📄 চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের নোটবই
হাজার বছর পূর্বের প্রায় প্রতিটি মুসলিম চিকিৎসা গ্রন্থে চক্ষুরোগের কোনো না কোনো দিক আলোচিত হতো। এ ব্যাপারে তাদের গবেষণা কিছুটা সীমাবদ্ধ ছিল, যেহেতু তারা মানুষের চোখের বদলে প্রাণিদের চোখ ব্যবহার করতো। ওই সময় মানবদেহের ব্যবচ্ছেদকে বেশ অসম্মানের চোখে দেখা হতো। তথাপি এটা চোখের গঠনের সবচেয়ে প্রাচীন ছবি অঙ্কনে তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দির মুসলিম চক্ষু সার্জন কিংবা চক্ষু বিশেষজ্ঞগণ তাদের পরিচালিত অপারেশন, ব্যবচ্ছেদ, নতুন আবিষ্কার ও কোনো বিষয়ে তাদের পাওয়া নতুন গবেষণা তথ্য পাঠ্যপুস্তক ও তথ্যবহুল গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসা অধ্যাপক জুলিয়াস হির্শবার্গের মতে, ওই সময় ৩০-টির মতো চক্ষুবিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক লেখা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪-টি এখনও টিকে আছে।
Conjunctiva (কনজাংটিভা - চোখের কর্নিয়ার পাতলা স্বচ্ছ আবরণ), কর্নিয়া (অক্ষিগোলকের স্বচ্ছ আবরণ), uvea (ইউভিয়া - চোখের মধ্যবর্তী স্তর) এবং রেটিনা (অক্ষিপট)-এর ন্যায় আধুনিক পরিভাষাগুলো তখনও ব্যবহারে ছিল। ট্রকোমার ন্যায় চোখের পাতার অসুখের অপারেশন তখন সাধারণ চিকিৎসা অনুশীলন ছিল, এ রোগে সাধারণত চোখের পাতার ভেতরের অংশ শক্ত ও কঠিন হয়ে উঠে। 'চোখের পিউপিল বা তারারন্ধ্রের ব্যথা' শিরোনামে গ্লুকৌমা বা চোখের তরলের ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টির ন্যায় রোগের চিকিৎসা বহুল প্রচলিত ছিল। কিন্তু চোখের ছানি চিকিৎসা ছিল চক্ষুবিজ্ঞানে মুসলিমদের রাখা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একক অবদান।
ছানি পরিভাষার আরবী: নুযুলুল মায়ি ইলাল আ'ইনি, যার অর্থ: চোখে পানির আগমন, এটা চোখের লেন্সে পানি জমে যাওয়াকে নির্দেশ করে। এমনটি হলে চোখ পানিতে ভারী হয়ে আসে এবং তা ঝাপসা দেখতে শুরু করে।
১০ম শতাব্দির ইরাকের আল-মাওসিলী দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারে ফাঁপা সুচ নির্মাণ করেন, যা তিনি কর্নিয়া ও কনজাংক্টিভার সংযোগস্থল limbus (লিম্বাস - স্বচ্ছ কর্নিয়া ও অস্বচ্ছ সাদা অংশের মধ্যস্থ সীমানা)-এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করিয়ে চোষণের মাধ্যমে ছানি অপসারণ করতেন। এভাবে চোখের ছানির অপারেশন আজও করা হয়, তবে তাতে আধুনিক কিছু পন্থা যুক্ত করা হয়, যেমন: চোষণের পূর্বে লেন্সকে ঠাণ্ডা করা।
তিনি তার নিজস্ব গবেষণা ও অনুশীলনের ভিত্তিতে রচনা করেন: "কিতাবুল মুনতাখাব ফী এ'লাজি আমরাধিল আ'ইন ওয়া ইলালিহা ওয়া মুদাওয়াতিহা বিল হাদীদ" (চক্ষু রোগের চিকিৎসাশাস্ত্রীয় নির্বাচিত পুস্তক), যেখানে তিনি চোখের ৪৮-টি রোগের আলোচনা করেছেন। স্পেনের মাদ্রিদে অবস্থিত এস্কোরিয়াল লাইব্রেরিতে এটার পাণ্ডুলিপি (নম্বর: ৮৯৪) পাওয়া যাবে।
বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত আল-মাওসিলীর রচনা কেবল আরবীতে এবং ১৩শ শতাব্দির একটি হিব্রু অনুবাদেই সহজলভ্য ছিল। এইতো ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক হির্শবার্গ এটার জার্মান সংস্করণ প্রকাশ করেন, যিনি আল-মাওসিলী সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন "গোটা আরবী সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর চক্ষু সার্জন।"
বর্তমান চিকিৎসকদের ন্যায় মুসলিম সভ্যতার পণ্ডিতগণও চোখের অসুখকে বেশ গুরুত্বের সাথে আমলে নিতেন।
১০ম শতাব্দির বাগদাদ নিবাসী এবং আল-মাওসিলীর সমসাময়িক আলী ইবনে ঈসা ছিলেন ইসলামের চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞদের মাঝে সর্বাধিক পরিচিতের একজন। তিনি "তাযকিরাতুল কাহহালিন" (চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের নোটবই) শিরোনামে গ্রন্থ রচনা করেন, যা ছিল চক্ষুরোগের উপর লিখিত সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই। গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়ে ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভেনিসে প্রকাশিত হয়। আবারও অধ্যাপক হিশবাগ ও তার সহযোগী চক্ষু সার্জন জে. লিপার্ট ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে এটার জার্মান অনুবাদ প্রকাশ করেন এবং মার্কিন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ ক্যাসি উড ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে এটার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন।
