📄 মৃৎশিল্প
প্রায় হাজার বছর ধরে মুসলিম এলাকাগুলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরামিক এবং মাটির সামগ্রী প্রস্তুত করেছে। শোভাবর্ধক বা অলঙ্কার হিসেবে এগুলোর কেনা-বেচা হতো। রান্নাবান্না, আলোকসজ্জা ও ধোয়া-মোছার মতো গৃহস্থালীর কাজে এগুলোর ছিল ব্যাপক ব্যবহার। এক সহস্রাব্ধ পরে, এই পাত্রগুলো বিভিন্ন ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পুনরুদ্ধার হচ্ছে।
পাত্র নির্মাণ বস্তুত বড় ধরনের বাণিজ্য। ১৪শ শতাব্দির শেষার্ধের ঐতিহাসিক আল-মাকুরিযী বলেন, কায়রোতে "প্রতিদিন যে পরিমাণ ময়লার স্তুপ জমা হতো... তার মূল্যমান কয়েক হাজার দিনারের সমান। লাল পোড়ামাটির পরিত্যক্ত এসব অবশিষ্টাংশের মাঝে দুধ বিক্রেতাগণ তাদের দুধ রাখতো, পনির বিক্রেতাগণ তাদের পনির রাখতো এবং গরিবেরা রাখতো তাদের রেশন, যা তারা রান্নার দোকানে দাঁড়িয়েই খেয়ে নিতো।”
প্রাচ্যের মৃৎশিল্পের কেন্দ্রগুলো ইরাকের বাগদাদ ও সামারাতে বিকাশ লাভ করে। সামারাতে চালানো খননকার্যে দেখা যায় যে, ৮৩৭ থেকে ৮৮৩ খ্রিস্টাব্দব্যাপী খলীফাদের ব্যবহৃত বাসভবনে কাচের মতো চকচকে প্রলেপ দেয়া ও প্রলেপহীন পাত্র, খোদাই ও মোহরাঙ্কিত পাত্র ছিল এবং এগুলো প্রধানত তিন প্রকারের ছিল। প্রথমটি, সাদা রঙবিশিষ্ট এবং কোবাল্টের নীলের উপর ফোটা ফোটা দাগ বা কৃত্রিম ক্যালিগ্রাফির পুনরাবৃত্তিময় নকশা দিয়ে সজ্জিত। দ্বিতীয়টি, ৭ম ও ৮ম শতাব্দির চীনা তাং আমলে পাথরের বাসনপত্র দিয়ে প্রভাবিত দ্বৈত আভার ডোরা কাটা নকশা এবং বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে সজ্জিত। তৃতীয় ধরনের পাত্রের বিশেষ ধরনের দীপ্তি ছিল, যে সজ্জার কারণে এটাকে অনেকটা ধাতব মনে হতো।
অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আজকের দিনের আধুনিক কুমোরের চাকের মতো করে এই পাত্রগুলো তৈরি হতো এবং এরপর সেগুলো শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হতো। এগুলো দুষ্প্রাপ্য বস্তুর সংগ্রাহকদের সংগ্রহ (collectors' items) এবং সৌন্দর্য ও শিল্পের অমূল্য রত্নে পরিণত হয়। কেননা মুসলিমগণ এক্ষেত্রে পূর্ববর্তীদের ছাড়িয়ে যায় এবং মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাকচিক্য, রঙ এবং সজ্জাকরণে ব্যাপক সমৃদ্ধি আনার পাশাপাশি তারা এসবে নিয়ে আসে নতুন ভাবনা ও কৌশলের ছোঁয়া।
মিশরসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোমানরা প্রধানত লালচে রঙের সাথে উজ্জ্বল সবুজ বা হলদে বাদামি রঙের মিহি প্রলেপের পোড়া মাটির বাসনপত্রের বিস্তৃতি ঘটায়। এসবের সাথে সীসা যোগ করে মুসলিমগণ আরও বেশি মসৃণ ও চমৎকার কারুকার্যের নিখুঁত পাত্র তৈরিতে সফল হয়, যা পানীয় রাখার পাত্র হিসেবে বেশ যুৎসই।
আব্বাসী আমলের মৃৎশিল্পীগণ সীসার স্বচ্ছ প্রলেপের এই কৌশল লুফে নেয় এবং এর সাথে টিন-অক্সাইড যোগ করে, যেহেতু তারা অত্যন্ত দামী বৈচিত্রময় চীনা বাসনপত্রের মতো করে সাদা রঙের নিখুঁত পালিশ-সমৃদ্ধ সিরামিক সামগ্রী তৈরির একটা পথ খুঁজছিল। ইরাক ও চীনের কাঁচামাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় কাঁচামালের সঠিক ব্যবহারে পটু মুসলিম মৃৎশিল্পীগণ টিন-অক্সাইডের আস্তরণের প্রচলন ঘটায়। এটা আলোনিরোধক গুণকে উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধির পাশাপাশি বহুল কাঙ্ক্ষিত সাদা রঙের নিখুঁত পালিশের কৌশলটিও তাদের সামনে হাজির করে।
নকশার ক্ষেত্রে তৃপ্ত নয়, এমন মৃৎশিল্পীগণ তাদের উদ্ভাবন শৈলীকে কাজে লাগিয়ে 'সাদার উপর নীল' সজ্জা কৌশল উদ্ভাবন করেন, পরবর্তীতে এগুলো চীনে পুনরায় আমদানী হয়ে সেখানে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং খোদ চীনেই তা ব্যাপক বিস্তৃত হয়। সাদার উপর নীল নকশার বাসনপত্রগুলো আব্বাসী মৃৎশিল্পীগণের গর্বের বস্তু ছিল এবং তারা তাদের বেশিরভাগ কর্মেই নিজেদের নামের স্বাক্ষর সংযুক্ত করে দিতেন। নিজের নামের স্বাক্ষর যুক্ত করে দেয়া এমন এক মৃৎশিল্পী হলেন: আবাওয়াই, যিনি নিজেকে 'সানি' আমিরুল মুমিনীন' হিসেবে তুলে ধরতেন, যেটা বলে দিচ্ছে যে, তিনি খলীফার একজন কারিগর। হস্তশিল্প এবং বিশেষভাবে মৃৎশিল্পের প্রতি খলীফাদের যে উৎসাহ ও আর্থিক আনুকূল্য ছিল, এটা মূলত তারই দৃষ্টান্ত।
৮ম শতাব্দিতে ইরাকে কর্মরত মৃৎশিল্পীগণ 'আল-বারীক আল মা'দিনী' (luster - দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী) নামে পরিচিত এক রহস্যময় কৌশলের বিকাশ ঘটায়। এই প্রক্রিয়াতে বিভিন্ন সামগ্রীতে "অসাধারণ ধাতব ঔজ্জ্বল্য আনয়ন করা যেত, যা কার্যকারিতার দিক দিয়ে অন্যসব মূল্যবান ধাতুর সাথে পাল্লা দেয়ার মতো ছিল; বস্তুত এটা ছিল মাটির বস্তুকে সোনায় বদলে দেয়ার এক কর্মযজ্ঞ” টেলিভিশন উপস্থাপক আমানি যেইন বিবিসি'র What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন।
দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী (luster) বিভিন্ন সামগ্রীতে চকচকে বৈশিষ্ট্য আনার প্রয়োজনীয় উপকরণ সস্তায় ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় সরবরাহে ব্যাপক ভূমিকা রাখে, যেহেতু ইসলাম সোনা ও রুপার তৈরি সামগ্রী ব্যবহারে অনুমোদন দেয় না।
এই প্রক্রিয়াতে মাটির কোনো মাধ্যম যেমন গিরিমাটির সাথে সিলভার বা কপার-অক্সাইড মিশানো হতো, অতঃপর প্রভাবক হিসেবে ভিনেগার বা আঙ্গুরের রস যোগ করা হতো। ৮ম শতাব্দির ইরাকী মৃৎশিল্পীগণ আবিষ্কার করেন যে, তারা যদি মৃৎসামগ্রীর পালিশ করা প্রলেপের উপর এই মিশ্রণ দিয়ে নকশা অঙ্কন করে ওই আর্দ্র পাত্র চুল্লিতে ধোঁয়াময় ও তীব্র আগুনে পোড়ানোর জন্য দ্বিতীয়বার রাখে, তবে সেখানে ধাতব পাতলা আস্তরণ থেকে যায়। ছাইভস্ম ও ধূলো পরিষ্কারের পর সেখান থেকে রংধনুর ন্যায় রঙিন এক আভা বেরিয়ে আসে।
বস্তুত, আগুনে পোড়ানোর সময় কপার ও সিলভার-অক্সাইড পৃথক হয়ে যায় এবং ধাতুর উপরিতলে টিনের প্রলেপ হিসেবে পাতলা আবরণী রেখে আসে। সিলভার সেখানে আবছা হলদে বা সোনালি এবং রুপালি আভা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে কপার সৃষ্টি করে গাঢ় কালো, রক্তিম ও চুনি রঙের আবহ। আলো কী মাত্রায় পড়ছে, তার উপর ভিত্তি করে রংধনুর ন্যায় রঙিন আভার মাত্রা নির্ভর করে। এক-রঙা বা সোনালি, সবুজ, বাদামি, হলুদ ও লাল থেকে শুরু করে প্রায় শত রঙের তরল আভা এই প্রক্রিয়াতে বানানো সম্ভব।
সজ্জিত টাইলসও এই প্রক্রিয়াতেই বানানো হতো। বর্গাকৃতির এই গঠনগুলোর বৈচিত্রময় রঙ ও তাদের সামঞ্জস্যময় বিন্যাস মসজিদ ও প্রাসাদগুলোতে এনে দিতো রাজকীয় জৌলুস।
দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী বাগদাদ হতে গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেইসাথে ৯ম শতাব্দির তিউনিসিয়ার কায়রাওয়ানে শুরু হয় চকচকে টাইলসের উৎপাদন। আরেক শতাব্দি পার হলে এটা পৌঁছে যায় স্পেনে।
কর্ডোবার নিকটে খিলাফতের শহর মাদীনাতুয যাহরার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে বিপুল সংখ্যক মৃৎ-সামগ্রী আবিষ্কৃত হয়, যেগুলোর অঙ্কিত রেখাগুলো বাদামি বর্ণের ম্যাঙ্গানিজ এবং রঙিন পৃষ্ঠতল সবুজ বর্ণের কপারের নকশা দিয়ে তৈরি। কয়েক শতাব্দী পর আন্দালুস তার নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলে, যেমন: মালাগাতে প্রস্তুত হতো সোনালি বর্ণের দীপ্তিময় আভার বাসন এবং 'আল-হামরা' জগের মতো বিশালাকার জগ।
টেলিভিশন উপস্থাপক আমানি যেইন বিবিসি'র What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, "আল-হামরার দৃষ্টিনন্দন এই জগগুলো প্রকৃতপক্ষে তেল ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু খলীফাদের প্রাসাদে এই পাত্রগুলোর নকশা এক অনন্য সুন্দর আভা ধারণ করতো। যারা এগুলো দেখতো, তারা ধরেই নিতো যে, এগুলো নিশ্চিতভাবে কোনো না কোনো মূল্যবান ধাতুর তৈরি।"
মুসলিম মৃৎশিল্প
"চীনা মৃৎশিল্পীদের সাথে সাথে আরব বিশ্বের মৃৎশিল্পীগণ এমনকিছু অনন্য সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত মৃৎসামগ্রী তৈরিতে সম্পৃক্ত ছিলেন, যেগুলো গোটা মধ্যযুগে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। আরবের এসব পণ্য যখন পশ্চিমা খ্রিস্টান এলাকাতে পৌঁছে, তখন সেগুলোর মূল্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং তা বিলাসী সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।"
ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারির লংমার্কেটে পরিচালিত খননকার্যে পাওয়া ইসলামী মৃৎসামগ্রী নিয়ে খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ জন কটারের বিবরণ
সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পাত্রের প্রয়োজন ছিল এবং স্পেনে এ ধরনের পাত্রের মাঝে ক্বাদুস নামের পাত্রটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। পাত্রটি জলচালিত চাকা নাউরোগুলোতে পানি বহনে ব্যবহৃত হতো, এই বিভাগের পানি সরবরাহ অধ্যায়ে এ সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত তথ্য পাবেন। এই সম্প্রতি টিন এটার জায়গা দখলের আগ পর্যন্ত চকচকহীন ব্যবহার্য পাত্র হিসেবে এর কদর ছিল সার্বজনীন এবং এটা ছিল গ্রামীণ মৃৎশিল্পের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
"আরবরা এমন কৌশল উদ্ভাবন করে, যা মাটির পাত্রকে দেয় শিল্পের মর্যাদা।" What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে ঔজ্জ্বলকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিবিসি'র উপস্থাপক আমানি যেইনের মন্তব্য
পানি বহনের প্রয়োজনীয় পাত্র তৈরির সাথে সাথে স্পেনের মুসলিমরা ১২শ শতাব্দির গোড়ার দিকে টাইলস ও আজুলিজসের মাধ্যমে বাইযান্টিন মোজাইকের বাজার দখল করে নেয়। নীল-সাদার এসব চমৎকার টাইলস জ্যামিতিক, লতাগুল্ম ও ক্যালিগ্রাফির নকশা দিয়ে সজ্জিত থাকতো। চকচকে চিত্রযুক্ত চীনা মাটির এসব টাইলস আজও মালাগাতে জনপ্রিয়। আমরা জানি, কোবাল্ট অক্সাইডের নীল আভা দিয়ে সজ্জিত আজুলিজস প্রাচ্য থেকে মালাগাতে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকেই এটা ছড়িয়ে পড়ে মুর্সিয়া হয়ে ১৪শ শতাব্দির শুরুর দিকের খ্রিস্টান স্পেন ও ভ্যালেন্সিয়াতে, অতঃপর তা বার্সেলোনাতে পৌঁছায়।
মঙ্গোল আক্রমণ থেকে পালিয়ে আসা কারিগররা কোনিয়া শহরে জড়ো হয়, যার বদৌলতে মৃৎশিল্পে তুরস্ক পরিণত হয় সমৃদ্ধ এক কেন্দ্রে। ১৪শ শতাব্দির শুরুর দিকের কোনিয়া সালতানাতের পতন আনাতোলিয়ার সিরামিক উৎপাদনে স্থবিরতা নেমে আসে, কিন্তু অটোমান তুর্করা যখন ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে বুসরাকে তাদের রাজধানী বানায়, তখন এই সিরামিক শিল্প এক চমৎকার নবজাগরণ প্রত্যক্ষ করে। সিরামিকের টাইলসে সজ্জিত ভবন নিয়ে শহরটি আবার নতুনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
