📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 পানি সরবরাহ

📄 পানি সরবরাহ


একবার কল্পনা করুন তো প্রবহমান পানি ছাড়া আপনার জীবন চলছে, যেখানে মাইলের পর মাইল হেঁটে আপনাকে নদী বা খালে যেতে হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে এটা ভাবতে হচ্ছে যে, কীভাবে বালতিতে পানি তোলা হবে, যেহেতু খরস্রোতা পানির উৎসের ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। ৮০০ বছর পূর্বে পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় যুগান্তকারী যন্ত্রসমূহের উদ্ভাবন ও প্রচলনের আগ পর্যন্ত মুসলিমদের অবস্থা অনেকটা এমনই ছিল।

পানি আটকে রাখা, কৃত্রিম নালাপথ তৈরি, পানি সংরক্ষণ ও উত্তোলনের নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং নিজেদের অর্জিত ও অন্যান্য সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে সময়কার প্রচলিত যন্ত্রসমূহে মুসলিমগণ নিয়ে আসে সুনিপুণ সৃজনশীলতার ছাপ।

প্রাচীন মিশরীয়রা শাদুফের মতো যন্ত্র ব্যবহার করতো। সাধারণ মনে হলেও এটা পানি উত্তোলনের কার্যকর এক যন্ত্র ছিল। আবর্তনশীল লম্বা দণ্ডে বালতি বেঁধে এ যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হতো। ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বালতিতে একটি পাল্টা-ওজন থাকতো এবং এগুলো বহন করতো অনুভূমিক কাঠের দণ্ডের উপর দাঁড়ানো দুটি খুঁটি বা স্তম্ভ। এই যন্ত্র মিশরে আজও ব্যবহৃত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ থেকেই খরস্রোতা নালাপথ বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি উত্তোলনের জন্য বৃহৎ জলচালিত চাকা বা নাউর ব্যবহৃত হতো। রোমান লেখক, স্থপতি ও প্রকৌশলী ভিটরুভিয়াস সাধারণ অথচ শক্তিশালী এই যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। যেকোন জলচালিত চাকার মতো প্রবহমান পানির স্রোত এটার প্রান্তে থাকা প্যাডেল কম্পার্টমেন্টে সজোরে ধাক্কা দিতো, আর তাতেই এটা চলা শুরু করতো। প্যাডেল কম্পার্টমেন্টগুলো পানি দিয়ে পূর্ণ হতো এবং এগুলো একেবারে চূড়াতে তুলে আনা হতো, যেখানে পানি সরবরাহের কৃত্রিম নালার সাথে সংযুক্ত প্রধান ট্যাংক বা জলাধারে এই কম্পার্টমেন্টগুলো পানি শুন্য হতো। রোমান ও পারসীয়দের ব্যবহৃত এই যন্ত্র মুসলিমরা নিজেদের চাহিদামাফিক ব্যবহার উপযোগী করে এটাকে আরও বেশি সুসংহত ও কার্যক্ষম করে তোলে।

৭ম শতাব্দির শেষার্ধে বসরায় অবস্থিত একটি খাল খননের আলোচনায় সর্বপ্রথম কোনো মুসলিম নাউরের বিষয়টি উল্লেখ করেন। সিরিয়ার হামা প্রদেশের অরন্টেস নদীতে আজও এসব জলচালিত চাকার দেখা মেলে, যদিও এগুলো আর ব্যবহৃত হয় না। এগুলোর চাকা বেশ বড় আকৃতির ছিল এবং সবচেয়ে বড়টির ব্যাস প্রায় ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) এবং এর বৃত্তাকার কাঠামো ১২০-টি কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল। স্পেনের মুর্সিয়াতে লা নরা (La Nora) নামে পরিচিত নাউরগুলো আজও সচল, কিন্তু এদের আসল চাকাগুলোর স্থান এখন স্টিলের চাকা দখল করে নিয়েছে। এ বিষয় বাদে বলা যায়, স্পেনের মুর আমলের কৃষি ব্যবস্থা কার্যত অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বহু নাউর রয়েছে, যেগুলো অনায়াসে আধুনিক পাম্পের সাথে সফল প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রাখে।

অনেক মুসলিম প্রযুক্তিবিদ এটা প্রত্যক্ষ করেন যে, শক্তি উৎপাদনে পানি ও জীবজন্তুর ব্যবহার কাজের মাত্রা দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়। আল-জাযারী ও তাকিউদ্দীনের মতো দু'জন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রকৌশলী অসংখ্য পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে বহু অভূতপূর্ব যন্ত্র নির্মাণ করেন, যা আজকের আধুনিক সভ্যতাতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী Automated machinery বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পথিকৃৎ।

আল-জাযারী ১২শ শতাব্দির শেষার্ধ ও ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিকে দক্ষিণ তুরস্কে বসবাস করতেন। দিয়ারবাকিরের আরটুক রাজা আনুমানিক ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে তাকে সরকারি কাজে নিয়োগ দেন। একজন দক্ষ স্থাপত্য নকশাবিদ হিসেবে তিনি এমন এক সুনিপুণ পানি উত্তোলন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যেখানে হাতের একটি অঙ্গুলি হেলানো ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি অনায়াসেই তোলা যেত। তিনি তার ক্র্যাংক-সংযুক্ত দণ্ড ব্যবস্থাতে (crank-connecting rod system) সর্বপ্রথম ক্র্যাংক (crank)-এর ব্যবহার করেন। যন্ত্র আবিষ্কারের ইতিহাসে ক্র্যাংককে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বিবেচনা করা হয়। কেননা, এটা চক্রাকার গতিকে সরলরৈখিক গতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম। গাড়ির ইঞ্জিন ও রেলের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের মতো জটিল যন্ত্র থেকে শুরু করে খেলনার মতো প্রায় সব ধরনের যন্ত্রে আজকের দিনে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়।

আল-জাযারী এমন এক যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা কড়িকাঠের কৃত্রিমনালার সাহায্যে একটি জন্তুর দ্বারা চালু হতো। কড়িকাঠের কৃত্রিমনালা পিচ্ছিল-ক্র্যাংক যান্ত্রিক পদ্ধতি (slider-crank mechanism) নামে পরিচিত গিয়ার ও ক্রাংকের সাহায্যে গঠিত জটিল ব্যবস্থার মাধ্যমে উপর ও নিচে চালিত হতো। ১৫শ শতাব্দিতে সংঘটিত প্রকৌশল বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইউরোপের কোথাও যন্ত্রের অংশ হিসেবে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

■ আল-জাযারীর ঘূর্ণায়মান পাম্প
আল-জাযারী পানি উত্তোলনের জন্য পাঁচটি যন্ত্র ডিজাইন করেন, যার মধ্যে দুটো ছিল শাদুফের উন্নত সংস্করণ এবং আরেকটি ছিল জন্তুর শক্তিকে গিয়ার ও জলশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন। ক্র্যাংক-চালিত সঞ্চালন দণ্ড (crankshaft) উদ্ভাবনের পর জলচালিত পাম্প নির্মাণের মাধ্যমে তার আরেকটি মৌলিক ও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। জলচালিত পাম্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল খাঁজকাটা চাকা (cogwheels), তামার পিস্টন, চোষণ যন্ত্র, নিঃসরণ পাইপ এবং একমুখী দোলক কপাটিকা (clack valve)। এই পাম্প ১২ মিটার (৩৯.৪ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত সরবরাহ ব্যবস্থাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পানি চুষে নিতে পারতো, যে পানি সেচ ও পয়ঃনিষ্কাশনে ব্যবহৃত হতো। এটা দ্বৈত-ক্রিয়া নীতির প্রথম উদাহরণ, যেখানে একটি পিস্টন পানি চুষে নিচ্ছে, অন্যদিকে আরেকটি পিস্টন তা নিঃসরণ করছে। আল-জাযারী পিস্টন ও একমুখী কপাটিকা এমন নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করে দিতেন যে, এরা অত্যন্ত দারুণভাবে কাজ করতো।

আপনার যদি কখনো মনে হয় যে, ঘূর্ণায়মান পাম্পের সাহায্যে আপনি ১৩শ শতাব্দির পানি উত্তোলন যন্ত্র বানাবেন, তবে যন্ত্রটির কার্যপ্রণালীর বিবরণ নিম্নরূপ:

জলচালিত কলের মতো এটাকে কোনো প্রবহমান নদীর কাছে বসাতে হবে, যেখানে এটার অর্ধেক প্যাডেল উত্তাল স্রোতের মাঝে থাকবে। প্যাডেল চাকা ঘোরার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গিয়ারিং কার্যক্রম চালু হয়ে তা পিস্টনকে কর্মক্ষম করে তুলে এবং পিস্টনটি লিভার বা ভার উত্তোলক বাহুর গতির সাথে উঠা-নামা করতে থাকে। আর এভাবেই তৈরি হয়ে গেল একটি ঘূর্ণায়মান পাম্প।

দোলক কপাটিকা পাইপের সাহায্যে পানি ভেতরে প্রবেশ করাতো এবং বাহিরে বের করে দিতো। অন্তর্গামী পাইপ পানিতে ডুবে থাকতো এবং যখনই পিস্টনকে এর সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য মোতাবেক টেনে তোলা হতো, তখনই অন্তর্গামী কপাটিকার সাহায্যে পানি এর মধ্যে শোষিত হতো। বহির্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

পিস্টনটি যখন সজোরে ধাক্কার অবস্থানে চলে যেত, তখন সিলিন্ডারে থাকা পানি বহির্গামী কপাটিকা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতো এবং অন্তর্গামী পাইপের চেয়ে সরু একটি বহির্গামী পাইপের মাধ্যমে পানি নিঃসরিত হতো। অন্তর্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

এই প্রক্রিয়া যন্ত্রটির উভয় অংশে পালাক্রমে চলতো। যন্ত্রের এক অংশ যখন ধাক্কা দেয়ার কায়দায় থাকতো, তখন অপর অংশটি টেনে তোলার অবস্থায় থাকতো। ফলশ্রুতিতে জলচালিত চাকার একটি আবর্তন সম্পন্ন করার সময়ে দুই 'একক পরিমাণ' পানি উত্তোলিত হতো। যতক্ষণ পানির প্রবাহ থাকতো, ততক্ষণ পানি উত্তোলন চলমান থাকতো।

■ তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্প
প্রযুক্তির ময়দানের আরেক বিস্ময় ১৬শ শতাব্দির অটোমান প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন ইবনে মারূফ আর-রশিদ, যিনি "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" (রূহানি যন্ত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কলাকৌশল) নামে যন্ত্র প্রকৌশলের উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বাষ্পশক্তির 'আবিষ্কারের' প্রায় একশত বছর পূর্বে জলচালিত পাম্পের আলোচনার পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সাদামাটা বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নিয়ে নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন।

তার নির্মিত ছয়-সিলিন্ডার পাম্প এবং পানি উত্তোলন যন্ত্র বস্তুত কাগজ প্রস্তুতকরণ ও ধাতুসংক্রান্ত কাজের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা তার নির্মিত পিস্টনগুলো অনেকটা বাষ্পচালিত হাতুড়ির মতো এবং এগুলো দ্বারা কাগজের জন্য কাঠের মণ্ড তৈরি করা যেত অথবা এক আঘাতে ধাতুর লম্বা সরু খাঁদ দূর করা যেত।

