📄 বায়ুকল (উইন্ডমিল)
যেকোন কিছু প্রস্তুত ও উৎপাদন করতে শক্তির প্রয়োজন এবং তেলচালিত যন্ত্রের পূর্বে টেকসই উৎসসমূহ হতে শক্তির যোগান আসতো। ইসলামী বিশ্বে যোগানকৃত শক্তির কিছু অংশ আজ থেকে প্রায় হাজার বছর পূর্বে পানি দিয়ে মেটানো হতো, যেখানে পানির সাহায্যে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড নির্ভর যন্ত্রসমূহ নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে পানিকে বেশ উঁচু স্থান ও কৃত্রিম নালাতে সরবরাহ করতো। জলচালিত যাঁতাকলগুলো গম চূর্ণ-বিচূর্ণ করলেও ইসলামী বিশ্বের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে তারা বাধ্য হয়।
মৌসুমি জলপ্রবাহগুলো শুকিয়ে গেলেও আরবের বৃহত্তর মরুভূমিগুলোর একটা জিনিস ছিল - বাতাস। এসব মরুভূমির বাতাসের প্রবাহের একটা নির্দিষ্ট দিক ছিল এবং বাতাস প্রতিনিয়ত একই স্থান দিয়ে বয়ে যেত। উইন্ডমিলগুলো বেশ সাদামাটা হলেও এগুলোর উপযোগিতা এতটাই কার্যকর ছিল যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৭ম শতাব্দির পারস্যে উদ্ভাবিত উইন্ডমিল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ১২শ শতাব্দিতে উইন্ডমিল ইউরোপে প্রবশে করে।
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১০ বছর শাসন পরিচালনাকারী দ্বিতীয় খলীফা উমর (রা.)-এর নিকট পারস্যের এক লোক এসে দাবী করে যে, সে এমন এক কল বানাতে সক্ষম, যা বাতাস দিয়ে চালিত হবে। এটা শুনে খলীফা তাকে একটা কল বানানোর আদেশ করেন। এরপরই, গম ও বিভিন্ন শস্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে যাঁতাকল চালানো এবং সেচের পানি উত্তোলনে বায়ুশক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। পারস্যের সিন্তান প্রদেশে প্রথম এই রেওয়াজের সূচনা ঘটে এবং ১০ম শতাব্দির আরব ভূগোলবিদ আল-মাসউদী এই এলাকাকে 'বাতাস ও বালুর নগর' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি লিখেন, "এই এলাকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার বাগানে পানি সরবরাহের জন্য বায়ুশক্তি ব্যবহার করে পাম্প চালানো হতো।"
শুরুর দিকের উইন্ডমিলগুলো দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট হতো এবং দুর্গ, পর্বত বা উঁচু প্রাসাদের মিনারে এগুলো স্থাপন করা হতো। উপরের তলাতে যাঁতাকল ছিল এবং নিচের তলায় একটি চাকা থাকতো, যা কাপড়ে মোড়ানো ৬ বা ১২-টি পাখার সাহায্যে চালিত হতো। এগুলো উপরের যাঁতাকল ঘোরাতো। অন্যদিকে নিচের প্রকোষ্ঠের দেয়ালগুলোকে ভেতরের দিকে ক্রমশ সরু হওয়া চারটি ঢালা দিয়ে ভেদ করা হতো। এই ঢালাগুলো বাতাসকে উইন্ডমিলের পাখার দিকে ধাবিত করতো এবং সেগুলোর আবর্তন গতি বাড়িয়ে দিতো।
ওই সময় থেকে উইন্ডমিলের বিবরণ দেয়ার সময় কাঠের সিলিন্ডারের শেষপ্রান্তে সংযুক্ত যাঁতাকলের বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। অর্ধ মিটার (১.৬ ফুট) প্রন্থ এবং ৩.৫ থেকে ৪ মিটার (১১.৫ থেকে ১৩.১ ফুট) উচ্চতার এই সিলিন্ডার উত্তর-পূর্বে উন্মুক্ত উঁচু মিনারে খাড়াভাবে দণ্ডায়মান থাকতো, যেন ওই দিক থেকে আসা বাতাসের নাগাল পাওয়া যায়। সিলিন্ডারটির পাখা লতাগুল্মের আঁটি বা তাল পাতা দিয়ে তৈরি এবং তা অক্ষদণ্ডের হাতলের সাথে সংযুক্ত। মিনারে বয়ে যাওয়া বাতাস পাখাগুলোকে ধাক্কা দিতো এবং এরফলে হাতল ও যাঁতাকল ঘুরতে শুরু করতো।
মধ্যযুগীয় প্রকৌশল বিজ্ঞানে উইন্ডমিলের আবির্ভাব বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং এটা নয়া বাণিজ্যের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে।
"খেয়াল করো! কতই না বিশাল আমি! আছি আমি আমার মিনারের চূড়ায়; আমার গ্রানাইটের চোয়াল গোগ্রাসে গিলছে ভুট্টা, গম ও রাইয়ের সব দানা চূর্ণ করে বানাচ্ছি তাদের ময়দায়।
ফসলের জমির দিকে তাকাই আমি তুচ্ছভাবে; শস্যের মাঠে আমি কেবল দেখি কর্তিত ফসল, বাতাসে আমি সজোরে নিক্ষেপ করি আমার বাহুদ্বয় কারণ, আমি জানি, এসব তো আমারই জন্যে।" - হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো রচিত "The Windmill" থেকে নেয়া
ফ্রান্সের রাইপসরিষা ক্ষেতে বায়ুচালিত টার্বাইন ঘূর্ণায়মান। পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা বায়ুশক্তি ব্যবহারের দাবী পুনরুজ্জীবিত করেছে।
উইন্ডমিল (বায়ুকল)
বায়ুশক্তি
বায়ুকে শক্তি উৎপাদনে কাজে লাগানোর প্রাচীন ও আধুনিক পদ্ধতি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: যেকোন সময়ের চেয়ে শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে বায়ুশক্তি আজ সর্বাধিক জনপ্রিয়
অবস্থান: সিন্তান, পারস্য
তারিখ: ১০শ শতাব্দি হতে বর্তমান
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: ভূগোলবিদ আল-মাসউদী (১০ম শতাব্দি) এবং আল-দিমাশক্বী (১৪শ শতাব্দি) কর্তৃক রচিত ও অঙ্কিত নথি।
এক হাজার বছর পূর্বে ভূগোলবিদ আল-মাসউদী ইরানের সিন্তান প্রদেশে এবং আজকের আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের বাগানগুলোতে সেচ কাজে পানির পাম্পে উইন্ডমিলের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেন। এই অঞ্চলের নদীতে যখন পর্যাপ্ত পানি থাকতো না বা শুকিয়ে যেত, তখন পানি উত্তোলন যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে যেত। এমন পরিস্থিতি সুরাহাকল্পে মুসলিম শাসকগণ বছরের চার মাস বহমান থাকা মরুভূমির বাতাস ব্যবহার করে উইন্ডমিল তৈরির আদেশ করেন। আর এ ধারাবাহিকতায় সর্বত্র উইন্ডমিলের ছড়াছড়ি শুরু হয়।
বাতাসের নাগাল ঠিক মতো পাওয়ার জন্য মধ্য এশীয় উইন্ডমিলগুলোতে খাড়া পাখা থাকতো, যা প্রথাগত ইউরোপীয় ডিজাইনের ব্যতিক্রম ছিল। দুর্গ বা প্রাসাদের চূড়া কিংবা পর্বতশৃঙ্গের শীর্ষদেশে স্থাপিত এসব উইন্ডমিল দোতলা হতো। প্রথম তলাতে যাঁতাকলের পাথর থাকতো, যার একটি কাঠের তৈরি খাড়া সঞ্চালন দণ্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। এই সঞ্চালন দণ্ডটি অপরতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানে কাপড়ে বা তাল গাছের পাতায় মোড়ানো ছয় থেকে বারটি উইন্ডমিলের পাখা খাড়াভাবে লাগানো থাকতো। বাতাসের নাগাল পাওয়ার জন্য উত্তরপূর্ব দিকে উইন্ডমিলের কাঠামো উন্মুক্ত রাখা হতো।
শস্য গুঁড়া করা বা নিজেদের জমিতে সেচের পানি সরবরাহের মতো কাজে কৃষকদের উইন্ডমিল ব্যবহার করতে আল-মাসউদী প্রত্যক্ষ করেন। শক্তির যোগান সমস্যার সমাধানে এটা ছিল চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব এক সমাধান। অতীতে বায়ুশক্তিকে নানা উপায়ে কাজে লাগানো হতো, যেমন: দ্রুত প্রবহমান বাতাসের সাহায্যে প্রাকৃতিক বায়ুচলন বা ভেন্টিলেশনের নিশ্চিত করা।
ঘরোয়া ও শক্তি সাশ্রয়ী পারিবারিক ঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য আজ থেকে ৪,৫০০ বছর আগে উঠানসহ বাড়ি নির্মাণের ঐতিহ্য চালু হয়। কয়েকটি পরিবারে ভাগ করা যৌথ দেয়ালে নির্মিত উঠানসহ এসব বাড়ির ডিজাইনে গৃহকে কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা রাখতে হয়, তার কৌশল অন্তর্ভূত ছিল। বায়ুকল এর মধ্যে অন্যতম, যেটা বহমান বাতাসকে ছাদের উঁচু চত্বর থেকে দেয়ালের মধ্য দিয়ে ঘরের অভ্যন্তরের কামরাগুলোতে প্রবেশের পথ করে দিতো।
পরিকল্পিত উঠানবিশিষ্ট বাড়ির মেঝের বিভিন্ন স্তরে ভেতরের দিকে মুখ- করা বিভিন্ন কক্ষ ও খালি জায়গার ব্যবস্থা ছিল, যেন তা বিভিন্ন মৌসুমের সাথে মানিয়ে নেয় এবং বাড়ির নির্জনতা ও গোপনীয়তা বৃদ্ধি করে।
গরমের মৌসুমে আজ বিদ্যুৎচালিত এয়ার কন্ডিশনার সাদরে গ্রহণ করা হলেও - এটাকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে বায়ুশক্তির মাঝেই একমাত্র সমাধান নিহিত। বিভিন্ন স্থানে বায়ুচালিত টার্বাইনের আকারে নতুন ধরনের উইন্ডমিলের বিস্তৃতি ঘটেছে, যেগুলো বিভিন্ন ধাচের অসংখ্য যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত মূল মেশিন চালাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
যেকোন কিছু প্রস্তুত ও উৎপাদন করতে শক্তির প্রয়োজন এবং তেলচালিত যন্ত্রের পূর্বে টেকসই উৎসসমূহ হতে শক্তির যোগান আসতো। ইসলামী বিশ্বে যোগানকৃত শক্তির কিছু অংশ আজ থেকে প্রায় হাজার বছর পূর্বে পানি দিয়ে মেটানো হতো, যেখানে পানির সাহায্যে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড নির্ভর যন্ত্রসমূহ নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে পানিকে বেশ উঁচু স্থান ও কৃত্রিম নালাতে সরবরাহ করতো। জলচালিত যাঁতাকলগুলো গম চূর্ণ-বিচূর্ণ করলেও ইসলামী বিশ্বের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে তারা বাধ্য হয়।
মৌসুমি জলপ্রবাহগুলো শুকিয়ে গেলেও আরবের বৃহত্তর মরুভূমিগুলোর একটা জিনিস ছিল - বাতাস। এসব মরুভূমির বাতাসের প্রবাহের একটা নির্দিষ্ট দিক ছিল এবং বাতাস প্রতিনিয়ত একই স্থান দিয়ে বয়ে যেত। উইন্ডমিলগুলো বেশ সাদামাটা হলেও এগুলোর উপযোগিতা এতটাই কার্যকর ছিল যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৭ম শতাব্দির পারস্যে উদ্ভাবিত উইন্ডমিল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ১২শ শতাব্দিতে উইন্ডমিল ইউরোপে প্রবশে করে।
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১০ বছর শাসন পরিচালনাকারী দ্বিতীয় খলীফা উমর (রা.)-এর নিকট পারস্যের এক লোক এসে দাবী করে যে, সে এমন এক কল বানাতে সক্ষম, যা বাতাস দিয়ে চালিত হবে। এটা শুনে খলীফা তাকে একটা কল বানানোর আদেশ করেন। এরপরই, গম ও বিভিন্ন শস্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে যাঁতাকল চালানো এবং সেচের পানি উত্তোলনে বায়ুশক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। পারস্যের সিন্তান প্রদেশে প্রথম এই রেওয়াজের সূচনা ঘটে এবং ১০ম শতাব্দির আরব ভূগোলবিদ আল-মাসউদী এই এলাকাকে 'বাতাস ও বালুর নগর' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি লিখেন, "এই এলাকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার বাগানে পানি সরবরাহের জন্য বায়ুশক্তি ব্যবহার করে পাম্প চালানো হতো।"
শুরুর দিকের উইন্ডমিলগুলো দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট হতো এবং দুর্গ, পর্বত বা উঁচু প্রাসাদের মিনারে এগুলো স্থাপন করা হতো। উপরের তলাতে যাঁতাকল ছিল এবং নিচের তলায় একটি চাকা থাকতো, যা কাপড়ে মোড়ানো ৬ বা ১২-টি পাখার সাহায্যে চালিত হতো। এগুলো উপরের যাঁতাকল ঘোরাতো। অন্যদিকে নিচের প্রকোষ্ঠের দেয়ালগুলোকে ভেতরের দিকে ক্রমশ সরু হওয়া চারটি ঢালা দিয়ে ভেদ করা হতো। এই ঢালাগুলো বাতাসকে উইন্ডমিলের পাখার দিকে ধাবিত করতো এবং সেগুলোর আবর্তন গতি বাড়িয়ে দিতো।
ওই সময় থেকে উইন্ডমিলের বিবরণ দেয়ার সময় কাঠের সিলিন্ডারের শেষপ্রান্তে সংযুক্ত যাঁতাকলের বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। অর্ধ মিটার (১.৬ ফুট) প্রন্থ এবং ৩.৫ থেকে ৪ মিটার (১১.৫ থেকে ১৩.১ ফুট) উচ্চতার এই সিলিন্ডার উত্তর-পূর্বে উন্মুক্ত উঁচু মিনারে খাড়াভাবে দণ্ডায়মান থাকতো, যেন ওই দিক থেকে আসা বাতাসের নাগাল পাওয়া যায়। সিলিন্ডারটির পাখা লতাগুল্মের আঁটি বা তাল পাতা দিয়ে তৈরি এবং তা অক্ষদণ্ডের হাতলের সাথে সংযুক্ত। মিনারে বয়ে যাওয়া বাতাস পাখাগুলোকে ধাক্কা দিতো এবং এরফলে হাতল ও যাঁতাকল ঘুরতে শুরু করতো।
মধ্যযুগীয় প্রকৌশল বিজ্ঞানে উইন্ডমিলের আবির্ভাব বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং এটা নয়া বাণিজ্যের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে।
"খেয়াল করো! কতই না বিশাল আমি! আছি আমি আমার মিনারের চূড়ায়; আমার গ্রানাইটের চোয়াল গোগ্রাসে গিলছে ভুট্টা, গম ও রাইয়ের সব দানা চূর্ণ করে বানাচ্ছি তাদের ময়দায়।
ফসলের জমির দিকে তাকাই আমি তুচ্ছভাবে; শস্যের মাঠে আমি কেবল দেখি কর্তিত ফসল, বাতাসে আমি সজোরে নিক্ষেপ করি আমার বাহুদ্বয় কারণ, আমি জানি, এসব তো আমারই জন্যে।" - হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো রচিত "The Windmill" থেকে নেয়া
ফ্রান্সের রাইপসরিষা ক্ষেতে বায়ুচালিত টার্বাইন ঘূর্ণায়মান। পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা বায়ুশক্তি ব্যবহারের দাবী পুনরুজ্জীবিত করেছে।
উইন্ডমিল (বায়ুকল)
বায়ুশক্তি
বায়ুকে শক্তি উৎপাদনে কাজে লাগানোর প্রাচীন ও আধুনিক পদ্ধতি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: যেকোন সময়ের চেয়ে শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে বায়ুশক্তি আজ সর্বাধিক জনপ্রিয়
অবস্থান: সিন্তান, পারস্য
তারিখ: ১০শ শতাব্দি হতে বর্তমান
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: ভূগোলবিদ আল-মাসউদী (১০ম শতাব্দি) এবং আল-দিমাশক্বী (১৪শ শতাব্দি) কর্তৃক রচিত ও অঙ্কিত নথি।
এক হাজার বছর পূর্বে ভূগোলবিদ আল-মাসউদী ইরানের সিন্তান প্রদেশে এবং আজকের আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের বাগানগুলোতে সেচ কাজে পানির পাম্পে উইন্ডমিলের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেন। এই অঞ্চলের নদীতে যখন পর্যাপ্ত পানি থাকতো না বা শুকিয়ে যেত, তখন পানি উত্তোলন যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে যেত। এমন পরিস্থিতি সুরাহাকল্পে মুসলিম শাসকগণ বছরের চার মাস বহমান থাকা মরুভূমির বাতাস ব্যবহার করে উইন্ডমিল তৈরির আদেশ করেন। আর এ ধারাবাহিকতায় সর্বত্র উইন্ডমিলের ছড়াছড়ি শুরু হয়।
বাতাসের নাগাল ঠিক মতো পাওয়ার জন্য মধ্য এশীয় উইন্ডমিলগুলোতে খাড়া পাখা থাকতো, যা প্রথাগত ইউরোপীয় ডিজাইনের ব্যতিক্রম ছিল। দুর্গ বা প্রাসাদের চূড়া কিংবা পর্বতশৃঙ্গের শীর্ষদেশে স্থাপিত এসব উইন্ডমিল দোতলা হতো। প্রথম তলাতে যাঁতাকলের পাথর থাকতো, যার একটি কাঠের তৈরি খাড়া সঞ্চালন দণ্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। এই সঞ্চালন দণ্ডটি অপরতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানে কাপড়ে বা তাল গাছের পাতায় মোড়ানো ছয় থেকে বারটি উইন্ডমিলের পাখা খাড়াভাবে লাগানো থাকতো। বাতাসের নাগাল পাওয়ার জন্য উত্তরপূর্ব দিকে উইন্ডমিলের কাঠামো উন্মুক্ত রাখা হতো।
শস্য গুঁড়া করা বা নিজেদের জমিতে সেচের পানি সরবরাহের মতো কাজে কৃষকদের উইন্ডমিল ব্যবহার করতে আল-মাসউদী প্রত্যক্ষ করেন। শক্তির যোগান সমস্যার সমাধানে এটা ছিল চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব এক সমাধান। অতীতে বায়ুশক্তিকে নানা উপায়ে কাজে লাগানো হতো, যেমন: দ্রুত প্রবহমান বাতাসের সাহায্যে প্রাকৃতিক বায়ুচলন বা ভেন্টিলেশনের নিশ্চিত করা।
ঘরোয়া ও শক্তি সাশ্রয়ী পারিবারিক ঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য আজ থেকে ৪,৫০০ বছর আগে উঠানসহ বাড়ি নির্মাণের ঐতিহ্য চালু হয়। কয়েকটি পরিবারে ভাগ করা যৌথ দেয়ালে নির্মিত উঠানসহ এসব বাড়ির ডিজাইনে গৃহকে কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা রাখতে হয়, তার কৌশল অন্তর্ভূত ছিল। বায়ুকল এর মধ্যে অন্যতম, যেটা বহমান বাতাসকে ছাদের উঁচু চত্বর থেকে দেয়ালের মধ্য দিয়ে ঘরের অভ্যন্তরের কামরাগুলোতে প্রবেশের পথ করে দিতো।
পরিকল্পিত উঠানবিশিষ্ট বাড়ির মেঝের বিভিন্ন স্তরে ভেতরের দিকে মুখ- করা বিভিন্ন কক্ষ ও খালি জায়গার ব্যবস্থা ছিল, যেন তা বিভিন্ন মৌসুমের সাথে মানিয়ে নেয় এবং বাড়ির নির্জনতা ও গোপনীয়তা বৃদ্ধি করে।
গরমের মৌসুমে আজ বিদ্যুৎচালিত এয়ার কন্ডিশনার সাদরে গ্রহণ করা হলেও - এটাকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে বায়ুশক্তির মাঝেই একমাত্র সমাধান নিহিত। বিভিন্ন স্থানে বায়ুচালিত টার্বাইনের আকারে নতুন ধরনের উইন্ডমিলের বিস্তৃতি ঘটেছে, যেগুলো বিভিন্ন ধাচের অসংখ্য যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত মূল মেশিন চালাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
📄 বাণিজ্য
বাণিজ্য ইসলামের সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার অনেক সাহাবীই ব্যবসায়ী ছিলেন। বাণিজ্য ইসলামী জিন্দেগীর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বিধায় বাণিজ্যকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য চুক্তি, লেনদেন, ঋণ ও বাজার নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সুসংহত আইনের ধারা।
মানসিক ঔদার্যসম্পন্ন ব্যবসায়ী ও রুচিশীল পণ্যের আশীর্বাদে মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। স্বর্ণ ও সাদা স্বর্ণ হিসেবে পরিচিত লবণ আফ্রিকার সাহারা থেকে উত্তর ও পশ্চিমে ভ্রমণ করে মরক্কো, স্পেন ও ফ্রান্সে পৌঁছে যায় এবং অল্প পরিমাণে এসব পণ্য গ্রীস, তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়াতে পৌঁছায়। ১৪শ শতাব্দিতে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এসব সামগ্রী কড়ির খোলসের মতো করে মালদ্বীপ থেকে আফ্রিকাতে পৌঁছায়। মৃৎশিল্প ও কাগুজে মুদ্রা চীন থেকে পশ্চিমে আসলেও কাগুজে মুদ্রা মিশরে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। দরবেশ, সুলতান, পণ্ডিত ও হজ্জযাত্রীদের সাথে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীসহ বণিকদের এক সমারোহ তখন বয়ে যেত।