উৎপাদনের দিক দিয়ে বুসরার চেয়েও ইযনিক শহর অধিক কর্মব্যস্ত ছিল এবং এটাই ছিল এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। ১৪শ শতাব্দির শেষ হতে প্রায় দুই শতাব্দি পর্যন্ত এ শিল্প ব্যাপকহারে বিকশিত হয়। সাধারণ একটি ইযনিক সজ্জা অঙ্কন করা হতো অর্ধতরল কাদামাটির উপর কোবাল্টের নীল, সবুজাভ নীল রঙ ও (কপারের) সবুজের মাঝে এবং অনিন্দ্য সুন্দর টমেটো লাল রঙের মুদ্রা-চিত্র দ্বারা কিনারার অংশ সজ্জিত হতো। আয়তাকার টাইলসগুলো মিলে যে নকশা দাঁড় করায়, তার সবগুলো ছিল লতাগুল্মের পুনরাবৃত্তিময় সাজ এবং প্রথাগতভাবে সেখানে চারটি ফুল থাকতো। চারটি ফুল ছিল: গোলাপ, জেসমিন, লাল রঙের পুষ্পবিশেষ- কার্নেশান এবং টিউলিপ।
মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ (Glaze) এবং দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলীর কারিগরি দক্ষতায় মুসলিম মৃৎশিল্পীগণ দশ দশ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার পাশাপাশি আজকের মৃৎশিল্প ওইসব কারিগরের অবদানের নিকট ব্যাপকভাবে ঋণী। স্পেন ও সিসিলির মৃৎশিল্পীদের থেকে নানা উপাদান ও হরেক রঙের মৃৎসামগ্রী উৎপাদনের নয়া ধরণ ও কৌশল ইউরোপে প্রবেশ করে। টিনের মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের কৌশলটি ৯ম শতাব্দিতে যখন মুসলিমদের মাধ্যমে স্পেনে প্রবেশ করে, তার আগ পর্যন্ত ইউরোপ এ সম্পর্কে একেবারে বেখবর ছিল।
মুসলিম মৃৎশিল্প যে স্পেনের বাহিরেও বিস্তৃত হয়েছিল, সে ব্যাপারে ব্যাপক তথ্য রয়েছে। যেমন, মালাগা শহরের মৃৎসামগ্রী ইংল্যান্ডে পাওয়া যায়, যেখানে ১৩শ শতাব্দীর শেষার্ধ ও ১৪শ শতাব্দি সময়ের ৪৪-টি এবং ১৫শ শতাব্দির আরও ২২-টি দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের মুর আমলের মৃৎসামগ্রী রয়েছে। অতি সম্প্রতি, ক্যান্টারবারির কেন্দ্রস্থ লংমার্কেটে পরিচালিত ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের খননকার্যে ইসলামী আমলের দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ এবং সবুজাভ নীল রঙের বিপুল পরিমাণ মৃৎসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে।
মুসলিম মৃৎশিল্পীদের তৈরি পাত্রগুলো কীভাবে ইংল্যান্ডে আসে, সে সম্পর্কে ক্যান্টারবারি অনুসন্ধানে কর্মরত জন কটার লিখেন, "কিছু পাত্র পবিত্রভূমি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় ক্রুসেডারদের মালপত্রের সাথে ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে ... পবিত্রভূমি বা স্পেনের কম্পোসটেলায় অবস্থিত সেন্ট জেমসের সমাধিমন্দির জিয়ারতের সময় মধ্যযুগীয় তীর্থযাত্রীরা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিশেষ এসব ইসলামী পাত্র সাথে করে নিয়ে আসতো, এটাও সম্ভাব্য আরেকটি কারণ।” কদাচিৎ কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম মৃৎশিল্পীদের তৈরি পাত্রগুলোর ইংল্যান্ডে অনুপ্রবেশ সরাসরি পথে ঘটতো। উদাহরণস্বরূপ, আমরা জানি যে, ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের স্পেন দেশীয় স্ত্রী, কান্তালের ইলিয়েনর রাজকীয় গৃহস্থালীর জন্য মালিক অঞ্চলের চার হাজার পাত্র ক্রয়ের ফরমায়েশ করেন। এখানে মালিক অঞ্চল নিশ্চিতভাবে আন্দালুসের দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের মৃৎসামগ্রী উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র মালাগাকে নির্দেশ করে (মালাগা শহরের আরবী নাম মালিকা)।
লন্ডনের ব্লসম্স ইন নামে পরিচিত স্থানে ১৪শ শতাব্দির একটি দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের বাসন পাওয়া যায়, যা প্রাণবৃক্ষ এবং সেইসাথে কুফি খোদাইকার্য দিয়ে সজ্জিত ছিল। এগুলো ওই সময় আন্দালুস ও উত্তর আফ্রিকাতে বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং এ ধরনের সজ্জা ব্যাপক হারে ইউরোপে নকল হতে থাকে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের কেন্ট শহরের স্যান্ডউইচ পোর্টে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করে, তার হিসাব নথিতে আশ্চর্যজনকভাবে ইংল্যান্ডে এই বাসনের অনুপ্রবেশের বিবরণ পাওয়া যায়। বাসনটি বর্তমানে লন্ডনের গিল্ডহল জাদুঘরে রয়েছে।
আমাদের জন্য রেখে যাওয়া মুসলিম মৃৎশিল্পীদের আরেকটি সুপরিচিত সিরামিক ব্র্যান্ড হচ্ছে: তথাকথিত মায়োলিকা বাসনসামগ্রী। ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনে থাকা মেজরকা ও বালিয়ারিক দ্বীপের সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই সিরামিক ব্র্যান্ডের সূচনার গল্প। জেনোয়া ও ভেনিসের ইতালীয় জাহাজগুলো টিনের মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ দেয়া মৃৎসামগ্রী সংগ্রহ এবং মুরীয় মৃৎশিল্পীদের ভাড়া করতো; বস্তুত এরাই সিসিলিতে মেজরকীয় মৃৎশৈলীর আবির্ভাব ঘটায়। ধীরে ধীরে এটা প্রধান শৈলী হিসেবে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করে এবং পরিণত হয় 'মাজ্যোলিকা' বা 'মায়্যোলিকা' নামে সমধিক পরিচিত শৈলীতে।
আন্দালুস ও মিশরীয় কারিগরদের ব্যবহৃত উৎপাদন ও সজ্জাকরণ কৌশল অবলম্বন করে ১৫শ শতাব্দি হতে মায়্যোলিকা শৈলী পূর্ণতার এক বিস্ময়কর পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ইতালীয় শিল্পীগণ এটাতে নানা বৈচিত্র নিয়ে আসে, যেমন: গুবিও দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী, যা মূলত সবুজাভ হলুদ, স্ট্রবেরির গোলাপি ও রুবির লাল আভার সংমিশ্রণ। এমনকি বর্তমান সময় পর্যন্ত এই মায়্যোলিকা নকশাশৈলী ইতালির সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি মাতিয়ে রেখেছিল।
প্রায় হাজার বছর ধরে মুসলিম এলাকাগুলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরামিক এবং মাটির সামগ্রী প্রস্তুত করেছে। শোভাবর্ধক বা অলঙ্কার হিসেবে এগুলোর কেনা-বেচা হতো। রান্নাবান্না, আলোকসজ্জা ও ধোয়া-মোছার মতো গৃহস্থালীর কাজে এগুলোর ছিল ব্যাপক ব্যবহার। এক সহস্রাব্ধ পরে, এই পাত্রগুলো বিভিন্ন ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পুনরুদ্ধার হচ্ছে।
পাত্র নির্মাণ বস্তুত বড় ধরনের বাণিজ্য। ১৪শ শতাব্দির শেষার্ধের ঐতিহাসিক আল-মাকুরিযী বলেন, কায়রোতে "প্রতিদিন যে পরিমাণ ময়লার স্তুপ জমা হতো... তার মূল্যমান কয়েক হাজার দিনারের সমান। লাল পোড়ামাটির পরিত্যক্ত এসব অবশিষ্টাংশের মাঝে দুধ বিক্রেতাগণ তাদের দুধ রাখতো, পনির বিক্রেতাগণ তাদের পনির রাখতো এবং গরিবেরা রাখতো তাদের রেশন, যা তারা রান্নার দোকানে দাঁড়িয়েই খেয়ে নিতো।”
প্রাচ্যের মৃৎশিল্পের কেন্দ্রগুলো ইরাকের বাগদাদ ও সামারাতে বিকাশ লাভ করে। সামারাতে চালানো খননকার্যে দেখা যায় যে, ৮৩৭ থেকে ৮৮৩ খ্রিস্টাব্দব্যাপী খলীফাদের ব্যবহৃত বাসভবনে কাচের মতো চকচকে প্রলেপ দেয়া ও প্রলেপহীন পাত্র, খোদাই ও মোহরাঙ্কিত পাত্র ছিল এবং এগুলো প্রধানত তিন প্রকারের ছিল। প্রথমটি, সাদা রঙবিশিষ্ট এবং কোবাল্টের নীলের উপর ফোটা ফোটা দাগ বা কৃত্রিম ক্যালিগ্রাফির পুনরাবৃত্তিময় নকশা দিয়ে সজ্জিত। দ্বিতীয়টি, ৭ম ও ৮ম শতাব্দির চীনা তাং আমলে পাথরের বাসনপত্র দিয়ে প্রভাবিত দ্বৈত আভার ডোরা কাটা নকশা এবং বিভিন্ন রঙের সংমিশ্রণে সজ্জিত। তৃতীয় ধরনের পাত্রের বিশেষ ধরনের দীপ্তি ছিল, যে সজ্জার কারণে এটাকে অনেকটা ধাতব মনে হতো।
অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আজকের দিনের আধুনিক কুমোরের চাকের মতো করে এই পাত্রগুলো তৈরি হতো এবং এরপর সেগুলো শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হতো। এগুলো দুষ্প্রাপ্য বস্তুর সংগ্রাহকদের সংগ্রহ (collectors' items) এবং সৌন্দর্য ও শিল্পের অমূল্য রত্নে পরিণত হয়। কেননা মুসলিমগণ এক্ষেত্রে পূর্ববর্তীদের ছাড়িয়ে যায় এবং মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাকচিক্য, রঙ এবং সজ্জাকরণে ব্যাপক সমৃদ্ধি আনার পাশাপাশি তারা এসবে নিয়ে আসে নতুন ভাবনা ও কৌশলের ছোঁয়া।
মিশরসহ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোমানরা প্রধানত লালচে রঙের সাথে উজ্জ্বল সবুজ বা হলদে বাদামি রঙের মিহি প্রলেপের পোড়া মাটির বাসনপত্রের বিস্তৃতি ঘটায়। এসবের সাথে সীসা যোগ করে মুসলিমগণ আরও বেশি মসৃণ ও চমৎকার কারুকার্যের নিখুঁত পাত্র তৈরিতে সফল হয়, যা পানীয় রাখার পাত্র হিসেবে বেশ যুৎসই।
আব্বাসী আমলের মৃৎশিল্পীগণ সীসার স্বচ্ছ প্রলেপের এই কৌশল লুফে নেয় এবং এর সাথে টিন-অক্সাইড যোগ করে, যেহেতু তারা অত্যন্ত দামী বৈচিত্রময় চীনা বাসনপত্রের মতো করে সাদা রঙের নিখুঁত পালিশ-সমৃদ্ধ সিরামিক সামগ্রী তৈরির একটা পথ খুঁজছিল। ইরাক ও চীনের কাঁচামাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় কাঁচামালের সঠিক ব্যবহারে পটু মুসলিম মৃৎশিল্পীগণ টিন-অক্সাইডের আস্তরণের প্রচলন ঘটায়। এটা আলোনিরোধক গুণকে উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধির পাশাপাশি বহুল কাঙ্ক্ষিত সাদা রঙের নিখুঁত পালিশের কৌশলটিও তাদের সামনে হাজির করে।
নকশার ক্ষেত্রে তৃপ্ত নয়, এমন মৃৎশিল্পীগণ তাদের উদ্ভাবন শৈলীকে কাজে লাগিয়ে 'সাদার উপর নীল' সজ্জা কৌশল উদ্ভাবন করেন, পরবর্তীতে এগুলো চীনে পুনরায় আমদানী হয়ে সেখানে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং খোদ চীনেই তা ব্যাপক বিস্তৃত হয়। সাদার উপর নীল নকশার বাসনপত্রগুলো আব্বাসী মৃৎশিল্পীগণের গর্বের বস্তু ছিল এবং তারা তাদের বেশিরভাগ কর্মেই নিজেদের নামের স্বাক্ষর সংযুক্ত করে দিতেন। নিজের নামের স্বাক্ষর যুক্ত করে দেয়া এমন এক মৃৎশিল্পী হলেন: আবাওয়াই, যিনি নিজেকে 'সানি' আমিরুল মুমিনীন' হিসেবে তুলে ধরতেন, যেটা বলে দিচ্ছে যে, তিনি খলীফার একজন কারিগর। হস্তশিল্প এবং বিশেষভাবে মৃৎশিল্পের প্রতি খলীফাদের যে উৎসাহ ও আর্থিক আনুকূল্য ছিল, এটা মূলত তারই দৃষ্টান্ত।
৮ম শতাব্দিতে ইরাকে কর্মরত মৃৎশিল্পীগণ 'আল-বারীক আল মা'দিনী' (luster - দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী) নামে পরিচিত এক রহস্যময় কৌশলের বিকাশ ঘটায়। এই প্রক্রিয়াতে বিভিন্ন সামগ্রীতে "অসাধারণ ধাতব ঔজ্জ্বল্য আনয়ন করা যেত, যা কার্যকারিতার দিক দিয়ে অন্যসব মূল্যবান ধাতুর সাথে পাল্লা দেয়ার মতো ছিল; বস্তুত এটা ছিল মাটির বস্তুকে সোনায় বদলে দেয়ার এক কর্মযজ্ঞ” টেলিভিশন উপস্থাপক আমানি যেইন বিবিসি'র What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন।
দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী (luster) বিভিন্ন সামগ্রীতে চকচকে বৈশিষ্ট্য আনার প্রয়োজনীয় উপকরণ সস্তায় ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় সরবরাহে ব্যাপক ভূমিকা রাখে, যেহেতু ইসলাম সোনা ও রুপার তৈরি সামগ্রী ব্যবহারে অনুমোদন দেয় না।
এই প্রক্রিয়াতে মাটির কোনো মাধ্যম যেমন গিরিমাটির সাথে সিলভার বা কপার-অক্সাইড মিশানো হতো, অতঃপর প্রভাবক হিসেবে ভিনেগার বা আঙ্গুরের রস যোগ করা হতো। ৮ম শতাব্দির ইরাকী মৃৎশিল্পীগণ আবিষ্কার করেন যে, তারা যদি মৃৎসামগ্রীর পালিশ করা প্রলেপের উপর এই মিশ্রণ দিয়ে নকশা অঙ্কন করে ওই আর্দ্র পাত্র চুল্লিতে ধোঁয়াময় ও তীব্র আগুনে পোড়ানোর জন্য দ্বিতীয়বার রাখে, তবে সেখানে ধাতব পাতলা আস্তরণ থেকে যায়। ছাইভস্ম ও ধূলো পরিষ্কারের পর সেখান থেকে রংধনুর ন্যায় রঙিন এক আভা বেরিয়ে আসে।
বস্তুত, আগুনে পোড়ানোর সময় কপার ও সিলভার-অক্সাইড পৃথক হয়ে যায় এবং ধাতুর উপরিতলে টিনের প্রলেপ হিসেবে পাতলা আবরণী রেখে আসে। সিলভার সেখানে আবছা হলদে বা সোনালি এবং রুপালি আভা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে কপার সৃষ্টি করে গাঢ় কালো, রক্তিম ও চুনি রঙের আবহ। আলো কী মাত্রায় পড়ছে, তার উপর ভিত্তি করে রংধনুর ন্যায় রঙিন আভার মাত্রা নির্ভর করে। এক-রঙা বা সোনালি, সবুজ, বাদামি, হলুদ ও লাল থেকে শুরু করে প্রায় শত রঙের তরল আভা এই প্রক্রিয়াতে বানানো সম্ভব।
সজ্জিত টাইলসও এই প্রক্রিয়াতেই বানানো হতো। বর্গাকৃতির এই গঠনগুলোর বৈচিত্রময় রঙ ও তাদের সামঞ্জস্যময় বিন্যাস মসজিদ ও প্রাসাদগুলোতে এনে দিতো রাজকীয় জৌলুস।
দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী বাগদাদ হতে গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেইসাথে ৯ম শতাব্দির তিউনিসিয়ার কায়রাওয়ানে শুরু হয় চকচকে টাইলসের উৎপাদন। আরেক শতাব্দি পার হলে এটা পৌঁছে যায় স্পেনে।
কর্ডোবার নিকটে খিলাফতের শহর মাদীনাতুয যাহরার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে বিপুল সংখ্যক মৃৎ-সামগ্রী আবিষ্কৃত হয়, যেগুলোর অঙ্কিত রেখাগুলো বাদামি বর্ণের ম্যাঙ্গানিজ এবং রঙিন পৃষ্ঠতল সবুজ বর্ণের কপারের নকশা দিয়ে তৈরি। কয়েক শতাব্দী পর আন্দালুস তার নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলে, যেমন: মালাগাতে প্রস্তুত হতো সোনালি বর্ণের দীপ্তিময় আভার বাসন এবং 'আল-হামরা' জগের মতো বিশালাকার জগ।
টেলিভিশন উপস্থাপক আমানি যেইন বিবিসি'র What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, "আল-হামরার দৃষ্টিনন্দন এই জগগুলো প্রকৃতপক্ষে তেল ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু খলীফাদের প্রাসাদে এই পাত্রগুলোর নকশা এক অনন্য সুন্দর আভা ধারণ করতো। যারা এগুলো দেখতো, তারা ধরেই নিতো যে, এগুলো নিশ্চিতভাবে কোনো না কোনো মূল্যবান ধাতুর তৈরি।"
মুসলিম মৃৎশিল্প
"চীনা মৃৎশিল্পীদের সাথে সাথে আরব বিশ্বের মৃৎশিল্পীগণ এমনকিছু অনন্য সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত মৃৎসামগ্রী তৈরিতে সম্পৃক্ত ছিলেন, যেগুলো গোটা মধ্যযুগে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। আরবের এসব পণ্য যখন পশ্চিমা খ্রিস্টান এলাকাতে পৌঁছে, তখন সেগুলোর মূল্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং তা বিলাসী সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।"
ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারির লংমার্কেটে পরিচালিত খননকার্যে পাওয়া ইসলামী মৃৎসামগ্রী নিয়ে খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ জন কটারের বিবরণ
সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পাত্রের প্রয়োজন ছিল এবং স্পেনে এ ধরনের পাত্রের মাঝে ক্বাদুস নামের পাত্রটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। পাত্রটি জলচালিত চাকা নাউরোগুলোতে পানি বহনে ব্যবহৃত হতো, এই বিভাগের পানি সরবরাহ অধ্যায়ে এ সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত তথ্য পাবেন। এই সম্প্রতি টিন এটার জায়গা দখলের আগ পর্যন্ত চকচকহীন ব্যবহার্য পাত্র হিসেবে এর কদর ছিল সার্বজনীন এবং এটা ছিল গ্রামীণ মৃৎশিল্পের অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
"আরবরা এমন কৌশল উদ্ভাবন করে, যা মাটির পাত্রকে দেয় শিল্পের মর্যাদা।" What the Ancients Did for Us: The Islamic World শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে ঔজ্জ্বলকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিবিসি'র উপস্থাপক আমানি যেইনের মন্তব্য
পানি বহনের প্রয়োজনীয় পাত্র তৈরির সাথে সাথে স্পেনের মুসলিমরা ১২শ শতাব্দির গোড়ার দিকে টাইলস ও আজুলিজসের মাধ্যমে বাইযান্টিন মোজাইকের বাজার দখল করে নেয়। নীল-সাদার এসব চমৎকার টাইলস জ্যামিতিক, লতাগুল্ম ও ক্যালিগ্রাফির নকশা দিয়ে সজ্জিত থাকতো। চকচকে চিত্রযুক্ত চীনা মাটির এসব টাইলস আজও মালাগাতে জনপ্রিয়। আমরা জানি, কোবাল্ট অক্সাইডের নীল আভা দিয়ে সজ্জিত আজুলিজস প্রাচ্য থেকে মালাগাতে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকেই এটা ছড়িয়ে পড়ে মুর্সিয়া হয়ে ১৪শ শতাব্দির শুরুর দিকের খ্রিস্টান স্পেন ও ভ্যালেন্সিয়াতে, অতঃপর তা বার্সেলোনাতে পৌঁছায়।
মঙ্গোল আক্রমণ থেকে পালিয়ে আসা কারিগররা কোনিয়া শহরে জড়ো হয়, যার বদৌলতে মৃৎশিল্পে তুরস্ক পরিণত হয় সমৃদ্ধ এক কেন্দ্রে। ১৪শ শতাব্দির শুরুর দিকের কোনিয়া সালতানাতের পতন আনাতোলিয়ার সিরামিক উৎপাদনে স্থবিরতা নেমে আসে, কিন্তু অটোমান তুর্করা যখন ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে বুসরাকে তাদের রাজধানী বানায়, তখন এই সিরামিক শিল্প এক চমৎকার নবজাগরণ প্রত্যক্ষ করে। সিরামিকের টাইলসে সজ্জিত ভবন নিয়ে শহরটি আবার নতুনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
উৎপাদনের দিক দিয়ে বুসরার চেয়েও ইযনিক শহর অধিক কর্মব্যস্ত ছিল এবং এটাই ছিল এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। ১৪শ শতাব্দির শেষ হতে প্রায় দুই শতাব্দি পর্যন্ত এ শিল্প ব্যাপকহারে বিকশিত হয়। সাধারণ একটি ইযনিক সজ্জা অঙ্কন করা হতো অর্ধতরল কাদামাটির উপর কোবাল্টের নীল, সবুজাভ নীল রঙ ও (কপারের) সবুজের মাঝে এবং অনিন্দ্য সুন্দর টমেটো লাল রঙের মুদ্রা-চিত্র দ্বারা কিনারার অংশ সজ্জিত হতো। আয়তাকার টাইলসগুলো মিলে যে নকশা দাঁড় করায়, তার সবগুলো ছিল লতাগুল্মের পুনরাবৃত্তিময় সাজ এবং প্রথাগতভাবে সেখানে চারটি ফুল থাকতো। চারটি ফুল ছিল: গোলাপ, জেসমিন, লাল রঙের পুষ্পবিশেষ- কার্নেশান এবং টিউলিপ।
মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ (Glaze) এবং দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলীর কারিগরি দক্ষতায় মুসলিম মৃৎশিল্পীগণ দশ দশ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার পাশাপাশি আজকের মৃৎশিল্প ওইসব কারিগরের অবদানের নিকট ব্যাপকভাবে ঋণী। স্পেন ও সিসিলির মৃৎশিল্পীদের থেকে নানা উপাদান ও হরেক রঙের মৃৎসামগ্রী উৎপাদনের নয়া ধরণ ও কৌশল ইউরোপে প্রবেশ করে। টিনের মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের কৌশলটি ৯ম শতাব্দিতে যখন মুসলিমদের মাধ্যমে স্পেনে প্রবেশ করে, তার আগ পর্যন্ত ইউরোপ এ সম্পর্কে একেবারে বেখবর ছিল।
মুসলিম মৃৎশিল্প যে স্পেনের বাহিরেও বিস্তৃত হয়েছিল, সে ব্যাপারে ব্যাপক তথ্য রয়েছে। যেমন, মালাগা শহরের মৃৎসামগ্রী ইংল্যান্ডে পাওয়া যায়, যেখানে ১৩শ শতাব্দীর শেষার্ধ ও ১৪শ শতাব্দি সময়ের ৪৪-টি এবং ১৫শ শতাব্দির আরও ২২-টি দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের মুর আমলের মৃৎসামগ্রী রয়েছে। অতি সম্প্রতি, ক্যান্টারবারির কেন্দ্রস্থ লংমার্কেটে পরিচালিত ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের খননকার্যে ইসলামী আমলের দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ এবং সবুজাভ নীল রঙের বিপুল পরিমাণ মৃৎসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে।
মুসলিম মৃৎশিল্পীদের তৈরি পাত্রগুলো কীভাবে ইংল্যান্ডে আসে, সে সম্পর্কে ক্যান্টারবারি অনুসন্ধানে কর্মরত জন কটার লিখেন, "কিছু পাত্র পবিত্রভূমি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় ক্রুসেডারদের মালপত্রের সাথে ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে ... পবিত্রভূমি বা স্পেনের কম্পোসটেলায় অবস্থিত সেন্ট জেমসের সমাধিমন্দির জিয়ারতের সময় মধ্যযুগীয় তীর্থযাত্রীরা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিশেষ এসব ইসলামী পাত্র সাথে করে নিয়ে আসতো, এটাও সম্ভাব্য আরেকটি কারণ।” কদাচিৎ কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম মৃৎশিল্পীদের তৈরি পাত্রগুলোর ইংল্যান্ডে অনুপ্রবেশ সরাসরি পথে ঘটতো। উদাহরণস্বরূপ, আমরা জানি যে, ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের স্পেন দেশীয় স্ত্রী, কান্তালের ইলিয়েনর রাজকীয় গৃহস্থালীর জন্য মালিক অঞ্চলের চার হাজার পাত্র ক্রয়ের ফরমায়েশ করেন। এখানে মালিক অঞ্চল নিশ্চিতভাবে আন্দালুসের দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের মৃৎসামগ্রী উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র মালাগাকে নির্দেশ করে (মালাগা শহরের আরবী নাম মালিকা)।
লন্ডনের ব্লসম্স ইন নামে পরিচিত স্থানে ১৪শ শতাব্দির একটি দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপের বাসন পাওয়া যায়, যা প্রাণবৃক্ষ এবং সেইসাথে কুফি খোদাইকার্য দিয়ে সজ্জিত ছিল। এগুলো ওই সময় আন্দালুস ও উত্তর আফ্রিকাতে বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং এ ধরনের সজ্জা ব্যাপক হারে ইউরোপে নকল হতে থাকে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের কেন্ট শহরের স্যান্ডউইচ পোর্টে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর নতুন করে যে শুল্ক আরোপ করে, তার হিসাব নথিতে আশ্চর্যজনকভাবে ইংল্যান্ডে এই বাসনের অনুপ্রবেশের বিবরণ পাওয়া যায়। বাসনটি বর্তমানে লন্ডনের গিল্ডহল জাদুঘরে রয়েছে।
আমাদের জন্য রেখে যাওয়া মুসলিম মৃৎশিল্পীদের আরেকটি সুপরিচিত সিরামিক ব্র্যান্ড হচ্ছে: তথাকথিত মায়োলিকা বাসনসামগ্রী। ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনে থাকা মেজরকা ও বালিয়ারিক দ্বীপের সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই সিরামিক ব্র্যান্ডের সূচনার গল্প। জেনোয়া ও ভেনিসের ইতালীয় জাহাজগুলো টিনের মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ দেয়া মৃৎসামগ্রী সংগ্রহ এবং মুরীয় মৃৎশিল্পীদের ভাড়া করতো; বস্তুত এরাই সিসিলিতে মেজরকীয় মৃৎশৈলীর আবির্ভাব ঘটায়। ধীরে ধীরে এটা প্রধান শৈলী হিসেবে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করে এবং পরিণত হয় 'মাজ্যোলিকা' বা 'মায়্যোলিকা' নামে সমধিক পরিচিত শৈলীতে।
আন্দালুস ও মিশরীয় কারিগরদের ব্যবহৃত উৎপাদন ও সজ্জাকরণ কৌশল অবলম্বন করে ১৫শ শতাব্দি হতে মায়্যোলিকা শৈলী পূর্ণতার এক বিস্ময়কর পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ইতালীয় শিল্পীগণ এটাতে নানা বৈচিত্র নিয়ে আসে, যেমন: গুবিও দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ শৈলী, যা মূলত সবুজাভ হলুদ, স্ট্রবেরির গোলাপি ও রুবির লাল আভার সংমিশ্রণ। এমনকি বর্তমান সময় পর্যন্ত এই মায়্যোলিকা নকশাশৈলী ইতালির সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি মাতিয়ে রেখেছিল।
📄 কাঁচশিল্প
অতীতে কাচের ব্যবহার সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি, তার সবই এসেছে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও বিভিন্ন সময়ের পর্যটকদের দেয়া বিবরণ থেকে। সে সূত্রে আমরা অবগত যে, ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দির সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামেস্ক শহর ছিল এই সূক্ষ্ম উপাদানের প্রধান কেন্দ্র। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এসব এলাকা ভ্রমণের সময় ইবনে বতুতা দামেস্ক শহরকে কাচ প্রস্তুতের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেন। কেবল সিরিয়া নয়, বরং মিশর, ইরাক ও আন্দালুস ৮ম শতাব্দী ও তৎপরবর্তী সময়ে বিপুল পরিমাণে কাচ ও কাচ পণ্য উৎপাদনে জড়িত ছিল। এক্ষেত্রে দুটো প্রন্থা মুখ্য ছিল - স্ফটিক থেকে কর্তন এবং ছাঁচে বাতাস প্রবেশ করিয়ে আকৃতি প্রদান।
সিরিয়া ও মিশরভিত্তিক রোমানদের রেখে যাওয়া কাচশিল্পের উত্তরাধিকার মুসলিমরা লাভ করে এবং সেইসাথে বিকাশ ঘটায় দ্বৈত সিলমোহরের নকশা (যেখানে সজ্জিত নকশার সিলমোহর উত্তপ্ত কাচের উপর চেপে ধরা হয়); সুতার সজ্জাসহ গলিত কাচে বাতাসের প্রবাহ ঘটিয়ে অনিয়মিত আকৃতি প্রদান (এটা রোমান ও বাইযান্টিনদের থেকে চলা আসা প্রথা); ছাঁচে বাতাস দিয়ে আকৃতি প্রদান (যেখানে কাচ প্রস্তুতকারীরা আগে থেকে বানানো ছাঁচে উত্তপ্ত তরল কাচ প্রবাহিত করে); এবং হাত ও চক্র দিয়ে কাচে নকশা খোদাই ও কর্তনের মতো বহু বিষয়ের। কাচ দিয়ে সজ্জার বিষয়ে মুসলিমগণ পূর্ণতা নিয়ে আসে এবং বোতল, ফ্লাস্ক, পাত্র ও কাপসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রীতে তারা এসব সজ্জার বিস্তৃতি ঘটায়।
১৩শ শতাব্দীর দিকে, সিরিয়ার কাচ এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, গোটা দুনিয়ার ব্যবসায়ী ও ক্রেতাগণ সেসব নমুনা সংগ্রহে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সাম্প্রতিককালের খননে সুইডেন, দক্ষিণ রাশিয়া, এমনকি চীনেও এনামেলে সজ্জিত ৭০০ বছরের পুরোনো সিরীয় কাচপাত্র আবিষ্কার এটার সাক্ষ্য দেয়।
নিজস্ব কাচের জন্য ইরাকের সামাত্রা ছিল বেশ প্রসিদ্ধ। খননকার্য থেকে আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর মাঝে মিলেফিওরি বা মোজাইক কাচ সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। বিশেষ রঙ ও নকশার জন্য এই কাচ তার পূববর্তী ধরন থেকে একেবারে ভিন্ন। ৯ম শতাব্দীর ঈষৎ সাদাটে কাচে তৈরি সোেজাপাত্র ছিল সামারাতে পাওয়া আরেক অতিবসুন্দর কাচপাত্র।
সুগন্ধির জন্য ব্যবহৃত ছোট ছোট বোতল বানানোর জন্যও সামারার কাচ প্রস্তুতকারীদের বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। চার প্রান্ত ও সিলিন্ডারের ন্যায় গলাবিশিষ্ট নীল ও সবুজ কাচে বানানো কিছু পাত্র ছিল নাশপাতি ফলের আকৃতির মতো। এগুলো বেশ ভারী এবং বিভিন্ন টুকরো দিয়ে পুনঃপুন সজ্জিত ছিল। অত্যন্ত মজবুত নকশা দিয়ে সজ্জিত বিভিন্ন আকৃতিতে কাটা ৯ম শতাব্দীর কাচ পাত্রের অত্যন্ত সুন্দর টুকরোগুলোও সামারাতে পাওয়া গেছে।
৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গোড়াপত্তন হওয়া 'পুরাতন কায়রো' নামে পরিচিত আল-ফুসতাত শহরে পরিচালিত খননকার্যে ৮ম শতাব্দী থেকে মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ের কাচ এত বেশি পরিমাণে আবিষ্কৃত হয়েছে যে, নিশ্চিতভাবে এটা কাচ উৎপাদনের একটা কেন্দ্র হয়ে থাকবে। এসবের মধ্যে মুদ্রাসদৃশ ভার সর্বাধিক প্রাচীন, যা ৭০৮ খ্রিস্টাব্দের এবং এগুলোতে শাসক বা সরকারি কর্মকর্তাদের সিলমোহর খোদাই করা থাকতো। কালো সবুজ, হালকা সবুজ ও সবুজাভ নীল থেকে শুরু করে সাদা ও রক্তবর্ণসহ বিভিন্ন রঙে এগুলো রঙিন ছিল। অত্যাধিক জটিল নকশার কিছু মিশরীয় কাচপাত্র দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ দিয়ে সজ্জিত করে উজ্জ্বল করা হতো, কখনো বস্তুর উপরিতলে কপার বা সিলভার অক্সাইড দিয়ে অঙ্কন করে ধাতব আভা প্রদান করা হতো, এরপর সেটা ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হতো।
কাচশিল্প কেবল প্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মৃৎসামগ্রীর মতো আল-আন্দালুসেও কাচ সামগ্রীর সমান চাহিদা ছিল। দুই, চার বা আট হাতলবিশিষ্ট জগ এবং হাতল ও বাকানো বাটের পাত্রসহ সবই এখানে পাওয়া যেত। আলমেরিয়া, মুর্সিয়া ও মালাগা ছিল কাচ উৎপাদনের প্রধানতম কেন্দ্র এবং এক্ষেত্রে আলমেরিয়ার ছিল দুনিয়া জোড়া সুখ্যাতি। প্রাচ্যের কাচসামগ্রীর অনুসরণে এই তিন শহরে তৈরি হাতলবিহীন কাচপাত্রগুলো ১০ম শতাব্দির লিওনের অভিজাত শ্রেণির টেবিলে পর্যন্ত জায়গা করে নেয়।
বলা হয় যে, ৯ম শতাব্দিতে আন্দালুসের কর্ডোবাতে স্ফটিক কাটার পদ্ধতির প্রবর্তন করেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। অত্যন্ত দুর্বোদ্ধ সব পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারে পারদর্শী এই মনীষী তৃতীয় আব্দুর রহমান এবং প্রথম মুহাম্মদের রাজসভায় পণ্ডিত ও উদ্ভাবক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কৃত্রিম পাখা লাগিয়ে তিনি উঁচু ভবন থেকে উড়বার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। তিনি কাচের বৈজ্ঞানিক গঠনশৈলী ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং লেন্স ও ম্যাগনিফাইং (বিবর্ধক) কাচ ব্যবহার করে হস্তুলিপিকে বড় করার প্রাথমিক দিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোতে বেশ ভাল অবদান রাখেন। এর পাশাপাশি তিনি খনি থেকে আহরিত পাথর দিয়ে আন্দালুসে প্রতিষ্ঠা করেন স্ফটিক ইন্ডাস্ট্রি।
তাই বলা যায়, সিরিয়া, মিশর, ইরাক ও আন্দালুসের চুল্লী হয়ে জ্ঞাত দুনিয়া ভ্রমণ, প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এবং মানুষের টেবিল ও ঘরকে অপরূপভাবে সাজিয়ে দেয়ার মাধ্যমে কাচ তার ইতিহাসকে কেবল রঙিনই করেছে।
অতীতে কাচের ব্যবহার সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি, তার সবই এসেছে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও বিভিন্ন সময়ের পর্যটকদের দেয়া বিবরণ থেকে। সে সূত্রে আমরা অবগত যে, ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দির সিরিয়ার আলেপ্পো ও দামেস্ক শহর ছিল এই সূক্ষ্ম উপাদানের প্রধান কেন্দ্র। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এসব এলাকা ভ্রমণের সময় ইবনে বতুতা দামেস্ক শহরকে কাচ প্রস্তুতের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেন। কেবল সিরিয়া নয়, বরং মিশর, ইরাক ও আন্দালুস ৮ম শতাব্দী ও তৎপরবর্তী সময়ে বিপুল পরিমাণে কাচ ও কাচ পণ্য উৎপাদনে জড়িত ছিল। এক্ষেত্রে দুটো প্রন্থা মুখ্য ছিল - স্ফটিক থেকে কর্তন এবং ছাঁচে বাতাস প্রবেশ করিয়ে আকৃতি প্রদান।
সিরিয়া ও মিশরভিত্তিক রোমানদের রেখে যাওয়া কাচশিল্পের উত্তরাধিকার মুসলিমরা লাভ করে এবং সেইসাথে বিকাশ ঘটায় দ্বৈত সিলমোহরের নকশা (যেখানে সজ্জিত নকশার সিলমোহর উত্তপ্ত কাচের উপর চেপে ধরা হয়); সুতার সজ্জাসহ গলিত কাচে বাতাসের প্রবাহ ঘটিয়ে অনিয়মিত আকৃতি প্রদান (এটা রোমান ও বাইযান্টিনদের থেকে চলা আসা প্রথা); ছাঁচে বাতাস দিয়ে আকৃতি প্রদান (যেখানে কাচ প্রস্তুতকারীরা আগে থেকে বানানো ছাঁচে উত্তপ্ত তরল কাচ প্রবাহিত করে); এবং হাত ও চক্র দিয়ে কাচে নকশা খোদাই ও কর্তনের মতো বহু বিষয়ের। কাচ দিয়ে সজ্জার বিষয়ে মুসলিমগণ পূর্ণতা নিয়ে আসে এবং বোতল, ফ্লাস্ক, পাত্র ও কাপসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রীতে তারা এসব সজ্জার বিস্তৃতি ঘটায়।
১৩শ শতাব্দীর দিকে, সিরিয়ার কাচ এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, গোটা দুনিয়ার ব্যবসায়ী ও ক্রেতাগণ সেসব নমুনা সংগ্রহে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সাম্প্রতিককালের খননে সুইডেন, দক্ষিণ রাশিয়া, এমনকি চীনেও এনামেলে সজ্জিত ৭০০ বছরের পুরোনো সিরীয় কাচপাত্র আবিষ্কার এটার সাক্ষ্য দেয়।
নিজস্ব কাচের জন্য ইরাকের সামাত্রা ছিল বেশ প্রসিদ্ধ। খননকার্য থেকে আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর মাঝে মিলেফিওরি বা মোজাইক কাচ সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। বিশেষ রঙ ও নকশার জন্য এই কাচ তার পূববর্তী ধরন থেকে একেবারে ভিন্ন। ৯ম শতাব্দীর ঈষৎ সাদাটে কাচে তৈরি সোেজাপাত্র ছিল সামারাতে পাওয়া আরেক অতিবসুন্দর কাচপাত্র।
সুগন্ধির জন্য ব্যবহৃত ছোট ছোট বোতল বানানোর জন্যও সামারার কাচ প্রস্তুতকারীদের বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। চার প্রান্ত ও সিলিন্ডারের ন্যায় গলাবিশিষ্ট নীল ও সবুজ কাচে বানানো কিছু পাত্র ছিল নাশপাতি ফলের আকৃতির মতো। এগুলো বেশ ভারী এবং বিভিন্ন টুকরো দিয়ে পুনঃপুন সজ্জিত ছিল। অত্যন্ত মজবুত নকশা দিয়ে সজ্জিত বিভিন্ন আকৃতিতে কাটা ৯ম শতাব্দীর কাচ পাত্রের অত্যন্ত সুন্দর টুকরোগুলোও সামারাতে পাওয়া গেছে।
৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গোড়াপত্তন হওয়া 'পুরাতন কায়রো' নামে পরিচিত আল-ফুসতাত শহরে পরিচালিত খননকার্যে ৮ম শতাব্দী থেকে মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ের কাচ এত বেশি পরিমাণে আবিষ্কৃত হয়েছে যে, নিশ্চিতভাবে এটা কাচ উৎপাদনের একটা কেন্দ্র হয়ে থাকবে। এসবের মধ্যে মুদ্রাসদৃশ ভার সর্বাধিক প্রাচীন, যা ৭০৮ খ্রিস্টাব্দের এবং এগুলোতে শাসক বা সরকারি কর্মকর্তাদের সিলমোহর খোদাই করা থাকতো। কালো সবুজ, হালকা সবুজ ও সবুজাভ নীল থেকে শুরু করে সাদা ও রক্তবর্ণসহ বিভিন্ন রঙে এগুলো রঙিন ছিল। অত্যাধিক জটিল নকশার কিছু মিশরীয় কাচপাত্র দীপ্তিময় মিহি স্বচ্ছ প্রলেপ দিয়ে সজ্জিত করে উজ্জ্বল করা হতো, কখনো বস্তুর উপরিতলে কপার বা সিলভার অক্সাইড দিয়ে অঙ্কন করে ধাতব আভা প্রদান করা হতো, এরপর সেটা ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হতো।
কাচশিল্প কেবল প্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মৃৎসামগ্রীর মতো আল-আন্দালুসেও কাচ সামগ্রীর সমান চাহিদা ছিল। দুই, চার বা আট হাতলবিশিষ্ট জগ এবং হাতল ও বাকানো বাটের পাত্রসহ সবই এখানে পাওয়া যেত। আলমেরিয়া, মুর্সিয়া ও মালাগা ছিল কাচ উৎপাদনের প্রধানতম কেন্দ্র এবং এক্ষেত্রে আলমেরিয়ার ছিল দুনিয়া জোড়া সুখ্যাতি। প্রাচ্যের কাচসামগ্রীর অনুসরণে এই তিন শহরে তৈরি হাতলবিহীন কাচপাত্রগুলো ১০ম শতাব্দির লিওনের অভিজাত শ্রেণির টেবিলে পর্যন্ত জায়গা করে নেয়।
বলা হয় যে, ৯ম শতাব্দিতে আন্দালুসের কর্ডোবাতে স্ফটিক কাটার পদ্ধতির প্রবর্তন করেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। অত্যন্ত দুর্বোদ্ধ সব পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারে পারদর্শী এই মনীষী তৃতীয় আব্দুর রহমান এবং প্রথম মুহাম্মদের রাজসভায় পণ্ডিত ও উদ্ভাবক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কৃত্রিম পাখা লাগিয়ে তিনি উঁচু ভবন থেকে উড়বার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। তিনি কাচের বৈজ্ঞানিক গঠনশৈলী ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং লেন্স ও ম্যাগনিফাইং (বিবর্ধক) কাচ ব্যবহার করে হস্তুলিপিকে বড় করার প্রাথমিক দিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোতে বেশ ভাল অবদান রাখেন। এর পাশাপাশি তিনি খনি থেকে আহরিত পাথর দিয়ে আন্দালুসে প্রতিষ্ঠা করেন স্ফটিক ইন্ডাস্ট্রি।
তাই বলা যায়, সিরিয়া, মিশর, ইরাক ও আন্দালুসের চুল্লী হয়ে জ্ঞাত দুনিয়া ভ্রমণ, প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এবং মানুষের টেবিল ও ঘরকে অপরূপভাবে সাজিয়ে দেয়ার মাধ্যমে কাচ তার ইতিহাসকে কেবল রঙিনই করেছে।
📄 অলংকার
কাচ, বস্ত্র, মৃৎ ও কাগজশিল্প রচনা করেছিল এক সফল সাম্রাজ্যের ভিত, যে সাম্রাজ্যের পণ্যের বাজার ছিল সুদূর চীন পর্যন্ত বিস্তৃত, যেমনটি ইতোমধ্যে জেনেছেন। অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিল খনি ও সমুদ্র থেকে আহরিত পণ্যের উপর ভর দিয়ে, যেমন: অলংকার ও মুক্তা। মিশরের উচ্চভূমিতে পান্না সংগ্রহ করা হতো, ফারগানা থেকে নেয়া হতো নীলকান্তমনি, বাদাখশানে পাওয়া যেত রুবি, ওদিকে ইয়ামেন ও স্পেনে পাওয়া যেত কারনেলিয়া (বাদামী-লাল রত্নপাথর) ও অনিক্স (অলংকারে ব্যবহৃত পাথরবিশেষ)।
স্পেনের আলমাদিনের সিনাবার খনিতে প্রায় হাজারের মতো কর্মী নিযুক্ত ছিল, কেউ খনিগহ্বরে পাথর কাটা, কেউ আকরিক গলানোর জন্য কাঠের পরিবহনে, কেউবা পাত্রকে গলানোর উপযুক্ত করতে, পারদের বিশোধনে এবং অগ্নিচুল্লিতে আগুনের প্রখরতা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত ছিল।
ইয়ামেনের হাদরামাওত, ইস্পাহান, আর্মেনিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় খনি হতে আহরিত দ্রব্যের মধ্যে সাদা স্বর্ণ নামে পরিচিত লবণ আশ্চর্যজনকভাবে মূল্যবান ছিল এবং উটের বিশাল কাফেলা এখানকার আহরিত লবণ বাণিজ্যের জন্য বয়ে বেড়াত। ১৬শ শতাব্দিতে আফ্রিকা ও ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকাতে ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো লিও নামে পরিচিত আফ্রিকার এক ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিক বলেন, "আফ্রিকার বৃহত্তর অংশজুড়ে লবণ পুরোপুরি খনি থেকে আহরিত পণ্য ছিল, যা মার্বেল বা জিপসামের মতো মূল্যবান বস্তু আহরণের ন্যায় কর্মী বাহিনী নিয়োগ করে ভূ-গহ্বর থেকে তোলা হতো।”
"দুনিয়া সুন্দর স্ত্রীর মতো, যার রূপ-লাবণ্য বর্ধিত করার জন্য মানব সৃষ্ট কোনো রত্নালংকারের দরকার পড়ে না।" - খালীল জিবরান, লেবাননীয় লেখক
নুবিয়া ও সিলনে পাওয়া মূল্যবান পাথরসমূহ সিরিশ গুঁড়া দিয়ে সজ্জিত ও পালিশ করা হতো। মিশর ও সুদান উভয় এলাকায় ফিটকিরি এবং মিশরের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষভাবে জনপ্রিয় ন্যাট্রন উপত্যকাতে ন্যাট্রন পাওয়া যেত, যা দিয়ে কপার, সুতা, লিনেন জাতীয় কাপড় সাদা করা এবং চামড়া বিশোধন করা হতো। বস্ত্র রঙকারী, কাচ প্রস্তুতকারক, স্বর্ণকারদের মাঝে ন্যাট্রনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। রুটি প্রস্তুতকারীরা তাদের ময়দার থালে এটা মিশাতো, অন্যদিকে মাংস নরম করতে বাবুর্চিরা এটা ব্যবহার করতো।
সমুদ্র থেকে আসতো অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ মুক্তা, যা দিয়ে দুনিয়া জুড়ে বহু মানুষের গলা অলংকৃত হয়েছে। মুক্তা আহরণের জন্য ডুবুরিগণ পারস্য উপসাগরের উভয় পাশ, আরব সাগর, শিরাফ ও কিশ দ্বীপ এবং সেইসাথে দাহলাক দ্বীপসংলগ্ন বাহরাইনের উপকূল ও সিলনের সমুদ্র তীরে ডুব দিতেন।
মুক্তা আহরণের জন্য সমুদ্রে ডুব দেয়ার কৌশল নিয়ে ১৪শ শতাব্দির ইবনে বতুতা এভাবে মন্তব্য করেন, “ডুবুরি তার কোমরে দড়ি বেঁধে ডুব দেয়। সমুদ্রের তলদেশে সে ছোট ছোট পাথরের ভিড়ে লুকানো বালুতে গেঁথে যাওয়া খোলসগুলো খুঁজে বের করে। হাত দিয়ে সে এগুলো উঠিয়ে নেয় কিংবা এর জন্য নিয়ে আসা ছুরি দিয়ে সে এগুলো তুলে নেয় এবং গলাতে ঝুলতে থাকা চামড়ার থলেতে সেগুলো সংগ্রহ করে। দম ধরে রাখা যখন আর সম্ভব হয় না, তখন সে দড়িতে টান মারে, যেটা নৌকাতে দড়ি নিয়ে বসে থাকা ব্যক্তিকে ডুবুরিকে তুলে আনার সংকেত দেয়। চামড়ার থলে খুলে তারা সেসব খোলস-বের করে আনে এবং ছুরি দিয়ে ভিতর থেকে তারা মাংসের টুকরো বের করে আনতো।"
সিসিলি ও সারডিনিয়ার নিকটবর্তী উত্তর আফ্রিকা উপকূল জুড়ে ছিল বিস্তৃত প্রবাল প্রাচীর। ১২শ শতাব্দির ভূতত্ত্ববিদ আল- ইদরিসী প্রবাল সংগ্রহের একটি বিবরণ আমাদের জন্য এভাবে তুলে ধরেছেন, "প্রবাল এক প্রকারের উদ্ভিদ, যা বৃক্ষের মতো বেড়ে উঠে এবং পরবর্তীতে গভীর সমুদ্রের উঁচু পাহাড়ের মাঝে শিলার ন্যায় শক্ত রূপ ধারণ করে। দড়ি অনেকবার পেচিয়ে জাহাজের উঁচু পাটাতন থেকে ছিপ নিক্ষেপ করে মাছ ধরার ন্যায় এসব কোরাল সংগ্রহ করা হয়। নিক্ষেপ করা দড়ি যখন প্রবালের ডালপালার সাথে আটকে যায়, জেলেরা তখন ছিপ টেনে আনা শুরু করে এবং সেটা থেকে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোরাল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।"
কোরাল ও সেইসাথে মুক্তা যুদ্ধাস্ত্র, তাসবীহের দানা ও অলংকার সজ্জায় ব্যবহৃত হতো। অনেকগুলো দানা দিয়ে লম্বা কেশগুচ্ছের সাজ থেকে শুরু করে উঁচু করে নকশা খোদাই ও পিনের ন্যায় সাজ, এমন বহু ভঙ্গিতেই অন্যসব অলংকারের মতো কোরালেরও ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু এই সামুদ্রিক সৌন্দর্যের জন্যে ৫০ মিলিমিটার (২ ইঞ্চি) ব্যাসের দানার জন্য আপনাকে ৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত গুণতে হতে পারে। মূলত প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করা এবং অলংকার হিসেবে এর দুষ্প্রাপ্যতাই এর মূল্যকে করেছে আকাশচুম্বী।
কাচ, বস্ত্র, মৃৎ ও কাগজশিল্প রচনা করেছিল এক সফল সাম্রাজ্যের ভিত, যে সাম্রাজ্যের পণ্যের বাজার ছিল সুদূর চীন পর্যন্ত বিস্তৃত, যেমনটি ইতোমধ্যে জেনেছেন। অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিল খনি ও সমুদ্র থেকে আহরিত পণ্যের উপর ভর দিয়ে, যেমন: অলংকার ও মুক্তা। মিশরের উচ্চভূমিতে পান্না সংগ্রহ করা হতো, ফারগানা থেকে নেয়া হতো নীলকান্তমনি, বাদাখশানে পাওয়া যেত রুবি, ওদিকে ইয়ামেন ও স্পেনে পাওয়া যেত কারনেলিয়া (বাদামী-লাল রত্নপাথর) ও অনিক্স (অলংকারে ব্যবহৃত পাথরবিশেষ)।
স্পেনের আলমাদিনের সিনাবার খনিতে প্রায় হাজারের মতো কর্মী নিযুক্ত ছিল, কেউ খনিগহ্বরে পাথর কাটা, কেউ আকরিক গলানোর জন্য কাঠের পরিবহনে, কেউবা পাত্রকে গলানোর উপযুক্ত করতে, পারদের বিশোধনে এবং অগ্নিচুল্লিতে আগুনের প্রখরতা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত ছিল।
ইয়ামেনের হাদরামাওত, ইস্পাহান, আর্মেনিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় খনি হতে আহরিত দ্রব্যের মধ্যে সাদা স্বর্ণ নামে পরিচিত লবণ আশ্চর্যজনকভাবে মূল্যবান ছিল এবং উটের বিশাল কাফেলা এখানকার আহরিত লবণ বাণিজ্যের জন্য বয়ে বেড়াত। ১৬শ শতাব্দিতে আফ্রিকা ও ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকাতে ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো লিও নামে পরিচিত আফ্রিকার এক ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিক বলেন, "আফ্রিকার বৃহত্তর অংশজুড়ে লবণ পুরোপুরি খনি থেকে আহরিত পণ্য ছিল, যা মার্বেল বা জিপসামের মতো মূল্যবান বস্তু আহরণের ন্যায় কর্মী বাহিনী নিয়োগ করে ভূ-গহ্বর থেকে তোলা হতো।”
"দুনিয়া সুন্দর স্ত্রীর মতো, যার রূপ-লাবণ্য বর্ধিত করার জন্য মানব সৃষ্ট কোনো রত্নালংকারের দরকার পড়ে না।" - খালীল জিবরান, লেবাননীয় লেখক
নুবিয়া ও সিলনে পাওয়া মূল্যবান পাথরসমূহ সিরিশ গুঁড়া দিয়ে সজ্জিত ও পালিশ করা হতো। মিশর ও সুদান উভয় এলাকায় ফিটকিরি এবং মিশরের পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষভাবে জনপ্রিয় ন্যাট্রন উপত্যকাতে ন্যাট্রন পাওয়া যেত, যা দিয়ে কপার, সুতা, লিনেন জাতীয় কাপড় সাদা করা এবং চামড়া বিশোধন করা হতো। বস্ত্র রঙকারী, কাচ প্রস্তুতকারক, স্বর্ণকারদের মাঝে ন্যাট্রনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। রুটি প্রস্তুতকারীরা তাদের ময়দার থালে এটা মিশাতো, অন্যদিকে মাংস নরম করতে বাবুর্চিরা এটা ব্যবহার করতো।
সমুদ্র থেকে আসতো অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ মুক্তা, যা দিয়ে দুনিয়া জুড়ে বহু মানুষের গলা অলংকৃত হয়েছে। মুক্তা আহরণের জন্য ডুবুরিগণ পারস্য উপসাগরের উভয় পাশ, আরব সাগর, শিরাফ ও কিশ দ্বীপ এবং সেইসাথে দাহলাক দ্বীপসংলগ্ন বাহরাইনের উপকূল ও সিলনের সমুদ্র তীরে ডুব দিতেন।
মুক্তা আহরণের জন্য সমুদ্রে ডুব দেয়ার কৌশল নিয়ে ১৪শ শতাব্দির ইবনে বতুতা এভাবে মন্তব্য করেন, “ডুবুরি তার কোমরে দড়ি বেঁধে ডুব দেয়। সমুদ্রের তলদেশে সে ছোট ছোট পাথরের ভিড়ে লুকানো বালুতে গেঁথে যাওয়া খোলসগুলো খুঁজে বের করে। হাত দিয়ে সে এগুলো উঠিয়ে নেয় কিংবা এর জন্য নিয়ে আসা ছুরি দিয়ে সে এগুলো তুলে নেয় এবং গলাতে ঝুলতে থাকা চামড়ার থলেতে সেগুলো সংগ্রহ করে। দম ধরে রাখা যখন আর সম্ভব হয় না, তখন সে দড়িতে টান মারে, যেটা নৌকাতে দড়ি নিয়ে বসে থাকা ব্যক্তিকে ডুবুরিকে তুলে আনার সংকেত দেয়। চামড়ার থলে খুলে তারা সেসব খোলস-বের করে আনে এবং ছুরি দিয়ে ভিতর থেকে তারা মাংসের টুকরো বের করে আনতো।"
সিসিলি ও সারডিনিয়ার নিকটবর্তী উত্তর আফ্রিকা উপকূল জুড়ে ছিল বিস্তৃত প্রবাল প্রাচীর। ১২শ শতাব্দির ভূতত্ত্ববিদ আল- ইদরিসী প্রবাল সংগ্রহের একটি বিবরণ আমাদের জন্য এভাবে তুলে ধরেছেন, "প্রবাল এক প্রকারের উদ্ভিদ, যা বৃক্ষের মতো বেড়ে উঠে এবং পরবর্তীতে গভীর সমুদ্রের উঁচু পাহাড়ের মাঝে শিলার ন্যায় শক্ত রূপ ধারণ করে। দড়ি অনেকবার পেচিয়ে জাহাজের উঁচু পাটাতন থেকে ছিপ নিক্ষেপ করে মাছ ধরার ন্যায় এসব কোরাল সংগ্রহ করা হয়। নিক্ষেপ করা দড়ি যখন প্রবালের ডালপালার সাথে আটকে যায়, জেলেরা তখন ছিপ টেনে আনা শুরু করে এবং সেটা থেকে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোরাল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।"
