📄 হাসপাতালের ক্রমবিকাশ
রোগের আরোগ্য বিধান, অনাথের আশ্রয়, এমনকি কর্ম থেকে অবসর নেয়া নিঃসঙ্গ মানুষদের আবাসের ব্যবস্থাসহ বিস্তর সেবাদানের অভিপ্রায় নিয়ে এক হাজার বছর পূর্বে মুসলিম হাসপাতালগুলো বিকশিত হয়েছিল। রাজা কী প্রজা, ধনী কী গরিব, তারা সব ধরনের মানুষের দেখাশোনা করতো, কেননা অসুস্থ হয়ে যে বা যারাই তাদের কাছে যেত, তাদের সেবাদানে মুসলিমরা নৈতিকভাবে বাধ্য ছিল।
মুসলিম ইতিহাসের একেবারে শুরু থেকেই এসব হাসপাতাল ওয়াকফ্ নামের ধর্মীয় দাতব্য সম্পত্তি দ্বারা পরিচালিত হতো, যদিও কিছু হাসপাতালের ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার বহন করতো। বস্তুত এসব হাসপাতালের বিজ্ঞাননির্ভর চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পিছনে এ ধরনের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার ভূমিকা কোনো অংশে কম নয় এবং দু' শতাব্দীরও কম সময়ে এগুলো নগর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
মুসলিমদের পূর্বে গ্রিকদের ছিল নিরাময় মন্দির। এসব স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের পরিবর্তে রোগমুক্তির জন্য অনেকটা অলৌকিক শক্তির উপর নির্ভর করা হতো। কুষ্ঠরোগী, অকেজো ও গরিব মানুষদের সেবাদানকারী জেনাডোকিয়ন (আক্ষরিকভাবে ভ্রমণকারীদের সরাইখানা) নামের গ্রিক বাইযান্টিন দাতব্য সংস্থাকে অনেকটা হাসপাতাল বলা যেতে পারে। যেহেতু এর কার্যক্রম অনেকটা হাসপাতালের মতোই।
ইসলামী হাসপাতালগুলোর গোড়াপত্তন ৮ম শতাব্দীর বাগদাদে এবং অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বাইযান্টিন ভ্রমণকারীদের হোস্টেলের সাথে সাদৃশ্য রাখে, যেহেতু এখানেও কুষ্ঠরোগী, অকেজো ও অনাথ মানুষদের দেখাশোনা করা হতো। কিন্তু প্রথম সুবিন্যস্ত হাসপাতাল ৮৭২ ও ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আহমাদ ইবনে তুলুন নামের এই হাসপাতাল বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ সেবা দিতো। এ হাসপাতালে ছিল নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা দুটো স্নানাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং মনোরোগ চিকিৎসার জন্য আলাদা বিভাগ। রোগীদের সেবার জন্য নির্ধারিত বিশেষ ওয়ার্ডের পোশাক এবং তাদের জন্য বরাদ্দকৃত শয্যাতে ভর্তি হওয়ার আগে রোগীরা তাদের জামা-কাপড় ও মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদে রাখার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট গচ্ছিত রাখতো।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের মাঝে রয়েছে ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিশালাকার বাগদাদী হাসপাতাল, যেখানে সার্বক্ষণিক ২৪-জন চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর দামেস্কের আন-নূরী হাসপাতাল এরচেয়েও বৃহদাকার ছিল। এখানে ঔষধ বিক্রেতা, নাপিত ও অস্থি চিকিৎসকদের চিকিৎসা নির্দেশনা দেয়া হতো এবং সেইসাথে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকগণ ঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন কিনা, সেটা যাচাইয়ের জন্য একজন 'বাজার পরিদর্শক' নির্ধারিত পাঠ্যক্রমের আলোকে পরীক্ষা নিতেন।
কায়রোতে মোট তিনটি সুবিশাল হাসপাতাল ছিল, যার মধ্যে আল-মানসূরী হাসপাতাল ছিল সুবিখ্যাত। ১৩শ শতাব্দীর মিশরের মামলুক শাসক আল-মানসূর কালাউন রাজকুমার অবস্থায় একবার সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনাকালে মূত্রাশয়ের বেদনাতে আক্রান্ত হন। তিনি দামেস্কের আন-নূরী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখানে তিনি যে ধরনের সেবা লাভ করেন, তাতে বিমোহিত হয়ে এই সংকল্প করেন যে, ক্ষমতার মসনদে আরোহণ মাত্রই তিনি এমন একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। নিজের প্রতিজ্ঞা তিনি পুরো করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন কায়রোর বিখ্যাত আল-মানসূরী হাসপাতাল, আর ঘোষণা করেন, "এই ওয়াফ্ফ সম্পত্তি আমি উৎসর্গ করছি, কী আমার সমতুল্য কী আমার অধস্তন, সৈনিক কী যুবরাজ, ধনী কী গরিব, স্বাধীন মানুষ কী দাস, নারী কী পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণের জন্য।"
চারটি প্রবশেদ্বার সম্বলিত আল-মানসূরী হাসপাতাল ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার একেবারে কেন্দ্রে একটি ঝরনা ছিল। খলীফা পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক এবং রোগীদের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন। পৃথক ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া নারী ও পুরুষ রোগীদের সেবার জন্য তিনি নারী ও পুরুষ সেবকের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেন। হাসপাতালের শয্যাগুলোতে তোশক ছিল এবং বিশেষায়িত কক্ষগুলোতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হতো। হাসপাতালের পুরো সীমানাতে প্রবহমান পানির সরবরাহ ছিল। ভবনের একটি অংশে প্রধান চিকিৎসকের জন্য কক্ষ বরাদ্দ ছিল, যেখানে তিনি শিক্ষাদান ও পাঠদান করতেন। কতজন রোগী চিকিৎসা সেবা পাবে, তার কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না এবং হাসপাতালে অভ্যন্তরীণ ঔষধ বিপণন কেন্দ্র ছিল, যেখান থেকে রোগীরা বাসায় ঔষধ নিয়ে যেতে পারতো।