১৩০-টি চক্ষুরোগের বিবরণ প্রদান এবং টুকোমা এবং চক্ষুপ্রদাহ বা চোখ-উঠা রোগের বিভিন্ন প্রকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাসমৃদ্ধ ইবনে ঈসার "তাযকিরাতুল কাহহালিন" গ্রন্থটি বহু শতাব্দি ধরে চক্ষুবিজ্ঞানের প্রামাণ্য পাঠ্যবই হিসেবে সমাদৃত ছিল।
অন্ধত্ব প্রতিরোধ "১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে অন্ধত্ব প্রতিরোধে মুসলিম চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা বেশ অগ্রগামী ছিল। আর-রাযী ছিলেন প্রথম ডাক্তার, যিনি চোখের পিউপিলের প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex action)-এর বর্ণনা দেন।
অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে ... আল-মাওসিলী ফাঁপা সুচ ব্যবহার করে চোষণ প্রক্রিয়ায় চোখের ছানি অপসারণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।"
- Optometry Today, মার্চ ২৮, ১৯৮৭ ইংল্যান্ডের The Association of Optometrists-এর একটি প্রকাশনা
এটা চক্ষুবিজ্ঞানে মুসলিমদের করা কোনো কাজের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যা পূর্ণাঙ্গ এবং যা এখনো তার আসল অবস্থায় টিকে আছে। বিংশ শতাব্দির চিকিৎসা ঐতিহাসিক ড. সিরিল এলগুড লিখেছেন, "প্রথম অংশে চোখের গঠনশৈলী, দ্বিতীয় অংশে সাধারণ দেখায় নজরে পড়ে না, চোখের এমনকিছু বাহ্যিক অসুখ নিয়ে আলোচনা রয়েছে ... প্রাথমিক স্তরের ছানি যতটা [অন্য অসুখের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া], ঠিক তেমনি ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিশক্তিও পাকস্থলি বা মস্তিষ্কের কোনো ব্যাধির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, চিকিৎসা অনুশীলকারীরা যেন বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করে, সে ব্যাপারে তিনি যেভাবে জোর দিয়েছিলেন, সেটা চক্ষুরোগ বিষয়ে আধুনিক ধারণার সবচেয়ে নিকটতর।"
"মধ্যযুগীয় ইউরোপ যখন অন্ধকারের অতলে, তখন মুসলিমরাই স্পেনের গোয়াদেলকুইভার থেকে মিশরের নীলনদ এবং রাশিয়ার অক্সাস নদী পর্যন্ত - বিজ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিল এবং তারাই আমাদের চক্ষুবিজ্ঞানের বাতিগুলো সচল রেখেছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপে তারাই ছিল চক্ষুবিজ্ঞানের সত্যিকার বিশেষজ্ঞ।"
আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনে দেয়া অধ্যাপক জুলিয়াস হির্শবার্গের সমাপ্তিসূচক ভাষণ, জুলাই ১৯০৫
চোখের অসুখ অন্যান্য রোগেরও আলামত, ইবনে ঈসাই যে এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণকারী একমাত্র চক্ষু সার্জন, ব্যাপারটি এমন নয়। ১০৮৮ ভূস্টাব্দে পারস্য নিবাসী আল জুরজানী নামে পরিচিত আবু রূহ মুহাম্মদ ইবনে মানসুর ইবনে আব্দুল্লাহ "নূরুল উ'য়ুন" (সেখের জ্যোতি) নামে গ্রন্থ রচনা করেন, যার একটি অধ্যায় এমন অসুখ নিয়ে আলোচনা করেছে, যা লুকানো কিন্তু ৫ব আলামত চোখ ও দৃষ্টিশক্তিতে বেশ ভালোভাবে দৃশ্যমান, যেমন: তৃতীয় স্নায় তথা অকুলোমোটরের বিকলাঙ্গতা, হকের ব্যাধি ও বিষাক্ততা।
দক্ষিণ স্পেনের কর্ডোবাতে আবক্ষ বা বুক পর্যন্ত বানানো ভাস্কর্যের মাধ্যমে যে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞকে অমর করে রাখা হয়েছে, তিনি হলেন: মুহাম্মদ ইবনে কাসুম ইবনে আসলাম আল-গাফিক্বী। কর্ডোবা নিবাসী এবং সেখানে চিকিৎসা অনুশীলনে রত এই মহামনীষী "আল-মুরশিদ ফীল কাহাল" (চক্ষুরোগ প্রতিকারে অভিজ্ঞ পরামর্শক) শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা কেবল চক্ষুরোগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একইসাথে মাথা ও মস্তিষ্কের নানা রোগের বিস্তারিত বিবরণে পূর্ণ। রিপোর্টার রাগেহ উমর বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র An Islamic History of Europe-এ বলেন, আল-গাফিক্বী যে পন্থায় ট্রকোমার ন্যায় চক্ষুরোগের চিকিৎসা করতেন, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অনুসরণ করা হতো। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই মহামনীষীর ৮০০-তম মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে কর্ডোবার পৌর হাসপাতালে তার আবক্ষ-ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।
