📄 ইবনে সীনার হাড়ের জখম চিকিৎসা
আবিসিনা নামে পশ্চিমে পরিচিত ইবনে সীনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যে, প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের সাথে তার তুলনা হয় এবং তিনি ইসলামের গ্যালেন নামেই সমধিক পরিচিত। তার এই চরম সুখ্যাতির কারণে অনেক দেশেই তার জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল এবং ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইবনে সীনার মৃত্যুর ৯০০ বছর পর তুরস্ক এ কাজে প্রথম হয়।
দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের সমৃদ্ধিতে তার অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কোর সকল সদস্য ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তার জন্মের এক সহস্রাব্দ পূর্তি উদ্যাপন করে।
বর্তমান উজবেকিস্তানের আফশানা গ্রামে জন্ম নেয়া ইবনে সীনা ২১ বছর বয়সে নিজ শহর ত্যাগ করেন এবং জীবনের বাদবাকি সময় তিনি পারস্যের বিভিন্ন শহরে কাটান এবং পরিণত হন জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসকে। গোটা জীবনে তিনি ২৭৬-টির মতো গ্রন্থ ও পুস্তক রচনা করেন, যার অধিকাংশই আরবী হলেও অল্প কিছু ছোট বই তার মাতৃভাষা ফারসিতে লেখা। দুঃখজনকভাবে, তার অধিকাংশ কাজ হারিয়ে গেলেও এখনও ৬৮-টির মতো পুস্তক টিকে আছে, যেগুলো প্রাচ্য ও পশ্চিমের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় কলম ধরলেও দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্র ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। যার কারণে বর্তমান কিছু ঐতিহাসিক তাকে যতটা না চিকিৎসক, তার চেয়ে বেশি দার্শনিক মনে করেন। আর অন্যরা তাকে মধ্যযুগের 'চিকিৎসকদের যুবরাজ' হিসেবে আখ্যা দেন।
তার বেশিরভাগ রচনাই চিকিৎসাশাস্ত্রীয়। ৪৩-টি রচনা এ শাস্ত্রের উপর, ২৪-টি রচনা দর্শন, ২৬-টি পদার্থবিদ্যা, ৩১-টি ধর্মতত্ত্ব, ২৩-টি মনোবিজ্ঞান, ১৫-টি গণিত, ২২-টি যুক্তিবিদ্যা এবং ৫-টি রচনা কুরআনের তাফসীর নিয়ে। অধ্যাত্মবাদ, প্রেম ও সঙ্গীত নিয়েও তার রচনা রয়েছে এবং এর পাশাপাশি তিনি বেশকিছু গল্পও লিখেছিলেন।
"আল-কানুন ফীত তীব” (চিকিৎসাশাস্ত্রের নিয়ম-কানুন) তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম এবং ইংরেজিতে এটা কানুন নামে পরিচিত। আরবীতে রচিত এই গ্রন্থ অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা পাঠ্যপুস্তক হিসেবে বিবেচিত, কেননা এটা ছিল তার সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সভ্যতা থেকে আহরিত চিকিৎসা জ্ঞানের এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ।
"চিকিৎসাশাস্ত্র অনুপস্থিত ছিল, যবে না হিপোক্রেটাস তা সৃজন করেন; এটা ছিল মৃত, যবে না গ্যালেন তাতে নয়াজীবন আনেন; এটা ছিল ছত্রভঙ্গ, যবে না রাযী তা সুসংহত করেন; আর এটা ছিল অসম্পূর্ণ, যবে না ইবনে সীনা তা পূর্ণ করেন।" - ডি পিওরে, ইউরোপীয় চিকিৎসক
চিকিৎসা ধারণাগুলোর সহজ উপলব্ধির মানসে ১২শ শতাব্দির দিকে আল-কানুনের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহের সংক্ষেপায়ন এবং বিষয়বস্তুর জটিলতা নিরসনে ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখা শুরু হয়। এসবের মাঝে "আল-মু'জিয ফীত তীব” (সংক্ষেপিত চিকিৎসাশাস্ত্র) নামক সংক্ষেপায়নটি সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল, যা ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ইবনে আন-নাফীস সিরিয়াতে অবস্থানকালে রচনা করেছিলেন।
আল-কানুন ৫ খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ড সাধারণ চিকিৎসা মৌলনীতি, দ্বিতীয় খণ্ড ঔষধ বিজ্ঞান, তৃতীয় খণ্ড দেহের নির্দিষ্ট অঙ্গকেন্দ্রীক রোগ, চতুর্থ খণ্ড -জ্বর এবং হাড় ও হাড়ের গিঁটের ভাঙন ও বিচ্যুতির ন্যায় নির্দিষ্ট অঙ্গকেন্দ্রীক নয়, এমন ব্যাধির আলোচনা নিয়ে নিবেদিত। আর শেষ খণ্ড বিভিন্ন যৌগিক প্রতিষেধকের প্রস্তুতপ্রণালী নিয়ে রচিত।
চতুর্থ খণ্ড দুটো প্রবন্ধ নিয়ে গঠিত, প্রথমটি 'জখম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা' এবং দ্বিতীয়টি 'প্রতিটি হাড়ের স্বতন্ত্র জখম' শিরোনামের।
'জখম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা' শীর্ষক প্রবন্ধে জখমের কারণ, প্রকার, ধরন, চিকিৎসা পদ্ধতি, জখমের সাথে সম্পৃক্ত নানা জটিলতা, অর্থাৎ জখমে বিষয়ক যাবতীয় তথ্যাদি আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে 'প্রতিটি হাড়ের স্বতন্ত্র জখম' শিরোনামের প্রবন্ধে তিনি প্রতিটি হাড়ের স্বতন্ত্র জখমের বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করেন। ইবনে সীনা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তা আধুনিক চিকিৎসা পাঠ্যপুস্তকের সাথে বেশ সামঞ্জস্যশীল।