“হাসপাতালের দায়িত্ব হচ্ছে: সেরে উঠা পর্যন্ত ধনী-গরিব, নারী-पुरुष নির্বিশেষে সকলের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। ক্ষমতাবান কী ক্ষমতাহীন, ধনী কী গরিব, রাজা কী প্রজা, সভ্য কী দস্যু বিবেচনায় না নিয়ে হাসপাতাল কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ ছাড়াই কেবলমাত্র রিযিকদাতা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সকলের সেবা নিশ্চিতে বাধ্য থাকবে." - কায়রোর আল-মানসূরী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাকালীন গঠনতন্ত্র
প্রথম দিকের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত ধরে হাসপাতাল উত্তর আফ্রিকা হয়ে সুদূর আন্দালুস খ্যাত স্পেন, সিসিলিসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই পুরো ব্যবস্থা নিয়ে ইউরোপীয়রা বিমোহিত ছিল এবং এর দেখাদেখি পরবর্তীতে তারা অনুরূপ ব্যবস্থা চালু করে, যেমন: স্বদেশীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য ফরাসীরা প্রতিষ্ঠা করে hospitaliers (হসপিটালিয়ারস), fighters of the hospital (হাসপাতালের যোদ্ধা) নামের হাসপাতাল। দক্ষিণ ইউরোপের হাসপাতালগুলোর ভিত্তি নির্মাণে মুসলিম চিকিৎসকগণ অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, যেমন: দক্ষিণ ইতালির বিখ্যাত সালেরনো হাসপাতাল।
মুসলিম বিশ্বের হাসপাতালগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে পরিচালিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, ১২শ শতাব্দির পর্যটক ইবনে জুবায়ের আন-নূরী হাসপাতাল এবং এটা যেভাবে রোগীদের ভালমন্দ তদারকি করে, তার ভূয়সী প্রসংসা করেন। খুব সম্ভবত এমন কার্যকর ব্যবস্থাসম্পন্ন হাসপাতালের মাঝে এটাই প্রথম। তিনি বলেন, "নতুন এই আন-নূরী হাসপাতাল দূর-দূরান্তের রোগীদের দ্বারা গুঞ্জরিত থাকে এবং এটা [দামেস্কের দুটো হাসপাতালের] মাঝে সর্ববৃহৎ। এটার দৈনিক বাজেট ১৫ দিনার এবং একজন পরিদর্শক রোগীদের নাম, প্রয়োজনীয় ঔষধ সরঞ্জাম, খাদ্য ও অনুরূপ জিনিসপত্রের ব্যয় বিবরণী নথিতে লিপিবদ্ধ করে। রোগীদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য চিকিৎসকগণ সকাল সকাল হাসপাতালে চলে আসেন এবং প্রত্যেকটি রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ ও খাবার প্রস্তুতের নির্দেশনা দেন।"
"গ্রন্থ ছাড়া যে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করে, তার উপমা ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে সম্পূর্ণ অজানা ও অজ্ঞাত এক সমুদ্র পানে যাত্রা করে, কিন্তু যে রোগী ছাড়াই চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করে, সে তো আদৌও সমুদ্রে নামেনি।" -স্যার উইলিয়াম ওসলার, কানাডীয় চিকিৎসক (১৮৪৯-১৯১৯)
নিকট প্রাচ্য ভ্রমণের সময় ইবনে জুবায়ের তার ভ্রমণকৃত অধিকাংশ অঞ্চলের প্রতিটি শহরেই এক বা একাধিক হাসপাতাল দেখতে পান। এসব প্রত্যক্ষ করে তিনি অকপটে বলতে বাধ্য হন যে, হাসপাতাল হচ্ছে: "ইসলামের চূড়ান্ত গৌরবের অন্যতম একটি প্রমাণ।"
এই হাসপাতালগুলো কেবল দৈহিক ব্যাধি নিরাময়ে নিজেদের আটকে রাখেনি, বরং অগ্রগামী চিন্তাতেও নিজেদের শামিল রেখেছিল। ৯ম শতাব্দির বাগদাদ হাসপাতালে মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বতন্ত্রভাবে নিবেদিত একটি ওয়ার্ড-ই ছিল। এই হাসপাতালে নিয়োজিত ছিলেন স্বনামধন্য চিকিৎসক আর-রাযী।
চিকিৎসাশাস্ত্র শিখতে আসা নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক হাসপাতালগুলো ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণ লাভের তীর্থভূমি, যেমনটি আজকের দিনেও সত্য। আটশত বছর পূর্বে, চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষাদানে নিয়োজিত এসব হাসপাতাল শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের সাথে তাত্ত্বিক পাঠ দিতো।
জমায়েত এবং ছাত্র-শিক্ষকের মুখোমুখি অবস্থান - আজকের দিনের ন্যায় উভয় পদ্ধতিতেই পাঠদান চলতো। হাসপাতালের বৃহৎ হলঘরে ভাষণ দেয়া হতো। সাধারণত চিকিৎসাশাস্ত্রীয় কোনো পাণ্ডুলিপি থেকে উচ্চস্বরে পাঠ করে শোনানো হতো। যিনি এ কাজ করতেন, তাকে 'আবৃত্তিকার চিকিৎসক' (আত-তাবিবুল ক্বারী) বলা হতো। পড়া শেষ হলে প্রধান চিকিৎসক বা সার্জন প্রশ্ন করতেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবও তিনি দিতেন।
বহু শিক্ষার্থী সুপরিচিত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পুস্তক অধ্যয়ন করতো এবং মুসলিম বিশ্বে কাগজের সহজলভ্যতা থাকায় 'ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য' সেগুলোতে ওই পুস্তকের পাণ্ডুলিপি নকল করে সংরক্ষণ করা হতো। অন্যদিকে, ইউরোপে এই পুস্তকগুলোর নকল বেশ দুর্লভ ছিল এবং নিতান্তই অল্প কিছু শিক্ষার্থীর নিকট তা পাওয়া যেত।
শিক্ষাদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক বা সাজর্নের চারপাশে শিক্ষার্থীদের দল বেঁধে জড়ো হওয়া এবং চিকিৎসকের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করাকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হতো। উচ্চতর শিক্ষার্থীগণ ডাক্তার কীভাবে রোগীর ইতিহাস ঢুকে এবং তাদেরকে কীভাবে পরীক্ষা করে, তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো; উপরন্তু বর্হিবিভাগীয় রোগীদের জন্য তারা ডাক্তারের হয়ে প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র পর্যন্ত লিখে দিতো।
দামেস্কের আন-নূরী হাসপাতাল ছিল এমনই এক চিকিৎসা বিদ্যালয়। চিকিৎসক আবুল মাজিদ আল-বাহিলীর দিক- নির্দেশনায় ১২শ শতাব্দির শাসক নূরুদ্দীন যঙ্গি হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নামেই এর নামকরণ করা হয়। খাদ্য ও ঔষধের পর্যাপ্ত সরবরাহের পাশাপাশি তিনি বিপুল সংখ্যক চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পুস্তক হাসপাতালের জন্য দান করেন, যেগুলো বিশেষ হলঘরে অধ্যয়নের জন্য রেখে দেয়া হয়।