যুক্তরাজ্যে যাদের বয়স পঞ্চাশের অধিক, তাদের অন্ধত্ববরণের অন্যতম প্রধান কারণ: চোখে ছানি পড়া। কিন্তু Royal College of Ophthalmologists এ সুসংবাদ দিচ্ছে যে, "ছানির সার্জারি বেশ সন্তোষজনক এবং তা রোগীদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয়।" যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর শত শত ছানির অপারেশন হয় এবং এটা সেখানের সর্বাধিক ঐচ্ছিক অপারেশনগুলোর অন্যতম। কেইবা জানতো, আল-মাওসিলীর কর্ম এমন এক সার্জারির ভিত দাঁড় করাবে, যা একবিংশ শতাব্দিতে এসে অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়তা লাভ করবে।
📄 ভ্যাকসিন
আজকের দিনেও ভ্যাকসিন বিতর্কের জালে আটকে আছে। প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে তুরস্ক থেকে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে ভ্যাকসিন আনা হলে সেটাও বিতর্কের তোপে পড়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। ভ্যাকসিন প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে আনাতোলিয়ার অটোমান তুর্করা বেশ দক্ষ ছিল। ভ্যাকসিনের এ পদ্ধতিকে তারা আশী বা অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া বলতো। মূলত নিজেদের আদি তুর্কি গোত্রগুলো থেকে তারা এ জ্ঞান হাসিল করেছিল।
ভ্যাকসিন এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে রোগ সৃষ্টিকারী অঙ্গের দুর্বল বা অক্ষম অংশ কারো দেহে ডোজ বা এক মাত্রা ঔষধ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এটা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে ওই নির্দিষ্ট রোগ মুকাবিলায় শরীরে এন্টিবডি সৃষ্টি করে। নতুন ভ্যাকসিন তৈরিতে বর্তমানে আট থেকে বার বছরের মতো সময় লাগে এবং যেকোন নতুন ভ্যাকসিন নিরাপদ হিসেবে গ্রহণের পূর্বে সেটাকে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তুর্কিরা এটা আবিষ্কার করে যে, গবাদি পশুর স্তন থেকে নেয়া গো-বসন্ত যদি শিশুদের মাঝে ভ্যাকসিন হিসেবে প্রয়োগ করা হয়, তবে শিশুরা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয় না। ১৭১৬ ও ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দের মাধামাঝি সময়ে তুরস্কে থাকা ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এবং বিখ্যাত ইংরেজি পত্র-লেখিকা লেডি মন্টাগু এ ধরনের ভ্যাকসিন এবং তা প্রয়োগের অন্যসব পদ্ধতির সাথে ইংল্যান্ডের পরিচয় ঘটান। তিনি ভ্যাকসিন প্রদানের এ তুর্কি পদ্ধতির সংস্পর্শে আসেন এবং দূতাবাসের সার্জন চার্লস মাইটল্যান্ড কর্তৃক তার পুত্রের দেহে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন প্রদানে সম্মতি দেয়ার পর থেকে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন নিয়ে তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেন।
ইস্তাম্বুলে অবস্থানকালে লেডি মন্টাগু পুরো প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে একগুচ্ছ পত্র ইংল্যান্ডে পাঠান। ইংল্যান্ডে ফেরার পর তিনি ভ্যাকসিন দেয়ার তুর্কি পদ্ধতির বিস্তৃতি ঘটান এবং নিজের বহু আত্মীয়কে তিনি গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন নিতে সহায়তা করেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি যে শুধু বরাবরের মতো সব ধরনের ভ্যাকসিন কর্মসূচি বিরোধী গির্জা কর্তৃপক্ষের তীব্র বিরোধিতার শিকার হয়েছিলেন, বিষয়টি এমন নয়, বরং বহু চিকিৎসকেরও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তার অদম্য মানসিকতার কারণে ভ্যাকসিন প্রক্রিয়া ক্রমশ চারদিক ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বিপুল সাফল্যের মুখ দেখে।