হাড় জখম হলে বা ভেঙে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটাকে যথাস্থানে এনে পট্টি না বাঁধার প্রয়োজনীয়তার দিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এটাকে তিনি পঞ্চম দিন পর্যন্ত মুলতবি রাখার পরামর্শ দেন। বর্তমানে, এটা বিলম্বে পট্টি বাঁধার থিওরি নামে বেশি পরিচিত এবং লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে কর্মরত প্রফেসর জর্জ পার্কিন্স (১৮৯২-১৯৭৯)-কে এ তত্ত্বের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
"কেউ যদি ভাল ডাক্তার হতে চায়, তাকে অবশ্যই ইবনে সীনার অনুসারী হতে হবে।" - প্রাচীন ইউরোপীয় প্রবাদ
বেনেটের প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে ইবনে সীনা এমন একটি বিষয়ে আলোকপাত করেছিলেন, আজ যা 'বেনেটের জখম ১৮৮২ (Bennett's fracture 1882)' নামে সুপরিচিত। শ্রেণিবিন্যাস, রোগের কারণ, মহামারী, লক্ষণ ও আলামত, চিকিৎসা এবং পূর্বাভাস নিয়ে আধুনিক যুগের চিকিৎসা পাঠ্যপুস্তকগুলোর বিন্যাস কাঠামো ইবনে সীনার আল-কানুনের বিন্যাস, ব্যাপকতা ও ব্যাখ্যার পদ্ধতির সাথে বেশ সাদৃশ্য বহন করে। এসব কারণে আল-কানুন মুসলিম ও ইউরোপের উভয় মহাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত চিকিৎসা পুস্তকের আসনে অধিষ্ঠিত হয়। ক্রিমোনার জেরার্ডের লাতিন অনুবাদের বদৌলতে আল-কানুন ইউরোপীয়দের নিকট ১২শ শতাব্দি থেকেই পরিচিত ছিল। ১৭শ শতাব্দি পর্যন্ত লিউভেন ও মন্টেপেলিয়ারের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে এটা পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল এবং ইউনেস্কোর জার্নাল মোতাবেক, 'আধুনিক চিকিৎসার' যুগেও এটা বেশ গৌরবের সাথে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
আল-কানুন ফীত তীব (চিকিৎসা নিয়ম-কানুন) ডাক্তারের সংকেত
বহু সভ্যতার চিকিৎসা জ্ঞানের ভাণ্ডার জমা যে গ্রন্থে উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: ১৯শ শতাব্দি পর্যন্ত চিকিৎসা অনুশীলনে অভূতপূর্ব প্রভাব বজায় রাখা স্থান: পারস্য তারিখ: ১০ম থেকে ১১শ শতাব্দি আবিষ্কারক: ইবনে সীনা, আবিসিনা নামে পরিচিত, ডাক্তার এবং বহুবিদ্যায় পারদর্শী (পলিম্যাথ)
১১শ শতাব্দির পণ্ডিত ইবনে সীনা চিকিৎসা, দর্শন এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে লিখেছেন এবং পাঠ দিয়েছেন। পশ্চিমে আবিসিনা নামে পরিচিত এই মহামনীষীর সর্বাধিক সাড়া জাগানিয়া লেখা "আল-কানুন ফীত তীব", যা Code of Laws in Medicine (চিকিৎসা নিয়মনীতির সংকেত) নামে অনুদিত হলেও the Canon (আল-কানুন) নামেই সমধিক পরিচিত।
আল-কানুনে ইবনে সীনা বিভিন্ন সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত চিকিৎসা জ্ঞান জড়ো করে পূর্ণাঙ্গ এক বিশ্বকোষ তৈরি করেন। পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থ চিকিৎসা মৌলনীতি, ঔষধ, দেহের বিভিন্ন অঙ্গের অসুখ, সাধারণ রোগব্যাধি এবং বিভিন্ন মানসিক ব্যাধি নিয়ে বিস্তর আলোচনায় সমৃদ্ধ।
রোগের কারণ, ধরন, জখমের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন জটিলতা এবং সেগুলো চিকিৎসার বিভিন্ন পন্থা নিয়ে ইবনে সীনা বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করেন। জখম বা ভেঙে যাওয়া হাড় তাৎক্ষণিকভাবে যথাস্থানে এনে পট্টি না বাঁধার পক্ষে বলে তিনি সেটাকে পাঁচদিন বিলম্ব করার পরামর্শ দেন যা বর্তমানে সার্বজনীনভাবে গৃহিত। তিনি তার লেখায়, প্রতিটি হাড়ের স্বতন্ত্র জখমের বিষয়টি উপলব্ধিকরণে বিস্তারিত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করেন, এমনকি পণ্ডিত বেনেটের কয়েক শতাব্দি পূর্বেই তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলির চোট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন, যা আজ 'বেনেটের জখম (Bennett's fracture)' হিসেবে সুপরিচিত।
আল-কানুনে ইবনে সীনা ১৪২-টি ভেষজ প্রতিষেধকের গুণাগুণ লিপিবদ্ধ করেন। মিশর, মেসোপটেমিয়া, চীন ও ভারতের সাথে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রাখা ঔষধি বৃক্ষ ও লতাগুল্ম প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজগুলোর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ক্রমবর্ধমান ভ্রমণ ও বাণিজ্যের বদৌলতে শুরুর দিকের মুসলিম সভ্যতা নতুন নতুন লতাগুল্ম, উদ্ভিদ, বীজ এবং মশলার সরবরাহে ঠাসা হওয়ার পাশাপাশি ভেষজ চিকিৎসায় নয়া নয়া প্রতিষেধকের বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছিল।