নিজের চিকিৎসা পেশাজীবন সমৃদ্ধ করার এক আদর্শ জায়গা ছিল এ হাসপাতাল। ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিকে আল- দাখওয়ার নামের এক চিকিৎসক বেশ কম পারিশ্রমিকে আন-নূরী হাসপাতালে কাজ করলেও যখন তার খ্যাতি চারদিক ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন তাকে এতটা সম্পদশালী করে যে, তিনি ওই শহরে আলাদা একটি চিকিৎসা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পেশাজীবনে সমৃদ্ধি অর্জনের এমন পথ আজকের দিনের বহু চিকিৎসকের নিকট বেশ পরিচিত।
স্বনামধন্য বহু চিকিৎসকই এই চিকিৎসা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং মাঝে মাঝে সুলতান নূরুদ্দীন যঙ্গি চিকিৎসা নিয়ে আলোচনার জন্য চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের জমায়েত দরবারে বসাতেন। অন্য সময় হাসপাতালের পরিচালক আবুল মাজিদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিন ঘন্টা ধরে যে বক্তব্য দিতেন, তা তাদেরকে এ জমায়েতে শুনতে হতো। এই চিকিৎসা বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, এমন স্বনামধন্য চিকিৎসকদের মাঝে ১৩শ শতাব্দির চিকিৎসাশাস্ত্রীয় ঐতিহাসিক ইবনে আবি উসাইবিয়া এবং ইবনে আন-নাফীস অন্যতম। ১৩শ শতাব্দিতে ইবনে আন- নাফীসের রক্তের স্বল্প মাত্রার সঞ্চালন আবিষ্কার মানবদেহ উপলব্ধিতে যোগ করে নতুন মাইলফলক।
📄 পূর্ণতার উপকরণ
কেউ যদি আপনার সামনে এক হাজার বছর আগেকার সার্জারি যন্ত্রের একটি ট্রে উপস্থিত করে, আর আপনি যদি ধরতে না পারেন যে, এগুলো কি আধুনিক যন্ত্র না হাজার বছর আগেকার, তবে কেমন হবে বলুন তো? যদি ভেবে থাকেন, হাজার বছর আগেকার এসব যন্ত্র হয় এবড়ো-থেবড়ো হবে, না হয় ত্রুটিপূর্ণ হবে, তবে বিস্তারিত জানতে পড়ুন এবং অবাক হতে থাকুন।
আমরা যদি ১০ম শতাব্দির দক্ষিণ স্পেনে ফিরে যাই, তবে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতিতে টইটুম্বুর আবুল ক্বাসিম খালাফ ইবনে আল-আব্বাস আয-যাহরাবী, পশ্চিমে আবুলকাসিস নামে পরিচিত সার্জনের কাঁধে ভর দিয়ে এক নয়া দিগন্তের দেখা পাবো। "আত-তাসরীফ" নামে ইতোমধ্যেই তিনি তার চিকিৎসা বিশ্বকোষ রচনা করে ফেলেছেন এবং তাতে রয়েছে সার্জারি নিয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায়, অবাক করে দেয়ার বিষয় হচ্ছে, সেখানে তিনি ২'শরও বেশি সার্জারি যন্ত্রের বিবরণ পেশ করেছেন। প্রাচীন মিশরীয় সমাধিগুলোর এদিক-সেদিক অঙ্কিত কিছু নকশার কথা বাদ দিলে চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে খুব সম্ভবত এটাই প্রথম রচনা, যেখানে সার্জারি যন্ত্রের সচিত্র নকশা অঙ্কন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই চিত্রায়নগুলো এতটাই নিখুঁত যে, এক সহস্রাব্দ পার হলেও এগুলোতে খুব সামান্যই পরিবর্তন এসেছে; উপরন্তু এই চিত্রায়নগুলোই ইউরোপে সার্জারির ভিত্তি দাঁড় করাতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
হাতে আঁকা নকশার মাধ্যমে আয-যাহরাবী প্রতিটি যন্ত্রের চিত্রায়নের পাশাপাশি ওই যন্ত্র কীভাবে ও কখন ব্যবহার করতে হয়, তারও বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। উদাহরণস্বরূপ, cauterization (ক্ষত নিরাময়ে ছেঁকা) সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, "প্রাচীন চিকিৎসকদের মতানুসারে ছেঁকা দিয়ে ক্ষতের সংক্রমণ রোধে লোহার তুলনায় স্বর্ণের ব্যবহার সর্বোত্তম। আমাদের মতে, এক্ষেত্রে লোহার ব্যবহারই চটপটে ও অধিকতর নিরাপদ।"
নাকে হওয়া ফিস্টুলা (নলসদৃশ দীর্ঘ ক্ষত/ভগন্দর) চিকিৎসায় কীভাবে scraper (মাজরাদ – চাঁছনি) যন্ত্রের ব্যবহার করতে হবে, সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, "জনসাধারণ যেটাকে সজারুর কাঁটা বলে, ডাক্তাররা সেটার নাম দিয়েছেন 'ফিস্টুলা'। ইতোপূর্বে বর্ণিত পদ্ধতি মোতাবেক ছেঁকা বা দাহক দিয়ে চিকিৎসার পরেও যদি এটার উপশম না হয়, তবে একেবারে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে, সেখান থেকে পেকে যাওয়া টিউমারটি কেটে সবটুকু পুঁজ বের করা ছাড়া এটা নিরাময়ের নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। যখন হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাবেন এবং পচা অংশ বা কালো জিনিস দেখতে পাবেন, তখন এই চিত্রে বর্ণিত যন্ত্র দিয়ে এটাকে একেবারে চেঁছে ফেলুন। এই যন্ত্রকে 'অসমতল মাথা' বলে এবং এটা ভারতীয় লোহা দিয়ে তৈরি। এটার মাথা বোতামের ন্যায় গোলাকার এবং ধাতু ঘষার যন্ত্র উখা বা রেতির ন্যায় নিশানা সমেত বেশ সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা। আক্রান্ত হাড়ের স্থানে এটা স্থাপন করুন এবং এটাকে আপনার আঙ্গুলের মাঝে ঘুরিয়ে হাতের সাহায্যে কিছুটা নিচের দিকে চাপতে থাকুন, যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছেন যে, সবটুকু আক্রান্ত হাড় চেঁছে ফেলা হয়েছে। এমনটি কয়েকবার করার পর রক্তক্ষরণ রোধ করে এমন প্রতিষেধক দিয়ে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং বা পট্টি বেঁধে দেন। ক্ষতস্থান যদি সেরে উঠতে থাকে এবং সেখানে মাংস গজাতে শুরু করে এবং ক্ষত থেকে পুঁজ পড়া বন্ধ হয়, এমনকি চল্লিশ দিন পার হওয়ার পরেও যদি সেগুলোর কোনো দেখা না মেলে এবং সেখানে কোনো ধরনের ফোলা বা কিছু বের হওয়া দৃশ্যমান না হয়, তবে আপনি ধরে নিতে পারেন যে, এটা পুরোপুরি সেরে গেছে।"