এই পাম্প কীভাবে কাজ করে, তাকিউদ্দীন তার পাণ্ডুলিপিতে সেটা তুলে ধরেন। ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটির সাথে ছিল লম্বা অনুভূমিক অক্ষদণ্ড বা Camshaft -এর সাথে সংযুক্ত একটি জলচালিত চাকা। আর এই চাকার সাথে ছিল এর দৈর্ঘ্য মোতাবেক ছয়টি দন্তক (Cam)। নদীর উত্তাল স্রোত জলচালিত চাকাকে ধাক্কা দিতো, যা ক্যামশাফ্টকে ঘোরাতো ও পাক দিতো। ক্যামশাফ্টের প্রতিটি দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে নিচের দিকে ধাক্কা দিতো এবং সবগুলো সংযুক্ত দণ্ড কেন্দ্র বরাবর ঘুরতে থাকে। সংযুক্ত দণ্ডের আরেক পাশে ছিল লেড বা সীসার ভার, যা উপরে উত্তোলিত হতো এবং সাথে করে পিস্টনকেও উপরে তুলে আনতো।

এভাবে একটি বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হতো এবং দোলক কপাটিকার সাহায্যে পানি পিস্টন সিলিন্ডারে শোষিত হতো। নির্দিষ্ট কোণে ক্যামশ্যাফ্টের আবর্তনের পর দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে অবমুক্ত করে দিতো, এরপর পিস্টনের ধাক্কা শেষ হতো। ভরের সাহায্যে সীসার ওজন পিস্টনকে নিচে নামিয়ে পানিকে দোলক কপাটিকার বিপরীতে বল প্রয়োগ করতো, কিন্তু দোলক কপাটিকা বন্ধ থাকায় পানিকে ভিন্ন আরেকটি ছিদ্র দিয়ে নির্গমন পাইপে যেতে হতো। একই সময়ে সবগুলো অংশের যুগপৎ ক্রিয়া এবং সঞ্চালন দণ্ডের অধীনে দন্তকগুলোর কৌণিক বিন্যাস দ্বারা সবগুলো পিস্টনের সুনিয়ন্ত্রিত অনুক্রমে পাম্পটির যান্ত্রিক ক্রিয়ার সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয়।

যন্ত্রের উপর নির্ভরতার পূর্বে যখন আমাদের চারপাশে না গাড়ি ছিল না ছিল সাইকেল বা ইলেকট্রিক পাম্প, ঠিক তখন এই আবিষ্কারগুলো সমাজ ও সভ্যতাকে আসলেই বদলে দিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলো হয়তো ব্যাপক ভিত্তিতে নির্মিত হতো না, তথাপি বহু শহরেই পানির পাম্পের দেখা মিলতো। যার ফলে মানুষদের না পানি সংরক্ষণের পাত্রের পসরা সাজাতে হতো, আর না তাদের শাদুফ দিয়ে পানি উত্তোলনে নিজেদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বরং তারা পাম্প বা কৃত্রিম নালার পাশে দাঁড়িয়ে কেবল পানি উত্তোলন চাকাগুলোর জমা করা মূল্যবান তরল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতো, যেমনিভাবে আমরা কল থেকে পানির প্রবাহের জন্য অপেক্ষা করি।

ঘূর্ণায়মান পাম্প
পানি সরবরাহ
পিপাসার্ত কৃষি ব্যবস্থার জন্য নয়া সেচ প্রযুক্তি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: সেচ ব্যবস্থার কল্যাণেই পীচফল, বেগুন ও ধানের মতো শস্যগুলো পশ্চিমের স্পেনে পৌঁছেছে।
অবস্থান: দিয়ারবাকির, বর্তমান তুরষ্ক
তারিখ: ১২শ শতাব্দীর শেষার্ধ
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: আল-জাযারী, যন্ত্র প্রকৌশলী

শতশত বছর পূর্বের মুসলিম স্পেনে আপনি হয়তো হাজারেরও অধিক পানি উত্তোলন-চাকা দেখতে পাবেন, যেগুলো ধানের জমিতে সেচকাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রতিটি শহর ও গ্রামে সেচ প্রদানে সেগুলো সক্ষম ছিল না।

১২শ শতাব্দীর প্রকৌশলী আল-জাযারী স্থানীয় মানুষদের কাছে সরাসরি পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি উত্তোলনের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার করা পাঁচটি ডিজাইনের মধ্যে দ্বিগুণ কর্মক্ষম চোষণ পাম্প ছিল সর্বোন্নত। তামার পিস্টন, কার্যকর বায়ু নিরোধক, চওড়া পাখনাযুক্ত কপাটিকা ব্যবহার করে আল-জাযারী এমন এক পাম্প উদ্ভাবন করেন, যা দুটো সিলিন্ডার দিয়ে নদীর পানি শুষে নিতো এবং এই যন্ত্রের উপরে থাকা এক ফালবিশিষ্ট নির্গমদ্বারে শুষে নেয়া পানি খালি করতো।

১৬শ শতাব্দীর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন তার অত্যাধুনিক ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের ডিজাইনে নদীর উত্তাল পানি শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করেন এবং তিনি তার রচিত "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" নামক পুস্তকে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বাষ্পচালিত টার্বাইনের প্রাথমিক একটি প্রকার নিয়ে আলোচনা করেন, যে ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দী পর পুনরায় আলোচনায় উঠে আসে।

তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটি একটি পানি উত্তোলন-চাকা দিয়ে চালিত হতো, যার সঞ্চালন দণ্ডে ছয়টি পেঁচানো আকৃতির গজাল বা দন্তক (Cam) ছিল। পানি উত্তোলন-চাকার অভ্যন্তরের ঘূর্ণায়মান ফাঁকা অংশে থাকা গজালগুলো পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডের একটি সিরিজকে সচল করতো, যার ফলে এদের প্রত্যেকেই এক একটি পিস্টনকে টেনে উপরে তুলতো। টেনে তোলা এই পিস্টনগুলো একটি কপাটিকার সাহায্যে পানি শুষে সিলিন্ডারে জমা করতো। সঞ্চালন দণ্ডটি ঘূর্ণায়মান হওয়ায় পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডগুলো খালাস করতো এবং ভার প্রযুক্ত হয়ে পিস্টনকে আবারও নিচে নামিয়ে দিতো, যার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত একটি পাইপের মাধ্যমে সিলিন্ডার হতে পানি বেরিয়ে যেত।

এমন যুগপৎ ক্রিয়ার বদৌলতে পাম্পটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই পানি সরবরাহ করতো এবং সেইসাথে হাতুড়িও পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল, যা দিয়ে কাগজের মণ্ড ও ধাতু পেটানো হতো। তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রের নিহিতার্থ হচ্ছে: মানুষকে আর পানির জন্য কোনো লাইনে দাঁড়াতে হবে না।

মুসলিম বিশ্বে যে কৃষি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার পিছনে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ব্যবসায়ীগণ ধান, পীচফল, এপ্রিকট, বেগুন স্পেনে এনে রোপণ করতো এবং এমন উন্নত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিতো। প্রজনন ও পশুপালনের নয়া কৌশল সকলের কাছে মাংস ও পশম সহজলভ্য করে দেয়, অথচ পূর্বে এসব অঞ্চলে এগুলো কেবল বিলাসিতা ভাবা হতো। পুরুষ ও নারীরা এমনসব খামারে কাজ ও ব্যবসায়িক লেনদেন করতো, যেখানে দূরবর্তী পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কৃত্রিম খালের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো।

আধুনিক কৃষি পদ্ধতি আজ সর্বত্র বিস্তৃত; তথাপি শাদুফ নামে পরিচিত হস্তচালিত পানি উত্তোলনের প্রাচীন যন্ত্রের ব্যবহার আজও আপনি মিশরে দেখতে পাবেন।

একবার কল্পনা করুন তো প্রবহমান পানি ছাড়া আপনার জীবন চলছে, যেখানে মাইলের পর মাইল হেঁটে আপনাকে নদী বা খালে যেতে হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে এটা ভাবতে হচ্ছে যে, কীভাবে বালতিতে পানি তোলা হবে, যেহেতু খরস্রোতা পানির উৎসের ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। ৮০০ বছর পূর্বে পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় যুগান্তকারী যন্ত্রসমূহের উদ্ভাবন ও প্রচলনের আগ পর্যন্ত মুসলিমদের অবস্থা অনেকটা এমনই ছিল।

পানি আটকে রাখা, কৃত্রিম নালাপথ তৈরি, পানি সংরক্ষণ ও উত্তোলনের নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং নিজেদের অর্জিত ও অন্যান্য সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে সময়কার প্রচলিত যন্ত্রসমূহে মুসলিমগণ নিয়ে আসে সুনিপুণ সৃজনশীলতার ছাপ।

প্রাচীন মিশরীয়রা শাদুফের মতো যন্ত্র ব্যবহার করতো। সাধারণ মনে হলেও এটা পানি উত্তোলনের কার্যকর এক যন্ত্র ছিল। আবর্তনশীল লম্বা দণ্ডে বালতি বেঁধে এ যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হতো। ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বালতিতে একটি পাল্টা-ওজন থাকতো এবং এগুলো বহন করতো অনুভূমিক কাঠের দণ্ডের উপর দাঁড়ানো দুটি খুঁটি বা স্তম্ভ। এই যন্ত্র মিশরে আজও ব্যবহৃত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ থেকেই খরস্রোতা নালাপথ বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি উত্তোলনের জন্য বৃহৎ জলচালিত চাকা বা নাউর ব্যবহৃত হতো। রোমান লেখক, স্থপতি ও প্রকৌশলী ভিটরুভিয়াস সাধারণ অথচ শক্তিশালী এই যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। যেকোন জলচালিত চাকার মতো প্রবহমান পানির স্রোত এটার প্রান্তে থাকা প্যাডেল কম্পার্টমেন্টে সজোরে ধাক্কা দিতো, আর তাতেই এটা চলা শুরু করতো। প্যাডেল কম্পার্টমেন্টগুলো পানি দিয়ে পূর্ণ হতো এবং এগুলো একেবারে চূড়াতে তুলে আনা হতো, যেখানে পানি সরবরাহের কৃত্রিম নালার সাথে সংযুক্ত প্রধান ট্যাংক বা জলাধারে এই কম্পার্টমেন্টগুলো পানি শুন্য হতো। রোমান ও পারসীয়দের ব্যবহৃত এই যন্ত্র মুসলিমরা নিজেদের চাহিদামাফিক ব্যবহার উপযোগী করে এটাকে আরও বেশি সুসংহত ও কার্যক্ষম করে তোলে।

৭ম শতাব্দির শেষার্ধে বসরায় অবস্থিত একটি খাল খননের আলোচনায় সর্বপ্রথম কোনো মুসলিম নাউরের বিষয়টি উল্লেখ করেন। সিরিয়ার হামা প্রদেশের অরন্টেস নদীতে আজও এসব জলচালিত চাকার দেখা মেলে, যদিও এগুলো আর ব্যবহৃত হয় না। এগুলোর চাকা বেশ বড় আকৃতির ছিল এবং সবচেয়ে বড়টির ব্যাস প্রায় ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) এবং এর বৃত্তাকার কাঠামো ১২০-টি কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল। স্পেনের মুর্সিয়াতে লা নরা (La Nora) নামে পরিচিত নাউরগুলো আজও সচল, কিন্তু এদের আসল চাকাগুলোর স্থান এখন স্টিলের চাকা দখল করে নিয়েছে। এ বিষয় বাদে বলা যায়, স্পেনের মুর আমলের কৃষি ব্যবস্থা কার্যত অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বহু নাউর রয়েছে, যেগুলো অনায়াসে আধুনিক পাম্পের সাথে সফল প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রাখে।