আল-কানুন গ্রন্থটি বেশ ব্যাপক কিন্তু এক হাজার বছর পূর্বে ইবনে সীনা যখন গ্রন্থটি লেখেন, তখন তিনি কি আদৌ জানতেন যে, কতটা যুগ ধরে এটার প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতা দাপটের সাথে রাজ করে যাবে? ১২শ শতাব্দিতে ক্রিমোনার জেরার্ডের লাতিন অনুবাদের বদৌলতে ইউরোপের পুরো চিকিৎসক সমাজের হাতে হাতে গ্রন্থটি পৌঁছে যায় এবং তাদের পূর্ববর্তী মুসলিম সভ্যতার চিকিৎসকদের ন্যায় তারাও ব্যাপক হারে এটার ব্যবহার শুরু করে। ১৩শ শতাব্দিতে আল- কানুনের জটিল বিষয়বস্তু সহজে বোঝার নিমিত্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি এটার সংক্ষিপ্ত লাতিন সংস্করণও প্রকাশ পেতে থাকে। ১৮শ শতাব্দি পর্যন্ত কিছু ডাক্তার চিকিৎসার জন্য আল-কানুন ব্যবহার করতেন।
ইবনে সীনা তার গোটা জীবনে বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য পুস্তক রচনা করেছেন। চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গ্রন্থের পাশাপাশি পদার্থবিদ্যায় ২৬-টি, ধর্মতত্ত্বে ৩১-টি, মনোবিজ্ঞানে ২৩-টি, গণিতে ১৫-টি, যুক্তিবিদ্যায় ২২-টি এবং দর্শনের উপর তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এমনকি প্রেম ও সঙ্গীত নিয়ে পুস্তক লেখারও সময় তার হয়েছিল।
মুসলিম সভ্যতার অনেক পণ্ডিতের ন্যায় ইবনে সীনা কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিভিন্ন বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তার একটা বুদ্ধিগ্রাহ্য উপলব্ধি দাঁড় করানো প্রয়াস চালান। তিনি তার লেখনীতে পানির উৎস এবং মেঘের গঠন নিয়ে লিখেছেন, এমনকি তার সুবিখ্যাত "আশ-শিফা" (আরোগ বিধান) গ্রন্থ থেকে খনিজবিদ্যা, আবহাওয়াবিজ্ঞান, পর্বত গঠন, ভূতাত্ত্বিক সময়ের ধারণা এবং ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণসমূহের মতো জটিল বিষয়গুলোও বাদ পড়েনি।
📄 চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের নোটবই
হাজার বছর পূর্বের প্রায় প্রতিটি মুসলিম চিকিৎসা গ্রন্থে চক্ষুরোগের কোনো না কোনো দিক আলোচিত হতো। এ ব্যাপারে তাদের গবেষণা কিছুটা সীমাবদ্ধ ছিল, যেহেতু তারা মানুষের চোখের বদলে প্রাণিদের চোখ ব্যবহার করতো। ওই সময় মানবদেহের ব্যবচ্ছেদকে বেশ অসম্মানের চোখে দেখা হতো। তথাপি এটা চোখের গঠনের সবচেয়ে প্রাচীন ছবি অঙ্কনে তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দির মুসলিম চক্ষু সার্জন কিংবা চক্ষু বিশেষজ্ঞগণ তাদের পরিচালিত অপারেশন, ব্যবচ্ছেদ, নতুন আবিষ্কার ও কোনো বিষয়ে তাদের পাওয়া নতুন গবেষণা তথ্য পাঠ্যপুস্তক ও তথ্যবহুল গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসা অধ্যাপক জুলিয়াস হির্শবার্গের মতে, ওই সময় ৩০-টির মতো চক্ষুবিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক লেখা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪-টি এখনও টিকে আছে।
Conjunctiva (কনজাংটিভা - চোখের কর্নিয়ার পাতলা স্বচ্ছ আবরণ), কর্নিয়া (অক্ষিগোলকের স্বচ্ছ আবরণ), uvea (ইউভিয়া - চোখের মধ্যবর্তী স্তর) এবং রেটিনা (অক্ষিপট)-এর ন্যায় আধুনিক পরিভাষাগুলো তখনও ব্যবহারে ছিল। ট্রকোমার ন্যায় চোখের পাতার অসুখের অপারেশন তখন সাধারণ চিকিৎসা অনুশীলন ছিল, এ রোগে সাধারণত চোখের পাতার ভেতরের অংশ শক্ত ও কঠিন হয়ে উঠে। 'চোখের পিউপিল বা তারারন্ধ্রের ব্যথা' শিরোনামে গ্লুকৌমা বা চোখের তরলের ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টির ন্যায় রোগের চিকিৎসা বহুল প্রচলিত ছিল। কিন্তু চোখের ছানি চিকিৎসা ছিল চক্ষুবিজ্ঞানে মুসলিমদের রাখা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একক অবদান।
ছানি পরিভাষার আরবী: নুযুলুল মায়ি ইলাল আ'ইনি, যার অর্থ: চোখে পানির আগমন, এটা চোখের লেন্সে পানি জমে যাওয়াকে নির্দেশ করে। এমনটি হলে চোখ পানিতে ভারী হয়ে আসে এবং তা ঝাপসা দেখতে শুরু করে।
১০ম শতাব্দির ইরাকের আল-মাওসিলী দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারে ফাঁপা সুচ নির্মাণ করেন, যা তিনি কর্নিয়া ও কনজাংক্টিভার সংযোগস্থল limbus (লিম্বাস - স্বচ্ছ কর্নিয়া ও অস্বচ্ছ সাদা অংশের মধ্যস্থ সীমানা)-এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করিয়ে চোষণের মাধ্যমে ছানি অপসারণ করতেন। এভাবে চোখের ছানির অপারেশন আজও করা হয়, তবে তাতে আধুনিক কিছু পন্থা যুক্ত করা হয়, যেমন: চোষণের পূর্বে লেন্সকে ঠাণ্ডা করা।