"নেতৃস্থানীয় পণ্ডিত হিসেবে আজও আয-যাহরাবী স্বমহিমায় ভাস্কর, যিনি ব্যবচ্ছেদ বিদ্যার জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সার্জারিকে বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র একটি শাখায় রূপান্তর করেছেন। বিভিন্ন যন্ত্রকে তিনি যে অভিনব ও সৃজনশীল কায়দায় চিত্রায়িত ও অঙ্কন করতেন, তা আজও তার অবদানকে জীবন্ত রেখেছে। আর যারাই তার পরে এসেছে, তাদের কর্মে তিনি বজায় রেখেছেন তার চলমান প্রভাব।" - এল, লুকল্যারক, ১৯শ শতাব্দির ফরাসি চিকিৎসাশাস্ত্রীয় ইতিহাসবেত্তা
মূত্রনালীর পাথর অপসারণে তার গবেষণালব্দ ফলাফল বিবৃত হয়েছে বহু পাতা জুড়ে। আয-যাহরাবী মূত্রনালীর এসব পাথর চূর্ণ করার জন্য 'আল-মিশ'আব' (ড্রিল) নামের একটি যন্ত্র প্রস্তুত করেন। তিনি বলেন, "ত্রিকোণাকার ধারালো প্রান্তবিশিষ্ট ইস্পাতের একটি রড নেন ... এবং পাথরের সমান আকারের সুতা এটার সাথে বাঁধুন, যেন এটা পিছনে না যায়। আলতোভাবে এটা প্রবেশ করাতে থাকুন, যতক্ষণ না পাথরের নাগাল পাচ্ছে, অতঃপর ছিদ্র করতে এটাকে ঘুরাতে থাকুন... তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্রাব বেরিয়ে আসবে, বাহির থেকে পাথরের উপরের চাপ প্রয়োগ করুন এবং নিজের হাত দিয়ে তা উপড়ে ফেলুন, তখন সেগুলো চূর্ণ হবে এবং প্রস্রাবসহ বেরিয়ে আসবে। যদি সফল না হন, তবে কেটে ফেলতে পারেন।"
আয-যাহরাবীর গ্রন্থের সাম্প্রতিককালের অনুবাদক জেফরি লুইস ও মার্টিন স্পিংক এই যন্ত্রের মৌলিকত্ব আলোচনা করতে গিয়ে এভাবে মন্তব্য করেন, "আধুনিক যুগের বহু শতাব্দি আগেই আবুলকাসিসের এই যন্ত্র তো প্রকৃত প্রস্তাবে lithotripter (মূত্রনালীর পাথর চূর্ণবিচূর্ণকারী যন্ত্র), অথচ বিষয়টি অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে, দুর্ভাগ্যক্রমে আধুনিক যুগের প্রখ্যাত সার্জন ফ্রাংকো ও প্যারে এবং যৌনাঙ্গ-মূত্রনালী সার্জারির ডিন হিসেবে খ্যাত প্যারেরা কোমিথি পর্যন্ত বিষয়টি একবারের জন্য উল্লেখও করেননি।"
১২শ শতাব্দির সেভিলের চিকিৎসক ইবনে যুহর ইস্পাত রডের শেষপ্রান্তে হীরা সংযুক্ত করে এ যন্ত্রকে আরও কার্যকর করেন। ড্রিল বা ছিদ্রকরণ যন্ত্রের পাশাপাশি আয-যাহরাবী cystolithotomy (মূত্রাশয় থেকে পাথর অপসারণ)-এর জন্য একটি ছুরিও প্রস্তুত করেছিলেন।
আয-যাহরাবীর আলোচিত অন্যান্য যন্ত্রের মাঝে বিভিন্ন আকার ও আকৃতির cauterization বা ছেঁকা দিয়ে ক্ষত নিরাময় যন্ত্র, scalpels (হালকা ছুরি): বিভিন্ন ধরনের ছেদন কাজে ব্যবহৃত খুবই ধারালো ছুরি, hooks (হুক, বড়শির ন্যায়): বেশ ধারালো বা ভোঁতা বৈশিষ্ট্যের অর্ধবৃত্তাকার প্রান্তবিশিষ্ট এ যন্ত্র আজও ব্যবহৃত হয় এবং এভাবেই এটা পরিচিত (ভোঁতা হুক রক্তের পিও পরিষ্কারের জন্য, ধারালো হুক সামান্য পরিমাণ টিস্যু ধরে রাখা ও উঠানোর কাজে লাগে; এতে টিস্যুর নির্যাস নেয়া এবং ক্ষতের প্রান্ত গুটিয়ে নেয়া যায়); forceps (চিমটা): বিচ্ছিন্ন করা, টেনে তোলা ও টিস্যু ধরে রাখার ন্যায় চিকিৎসা অপারেশনে দু' হাতলবিশিষ্ট এ ধাতব যন্ত্র ব্যবহৃত হয়; (crushing forceps চূর্ণকারী এই চিমটার দুটো চোয়াল মূত্রাশয়ের পাথর চূর্ণবিচূর্ণ ও অপসারণের কাজে লাগে এবং delivery forceps প্রসব কাজে সহায়ক এ চিমটাতে একটি অর্ধবৃত্তাকার প্রান্ত এমনভাবে যুক্ত থাকে, যা মায়ের গর্ভ থেকে ভ্রূণ অপসারণে বেশ কার্যকর এবং এ যন্ত্র আজও ব্যবহৃত হয়)।
মুসলিম সভ্যতার এসব সার্জারি যন্ত্র মামুলি ও সাদামাটা এ ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিরোধী, বরং আজকের দিনে আমাদের ব্যবহৃত যন্ত্রের সাথে রয়েছে এগুলোর অবাক করা সাদৃশ্য।
চিকিৎসা উপকরণ সার্জারি যন্ত্রের নিপুণতা আজকের দিনেও সমানভাবে কার্যকর জীবন রক্ষাকারী যন্ত্র
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: ২'শরও অধিক যন্ত্র নির্মাণ, যার অধিকাংশই আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে
স্থান: কর্ডোবা, স্পেন তারিখ: ১০ম থেকে ১১শ শতাব্দি আবিষ্কারক: আয-যাহরাবী, সার্জন
Scalpels (হালকা ছুরি) ও ছুরি, saw (অপারেশনে ব্যবহৃত করাত) ও scraper (চাঁছনি), ড্রিল বা তুরপুন ও forceps (চিমটা)। সার্জারি যন্ত্রে বিগত হাজার বছরে আশ্চর্যজনকভাবে বেশ সামান্যই বদলেছে। মুসলিম সভ্যতার সোনালি যুগে স্পেনে বসবাসরত সার্জন ও পণ্ডিত আয-যাহরাবী যেসব নথিপত্র রেখে গেছেন, সেগুলো এটা প্রদর্শন করে যে, তিনি দু'শরও বেশি চিকিৎসা উপকরণ নির্মাণ ও ব্যবহার করেছিলেন, যার অধিকাংশই আমরা আজকের দিনেও ব্যবহার করছি।
পশ্চিমে আবুলকাসিস নামে পরিচিত আয-যাহরাবী ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবাতে জন্ম নেন। স্বনামধন্য এই চিকিৎসক তার চিকিৎসা জীবনে শতাধিক অপারেশন ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি চিকিৎসার বহু নতুন নিয়ম ও কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন, যা তার রোগীদের প্রত্যাশাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আয-যাহরাবী তার ও তার সহকর্মীদের কাজের চাক্ষুষ বিবরণসমূহ তার "আত-তাসরীফ” নামের ৩০ খণ্ডের সুবিশাল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন, যেখানে চিকিৎসার বিভিন্ন দশা, দন্ত্য চিকিৎসা ও সার্জারির নানা কলা-কৌশল নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। খনিজ ও ভেষজ উপাদান, এমনকি প্রাণিজ দ্রব্য ব্যবহার করে কীভাবে প্রতিষেধক ঔষধ প্রস্তুত করতে হয়, সে ব্যাপারেও তিনি পর্যাপ্ত বিবরণ তুলে ধরেছেন।