অনেক মুসলিম প্রযুক্তিবিদ এটা প্রত্যক্ষ করেন যে, শক্তি উৎপাদনে পানি ও জীবজন্তুর ব্যবহার কাজের মাত্রা দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়। আল-জাযারী ও তাকিউদ্দীনের মতো দু'জন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রকৌশলী অসংখ্য পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে বহু অভূতপূর্ব যন্ত্র নির্মাণ করেন, যা আজকের আধুনিক সভ্যতাতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী Automated machinery বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পথিকৃৎ।

আল-জাযারী ১২শ শতাব্দির শেষার্ধ ও ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিকে দক্ষিণ তুরস্কে বসবাস করতেন। দিয়ারবাকিরের আরটুক রাজা আনুমানিক ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে তাকে সরকারি কাজে নিয়োগ দেন। একজন দক্ষ স্থাপত্য নকশাবিদ হিসেবে তিনি এমন এক সুনিপুণ পানি উত্তোলন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যেখানে হাতের একটি অঙ্গুলি হেলানো ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি অনায়াসেই তোলা যেত। তিনি তার ক্র্যাংক-সংযুক্ত দণ্ড ব্যবস্থাতে (crank-connecting rod system) সর্বপ্রথম ক্র্যাংক (crank)-এর ব্যবহার করেন। যন্ত্র আবিষ্কারের ইতিহাসে ক্র্যাংককে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বিবেচনা করা হয়। কেননা, এটা চক্রাকার গতিকে সরলরৈখিক গতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম। গাড়ির ইঞ্জিন ও রেলের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের মতো জটিল যন্ত্র থেকে শুরু করে খেলনার মতো প্রায় সব ধরনের যন্ত্রে আজকের দিনে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়।

আল-জাযারী এমন এক যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা কড়িকাঠের কৃত্রিমনালার সাহায্যে একটি জন্তুর দ্বারা চালু হতো। কড়িকাঠের কৃত্রিমনালা পিচ্ছিল-ক্র্যাংক যান্ত্রিক পদ্ধতি (slider-crank mechanism) নামে পরিচিত গিয়ার ও ক্রাংকের সাহায্যে গঠিত জটিল ব্যবস্থার মাধ্যমে উপর ও নিচে চালিত হতো। ১৫শ শতাব্দিতে সংঘটিত প্রকৌশল বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইউরোপের কোথাও যন্ত্রের অংশ হিসেবে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

■ আল-জাযারীর ঘূর্ণায়মান পাম্প
আল-জাযারী পানি উত্তোলনের জন্য পাঁচটি যন্ত্র ডিজাইন করেন, যার মধ্যে দুটো ছিল শাদুফের উন্নত সংস্করণ এবং আরেকটি ছিল জন্তুর শক্তিকে গিয়ার ও জলশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন। ক্র্যাংক-চালিত সঞ্চালন দণ্ড (crankshaft) উদ্ভাবনের পর জলচালিত পাম্প নির্মাণের মাধ্যমে তার আরেকটি মৌলিক ও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। জলচালিত পাম্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল খাঁজকাটা চাকা (cogwheels), তামার পিস্টন, চোষণ যন্ত্র, নিঃসরণ পাইপ এবং একমুখী দোলক কপাটিকা (clack valve)। এই পাম্প ১২ মিটার (৩৯.৪ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত সরবরাহ ব্যবস্থাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পানি চুষে নিতে পারতো, যে পানি সেচ ও পয়ঃনিষ্কাশনে ব্যবহৃত হতো। এটা দ্বৈত-ক্রিয়া নীতির প্রথম উদাহরণ, যেখানে একটি পিস্টন পানি চুষে নিচ্ছে, অন্যদিকে আরেকটি পিস্টন তা নিঃসরণ করছে। আল-জাযারী পিস্টন ও একমুখী কপাটিকা এমন নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করে দিতেন যে, এরা অত্যন্ত দারুণভাবে কাজ করতো।

আপনার যদি কখনো মনে হয় যে, ঘূর্ণায়মান পাম্পের সাহায্যে আপনি ১৩শ শতাব্দির পানি উত্তোলন যন্ত্র বানাবেন, তবে যন্ত্রটির কার্যপ্রণালীর বিবরণ নিম্নরূপ:

জলচালিত কলের মতো এটাকে কোনো প্রবহমান নদীর কাছে বসাতে হবে, যেখানে এটার অর্ধেক প্যাডেল উত্তাল স্রোতের মাঝে থাকবে। প্যাডেল চাকা ঘোরার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গিয়ারিং কার্যক্রম চালু হয়ে তা পিস্টনকে কর্মক্ষম করে তুলে এবং পিস্টনটি লিভার বা ভার উত্তোলক বাহুর গতির সাথে উঠা-নামা করতে থাকে। আর এভাবেই তৈরি হয়ে গেল একটি ঘূর্ণায়মান পাম্প।

দোলক কপাটিকা পাইপের সাহায্যে পানি ভেতরে প্রবেশ করাতো এবং বাহিরে বের করে দিতো। অন্তর্গামী পাইপ পানিতে ডুবে থাকতো এবং যখনই পিস্টনকে এর সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য মোতাবেক টেনে তোলা হতো, তখনই অন্তর্গামী কপাটিকার সাহায্যে পানি এর মধ্যে শোষিত হতো। বহির্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

পিস্টনটি যখন সজোরে ধাক্কার অবস্থানে চলে যেত, তখন সিলিন্ডারে থাকা পানি বহির্গামী কপাটিকা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতো এবং অন্তর্গামী পাইপের চেয়ে সরু একটি বহির্গামী পাইপের মাধ্যমে পানি নিঃসরিত হতো। অন্তর্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

এই প্রক্রিয়া যন্ত্রটির উভয় অংশে পালাক্রমে চলতো। যন্ত্রের এক অংশ যখন ধাক্কা দেয়ার কায়দায় থাকতো, তখন অপর অংশটি টেনে তোলার অবস্থায় থাকতো। ফলশ্রুতিতে জলচালিত চাকার একটি আবর্তন সম্পন্ন করার সময়ে দুই 'একক পরিমাণ' পানি উত্তোলিত হতো। যতক্ষণ পানির প্রবাহ থাকতো, ততক্ষণ পানি উত্তোলন চলমান থাকতো।

■ তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্প
প্রযুক্তির ময়দানের আরেক বিস্ময় ১৬শ শতাব্দির অটোমান প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন ইবনে মারূফ আর-রশিদ, যিনি "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" (রূহানি যন্ত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কলাকৌশল) নামে যন্ত্র প্রকৌশলের উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বাষ্পশক্তির 'আবিষ্কারের' প্রায় একশত বছর পূর্বে জলচালিত পাম্পের আলোচনার পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সাদামাটা বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নিয়ে নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন।

তার নির্মিত ছয়-সিলিন্ডার পাম্প এবং পানি উত্তোলন যন্ত্র বস্তুত কাগজ প্রস্তুতকরণ ও ধাতুসংক্রান্ত কাজের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা তার নির্মিত পিস্টনগুলো অনেকটা বাষ্পচালিত হাতুড়ির মতো এবং এগুলো দ্বারা কাগজের জন্য কাঠের মণ্ড তৈরি করা যেত অথবা এক আঘাতে ধাতুর লম্বা সরু খাঁদ দূর করা যেত।

এই পাম্প কীভাবে কাজ করে, তাকিউদ্দীন তার পাণ্ডুলিপিতে সেটা তুলে ধরেন। ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটির সাথে ছিল লম্বা অনুভূমিক অক্ষদণ্ড বা Camshaft -এর সাথে সংযুক্ত একটি জলচালিত চাকা। আর এই চাকার সাথে ছিল এর দৈর্ঘ্য মোতাবেক ছয়টি দন্তক (Cam)। নদীর উত্তাল স্রোত জলচালিত চাকাকে ধাক্কা দিতো, যা ক্যামশাফ্টকে ঘোরাতো ও পাক দিতো। ক্যামশাফ্টের প্রতিটি দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে নিচের দিকে ধাক্কা দিতো এবং সবগুলো সংযুক্ত দণ্ড কেন্দ্র বরাবর ঘুরতে থাকে। সংযুক্ত দণ্ডের আরেক পাশে ছিল লেড বা সীসার ভার, যা উপরে উত্তোলিত হতো এবং সাথে করে পিস্টনকেও উপরে তুলে আনতো।

এভাবে একটি বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হতো এবং দোলক কপাটিকার সাহায্যে পানি পিস্টন সিলিন্ডারে শোষিত হতো। নির্দিষ্ট কোণে ক্যামশ্যাফ্টের আবর্তনের পর দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে অবমুক্ত করে দিতো, এরপর পিস্টনের ধাক্কা শেষ হতো। ভরের সাহায্যে সীসার ওজন পিস্টনকে নিচে নামিয়ে পানিকে দোলক কপাটিকার বিপরীতে বল প্রয়োগ করতো, কিন্তু দোলক কপাটিকা বন্ধ থাকায় পানিকে ভিন্ন আরেকটি ছিদ্র দিয়ে নির্গমন পাইপে যেতে হতো। একই সময়ে সবগুলো অংশের যুগপৎ ক্রিয়া এবং সঞ্চালন দণ্ডের অধীনে দন্তকগুলোর কৌণিক বিন্যাস দ্বারা সবগুলো পিস্টনের সুনিয়ন্ত্রিত অনুক্রমে পাম্পটির যান্ত্রিক ক্রিয়ার সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয়।

যন্ত্রের উপর নির্ভরতার পূর্বে যখন আমাদের চারপাশে না গাড়ি ছিল না ছিল সাইকেল বা ইলেকট্রিক পাম্প, ঠিক তখন এই আবিষ্কারগুলো সমাজ ও সভ্যতাকে আসলেই বদলে দিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলো হয়তো ব্যাপক ভিত্তিতে নির্মিত হতো না, তথাপি বহু শহরেই পানির পাম্পের দেখা মিলতো। যার ফলে মানুষদের না পানি সংরক্ষণের পাত্রের পসরা সাজাতে হতো, আর না তাদের শাদুফ দিয়ে পানি উত্তোলনে নিজেদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বরং তারা পাম্প বা কৃত্রিম নালার পাশে দাঁড়িয়ে কেবল পানি উত্তোলন চাকাগুলোর জমা করা মূল্যবান তরল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতো, যেমনিভাবে আমরা কল থেকে পানির প্রবাহের জন্য অপেক্ষা করি।

ঘূর্ণায়মান পাম্প
পানি সরবরাহ
পিপাসার্ত কৃষি ব্যবস্থার জন্য নয়া সেচ প্রযুক্তি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: সেচ ব্যবস্থার কল্যাণেই পীচফল, বেগুন ও ধানের মতো শস্যগুলো পশ্চিমের স্পেনে পৌঁছেছে।
অবস্থান: দিয়ারবাকির, বর্তমান তুরষ্ক
তারিখ: ১২শ শতাব্দীর শেষার্ধ
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: আল-জাযারী, যন্ত্র প্রকৌশলী

শতশত বছর পূর্বের মুসলিম স্পেনে আপনি হয়তো হাজারেরও অধিক পানি উত্তোলন-চাকা দেখতে পাবেন, যেগুলো ধানের জমিতে সেচকাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রতিটি শহর ও গ্রামে সেচ প্রদানে সেগুলো সক্ষম ছিল না।