তিনি তার নিজস্ব গবেষণা ও অনুশীলনের ভিত্তিতে রচনা করেন: "কিতাবুল মুনতাখাব ফী এ'লাজি আমরাধিল আ'ইন ওয়া ইলালিহা ওয়া মুদাওয়াতিহা বিল হাদীদ" (চক্ষু রোগের চিকিৎসাশাস্ত্রীয় নির্বাচিত পুস্তক), যেখানে তিনি চোখের ৪৮-টি রোগের আলোচনা করেছেন। স্পেনের মাদ্রিদে অবস্থিত এস্কোরিয়াল লাইব্রেরিতে এটার পাণ্ডুলিপি (নম্বর: ৮৯৪) পাওয়া যাবে।
বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত আল-মাওসিলীর রচনা কেবল আরবীতে এবং ১৩শ শতাব্দির একটি হিব্রু অনুবাদেই সহজলভ্য ছিল। এইতো ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক হির্শবার্গ এটার জার্মান সংস্করণ প্রকাশ করেন, যিনি আল-মাওসিলী সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন "গোটা আরবী সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর চক্ষু সার্জন।"
বর্তমান চিকিৎসকদের ন্যায় মুসলিম সভ্যতার পণ্ডিতগণও চোখের অসুখকে বেশ গুরুত্বের সাথে আমলে নিতেন।
১০ম শতাব্দির বাগদাদ নিবাসী এবং আল-মাওসিলীর সমসাময়িক আলী ইবনে ঈসা ছিলেন ইসলামের চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞদের মাঝে সর্বাধিক পরিচিতের একজন। তিনি "তাযকিরাতুল কাহহালিন" (চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের নোটবই) শিরোনামে গ্রন্থ রচনা করেন, যা ছিল চক্ষুরোগের উপর লিখিত সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই। গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়ে ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভেনিসে প্রকাশিত হয়। আবারও অধ্যাপক হিশবাগ ও তার সহযোগী চক্ষু সার্জন জে. লিপার্ট ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে এটার জার্মান অনুবাদ প্রকাশ করেন এবং মার্কিন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ ক্যাসি উড ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে এটার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন।
১৩০-টি চক্ষুরোগের বিবরণ প্রদান এবং টুকোমা এবং চক্ষুপ্রদাহ বা চোখ-উঠা রোগের বিভিন্ন প্রকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাসমৃদ্ধ ইবনে ঈসার "তাযকিরাতুল কাহহালিন" গ্রন্থটি বহু শতাব্দি ধরে চক্ষুবিজ্ঞানের প্রামাণ্য পাঠ্যবই হিসেবে সমাদৃত ছিল।
অন্ধত্ব প্রতিরোধ "১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে অন্ধত্ব প্রতিরোধে মুসলিম চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা বেশ অগ্রগামী ছিল। আর-রাযী ছিলেন প্রথম ডাক্তার, যিনি চোখের পিউপিলের প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex action)-এর বর্ণনা দেন।
অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে ... আল-মাওসিলী ফাঁপা সুচ ব্যবহার করে চোষণ প্রক্রিয়ায় চোখের ছানি অপসারণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।"
- Optometry Today, মার্চ ২৮, ১৯৮৭ ইংল্যান্ডের The Association of Optometrists-এর একটি প্রকাশনা
এটা চক্ষুবিজ্ঞানে মুসলিমদের করা কোনো কাজের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যা পূর্ণাঙ্গ এবং যা এখনো তার আসল অবস্থায় টিকে আছে। বিংশ শতাব্দির চিকিৎসা ঐতিহাসিক ড. সিরিল এলগুড লিখেছেন, "প্রথম অংশে চোখের গঠনশৈলী, দ্বিতীয় অংশে সাধারণ দেখায় নজরে পড়ে না, চোখের এমনকিছু বাহ্যিক অসুখ নিয়ে আলোচনা রয়েছে ... প্রাথমিক স্তরের ছানি যতটা [অন্য অসুখের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া], ঠিক তেমনি ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিশক্তিও পাকস্থলি বা মস্তিষ্কের কোনো ব্যাধির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, চিকিৎসা অনুশীলকারীরা যেন বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করে, সে ব্যাপারে তিনি যেভাবে জোর দিয়েছিলেন, সেটা চক্ষুরোগ বিষয়ে আধুনিক ধারণার সবচেয়ে নিকটতর।"
"মধ্যযুগীয় ইউরোপ যখন অন্ধকারের অতলে, তখন মুসলিমরাই স্পেনের গোয়াদেলকুইভার থেকে মিশরের নীলনদ এবং রাশিয়ার অক্সাস নদী পর্যন্ত - বিজ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিল এবং তারাই আমাদের চক্ষুবিজ্ঞানের বাতিগুলো সচল রেখেছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপে তারাই ছিল চক্ষুবিজ্ঞানের সত্যিকার বিশেষজ্ঞ।"
আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনে দেয়া অধ্যাপক জুলিয়াস হির্শবার্গের সমাপ্তিসূচক ভাষণ, জুলাই ১৯০৫
চোখের অসুখ অন্যান্য রোগেরও আলামত, ইবনে ঈসাই যে এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণকারী একমাত্র চক্ষু সার্জন, ব্যাপারটি এমন নয়। ১০৮৮ ভূস্টাব্দে পারস্য নিবাসী আল জুরজানী নামে পরিচিত আবু রূহ মুহাম্মদ ইবনে মানসুর ইবনে আব্দুল্লাহ "নূরুল উ'য়ুন" (সেখের জ্যোতি) নামে গ্রন্থ রচনা করেন, যার একটি অধ্যায় এমন অসুখ নিয়ে আলোচনা করেছে, যা লুকানো কিন্তু ৫ব আলামত চোখ ও দৃষ্টিশক্তিতে বেশ ভালোভাবে দৃশ্যমান, যেমন: তৃতীয় স্নায় তথা অকুলোমোটরের বিকলাঙ্গতা, হকের ব্যাধি ও বিষাক্ততা।
দক্ষিণ স্পেনের কর্ডোবাতে আবক্ষ বা বুক পর্যন্ত বানানো ভাস্কর্যের মাধ্যমে যে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞকে অমর করে রাখা হয়েছে, তিনি হলেন: মুহাম্মদ ইবনে কাসুম ইবনে আসলাম আল-গাফিক্বী। কর্ডোবা নিবাসী এবং সেখানে চিকিৎসা অনুশীলনে রত এই মহামনীষী "আল-মুরশিদ ফীল কাহাল" (চক্ষুরোগ প্রতিকারে অভিজ্ঞ পরামর্শক) শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা কেবল চক্ষুরোগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একইসাথে মাথা ও মস্তিষ্কের নানা রোগের বিস্তারিত বিবরণে পূর্ণ। রিপোর্টার রাগেহ উমর বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র An Islamic History of Europe-এ বলেন, আল-গাফিক্বী যে পন্থায় ট্রকোমার ন্যায় চক্ষুরোগের চিকিৎসা করতেন, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অনুসরণ করা হতো। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই মহামনীষীর ৮০০-তম মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে কর্ডোবার পৌর হাসপাতালে তার আবক্ষ-ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়।
যুক্তরাজ্যে যাদের বয়স পঞ্চাশের অধিক, তাদের অন্ধত্ববরণের অন্যতম প্রধান কারণ: চোখে ছানি পড়া। কিন্তু Royal College of Ophthalmologists এ সুসংবাদ দিচ্ছে যে, "ছানির সার্জারি বেশ সন্তোষজনক এবং তা রোগীদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয়।" যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর শত শত ছানির অপারেশন হয় এবং এটা সেখানের সর্বাধিক ঐচ্ছিক অপারেশনগুলোর অন্যতম। কেইবা জানতো, আল-মাওসিলীর কর্ম এমন এক সার্জারির ভিত দাঁড় করাবে, যা একবিংশ শতাব্দিতে এসে অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়তা লাভ করবে।
📄 ভ্যাকসিন
আজকের দিনেও ভ্যাকসিন বিতর্কের জালে আটকে আছে। প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে তুরস্ক থেকে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে ভ্যাকসিন আনা হলে সেটাও বিতর্কের তোপে পড়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। ভ্যাকসিন প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে আনাতোলিয়ার অটোমান তুর্করা বেশ দক্ষ ছিল। ভ্যাকসিনের এ পদ্ধতিকে তারা আশী বা অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া বলতো। মূলত নিজেদের আদি তুর্কি গোত্রগুলো থেকে তারা এ জ্ঞান হাসিল করেছিল।
ভ্যাকসিন এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে রোগ সৃষ্টিকারী অঙ্গের দুর্বল বা অক্ষম অংশ কারো দেহে ডোজ বা এক মাত্রা ঔষধ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এটা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে ওই নির্দিষ্ট রোগ মুকাবিলায় শরীরে এন্টিবডি সৃষ্টি করে। নতুন ভ্যাকসিন তৈরিতে বর্তমানে আট থেকে বার বছরের মতো সময় লাগে এবং যেকোন নতুন ভ্যাকসিন নিরাপদ হিসেবে গ্রহণের পূর্বে সেটাকে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তুর্কিরা এটা আবিষ্কার করে যে, গবাদি পশুর স্তন থেকে নেয়া গো-বসন্ত যদি শিশুদের মাঝে ভ্যাকসিন হিসেবে প্রয়োগ করা হয়, তবে শিশুরা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয় না। ১৭১৬ ও ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দের মাধামাঝি সময়ে তুরস্কে থাকা ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এবং বিখ্যাত ইংরেজি পত্র-লেখিকা লেডি মন্টাগু এ ধরনের ভ্যাকসিন এবং তা প্রয়োগের অন্যসব পদ্ধতির সাথে ইংল্যান্ডের পরিচয় ঘটান। তিনি ভ্যাকসিন প্রদানের এ তুর্কি পদ্ধতির সংস্পর্শে আসেন এবং দূতাবাসের সার্জন চার্লস মাইটল্যান্ড কর্তৃক তার পুত্রের দেহে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন প্রদানে সম্মতি দেয়ার পর থেকে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন নিয়ে তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেন।