এই গ্রন্থে প্রথমবারের মতো সার্জারি যন্ত্রের চিত্রায়ন, সেগুলোর গঠনশৈলীর নকশা এবং প্রতিটি যন্ত্র কীভাবে ও কখন ব্যবহার করতে হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আজকের দিনেও সার্জারি বেশ বিপজ্জনক ও কষ্টসাধ্য কাজ, তথাপি উপযুক্ত যন্ত্রের সহায়তায় হাড়ের রোগ, টিউমার, মূত্রশয়ের পাথর, বিভিন্ন ক্ষতে আক্রান্ত রোগীদের যন্ত্রণা উপশম এবং শিশুজন্মে সহায়তার মতো কাজগুলো সাফল্যের সাথে সম্পাদন করা যায়।
আয-যাহরাবীর গ্রন্থে Scalpels (হালকা ছুরি), ধারালো ও ভোঁতা হুক, saw (অপারেশনে ব্যবহৃত করাত) এবং scraper (চাঁছনি)-এর মতো যন্ত্রের হাতে আঁকা নকশা রয়েছে, যার অধিকাংশই আমাদের নিকট সুপরিচিত এবং অন্যগুলো আজ আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ১২শ শতাব্দিতে ইবনে যুহর নামের সেভিল নিবাসী এক ডাক্তার আয-যাহরাবীর একটি যন্ত্রে হীরার ডগা যুক্ত করে সেটাকে আরও উন্নত ও কার্যক্ষম করেছিলেন।
স্থানচ্যুত কাঁধ ঠিক করা, সরে যাওয়া হাড় যথাস্থানে বহাল রাখতে প্লাস্টারের ছাঁচের ব্যবহার, নকল দাঁত দিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের প্রতিস্থাপন এবং ক্যান্সারের মতো রোগের চিকিৎসার চেষ্টাসহ বহু বিষয় আয-যাহরাবী তার "আত-তাসরীফ" গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ঝুলি তাকে তার রোগীদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াতে বিপুলভাবে সহায়তা করেছিল।
অল্পতেই উত্তেজিত হন, এমন রোগীদের স্বাভাবিক রাখার জন্য সংবেদনশীল প্রকৃতির একটি ছুরি নির্মাণ করেন, যাতে ব্লেড লুকানো ছিল।
রোগীর শয্যাপাশের রীতিনীতি এবং চিকিৎসাতে উদ্ভাবনকুশলের প্রয়োগ তাকে তৎকালীন স্পেনের মুসলিম শাসকের রাজকীয় চিকিৎসকে পরিণত করেছিল।
সার্জারির পর রোগীর দেহের অভ্যন্তরে সেলাইয়ের জন্য সুনিপুণভাবে catgut (প্রাকৃতিক ফাইবার বা তন্তু থেকে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের কর্ড বা তন্ত্রী)-এর ব্যবহার আয-যাহরাবীর অন্যতম আরেকটি স্মরণীয় উদ্ভাবন – যা সার্জনগণ আজও ব্যবহার করেন। এটা ছাড়াও আয-যাহরাবীর প্রস্তাবিত বহু প্রস্তাবনা আজকের দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞান যেভাবে কাজ করে, তার সাথে নিবিড় সাদৃশ্য বহন করে।
হাসপাতাল, চিকিৎসা কৌশল এবং সার্জারি – এসবের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিজের শিকড়কে অতীতের অগণিত সূত্রের সাথে আটকে রেখেছে। প্রাথমিক দিকের মুসলিম সমাজে বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যা সার্জারি, হাসপাতাল এবং প্রাচীন জ্ঞান ও নয়া গবেষণার ভিত্তিতে প্রাপ্ত ব্যাপক ঔষধ সরবরাহ আমাদের দিয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোর দেখা।
ক্রিমোনার জেরার্ড যখন আয-যাহরাবীর "আত-তাসরীফ"-এর লাতিন অনুবাদ করেন, তখন থেকেই এই মুসলিম সার্জনের উদ্ভাবন ও গবেষণা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে এবং তা রেনেসাঁর সময় পর্যন্ত চিকিৎসা অনুশীলনে ব্যাপক প্রভাব রাখতে সমর্থ হয়। মুসলিম সভ্যতার অন্যান্য চিকিৎসা পুস্তকের সাথে এটা বহু শতাব্দির ধরে ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে ম্যানুয়েল গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
📄 সার্জারি
উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছা আধুনিক সার্জারি বস্তুত কয়েক শতাব্দির উদ্ভাবনকুশলের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যা সম্ভব হয়েছে জীবন বাঁচাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একদল আত্মনিয়োগকারী মানুষের বদৌলতে। জীবন বাঁচানোর এই নৈতিক দাবী এক হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ স্পেনের মুসলিমদের অন্তরে গেঁথে ছিল এবং সেখানের মুসলিমরা তিন ধরনের সার্জারি চর্চা করতো: রক্তনালী, সাধারণ ও অস্থিবিষয়ক।
ইসলামী সভ্যতা যখন তার উৎকর্ষের চরমে পৌঁছায়, তখন স্পেনের কর্ডোবাতে বাস করতেন সর্বাধিক পরিচিত মুসলিম সার্জনদের একজন। আয-যাহরাবী বা আবুলকাসিস তার কাছে আসা প্রতিটি রোগীর বিষয় দক্ষতা ও উদ্ভাবনকুশলের সাথে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন এবং যথাসম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেন। এ ব্যাপারে তিনি এতটাই সৃজনশীলতার পরিচয় দেন যে, তৎকালে বিশিষ্ট সার্জন হিসেবে তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি আন্দালুসের শাসক আল-মানসূরের রাজকীয় চিকিৎসকে পরিণত হন।
নয়া সব কৌশল, দু'শরও বেশি সার্জারি উপকরণ উদ্ভাবন এবং এর পাশাপাশি দাঁত, ঔষধ ও ওই সময়ের সার্জারি বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ প্রদানের মাধ্যমে তিনি সার্জারিতে নিয়ে আসেন বৈপ্লবিক উপাখ্যান। প্রতিটি চিকিৎসা অনুশীলনের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে গুরুত্বারোপে মাধ্যমে তার রচিত "আত-তাসরীফ” ব্যবহারিক চিকিৎসাশাস্ত্রীয় নিয়মনীতির ভিত দাঁড় করায়।
বহু যন্ত্র আয-যাহরাবী প্রথম উদ্ভাবন করেন বিধায় তার নামের সাথে অনেকগুলো 'প্রথম' তকমা জুড়ে আছে এবং তার জীবন-বৃত্তান্তও বেশ উপভোগ্য। অভ্যন্তরীণ সেলাইয়ে তিনি ক্যাটগাট (catgut)-এর প্রচলন ঘটান, যা আজকের দিনে নিতান্ত সাধারণ থেকে শুরু করে জটিল, সব ধরনের সার্জারিতে সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। ক্যাটগাট (catgut) একমাত্র প্রাকৃতিক বস্তু, যা নিমেষেই দেহে মিশে যায় এবং দেহও সেটা ভালভাবে গ্রহণ করে।