১২শ শতাব্দীর প্রকৌশলী আল-জাযারী স্থানীয় মানুষদের কাছে সরাসরি পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি উত্তোলনের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার করা পাঁচটি ডিজাইনের মধ্যে দ্বিগুণ কর্মক্ষম চোষণ পাম্প ছিল সর্বোন্নত। তামার পিস্টন, কার্যকর বায়ু নিরোধক, চওড়া পাখনাযুক্ত কপাটিকা ব্যবহার করে আল-জাযারী এমন এক পাম্প উদ্ভাবন করেন, যা দুটো সিলিন্ডার দিয়ে নদীর পানি শুষে নিতো এবং এই যন্ত্রের উপরে থাকা এক ফালবিশিষ্ট নির্গমদ্বারে শুষে নেয়া পানি খালি করতো।

১৬শ শতাব্দীর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন তার অত্যাধুনিক ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের ডিজাইনে নদীর উত্তাল পানি শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করেন এবং তিনি তার রচিত "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" নামক পুস্তকে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বাষ্পচালিত টার্বাইনের প্রাথমিক একটি প্রকার নিয়ে আলোচনা করেন, যে ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দী পর পুনরায় আলোচনায় উঠে আসে।

তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটি একটি পানি উত্তোলন-চাকা দিয়ে চালিত হতো, যার সঞ্চালন দণ্ডে ছয়টি পেঁচানো আকৃতির গজাল বা দন্তক (Cam) ছিল। পানি উত্তোলন-চাকার অভ্যন্তরের ঘূর্ণায়মান ফাঁকা অংশে থাকা গজালগুলো পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডের একটি সিরিজকে সচল করতো, যার ফলে এদের প্রত্যেকেই এক একটি পিস্টনকে টেনে উপরে তুলতো। টেনে তোলা এই পিস্টনগুলো একটি কপাটিকার সাহায্যে পানি শুষে সিলিন্ডারে জমা করতো। সঞ্চালন দণ্ডটি ঘূর্ণায়মান হওয়ায় পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডগুলো খালাস করতো এবং ভার প্রযুক্ত হয়ে পিস্টনকে আবারও নিচে নামিয়ে দিতো, যার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত একটি পাইপের মাধ্যমে সিলিন্ডার হতে পানি বেরিয়ে যেত।

এমন যুগপৎ ক্রিয়ার বদৌলতে পাম্পটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই পানি সরবরাহ করতো এবং সেইসাথে হাতুড়িও পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল, যা দিয়ে কাগজের মণ্ড ও ধাতু পেটানো হতো। তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রের নিহিতার্থ হচ্ছে: মানুষকে আর পানির জন্য কোনো লাইনে দাঁড়াতে হবে না।

মুসলিম বিশ্বে যে কৃষি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার পিছনে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ব্যবসায়ীগণ ধান, পীচফল, এপ্রিকট, বেগুন স্পেনে এনে রোপণ করতো এবং এমন উন্নত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিতো। প্রজনন ও পশুপালনের নয়া কৌশল সকলের কাছে মাংস ও পশম সহজলভ্য করে দেয়, অথচ পূর্বে এসব অঞ্চলে এগুলো কেবল বিলাসিতা ভাবা হতো। পুরুষ ও নারীরা এমনসব খামারে কাজ ও ব্যবসায়িক লেনদেন করতো, যেখানে দূরবর্তী পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কৃত্রিম খালের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো।

আধুনিক কৃষি পদ্ধতি আজ সর্বত্র বিস্তৃত; তথাপি শাদুফ নামে পরিচিত হস্তচালিত পানি উত্তোলনের প্রাচীন যন্ত্রের ব্যবহার আজও আপনি মিশরে দেখতে পাবেন।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বাঁধ

📄 বাঁধ


সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা পূর্ত প্রকৌশলের সর্ববৃহৎ স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাঁধ অন্যতম এবং সভ্যতা বিনির্মাণে বাঁধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁধ ব্যবস্থার অভাবে অত্যধিক বন্যা জমি প্লাবিত করে বিনাশ করতো, আর অসম্ভব করে তুলতো ব্যাপকভিত্তিক সেচ কার্যক্রম। বাঁধ নির্মাণ ব্যতীত জলবিদ্যুৎ স্থাপনা অসম্ভব ছিল, যা আজকের দিনে প্রতিনিয়ত শক্তি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

বহু শতাব্দি পূর্বেই মুসলিমগণ নির্মাণ কাঠামো ও বৈচিত্রময় গঠনের মধ্য থেকে খিলানাকৃতির বাঁধ, উপাশ্রয় বাঁধ ও বেড়িবাঁধের মতো বহু বাঁধ নির্মাণ করেছিল। নকশা ও নান্দনিকতার বিচারে এসব বাঁধের মাঝে ৯ম শতাব্দিতে তিউনিসের আগলাবী রাজবংশ কর্তৃক তাদের রাজধানী আল-কায়রাওয়ানের নিকট নির্মিত বাঁধটি সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। ১১শ শতাব্দির দক্ষিণ স্পেনের ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক আল-বাকরী বাঁধটির বিবরণ এভাবে দেন, "আকৃতিতে বৃত্তাকার এবং আয়তনে বিশাল এই বাঁধ। বাঁধের একেবারে কেন্দ্রে অষ্টভুজের একটি টাওয়ার দাঁড়ানো, যা চার দরজাবিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন কক্ষকে বেষ্টন করে আছে। উভয়পাশে খিলানে ঢাকা তোরণের লম্বা সারি এবং এগুলো জলাধারের দক্ষিণ অংশে একটি অপরটির উপর হেলান দিয়ে আছে।"

ইরানের কিবার বাঁধটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন বাঁধ হিসেবে পরিচিত, যা প্রায় ৭০০ বছরের মতো পুরোনো। এ ধরনের নকশার অন্যান্য বাঁধের মতো এই বাঁধের মর্টার বা হামানদিস্তাতে অসমান, এবড়ো-থেবড়ো পাথরকুচির শাঁসের সমষ্ঠি রয়েছে। এক প্রকার স্থানীয় মরু লতাগুল্মের ছাইয়ের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা চুনাপাথর দিয়ে মর্টার তৈরি হতো, যেন তা ফাটল মুকাবিলায় আরও বেশি শক্ত, অটল ও অভেদ্য হয়। এরপরের প্রাচীন বাঁধের তালিকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে বাঁকানো কুসাইবা বাঁধ, যা ৩০ মিটার (৯৮.৪ ফুট) উঁচু এবং ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট। বাঁধটি বর্তমান সৌদি আরবের মদীনার নিকটে অবস্থিত।

আজকের আফগানিস্তানে তিনটি সুপ্রাচীন বাঁধ রয়েছে, যা ১১শ শতাব্দিতে গজনীর সুলতান মাহমুদ নিজ সাম্রাজ্যের রাজধানীর নিকট নির্মাণ করেন। এর মধ্যে একটি বাঁধ তার নামে নামকৃত, যা কাবুল থেকে ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বাঁধটি উচ্চতায় ৩২ মিটার (১০৫ ফুট) এবং দৈর্ঘ্যে ২২০ মিটার (৭২২ ফুট)।

"সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসবেত্তাগণ মুসলিম সময়কে একেবারে বাদই দিয়ে দিয়েছেন, আর বিশেষভাবে বলতে গেলে বাঁধ নির্মাণের ঐতিহাসিকগণ তো মুসলিম আমলের বিষয়টি একদম চেপে গেছেন, এমনকি তারা এই দাবী করে বসেছেন যে, উমাইয়া ও আব্বাসীদের সময়ে বাঁধ নির্মাণ, সেচ ও অন্যান্য প্রকৌশলের কাজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় এবং শেষমেশ তা বিলুপ্ত পর্যন্ত হয়। এ ধরনের কথা নিতান্তই অন্যায় ও অসত্য।"
নরম্যান স্মিথ, History of Dams, ১৯৭১

মুসলিম স্পেনে অতিকায় আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হতো এবং গাঁথুনি হিসেবে তারা সেখানে এক প্রকারের সিমেন্ট ব্যবহার করতো, যা পাথরের চেয়েও শক্ত। তুরিয়া নদীতে অবস্থিত ৮-টি বাঁধের প্রতিটির ভিত্তি নদীগর্ভের ১৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নিমজ্জিত, অধিকন্তু সারি সারি কাঠের পাইল (pile) দিয়ে ভিত্তিগুলোকে আরও সুরক্ষা প্রদান করা হতো। নদীর অস্বাভাবিক আচরণের জন্যই এমন কঠিন ও শক্ত ভিত্তির ব্যবস্থা করা হতো। কেননা বন্যাকালীন সময়ে এই প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে শতগুণে বেড়ে যেত। দশ শতাব্দির অধিক সময় পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত সংস্কার ছাড়াই বাঁধগুলো আজও ভেলেন্সিয়ার সেচ চাহিদাকে পূরণ করে যাচ্ছে।

কর্ডোবা শহরের গোয়াদেলকুইভার নদীর বাঁধটি সম্ভবত দেশটিতে টিকে থাকা সর্বপ্রাচীন ইসলামী বাঁধ। ১২শ শতাব্দির ভূগোলবিদ আল-ইদরিসীর মতে, বাঁধটি কিবতীয়্যা পাথরের তৈরি এবং এতে মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে। বাঁধটি নদীতে আঁকাবাঁকা পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। এ ধরনের আঁকাবাঁকা আকৃতি থেকে এটা বুঝা যায় যে, নির্মাতাগণ ঢেউয়ের চূড়াকে উদ্দেশ্য করে এমনটি করেছেন, যেন বাঁধের প্লাবিত হওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। এই বাঁধের অবশিষ্টাংশ নদীগর্ভের কয়েক ফুট উপরে আজও দৃশ্যমান।

এ ধরনের অতিকায় স্থাপনা নির্মাণে মুসলিম প্রকৌশলীগণ ভূমি জরিপের অত্যাধুনিক কৌশল ও উপকরণসমূহ ব্যবহার করেছেন, যেমন: আন্তর্লাব এবং সেইসাথে ত্রিকোণমিতিক হিসেব। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা পাথরখণ্ড দিয়ে বাঁধগুলো নির্মিত হতো। ইস্পাতের পেরেক দিয়ে এই পাথরখণ্ডগুলো সংযুক্ত করা হতো এবং পেরেকগুলো বসানোর ফলে সৃষ্ট গর্ত গলিত সীসা দিয়ে পূর্ণ করা হতো। কারিগরি শিল্প-নৈপুণ্যের মাত্রা ও নকশার উৎকর্ষ এতটাই অর্জিত হয়েছিল যে, ৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত বাঁধগুলোর এক-তৃতীয়াংশ আজও অক্ষত। আর অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গল বাহিনী থেকে শুরু করে তাইমুর লঙ্গের সুবিশাল সৈন্যদলের শতাব্দিব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কল-কারখানাতে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে মুসলিমগণ নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক শক্তিতে (Green energy) বিনিয়োগের নজির স্থাপন করেছিল। খুজিস্তানের আবি গারার প্রণালীতে দেয়া পুল-ই-বলাইতী বাঁধের প্রত্যেক কিনারার প্রাচীর কেটে ভূ-গর্ভস্থ সুড়ঙ্গে কারখানা স্থাপন করেছিল, যা জলশক্তি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রাচীন দৃষ্টান্ত। ডিজফুলের সেতু-বাঁধ এমনই আরেক দৃষ্টান্ত, যা ৫০ হাত ব্যাসের বৃহৎ জলচালিত চাকা চালানোর ক্ষমতা রাখতো এবং চাকাটি ওই শহরের সকল গৃহে পানি সরবরাহ করতো। পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের এমন বহু দৃষ্টান্ত আজও বহুস্থানে দৃশ্যমান।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা পূর্ত প্রকৌশলের সর্ববৃহৎ স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাঁধ অন্যতম এবং সভ্যতা বিনির্মাণে বাঁধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁধ ব্যবস্থার অভাবে অত্যধিক বন্যা জমি প্লাবিত করে বিনাশ করতো, আর অসম্ভব করে তুলতো ব্যাপকভিত্তিক সেচ কার্যক্রম। বাঁধ নির্মাণ ব্যতীত জলবিদ্যুৎ স্থাপনা অসম্ভব ছিল, যা আজকের দিনে প্রতিনিয়ত শক্তি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