ইস্তাম্বুলে অবস্থানকালে লেডি মন্টাগু পুরো প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে একগুচ্ছ পত্র ইংল্যান্ডে পাঠান। ইংল্যান্ডে ফেরার পর তিনি ভ্যাকসিন দেয়ার তুর্কি পদ্ধতির বিস্তৃতি ঘটান এবং নিজের বহু আত্মীয়কে তিনি গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন নিতে সহায়তা করেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি যে শুধু বরাবরের মতো সব ধরনের ভ্যাকসিন কর্মসূচি বিরোধী গির্জা কর্তৃপক্ষের তীব্র বিরোধিতার শিকার হয়েছিলেন, বিষয়টি এমন নয়, বরং বহু চিকিৎসকেরও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তার অদম্য মানসিকতার কারণে ভ্যাকসিন প্রক্রিয়া ক্রমশ চারদিক ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বিপুল সাফল্যের মুখ দেখে।
"গণস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দু'শ বছরের অধিক সময় ধরে ভ্যাকসিন অপ্রতিদ্বন্দ্বি ভূমিকা পালন করে আসছে... পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়া (কণ্ঠনালীর সংক্রমক রোগ), হুপিং কাশি, রুবেলা, মাম্পস, টিটেনাস, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib)-এর ন্যায় কত শত মরণব্যাধি, যা সবার মাঝে ভয় ছড়িয়ে দিতো, আজ তা ভ্যাকসিনের বদৌলতে আমাদের নিয়ন্ত্রণে, যা থেকে একজন ভ্যাকসিনের অলৌকিক মর্যাদা আঁচ করতে পারে।" রিচার্ড গ্যালাহার, সম্পাদক, ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিন এবং The Scientist ওয়েবসাইট
ইস্তাম্বুলে মন্টাগু পরিবারের পারিবারিক ডাক্তার ইমানুয়েল তিমোনি যখন ভ্যাকসিন প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক বিবরণ ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে রয়েল সোসাইটিতে জমা দেন, তখনই ভ্যাকসিনের ইতিহাসে যোগ হয় নতুন মাত্রা। ত্রিপলির রাষ্ট্রদূত কাসেম আগা এ ব্যাপারে আরও শক্ত যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি ভ্যাকসিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ত্রিপলি, তিউনিস, আলজিয়ার্স এলাকায় ভ্যাকসিন পরবর্তী সফলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। মূলত মুসলিম দেশগুলোর ভ্যাকসিন প্রক্রিয়া এবং সেটার সাফল্যের দীর্ঘ ইতিহাস ভ্যাকসিনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য মনোনীত হন। তখন থেকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্যাকসিন কর্মসূচিকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়, যা ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক হিসেবে পরিচিত এডওয়ার্ড জেনারের অর্ধ শতাব্দী পূর্বের ঘটনা।
বর্তমানে এটা মানা হয় যে, ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে জেনার এটা 'শুনতে' পান যে, গো-বসন্ত নাকি গুটিবসন্ত মুকাবিলায় দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে সক্ষম। সারাহ নেলস নামের এক গোয়ালিনীর হাতের ক্ষত থেকে গো-বসন্তে আক্রান্ত আট বছরের জেমস ফিপস নামের বালকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের সময় তিনি এটা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
📄 ভেষজ চিকিৎসা
হাজার বছর পূর্বে বাগান ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি 'ক্ষেত্র', যা স্বনামধন্য বিজ্ঞানী দ্বারা পরিচালিত হতো, যারা বিভিন্ন উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ম্যানুয়েল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ভেষজ চিকিৎসাকে তখন বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে দেখা হতো না, বরং তা ছিল চিকিৎসা অনুশীলনেরই একটি অংশ। এ কারণে বহু হাসপাতালে ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাগানভর্তি ঔষধি বৃক্ষ থাকতো এবং এগুলো থেকে নিত্য-নতুন ঔষধ আবিষ্কার এবং সেগুলোর পরিচর্যা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