সিল্ক মহাসড়ক ও তার চারিপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ভূ-বাণিজ্য ছিল মুসলিম অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সমুদ্র বাণিজ্য প্রধানত আফ্রিকা ও ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে চলতো। দক্ষিণ স্পেনের মালাগা বন্দর ছিল বাণিজ্যের এক মহামিলন কেন্দ্র, যেখানে প্রায় সব দেশ বিশেষ করে ইতালির বণিকপ্রজাতন্ত্র থেকে অধিকহারে ব্যবসায়ীরা আসতো, যেমন: জেনোয়াবাসী বণিকগণ। ইবনে বতুতা জেনোয়াবাসীদের নৌকা করে আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, কারণ তারা এ অঞ্চলের বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "খ্রিস্টানরা আমাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করে নেয় এবং তারা আমাদের কাছ থেকে ভ্রমণের জন্য তারা এক পয়সাও গ্রহণ করেনি।"
মালাগার জনবহুল ঘাটসমূহে বণিকগণ রেশম, অস্ত্রসস্ত্র, অলংকার ও সোনালি রঙের মাটির তৈরি সামগ্রী থেকে শুরু করে স্পেনের সুস্বাদু ফলসহ প্রতিটি দেশের পণ্য লেনদেন করতো।
ভূমধ্যসাগরে উন্মুক্ত হয়ে থাকা নীলনদের ব-দ্বীপের (Nile Delta) মুখে অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরটি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। মসলা বাণিজ্যের যাত্রাপথে এটা ছিল ভারত সাগর থেকে লোহিত সাগর ও নীলনদ হয়ে মালামাল ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রবেশ দ্বার। ফেরোস দ্বীপ দ্বারা বিভক্ত এ বন্দরে দুটো পোতাশ্রয় রয়েছে, যার পশ্চিমেরটি মুসলিমরা এবং পূর্বেরটি খ্রিস্টানরা ব্যবহার করতো। এছাড়া এর প্রকাণ্ড বাতিঘর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য হিসেবে স্বীকৃত।
রাস্তার চারপাশে বিশ্রামের জন্য গড়ে উঠা সরাইখানাগুলো বাণিজ্য সমৃদ্ধিতে অন্যতম নিয়ামক ছিল। সরাইখানা এক ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যা মুসাফিরদের তিনদিনের জন্য বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবার সরবরাহ করতো, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনোদনেরও ব্যবস্থা করতো। এই সরাইখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য যাত্রাপথে প্রতি ৩০ কিলোমিটার (১৮.৬ মাইল) অন্তর অন্তর অবস্থিত ছিল।
বণিকরা তাদের পণ্য দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সময় সাথে করে ইসলামকেও নিয়ে যেত। গোয়াংজু (আজকের ক্যান্টন) চীনা উপকূলে ৮ম শতাব্দিতে মুসলিম ও ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গড়ে উঠে। মুসলিম বণিকগণ আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক দিকে বার্বার বণিক সম্প্রদায় সাহারা অঞ্চলে ইসলাম বার্তা নিয়ে যায়। লোহিত সাগরের সাথে নীলনদকে যুক্তকারী উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্য যাত্রাপথসমূহের যাযাবর গোষ্ঠীগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম হয়ে যায়।
বাণিজ্যিক লেনদেনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থানের প্রেক্ষিতে কিছু বাণিজ্যি কেন্দ্র ইসলামী বিশ্বে বেশ সমৃদ্ধশালী সমাজের জন্ম দেয়। তিউনিসের আল-কায়রাওয়ান ও মরক্কোর সিজিলমাসা সম্পর্কে ১০ম শতাব্দির পর্যটক ইবনে হাওকাল তার "মাসালিক ওয়া মামালিক" (যাত্রাপথ ও রাজ্য) গ্রন্থে বলেন, "পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শহর আল-কায়রাওয়ান বাণিজ্য, ধন-দৌলত ও এর বাজারের সৌন্দর্যে বাকি শহরগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি সরকারি কোষাগারের প্রধান আবুল হাসা-কে বলতে শুনেছি যে, পশ্চিমের সকল প্রদেশ ও জনপদের আয়ের পরিমাণ সাত থেকে আট কোটি দিনারের মাঝামাঝি।"
"গ্যাসকোনির উপসাগরীয় এলাকা থেকে সিন্ধু ছাড়িয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক আরবগণ বাল্টিক ইউরোপ থেকে আফ্রিকাব্যাপী বাণিজ্যিক শিল্পোদ্যোগে জড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ব ও পশ্চিমকে একত্র করেছিল।" - রবার্ট লোপেজ, মধ্যযুগ পরবর্তী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ বিষয়ক ঐতিহাসিক
ইসলামী বিশ্ব হতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা ব্যাপকহারে পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে: এনামেল-সজ্জিত কাচপণ্য, চামড়ার তৈরি সব ধরনের পণ্য, টাইলস, মৃৎসামগ্রী, কাগজ, কার্পেট, খোদাইকৃত হাতির দাঁত, সচিত্র পাণ্ডুলিপি, ধাতব শিল্পকর্ম যেমন: দামেস্কের তরবারি, পানপাত্র, মিহি তুলার কাপড় এবং দামী রেশমের বস্ত্রাদি।
মুসলিমদের তৈরি বস্ত্রাদি, ধাতব পণ্য, কাচ খণ্ড এবং সাবান বেশ চড়া দামের হতো। কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূল ও একইসাথে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল, হ্যানসেটিক বন্দরসমূহ এবং হল্যান্ডের ম্যাস্ট্রিক্টে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ মামলুক আমলে নির্মিত অত্যন্ত বিলাসী পণ্য আবিষ্কার করেন। পণ্যগুলো যে অত্যন্ত নিবিড় ও নিরবিচ্ছিন্ন শ্রমের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়।
মুসলিম সরাইখানা
মুসলিম সরাইখানাগুলো ছিল পণ্য, জীবজন্তু এবং লোকজনের বিশাল এক শোভাযাত্রা, যা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে দূরান্তে পৌঁছে যেত। তাদের উদ্দেশ্য থাকতো হজ্জ পালন, আর না হয় বাণিজ্য। এই ব্যবসায়ীগণ তাদের বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত চলে যেত, যা ভারত, পারস্য, সিরিয়া ও মিশরের মতো বিশাল দূরত্বকে একই সীমায় নিয়ে আসতো।
কিছু কিছু উটের কাফেলা এতো বিশাল হতো যে, আপনি যদি নিজের অবস্থান ছেড়ে আসেন, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে হয়তো আর সে অবস্থান খুঁজে পাবেন না। বিশালাকার ধাতুর তৈরি কড়াইয়ে খাবার রান্না করা হতো এবং তা গরীব হজ্জযাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা হতো।
যারা হাঁটতে পারতো না, খালি উটগুলো তাদের বহন করতো। ভেড়া ও ছাগল কাফেলার সাথে থাকতো, যাতে সেগুলো থেকে দুধ, পনির ও মাংসের জোগান পাওয়া যায়। উটের দুধ ও মাংস খাওয়া হতো এবং এসব পশুর উচ্ছিষ্ট শুকনো গোবর ক্যাম্পফায়ার তথা তাঁবুর আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। যাত্রাপথে ময়দা, লবণ ও পানি দিয়ে চ্যাপ্টা রুটি ও পিঠা বানানো হতো। ছাগল ও মহিষের চামড়ায় তৈরি থলেতে পানি বহন করা হতো এবং জলাধারগুলো তৃপ্তির স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। দিনের বেলায় মরুভূমির তীব্র উত্তাপ এড়াতে কাফেলাগুলো রাতের বেলায় ভ্রমণ করতো এবং যাত্রাপথ আলোকিত করতে মশাল ব্যবহার করতো। আর এতে অন্ধকার মরুভূমি আলোর আভায় ছেয়ে যেত এবং রাত পরিণত হতো দিনে।
বাণিজ্য ইসলামের সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার অনেক সাহাবীই ব্যবসায়ী ছিলেন। বাণিজ্য ইসলামী জিন্দেগীর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বিধায় বাণিজ্যকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য চুক্তি, লেনদেন, ঋণ ও বাজার নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সুসংহত আইনের ধারা।
মানসিক ঔদার্যসম্পন্ন ব্যবসায়ী ও রুচিশীল পণ্যের আশীর্বাদে মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। স্বর্ণ ও সাদা স্বর্ণ হিসেবে পরিচিত লবণ আফ্রিকার সাহারা থেকে উত্তর ও পশ্চিমে ভ্রমণ করে মরক্কো, স্পেন ও ফ্রান্সে পৌঁছে যায় এবং অল্প পরিমাণে এসব পণ্য গ্রীস, তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়াতে পৌঁছায়। ১৪শ শতাব্দিতে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এসব সামগ্রী কড়ির খোলসের মতো করে মালদ্বীপ থেকে আফ্রিকাতে পৌঁছায়। মৃৎশিল্প ও কাগুজে মুদ্রা চীন থেকে পশ্চিমে আসলেও কাগুজে মুদ্রা মিশরে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। দরবেশ, সুলতান, পণ্ডিত ও হজ্জযাত্রীদের সাথে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীসহ বণিকদের এক সমারোহ তখন বয়ে যেত।
সিল্ক মহাসড়ক ও তার চারিপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ভূ-বাণিজ্য ছিল মুসলিম অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সমুদ্র বাণিজ্য প্রধানত আফ্রিকা ও ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে চলতো। দক্ষিণ স্পেনের মালাগা বন্দর ছিল বাণিজ্যের এক মহামিলন কেন্দ্র, যেখানে প্রায় সব দেশ বিশেষ করে ইতালির বণিকপ্রজাতন্ত্র থেকে অধিকহারে ব্যবসায়ীরা আসতো, যেমন: জেনোয়াবাসী বণিকগণ। ইবনে বতুতা জেনোয়াবাসীদের নৌকা করে আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, কারণ তারা এ অঞ্চলের বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "খ্রিস্টানরা আমাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করে নেয় এবং তারা আমাদের কাছ থেকে ভ্রমণের জন্য তারা এক পয়সাও গ্রহণ করেনি।"
মালাগার জনবহুল ঘাটসমূহে বণিকগণ রেশম, অস্ত্রসস্ত্র, অলংকার ও সোনালি রঙের মাটির তৈরি সামগ্রী থেকে শুরু করে স্পেনের সুস্বাদু ফলসহ প্রতিটি দেশের পণ্য লেনদেন করতো।
ভূমধ্যসাগরে উন্মুক্ত হয়ে থাকা নীলনদের ব-দ্বীপের (Nile Delta) মুখে অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরটি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। মসলা বাণিজ্যের যাত্রাপথে এটা ছিল ভারত সাগর থেকে লোহিত সাগর ও নীলনদ হয়ে মালামাল ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রবেশ দ্বার। ফেরোস দ্বীপ দ্বারা বিভক্ত এ বন্দরে দুটো পোতাশ্রয় রয়েছে, যার পশ্চিমেরটি মুসলিমরা এবং পূর্বেরটি খ্রিস্টানরা ব্যবহার করতো। এছাড়া এর প্রকাণ্ড বাতিঘর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য হিসেবে স্বীকৃত।
রাস্তার চারপাশে বিশ্রামের জন্য গড়ে উঠা সরাইখানাগুলো বাণিজ্য সমৃদ্ধিতে অন্যতম নিয়ামক ছিল। সরাইখানা এক ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যা মুসাফিরদের তিনদিনের জন্য বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবার সরবরাহ করতো, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনোদনেরও ব্যবস্থা করতো। এই সরাইখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য যাত্রাপথে প্রতি ৩০ কিলোমিটার (১৮.৬ মাইল) অন্তর অন্তর অবস্থিত ছিল।
বণিকরা তাদের পণ্য দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সময় সাথে করে ইসলামকেও নিয়ে যেত। গোয়াংজু (আজকের ক্যান্টন) চীনা উপকূলে ৮ম শতাব্দিতে মুসলিম ও ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গড়ে উঠে। মুসলিম বণিকগণ আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক দিকে বার্বার বণিক সম্প্রদায় সাহারা অঞ্চলে ইসলাম বার্তা নিয়ে যায়। লোহিত সাগরের সাথে নীলনদকে যুক্তকারী উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্য যাত্রাপথসমূহের যাযাবর গোষ্ঠীগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম হয়ে যায়।
বাণিজ্যিক লেনদেনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থানের প্রেক্ষিতে কিছু বাণিজ্যি কেন্দ্র ইসলামী বিশ্বে বেশ সমৃদ্ধশালী সমাজের জন্ম দেয়। তিউনিসের আল-কায়রাওয়ান ও মরক্কোর সিজিলমাসা সম্পর্কে ১০ম শতাব্দির পর্যটক ইবনে হাওকাল তার "মাসালিক ওয়া মামালিক" (যাত্রাপথ ও রাজ্য) গ্রন্থে বলেন, "পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শহর আল-কায়রাওয়ান বাণিজ্য, ধন-দৌলত ও এর বাজারের সৌন্দর্যে বাকি শহরগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি সরকারি কোষাগারের প্রধান আবুল হাসা-কে বলতে শুনেছি যে, পশ্চিমের সকল প্রদেশ ও জনপদের আয়ের পরিমাণ সাত থেকে আট কোটি দিনারের মাঝামাঝি।"
"গ্যাসকোনির উপসাগরীয় এলাকা থেকে সিন্ধু ছাড়িয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক আরবগণ বাল্টিক ইউরোপ থেকে আফ্রিকাব্যাপী বাণিজ্যিক শিল্পোদ্যোগে জড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ব ও পশ্চিমকে একত্র করেছিল।" - রবার্ট লোপেজ, মধ্যযুগ পরবর্তী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ বিষয়ক ঐতিহাসিক
ইসলামী বিশ্ব হতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা ব্যাপকহারে পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে: এনামেল-সজ্জিত কাচপণ্য, চামড়ার তৈরি সব ধরনের পণ্য, টাইলস, মৃৎসামগ্রী, কাগজ, কার্পেট, খোদাইকৃত হাতির দাঁত, সচিত্র পাণ্ডুলিপি, ধাতব শিল্পকর্ম যেমন: দামেস্কের তরবারি, পানপাত্র, মিহি তুলার কাপড় এবং দামী রেশমের বস্ত্রাদি।
মুসলিমদের তৈরি বস্ত্রাদি, ধাতব পণ্য, কাচ খণ্ড এবং সাবান বেশ চড়া দামের হতো। কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূল ও একইসাথে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল, হ্যানসেটিক বন্দরসমূহ এবং হল্যান্ডের ম্যাস্ট্রিক্টে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ মামলুক আমলে নির্মিত অত্যন্ত বিলাসী পণ্য আবিষ্কার করেন। পণ্যগুলো যে অত্যন্ত নিবিড় ও নিরবিচ্ছিন্ন শ্রমের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়।
মুসলিম সরাইখানা
মুসলিম সরাইখানাগুলো ছিল পণ্য, জীবজন্তু এবং লোকজনের বিশাল এক শোভাযাত্রা, যা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে দূরান্তে পৌঁছে যেত। তাদের উদ্দেশ্য থাকতো হজ্জ পালন, আর না হয় বাণিজ্য। এই ব্যবসায়ীগণ তাদের বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত চলে যেত, যা ভারত, পারস্য, সিরিয়া ও মিশরের মতো বিশাল দূরত্বকে একই সীমায় নিয়ে আসতো।
কিছু কিছু উটের কাফেলা এতো বিশাল হতো যে, আপনি যদি নিজের অবস্থান ছেড়ে আসেন, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে হয়তো আর সে অবস্থান খুঁজে পাবেন না। বিশালাকার ধাতুর তৈরি কড়াইয়ে খাবার রান্না করা হতো এবং তা গরীব হজ্জযাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা হতো।
যারা হাঁটতে পারতো না, খালি উটগুলো তাদের বহন করতো। ভেড়া ও ছাগল কাফেলার সাথে থাকতো, যাতে সেগুলো থেকে দুধ, পনির ও মাংসের জোগান পাওয়া যায়। উটের দুধ ও মাংস খাওয়া হতো এবং এসব পশুর উচ্ছিষ্ট শুকনো গোবর ক্যাম্পফায়ার তথা তাঁবুর আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। যাত্রাপথে ময়দা, লবণ ও পানি দিয়ে চ্যাপ্টা রুটি ও পিঠা বানানো হতো। ছাগল ও মহিষের চামড়ায় তৈরি থলেতে পানি বহন করা হতো এবং জলাধারগুলো তৃপ্তির স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। দিনের বেলায় মরুভূমির তীব্র উত্তাপ এড়াতে কাফেলাগুলো রাতের বেলায় ভ্রমণ করতো এবং যাত্রাপথ আলোকিত করতে মশাল ব্যবহার করতো। আর এতে অন্ধকার মরুভূমি আলোর আভায় ছেয়ে যেত এবং রাত পরিণত হতো দিনে।
📄 বস্ত্রশিল্প (টেক্সটাইল)
মধ্যযুগীয় বাণিজ্যের বড় একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে বস্ত্রশিল্প এবং এ শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমনটি অনুমান করা হয় যে, বস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রয় বাণিজ্যই বর্তমান কর্মজীবী মানুষের অধিকাংশকে কর্মমুখর রেখেছে।
৯ম শতাব্দির মাঝামাঝিতে মুসলিম স্পেনে উৎপাদিত বস্ত্রের সুখ্যাতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি তিন শতাব্দি পরেও সোনালি কিনারা ও অলংকারখঁচিত স্পেনের রেশমি কাপড় পর্তুগালের রাণী বিয়াট্রিসের বিয়েতে ব্যবহৃত হয়।
চীনা দক্ষ কারিগরদের মতো স্পেনের মুসলিমগণ তাদের কাজে বেশ সূক্ষ্ম ও পারদর্শী হিসেবে সুপরিচিত ছিল। কেবল কর্ডোবাতেই কার্পেট, গদি, রেশমের গদি, শাল, হেলান দেয়ার নরম আসন বানানোর জন্য ৩০০০-এর মতো তাঁতি ছিল এবং কর্ডোবার চামড়া ইউরোপের চর্মকার তথা জুতা প্রস্তুতকারীদের জন্য অতি মূল্যবান ছিল, কেননা এ চামড়ায় তৈরি জুতার আগ্রহী ক্রেতা সবখানেই পাওয়া যেত। এছাড়াও স্পেনের কুয়েংকা প্রদেশের মুসলিম কারিগরগণ অত্যন্ত চমৎকার পশমি সামগ্রী, বিশেষভাবে পশমের মোটা কম্বল এবং দেয়াল বা আসবাবপত্র ঢাকার রঙিন পশমি সুতার চিত্রযুক্ত কাপড় তৈরিতে বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। এগুলো জায়নামাজ এবং সেইসাথে তাদের সুন্দর গৃহে টেবিল ও মেঝে সজ্জিতকরণে ব্যবহৃত হতো।
আন্দালুসে প্রাচ্যদেশীয় কাপড় উৎপাদনে মালাগা ও আলমেরিয়া শহর বিশেষভাবে মনোযোগী ছিল। এ শহরগুলোতে বন্দর থাকায়, যেকোন নতুন স্টাইল এবং পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এরা বেশ অগ্রগামী ছিল। মুসলিম স্পেন থেকে মিহি বস্ত্রশিল্প ইউরোপে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে।
দূর প্রাচ্য ও সেইসাথে ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রধানত পারিবারিক সাজসরঞ্জাম তৈরি ও কাপড় উৎপাদনে বস্ত্রশিল্পের ভূমিকা প্রসিদ্ধ ছিল। যাযাবর নারীগণ তাঁবুর ফিতা, ঘোড়ার পিঠে চড়ানো জিন, দোলনা এবং তাদের ভ্রাম্যমান জীবনের ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে নানা ধরনের জাঁকালো পোশাক বানাতো। এমনকি নগরের মিলনকেন্দ্র ও প্রাসাদগুলোতেও সজ্জার উপকরণ হিসেবে প্রধানত কার্পেট, পর্দা এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্ত বস্তু ব্যবহৃত হতো। চেয়ারের পরিবর্তে মানুষ কাপড়ে মোড়ানো নানা ধরনের গদি ও হেলান দেয়ার কোল বা পাশ-বালিশ ব্যবহার করতো। কাপড়ের মান ও উৎকর্ষ থেকে ব্যবহারকারীর আর্থিক সঙ্গতি প্রতিফলিত হতো।
বস্ত্র একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে। বিলাসবহুল কূটনৈতিক উপহার বানিয়ে সেগুলো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও অন্যান্য সুধীদের নিয়মিত বিরতিতে উপহার পাঠানো সাধারণ একটা রেওয়াজ ছিল এবং বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে শাসকদের নিজ প্রাসাদেই সম্মানসূচক আলখাল্লা, পাগড়ি ও অন্যান্য পোশাক-পরিচ্ছদ বোনা হতো। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে মামলুক সুলতান কর্তৃক নতুন কিসওয়া তথা অত্যন্ত মূল্যবান সজ্জায় সজ্জিত আবরণ দিয়ে মক্কা নগরীর কাবাঘর ঢেকে দেয়ার রেওয়াজ চালুর পর থেকে প্রতি বছর নতুন কিসওয়া দিয়ে কাবাগৃহ আবৃতের রেওয়াজ খলীফাদের এক বিশেষ প্রাধিকারে পরিণত হয়।
ইসলামী বিশ্বে বিস্তৃত পরিসরে বস্ত্রাদির কোনো অভাব ছিল না। ইরান থেকে স্পেন পর্যন্ত পশমি সুতা ও শণের কাপড় দিয়ে ব্যাপকহারে পোশাক প্রস্তুত করা হতো। উপরন্তু, শণের কাপড়ের বাড়তি যোগান নিশ্চিতের জন্য তা আমদানি করা হতো, যেহেতু এটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। মুসলিম সভ্যতার সমৃদ্ধির পরপর ভারতীয় আদি জাতের তুলাই শুধু ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ব্যাপকহারে উৎপন্ন হতো। এই তুলা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনেও উৎপন্ন হতো এবং দক্ষিণ স্পেনেও এটা ইউরোপে প্রবেশ করে। চামড়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা শিল্প ছিল এবং ১২শ শতাব্দির আলমোহাদ রাজবংশের অঙ্গ মানসূরের শাসনামলে ফেযে ৮৬-টি ট্যানারি (চামড়া পাকা করার কারখানা) এবং ১১৬-টি বস্ত্র রঙ করার কারখানা ছিল।
কিছু শহর ও নগর তাদের পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। শিরাজ ছিল এর পশমি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত: বাগদাদ সিংহাসনের ঝুলন্ত আচ্ছাদন ও ধূসর-বাদামী ডোরাকাটা রেশমি কাপড়ের জন্য: খুজিস্তান উট বা ছাগলের চুল থেকে তৈরি বস্ত্রের জন্য: খোরাসান সোফার চাদরের জন্য; তায়ার কার্পেটের জন্য; বুখারা জায়নামাজ এবং হেরাত স্বর্ণের কারুকার্যখচিত রেশমি বস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। কালের নিষ্পেষণ ওই সময়ের এসব পণ্যের কোনো নমুনা অবিকল না রাখলেও পশ্চিমা জাদুঘর ও প্রাচ্যের শিল্প-সংগ্রহশালাগুলোতে অন্য সময়ের বস্ত্রাদির টুকরো পাওয়া যায়। এসবের মাঝে ১৪শ শতাব্দির টিকে থাকা মিশরীয় মামুলক সুলতানের আস্তিনবিহীন রেশমি জামার অংশ সবচেয়ে মূল্যবান, যাতে খোদই করে লেখা রয়েছে, 'জ্ঞানবান সুলতান'। এটা দানজিগ শহরের সেন্ট মেরি চার্চে পাওয়া গেছে।
মুসলিম বস্ত্রাদির প্রতি ইউরোপের এই মোহের সূচনা ঠিক মধ্যযুগ থেকেই, যখন এসব বস্ত্র ক্রুসেডার ও বণিকদের দ্বারা এসব অঞ্চলে আমদানি করা হতো। এগুলোকে এতটাই মূল্য দেয়া হতো যে, পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টারকে পারস্যের অত্যন্ত দামী রেশমি কাপড়ে সমাহিত করা হয়। রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের কান্তালিয় নববধূ রাণী এলিনর ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে নিজের বিয়ের যৌতুক হিসেবে আন্দালুসের কার্পেট ইংল্যান্ডে আনেন।
১৭শ শতাব্দির দিকে ইংল্যান্ডের সাথে পারস্যের বাণিজ্য বেশ রমরমা হয়ে উঠে, আর ঠিক এ সময়ে পারস্যের বস্ত্র বাণিজ্য তার শিখরে পৌঁছায়। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহ বাণিজ্যে উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য ইংল্যান্ডকে ৩০০০ বস্তা রেশমি পোশাক ধারে প্রদান করেন; এবং এরপরেই পারস্যের রেশমি বস্ত্র আমদানির একেবারে শীর্ষে উঠে আসে। তিন বছর পরে রয়াল অ্যান (Royal Anne) নামের জাহাজ সুরাত হয়ে পারস্য থেকে রেশমি সুতায় তৈরি ১১ বস্তা পণ্য ইংল্যান্ডে নিয়ে আসে। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা প্রথম জেমস পারস্যের রেশমি বস্ত্রে এতটাই মোহমুগ্ধ হন যে, তিনি ইংল্যান্ডে রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পর্যন্ত বিবেচনা করেন। তিনি রেশমগুটি বা গুটিপোকা সংগ্রহ করেন এবং নিজের অধিকৃত ভূ-সম্পত্তি ও হোয়াইট হলের বাগানগুলোতে এসব পোকার উপযুক্ত বিকাশ ও বৃদ্ধি নিশ্চিতের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেন। তিনি রাজকীয় রেশমশিল্পের ব্যবস্থাপক ফ্রান্সের অধিবাসী জন বোনিলকে রেশম চাষ বিষয়ে একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ লিখতে আদেশ করেন, যা ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
সমসাময়িক সময়ে ভারতের সাথে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য বেশ জমজমাট হয়ে উঠে এবং আসবাবপত্রের আচ্ছাদনে ব্যবহৃত ভারতীয় ছিট কাপড় ইংল্যান্ডে পরিচিত করে তোলার পিছনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। নানা ধরনের মুসলিম নকশা ও চিত্রে চিত্রায়িত এসব সুতি কাপড় ইউরোপীয় সুতি কাপড় এবং একইসাথে দেয়াল-কাপড় (ওয়ালপেপার) উৎপাদনে আদর্শ নমুনায় পরিণত হয়।
১৭শ শতাব্দির দিকে মুসলিম বিশ্ব থেকে আমদানিকৃত বস্ত্রাদি ইউরোপের মধ্যবিত্ত শ্রেণির নিকট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং এরফলে স্থানীয় বাজার হুমকির সম্মুখীন হয়। ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় রেশম তাঁতিরা অভিযোগ উত্থাপন করে। অন্যদিকে ব্রিটিশ ও ফরাসি রেশম ও পশম ব্যবসায়ীগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর নিষোধাজ্ঞা আরোপের দাবী জানায়, কেননা তারা ভিনদেশী বস্ত্রশিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে ক্ষতিগ্রস্থ হতে ইচ্ছুক ছিল না।
ব্রিটিশ সরকার মুসলিম এলাকা থেকে রেশম আমদানির উপর বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে আইন জারি করে, যার অধীনে একইসাথে ভারতীয় ছিট কাপড় এবং পারস্য ও চীনা বস্ত্র আমদানিও নিষিদ্ধের আওতায় অন্তর্ভূক্ত হয়।
মিহি রেশম যে কেবল পারস্য থেকেই আসতো বিষয়টি এমন নয়, বরং তুরস্কের বস্ত্র কারখানাতেও মিহি রেশমের উৎপাদন হতো। বুরসার রেশমি পণ্য মানের দিক দিয়ে বেশ নজরকাড়া ছিল, সেখানকার রেশম তাঁতিরা অপূর্বসুন্দর নকশাদার কাপড় প্রস্তুত করতো, যা ইযনিক এলাকার লতাগুল্মের পুনরাবৃত্তিময় নকশা দিয়ে সজ্জিত ছিল। মৃৎশিল্প অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আপনি আরও পড়তে পারবেন। এখান থেকেই রেশম ও মখমল (এক প্রকার নরম ও মোটা কাপড়) সুলতানদের পরিবারের নিকট পৌঁছাতো। অটোমানদের পারিবারিক সোফা, হেলান দেয়ার নরম আসন ও পর্দাতে এগুলো ব্যবহৃত হতো এবং এগুলো ক্রমশ অভ্যন্তরীণ সজ্জার অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়। লেডি মন্টাগু (যার ব্যাপারে আপনি হাসপাতাল বিভাগের ভ্যাকসিন অধ্যায়ে আরও তথ্য পাবেন) তুরস্কের বস্ত্রশিল্পের খ্যাতির বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং নিজে পরিধানের মাধ্যমে তিনি তুর্কি পোশাক স্টাইলের ভূয়শী প্রশংসা করেন।
তুর্কি বস্ত্র ও পোশাকের প্রতি উৎসাহী আরেক ব্যক্তি হলেন: সুইজারল্যান্ডের প্রভাবশালী শিল্পী জিন ইটিয়েন লিওটার্ড, যিনি ইস্তাম্বুলে ৫ বছর বসবাস করেন এবং সেখানে থাকাকালে তিনি স্থানীয় তুর্কিদের মতো পোশাক পরতেন। ইউরোপ জুড়ে তুর্কি পোশাক পরিধানের কালচার বিস্তৃতির পিছনে তার অংকিত 'en Sultane' চিত্রকর্মের নারী মডেলসমূহ বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে।
আজকের দিনেও এমন বহু পণ্য রয়েছে, যেগুলো মুসলিম নাম বহন করে, যেমন: মসলিন এসেছে ইরাকের মাওসুল শহরের নাম থেকে, মূলত এ শহরেই পণ্যটি প্রথম প্রস্তুত করা হয়; দামাস্ক (damask) এসেছে দামেস্ক থেকে, বাল্ডাসীন (baldachin - সিংহাসনের আচ্ছাদন) এসেছে বাগদাদীয়া হতে ('বাগদাদে প্রস্তুতকৃত'), গোজ (gauze – তুলা বা রেশমের তৈরি কাপড় বিশেষ) এসেছে গাজা শহরের নাম থেকে, কটন (cotton – তুলা) এসেছে আরবী কুতন শব্দ হতে (যার অর্থ: কাঁচা তুলা) এবং স্যাটিন (satin – রেশমি বস্ত্র) এসেছে জায়তুনী শব্দ থেকে: বস্তুত সিঙ্গুয়ান কোয়ানের চীনা বন্দর থেকে আমদানি করার পর মুসলিমগণ এটার এই নাম রাখেন।
মধ্যযুগীয় বাণিজ্যের বড় একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে বস্ত্রশিল্প এবং এ শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমনটি অনুমান করা হয় যে, বস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রয় বাণিজ্যই বর্তমান কর্মজীবী মানুষের অধিকাংশকে কর্মমুখর রেখেছে।
৯ম শতাব্দির মাঝামাঝিতে মুসলিম স্পেনে উৎপাদিত বস্ত্রের সুখ্যাতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি তিন শতাব্দি পরেও সোনালি কিনারা ও অলংকারখঁচিত স্পেনের রেশমি কাপড় পর্তুগালের রাণী বিয়াট্রিসের বিয়েতে ব্যবহৃত হয়।