বহু শতাব্দি পূর্বেই মুসলিমগণ নির্মাণ কাঠামো ও বৈচিত্রময় গঠনের মধ্য থেকে খিলানাকৃতির বাঁধ, উপাশ্রয় বাঁধ ও বেড়িবাঁধের মতো বহু বাঁধ নির্মাণ করেছিল। নকশা ও নান্দনিকতার বিচারে এসব বাঁধের মাঝে ৯ম শতাব্দিতে তিউনিসের আগলাবী রাজবংশ কর্তৃক তাদের রাজধানী আল-কায়রাওয়ানের নিকট নির্মিত বাঁধটি সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। ১১শ শতাব্দির দক্ষিণ স্পেনের ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক আল-বাকরী বাঁধটির বিবরণ এভাবে দেন, "আকৃতিতে বৃত্তাকার এবং আয়তনে বিশাল এই বাঁধ। বাঁধের একেবারে কেন্দ্রে অষ্টভুজের একটি টাওয়ার দাঁড়ানো, যা চার দরজাবিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন কক্ষকে বেষ্টন করে আছে। উভয়পাশে খিলানে ঢাকা তোরণের লম্বা সারি এবং এগুলো জলাধারের দক্ষিণ অংশে একটি অপরটির উপর হেলান দিয়ে আছে।"

ইরানের কিবার বাঁধটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন বাঁধ হিসেবে পরিচিত, যা প্রায় ৭০০ বছরের মতো পুরোনো। এ ধরনের নকশার অন্যান্য বাঁধের মতো এই বাঁধের মর্টার বা হামানদিস্তাতে অসমান, এবড়ো-থেবড়ো পাথরকুচির শাঁসের সমষ্ঠি রয়েছে। এক প্রকার স্থানীয় মরু লতাগুল্মের ছাইয়ের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা চুনাপাথর দিয়ে মর্টার তৈরি হতো, যেন তা ফাটল মুকাবিলায় আরও বেশি শক্ত, অটল ও অভেদ্য হয়। এরপরের প্রাচীন বাঁধের তালিকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে বাঁকানো কুসাইবা বাঁধ, যা ৩০ মিটার (৯৮.৪ ফুট) উঁচু এবং ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট। বাঁধটি বর্তমান সৌদি আরবের মদীনার নিকটে অবস্থিত।

আজকের আফগানিস্তানে তিনটি সুপ্রাচীন বাঁধ রয়েছে, যা ১১শ শতাব্দিতে গজনীর সুলতান মাহমুদ নিজ সাম্রাজ্যের রাজধানীর নিকট নির্মাণ করেন। এর মধ্যে একটি বাঁধ তার নামে নামকৃত, যা কাবুল থেকে ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বাঁধটি উচ্চতায় ৩২ মিটার (১০৫ ফুট) এবং দৈর্ঘ্যে ২২০ মিটার (৭২২ ফুট)।

"সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসবেত্তাগণ মুসলিম সময়কে একেবারে বাদই দিয়ে দিয়েছেন, আর বিশেষভাবে বলতে গেলে বাঁধ নির্মাণের ঐতিহাসিকগণ তো মুসলিম আমলের বিষয়টি একদম চেপে গেছেন, এমনকি তারা এই দাবী করে বসেছেন যে, উমাইয়া ও আব্বাসীদের সময়ে বাঁধ নির্মাণ, সেচ ও অন্যান্য প্রকৌশলের কাজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় এবং শেষমেশ তা বিলুপ্ত পর্যন্ত হয়। এ ধরনের কথা নিতান্তই অন্যায় ও অসত্য।"
নরম্যান স্মিথ, History of Dams, ১৯৭১

মুসলিম স্পেনে অতিকায় আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হতো এবং গাঁথুনি হিসেবে তারা সেখানে এক প্রকারের সিমেন্ট ব্যবহার করতো, যা পাথরের চেয়েও শক্ত। তুরিয়া নদীতে অবস্থিত ৮-টি বাঁধের প্রতিটির ভিত্তি নদীগর্ভের ১৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নিমজ্জিত, অধিকন্তু সারি সারি কাঠের পাইল (pile) দিয়ে ভিত্তিগুলোকে আরও সুরক্ষা প্রদান করা হতো। নদীর অস্বাভাবিক আচরণের জন্যই এমন কঠিন ও শক্ত ভিত্তির ব্যবস্থা করা হতো। কেননা বন্যাকালীন সময়ে এই প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে শতগুণে বেড়ে যেত। দশ শতাব্দির অধিক সময় পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত সংস্কার ছাড়াই বাঁধগুলো আজও ভেলেন্সিয়ার সেচ চাহিদাকে পূরণ করে যাচ্ছে।

কর্ডোবা শহরের গোয়াদেলকুইভার নদীর বাঁধটি সম্ভবত দেশটিতে টিকে থাকা সর্বপ্রাচীন ইসলামী বাঁধ। ১২শ শতাব্দির ভূগোলবিদ আল-ইদরিসীর মতে, বাঁধটি কিবতীয়্যা পাথরের তৈরি এবং এতে মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে। বাঁধটি নদীতে আঁকাবাঁকা পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। এ ধরনের আঁকাবাঁকা আকৃতি থেকে এটা বুঝা যায় যে, নির্মাতাগণ ঢেউয়ের চূড়াকে উদ্দেশ্য করে এমনটি করেছেন, যেন বাঁধের প্লাবিত হওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। এই বাঁধের অবশিষ্টাংশ নদীগর্ভের কয়েক ফুট উপরে আজও দৃশ্যমান।

এ ধরনের অতিকায় স্থাপনা নির্মাণে মুসলিম প্রকৌশলীগণ ভূমি জরিপের অত্যাধুনিক কৌশল ও উপকরণসমূহ ব্যবহার করেছেন, যেমন: আন্তর্লাব এবং সেইসাথে ত্রিকোণমিতিক হিসেব। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা পাথরখণ্ড দিয়ে বাঁধগুলো নির্মিত হতো। ইস্পাতের পেরেক দিয়ে এই পাথরখণ্ডগুলো সংযুক্ত করা হতো এবং পেরেকগুলো বসানোর ফলে সৃষ্ট গর্ত গলিত সীসা দিয়ে পূর্ণ করা হতো। কারিগরি শিল্প-নৈপুণ্যের মাত্রা ও নকশার উৎকর্ষ এতটাই অর্জিত হয়েছিল যে, ৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত বাঁধগুলোর এক-তৃতীয়াংশ আজও অক্ষত। আর অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গল বাহিনী থেকে শুরু করে তাইমুর লঙ্গের সুবিশাল সৈন্যদলের শতাব্দিব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কল-কারখানাতে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে মুসলিমগণ নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক শক্তিতে (Green energy) বিনিয়োগের নজির স্থাপন করেছিল। খুজিস্তানের আবি গারার প্রণালীতে দেয়া পুল-ই-বলাইতী বাঁধের প্রত্যেক কিনারার প্রাচীর কেটে ভূ-গর্ভস্থ সুড়ঙ্গে কারখানা স্থাপন করেছিল, যা জলশক্তি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রাচীন দৃষ্টান্ত। ডিজফুলের সেতু-বাঁধ এমনই আরেক দৃষ্টান্ত, যা ৫০ হাত ব্যাসের বৃহৎ জলচালিত চাকা চালানোর ক্ষমতা রাখতো এবং চাকাটি ওই শহরের সকল গৃহে পানি সরবরাহ করতো। পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের এমন বহু দৃষ্টান্ত আজও বহুস্থানে দৃশ্যমান।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বায়ুকল (উইন্ডমিল)

📄 বায়ুকল (উইন্ডমিল)


যেকোন কিছু প্রস্তুত ও উৎপাদন করতে শক্তির প্রয়োজন এবং তেলচালিত যন্ত্রের পূর্বে টেকসই উৎসসমূহ হতে শক্তির যোগান আসতো। ইসলামী বিশ্বে যোগানকৃত শক্তির কিছু অংশ আজ থেকে প্রায় হাজার বছর পূর্বে পানি দিয়ে মেটানো হতো, যেখানে পানির সাহায্যে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড নির্ভর যন্ত্রসমূহ নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে পানিকে বেশ উঁচু স্থান ও কৃত্রিম নালাতে সরবরাহ করতো। জলচালিত যাঁতাকলগুলো গম চূর্ণ-বিচূর্ণ করলেও ইসলামী বিশ্বের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে তারা বাধ্য হয়।

মৌসুমি জলপ্রবাহগুলো শুকিয়ে গেলেও আরবের বৃহত্তর মরুভূমিগুলোর একটা জিনিস ছিল - বাতাস। এসব মরুভূমির বাতাসের প্রবাহের একটা নির্দিষ্ট দিক ছিল এবং বাতাস প্রতিনিয়ত একই স্থান দিয়ে বয়ে যেত। উইন্ডমিলগুলো বেশ সাদামাটা হলেও এগুলোর উপযোগিতা এতটাই কার্যকর ছিল যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৭ম শতাব্দির পারস্যে উদ্ভাবিত উইন্ডমিল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ১২শ শতাব্দিতে উইন্ডমিল ইউরোপে প্রবশে করে।

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১০ বছর শাসন পরিচালনাকারী দ্বিতীয় খলীফা উমর (রা.)-এর নিকট পারস্যের এক লোক এসে দাবী করে যে, সে এমন এক কল বানাতে সক্ষম, যা বাতাস দিয়ে চালিত হবে। এটা শুনে খলীফা তাকে একটা কল বানানোর আদেশ করেন। এরপরই, গম ও বিভিন্ন শস্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে যাঁতাকল চালানো এবং সেচের পানি উত্তোলনে বায়ুশক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। পারস্যের সিন্তান প্রদেশে প্রথম এই রেওয়াজের সূচনা ঘটে এবং ১০ম শতাব্দির আরব ভূগোলবিদ আল-মাসউদী এই এলাকাকে 'বাতাস ও বালুর নগর' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি লিখেন, "এই এলাকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার বাগানে পানি সরবরাহের জন্য বায়ুশক্তি ব্যবহার করে পাম্প চালানো হতো।"

শুরুর দিকের উইন্ডমিলগুলো দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট হতো এবং দুর্গ, পর্বত বা উঁচু প্রাসাদের মিনারে এগুলো স্থাপন করা হতো। উপরের তলাতে যাঁতাকল ছিল এবং নিচের তলায় একটি চাকা থাকতো, যা কাপড়ে মোড়ানো ৬ বা ১২-টি পাখার সাহায্যে চালিত হতো। এগুলো উপরের যাঁতাকল ঘোরাতো। অন্যদিকে নিচের প্রকোষ্ঠের দেয়ালগুলোকে ভেতরের দিকে ক্রমশ সরু হওয়া চারটি ঢালা দিয়ে ভেদ করা হতো। এই ঢালাগুলো বাতাসকে উইন্ডমিলের পাখার দিকে ধাবিত করতো এবং সেগুলোর আবর্তন গতি বাড়িয়ে দিতো।