এ ধরনের ঔষধি বৃক্ষের আবিষ্কার মানব সভ্যতার একেবারে সূচনা থেকেই জারি ছিল। এমনকি লেখন রীতি আবিষ্কারের বহু আগেই মিশর, মেসোপটেমিয়া, চীন ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ঔষধি বৃক্ষের বহুল ব্যবহার ছিল। বিভিন্ন ঔষধি বৃক্ষের তালিকা এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় সমৃদ্ধ "হারবাল" শিরোনামের গ্রন্থটি ছিল প্রথম গ্রিক প্রচেষ্টা, যা কারিয়াস্টাসের ডিয়োক্লিস কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে রচিত এবং প্রথম খ্রিস্টাব্দের পণ্ডিত ক্রাটিউস সে ধারা অব্যাহত রাখেন। ভেষজ উদ্ভিদের গুণাগুণ নিয়ে De Materia Medica (ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকাস) নামে যে কর্মটি আজ অবধি টিকে আছে, তা ৬৫ খ্রিস্টাব্দে ডায়াসোক্রাইডস কর্তৃক রচিত। গ্রিক ও রোমান ভেষজ বিশেষজ্ঞদের মাঝে কেবল ডায়াসোক্রাইডসের নামই জানা যায়।
মুসলিম সাম্রাজ্যের পরিসর বৃদ্ধির সাথ সাথে বণিক ও পর্যটকগণ এমনসব বিচিত্র লতাগুল্ম, বৃক্ষ, বীজ ও মশলার সাথে পরিচিত হন, যা পূর্বে তাদের নিকট অপরিচিত ছিল। এগুলোর কাঁচামালের বিপুল সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি কীভাবে এগুলো ব্যবহার করতে হয়, তার প্রয়োজনীয় জ্ঞানও তারা সংগ্রহ করেছিল। এ কাজে তারা পুরো দুনিয়া চষে বেড়ায়, রূঢ় আবহাওয়া এমনকি এশিয়ার বিস্তৃত প্রান্তর থেকে পিরিনীয় পর্বতমালার ন্যায় দূরত্বও তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। কাগজ আবিষ্কার এবং এর বহুল ব্যবহারের কল্যাণে তারা তাদের ভ্রমণের বিশদ বিবরণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিক লিখে ফেলতেন।
বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্তের সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান একত্র হয়ে নতুন প্রতিষেধকের পাশাপাশি ভেষজ ঔষধের উল্লেখযোগ্য যোগান সহজলভ্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতসব আবিষ্কারের বদৌলতে তথ্যের এক ভাণ্ডার গড়ে উঠে, যা শেষমেশ বিশ্বকোষ তুল্য গ্রন্থে নিজেদের স্থান খুঁজে নেয়।
১০০২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী ইবনে সামাজুন ভেষজ লতাগুল্ম ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ বৃক্ষ এবং সেগুলো থেকে ঔষধ বানানোর নিয়ম সম্বলিত একখানা গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে তিনি বিভিন্ন উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস এবং সেগুলোর ঔষধি বিশেষত্ব আলোচনাভুক্ত ছিল। ১১শ শতাব্দিতে ইবনে সীনা তার আল- কানুনে ভেষজ প্রতিষেধকের ১৪২-টি রেসিপির বিবরণ দেন।
ওই সময়ে উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথা উদ্ভিদবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাতে উদ্ভিদের ব্যবহার ছিল একইসূত্রে গাঁথা। উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় ওই যুগ এতটাই বিচিত্র ছিল যে, একদিকে 'আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক' হিসেবে পরিচিত আবু হানিফা আদ-দিনাওয়ারী "কিতাবুন নাবাত"-সহ তার লেখা নানা গ্রন্থে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের বিস্তৃত তালিকা তৈরিতে ব্যস্ত তো অপরপ্রান্তে ১০ম শতাব্দির চিকিৎসা পণ্ডিত আর-রাযী গেঁটেবাতের চিকিৎসায় ঔষধ হিসেবে কলচিকাম (colchicum) ব্যবহার করে বেশ ভালো সাড়া পেতে শুরু করেছেন।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক রূপান্তরের সাথে সাথে রসায়নশাস্ত্র দ্রুত গতিতে উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছায় এবং উভয় শাস্ত্রের এমন সমৃদ্ধি ভেষজ চিকিৎসাকে মূলধারায় উন্নীত করতে জোরদার ভূমিকা রেখেছিল। পানি উত্তোলনে উন্নত যন্ত্রের ব্যবহার এবং নয়া সেচ কৌশল একত্র হয়ে ১০ম শতাব্দিতে গবেষণাধর্মী বাগান সৃষ্টি এবং ভেষজ বৃক্ষের ব্যাপক আবাদে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।
আন্দালুস নামে পরিচিত মুসলিম স্পেন ছিল ভেষজ চিকিৎসা বিকাশের আঁতুড়ঘর। ১১শ শতাব্দিতে টলেডো, স্পেন এবং পরবর্তীতে সেভিলের মাধ্যমে ইউরোপ প্রথমবারের মতো রাজকীয় উদ্ভিদ উদ্যান বা বোটানিকাল গার্ডেনের সাথে পরিচিত হয়। রাজকীয় এই উদ্যানগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা বিভিন্ন উদ্ভিদ ইউরোপের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছে কিনা, তা যাচাইয়ে ব্যবহৃত হতো।