চীনা দক্ষ কারিগরদের মতো স্পেনের মুসলিমগণ তাদের কাজে বেশ সূক্ষ্ম ও পারদর্শী হিসেবে সুপরিচিত ছিল। কেবল কর্ডোবাতেই কার্পেট, গদি, রেশমের গদি, শাল, হেলান দেয়ার নরম আসন বানানোর জন্য ৩০০০-এর মতো তাঁতি ছিল এবং কর্ডোবার চামড়া ইউরোপের চর্মকার তথা জুতা প্রস্তুতকারীদের জন্য অতি মূল্যবান ছিল, কেননা এ চামড়ায় তৈরি জুতার আগ্রহী ক্রেতা সবখানেই পাওয়া যেত। এছাড়াও স্পেনের কুয়েংকা প্রদেশের মুসলিম কারিগরগণ অত্যন্ত চমৎকার পশমি সামগ্রী, বিশেষভাবে পশমের মোটা কম্বল এবং দেয়াল বা আসবাবপত্র ঢাকার রঙিন পশমি সুতার চিত্রযুক্ত কাপড় তৈরিতে বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। এগুলো জায়নামাজ এবং সেইসাথে তাদের সুন্দর গৃহে টেবিল ও মেঝে সজ্জিতকরণে ব্যবহৃত হতো।
আন্দালুসে প্রাচ্যদেশীয় কাপড় উৎপাদনে মালাগা ও আলমেরিয়া শহর বিশেষভাবে মনোযোগী ছিল। এ শহরগুলোতে বন্দর থাকায়, যেকোন নতুন স্টাইল এবং পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এরা বেশ অগ্রগামী ছিল। মুসলিম স্পেন থেকে মিহি বস্ত্রশিল্প ইউরোপে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে।
দূর প্রাচ্য ও সেইসাথে ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রধানত পারিবারিক সাজসরঞ্জাম তৈরি ও কাপড় উৎপাদনে বস্ত্রশিল্পের ভূমিকা প্রসিদ্ধ ছিল। যাযাবর নারীগণ তাঁবুর ফিতা, ঘোড়ার পিঠে চড়ানো জিন, দোলনা এবং তাদের ভ্রাম্যমান জীবনের ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে নানা ধরনের জাঁকালো পোশাক বানাতো। এমনকি নগরের মিলনকেন্দ্র ও প্রাসাদগুলোতেও সজ্জার উপকরণ হিসেবে প্রধানত কার্পেট, পর্দা এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্ত বস্তু ব্যবহৃত হতো। চেয়ারের পরিবর্তে মানুষ কাপড়ে মোড়ানো নানা ধরনের গদি ও হেলান দেয়ার কোল বা পাশ-বালিশ ব্যবহার করতো। কাপড়ের মান ও উৎকর্ষ থেকে ব্যবহারকারীর আর্থিক সঙ্গতি প্রতিফলিত হতো।
বস্ত্র একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে। বিলাসবহুল কূটনৈতিক উপহার বানিয়ে সেগুলো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও অন্যান্য সুধীদের নিয়মিত বিরতিতে উপহার পাঠানো সাধারণ একটা রেওয়াজ ছিল এবং বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে শাসকদের নিজ প্রাসাদেই সম্মানসূচক আলখাল্লা, পাগড়ি ও অন্যান্য পোশাক-পরিচ্ছদ বোনা হতো। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দে মামলুক সুলতান কর্তৃক নতুন কিসওয়া তথা অত্যন্ত মূল্যবান সজ্জায় সজ্জিত আবরণ দিয়ে মক্কা নগরীর কাবাঘর ঢেকে দেয়ার রেওয়াজ চালুর পর থেকে প্রতি বছর নতুন কিসওয়া দিয়ে কাবাগৃহ আবৃতের রেওয়াজ খলীফাদের এক বিশেষ প্রাধিকারে পরিণত হয়।
ইসলামী বিশ্বে বিস্তৃত পরিসরে বস্ত্রাদির কোনো অভাব ছিল না। ইরান থেকে স্পেন পর্যন্ত পশমি সুতা ও শণের কাপড় দিয়ে ব্যাপকহারে পোশাক প্রস্তুত করা হতো। উপরন্তু, শণের কাপড়ের বাড়তি যোগান নিশ্চিতের জন্য তা আমদানি করা হতো, যেহেতু এটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। মুসলিম সভ্যতার সমৃদ্ধির পরপর ভারতীয় আদি জাতের তুলাই শুধু ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ব্যাপকহারে উৎপন্ন হতো। এই তুলা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনেও উৎপন্ন হতো এবং দক্ষিণ স্পেনেও এটা ইউরোপে প্রবেশ করে। চামড়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা শিল্প ছিল এবং ১২শ শতাব্দির আলমোহাদ রাজবংশের অঙ্গ মানসূরের শাসনামলে ফেযে ৮৬-টি ট্যানারি (চামড়া পাকা করার কারখানা) এবং ১১৬-টি বস্ত্র রঙ করার কারখানা ছিল।
কিছু শহর ও নগর তাদের পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। শিরাজ ছিল এর পশমি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত: বাগদাদ সিংহাসনের ঝুলন্ত আচ্ছাদন ও ধূসর-বাদামী ডোরাকাটা রেশমি কাপড়ের জন্য: খুজিস্তান উট বা ছাগলের চুল থেকে তৈরি বস্ত্রের জন্য: খোরাসান সোফার চাদরের জন্য; তায়ার কার্পেটের জন্য; বুখারা জায়নামাজ এবং হেরাত স্বর্ণের কারুকার্যখচিত রেশমি বস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। কালের নিষ্পেষণ ওই সময়ের এসব পণ্যের কোনো নমুনা অবিকল না রাখলেও পশ্চিমা জাদুঘর ও প্রাচ্যের শিল্প-সংগ্রহশালাগুলোতে অন্য সময়ের বস্ত্রাদির টুকরো পাওয়া যায়। এসবের মাঝে ১৪শ শতাব্দির টিকে থাকা মিশরীয় মামুলক সুলতানের আস্তিনবিহীন রেশমি জামার অংশ সবচেয়ে মূল্যবান, যাতে খোদই করে লেখা রয়েছে, 'জ্ঞানবান সুলতান'। এটা দানজিগ শহরের সেন্ট মেরি চার্চে পাওয়া গেছে।
মুসলিম বস্ত্রাদির প্রতি ইউরোপের এই মোহের সূচনা ঠিক মধ্যযুগ থেকেই, যখন এসব বস্ত্র ক্রুসেডার ও বণিকদের দ্বারা এসব অঞ্চলে আমদানি করা হতো। এগুলোকে এতটাই মূল্য দেয়া হতো যে, পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টারকে পারস্যের অত্যন্ত দামী রেশমি কাপড়ে সমাহিত করা হয়। রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের কান্তালিয় নববধূ রাণী এলিনর ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে নিজের বিয়ের যৌতুক হিসেবে আন্দালুসের কার্পেট ইংল্যান্ডে আনেন।
১৭শ শতাব্দির দিকে ইংল্যান্ডের সাথে পারস্যের বাণিজ্য বেশ রমরমা হয়ে উঠে, আর ঠিক এ সময়ে পারস্যের বস্ত্র বাণিজ্য তার শিখরে পৌঁছায়। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহ বাণিজ্যে উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য ইংল্যান্ডকে ৩০০০ বস্তা রেশমি পোশাক ধারে প্রদান করেন; এবং এরপরেই পারস্যের রেশমি বস্ত্র আমদানির একেবারে শীর্ষে উঠে আসে। তিন বছর পরে রয়াল অ্যান (Royal Anne) নামের জাহাজ সুরাত হয়ে পারস্য থেকে রেশমি সুতায় তৈরি ১১ বস্তা পণ্য ইংল্যান্ডে নিয়ে আসে। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা প্রথম জেমস পারস্যের রেশমি বস্ত্রে এতটাই মোহমুগ্ধ হন যে, তিনি ইংল্যান্ডে রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পর্যন্ত বিবেচনা করেন। তিনি রেশমগুটি বা গুটিপোকা সংগ্রহ করেন এবং নিজের অধিকৃত ভূ-সম্পত্তি ও হোয়াইট হলের বাগানগুলোতে এসব পোকার উপযুক্ত বিকাশ ও বৃদ্ধি নিশ্চিতের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেন। তিনি রাজকীয় রেশমশিল্পের ব্যবস্থাপক ফ্রান্সের অধিবাসী জন বোনিলকে রেশম চাষ বিষয়ে একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ লিখতে আদেশ করেন, যা ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
সমসাময়িক সময়ে ভারতের সাথে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য বেশ জমজমাট হয়ে উঠে এবং আসবাবপত্রের আচ্ছাদনে ব্যবহৃত ভারতীয় ছিট কাপড় ইংল্যান্ডে পরিচিত করে তোলার পিছনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। নানা ধরনের মুসলিম নকশা ও চিত্রে চিত্রায়িত এসব সুতি কাপড় ইউরোপীয় সুতি কাপড় এবং একইসাথে দেয়াল-কাপড় (ওয়ালপেপার) উৎপাদনে আদর্শ নমুনায় পরিণত হয়।
১৭শ শতাব্দির দিকে মুসলিম বিশ্ব থেকে আমদানিকৃত বস্ত্রাদি ইউরোপের মধ্যবিত্ত শ্রেণির নিকট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং এরফলে স্থানীয় বাজার হুমকির সম্মুখীন হয়। ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় রেশম তাঁতিরা অভিযোগ উত্থাপন করে। অন্যদিকে ব্রিটিশ ও ফরাসি রেশম ও পশম ব্যবসায়ীগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর নিষোধাজ্ঞা আরোপের দাবী জানায়, কেননা তারা ভিনদেশী বস্ত্রশিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে ক্ষতিগ্রস্থ হতে ইচ্ছুক ছিল না।
ব্রিটিশ সরকার মুসলিম এলাকা থেকে রেশম আমদানির উপর বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে আইন জারি করে, যার অধীনে একইসাথে ভারতীয় ছিট কাপড় এবং পারস্য ও চীনা বস্ত্র আমদানিও নিষিদ্ধের আওতায় অন্তর্ভূক্ত হয়।
মিহি রেশম যে কেবল পারস্য থেকেই আসতো বিষয়টি এমন নয়, বরং তুরস্কের বস্ত্র কারখানাতেও মিহি রেশমের উৎপাদন হতো। বুরসার রেশমি পণ্য মানের দিক দিয়ে বেশ নজরকাড়া ছিল, সেখানকার রেশম তাঁতিরা অপূর্বসুন্দর নকশাদার কাপড় প্রস্তুত করতো, যা ইযনিক এলাকার লতাগুল্মের পুনরাবৃত্তিময় নকশা দিয়ে সজ্জিত ছিল। মৃৎশিল্প অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আপনি আরও পড়তে পারবেন। এখান থেকেই রেশম ও মখমল (এক প্রকার নরম ও মোটা কাপড়) সুলতানদের পরিবারের নিকট পৌঁছাতো। অটোমানদের পারিবারিক সোফা, হেলান দেয়ার নরম আসন ও পর্দাতে এগুলো ব্যবহৃত হতো এবং এগুলো ক্রমশ অভ্যন্তরীণ সজ্জার অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়। লেডি মন্টাগু (যার ব্যাপারে আপনি হাসপাতাল বিভাগের ভ্যাকসিন অধ্যায়ে আরও তথ্য পাবেন) তুরস্কের বস্ত্রশিল্পের খ্যাতির বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং নিজে পরিধানের মাধ্যমে তিনি তুর্কি পোশাক স্টাইলের ভূয়শী প্রশংসা করেন।