ওই সময় থেকে উইন্ডমিলের বিবরণ দেয়ার সময় কাঠের সিলিন্ডারের শেষপ্রান্তে সংযুক্ত যাঁতাকলের বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। অর্ধ মিটার (১.৬ ফুট) প্রন্থ এবং ৩.৫ থেকে ৪ মিটার (১১.৫ থেকে ১৩.১ ফুট) উচ্চতার এই সিলিন্ডার উত্তর-পূর্বে উন্মুক্ত উঁচু মিনারে খাড়াভাবে দণ্ডায়মান থাকতো, যেন ওই দিক থেকে আসা বাতাসের নাগাল পাওয়া যায়। সিলিন্ডারটির পাখা লতাগুল্মের আঁটি বা তাল পাতা দিয়ে তৈরি এবং তা অক্ষদণ্ডের হাতলের সাথে সংযুক্ত। মিনারে বয়ে যাওয়া বাতাস পাখাগুলোকে ধাক্কা দিতো এবং এরফলে হাতল ও যাঁতাকল ঘুরতে শুরু করতো।

মধ্যযুগীয় প্রকৌশল বিজ্ঞানে উইন্ডমিলের আবির্ভাব বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং এটা নয়া বাণিজ্যের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে।

"খেয়াল করো! কতই না বিশাল আমি! আছি আমি আমার মিনারের চূড়ায়; আমার গ্রানাইটের চোয়াল গোগ্রাসে গিলছে ভুট্টা, গম ও রাইয়ের সব দানা চূর্ণ করে বানাচ্ছি তাদের ময়দায়।

ফসলের জমির দিকে তাকাই আমি তুচ্ছভাবে; শস্যের মাঠে আমি কেবল দেখি কর্তিত ফসল, বাতাসে আমি সজোরে নিক্ষেপ করি আমার বাহুদ্বয় কারণ, আমি জানি, এসব তো আমারই জন্যে।" - হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো রচিত "The Windmill" থেকে নেয়া

ফ্রান্সের রাইপসরিষা ক্ষেতে বায়ুচালিত টার্বাইন ঘূর্ণায়মান। পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা বায়ুশক্তি ব্যবহারের দাবী পুনরুজ্জীবিত করেছে।

উইন্ডমিল (বায়ুকল)
বায়ুশক্তি
বায়ুকে শক্তি উৎপাদনে কাজে লাগানোর প্রাচীন ও আধুনিক পদ্ধতি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: যেকোন সময়ের চেয়ে শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে বায়ুশক্তি আজ সর্বাধিক জনপ্রিয়
অবস্থান: সিন্তান, পারস্য
তারিখ: ১০শ শতাব্দি হতে বর্তমান
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: ভূগোলবিদ আল-মাসউদী (১০ম শতাব্দি) এবং আল-দিমাশক্বী (১৪শ শতাব্দি) কর্তৃক রচিত ও অঙ্কিত নথি।

এক হাজার বছর পূর্বে ভূগোলবিদ আল-মাসউদী ইরানের সিন্তান প্রদেশে এবং আজকের আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের বাগানগুলোতে সেচ কাজে পানির পাম্পে উইন্ডমিলের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেন। এই অঞ্চলের নদীতে যখন পর্যাপ্ত পানি থাকতো না বা শুকিয়ে যেত, তখন পানি উত্তোলন যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে যেত। এমন পরিস্থিতি সুরাহাকল্পে মুসলিম শাসকগণ বছরের চার মাস বহমান থাকা মরুভূমির বাতাস ব্যবহার করে উইন্ডমিল তৈরির আদেশ করেন। আর এ ধারাবাহিকতায় সর্বত্র উইন্ডমিলের ছড়াছড়ি শুরু হয়।

বাতাসের নাগাল ঠিক মতো পাওয়ার জন্য মধ্য এশীয় উইন্ডমিলগুলোতে খাড়া পাখা থাকতো, যা প্রথাগত ইউরোপীয় ডিজাইনের ব্যতিক্রম ছিল। দুর্গ বা প্রাসাদের চূড়া কিংবা পর্বতশৃঙ্গের শীর্ষদেশে স্থাপিত এসব উইন্ডমিল দোতলা হতো। প্রথম তলাতে যাঁতাকলের পাথর থাকতো, যার একটি কাঠের তৈরি খাড়া সঞ্চালন দণ্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। এই সঞ্চালন দণ্ডটি অপরতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানে কাপড়ে বা তাল গাছের পাতায় মোড়ানো ছয় থেকে বারটি উইন্ডমিলের পাখা খাড়াভাবে লাগানো থাকতো। বাতাসের নাগাল পাওয়ার জন্য উত্তরপূর্ব দিকে উইন্ডমিলের কাঠামো উন্মুক্ত রাখা হতো।

শস্য গুঁড়া করা বা নিজেদের জমিতে সেচের পানি সরবরাহের মতো কাজে কৃষকদের উইন্ডমিল ব্যবহার করতে আল-মাসউদী প্রত্যক্ষ করেন। শক্তির যোগান সমস্যার সমাধানে এটা ছিল চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব এক সমাধান। অতীতে বায়ুশক্তিকে নানা উপায়ে কাজে লাগানো হতো, যেমন: দ্রুত প্রবহমান বাতাসের সাহায্যে প্রাকৃতিক বায়ুচলন বা ভেন্টিলেশনের নিশ্চিত করা।

ঘরোয়া ও শক্তি সাশ্রয়ী পারিবারিক ঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য আজ থেকে ৪,৫০০ বছর আগে উঠানসহ বাড়ি নির্মাণের ঐতিহ্য চালু হয়। কয়েকটি পরিবারে ভাগ করা যৌথ দেয়ালে নির্মিত উঠানসহ এসব বাড়ির ডিজাইনে গৃহকে কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা রাখতে হয়, তার কৌশল অন্তর্ভূত ছিল। বায়ুকল এর মধ্যে অন্যতম, যেটা বহমান বাতাসকে ছাদের উঁচু চত্বর থেকে দেয়ালের মধ্য দিয়ে ঘরের অভ্যন্তরের কামরাগুলোতে প্রবেশের পথ করে দিতো।

পরিকল্পিত উঠানবিশিষ্ট বাড়ির মেঝের বিভিন্ন স্তরে ভেতরের দিকে মুখ- করা বিভিন্ন কক্ষ ও খালি জায়গার ব্যবস্থা ছিল, যেন তা বিভিন্ন মৌসুমের সাথে মানিয়ে নেয় এবং বাড়ির নির্জনতা ও গোপনীয়তা বৃদ্ধি করে।

গরমের মৌসুমে আজ বিদ্যুৎচালিত এয়ার কন্ডিশনার সাদরে গ্রহণ করা হলেও - এটাকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে বায়ুশক্তির মাঝেই একমাত্র সমাধান নিহিত। বিভিন্ন স্থানে বায়ুচালিত টার্বাইনের আকারে নতুন ধরনের উইন্ডমিলের বিস্তৃতি ঘটেছে, যেগুলো বিভিন্ন ধাচের অসংখ্য যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত মূল মেশিন চালাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

যেকোন কিছু প্রস্তুত ও উৎপাদন করতে শক্তির প্রয়োজন এবং তেলচালিত যন্ত্রের পূর্বে টেকসই উৎসসমূহ হতে শক্তির যোগান আসতো। ইসলামী বিশ্বে যোগানকৃত শক্তির কিছু অংশ আজ থেকে প্রায় হাজার বছর পূর্বে পানি দিয়ে মেটানো হতো, যেখানে পানির সাহায্যে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড নির্ভর যন্ত্রসমূহ নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে পানিকে বেশ উঁচু স্থান ও কৃত্রিম নালাতে সরবরাহ করতো। জলচালিত যাঁতাকলগুলো গম চূর্ণ-বিচূর্ণ করলেও ইসলামী বিশ্বের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে তারা বাধ্য হয়।

মৌসুমি জলপ্রবাহগুলো শুকিয়ে গেলেও আরবের বৃহত্তর মরুভূমিগুলোর একটা জিনিস ছিল - বাতাস। এসব মরুভূমির বাতাসের প্রবাহের একটা নির্দিষ্ট দিক ছিল এবং বাতাস প্রতিনিয়ত একই স্থান দিয়ে বয়ে যেত। উইন্ডমিলগুলো বেশ সাদামাটা হলেও এগুলোর উপযোগিতা এতটাই কার্যকর ছিল যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৭ম শতাব্দির পারস্যে উদ্ভাবিত উইন্ডমিল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, ক্রুসেডারদের মাধ্যমে ১২শ শতাব্দিতে উইন্ডমিল ইউরোপে প্রবশে করে।

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ১০ বছর শাসন পরিচালনাকারী দ্বিতীয় খলীফা উমর (রা.)-এর নিকট পারস্যের এক লোক এসে দাবী করে যে, সে এমন এক কল বানাতে সক্ষম, যা বাতাস দিয়ে চালিত হবে। এটা শুনে খলীফা তাকে একটা কল বানানোর আদেশ করেন। এরপরই, গম ও বিভিন্ন শস্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে যাঁতাকল চালানো এবং সেচের পানি উত্তোলনে বায়ুশক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। পারস্যের সিন্তান প্রদেশে প্রথম এই রেওয়াজের সূচনা ঘটে এবং ১০ম শতাব্দির আরব ভূগোলবিদ আল-মাসউদী এই এলাকাকে 'বাতাস ও বালুর নগর' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি লিখেন, "এই এলাকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার বাগানে পানি সরবরাহের জন্য বায়ুশক্তি ব্যবহার করে পাম্প চালানো হতো।"

শুরুর দিকের উইন্ডমিলগুলো দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট হতো এবং দুর্গ, পর্বত বা উঁচু প্রাসাদের মিনারে এগুলো স্থাপন করা হতো। উপরের তলাতে যাঁতাকল ছিল এবং নিচের তলায় একটি চাকা থাকতো, যা কাপড়ে মোড়ানো ৬ বা ১২-টি পাখার সাহায্যে চালিত হতো। এগুলো উপরের যাঁতাকল ঘোরাতো। অন্যদিকে নিচের প্রকোষ্ঠের দেয়ালগুলোকে ভেতরের দিকে ক্রমশ সরু হওয়া চারটি ঢালা দিয়ে ভেদ করা হতো। এই ঢালাগুলো বাতাসকে উইন্ডমিলের পাখার দিকে ধাবিত করতো এবং সেগুলোর আবর্তন গতি বাড়িয়ে দিতো।

ওই সময় থেকে উইন্ডমিলের বিবরণ দেয়ার সময় কাঠের সিলিন্ডারের শেষপ্রান্তে সংযুক্ত যাঁতাকলের বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। অর্ধ মিটার (১.৬ ফুট) প্রন্থ এবং ৩.৫ থেকে ৪ মিটার (১১.৫ থেকে ১৩.১ ফুট) উচ্চতার এই সিলিন্ডার উত্তর-পূর্বে উন্মুক্ত উঁচু মিনারে খাড়াভাবে দণ্ডায়মান থাকতো, যেন ওই দিক থেকে আসা বাতাসের নাগাল পাওয়া যায়। সিলিন্ডারটির পাখা লতাগুল্মের আঁটি বা তাল পাতা দিয়ে তৈরি এবং তা অক্ষদণ্ডের হাতলের সাথে সংযুক্ত। মিনারে বয়ে যাওয়া বাতাস পাখাগুলোকে ধাক্কা দিতো এবং এরফলে হাতল ও যাঁতাকল ঘুরতে শুরু করতো।