মালাগার ইবনুল বাইতারের ব্যাপারে ফার্মাসি অধ্যায়ে আপনি আরও তথ্য পাবেন, তথাপি এখানে বলতে হয় যে, ঔষধ প্রস্তুত ও ব্যবহার বিষয়ে "আল-জামিউল মুফরাদাত আল-আদবিয়াত ওয়াল আগযিয়াত” (ভেষজ ঔষধ ও খাদ্য বিষয়ক অভিধান) নামে তিনি যে প্রকাণ্ড বিশ্বকোষ রচনা করেছেন, সেটা তার উদ্ভিদবিজ্ঞানে পারদর্শীতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। উক্ত গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০০০ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা এবং তাদের ঔষধি গুণাগুণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
ভেষজ চিকিৎসার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি লিখেছেন ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী আল-গাফিক্বী এবং তার এ গ্রন্থ "কিতাব আল-আদবিয়াতুল মুফরাদাত" (ভেষজ ঔষধ বিষয়ক পুস্তক) নামেই পরিচিত। বিস্ময়করভাবে গ্রন্থটি বেশ নিখুঁত বর্ণনায় সমৃদ্ধ এবং এটা ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে মিশরে ম্যাক মেয়াহফ কর্তৃক পুনরায় প্রকাশিত হয়।
১০ম শতাব্দিতে ইবনে জুলজুল ডায়াসোক্রাইডস কর্তৃক রচিত De Materia Medica গ্রন্থের আরবী অনুবাদের পাশাপাশি এটার ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন, যেখানে তেঁতুল, কপূর, চন্দনকাঠ এবং এলাচের ন্যায় বহু নতুন জিনিসের বিবরণ তিনি সংযুক্ত করেন। নতুন নতুন উদ্ভিদ চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এসব উদ্ভিদের ঔষধি গুণের বিবরণসহ এদের নানাবিধ বৈশিষ্ট্য তিনি এতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
ঔষধি লতাগুল্ম ও বৃক্ষ কীভাবে রোগীর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে, সেটার পর্যবেক্ষণ ছিল ভেষজ চিকিৎসায় মুসলিমদের রাখা সাধারণ ও একইসাথে যুগান্তকারী অবদান। এটা আজকের দিনে বেশ সাধারণ মনে হলেও তৎকালে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি কেবল মুসলিমরাই ব্যবহার করতো এবং এর উপর নির্ভর করতো।
অন্যদিকে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে ভেষজ চিকিৎসাগ্রন্থ কেবল দুর্লভই ছিল না, বরং তা স্বল্পসংখ্যক পণ্ডিতের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি ১৫শ শতাব্দির শেষ অবধি অনেক ইউরোপীয় চিকিৎসক আরবী পাঠ্যপুস্তক ও গ্রিক গ্রন্থসমূহের আরবী সংস্করণের লাতিন অনুবাদ ব্যবহার করতো। ১৫০০ এবং ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিক পণ্ডিত ডায়াসোক্রাইডসেরই প্রায় ৭৮-টি সংস্করণ সহজলভ্য ছিল।
"এবং তাদের পানীয় হবে আদামিশ্রিত।" - কুরআন, (৭৬:১৭), এই আয়াতে আদাকে জান্নাতবাসীদের অন্যতম একটি পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে আদা বমি-বমি ভাব উপশম ও বমি বন্ধে ব্যবহৃত হয়।
মুসলিম উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের থেকে ইউরোপীয়রা কতটা ধার করেছে এবং ডায়াসোক্রাইডসকে কীভাবে কতটা প্রাসঙ্গিক বানানো যায়, তার ভিত্তিতে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সাফল্য মাপা হতো, কিন্তু পরিস্থিতি সব সময় ঠিকঠাক যায় না। গ্রিক, লাতিন এবং আরবী ভাষায় পর্যাপ্ত পারদর্শীতার অভাবে একবার তো সালেরনোর মহাবিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই ভাষাগুলোতে দক্ষতার অভাবে গ্রিক পাঠ্যপুস্তক উপলব্ধিতে তাদের বেশ বেগ পেত হতো, যেহেতু এগুলো ছিল একাধিক অনুবাদের অনুবাদ।
অজ্ঞতা, অপচিকিৎসা এবং পূর্ববর্তী বাজে গ্রিক অনুবাদের ভুল-ভ্রান্তি এবং সেইসাথে প্রয়োজনীয় উপকরণের বিবরণ আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হওয়ায় এবং সেগুলো ঠিকভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞগণ নিদারুণ হতাশায় পড়েন। এসব কারণে ১৬শ শতাব্দির ইংরেজ কূটনৈতিক ও পণ্ডিত স্যার থমাস ইলিয়ট তার পাঠকদের জানিয়ে দেন যে, (এ বিষয়ে) তিনি প্রাচীনদের থেকে জ্ঞান হাসিল করেননি, যেহেতু ওই জ্ঞান "কারো স্বাস্থের উন্নতির জন্য তেমন কার্যকরী নয়।"
সৌভাগ্যজনকভাবে, ভেষজ চিকিৎসায় বাচ্চা প্রসব করা মায়ের রক্ত ব্যবহারের নীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, যা মধ্যযুগে বিশেষ কিছু ইউরোপীয় চিকিৎসা রেসিপিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ৫-জন ইংরেজ নাগরিকের মধ্যে ১-জন সম্পূরক চিকিৎসা নেয়। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, দশ জনে একজন ভেষজ বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার দারস্থ হয়।
বহু সংখ্যক ভেষজ চিকিৎসকের আবির্ভাবে মুসলিমদের মাঝে ভেষজ চিকিৎসা আবারও তার গুরুত্ব ফিরে পেতে শুরু করেছে, যদিও গ্রাম ও গ্রামীণ জনপদে ভেষজ চিকিৎসা এখনো তাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে।