর্তীতে যে ধরনের মানচিত্র বানাতো, মুসলিমদের দৃষ্টিতে তা উল্টানো ছিল, যেহেতু সেগুলোতে উত্তর ছিল উপরে এবং দক্ষিণ নিচে।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদ জাদুঘরে নাবিক পিরি ইবনে হাজ্জ মুহাম্মদ রেইস স্বাক্ষরিত ১৬শ শতাব্দির বিশ্ব মানিচিত্রের অংশবিশেষ খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে বছর হিসেবে লেখা রয়েছে মুহারম, ৯১৯ হিজরী বা ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দ। 'আমেরিকার মানচিত্র' নামেও পরিচিত এই মানচিত্র কলাম্বাসের নতুন বিশ্বে পৌঁছানোর মাত্র ২১ বছর পর আঁকা হয়েছিল।
"কলাম্বাস আরবী মানচিত্রসমূহ অধ্যয়ন করেছিলেন... দক্ষ মুসলিম ও ইহুদিদের সাহায্য নেয়া ছাড়া ১৬শ শতাব্দির ইউরোপে স্পেন কখনো শক্তিধর ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতো না।" - রাগেহ উমর, বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe
পিরি রেইসের এই মানচিত্র আবিষ্কৃত হলে দুনিয়া জুড়ে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, কেননা ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে নতুন বিশ্বের অনুসন্ধানে তৃতীয়বারের মতো বের হওয়া কলাম্বাসের বানানো একটি মানচিত্রের সাথে এটার যোগসূত্র রয়েছে। কলাম্বাসের ওই হারিয়ে যাওয়া মানচিত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত পিরি রেইসের এ মানচিত্রে ব্রাজিল চিহ্নিত এলাকাতে লিখিত রয়েছে, "এই অধ্যায় বলবে কীভাবে এই মানচিত্র রচিত হয়েছে। এরূপ মানচিত্র আর কারও কাছে কখনো ছিল না। ২০-টি আঞ্চলিক এবং বেশকিছু বিশ্ব মানচিত্রের সাহায্যে এই ফকির নিজ হাতে এটা প্রস্তুত করেছে। বিশ্ব মানচিত্রের মাঝে রয়েছে ... আরবদের আঁকা ভারতের একটি মানচিত্র, গাণিতিক প্রক্ষেপণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সাম্প্রতিককালে পর্তুগিজদের বানানো চারটি মানচিত্র যেখানে হিন্দুস্তান ও চীন চিহ্নিত রয়েছে এবং সেইসাথে রয়েছে কলাম্বাসের আঁকা পশ্চিমের মানচিত্র ... এই মানচিত্রে অঙ্কিত (নতুন বিশ্বের) উপকূল ও দ্বীপসমূহ কলাম্বাসের মানচিত্র থেকে নেয়া।" এটা ছাড়া কলাম্বাসের মানচিত্রের আর কোনো নিশানা পাওয়া যায়নি।
অতি সম্প্রতি চীনা মুসলিম নৌ-সেনাপতি যেং হোর মানচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে এবং সেখান থেকে জানা যায় যে, এটা বানানোর সময়কাল ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দ। পিরি রেইস এই মানচিত্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন কিনা, তা আমরা এখনো নিশ্চিত জানি না।
চার্লস হ্যাপগুড ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রস্তাব করেন যে, পিরি রেইসের মানচিত্রে এন্টার্কটিকা মহাদেশ রয়েছে (এই মহাদেশ 'আবিষ্কারের' ৩০৭ বছর পূর্বে)। কিন্তু গভীর পর্যালোচনার সামনে এই তত্ত্ব টিকেনি, বরং দৃশ্যত এটা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল। এছাড়াও এই মানচিত্রে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা রয়েছে, যা এই মানচিত্র তৈরির ১৪ বছর পর ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে 'প্রথমবারের মতো' কোনো স্পেনীয় মানুষের নজরে আসে। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে হরিণের চামড়ায় অঙ্কিত বিশ্ব মানচিত্রের এই অংশে স্পেনের নিকটবর্তী উপকূল এবং নতুন বিশ্বসহ উত্তর আফ্রিকা চিহ্নিত হয়েছে।
পিরি রেইস এখানেই থেমে যাননি, বরং ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দ্বিতীয় আরেকটি মানচিত্র প্রস্তুত করেছিলেন, যার এক-ষষ্ঠাংশ বর্তমানে টিকে আছে। এটাতে আটলান্টিকের উত্তর-পশ্চিমাংশ, ভেনিজুয়েলা থেকে নবআবিষ্কৃত এলাকা হয়ে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ ডগা পর্যন্ত চিত্রিত হয়েছে। ইতিহাসবেত্তাগণ মানচিত্রের এই উৎকর্ষতা দেখে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি প্রথম বিশ্ব মানচিত্রের খুব সামান্য অংশ টিকে থাকায় বেশ আক্ষেপ প্রকাশ করেন। অবশিষ্ট অংশ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা এখন পর্যন্ত তেমন ফলপ্রসূ হয়নি।
৭ম শতাব্দি থেকে মুসলিমরা হজ্জ পালনের জন্য হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় বা উটের পিঠে চড়ে মক্কা অভিমুখে বের হতো। কাগজের সুবাদে হজ্জ যাত্রীগণ অন্যদের যাত্রাকে সুখকর করতে ভ্রমণ সহায়ক মানচিত্র প্রস্তুত করা শুরু করেছিল।
কে এই পিরি রেইস এবং মানচিত্রাঙ্কনে এত অবদান সত্ত্বেও অধিকাংশ ইতিহাসের বই কেন তার ব্যাপারে নীরব?
১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিপলিতে জন্ম নেয়া পিরি রেইস ১৫শ শতাব্দির শেষদিকে তার প্রথিতযশা চাচা কামাল রেইসের অধীনে নিজের সমুদ্র জীবন শুরু করেছিলেন। চাচার সাথে তিনি বেশকিছু নৌযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে নৌ-সেনাপতি পদে উন্নীত হয়ে তিনি লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অটোমান নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এসমস্ত যুদ্ধের মাঝে তিনি অবসর নিয়ে গ্যালিপলিতে ফিরে আসেন এবং তৈরি করেন তার প্রথম বিশ্ব মানচিত্র, রচনা করেন নৌ-চালনার দিক নির্ণয়ের ম্যানুয়েল গ্রন্থ: "কিতাবুল বাহরিয়া" (সমুদ্র জ্ঞান বিষয়ক পুস্তক) এবং ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার দ্বিতীয় বিশ্ব মানচিত্র প্রস্তুত করেন। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্ব মানচিত্র তৈরি, এরপর অবসর, এরপর আবার ১৬শ শতাব্দির মধ্যভাগে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে অটোমান নৌবহরের নেতৃত্ব দিতে সেনাপতি হিসেবে ফিরে আসা - মাঝের এই অবসর সময়কে ঘিরে অনেক রহস্য লোকমুখে প্রচলিত আছে। কিন্তু তার জীবনের শেষটা খুবই নির্মম ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক নৌযুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় অটোমান সুলতান তাকে হত্যার আদেশ দেয়।
১০০১ মুসলিম আবিষ্কার গ্রন্থে বর্ণিত অধিকাংশ ঐতিহাসিক তথ্যের ন্যায় মানচিত্রাঙ্কনের অনেক তথ্যই সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছেনি। ইউরোপ তার নিজের ইতিহাস নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এবং সমুদ্র অভিযান, আবিষ্কার, বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের নাটকীয় সব গল্পের রহস্যজট খোলাতে নিমগ্ন থাকায় তুর্কি মানচিত্রগুলোতে খুব কমই দৃষ্টিপাত করা হয়েছে, আর না হয় ভ্রান্তভাবে সেগুলোকে