মধ্যযুগীয় প্রকৌশল বিজ্ঞানে উইন্ডমিলের আবির্ভাব বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে এবং এটা নয়া বাণিজ্যের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে।

"খেয়াল করো! কতই না বিশাল আমি! আছি আমি আমার মিনারের চূড়ায়; আমার গ্রানাইটের চোয়াল গোগ্রাসে গিলছে ভুট্টা, গম ও রাইয়ের সব দানা চূর্ণ করে বানাচ্ছি তাদের ময়দায়।

ফসলের জমির দিকে তাকাই আমি তুচ্ছভাবে; শস্যের মাঠে আমি কেবল দেখি কর্তিত ফসল, বাতাসে আমি সজোরে নিক্ষেপ করি আমার বাহুদ্বয় কারণ, আমি জানি, এসব তো আমারই জন্যে।" - হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো রচিত "The Windmill" থেকে নেয়া

ফ্রান্সের রাইপসরিষা ক্ষেতে বায়ুচালিত টার্বাইন ঘূর্ণায়মান। পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা বায়ুশক্তি ব্যবহারের দাবী পুনরুজ্জীবিত করেছে।

উইন্ডমিল (বায়ুকল)
বায়ুশক্তি
বায়ুকে শক্তি উৎপাদনে কাজে লাগানোর প্রাচীন ও আধুনিক পদ্ধতি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: যেকোন সময়ের চেয়ে শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে বায়ুশক্তি আজ সর্বাধিক জনপ্রিয়
অবস্থান: সিন্তান, পারস্য
তারিখ: ১০শ শতাব্দি হতে বর্তমান
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: ভূগোলবিদ আল-মাসউদী (১০ম শতাব্দি) এবং আল-দিমাশক্বী (১৪শ শতাব্দি) কর্তৃক রচিত ও অঙ্কিত নথি।

এক হাজার বছর পূর্বে ভূগোলবিদ আল-মাসউদী ইরানের সিন্তান প্রদেশে এবং আজকের আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের বাগানগুলোতে সেচ কাজে পানির পাম্পে উইন্ডমিলের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করেন এবং তা লিপিবদ্ধ করেন। এই অঞ্চলের নদীতে যখন পর্যাপ্ত পানি থাকতো না বা শুকিয়ে যেত, তখন পানি উত্তোলন যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে যেত। এমন পরিস্থিতি সুরাহাকল্পে মুসলিম শাসকগণ বছরের চার মাস বহমান থাকা মরুভূমির বাতাস ব্যবহার করে উইন্ডমিল তৈরির আদেশ করেন। আর এ ধারাবাহিকতায় সর্বত্র উইন্ডমিলের ছড়াছড়ি শুরু হয়।

বাতাসের নাগাল ঠিক মতো পাওয়ার জন্য মধ্য এশীয় উইন্ডমিলগুলোতে খাড়া পাখা থাকতো, যা প্রথাগত ইউরোপীয় ডিজাইনের ব্যতিক্রম ছিল। দুর্গ বা প্রাসাদের চূড়া কিংবা পর্বতশৃঙ্গের শীর্ষদেশে স্থাপিত এসব উইন্ডমিল দোতলা হতো। প্রথম তলাতে যাঁতাকলের পাথর থাকতো, যার একটি কাঠের তৈরি খাড়া সঞ্চালন দণ্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। এই সঞ্চালন দণ্ডটি অপরতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানে কাপড়ে বা তাল গাছের পাতায় মোড়ানো ছয় থেকে বারটি উইন্ডমিলের পাখা খাড়াভাবে লাগানো থাকতো। বাতাসের নাগাল পাওয়ার জন্য উত্তরপূর্ব দিকে উইন্ডমিলের কাঠামো উন্মুক্ত রাখা হতো।

শস্য গুঁড়া করা বা নিজেদের জমিতে সেচের পানি সরবরাহের মতো কাজে কৃষকদের উইন্ডমিল ব্যবহার করতে আল-মাসউদী প্রত্যক্ষ করেন। শক্তির যোগান সমস্যার সমাধানে এটা ছিল চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব এক সমাধান। অতীতে বায়ুশক্তিকে নানা উপায়ে কাজে লাগানো হতো, যেমন: দ্রুত প্রবহমান বাতাসের সাহায্যে প্রাকৃতিক বায়ুচলন বা ভেন্টিলেশনের নিশ্চিত করা।

ঘরোয়া ও শক্তি সাশ্রয়ী পারিবারিক ঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য আজ থেকে ৪,৫০০ বছর আগে উঠানসহ বাড়ি নির্মাণের ঐতিহ্য চালু হয়। কয়েকটি পরিবারে ভাগ করা যৌথ দেয়ালে নির্মিত উঠানসহ এসব বাড়ির ডিজাইনে গৃহকে কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা রাখতে হয়, তার কৌশল অন্তর্ভূত ছিল। বায়ুকল এর মধ্যে অন্যতম, যেটা বহমান বাতাসকে ছাদের উঁচু চত্বর থেকে দেয়ালের মধ্য দিয়ে ঘরের অভ্যন্তরের কামরাগুলোতে প্রবেশের পথ করে দিতো।

পরিকল্পিত উঠানবিশিষ্ট বাড়ির মেঝের বিভিন্ন স্তরে ভেতরের দিকে মুখ- করা বিভিন্ন কক্ষ ও খালি জায়গার ব্যবস্থা ছিল, যেন তা বিভিন্ন মৌসুমের সাথে মানিয়ে নেয় এবং বাড়ির নির্জনতা ও গোপনীয়তা বৃদ্ধি করে।

গরমের মৌসুমে আজ বিদ্যুৎচালিত এয়ার কন্ডিশনার সাদরে গ্রহণ করা হলেও - এটাকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে বায়ুশক্তির মাঝেই একমাত্র সমাধান নিহিত। বিভিন্ন স্থানে বায়ুচালিত টার্বাইনের আকারে নতুন ধরনের উইন্ডমিলের বিস্তৃতি ঘটেছে, যেগুলো বিভিন্ন ধাচের অসংখ্য যন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত মূল মেশিন চালাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বাণিজ্য

📄 বাণিজ্য


বাণিজ্য ইসলামের সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার অনেক সাহাবীই ব্যবসায়ী ছিলেন। বাণিজ্য ইসলামী জিন্দেগীর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বিধায় বাণিজ্যকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য চুক্তি, লেনদেন, ঋণ ও বাজার নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সুসংহত আইনের ধারা।

মানসিক ঔদার্যসম্পন্ন ব্যবসায়ী ও রুচিশীল পণ্যের আশীর্বাদে মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। স্বর্ণ ও সাদা স্বর্ণ হিসেবে পরিচিত লবণ আফ্রিকার সাহারা থেকে উত্তর ও পশ্চিমে ভ্রমণ করে মরক্কো, স্পেন ও ফ্রান্সে পৌঁছে যায় এবং অল্প পরিমাণে এসব পণ্য গ্রীস, তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়াতে পৌঁছায়। ১৪শ শতাব্দিতে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এসব সামগ্রী কড়ির খোলসের মতো করে মালদ্বীপ থেকে আফ্রিকাতে পৌঁছায়। মৃৎশিল্প ও কাগুজে মুদ্রা চীন থেকে পশ্চিমে আসলেও কাগুজে মুদ্রা মিশরে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। দরবেশ, সুলতান, পণ্ডিত ও হজ্জযাত্রীদের সাথে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীসহ বণিকদের এক সমারোহ তখন বয়ে যেত।

সিল্ক মহাসড়ক ও তার চারিপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ভূ-বাণিজ্য ছিল মুসলিম অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সমুদ্র বাণিজ্য প্রধানত আফ্রিকা ও ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে চলতো। দক্ষিণ স্পেনের মালাগা বন্দর ছিল বাণিজ্যের এক মহামিলন কেন্দ্র, যেখানে প্রায় সব দেশ বিশেষ করে ইতালির বণিকপ্রজাতন্ত্র থেকে অধিকহারে ব্যবসায়ীরা আসতো, যেমন: জেনোয়াবাসী বণিকগণ। ইবনে বতুতা জেনোয়াবাসীদের নৌকা করে আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, কারণ তারা এ অঞ্চলের বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "খ্রিস্টানরা আমাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করে নেয় এবং তারা আমাদের কাছ থেকে ভ্রমণের জন্য তারা এক পয়সাও গ্রহণ করেনি।"

মালাগার জনবহুল ঘাটসমূহে বণিকগণ রেশম, অস্ত্রসস্ত্র, অলংকার ও সোনালি রঙের মাটির তৈরি সামগ্রী থেকে শুরু করে স্পেনের সুস্বাদু ফলসহ প্রতিটি দেশের পণ্য লেনদেন করতো।

ভূমধ্যসাগরে উন্মুক্ত হয়ে থাকা নীলনদের ব-দ্বীপের (Nile Delta) মুখে অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরটি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। মসলা বাণিজ্যের যাত্রাপথে এটা ছিল ভারত সাগর থেকে লোহিত সাগর ও নীলনদ হয়ে মালামাল ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রবেশ দ্বার। ফেরোস দ্বীপ দ্বারা বিভক্ত এ বন্দরে দুটো পোতাশ্রয় রয়েছে, যার পশ্চিমেরটি মুসলিমরা এবং পূর্বেরটি খ্রিস্টানরা ব্যবহার করতো। এছাড়া এর প্রকাণ্ড বাতিঘর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য হিসেবে স্বীকৃত।

রাস্তার চারপাশে বিশ্রামের জন্য গড়ে উঠা সরাইখানাগুলো বাণিজ্য সমৃদ্ধিতে অন্যতম নিয়ামক ছিল। সরাইখানা এক ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যা মুসাফিরদের তিনদিনের জন্য বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবার সরবরাহ করতো, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনোদনেরও ব্যবস্থা করতো। এই সরাইখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য যাত্রাপথে প্রতি ৩০ কিলোমিটার (১৮.৬ মাইল) অন্তর অন্তর অবস্থিত ছিল।

বণিকরা তাদের পণ্য দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সময় সাথে করে ইসলামকেও নিয়ে যেত। গোয়াংজু (আজকের ক্যান্টন) চীনা উপকূলে ৮ম শতাব্দিতে মুসলিম ও ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গড়ে উঠে। মুসলিম বণিকগণ আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক দিকে বার্বার বণিক সম্প্রদায় সাহারা অঞ্চলে ইসলাম বার্তা নিয়ে যায়। লোহিত সাগরের সাথে নীলনদকে যুক্তকারী উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্য যাত্রাপথসমূহের যাযাবর গোষ্ঠীগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম হয়ে যায়।

বাণিজ্যিক লেনদেনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থানের প্রেক্ষিতে কিছু বাণিজ্যি কেন্দ্র ইসলামী বিশ্বে বেশ সমৃদ্ধশালী সমাজের জন্ম দেয়। তিউনিসের আল-কায়রাওয়ান ও মরক্কোর সিজিলমাসা সম্পর্কে ১০ম শতাব্দির পর্যটক ইবনে হাওকাল তার "মাসালিক ওয়া মামালিক" (যাত্রাপথ ও রাজ্য) গ্রন্থে বলেন, "পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শহর আল-কায়রাওয়ান বাণিজ্য, ধন-দৌলত ও এর বাজারের সৌন্দর্যে বাকি শহরগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি সরকারি কোষাগারের প্রধান আবুল হাসা-কে বলতে শুনেছি যে, পশ্চিমের সকল প্রদেশ ও জনপদের আয়ের পরিমাণ সাত থেকে আট কোটি দিনারের মাঝামাঝি।"