সার্জারিতে ক্যাটগাট (catgut)-এর প্রচলনের সূত্রপাত আয-যাহরাবীর হাত ধরে হলেও আর-রাযীই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সেলাইয়ের সুতাতে প্রাণিজ অস্ত্র ব্যবহার করেন। সার্জারি কাজে আয-যাহরাবী সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের স্ট্রিং বা তারের পাকানো তত্ত্বও ব্যবহার করতেন।
প্রতিটি চিকিৎসা অনুশীলনে উদ্ভাবনকুশলের প্রয়োগ ঘটিয়ে চিকিৎসা পদ্ধতিতে তিনি বৈপ্লবিক ছোঁয়া নিয়ে আসেন, যেমন: ক্ষয় বা পড়ে যাওয়া দাঁতের বেলায় হাড়ের প্রতিস্থাপন প্রয়োগ; সোনা বা রুপার পাত্র দ্বারা নড়ে যাওয়া দাঁত কীভাবে সুস্থ দাঁতের সাথে সংযুক্ত করতে হবে - তার বিবরণ প্রদান; অসমভাবে ঝুলে যাওয়া নারীদের স্তন স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে সার্জারি চিকিৎসা দেয়া; রক্তপাত বন্ধে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তুলার ব্যবহার; শ্বাসনালীর অস্ত্রোপচার, সরে যাওয়া হাড় যথাস্থানে বহাল রাখতে প্লাস্টারের ছাঁচের ব্যবহার এবং মূত্রনালীর পাথর অপসারণে মূত্রনালীর পথ দিয়ে সূক্ষ্ম ড্রিল বা ছিদ্রকরণ যন্ত্র অনুপ্রবেশের পদ্ধতি চালু করা।
নিজের বানানো যন্ত্র দ্বারা চূর্ণ-বিচূর্ণকরণের মাধ্যমে কীভাবে মূত্রাশয়ের পাথর অপসারণ করতে হয়, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। নাকের ফোড়া অপসারণের ন্যায় সাধারণ সার্জারি বিবরণ প্রদানের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্ভাবিত বিশেষ চিমটার সাহায্যে মৃত ভ্রূণ অপসারণের ন্যায় জটিল বিষয়ও তার আলোচনা থেকে বাদ পড়েনি। ব্যথা নাশের জন্য চামড়াকে ছেঁকা দেয়া এবং যথাস্থান থেকে বিচ্যুত হাড়কে স্বাভাবিক স্থানে আনার মতো বিষয়ও তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।
এতসব উদ্ভাবন সত্ত্বেও রোগীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা তিনি বেমালুম ভুলে যাননি, বরং পুঁজযুক্ত ফোড়া উন্মুক্ত করতে তিনি তার সার্জারি অপারেশনের জন্য লুকানো ছুরিযুক্ত বিশেষ ধরনের যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, এতে করে তার রোগীরা অযথা ভয় থেকে নির্ভার থাকতো। টনসিল অপসারণে তিনি জিহ্বাকে ধরে রাখার জন্য জিহ্বাকে চাপ দেয়, এমন যন্ত্র ব্যবহার করেন এবং স্ফীত টনসিলকে হুকের সাহায্যে ধরে রেখে কাঁচির মতো যন্ত্রের সাহায্যে কেটে ফেলতেন। যন্ত্রটিতে আড়াআড়িভাবে যুক্ত ব্লেড ছিল, যা লালাগ্রন্থিকে কেটে দিতো এবং কণ্ঠনালী থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য এটা ধরে রাখতো, যেন রোগী শ্বাসরোধ অনুভব না করে।
ঝুঁকিপূর্ণ এবং অত্যধিক ব্যথাদায়ক অপারেশন সম্পাদনে আয-যাহরাবী সচেতন ও মানবিক উভয়ভাবেই অনাগ্রহী ছিলেন, কেননা এগুলো রোগীদের যে কী পরিমাণ যন্ত্রণার সম্মুখীন করে, তিনি তা ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। সার্জন ও রোগীর সম্পর্ক কেমন হবে, এটা ছিল সে ব্যাপারে এক অভূতপূর্ব অর্জন।
আয-যাহরাবীর বদৌলতে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পুস্তকে প্রথমবারের মতো নারীদের মূত্রাশয়ে থেকে কীভাবে পাথর সরাতে হয়, তার উপর স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিপিবদ্ধ হয়, যা তার সার্জারি বিষয়ক গ্রন্থের ৬১-তম অধ্যায়। যে ৩০-টি খণ্ডের সমন্বয়ে "আত-তাসরীফ" গঠিত, সেখানে সার্জারি কেবল একটি অংশ মাত্র, যা থেকে খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, কী পরিমাণ কাজ তিনি সেখানে জমা করেছেন।
পুরুষের মূত্রাশয় থেকে পাথর অপসারণে তিনি তার নিজস্ব পদ্ধতি বর্ণনা করেন, যা হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর লিখিত "সুশ্রুত সংহিতা” গ্রন্থে বর্ণিত পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য পরিমার্জনের ফসল। মূত্রথলিতে যেন কোনো ধরনের ফুটো বা ছিদ্রের সৃষ্টি না হয়, সেজন্য ছেদক বা ছিত্তির অভ্যন্তরীণ অংশ আবশ্যিকভাবে তার বাহিরের অংশ থেকে ছোট হবে, এ ব্যাপারে আর-রাযী ও আয-যাহরাবী উভয়ে বেশ জোর দিয়েছেন।
মূত্রাশয়ের পাথর টেনে বের না করে চিমটার সাহায্যে বের করতে হবে, যদি পাথর বড় হয়, তবে তা ভেঙে ফেলতে হবে এবং একটু একটু করে বের করে আনতে হবে। টিস্যুর ক্ষতি ও মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত এড়ানো এবং নতুন করে মূত্রাশয়ে ফিস্টুলার আবির্ভাব যাতে না হয়, সে ব্যাপারে তাদের সচেতনতার মাত্রা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।
এক হাজার বছর পূর্বে হাসপাতালে রোগীরা ঠিক সেভাবেই স্বাস্থ্য সেবা পেতেন, যেভাবে তারা আজ পাচ্ছেন।
আয-যাহরাবী আরও বলেন যে, প্রতিটি পাথর টুকরোকে সরাতে হবে, কেননা মূত্রাশয়ে একটি টুকরো থাকার মানেই হলো, তা আবার আকারে বড় হবে। আজকের দিনেও এই উপদেশ বেশ জোরের সাথে দেয়া হয়।
"যখনই সার্জনরা ছুরি হাতে নেবে, অত্যধিক সতর্ক হওয়াটা তাদের জন্য আবশ্যক! কেননা তাদের সূক্ষ্ম ছেদন কার্য জীবনরূপ আসামীকে প্রতিনিয়ত ভয়ে আঁতকে দেয়।" - এমিলি ডিকিনসন, মার্কিন কবি
গাইনি বা প্রসূতিবিদ্যাতে তৎকালীন অন্যসব মুসলিম সার্জনের সাথে তার কাজও ছিল পথিকৃতের ন্যায়। অকাল গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসব পরবর্তী করণীয় বিষয়ে তিনি ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিতেন। যোনিপথ ফাঁক রাখে, এমন যন্ত্রও তিনি তৈরি করেন এবং সেটার প্রচলন ঘটান।
মুসলিম বিশ্বে এমন বহু ডাক্তার ও সার্জন ছিলেন, যারা বহু যুগান্তকারী কাজের নায়ক ও স্বপ্নদ্রষ্টা, যেমন: বর্তমান উজবেকিস্তানে জন্ম নেয়া ১১শ শতাব্দির ইবনে সীনা। তিনি তার "আল-কানুন ফীত তীব' গ্রন্থে ঔষধের এক বিস্তৃত ফিরিস্তি দেন এবং ইবনে সীনার হাড়ের জখম চিকিৎসা অধ্যায়ে আপনি এ ব্যাপারে আরও তথ্য পাবেন।