ইতালীয় বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু আসল বাস্তবতা হচ্ছে: তুর্কির নৌচালন-বিদ্যা তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে পিরি রেইস যখন অটোমান সুলতানের নিকট তার নতুন বিশ্ব মানচিত্র পেশ করেছিলেন, তখন তুরস্কের হাতে ছিল উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার দুর্গম কিছু এলাকার নির্ভুল মানচিত্র, যেখানে ওই সময় ও তার পরবর্তী কিছু কাল ধরে ইউরোপীয় নাবিকগণ এসব এলাকা হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছিলেন।
সম্ভবত সবচেয়ে অবাক করা বিশ্ব মানচিত্রের মাঝে আলী মাজার রেইসের মানচিত্র অন্যতম। ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে আঁকা এই মানচিত্র এতই নিখুঁত ও খুটিনাটি বিবরণ সম্বলিত যে, তা আধুনিক মানচিত্রের সাথে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ এবং আমাদের অনেকের নিকট এমনটি মনে হবে যে, আলী মাজার রেইস যেন চাঁদ থেকে পৃথিবী দেখে এই মানচিত্র এঁকেছেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মানচিত্রের মাঝে রয়েছে সিসিলির নরম্যান রাজা দ্বিতীয় রজারের জন্য আল-ইদরিসীর আঁকা ৭০-টি আঞ্চলিক মানচিত্র, যেগুলো একত্র হয়ে তখনকার জানা পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র দাঁড় করায়। হাজারো পর্যটকের সাক্ষাতের ভিত্তিতে বানানো নিখুঁত এই মানচিত্রে এমনও এলাকা ছিল, যা ওই সময়ের পূর্বে কখনো মানচিত্রভুক্ত হয়নি। তিন শতাব্দি ধরে ভূগোলবিদগণ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই তার মানচিত্রগুলো নকল করতো। মুগ্ধ করা আকর্ষণীয় গুণের অধিকারী এই প্রতিভা সম্পর্কে আপনি এই বিভাগের নৌচালন-বিদ্যা অধ্যায়ে আরও তথ্য পাবেন।
পীরি রেইসের মানচিত্র পূর্ব ও পশ্চিমকে এক করা মানচিত্র এ যাবৎ টিকে থাকা আমেরিকা মহাদেশের বিস্তারিত বিবরণ সমৃদ্ধ সর্বপ্রাচীন মানচিত্র
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: নিজেই যেখানে বিস্ময়, সেখানে পিরি রেইসের এই অসাধারণ মানচিত্রে আমেরিকা অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পাশাপাশি এটাই ক্রিস্টোফার কলাম্বাসের হারিয়ে যাওয়া মানচিত্রের একমাত্র সংরক্ষিত নথি
অবস্থান: তুর্কি তারিখ: ১৬শ শতাব্দি প্রধান ব্যক্তিত্ব: তুর্কি নৌ-সেনাপতি পিরি রেইস
১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে একদল গবেষক তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদ জাদুঘরে ১৬শ শতাব্দীর তুর্কি বিশ্ব মানচিত্রের কিছু অংশ আবিষ্কার করে। নাবিক পিরি ইবনে হাজ্জ মুহাম্মদ রেইস স্বাক্ষরিত মানচিত্রটি প্রস্তুতের সময়কাল: ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দ (রেইস অর্থ: নৌ-সেনাপতি)। 'আমেরিকার মানচিত্র' নামেও পরিচিত মানচিত্রটি কলাম্বাসের নতুন বিশ্বে পৌঁছানোর মাত্র ২১ বছর পর আঁকা হয়েছিল।
