📄 চিকিৎসা জ্ঞান
হাজার বছর পূর্বের মুসলিম চিকিৎসকগণ যদি জানতেন যে, তাদের মৃত্যুর কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দি পরে তাদের রেখে যাওয়া কাজ লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়ে গোটা ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াবে, তবে তারা যে ভীষণ আনন্দিত হতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
৮৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আল-কায়রাওয়ানের ন্যায় আলো ছড়ানো হাসপাতালের বদৌলতে তিউনিস পরিণত হয় চিকিৎসা জ্ঞানের লালনভূমিতে। চিকিৎসা অনুশীলনের পাশাপাশি আল-কায়রাওয়ানের ছিল এমনকিছু মেধাবী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা জ্ঞানের উপর যাদের ছিল এমনসব মোটা গ্রন্থ, যেগুলো কন্সট্যান্টিন দ্য আফ্রিকানের মতো বিচক্ষণ মানুষ ইউরোপে নিয়ে আসেন।
"উৎসগতভাবে ইউরোপীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা কেবল আরবীয় নয়, বরং অবকাঠামোর দিক দিয়েও আরবীয়। আরবরাই ছিলেন ইউরোপীয়দের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের পূর্বপুরুষ।" - ড. ডোনাল্ড ক্রামবেল, বিংশ শতাব্দির আরব চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসবেত্তা
১১শ শতাব্দিতে তিউনিসের এই খ্রিস্টান পণ্ডিত চিকিৎসা বিশ্বকোষ লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন, যেন তা লাতিনভাষী ইউরোপীয়দের মাঝে সহজলভ্য হয়। ইউরোপের চিকিৎসা অধ্যয়নে বিপ্লব আনয়নের পাশাপাশি এটা চিকিৎসা বিষয়ে শিক্ষা দিতে পারে, এমন কিছু প্রখ্যাত পণ্ডিতের একটি প্রজন্ম গড়ে তোলে। কন্সট্যান্টিনের সর্বাধিক পরিচিত লাতিন অনুবাদের মাঝে রয়েছে: ১০ম শতাব্দির চিকিৎসক আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসীর "কিতাবুল মালাকী" (রাজকীয় পুস্তক)। এই আলী ইবনে আব্বাস আল-মাজুসী লাতিনে Pantegni (পানতেগনি) নামে সমধিক পরিচিত। কন্সট্যান্টিনের লাতিন অনুবাদটি ফ্রান্সের লিওনে ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে এবং সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
আল-কায়রাওয়ান হাসপাতাল থেকে শিক্ষা লাভ করা এবং সেখানেই চিকিৎসা অনুশীলনে রত চিকিৎসক ইবনুল জাযারের লেখা "যাদুল মুসাফির" (দূর দেশে বের হওয়া ভ্রমণকারীদের পথনির্দেশিকা বা ভ্রমণকারীদের পাথেয়) নামের গ্রন্থটি ছিল তৎকালের চিকিৎসাশাস্ত্রীয় বেস্ট-সেলার (বহুল বিক্রিত গ্রন্থ)।
ইবনুল জাযার ৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ৮০ বছরেরও বেশি বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ২৪,০০০ দিনার এবং চিকিৎসা ও অন্যান্য শাস্ত্রের উপর লেখা ২৫ কুইন্টার (১ কুইন্টার = ৪৫ কিলোগ্রাম)-এর সমপরিমাণ ওজনের বই- পুস্তক রেখে যান। তার এসব কীর্তির মাঝে নারীদের ব্যাধি ও তার প্রতিকার শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ধরনের লেখা তাকে এনে দেয় সীমাহীন যশ ও খ্যাতি এবং মধ্যযুগের পশ্চিমা ইউরোপে তিনি পরিণত অন্যতম প্রভাবশালী মনীষীতে।
কন্সট্যান্টিন Viaticum peregrinantis শিরোনামে যাদুল মুসাফির গ্রন্থের লাতিন অনুবাদ সম্পন্ন করেন, অন্যদিকে সেনিসিয়োস Zedat ha-derachim শিরোনামে এটার গ্রিক ও হিব্রু অনুবাদ প্রকাশ করেন, যা এটাকে আন্তর্জাতিক বেস্ট সেলার এবং সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থের কাতারে নিয়ে আসে। যাদুল মুসাফির ছিল অত্যন্ত সুবিন্যস্ত এবং পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গ্রন্থ, যা সালেরনো, মন্টেপেলিয়ার, বলোনিয়া, প্যারিস ও অক্সফোর্ডের চিকিৎসা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালসমূহের জন্য নির্ধারিত Articella বা Ars medicinae নামের চিকিৎসা পাঠ্যক্রমে স্থান করে নেয়। ইবনুল জাযারের এই গ্রন্থে রয়েছে গুটিবসন্ত ও হামরোগের অসাধারণ বিবরণ।