"গণস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দু'শ বছরের অধিক সময় ধরে ভ্যাকসিন অপ্রতিদ্বন্দ্বি ভূমিকা পালন করে আসছে... পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়া (কণ্ঠনালীর সংক্রমক রোগ), হুপিং কাশি, রুবেলা, মাম্পস, টিটেনাস, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib)-এর ন্যায় কত শত মরণব্যাধি, যা সবার মাঝে ভয় ছড়িয়ে দিতো, আজ তা ভ্যাকসিনের বদৌলতে আমাদের নিয়ন্ত্রণে, যা থেকে একজন ভ্যাকসিনের অলৌকিক মর্যাদা আঁচ করতে পারে।" রিচার্ড গ্যালাহার, সম্পাদক, ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিন এবং The Scientist ওয়েবসাইট
ইস্তাম্বুলে মন্টাগু পরিবারের পারিবারিক ডাক্তার ইমানুয়েল তিমোনি যখন ভ্যাকসিন প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক বিবরণ ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে রয়েল সোসাইটিতে জমা দেন, তখনই ভ্যাকসিনের ইতিহাসে যোগ হয় নতুন মাত্রা। ত্রিপলির রাষ্ট্রদূত কাসেম আগা এ ব্যাপারে আরও শক্ত যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি ভ্যাকসিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ত্রিপলি, তিউনিস, আলজিয়ার্স এলাকায় ভ্যাকসিন পরবর্তী সফলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। মূলত মুসলিম দেশগুলোর ভ্যাকসিন প্রক্রিয়া এবং সেটার সাফল্যের দীর্ঘ ইতিহাস ভ্যাকসিনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য মনোনীত হন। তখন থেকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্যাকসিন কর্মসূচিকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়, যা ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক হিসেবে পরিচিত এডওয়ার্ড জেনারের অর্ধ শতাব্দী পূর্বের ঘটনা।
বর্তমানে এটা মানা হয় যে, ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে জেনার এটা 'শুনতে' পান যে, গো-বসন্ত নাকি গুটিবসন্ত মুকাবিলায় দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে সক্ষম। সারাহ নেলস নামের এক গোয়ালিনীর হাতের ক্ষত থেকে গো-বসন্তে আক্রান্ত আট বছরের জেমস ফিপস নামের বালকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের সময় তিনি এটা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
📄 ভেষজ চিকিৎসা
হাজার বছর পূর্বে বাগান ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি 'ক্ষেত্র', যা স্বনামধন্য বিজ্ঞানী দ্বারা পরিচালিত হতো, যারা বিভিন্ন উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ম্যানুয়েল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ভেষজ চিকিৎসাকে তখন বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে দেখা হতো না, বরং তা ছিল চিকিৎসা অনুশীলনেরই একটি অংশ। এ কারণে বহু হাসপাতালে ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাগানভর্তি ঔষধি বৃক্ষ থাকতো এবং এগুলো থেকে নিত্য-নতুন ঔষধ আবিষ্কার এবং সেগুলোর পরিচর্যা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
এ ধরনের ঔষধি বৃক্ষের আবিষ্কার মানব সভ্যতার একেবারে সূচনা থেকেই জারি ছিল। এমনকি লেখন রীতি আবিষ্কারের বহু আগেই মিশর, মেসোপটেমিয়া, চীন ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ঔষধি বৃক্ষের বহুল ব্যবহার ছিল। বিভিন্ন ঔষধি বৃক্ষের তালিকা এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় সমৃদ্ধ "হারবাল" শিরোনামের গ্রন্থটি ছিল প্রথম গ্রিক প্রচেষ্টা, যা কারিয়াস্টাসের ডিয়োক্লিস কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে রচিত এবং প্রথম খ্রিস্টাব্দের পণ্ডিত ক্রাটিউস সে ধারা অব্যাহত রাখেন। ভেষজ উদ্ভিদের গুণাগুণ নিয়ে De Materia Medica (ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকাস) নামে যে কর্মটি আজ অবধি টিকে আছে, তা ৬৫ খ্রিস্টাব্দে ডায়াসোক্রাইডস কর্তৃক রচিত। গ্রিক ও রোমান ভেষজ বিশেষজ্ঞদের মাঝে কেবল ডায়াসোক্রাইডসের নামই জানা যায়।