তুর্কি বস্ত্র ও পোশাকের প্রতি উৎসাহী আরেক ব্যক্তি হলেন: সুইজারল্যান্ডের প্রভাবশালী শিল্পী জিন ইটিয়েন লিওটার্ড, যিনি ইস্তাম্বুলে ৫ বছর বসবাস করেন এবং সেখানে থাকাকালে তিনি স্থানীয় তুর্কিদের মতো পোশাক পরতেন। ইউরোপ জুড়ে তুর্কি পোশাক পরিধানের কালচার বিস্তৃতির পিছনে তার অংকিত 'en Sultane' চিত্রকর্মের নারী মডেলসমূহ বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে।
আজকের দিনেও এমন বহু পণ্য রয়েছে, যেগুলো মুসলিম নাম বহন করে, যেমন: মসলিন এসেছে ইরাকের মাওসুল শহরের নাম থেকে, মূলত এ শহরেই পণ্যটি প্রথম প্রস্তুত করা হয়; দামাস্ক (damask) এসেছে দামেস্ক থেকে, বাল্ডাসীন (baldachin - সিংহাসনের আচ্ছাদন) এসেছে বাগদাদীয়া হতে ('বাগদাদে প্রস্তুতকৃত'), গোজ (gauze – তুলা বা রেশমের তৈরি কাপড় বিশেষ) এসেছে গাজা শহরের নাম থেকে, কটন (cotton – তুলা) এসেছে আরবী কুতন শব্দ হতে (যার অর্থ: কাঁচা তুলা) এবং স্যাটিন (satin – রেশমি বস্ত্র) এসেছে জায়তুনী শব্দ থেকে: বস্তুত সিঙ্গুয়ান কোয়ানের চীনা বন্দর থেকে আমদানি করার পর মুসলিমগণ এটার এই নাম রাখেন।
📄 কাগজ
আজকের দিনে কাগজ খুবই সাধারণ একটি পণ্য হলেও আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণে কাগজের ভূমিকা অপরিহার্য। ম্যাগাজিন, টিভিসূচি, সংবাদপত্র থেকে কাগজের তোয়ালে ও শুভেচ্ছা কার্ড – এগুলোতে প্রতিদিন কী পরিমাণ কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা চিন্তা করলেই কাগজের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয় হবে।
৭৫১ খ্রিস্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে চীনা যুদ্ধবন্দীদের আটকের পর থেকেই প্রায় ১১শ বছর পূর্বে বাগদাদের মুসলিমগণ কাগজ উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধবন্দীদের আটককারী মুসলিম সেনারা কাগজ উৎপাদনের চীনা গুপ্ত প্রক্রিয়া জেনে নেয় এবং অতিসত্বর এসব প্রক্রিয়াতে ব্যাপক উৎকর্ষ আনার পাশাপাশি বাগদাদের কারখানা থেকে শুরু করে সুদূর পশ্চিমের দামেস্ক, তাইবেরিয়াস ও সিরিয়ার ত্রিপলী পর্যন্ত কাগজের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে কাগজের মূল্যও কমতে থাকে এবং গুণগত মানে তা উন্নত থেকে উন্নত হতে থাকে। দামেস্কের কারখানাগুলোই ছিল ইউরোপে কাগজ সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস।
সিরিয়ার কারখানাগুলো শণ উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় কাগজ উৎপাদনে তারা বেশ সুবিধা পায়। শণ দৈর্ঘ্য ও মানের দিক দিয়ে শক্ত তন্তুর বিশেষ কাঁচামাল, যা উৎকৃষ্ট মানের কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে শণে তৈরি কাগজ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে সমাদৃত। শণ দিয়ে কাগজ উৎপাদন বেশ সাশ্রয়ী, এমনকি তা কাঠে উৎপাদিত কাগজের উৎপাদন মূল্যের অর্ধেকের চেয়েও কম।
শণের পাশাপাশি মুসলিমগণ লিনেন নামক তন্তুর প্রচলন ঘটায় এবং কাগজ উৎপাদনে কাঁচামালা হিসেবে এটা চীনাদের ব্যবহৃত তুঁতগাছের বাকলের স্থান দখল করে নেয়। লিনেনের কাপড় টুকরো করে পানিতে ভিজিয়ে রেখে খামির বানানো হতো। এরপর এগুলো সিদ্ধ করে ক্ষারধর্মী অবশেষ ও ময়লা অপসারণ করা হতো। পরিচ্ছন্ন কাপড়ের টুকরোগুলোকে ভারী মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মণ্ডে পরিণত করার মতো যুগান্তকারী প্রক্রিয়ার সূত্রপাত মুসলিমদের হাত ধরেই ঘটে।
মুসলিমগণ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করে তুলা দিয়ে কাগজ বানানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত চালায়। মাদ্রিদের এসকোরিয়াল লাইব্রেরিতে ১১শ শতাব্দীর একটি মুসলিম পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়, যেখানে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে।
৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কাগজ উৎপাদন মিশর পর্যন্ত পৌঁছায় এবং খুব সম্ভবত কাগজে লিখিত কুরআনের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দশম শতাব্দীর হবে। মিশর হয়ে কাগজ আরও পশ্চিমে যাত্রা করে উত্তর আফ্রিকা থেকে মরক্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অন্যান্য বহু বিষয়ের মতো এটাও সেখান থেকে প্রণালী পাড়ি দিয়ে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুসলিম স্পেনে পৌঁছায়। আন্দালুসের মুসলিমগণ এখান থেকেই কাগজ উৎপাদন কৌশল রপ্ত করে নেয় এবং ভ্যালেন্সিয়ার নিকটস্থ জাটিভা শহর শাতিবী নামে পরিচিত সরু, মসৃণ ও উজ্জ্বল কাগজ উৎপাদনে ব্যাপক সুখ্যাতি লাভ করে। বাগদাদের কারখানায় উৎপাদন চালু হওয়ার ২০০ বছরের মধ্যে কাগজের ব্যবহার গোটা ইসলামী বিশ্বে সাধারণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়।
এর মানে: বই প্রস্তুত আগের তুলনায় বেশ সহজ হওয়ার পাশাপাশি খরচের দিক দিয়ে বেশ সাশ্রয়ী হয়ে উঠে এবং সেইসাথে প্যাপিরাস ও লেখার উপযোগী পশুচর্মের ন্যায় দামী ও সহজলভ্য নয়, লেখার এমন উপকরণের জায়গা কাগজ দখল করে নেয়। এটা বইয়ের উৎপাদন বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। কাগজের পূর্বে বই প্রস্তুত করা বেশ জটিল ও ব্যাপক কারিগরি নৈপুণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। অনুলিপিকারদের শ্রমের মাধ্যমে বই বানানো হতো বলে কাজটি বেশ জটিল এবং দক্ষ হাতের ছোঁয়া থাকায় কাজটিতে কারিগরি নৈপুণ্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ছিল। কাগজের বদৌলতে বই প্রস্তুতে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হতো, তা হ্রাস পেলেও কারিগরি নৈপুণ্যের বিষয়টি অপরিবর্তিত থাকে। ফলে মুসলিম বিশ্বে শত শত নয়, বরং হাজার হাজার তথ্যসমৃদ্ধ বই-পুস্তক সহজলভ্য হয়ে পড়ে, যা সমৃদ্ধশীল বই বাণিজ্য ও শেখার সংস্কৃতিকে দারুণভাবে চাঙ্গা করে। স্পষ্টত, বই প্রস্তুত শিল্পে উৎকর্ষের চূড়ান্ত বিপ্লব আরও পরে সংঘটিত হয়, যখন ইউরোপে ছাপাখানার ব্যবহার শুরু হয়।
কাগজ উৎপাদনের ব্যাপক বিস্তৃতি একইসাথে রঞ্জক, কালি উৎপাদন, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতকরণের মতো নানা পেশা সৃষ্টির পিছনে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি শিল্পের মতো বিদ্যাগুলোও এর দ্বারা বেশ উপকৃত হয়। ১১শ শতাব্দির তিউনিসের ইবনে বাদীসের ন্যায় চিন্তানায়কের রচিত “উমদাতুল কুত্তাব” (লিপিকারদের সহায়ক হাতিয়ার) শীর্ষক গ্রন্থে ছিল: কলমের মাহাত্ম, বিভিন্ন রঙের কালির প্রস্তুতপ্রণালী, রঞ্জক ও বিভিন্ন মিশ্রণ দিয়ে রঙকরণ, লেখার সূক্ষ্ম কৌশল এবং কাগজ প্রস্তুতের নানা আলোচনা।
খ্রিস্টান ইউরোপে ১২৯৩ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম বলোনিয়া শহরে কাগজকল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৩০৯ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের নজির মেলে। কাগজ ও বেশ সন্তায় প্রস্তুতকৃত বইয়ের সমাহার ইউরোপের আনাচে-কানাচে জ্ঞানের বিকাশকে আরও বেগবান করে।
ডেনিশ ঐতিহাসিক ইয়োহান পিডারসেন বলেন, ব্যাপকভিত্তিতে কাগজ উৎপাদনে মুসলিমগণ "কেবল ইসলামী বইয়ের ইতিহাস নয়, বরং গোটা বিশ্বের বইয়ের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ কৃতিত্বের আসন অলংকৃত করে আছে।"
কাগজ সজ্জিতকরণ
কাগজ সজ্জিতকরণে মুসলিমরা নানা কলা-কৌশল উদ্ভাবন করে, যা আজকের দিনেও বিভিন্ন লেখার কাগজ ও বইয়ে দেখা যায়। কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়াটা এমনই এক কায়দা, যেটা কাগজকে শিরাযুক্ত কাপড়ের রূপ দেয়; এ ধরনের কাগজ গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি আবৃত করতে ব্যবহৃত হতো।
কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই কৌশল তুর্কি ভাষায় ইব্রু (অর্থ: মেঘলা) অথবা আক্র (অর্থ: পানিমুখ) নামে পরিচিত। ইকু শব্দটি এসেছে প্রাচীন মধ্য এশীয় ভাষা হতে, যার অর্থ: 'শিরাযুক্ত কাপড় বা কাগজ'। এর আদি উৎস সম্ভবত চীনে মিলবে এবং সিল্ক রোড যোগে কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই কৌশল ইরানে প্রবেশ করে, অতঃপর তা আনাতোলিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে ইকু নাম ধারণ করে।
১৬শ শতাব্দির শেষের দিকে আনাতোলিয়া থেকে আগত বণিক, কূটনৈতিক ও পর্যটকগণ কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই শিল্পকে ইউরোপে নিয়ে আসে এবং ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এটা বইপ্রেমীদের পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হয়, যা 'তুর্কি কাগজ' বা 'কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার তুর্কি কৌশল' নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে এর ব্যাপক ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।