আরবী অনুদিত এসব গ্রন্থ খুব দ্রুতই সালেরনোসহ জ্ঞানের সবগুলো কেন্দ্রে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। সালেরনো ছিল এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসা বিদ্যালয়সহ শহরটি ছিল ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখার তীর্থভূমি।
অন্য যেসব চিকিৎসা গ্রন্থ ইউরোপে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার মাঝে 'চিকিৎসকদের যুবরাজ' নামে পশ্চিমে পরিচিত ইবনে সীনার কর্মগুলো অন্যতম। তার লেখা ১১শ শতাব্দির আল-কানুন ছিল আরেকটি বৃহদাকার চিকিৎসা বিশ্বকোষ, যা প্রায় ছয় শতাব্দি জুড়ে গোটা বিশ্বব্যাপী নিজের দাপট বেশ শক্তভাবে ধরে রেখেছিল। তার বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আলবার্টাস ম্যাগনাস, সেন্ট থমাস একুইনাস, ডান্স স্কোটাস এবং রজার বেকনের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ চিন্তানায়কের উপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিল।
ইবনে আত-তাহাবী নামে পরিচিত আল-আযদীর রচিত "কিতাব আল-মায়ু” (পানি বিষয়ক পুস্তক)-ই হলো প্রথম গ্রন্থ, যেখানে বর্ণানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে চিকিৎসা পরিভাষা, রোগের নাম, ঔষধ, দেহতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং চিকিৎসা কৌশলের বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম অন্তর্ভুক্তি আল-মায়ু (পানি) হওয়ায় এটার নাম "কিতাব আল-মায়ু"।
আর-রাযীর ২০ খণ্ডে সমাপ্ত "কিতাবুল হাভি” (সামগ্রিক পুস্তক) শিরোনামের গ্রন্থটি চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রায় প্রতিটি শাখা নিয়েই আলোচনা করেছে এবং লাতিন ভাষায় এটা Liber Continens নামে অনুদিত হয়। সম্ভবত এটা ছিল কয়েক শতাব্দি জুড়ে পশ্চিমা বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও বিপুলভাবে সমাদৃত চিকিৎসা পাঠ্যপুস্তক। এটা ছিল নয়টি গ্রন্থের একটি, যেগুলো ১৩৯৫ খ্রিস্টাব্দের প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের পুরো গ্রন্থাগার দখল করে রেখেছিল।
১০০০ খ্রিস্টাব্দ সময়ের দক্ষিণ স্পেনের কর্ডোবার অপ্রতিদ্বন্দ্বি চিকিৎসক আয-যাহরাবীর কাজগুলো ছিল অনন্য সাধারণ উচ্চতার। "আত-তাসরীফ” নামে তার রচিত ৩০-খণ্ডের অতুলনীয় চিকিৎসা বিশ্বকোষের সার্জারি অংশটুকু ক্রিমোনার জেরার্ড কর্তৃক লাতিনে অনুদিত হয় এবং এটার বিভিন্ন সংস্করণ ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভেনিস, ১৫৪১ খ্রিস্টাব্দে বাসেল এবং ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ডে প্রকাশিত হয়। সালেরনো এবং মন্টেপেলিয়ারের ন্যায় ইউরোপের অধিকাংশ মধ্যযুগীয় চিকিৎসা বিদ্যালয়সমূহে এটা সার্জারি ম্যানুয়েল গ্রন্থে পরিণত হয় এবং কয়েক শতাব্দি জুড়ে এটা ছিল এসব চিকিৎসা বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সবশেষে, ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী সিরিয়া নিবাসী চিকিৎসক ইবনে আন-নাফীসের কীর্তির দিকে নজর দিলে দেখি, তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন ৮০-খণ্ডে সমাপ্ত "আশ-শামিল ফীস সানা' আতি তিবিয়াতি” (সামগ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্র) নামের এক অনবদ্য গ্রন্থ। বিশালাকার এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ দামেস্ক, আলেপ্পো, বাগদাদ ও অক্সফোর্ডর সংগ্রহশালায় পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোর সংগ্রহশালায় ইবনে আন-নাফীসের স্বহস্তে লেখা পাণ্ডুলিপির সর্ববৃহৎ অংশ সংরক্ষিত রয়েছে।
মুসলিম চিকিৎসকদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের বদৌলতে অধিকাংশ চিকিৎসা জ্ঞান ইউরোপে প্রবেশ করে, উদাহরণস্বরূপ, ক্রুসেডের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে মুসলিম চিকিৎসকগণ বহু ক্রসেড যোদ্ধার চিকিৎসা করেছিলেন। এমনকি রিচার্ড দ্য লায়নহার্টও সালাউদ্দীনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক থেকে চিকিৎসা নিয়ে ছিলেন।