ইবনে সীনার মতানুসারে, ক্যান্সার (আরবীতে السَّرَطَانُ - আস-সারাতান) এক ধরনের শীতল টিউমার, যা প্রদাহ বা জ্বালা সৃষ্টি করে না এবং প্রথমদিকে ব্যথাহীন থাকে। বিশেষ কিছু ধরনে ব্যথা থাকে এবং উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছালে তা অনারোগ্য ব্যাধিতে রূপ নেয়। তিনি বলেন, সামুদ্রিক কাঁকড়ার পায়ের প্রসারণের ন্যায় ক্যান্সার কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এখান থেকেই এর আরবী নামকরণ হয় (আরবী سَرَطَانٌ দ্বারা কাঁকড়াও বোঝায়)। অভ্যন্তরীণ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর অজান্তেই বেড়ে উঠে এবং ব্যথা থাকা সত্ত্বেও রোগী এটা নিয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। 'সীমাবদ্ধ ক্যান্সার' হলো ক্যান্সারের এমন এক ধরন যেখানে সার্জনের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকে। এসব ক্ষেত্রে কর্তন প্রক্রিয়াকে বেশ নিখুঁত হতে হয়, যেন টিউমারের সবটুকু অংশ বেরিয়ে আসে। তথাপি এসব ক্ষেত্রে সার্জারিই শেষ কথা নয়, কারণ ক্যান্সার আবার ফিরে আসতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ইবনে সীনা নারীদের স্তন ব্যবচ্ছেদের বিপক্ষে উপদেশ দিয়ে থাকেন, কেননা এটা রোগের বিস্তৃতির পথ সুগম করে। বরং তিনি কপার বা লেড অক্সাইড ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন, এগুলো ক্যান্সার নিরাময়ে অক্ষম হলেও রোগের বিস্তৃতি রোধে বেশ কার্যকর।
আয-যাহরাবীর ন্যায় ইবনে সীনা বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। মূত্রাশয়ের পাথরের কারণে মূত্রত্যাগে অক্ষম হওয়ার ব্যাপারে তিনি এভাবে মন্তব্য করেন, "রোগী তার পিঠের উপর ভর দিয়ে শুয়ে থাকলে তার পাছার একাংশ উঁচু করে তাকে ঝাঁকানো হবে, এতে করে মূত্রনালীর পথ থেকে পাথর সরে গিয়ে ... প্রস্রাব বেরিয়ে আসবে; মলদ্বারে আঙ্গুল প্রবেশ করানো সম্ভবত পাথর সরানোর সহজ একটি পন্থা হবে ... এটা কাজ না করলে catheter (মূত্রনিষ্কাশক নল) দিয়ে পাথর সরানো যেতে পারে ... এটা প্রবেশ করানো কঠিন কাজ, তাই তা প্রবেশ করানোর জন্য সজোরে ধাক্কা দেয়া যাবে না।” পশ্চাদদেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী মূত্রাশয়ের পাথর অপসারণে আধুনিক মূত্ররোগ বিশেষজ্ঞগণ যে পন্থা অবলম্বন করেন, এটা তারই অনুরূপ। তারা এটা catheter (মূত্রনিষ্কাশক নল) বা এন্ডোস্কপির মাধ্যমে পিছনে প্রবেশ করান।
১৩শ শতাব্দির সিরীয় চিকিৎসক ইবনুল কুফের মতে, সার্জারির মাধ্যমে মূত্রাশয়ের ছোট পাথর অপসারণের চেয়ে বড় পাথর অপসারণ অধিকতর সহজ, কেননা বড় পাথরগুলো হয় মূত্রনালীতে আটকে থাকবে, নয়তো মূত্রাশয়ের গহ্বরে থাকবে এবং সেখানে খুব সহজেই তাদের উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
এসব কিছু এটাই প্রমাণ করে যে, এক হাজার বছর পূর্বে হাসপাতালগুলোতে অত্যন্ত যত্নের সাথে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। বর্তমানের মতো, কতজন লোক সেরে উঠেছেন, তার পরিসংখ্যান হয়তো আমাদের কাছে নেই, তবে ওই সময়ের মহান সার্জনদের লিখে যাওয়া অঢেল নোট আমাদের সামনে রয়েছে। চিকিৎসা অনুশীলন ও গবেষণার এসব নোট সার্জারি ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। সবার কল্যাণের জন্য নিবেদিত এসব অবদান একবিংশ শতাব্দির মানুষদেরও স্পর্শ করেছে।
📄 রক্ত সঞ্চালন
প্রাচীন গ্রিকরা মনে করতো, শিরার মাধ্যমে খাদ্য পাকস্থলি থেকে মলদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত অস্ত্রে পরিপাক হয়ে লিভার বা যকৃতে পৌঁছায় এবং এই লিভারই রক্তের উৎপত্তিস্থল। হৃদপিণ্ডে যাত্রা শুরুর পূর্বে রক্ত 'প্রাকৃতিক শক্তি' দ্বারা লিভারে পূর্ণ হয়।
দ্বিতীয় শতাব্দিতে গ্রিক চিকিৎসক ও পণ্ডিত গ্যালেন এ ব্যাপারে আরও গবেষণা করেন। তিনি বলেন, রক্ত হৃদপিণ্ডের ডান পাশে পৌঁছে অদৃশ্য সূক্ষ্মরন্ধ্র বা ছিদ্রের সাহায্যে হৃদপিণ্ডের প্রাচীর ভেদ করে হৃদপিণ্ডের বাম পাশে পৌঁছায়। এখানে এসে রক্ত বাতাসের সাথে মিশে শক্তি উৎপন্ন করে, এরপর তা সারা দেহে বণ্টিত হয়।
১৭শ শতাব্দির ইউরোপে রক্ত সঞ্চালন এবং হৃদপিণ্ডের কার্যপ্রণালী নিয়ে উইলিয়াম হার্ভের যুগান্তকারী গবেষণার আগ পর্যন্ত শতাব্দির পর শতাব্দি এই ব্যাখ্যা সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। হার্ভে যুক্তি দেখান যে, হৃদপিণ্ড [রক্ত] সঞ্চালন ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল। এর মাধ্যমে তিনি আমাদের দেহে রক্তের পরিভ্রমণ ক্রিয়া ব্যাখ্যায় সফল হন। এই আবিষ্কার তাকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি।
কিন্তু ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে গুরুত্বপূর্ণ এক পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় এবং মিশরীয় চিকিৎসক ড. মুহিউদ্দীন আত-তাতাবী তা দুনিয়ার কাছে তুলে ধরেন। এই আবিষ্কার হার্ভের বহুকাল পূর্বে দেয়া পালমোনারি বা ফুসফুসীয় সঞ্চালনের প্রথম বর্ণনা দুনিয়াবাসীর সামনে উন্মোচন করে।
"শারহু তাশরীহ আল-কানুন লি ইবনে সীনা" (ইবনে সীনার আল-কানুনের ব্যাখ্যা) নামের এই পাণ্ডুলিপি ১২১০ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কে জন্ম নেয়া মুসলিম পণ্ডিত ইবনে আন-নাফীস কর্তৃক রচিত, যিনি বিখ্যাত আন-নূরী হাসপাতাল থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। 'স্নাতক' শেষ করলে মিশরের সুলতান তাকে সালাউদ্দীনের প্রতিষ্ঠিত নাসিরী হাসপাতালে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের জন্য কায়রোতে আমন্ত্রণ জানান।