মুসলিম সাম্রাজ্যের পরিসর বৃদ্ধির সাথ সাথে বণিক ও পর্যটকগণ এমনসব বিচিত্র লতাগুল্ম, বৃক্ষ, বীজ ও মশলার সাথে পরিচিত হন, যা পূর্বে তাদের নিকট অপরিচিত ছিল। এগুলোর কাঁচামালের বিপুল সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি কীভাবে এগুলো ব্যবহার করতে হয়, তার প্রয়োজনীয় জ্ঞানও তারা সংগ্রহ করেছিল। এ কাজে তারা পুরো দুনিয়া চষে বেড়ায়, রূঢ় আবহাওয়া এমনকি এশিয়ার বিস্তৃত প্রান্তর থেকে পিরিনীয় পর্বতমালার ন্যায় দূরত্বও তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। কাগজ আবিষ্কার এবং এর বহুল ব্যবহারের কল্যাণে তারা তাদের ভ্রমণের বিশদ বিবরণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিক লিখে ফেলতেন।
বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্তের সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান একত্র হয়ে নতুন প্রতিষেধকের পাশাপাশি ভেষজ ঔষধের উল্লেখযোগ্য যোগান সহজলভ্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতসব আবিষ্কারের বদৌলতে তথ্যের এক ভাণ্ডার গড়ে উঠে, যা শেষমেশ বিশ্বকোষ তুল্য গ্রন্থে নিজেদের স্থান খুঁজে নেয়।
১০০২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ইবনে সামাজুন ভেষজ লতাগুল্ম ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ বৃক্ষ এবং সেগুলো থেকে ঔষধ বানানোর নিয়ম সম্বলিত একখানা গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে তিনি বিভিন্ন উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস এবং সেগুলোর ঔষধি বিশেষত্ব আলোচনাভুক্ত ছিল। ১১শ শতাব্দিতে ইবনে সীনা তার আল- কানুনে ভেষজ প্রতিষেধকের ১৪২-টি রেসিপির বিবরণ দেন।
ওই সময়ে উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথা উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাতে উদ্ভিদের ব্যবহার ছিল একইসূত্রে গাঁথা। উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় ওই যুগ এতটাই বিচিত্র ছিল যে, একদিকে 'আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক' হিসেবে পরিচিত আবু হানিফা আদ-দিনাওয়ারী "কিতাবুন নাবাত"-সহ তার লেখা নানা গ্রন্থে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের বিস্তৃত তালিকা তৈরিতে ব্যস্ত তো অপরপ্রান্তে ১০ম শতাব্দির চিকিৎসা পণ্ডিত আর-রাযী গেঁটেবাতের চিকিৎসায় ঔষধ হিসেবে কলচিকাম (colchicum) ব্যবহার করে বেশ ভালো সাড়া পেতে শুরু করেছেন।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক রূপান্তরের সাথে সাথে রসায়নশাস্ত্র দ্রুত গতিতে উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছায় এবং উভয় শাস্ত্রের এমন সমৃদ্ধি ভেষজ চিকিৎসাকে মূলধারায় উন্নীত করতে জোরদার ভূমিকা রেখেছিল। পানি উত্তোলনে উন্নত যন্ত্রের ব্যবহার এবং নয়া সেচ কৌশল একত্র হয়ে ১০ম শতাব্দিতে গবেষণাধর্মী বাগান সৃষ্টি এবং ভেষজ বৃক্ষের ব্যাপক আবাদে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।
আন্দালুস নামে পরিচিত মুসলিম স্পেন ছিল ভেষজ চিকিৎসা বিকাশের আঁতুড়ঘর। ১১শ শতাব্দিতে টলেডো, স্পেন এবং পরবর্তীতে সেভিলের মাধ্যমে ইউরোপ প্রথমবারের মতো রাজকীয় উদ্ভিদ উদ্যান বা বোটানিকাল গার্ডেনের সাথে পরিচিত হয়। রাজকীয় এই উদ্যানগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা বিভিন্ন উদ্ভিদ ইউরোপের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছে কিনা, তা যাচাইয়ে ব্যবহৃত হতো।
মালাগার ইবনুল বাইতারের ব্যাপারে ফার্মাসি অধ্যায়ে আপনি আরও তথ্য পাবেন, তথাপি এখানে বলতে হয় যে, ঔষধ প্রস্তুত ও ব্যবহার বিষয়ে "আল-জামিউল মুফরাদাত আল-আদবিয়াত ওয়াল আগযিয়াত” (ভেষজ ঔষধ ও খাদ্য বিষয়ক অভিধান) নামে তিনি যে প্রকাণ্ড বিশ্বকোষ রচনা করেছেন, সেটা তার উদ্ভিদবিজ্ঞানে পারদর্শীতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। উক্ত গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০০০ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা এবং তাদের ঔষধি গুণাগুণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
ভেষজ চিকিৎসার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি লিখেছেন ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-গাফিক্বী এবং তার এ গ্রন্থ "কিতাব আল-আদবিয়াতুল মুফরাদাত" (ভেষজ ঔষধ বিষয়ক পুস্তক) নামেই পরিচিত। বিস্ময়করভাবে গ্রন্থটি বেশ নিখুঁত বর্ণনায় সমৃদ্ধ এবং এটা ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে মিশরে ম্যাক মেয়াহফ কর্তৃক পুনরায় প্রকাশিত হয়।
১০ম শতাব্দিতে ইবনে জুলজুল ডায়াসোক্রাইডস কর্তৃক রচিত De Materia Medica গ্রন্থের আরবী অনুবাদের পাশাপাশি এটার ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন, যেখানে তেঁতুল, কপূর, চন্দনকাঠ এবং এলাচের ন্যায় বহু নতুন জিনিসের বিবরণ তিনি সংযুক্ত করেন। নতুন নতুন উদ্ভিদ চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এসব উদ্ভিদের ঔষধি গুণের বিবরণসহ এদের নানাবিধ বৈশিষ্ট্য তিনি এতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
ঔষধি লতাগুল্ম ও বৃক্ষ কীভাবে রোগীর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে, সেটার পর্যবেক্ষণ ছিল ভেষজ চিকিৎসায় মুসলিমদের রাখা সাধারণ ও একইসাথে যুগান্তকারী অবদান। এটা আজকের দিনে বেশ সাধারণ মনে হলেও তৎকালে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি কেবল মুসলিমরাই ব্যবহার করতো এবং এর উপর নির্ভর করতো।
অন্যদিকে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে ভেষজ চিকিৎসাগ্রন্থ কেবল দুর্লভই ছিল না, বরং তা স্বল্পসংখ্যক পণ্ডিতের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি ১৫শ শতাব্দির শেষ অবধি অনেক ইউরোপীয় চিকিৎসক আরবী পাঠ্যপুস্তক ও গ্রিক গ্রন্থসমূহের আরবী সংস্করণের লাতিন অনুবাদ ব্যবহার করতো। ১৫০০ এবং ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিক পণ্ডিত ডায়াসোক্রাইডসেরই প্রায় ৭৮-টি সংস্করণ সহজলভ্য ছিল।
"এবং তাদের পানীয় হবে আদামিশ্রিত।" - কুরআন, (৭৬:১৭), এই আয়াতে আদাকে জান্নাতবাসীদের অন্যতম একটি পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে আদা বমি-বমি ভাব উপশম ও বমি বন্ধে ব্যবহৃত হয়।
মুসলিম উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের থেকে ইউরোপীয়রা কতটা ধার করেছে এবং ডায়াসোক্রাইডসকে কীভাবে কতটা প্রাসঙ্গিক বানানো যায়, তার ভিত্তিতে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সাফল্য মাপা হতো, কিন্তু পরিস্থিতি সব সময় ঠিকঠাক যায় না। গ্রিক, লাতিন এবং আরবী ভাষায় পর্যাপ্ত পারদর্শীতার অভাবে একবার তো সালেরনোর মহাবিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই ভাষাগুলোতে দক্ষতার অভাবে গ্রিক পাঠ্যপুস্তক উপলব্ধিতে তাদের বেশ বেগ পেত হতো, যেহেতু এগুলো ছিল একাধিক অনুবাদের অনুবাদ।
অজ্ঞতা, অপচিকিৎসা এবং পূর্ববর্তী বাজে গ্রিক অনুবাদের ভুল-ভ্রান্তি এবং সেইসাথে প্রয়োজনীয় উপকরণের বিবরণ আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হওয়ায় এবং সেগুলো ঠিকভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞগণ নিদারুণ হতাশায় পড়েন। এসব কারণে ১৬শ শতাব্দির ইংরেজ কূটনৈতিক ও পণ্ডিত স্যার থমাস ইলিয়ট তার পাঠকদের জানিয়ে দেন যে, (এ বিষয়ে) তিনি প্রাচীনদের থেকে জ্ঞান হাসিল করেননি, যেহেতু ওই জ্ঞান "কারো স্বাস্থের উন্নতির জন্য তেমন কার্যকরী নয়।"
সৌভাগ্যজনকভাবে, ভেষজ চিকিৎসায় বাচ্চা প্রসব করা মায়ের রক্ত ব্যবহারের নীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, যা মধ্যযুগে বিশেষ কিছু ইউরোপীয় চিকিৎসা রেসিপিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ৫-জন ইংরেজ নাগরিকের মধ্যে ১-জন সম্পূরক চিকিৎসা নেয়। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, দশ জনে একজন ভেষজ বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার দারস্থ হয়।
বহু সংখ্যক ভেষজ চিকিৎসকের আবির্ভাবে মুসলিমদের মাঝে ভেষজ চিকিৎসা আবারও তার গুরুত্ব ফিরে পেতে শুরু করেছে, যদিও গ্রাম ও গ্রামীণ জনপদে ভেষজ চিকিৎসা এখনো তাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।
📄 ফার্মাসি
প্রতিটি বাণিজ্যিক সড়ক ও অধিকাংশ সুপারমার্কেটে একটি ফার্মাসি অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু এটা কোনো আধুনিক ধারণা নয়, কেননা প্রায় হাজার বছর পূর্বে বাগদাদে ঘটেছিল ফার্মাসির বিকাশ।
৯ম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফার্মাসিস্ট বা ঔষধ প্রস্তুতকারী বিশেষজ্ঞগণ স্বাধীন পেশাজীবী ছিলেন, যারা তাদের নিজস্ব ফার্মাসি চালাতেন। পরিবার চালিত এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বাজারে তাদের কার্যক্রম চালাতো এবং সময়ে সময়ে (বিশেষত ১২শ ও ১৩শ শতাব্দীর দিকে) রাষ্ট্র কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত বাজার পরিদর্শক - আল-মুহতাসিব ও তার সহযোগীরা এসব ফার্মাসি পরিদর্শন করতো। ওজন ও পরিমাণ ঠিক আছে কিনা, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি ব্যবহৃত ঔষধগুলোর বিশুদ্ধতাও পরখ করে দেখা হতো। ভণ্ড ও হাতুড়ে ডাক্তারদের কার্যক্রম প্রতিরোধে অপমানজনক দৈহিক শান্তির হুমকি সবার জন্য বলবৎ ছিল।
এক হাজার বছর পূর্বের হাসপাতালগুলোর ছিল নিজস্ব ঔষধ বিপণী, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ প্রস্তুত করা হতো। আর এভাবেই সাবুর ইবনে সাহল, আর-রাযী, ইবনে সীনা এবং আল-কিন্দীর ন্যায় পণ্ডিতদের হাত ধরে ফার্মাকোলজি বা ঔষধবিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিকটি বেশ ভালোভাবেই বিকশিত হতে থাকে। নবম শতাব্দীর সাবুর ইবনে সাহল হলেন প্রথম চিকিৎসক, যিনি রোগ নিরাময়ে বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ ও প্রতিষেধকের বিস্তৃত বিবরণ প্রদান করেন। আর-রাযী চিকিৎসাশাস্ত্রে রাসায়নিক যৌগ বা সংমিশ্রণের প্রচলন ঘটান, ইবনে সীনা ৭০০-এর মতো ঔষধের প্রস্তুতপ্রণালী, সেগুলোর বৈশিষ্ট্য, কার্যকারিতা এবং ব্যবহার নির্দেশিকা প্রদান করেন এবং আল-কিন্দী যথাযথ মাত্রায় ঔষধ ব্যবহার বিধি নির্ধারণ করেন, যা চিকিৎসা সংহিতা বা নির্দেশাবলীর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।
প্রভাবশালী চিকিৎসা পণ্ডিতদের মাঝে রয়েছেন স্পেনের আয-যাহরাবী, যিনি ঊর্ধ্বপাতন ও পাতনের সাহায্যে ঔষধ প্রস্তুত করে ১০ম শতাব্দিতে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার এ যুগান্তকারী ভূমিকার বদৌলতে নতুন ঔষধ প্রস্তুতের এক বিস্তৃত দুয়ার খুলে যায়। অভ্যন্তরীণ সেলাইয়ে তিনি ক্যাটগাট ব্যবহার করতেন, যেমনটি আমরা ইতোমধ্যেই জেনে এসেছি, এর পাশাপাশি তিনি গিলে খাওয়ার উপযোগী করে ক্যাটগাটে নির্মিত খোলসে ঔষধ জমা করার কৌশল উদ্ভাবন করেন। তাই ক্যাপসুল জাতীয় কোনো ঔষধ ব্যবহার করতে গেলে ভুলে যাবেন না যে, এটার অগ্রনায়ক প্রায় এক হাজার বছর পূর্বের এক মানুষ ছিলেন।
আয-যাহরাবীর অনবদ্য সৃষ্টি “আত-তাসরীফ” লাতিন ভাষায় Liber Servitoris শিরোনামে অনুদিত হয় এবং গ্রন্থটি একক উপাদান থেকে শুরু করে একাধিক উপাদানের সংমিশ্রণে ঔষধ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া ও কৌশল পাঠকদের সামনে তুলে ধরে। এছাড়াও তিনি লিথারেজ (মুদ্রাশঙ্খ) বা লেড মনোক্সাইড, সাদা লেড (সীসা), লেড সালফাইড (পোড়া সীসা), পোড়া কপার, ক্যাডমিয়াম, মার্কাসাইট আয়রন সালফাউড, হলুদ আর্সেনিক এবং চুনসহ অসংখ্য গন্ধক ও লবণের প্রস্তুতপ্রণালীর বিবরণ প্রদান করেছেন। আবুল মানসূর মুওয়াফ্ফাক “কিতাবুল আবনিয়াতু আ'ন হাকায়িক আল-আদবিয়াতুল” (প্রতিষেধক ঔষধের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যাবলীর ভিত্তি) শীর্ষক পুস্তক রচনার মাধ্যমে ১০ম শতাব্দিতে ঔষধবিজ্ঞানে এক নয়া আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। গ্রন্থটি আর্সেনিয়াস অক্সাইডের বিবরণ প্রদান করে এবং এর রচয়িতা আবুল মানসূর সিলিকিক এসিড সম্পর্কে অবগত ছিলেন। বর্তমানে এই এসিডের একটি ব্যবহার ওই পিলগুলোতে দেখা যায়, যা সহজে জ্বালাপোড়ায় কাবু হয়, এমন পাকস্থলিতে সুরক্ষা ঝিল্লি তৈরিতে সহায়তা করে। তিনি সোডিয়াম কার্বনেট এবং পটাশিয়াম কার্বনেটের মাঝে যে পার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট করার পাশাপাশি কপারের যৌগ বিশেষভাবে কপার ভিট্রিয়ল ও লেডের যৌগগুলো যে বিষাক্ত, সে ব্যাপারে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১১শ শতাব্দিতে আল-বিরুনী "কিতাবুস সায়দালাতু ফীত তীব" (ঔষধবিদ্যা বিষয়ক পুস্তক) শিরোনামে এই শাস্ত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে বিভিন্ন ঔষধের বৈশিষ্ট্য বর্ণনার পাশাপাশি তিনি ফার্মাসি এবং একজন ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব ও ভূমিকার রূপরেখাও সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। ফার্মাসিস্টের প্রধান লক্ষ্য হবে, তার কাজ সুচারুভাবে বিন্যস্ত করা এবং তার কাজ যেন ঔষধ প্রস্তুতকারক, বিক্রেতা ও চিকিৎসা অনুশীলনকারীদের নিকট সর্বাধিক কার্যকর প্রমাণিত হয়, তা নিশ্চিত করা। যার ফলে দ্রুত তথ্যনির্দেশ ও তাৎক্ষণিক ব্যবহারের সুবিধার্থে বর্ণানুক্রমিক ছকে তারা ঔষধের তালিকা প্রস্তুত করে, আর এ সুবাদে পূর্ণাঙ্গ কাজ হিসেবে কিংবা বিশেষায়িত কোনো চিকিৎসা বিষয়ের উপর বিশ্বকোষ ও অভিধান রচনা বেশ সহজ হয়ে উঠে।
ঔষধ প্রস্তুত এবং তার প্রয়োগবিধির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্বলিত এসব প্রবন্ধ ইউরোপে প্রবেশ করে ইয়োহান সেন্ট আমান্ডো এবং ১৩০৬ থেকে ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতালির পাদোভায় অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত পিয়েত্রো ডিআবানার ন্যায় ১৩শ শতাদির বহু ইউরোপীয় ফার্মাসিস্টকে প্রভাবিত করে। ইউরোপ ভ্রমণের এমন অভিজ্ঞতা যেসব গ্রন্থের কপালে জুটেছে, সেগুলোর মাঝে স্পেনের ইবনুল ওয়াফিদের গ্রন্থসমূহের কথা উল্লেখ করার মতো। লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়ে তার গ্রন্থগুলো ৫০-এরও অধিকবার প্রকাশিত হয়। "কিতাব আল-আদবিয়াতুল মুফরাদাত” (ভেষজ ঔষধ) নামের গ্রন্থটি তার প্রধান কর্ম এবং ৫০০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি সংকলন করতে তার প্রায় ২৫ বছর সময় লেগেছিল। লাতিন ভাষায় অনুদিত De medicamentis simplicibus হলো তার কাজের সামান্য প্রতিফলন মাত্র।
১৩শ শতাব্দির মালাগা নিবাসী মুসলিম মনীষী ইবনুল বাইতার অন্যতম প্রভাবশালী উদ্ভিদবিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি রচনা করেছেন ঔষধবিজ্ঞান বিষয়ক সর্ববৃহৎ বিশ্বকোষ, যা আমাদের সময় পর্যন্ত টিকে আছে। "আল-জামিউল মুফরাদাত আল-আদবিয়াত ওয়াল আগযিয়াত" নামের এ বিশ্বকোষে বর্ণানুক্রমিকভাবে ৩০০০-এরও অধিক উদ্ভিদ নমুনার বিস্তারিত বিবরণ আলোচিত হয়েছে। লাতিন সংস্করণ ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে এটার প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশ পায়।
ইউরোপীয় ফার্মাসিস্টগণ এসব কর্ম দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত হন এবং এর প্রেক্ষিতে অভিধানতুল্য বহু গ্রন্থ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৫শ শতাব্দির চিকিৎসক অসলোর সালাদীনের সংকলিত সাত খণ্ডে বিভক্ত Compendium aromatariorum নামের এই অভিধান এটারই এক দৃষ্টান্ত, যেখানে বিষয়বস্তুর বিন্যাসে পূর্ববর্তী মুসলিম ধারাকে হবহু অনুসরণ করা হয়েছে।
ফ্লোরেন্টাইন কলেজ অব ফিজিসিয়ান্সে কর্মরত চিকিৎসক লুডুভিকো ডাল পোজ্জো টসকানেলি London Dispensatory (লন্ডন ডিসপেনসেটরি)-এর একটি ১৭শ শতাব্দি সংস্করণ প্রস্তুত করেন, যেখানে উদ্ভিদ, লতাগুল্ম, খনিজ পদার্থ, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য এক ও একাধিক উপাদানে তৈরি ঔষধ, বিভিন্ন ধরনের তেল, পিল এবং পুলটিস (ক্ষতে লাগানোর উষ্ণ মলম বা গরম প্রলেপ)-এর মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে, যা এসবের সাথে মুসলিম যোগসূত্রের সম্ভাব্যতার বিষয়টি আরও জোরালো করে।
মার্কিন ঐতিহাসিক মার্টিন লিভে সাম্প্রতিককালে মুসলিম ফার্মাসি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের সঞ্চার করেছেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণের পূর্বে তিনি বহু আরবী পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করেন এবং রোগনিরাময় কৌশলের বিস্তৃত ফিরিস্তি মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করেন, যেখানে একাধিক উপাদানে তৈরি ঔষধ, পিল, চুষে খাওয়ার সুগন্ধি বড়ি, পাউডার, সিরাপ, তেল, লোশন এবং টুথপেস্টের মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।