১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিপলিতে জন্ম নেয়া পিরি রেইস ১৫শ শতাব্দীর শেষদিকে তার প্রথিতযশা চাচা কামাল রেইসের অধীনে নিজের সমুদ্র জীবন শুরু করেছিলেন। চাচার সাথে তিনি বেশকিছু নৌযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে নৌ-সেনাপতি পদে উন্নীত হয়ে তিনি লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অটোমান নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রাসাদ জাদুঘরে পুনরাবিষ্কৃত এই মানচিত্র আঁকতে পিরি রেইস তার নিজস্ব ভ্রমণ বা নৌ-অভিযানের উপর নির্ভর করেননি, যেমনটি আপনি ভাবতে পারেন। আরবদের আঁকা ভারতের একটি মানচিত্র, একটি চীন ও চারটি পর্তুগিজ মানচিত্র এবং 'পশ্চিমাঞ্চল' তথা নতুন বিশ্বের উপকূল ও দ্বীপ-সম্বলিত কলাম্বাসের আঁকা মানচিত্রসহ ২০-টি আঞ্চলিক মানচিত্র ব্যবহার করে তিনি এ বিশ্ব মানচিত্র প্রস্তুত করেছিলেন।
শেষের এই তথ্যের জন্যই পিরি রেইসের এই মানচিত্রের পুনরাবিষ্কার বিশ্বব্যাপী ইতিহাসবেত্তাদের মাঝে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। সবশেষে তিনি যে মানচিত্রের উল্লেখ করেছেন, তা নতুন বিশ্ব অনুসন্ধানে কলাম্বাসের তৃতীয় অভিযানের সময় আঁকা। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কলাম্বাস এটা স্পেনে পাঠিয়েছিলেন – কিন্তু তা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এখন আমরা পিরি রেইসের এই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি: কলাম্বাস কী সংরক্ষণ করেছিলেন।
পিরি রেইস সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। চলমান নৌ-যুদ্ধ থেকে অবসর নিয়ে তিনি গ্যালিপলিতে ফিরে আসেন এবং তৈরি করেন তার প্রথম বিশ্ব মানচিত্র, রচনা করেন নৌ-চালনার দিক নির্ণয়ের ম্যানুয়েল গ্রন্থ: "কিতাবুল বাহরিয়া" এবং ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার দ্বিতীয় বিশ্ব মানচিত্র প্রস্তুত করেন - যার এক-ষষ্ঠমাংশ টিকে আছে। এই মানচিত্রে আটলান্টিকের উত্তর-পশ্চিমাংশ, ভেনিজুয়েলা থেকে নবআবিষ্কৃত এলাকা হয়ে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ ডগা পর্যন্ত চিত্রিত হয়েছে। ইতিহাসবেত্তাগণ মানচিত্রের এই উৎকর্ষতা দেখে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি প্রথম বিশ্ব মানচিত্রের খুব সামান্য অংশ টিকে থাকায় তারা বেশ আক্ষেপ করেন। অবশিষ্ট অংশ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা এখন পর্যন্ত তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্ব মানচিত্র তৈরি, এরপর অবসর, এরপর আবার ১৬শ শতাব্দীর মধ্যভাগে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে অটোমান নৌবহরের নেতৃত্ব দিতে সেনাপতি হিসেবে ফিরে আসা - মাঝের এই অবসর সময়কে ঘিরে অনেক রহস্য লোকমুখে প্রচলিত আছে। কিন্তু তার জীবনের শেষটা খুবই নির্মম ছিল- গুরুত্বপূর্ণ এক নৌযুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় অটোমান সুলতান তাকে হত্যার আদেশ দেয়।
পিরি রেইসের আঁকা এই মানচিত্র বস্তুত এখন পর্যন্ত টিকে থাকা আমেরিকা মহাদেশের বিস্তারিত বিবরণ সমৃদ্ধ সর্বপ্রাচীন মানচিত্র। তুর্কি নৌচালন-বিদ্যা যে তার সময় থেকে কতটা এগিয়ে ছিল, এই মানচিত্র সেটারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে পিরি রেইস যখন অটোমান সুলতানের নিকট তার নতুন বিশ্ব মানচিত্র পেশ করেছিলেন, তখন তুরস্কের কাছে ছিল উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার দুর্গম কিছু এলাকার নির্ভুল মানচিত্র, যা ওই সময় ও তার পরবর্তী কিছু কাল ইউরোপীয় কোনো শাসকের কাছে ছিল না।