চিকিৎসক এবং আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যস্ত কর্মজীবন পার করার পাশাপাশি ইবনে আন-নাফীস বিভিন্ন বিষয়ের উপর গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে "ইবনে সীনার আল-কানুনের ব্যাখ্যা” অন্যতম।
আবিসিনা নামে পরিচিত ইবনে সীনা বহুবিদ্যায় পারদর্শী একজন পণ্ডিত ছিলেন, যিনি দর্শন, আইন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে চরম উৎকর্ষ হাসিল করেছিলেন। "ইবনে সীনার আল-কানুনের ব্যাখ্যা" নামে ইবনে আন-নাফীস যে গ্রন্থ রচনা করেন, সেটা তার নিজস্ব ক্ষেত্রে ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ গ্রন্থে ইবনে আন-নাফীস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালমোনারি বা ফুসফুসীয় সঞ্চালনের বিবরণ দেন, হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করেন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের বাহির থেকে আগত বাতাসের সংস্পর্শে এসে রক্ত ফুসফুসে পরিশোধিত হয়, এ ব্যাপারে তিনি বেশ জোর দেন।
রক্তের ফুসফুসীয় সঞ্চালনের ব্যাখ্যায় ইবনে আন-নাফীস বলেন, এই ব্যবস্থা হৃদপিণ্ডের এক প্রকোষ্ঠ থেকে ফুসফুসে রক্তের চলাচল এবং এরপর হৃদপিণ্ডের ভিন্ন প্রকোষ্ঠে রক্তের পুনপ্রবাহের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তার মতে, অপরিহার্য শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আগত ফুসফুসীয় বাতাস দ্বারা রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং ধমনীর মাধ্যমে তা পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে। তার উদ্ভাবন হচ্ছে: এটা বলা যে, হৃদপিণ্ডের ডান নিলয় (right ventricle) থেকে আগত শিরাস্থ রক্ত বাম নিলয়ে প্রবেশের পূর্বে সেটাকে ফুসফুস অতিক্রম করতে হয় এবং এই পর্যায়ে এটা ধমনীতে ধমনীবাহিত রক্ত হিসেবে প্রবেশ করে।
তার ভাষায় বললে, "হৃদপিণ্ডের ডান প্রকোষ্ঠ থেকে রক্তকে অবশ্যই এর বাম প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করতে হবে, কিন্তু এ দুটোর মধ্যে সরাসরি কোনো পথ নেই। হৃদপিণ্ডের পুরু প্রাচীর ছিদ্রযুক্ত নয় এবং কিছু লোকের ধারণা মোতাবেক না এতে কোনো দৃশ্যমান সূক্ষ্ম ছিদ্র আছে, আর না গ্যালেনের চিন্তা অনুযায়ী অদৃশ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র আছে। ডান প্রকোষ্ঠ হতে রক্ত অবশ্যই ফুসফুসীয় ধমনীর মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবাহিত হবে এবং এ প্রবাহের সময় রক্ত তার সারবস্তুগুলোকে ছড়িয়ে দিয়ে বাতাসের সাথে মিশ্রিত হয়ে ফুসফুসীয় শিরা অতিক্রম করে হৃদপিণ্ডের বাম প্রকোষ্ঠে পৌঁছাবে।”
"হৃদপিণ্ডের পুরু প্রাচীর ছিদ্রযুক্ত নয় এবং কিছু লোকের ধারণা মোতাবেক না এতে কোনো দৃশ্যমান সূক্ষ্ম ছিদ্র আছে, আর না গ্যালেনের ভাবনা মোতাবেক রয়েছে কোনো অদৃশ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র।" - ইবনে আন-নাফীস, মুসলিম পণ্ডিত
আধুনিক ভাষায়, এই অনুচ্ছেদের রূপান্তর হবে এমন: বর্জ্যবাহিত দূষিত রক্ত vena cava (ভ্যানাকাভা) নামের মহাশিরার মাধ্যমে ডান অলিন্দে (right atrium) প্রবেশ করে। বর্জ্যবাহিত দূষিত রক্ত দিয়ে পূর্ণ হবার পর ডান অলিন্দ সংকুচিত হয়ে একমুখী কপাটিকা দিয়ে রক্তকে ডান নিলয়ে (right ventricle) পাঠাতে থাকে। ফলে ডান নিলয় পূর্ণ হয়ে সংকুচিত হয় এবং তা রক্তকে ফুসফুসের সাথে সংযুক্ত ফুসফুসীয় ধমনীতে পাঠাতে শুরু করে। এখানে কৈশিক জালিকা (capillaries)-র মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেনের আদান প্রদান ঘটে। রক্ত এখন অক্সিজেনসমৃদ্ধ, যেহেতু তা ফুসফুসীয় শিরাতে প্রবেশ করেছে এবং বাম অলিন্দ হয়ে এ রক্ত হৃদপিণ্ডে পুনরায় ফিরে আসে। বাম অলিন্দ পূর্ণ হয়ে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তকে একমুখী কপাটিকা দিয়ে বাম নিলয়ে পাঠিয়ে দেয়। বাম নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্তকে মহাধমনীতে সজোরে পাঠিয়ে দেয়, যেখান থেকে পুরো দেহে রক্তের পরিভ্রমণের সূচনা ঘটে।
৩০০ বছর পর্যন্ত এ পর্যবেক্ষণ ইউরোপের নিকট পরিচিত ছিল না এবং ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দে বেলুনো শহরের আন্দ্রেয়া আলপাগো কর্তৃক ইবনে আন-নাফীসের কিছু লেখার লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে এ ধারণা ইউরোপে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে, রক্ত সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যাদানের কিছু প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়, যেমন: ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে মাইকেল সার্ভেটাস তার Christianismi Restitutio গ্রন্থে এবং ১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দে রিয়াল্ডো কলোম্বো তার De re Anatomica গ্রন্থে চেষ্টা চালান। অবশেষে, ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার উইলিয়াম হার্ভে এটার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন এবং এর মাধ্যমে তিনি রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার আবিষ্কারকের কৃতিত্ব লাভ করেন। যদিও ইবনে আন-নাফীস ছিলেন 'স্বল্প মাত্রা' বা ফুসফুসীয় সঞ্চালনের পথিকৃৎ।
ইবনে আন-নাফীসের মৃত্যুর ৭০০ বছর পর, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাকে দেয়া হয়।