কোরাল ও সেইসাথে মুক্তা যুদ্ধাস্ত্র, তাসবীহের দানা ও অলংকার সজ্জায় ব্যবহৃত হতো। অনেকগুলো দানা দিয়ে লম্বা কেশগুচ্ছের সাজ থেকে শুরু করে উঁচু করে নকশা খোদাই ও পিনের ন্যায় সাজ, এমন বহু ভঙ্গিতেই অন্যসব অলংকারের মতো কোরালেরও ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু এই সামুদ্রিক সৌন্দর্যের জন্যে ৫০ মিলিমিটার (২ ইঞ্চি) ব্যাসের দানার জন্য আপনাকে ৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত গুণতে হতে পারে। মূলত প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করা এবং অলংকার হিসেবে এর দুষ্প্রাপ্যতাই এর মূল্যকে করেছে আকাশচুম্বী।
📄 মুদ্রা
অতীতে মুদ্রা জীবন্ত ছিল, কেননা তখন উট, গবাদি পশু বা ভেড়া ছিল পণ্যের 'বিনিময়' মাধ্যম। ১৪শ শতাব্দির মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার সময় মালদ্বীপের জনগণের ব্যবহৃত মুদ্রা ছিল কড়ির খোলস এবং ওই সময় এটা ছিল বেশ মূল্যবান সম্পদ, যা উত্তর আফ্রিকার মালির ন্যায় দূরবর্তী স্থানেও পৌঁছে গিয়েছিল। গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া 'অदृश्य' ও অস্পৃশ্য মুদ্রার মাধ্যমে আর্থিক বাজারগুলো যে হারে ইলেকট্রনিক লেনদেন সম্পন্ন করছে, সেটার তুলনায় বর্তমানে আমাদের ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড, কাগজের নোট ও মুদ্রা কিছুই নয়। ইবনে বতুতার সময়ের কড়ি আমাদের নিকট যেমন, হয়তো কোনো একদিন আমাদের ব্যবহৃত মুদ্রা ও নোটগুলো সেরূপ হয়ে উঠবে।
স্বাধীন সুলতানদের অধীনে থেকেও নামেমাত্র ঐক্যবদ্ধ ইসলামী খিলাফত স্বর্ণ ও রুপাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজ সাম্রাজ্যের পাখা বিস্তৃত করেছিল। আমরা যদি দেশ-বিদেশ ভ্রমণকারী পর্যটক হই, তবে হয় আমাদের পর্যটক চেক বহন করতে হয়, নতুবা বিভিন্ন কারেন্সিতে ঠাসা থলে বয়ে বেড়ানোর ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু ১৪শ শতাব্দিতে মুসলিম বিশ্বের পর্যটকরা ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি বাজার চষে বেড়াতে পারতো, এমনকি রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তারা দিনার ও দিরহাম দিয়ে লেনদেন করতে পারতো।
মুসলিম বিশ্বের বাহিরে লেনদেনের ছিল এক ভিন্ন চিত্র। চীনে আশ্চর্যজনক আর্থিক লেনদেনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে বতুতা আবারও আমাদের সামনে প্রায় ৭০০ বছর আগেকার বিশ্বের বেশ কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছেন, তিনি বলেন, "চীনের লোকেরা ... হাতের তালুর সমান কাগজের টুকরো দিয়ে কেনা-বেচা করে, যেখানে সুলতানের সিলমোহর খোদাই করা থাকে ... কেউ যদি রুপার দিরহাম বা দিনার নিয়ে বাজারে যায়... তবে তা গ্রহণ করা হয় না এবং ওই ব্যক্তিকে উপেক্ষা করা হয়।"
৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে স্বর্ণ ও রুপাই ছিল বহুল প্রচলিত মুদ্রা এবং মুসলিমগণ কুরআন মোতাবেক তাদের মুদ্রা বানাতো। কুরআনে বলা হয়েছে: "মাপার সময় তোমরা পূর্ণভাবে মেপে দাও এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো" (সূরা ১৭:৩৫)। মুদ্রার পবিত্রতা ও ওজন ঠিক রাখার দায়িত্ব খলীফার উপর ন্যস্ত ছিল। সাত মিসক্কাল স্বর্ণ মুদ্রা রুপার দশটি মুদ্রার সমতুল্য, শরীয়তের এই আইনের মাধ্যমে ওজনের মানদণ্ড ঠিক করা হয়। এই ওজনের সমতুল্য নয়, এমন সকল মুদ্রা, বিদেশী মুদ্রা এবং পুরাতন মুদ্রাগুলো স্বর্ণ ও রুপার আদর্শ পিণ্ডসহ পরিশোধনের জন্য মুদ্রা প্রস্তুতের টাকশালে পাঠানো হতো, এরপর সেগুলো নতুন মুদ্রায় রূপান্তর করা হতো। মুদ্রা বানানোর সময় ধাতু উত্তপ্ত করার পূর্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সর্বপ্রথম স্বর্ণ ও রুপার আদর্শ পিণ্ডগুলোর বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করা হতো এবং প্রতিষ্ঠিত ধাতব মিশ্রণের মানদণ্ডের আলোকে মুদ্রা প্রস্তুত করা হতো।
মুসলিম শাসকগণ দিনার ও দিরহাম দুটোই ব্যবহার করতো। ৬৮৩ থেকে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করা উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক আল-মারওয়ান হলেন প্রথম শাসক, যিনি প্রথম নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছিলেন। আরবী লেখা খোদাই করা এই দিনারগুলোই প্রথম, কেননা এরপূর্বে মুদ্রা হিসেবে সাসানীয় রৌপ্য মুদ্রা এবং বাইযান্টিনদের স্বর্ণ ও কপারের মুদ্রা প্রচলিত ছিল। ৬৯১ বা ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে নিজস্ব মুদ্রা চালুর মাধ্যমে খলীফা আব্দুল মালিক নিজের শাসনকে বাইযান্টিনদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করার প্রয়াস পান এবং এক মুদ্রার অধীনে তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করেন। নতুন এই মুদ্রা বাইযান্টিন মুদ্রা সলিডাসের অনুকরণে বানানো হয়। আকার ও ওজনে এটা বাইযান্টিন মুদ্রার মতোই ছিল। হিরাকেল্স, হিরাক্লিয়াস কন্সট্যান্টিন ও হিরাক্লোনাসের প্রতিকৃতি সম্বলিত বাইযান্টিন মুদ্রার মতো এটার সম্মুখ অংশে তিনটি দাঁড়ানো প্রতিকৃতি ছিল। "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, কিছুই তার সমতুল্য নয় এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল" ইসলামের এই কালেমা শাহাদাত বাক্যটি উভয় মুদ্রার মাঝে পার্থক্য করে দিতো, যা মুদ্রার উল্টো পাশের নকশা ঘিরে আরবী লিপিতে খোদাই করা ছিল।
বাইযান্টিন সম্রাট ঘটনার এতদূর বিস্তৃতি দেখে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন, যেহেতু নতুন মুদ্রা প্রতিযোগিতার আভাস দিচ্ছে। তিনি এই মুদ্রা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং নতুন মুদ্রা বানিয়ে এটার জবাব দেন। এটা খলীফা আব্দুল মালিককে রাগিয়ে তোলে এবং প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি তরবারি উঁচু করে আরব পাগড়ি পরিহিত খলীফার খাড়া প্রতিকৃতি সম্বলিত আরেকটি মুদ্রা প্রস্তুত করেন, যার বিপরীত পাশে ইসলামের কালেমা শাহাদাত ও তারিখ খোদাই ছিল।
মুদ্রা ছোড়াছুড়ির এই ধারা চলতে থাকে এবং প্রত্যাশিতভাবেই বাইযান্টিন সম্রাট আরেকটি মুদ্রার মাধ্যমে এর জবাব দেন এবং এ পর্যায়ে ৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে খলীফা এটাকে যথেষ্ট ভাবেন এবং কোনো প্রতিকৃতি ছাড়াই প্রথম ইসলামী মুদ্রা চালু করেন। নতুন এই দিনারের উভয় পাশে কুরআনের আয়াত লিখিত ছিল, যা প্রতিটি মুদ্রাকে রূপ দিয়েছিল এক একটি ঈমানের বার্তাবাহক হিসেবে। এরপর তিনি গোটা উমাইয়া সাম্রাজ্য জুড়ে এটাকে একমাত্র ব্যবহার্য মুদ্রা হিসেবে সরকারি ফরমান জারি করেন। অবশিষ্ট সকল বাইযান্টিন ও আরব-বাইযান্টিন মুদ্রা গলিয়ে নতুন মুদ্রা বানানোর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পাঠানো হয় এবং যারা এই রাষ্ট্রীয় আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের কঠিন সাজা দেয়া হয়।
পৌরাণিক মুদ্রা
এক হাজার মোহর ও একশ মোহর নামের দুটো পৌরাণিক ইসলামী মুদ্রা ছিল। প্রথমটি ১২ কিলোগ্রাম (২৬.৫ পাউন্ড) ওজনের নিখুঁত স্বর্ণ এবং দ্বিতীয়টি ছিল নিছক ১০৯৪ গ্রাম ওজনের নিখুঁত স্বর্ণ, যেটা প্রথমটির তুলনায় নিহায়েৎ সামান্য। এদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য যথাক্রমে ১০ মিলিয়ন এবং ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই মুদ্রাগুলো প্রকৃতপক্ষে ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামতি আকবরের পুত্র মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তার পুত্র শাহজাহানের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শাহজাহান ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে তাজমহলের ন্যায় মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য কীর্তির জন্য সমধিক প্রসিদ্ধ। এই মুদ্রাগুলো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপহার হিসেবে দেয়া হতো।
২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) ব্যাসের এক হাজার মোহরটি ছিল বিশালাকার এবং উল্লেখ করা হয় যে, শতাব্দীর পর শতাব্দি জুড়ে এরূপ চার বা পাঁচটি মোহর পারস্যের শক্তিশালী শাসকদের দূতদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তুলনাযোগ্য এরূপ একটি মুদ্রার কথা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্লাস্টারের ছাঁচ থেকে জানা যায় যে, এমন একটি দু'শ মোহর সর্বশেষ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে দেখা যায় এবং এরপর থেকে তা হারিয়ে যায়। বিশালাকার স্বর্ণের এসব কিংবদন্তী মোহরের কোনটাই জানা মতে টিকে থাকেনি এবং ধারণা করা হয় যে, এগুলোর আদর্শ মানের জন্য এগুলো গলিয়ে ফেলা হয়। তথাপি আমরা জানি যে, এগুলো বিদ্যমান ছিল, কেননা পর্যটকগণ শাহজাহানের কোষাগারে থাকা বিশালাকার মুদ্রার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
"ফাতিমীয় মুদ্রা গুণগত মানে এতটাই উন্নত ও সহজলভ্য ছিল যে, এগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সর্বাধিক বিস্তৃত জিনিসে পরিণত হয়।"
- বিজদান আলী, বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক
নতুন স্বর্ণ দিনারগুলো বাইযান্টিন সলিডাসের চেয়ে ওজনে কম ছিল এবং এসব দিনারে ব্যবহৃত স্বর্ণের বিশুদ্ধতার পাশাপাশি ওজন ঠিক আছে কিনা, তা রাষ্ট্র তদারকি করতো। উমাইয়াদের স্বর্ণ মুদ্রাসমূহ সাধারণত দামেস্কে প্রস্তুত হলেও রুপা ও কপারের মুদ্রাগুলো অন্যত্র বানানো হতো।
প্রথম এই মুদ্রার পর বিভিন্ন মানের আরও মুদ্রা প্রস্তুত করা হয়। উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন বিজয়ের পর উমাইয়াগণ নতুন নতুন টাকশাল প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিটি টাকশাল তাদের নিজ নিজ শহরের নাম ও তারিখসহ মুদ্রা প্রস্তুত করতো।
৭৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিনার খিলাফতের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং খলীফা আল-মানসূর বাগদাদ শহরের গোড়াপত্তন করলে স্বর্ণের টাকশালও একইসাথে নতুন রাজধানীতে স্থানান্তরিত হয়। দিরহাম নামে পরিচিত রুপার মুদ্রাগুলোতে ওইসব লোকের নাম থাকতো, যারা সেগুলোর প্রস্তুতের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু এই রীতি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, কারণ পরবর্তী খলীফা হারুন উর-রশিদ ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতার মসনদে আসীন হলে তিনি এগুলো অচল বলে ঘোষণা দেন এবং মিশরের গভর্নরদের নামে দিনার প্রস্তুত করেন। এ কাজে তিনি দুটো সক্রিয় টাকশালের সহায়তা নেন, যার একটি বাগদাদে এবং অপরটি মিশরীয় গভর্নরের কেন্দ্র ফুসতাতে অবস্থিত।