ইব্রু নিয়ে নানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেমন: ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে আথানাসিয়াস কার্চার Discourse on Decorating Paper in the Turkish Manner (তুর্কি নিয়মে কাগজের সজ্জাকরণ) নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৭শ শতাব্দির এই জার্মান পণ্ডিত রোমে কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই শিল্পের বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আজকের দিনে কাগজ খুবই সাধারণ একটি পণ্য হলেও আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণে কাগজের ভূমিকা অপরিহার্য। ম্যাগাজিন, টিভিসূচি, সংবাদপত্র থেকে কাগজের তোয়ালে ও শুভেচ্ছা কার্ড – এগুলোতে প্রতিদিন কী পরিমাণ কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা চিন্তা করলেই কাগজের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয় হবে।
৭৫১ খ্রিস্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে চীনা যুদ্ধবন্দীদের আটকের পর থেকেই প্রায় ১১শ বছর পূর্বে বাগদাদের মুসলিমগণ কাগজ উৎপাদনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধবন্দীদের আটককারী মুসলিম সেনারা কাগজ উৎপাদনের চীনা গুপ্ত প্রক্রিয়া জেনে নেয় এবং অতিসত্বর এসব প্রক্রিয়াতে ব্যাপক উৎকর্ষ আনার পাশাপাশি বাগদাদের কারখানা থেকে শুরু করে সুদূর পশ্চিমের দামেস্ক, তাইবেরিয়াস ও সিরিয়ার ত্রিপলী পর্যন্ত কাগজের ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে কাগজের মূল্যও কমতে থাকে এবং গুণগত মানে তা উন্নত থেকে উন্নত হতে থাকে। দামেস্কের কারখানাগুলোই ছিল ইউরোপে কাগজ সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস।
সিরিয়ার কারখানাগুলো শণ উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় কাগজ উৎপাদনে তারা বেশ সুবিধা পায়। শণ দৈর্ঘ্য ও মানের দিক দিয়ে শক্ত তন্তুর বিশেষ কাঁচামাল, যা উৎকৃষ্ট মানের কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে শণে তৈরি কাগজ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে সমাদৃত। শণ দিয়ে কাগজ উৎপাদন বেশ সাশ্রয়ী, এমনকি তা কাঠে উৎপাদিত কাগজের উৎপাদন মূল্যের অর্ধেকের চেয়েও কম।
শণের পাশাপাশি মুসলিমগণ লিনেন নামক তন্তুর প্রচলন ঘটায় এবং কাগজ উৎপাদনে কাঁচামালা হিসেবে এটা চীনাদের ব্যবহৃত তুঁতগাছের বাকলের স্থান দখল করে নেয়। লিনেনের কাপড় টুকরো করে পানিতে ভিজিয়ে রেখে খামির বানানো হতো। এরপর এগুলো সিদ্ধ করে ক্ষারধর্মী অবশেষ ও ময়লা অপসারণ করা হতো। পরিচ্ছন্ন কাপড়ের টুকরোগুলোকে ভারী মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মণ্ডে পরিণত করার মতো যুগান্তকারী প্রক্রিয়ার সূত্রপাত মুসলিমদের হাত ধরেই ঘটে।
মুসলিমগণ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করে তুলা দিয়ে কাগজ বানানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত চালায়। মাদ্রিদের এসকোরিয়াল লাইব্রেরিতে ১১শ শতাব্দীর একটি মুসলিম পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়, যেখানে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে।
৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কাগজ উৎপাদন মিশর পর্যন্ত পৌঁছায় এবং খুব সম্ভবত কাগজে লিখিত কুরআনের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দশম শতাব্দীর হবে। মিশর হয়ে কাগজ আরও পশ্চিমে যাত্রা করে উত্তর আফ্রিকা থেকে মরক্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অন্যান্য বহু বিষয়ের মতো এটাও সেখান থেকে প্রণালী পাড়ি দিয়ে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুসলিম স্পেনে পৌঁছায়। আন্দালুসের মুসলিমগণ এখান থেকেই কাগজ উৎপাদন কৌশল রপ্ত করে নেয় এবং ভ্যালেন্সিয়ার নিকটস্থ জাটিভা শহর শাতিবী নামে পরিচিত সরু, মসৃণ ও উজ্জ্বল কাগজ উৎপাদনে ব্যাপক সুখ্যাতি লাভ করে। বাগদাদের কারখানায় উৎপাদন চালু হওয়ার ২০০ বছরের মধ্যে কাগজের ব্যবহার গোটা ইসলামী বিশ্বে সাধারণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়।
এর মানে: বই প্রস্তুত আগের তুলনায় বেশ সহজ হওয়ার পাশাপাশি খরচের দিক দিয়ে বেশ সাশ্রয়ী হয়ে উঠে এবং সেইসাথে প্যাপিরাস ও লেখার উপযোগী পশুচর্মের ন্যায় দামী ও সহজলভ্য নয়, লেখার এমন উপকরণের জায়গা কাগজ দখল করে নেয়। এটা বইয়ের উৎপাদন বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। কাগজের পূর্বে বই প্রস্তুত করা বেশ জটিল ও ব্যাপক কারিগরি নৈপুণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। অনুলিপিকারদের শ্রমের মাধ্যমে বই বানানো হতো বলে কাজটি বেশ জটিল এবং দক্ষ হাতের ছোঁয়া থাকায় কাজটিতে কারিগরি নৈপুণ্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ছিল। কাগজের বদৌলতে বই প্রস্তুতে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হতো, তা হ্রাস পেলেও কারিগরি নৈপুণ্যের বিষয়টি অপরিবর্তিত থাকে। ফলে মুসলিম বিশ্বে শত শত নয়, বরং হাজার হাজার তথ্যসমৃদ্ধ বই-পুস্তক সহজলভ্য হয়ে পড়ে, যা সমৃদ্ধশীল বই বাণিজ্য ও শেখার সংস্কৃতিকে দারুণভাবে চাঙ্গা করে। স্পষ্টত, বই প্রস্তুত শিল্পে উৎকর্ষের চূড়ান্ত বিপ্লব আরও পরে সংঘটিত হয়, যখন ইউরোপে ছাপাখানার ব্যবহার শুরু হয়।
কাগজ উৎপাদনের ব্যাপক বিস্তৃতি একইসাথে রঞ্জক, কালি উৎপাদন, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতকরণের মতো নানা পেশা সৃষ্টির পিছনে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি শিল্পের মতো বিদ্যাগুলোও এর দ্বারা বেশ উপকৃত হয়। ১১শ শতাব্দির তিউনিসের ইবনে বাদীসের ন্যায় চিন্তানায়কের রচিত “উমদাতুল কুত্তাব” (লিপিকারদের সহায়ক হাতিয়ার) শীর্ষক গ্রন্থে ছিল: কলমের মাহাত্ম, বিভিন্ন রঙের কালির প্রস্তুতপ্রণালী, রঞ্জক ও বিভিন্ন মিশ্রণ দিয়ে রঙকরণ, লেখার সূক্ষ্ম কৌশল এবং কাগজ প্রস্তুতের নানা আলোচনা।
খ্রিস্টান ইউরোপে ১২৯৩ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম বলোনিয়া শহরে কাগজকল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৩০৯ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম কাগজ ব্যবহারের নজির মেলে। কাগজ ও বেশ সন্তায় প্রস্তুতকৃত বইয়ের সমাহার ইউরোপের আনাচে-কানাচে জ্ঞানের বিকাশকে আরও বেগবান করে।
ডেনিশ ঐতিহাসিক ইয়োহান পিডারসেন বলেন, ব্যাপকভিত্তিতে কাগজ উৎপাদনে মুসলিমগণ "কেবল ইসলামী বইয়ের ইতিহাস নয়, বরং গোটা বিশ্বের বইয়ের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ কৃতিত্বের আসন অলংকৃত করে আছে।"
কাগজ সজ্জিতকরণ
কাগজ সজ্জিতকরণে মুসলিমরা নানা কলা-কৌশল উদ্ভাবন করে, যা আজকের দিনেও বিভিন্ন লেখার কাগজ ও বইয়ে দেখা যায়। কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়াটা এমনই এক কায়দা, যেটা কাগজকে শিরাযুক্ত কাপড়ের রূপ দেয়; এ ধরনের কাগজ গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি আবৃত করতে ব্যবহৃত হতো।
কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই কৌশল তুর্কি ভাষায় ইব্রু (অর্থ: মেঘলা) অথবা আক্র (অর্থ: পানিমুখ) নামে পরিচিত। ইকু শব্দটি এসেছে প্রাচীন মধ্য এশীয় ভাষা হতে, যার অর্থ: 'শিরাযুক্ত কাপড় বা কাগজ'। এর আদি উৎস সম্ভবত চীনে মিলবে এবং সিল্ক রোড যোগে কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই কৌশল ইরানে প্রবেশ করে, অতঃপর তা আনাতোলিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে ইকু নাম ধারণ করে।
১৬শ শতাব্দির শেষের দিকে আনাতোলিয়া থেকে আগত বণিক, কূটনৈতিক ও পর্যটকগণ কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই শিল্পকে ইউরোপে নিয়ে আসে এবং ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এটা বইপ্রেমীদের পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হয়, যা 'তুর্কি কাগজ' বা 'কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার তুর্কি কৌশল' নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে এর ব্যাপক ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।
ইব্রু নিয়ে নানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেমন: ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে আথানাসিয়াস কার্চার Discourse on Decorating Paper in the Turkish Manner (তুর্কি নিয়মে কাগজের সজ্জাকরণ) নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৭শ শতাব্দির এই জার্মান পণ্ডিত রোমে কাগজকে মার্বেলের মতো সাজ দেয়ার এই শিল্পের বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।