৯০৯ থেকে ১১৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকার্য চালানো ফাতিমীগণ তাদের দিনারগুলোতে কুফি নকশা ব্যবহার করতো। উন্নতমান ও পরিমাণে বিপুল হওয়ার কারণে এই মুদ্রাগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সর্বাধিক প্রচলিত বাণিজ্যিক মুদ্রায় পরিণত হয়। ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করলে নিজেদের মুদ্রা বানানোর পরিবর্তে এগুলোর অনুকরণ শুরু করে, স্বাভাবিকভাবেই এসবের মাঝে কিছু অনুকরণ ছিল উৎকৃষ্ট মানের, আর কিছু ছিল নিতান্তই বাজে মানের।
আনুমানিক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আন্দালুস থেকে স্বর্ণ দিনার ইউরোপে প্রবেশ করে। অতঃপর, ১২৩৮ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গ্রানাডার নাসিরী শাসনামলে দিনার দিরহামে পরিণত হয়। বেশ ভারী এই মুদ্রাগুলো অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রস্তুত করা হতো এবং এগুলো কুরআনের অনুচ্ছেদ ও শাসকদের বংশ-লতিকাসহ দীর্ঘ লৌকিক উপাখ্যান বহন করতো। নাসিরী আমলের কোনো মুদ্রাতে প্রস্তুতের সময়কাল উল্লেখ না থাকলেও সেগুলোতে থাকা 'লা গালিবা ইল্লাল্লাহ - আল্লাহ ছাড়া কোনো বিজয়ী নেই' বাক্য যে তাদের রাজনৈতিক স্লোগান, তা সহজেই শনাক্ত করা যায়। একই সময়ে, উত্তরের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো প্রায় ৪০০ বছর ধরে মুদ্রা হিসেবে কেবল আরব ও ফ্রেঞ্চ মুদ্রাই ব্যবহার করতো।
১৩শ শতাব্দির পর, মুসলিম খিলাফত একক খলীফা শাসন থেকে ছোট ছোট রাজবংশ দ্বারা শাসিত হতে শুরু করে এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে। আজকের দিনের মুদ্রার ন্যায় সেগুলো অর্ধ-স্বাধীন রাজ্যগুলোর বিভিন্ন গভর্নরদের নাম বহন করতো। এসব মুদ্রা স্বতন্ত্রভাবে তৈরি হলেও, এগুলোতে নামমাত্র খিলাফতের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করা হতো।
আজকের ন্যায় মুদ্রা সর্বদা বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম ছিল না। প্রায় শতাব্দি পূর্বেই চেকের ব্যবহার ছিল। 'চেক' শব্দটি আরবী (صك) (সাক্কুন) থেকে উৎসারিত। পণ্যদ্রব্য গন্তব্যে পৌঁছালে তার মূল্য পরিশোধের লিখিত অঙ্গীকারনামা এই চেক। ৯ম শতাব্দিতে হারুন উর-রশিদের শাসনামলে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠে, যার আওতায় একজন মুসলিম ব্যবসায়ী চাইলে বাগদাদে থাকা নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে চীনের ক্যান্টন (বর্তমান গোয়াংজু) শহরে চেক ভাঙাতে পারতো। বৈধ আইনি মুদ্রা হিসেবে বিপুল পরিমাণ মুদ্রা স্থানান্তরে যে ধরনের ঝুঁকি ও বিপত্তি জড়িত রয়েছে, সেসব বিপত্তি ও ঝুঁকি এড়াতেই চেক বা সাক্কের প্রচলন ঘটে। ব্যাংকারগণ হুন্ডি, ঋণপত্র এবং প্রত্যর্থপত্র ব্যবহার করলেও কার্যত এগুলো চেক। হুন্ডি, সাক্ক বা চেক ব্যবহারের ধারণা জনপ্রিয় করার মাধ্যমে মুসলিমগণ বাণিজ্যে আর্থিক বিনিয়োগ ও আন্তমহাদেশীয় ব্যবসাকে সম্ভবপর করেছিল।
রাজা অফফার রহস্য
১২শ বছর আগে যখন খলীফারা মুসলিম বিশ্ব শাসন করতো, তখন ইংল্যান্ড শাসন করতো রাজা অফফা। তিনি তার রাজত্বে রুপার মুদ্রার প্রচলন ঘটান - এবং সেইসাথে ম্যানকাস স্বর্ণ নামের একটি স্বর্ণ মুদ্রা বানান, যা ৩০-টি রৌপ্যর মুদ্রার সমতুল্য। ম্যানকাস স্বর্ণ মুদ্রার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটা ১৫৭ হিজরী বা ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি আব্বাসী খলীফা আল-মানসূরের আমলের একটি স্বর্ণ মুদ্রার নকল এবং এই মুদ্রার এক পাশে আরবী অক্ষরে খোদাই করে লেখা রয়েছে, "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, অংশীদারহীন এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।"
আসল দিনারের সাথে এই মুদ্রার উল্লেখ্য পার্থক্য হচ্ছে রাজা অফফা এই মুদ্রার মধ্যস্থলে OFFA REX (অফফা রেক্স) লেখাটি খোদাই করে দেন। পণ্ডিতগণ এটা ভেবে হয়রান যে, একজন ইংরেজ রাজা কেনইবা আরব মুদ্রার হুবহু নকল বানাতে যাবেন। কারো মতে, তিনি ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন, যদিও এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, তিনি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কিংবা আরব দেশগুলো পাড়ি দিয়ে তীর্থযাত্রায় যাওয়া তীর্থযাত্রীদের ব্যবহারের জন্য এমনটি করেছেন। এই মুদ্রা নিশ্চিতভাবে কোনো কারিগর দিয়ে তৈরি নয়, যেহেতু আরবীতে OFFA REX (অফফা রেক্স) লেখার কোনো অর্থ নেই, তাছাড়া এই লেখা আরবী কুফি হস্তলিপির সাপেক্ষে উল্টোভাবে লেখা এবং 'বছর' শব্দটি ভুল আরবী বানানে লিখা। মুদ্রাটি খুব সম্ভবত কোনো অ্যাংলো-স্যাক্সন কারিগর নকল করেছে।
১২০০ বছর আগে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা নতুনভাবে ঝালাই করতে এ ঘটনা বেশ সহায়ক। ৮ম শতাব্দিতে ইসলামী মুদ্রা যে কতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, রাজা অফফার এই মুদ্রা তারই প্রমাণ। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ আধুনিক সময়ের জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে হাজারেরও অধিক মুসলিম মুদ্রা খুঁজে পেয়েছে, যা এই সাক্ষ্য আমাদের সামনে তুলে ধরছে যে, এসব মুদ্রা পরিবহন ও বাণিজ্যের সুবাদে মুসলিম দেশগুলো থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজা অফফাই একমাত্র অমুসলিম শাসক ছিলেন না, যিনি আরবীয় মুদ্রা প্রস্তুত করেছিলেন। ১১শ শতাব্দির স্পেনের ক্যাথলিক যুবরাজ, অষ্টম আলফোনসো নকশা খচিত মুদ্রা বানানোর আদেশ জারি করেন, যেখানে আরবী লেখা খোদাই ছিল। ওই মুদ্রাতে তিনি নিজেকে 'ক্যাথলিকদের আমির' এবং রোমের পোপকে 'খ্রিস্টীয় চার্চ বা গির্জার ইমাম' হিসেবে অভিহিত করেন।
অতীতে মুদ্রা জীবন্ত ছিল, কেননা তখন উট, গবাদি পশু বা ভেড়া ছিল পণ্যের 'বিনিময়' মাধ্যম। ১৪শ শতাব্দির মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার সময় মালদ্বীপের জনগণের ব্যবহৃত মুদ্রা ছিল কড়ির খোলস এবং ওই সময় এটা ছিল বেশ মূল্যবান সম্পদ, যা উত্তর আফ্রিকার মালির ন্যায় দূরবর্তী স্থানেও পৌঁছে গিয়েছিল। গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া 'অदृश्य' ও অস্পৃশ্য মুদ্রার মাধ্যমে আর্থিক বাজারগুলো যে হারে ইলেকট্রনিক লেনদেন সম্পন্ন করছে, সেটার তুলনায় বর্তমানে আমাদের ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড, কাগজের নোট ও মুদ্রা কিছুই নয়। ইবনে বতুতার সময়ের কড়ি আমাদের নিকট যেমন, হয়তো কোনো একদিন আমাদের ব্যবহৃত মুদ্রা ও নোটগুলো সেরূপ হয়ে উঠবে।
স্বাধীন সুলতানদের অধীনে থেকেও নামেমাত্র ঐক্যবদ্ধ ইসলামী খিলাফত স্বর্ণ ও রুপাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে নিজ সাম্রাজ্যের পাখা বিস্তৃত করেছিল। আমরা যদি দেশ-বিদেশ ভ্রমণকারী পর্যটক হই, তবে হয় আমাদের পর্যটক চেক বহন করতে হয়, নতুবা বিভিন্ন কারেন্সিতে ঠাসা থলে বয়ে বেড়ানোর ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু ১৪শ শতাব্দিতে মুসলিম বিশ্বের পর্যটকরা ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি বাজার চষে বেড়াতে পারতো, এমনকি রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তারা দিনার ও দিরহাম দিয়ে লেনদেন করতে পারতো।
মুসলিম বিশ্বের বাহিরে লেনদেনের ছিল এক ভিন্ন চিত্র। চীনে আশ্চর্যজনক আর্থিক লেনদেনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে বতুতা আবারও আমাদের সামনে প্রায় ৭০০ বছর আগেকার বিশ্বের বেশ কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছেন, তিনি বলেন, "চীনের লোকেরা ... হাতের তালুর সমান কাগজের টুকরো দিয়ে কেনা-বেচা করে, যেখানে সুলতানের সিলমোহর খোদাই করা থাকে ... কেউ যদি রুপার দিরহাম বা দিনার নিয়ে বাজারে যায়... তবে তা গ্রহণ করা হয় না এবং ওই ব্যক্তিকে উপেক্ষা করা হয়।"
৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে স্বর্ণ ও রুপাই ছিল বহুল প্রচলিত মুদ্রা এবং মুসলিমগণ কুরআন মোতাবেক তাদের মুদ্রা বানাতো। কুরআনে বলা হয়েছে: "মাপার সময় তোমরা পূর্ণভাবে মেপে দাও এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো" (সূরা ১৭:৩৫)। মুদ্রার পবিত্রতা ও ওজন ঠিক রাখার দায়িত্ব খলীফার উপর ন্যস্ত ছিল। সাত মিসক্কাল স্বর্ণ মুদ্রা রুপার দশটি মুদ্রার সমতুল্য, শরীয়তের এই আইনের মাধ্যমে ওজনের মানদণ্ড ঠিক করা হয়। এই ওজনের সমতুল্য নয়, এমন সকল মুদ্রা, বিদেশী মুদ্রা এবং পুরাতন মুদ্রাগুলো স্বর্ণ ও রুপার আদর্শ পিণ্ডসহ পরিশোধনের জন্য মুদ্রা প্রস্তুতের টাকশালে পাঠানো হতো, এরপর সেগুলো নতুন মুদ্রায় রূপান্তর করা হতো। মুদ্রা বানানোর সময় ধাতু উত্তপ্ত করার পূর্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সর্বপ্রথম স্বর্ণ ও রুপার আদর্শ পিণ্ডগুলোর বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করা হতো এবং প্রতিষ্ঠিত ধাতব মিশ্রণের মানদণ্ডের আলোকে মুদ্রা প্রস্তুত করা হতো।
মুসলিম শাসকগণ দিনার ও দিরহাম দুটোই ব্যবহার করতো। ৬৮৩ থেকে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করা উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক আল-মারওয়ান হলেন প্রথম শাসক, যিনি প্রথম নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছিলেন। আরবী লেখা খোদাই করা এই দিনারগুলোই প্রথম, কেননা এরপূর্বে মুদ্রা হিসেবে সাসানীয় রৌপ্য মুদ্রা এবং বাইযান্টিনদের স্বর্ণ ও কপারের মুদ্রা প্রচলিত ছিল। ৬৯১ বা ৬৯২ খ্রিস্টাব্দে নিজস্ব মুদ্রা চালুর মাধ্যমে খলীফা আব্দুল মালিক নিজের শাসনকে বাইযান্টিনদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করার প্রয়াস পান এবং এক মুদ্রার অধীনে তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করেন। নতুন এই মুদ্রা বাইযান্টিন মুদ্রা সলিডাসের অনুকরণে বানানো হয়। আকার ও ওজনে এটা বাইযান্টিন মুদ্রার মতোই ছিল। হিরাকেল্স, হিরাক্লিয়াস কন্সট্যান্টিন ও হিরাক্লোনাসের প্রতিকৃতি সম্বলিত বাইযান্টিন মুদ্রার মতো এটার সম্মুখ অংশে তিনটি দাঁড়ানো প্রতিকৃতি ছিল। "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, কিছুই তার সমতুল্য নয় এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল" ইসলামের এই কালেমা শাহাদাত বাক্যটি উভয় মুদ্রার মাঝে পার্থক্য করে দিতো, যা মুদ্রার উল্টো পাশের নকশা ঘিরে আরবী লিপিতে খোদাই করা ছিল।
বাইযান্টিন সম্রাট ঘটনার এতদূর বিস্তৃতি দেখে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন, যেহেতু নতুন মুদ্রা প্রতিযোগিতার আভাস দিচ্ছে। তিনি এই মুদ্রা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং নতুন মুদ্রা বানিয়ে এটার জবাব দেন। এটা খলীফা আব্দুল মালিককে রাগিয়ে তোলে এবং প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি তরবারি উঁচু করে আরব পাগড়ি পরিহিত খলীফার খাড়া প্রতিকৃতি সম্বলিত আরেকটি মুদ্রা প্রস্তুত করেন, যার বিপরীত পাশে ইসলামের কালেমা শাহাদাত ও তারিখ খোদাই ছিল।
মুদ্রা ছোড়াছুড়ির এই ধারা চলতে থাকে এবং প্রত্যাশিতভাবেই বাইযান্টিন সম্রাট আরেকটি মুদ্রার মাধ্যমে এর জবাব দেন এবং এ পর্যায়ে ৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে খলীফা এটাকে যথেষ্ট ভাবেন এবং কোনো প্রতিকৃতি ছাড়াই প্রথম ইসলামী মুদ্রা চালু করেন। নতুন এই দিনারের উভয় পাশে কুরআনের আয়াত লিখিত ছিল, যা প্রতিটি মুদ্রাকে রূপ দিয়েছিল এক একটি ঈমানের বার্তাবাহক হিসেবে। এরপর তিনি গোটা উমাইয়া সাম্রাজ্য জুড়ে এটাকে একমাত্র ব্যবহার্য মুদ্রা হিসেবে সরকারি ফরমান জারি করেন। অবশিষ্ট সকল বাইযান্টিন ও আরব-বাইযান্টিন মুদ্রা গলিয়ে নতুন মুদ্রা বানানোর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পাঠানো হয় এবং যারা এই রাষ্ট্রীয় আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের কঠিন সাজা দেয়া হয়।
পৌরাণিক মুদ্রা
এক হাজার মোহর ও একশ মোহর নামের দুটো পৌরাণিক ইসলামী মুদ্রা ছিল। প্রথমটি ১২ কিলোগ্রাম (২৬.৫ পাউন্ড) ওজনের নিখুঁত স্বর্ণ এবং দ্বিতীয়টি ছিল নিছক ১০৯৪ গ্রাম ওজনের নিখুঁত স্বর্ণ, যেটা প্রথমটির তুলনায় নিহায়েৎ সামান্য। এদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য যথাক্রমে ১০ মিলিয়ন এবং ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই মুদ্রাগুলো প্রকৃতপক্ষে ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামতি আকবরের পুত্র মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তার পুত্র শাহজাহানের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শাহজাহান ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে তাজমহলের ন্যায় মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য কীর্তির জন্য সমধিক প্রসিদ্ধ। এই মুদ্রাগুলো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপহার হিসেবে দেয়া হতো।
২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) ব্যাসের এক হাজার মোহরটি ছিল বিশালাকার এবং উল্লেখ করা হয় যে, শতাব্দীর পর শতাব্দি জুড়ে এরূপ চার বা পাঁচটি মোহর পারস্যের শক্তিশালী শাসকদের দূতদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তুলনাযোগ্য এরূপ একটি মুদ্রার কথা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্লাস্টারের ছাঁচ থেকে জানা যায় যে, এমন একটি দু'শ মোহর সর্বশেষ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে দেখা যায় এবং এরপর থেকে তা হারিয়ে যায়। বিশালাকার স্বর্ণের এসব কিংবদন্তী মোহরের কোনটাই জানা মতে টিকে থাকেনি এবং ধারণা করা হয় যে, এগুলোর আদর্শ মানের জন্য এগুলো গলিয়ে ফেলা হয়। তথাপি আমরা জানি যে, এগুলো বিদ্যমান ছিল, কেননা পর্যটকগণ শাহজাহানের কোষাগারে থাকা বিশালাকার মুদ্রার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
"ফাতিমীয় মুদ্রা গুণগত মানে এতটাই উন্নত ও সহজলভ্য ছিল যে, এগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সর্বাধিক বিস্তৃত জিনিসে পরিণত হয়।"
- বিজদান আলী, বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক
নতুন স্বর্ণ দিনারগুলো বাইযান্টিন সলিডাসের চেয়ে ওজনে কম ছিল এবং এসব দিনারে ব্যবহৃত স্বর্ণের বিশুদ্ধতার পাশাপাশি ওজন ঠিক আছে কিনা, তা রাষ্ট্র তদারকি করতো। উমাইয়াদের স্বর্ণ মুদ্রাসমূহ সাধারণত দামেস্কে প্রস্তুত হলেও রুপা ও কপারের মুদ্রাগুলো অন্যত্র বানানো হতো।
প্রথম এই মুদ্রার পর বিভিন্ন মানের আরও মুদ্রা প্রস্তুত করা হয়। উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন বিজয়ের পর উমাইয়াগণ নতুন নতুন টাকশাল প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিটি টাকশাল তাদের নিজ নিজ শহরের নাম ও তারিখসহ মুদ্রা প্রস্তুত করতো।
৭৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিনার খিলাফতের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং খলীফা আল-মানসূর বাগদাদ শহরের গোড়াপত্তন করলে স্বর্ণের টাকশালও একইসাথে নতুন রাজধানীতে স্থানান্তরিত হয়। দিরহাম নামে পরিচিত রুপার মুদ্রাগুলোতে ওইসব লোকের নাম থাকতো, যারা সেগুলোর প্রস্তুতের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু এই রীতি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, কারণ পরবর্তী খলীফা হারুন উর-রশিদ ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতার মসনদে আসীন হলে তিনি এগুলো অচল বলে ঘোষণা দেন এবং মিশরের গভর্নরদের নামে দিনার প্রস্তুত করেন। এ কাজে তিনি দুটো সক্রিয় টাকশালের সহায়তা নেন, যার একটি বাগদাদে এবং অপরটি মিশরীয় গভর্নরের কেন্দ্র ফুসতাতে অবস্থিত।
৯০৯ থেকে ১১৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসনকার্য চালানো ফাতিমীগণ তাদের দিনারগুলোতে কুফি নকশা ব্যবহার করতো। উন্নতমান ও পরিমাণে বিপুল হওয়ার কারণে এই মুদ্রাগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সর্বাধিক প্রচলিত বাণিজ্যিক মুদ্রায় পরিণত হয়। ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করলে নিজেদের মুদ্রা বানানোর পরিবর্তে এগুলোর অনুকরণ শুরু করে, স্বাভাবিকভাবেই এসবের মাঝে কিছু অনুকরণ ছিল উৎকৃষ্ট মানের, আর কিছু ছিল নিতান্তই বাজে মানের।
আনুমানিক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আন্দালুস থেকে স্বর্ণ দিনার ইউরোপে প্রবেশ করে। অতঃপর, ১২৩৮ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গ্রানাডার নাসিরী শাসনামলে দিনার দিরহামে পরিণত হয়। বেশ ভারী এই মুদ্রাগুলো অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রস্তুত করা হতো এবং এগুলো কুরআনের অনুচ্ছেদ ও শাসকদের বংশ-লতিকাসহ দীর্ঘ লৌকিক উপাখ্যান বহন করতো। নাসিরী আমলের কোনো মুদ্রাতে প্রস্তুতের সময়কাল উল্লেখ না থাকলেও সেগুলোতে থাকা 'লা গালিবা ইল্লাল্লাহ - আল্লাহ ছাড়া কোনো বিজয়ী নেই' বাক্য যে তাদের রাজনৈতিক স্লোগান, তা সহজেই শনাক্ত করা যায়। একই সময়ে, উত্তরের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো প্রায় ৪০০ বছর ধরে মুদ্রা হিসেবে কেবল আরব ও ফ্রেঞ্চ মুদ্রাই ব্যবহার করতো।
১৩শ শতাব্দির পর, মুসলিম খিলাফত একক খলীফা শাসন থেকে ছোট ছোট রাজবংশ দ্বারা শাসিত হতে শুরু করে এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে। আজকের দিনের মুদ্রার ন্যায় সেগুলো অর্ধ-স্বাধীন রাজ্যগুলোর বিভিন্ন গভর্নরদের নাম বহন করতো। এসব মুদ্রা স্বতন্ত্রভাবে তৈরি হলেও, এগুলোতে নামমাত্র খিলাফতের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করা হতো।
আজকের ন্যায় মুদ্রা সর্বদা বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম ছিল না। প্রায় শতাব্দি পূর্বেই চেকের ব্যবহার ছিল। 'চেক' শব্দটি আরবী (صك) (সাক্কুন) থেকে উৎসারিত। পণ্যদ্রব্য গন্তব্যে পৌঁছালে তার মূল্য পরিশোধের লিখিত অঙ্গীকারনামা এই চেক। ৯ম শতাব্দিতে হারুন উর-রশিদের শাসনামলে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠে, যার আওতায় একজন মুসলিম ব্যবসায়ী চাইলে বাগদাদে থাকা নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে চীনের ক্যান্টন (বর্তমান গোয়াংজু) শহরে চেক ভাঙাতে পারতো। বৈধ আইনি মুদ্রা হিসেবে বিপুল পরিমাণ মুদ্রা স্থানান্তরে যে ধরনের ঝুঁকি ও বিপত্তি জড়িত রয়েছে, সেসব বিপত্তি ও ঝুঁকি এড়াতেই চেক বা সাক্কের প্রচলন ঘটে। ব্যাংকারগণ হুন্ডি, ঋণপত্র এবং প্রত্যর্থপত্র ব্যবহার করলেও কার্যত এগুলো চেক। হুন্ডি, সাক্ক বা চেক ব্যবহারের ধারণা জনপ্রিয় করার মাধ্যমে মুসলিমগণ বাণিজ্যে আর্থিক বিনিয়োগ ও আন্তমহাদেশীয় ব্যবসাকে সম্ভবপর করেছিল।
রাজা অফফার রহস্য
১২শ বছর আগে যখন খলীফারা মুসলিম বিশ্ব শাসন করতো, তখন ইংল্যান্ড শাসন করতো রাজা অফফা। তিনি তার রাজত্বে রুপার মুদ্রার প্রচলন ঘটান - এবং সেইসাথে ম্যানকাস স্বর্ণ নামের একটি স্বর্ণ মুদ্রা বানান, যা ৩০-টি রৌপ্যর মুদ্রার সমতুল্য। ম্যানকাস স্বর্ণ মুদ্রার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটা ১৫৭ হিজরী বা ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি আব্বাসী খলীফা আল-মানসূরের আমলের একটি স্বর্ণ মুদ্রার নকল এবং এই মুদ্রার এক পাশে আরবী অক্ষরে খোদাই করে লেখা রয়েছে, "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, অংশীদারহীন এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।"
আসল দিনারের সাথে এই মুদ্রার উল্লেখ্য পার্থক্য হচ্ছে রাজা অফফা এই মুদ্রার মধ্যস্থলে OFFA REX (অফফা রেক্স) লেখাটি খোদাই করে দেন। পণ্ডিতগণ এটা ভেবে হয়রান যে, একজন ইংরেজ রাজা কেনইবা আরব মুদ্রার হুবহু নকল বানাতে যাবেন। কারো মতে, তিনি ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন, যদিও এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, তিনি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কিংবা আরব দেশগুলো পাড়ি দিয়ে তীর্থযাত্রায় যাওয়া তীর্থযাত্রীদের ব্যবহারের জন্য এমনটি করেছেন। এই মুদ্রা নিশ্চিতভাবে কোনো কারিগর দিয়ে তৈরি নয়, যেহেতু আরবীতে OFFA REX (অফফা রেক্স) লেখার কোনো অর্থ নেই, তাছাড়া এই লেখা আরবী কুফি হস্তলিপির সাপেক্ষে উল্টোভাবে লেখা এবং 'বছর' শব্দটি ভুল আরবী বানানে লিখা। মুদ্রাটি খুব সম্ভবত কোনো অ্যাংলো-স্যাক্সন কারিগর নকল করেছে।
১২০০ বছর আগে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা নতুনভাবে ঝালাই করতে এ ঘটনা বেশ সহায়ক। ৮ম শতাব্দিতে ইসলামী মুদ্রা যে কতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, রাজা অফফার এই মুদ্রা তারই প্রমাণ। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ আধুনিক সময়ের জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে হাজারেরও অধিক মুসলিম মুদ্রা খুঁজে পেয়েছে, যা এই সাক্ষ্য আমাদের সামনে তুলে ধরছে যে, এসব মুদ্রা পরিবহন ও বাণিজ্যের সুবাদে মুসলিম দেশগুলো থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজা অফফাই একমাত্র অমুসলিম শাসক ছিলেন না, যিনি আরবীয় মুদ্রা প্রস্তুত করেছিলেন। ১১শ শতাব্দির স্পেনের ক্যাথলিক যুবরাজ, অষ্টম আলফোনসো নকশা খচিত মুদ্রা বানানোর আদেশ জারি করেন, যেখানে আরবী লেখা খোদাই ছিল। ওই মুদ্রাতে তিনি নিজেকে 'ক্যাথলিকদের আমির' এবং রোমের পোপকে 'খ্রিস্টীয় চার্চ বা গির্জার ইমাম' হিসেবে অভিহিত করেন।