"গ্যাসকোনির উপসাগরীয় এলাকা থেকে সিন্ধু ছাড়িয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক আরবগণ বাল্টিক ইউরোপ থেকে আফ্রিকাব্যাপী বাণিজ্যিক শিল্পোদ্যোগে জড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ব ও পশ্চিমকে একত্র করেছিল।" - রবার্ট লোপেজ, মধ্যযুগ পরবর্তী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ বিষয়ক ঐতিহাসিক

ইসলামী বিশ্ব হতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা ব্যাপকহারে পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে: এনামেল-সজ্জিত কাচপণ্য, চামড়ার তৈরি সব ধরনের পণ্য, টাইলস, মৃৎসামগ্রী, কাগজ, কার্পেট, খোদাইকৃত হাতির দাঁত, সচিত্র পাণ্ডুলিপি, ধাতব শিল্পকর্ম যেমন: দামেস্কের তরবারি, পানপাত্র, মিহি তুলার কাপড় এবং দামী রেশমের বস্ত্রাদি।

মুসলিমদের তৈরি বস্ত্রাদি, ধাতব পণ্য, কাচ খণ্ড এবং সাবান বেশ চড়া দামের হতো। কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূল ও একইসাথে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল, হ্যানসেটিক বন্দরসমূহ এবং হল্যান্ডের ম্যাস্ট্রিক্টে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ মামলুক আমলে নির্মিত অত্যন্ত বিলাসী পণ্য আবিষ্কার করেন। পণ্যগুলো যে অত্যন্ত নিবিড় ও নিরবিচ্ছিন্ন শ্রমের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়।

মুসলিম সরাইখানা
মুসলিম সরাইখানাগুলো ছিল পণ্য, জীবজন্তু এবং লোকজনের বিশাল এক শোভাযাত্রা, যা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে দূরান্তে পৌঁছে যেত। তাদের উদ্দেশ্য থাকতো হজ্জ পালন, আর না হয় বাণিজ্য। এই ব্যবসায়ীগণ তাদের বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত চলে যেত, যা ভারত, পারস্য, সিরিয়া ও মিশরের মতো বিশাল দূরত্বকে একই সীমায় নিয়ে আসতো।

কিছু কিছু উটের কাফেলা এতো বিশাল হতো যে, আপনি যদি নিজের অবস্থান ছেড়ে আসেন, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে হয়তো আর সে অবস্থান খুঁজে পাবেন না। বিশালাকার ধাতুর তৈরি কড়াইয়ে খাবার রান্না করা হতো এবং তা গরীব হজ্জযাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা হতো।

যারা হাঁটতে পারতো না, খালি উটগুলো তাদের বহন করতো। ভেড়া ও ছাগল কাফেলার সাথে থাকতো, যাতে সেগুলো থেকে দুধ, পনির ও মাংসের জোগান পাওয়া যায়। উটের দুধ ও মাংস খাওয়া হতো এবং এসব পশুর উচ্ছিষ্ট শুকনো গোবর ক্যাম্পফায়ার তথা তাঁবুর আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। যাত্রাপথে ময়দা, লবণ ও পানি দিয়ে চ্যাপ্টা রুটি ও পিঠা বানানো হতো। ছাগল ও মহিষের চামড়ায় তৈরি থলেতে পানি বহন করা হতো এবং জলাধারগুলো তৃপ্তির স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। দিনের বেলায় মরুভূমির তীব্র উত্তাপ এড়াতে কাফেলাগুলো রাতের বেলায় ভ্রমণ করতো এবং যাত্রাপথ আলোকিত করতে মশাল ব্যবহার করতো। আর এতে অন্ধকার মরুভূমি আলোর আভায় ছেয়ে যেত এবং রাত পরিণত হতো দিনে।

বাণিজ্য ইসলামের সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য। নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার অনেক সাহাবীই ব্যবসায়ী ছিলেন। বাণিজ্য ইসলামী জিন্দেগীর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বিধায় বাণিজ্যকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য চুক্তি, লেনদেন, ঋণ ও বাজার নীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে সুসংহত আইনের ধারা।

মানসিক ঔদার্যসম্পন্ন ব্যবসায়ী ও রুচিশীল পণ্যের আশীর্বাদে মুসলিম সাম্রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত বাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। স্বর্ণ ও সাদা স্বর্ণ হিসেবে পরিচিত লবণ আফ্রিকার সাহারা থেকে উত্তর ও পশ্চিমে ভ্রমণ করে মরক্কো, স্পেন ও ফ্রান্সে পৌঁছে যায় এবং অল্প পরিমাণে এসব পণ্য গ্রীস, তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়াতে পৌঁছায়। ১৪শ শতাব্দিতে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এসব সামগ্রী কড়ির খোলসের মতো করে মালদ্বীপ থেকে আফ্রিকাতে পৌঁছায়। মৃৎশিল্প ও কাগুজে মুদ্রা চীন থেকে পশ্চিমে আসলেও কাগুজে মুদ্রা মিশরে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। দরবেশ, সুলতান, পণ্ডিত ও হজ্জযাত্রীদের সাথে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীসহ বণিকদের এক সমারোহ তখন বয়ে যেত।

সিল্ক মহাসড়ক ও তার চারিপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ভূ-বাণিজ্য ছিল মুসলিম অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সমুদ্র বাণিজ্য প্রধানত আফ্রিকা ও ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে চলতো। দক্ষিণ স্পেনের মালাগা বন্দর ছিল বাণিজ্যের এক মহামিলন কেন্দ্র, যেখানে প্রায় সব দেশ বিশেষ করে ইতালির বণিকপ্রজাতন্ত্র থেকে অধিকহারে ব্যবসায়ীরা আসতো, যেমন: জেনোয়াবাসী বণিকগণ। ইবনে বতুতা জেনোয়াবাসীদের নৌকা করে আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, কারণ তারা এ অঞ্চলের বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "খ্রিস্টানরা আমাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করে নেয় এবং তারা আমাদের কাছ থেকে ভ্রমণের জন্য তারা এক পয়সাও গ্রহণ করেনি।"

মালাগার জনবহুল ঘাটসমূহে বণিকগণ রেশম, অস্ত্রসস্ত্র, অলংকার ও সোনালি রঙের মাটির তৈরি সামগ্রী থেকে শুরু করে স্পেনের সুস্বাদু ফলসহ প্রতিটি দেশের পণ্য লেনদেন করতো।

ভূমধ্যসাগরে উন্মুক্ত হয়ে থাকা নীলনদের ব-দ্বীপের (Nile Delta) মুখে অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরটি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। মসলা বাণিজ্যের যাত্রাপথে এটা ছিল ভারত সাগর থেকে লোহিত সাগর ও নীলনদ হয়ে মালামাল ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রবেশ দ্বার। ফেরোস দ্বীপ দ্বারা বিভক্ত এ বন্দরে দুটো পোতাশ্রয় রয়েছে, যার পশ্চিমেরটি মুসলিমরা এবং পূর্বেরটি খ্রিস্টানরা ব্যবহার করতো। এছাড়া এর প্রকাণ্ড বাতিঘর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য হিসেবে স্বীকৃত।

রাস্তার চারপাশে বিশ্রামের জন্য গড়ে উঠা সরাইখানাগুলো বাণিজ্য সমৃদ্ধিতে অন্যতম নিয়ামক ছিল। সরাইখানা এক ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান, যা মুসাফিরদের তিনদিনের জন্য বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবার সরবরাহ করতো, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনোদনেরও ব্যবস্থা করতো। এই সরাইখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য যাত্রাপথে প্রতি ৩০ কিলোমিটার (১৮.৬ মাইল) অন্তর অন্তর অবস্থিত ছিল।

বণিকরা তাদের পণ্য দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার সময় সাথে করে ইসলামকেও নিয়ে যেত। গোয়াংজু (আজকের ক্যান্টন) চীনা উপকূলে ৮ম শতাব্দিতে মুসলিম ও ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গড়ে উঠে। মুসলিম বণিকগণ আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক দিকে বার্বার বণিক সম্প্রদায় সাহারা অঞ্চলে ইসলাম বার্তা নিয়ে যায়। লোহিত সাগরের সাথে নীলনদকে যুক্তকারী উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্য যাত্রাপথসমূহের যাযাবর গোষ্ঠীগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম হয়ে যায়।

বাণিজ্যিক লেনদেনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থানের প্রেক্ষিতে কিছু বাণিজ্যি কেন্দ্র ইসলামী বিশ্বে বেশ সমৃদ্ধশালী সমাজের জন্ম দেয়। তিউনিসের আল-কায়রাওয়ান ও মরক্কোর সিজিলমাসা সম্পর্কে ১০ম শতাব্দির পর্যটক ইবনে হাওকাল তার "মাসালিক ওয়া মামালিক" (যাত্রাপথ ও রাজ্য) গ্রন্থে বলেন, "পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শহর আল-কায়রাওয়ান বাণিজ্য, ধন-দৌলত ও এর বাজারের সৌন্দর্যে বাকি শহরগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি সরকারি কোষাগারের প্রধান আবুল হাসা-কে বলতে শুনেছি যে, পশ্চিমের সকল প্রদেশ ও জনপদের আয়ের পরিমাণ সাত থেকে আট কোটি দিনারের মাঝামাঝি।"

"গ্যাসকোনির উপসাগরীয় এলাকা থেকে সিন্ধু ছাড়িয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক আরবগণ বাল্টিক ইউরোপ থেকে আফ্রিকাব্যাপী বাণিজ্যিক শিল্পোদ্যোগে জড়িয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ব ও পশ্চিমকে একত্র করেছিল।" - রবার্ট লোপেজ, মধ্যযুগ পরবর্তী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ বিষয়ক ঐতিহাসিক

ইসলামী বিশ্ব হতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা ব্যাপকহারে পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে: এনামেল-সজ্জিত কাচপণ্য, চামড়ার তৈরি সব ধরনের পণ্য, টাইলস, মৃৎসামগ্রী, কাগজ, কার্পেট, খোদাইকৃত হাতির দাঁত, সচিত্র পাণ্ডুলিপি, ধাতব শিল্পকর্ম যেমন: দামেস্কের তরবারি, পানপাত্র, মিহি তুলার কাপড় এবং দামী রেশমের বস্ত্রাদি।

মুসলিমদের তৈরি বস্ত্রাদি, ধাতব পণ্য, কাচ খণ্ড এবং সাবান বেশ চড়া দামের হতো। কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূল ও একইসাথে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল, হ্যানসেটিক বন্দরসমূহ এবং হল্যান্ডের ম্যাস্ট্রিক্টে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ মামলুক আমলে নির্মিত অত্যন্ত বিলাসী পণ্য আবিষ্কার করেন। পণ্যগুলো যে অত্যন্ত নিবিড় ও নিরবিচ্ছিন্ন শ্রমের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়।

মুসলিম সরাইখানা
মুসলিম সরাইখানাগুলো ছিল পণ্য, জীবজন্তু এবং লোকজনের বিশাল এক শোভাযাত্রা, যা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে দূরান্তে পৌঁছে যেত। তাদের উদ্দেশ্য থাকতো হজ্জ পালন, আর না হয় বাণিজ্য। এই ব্যবসায়ীগণ তাদের বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত চলে যেত, যা ভারত, পারস্য, সিরিয়া ও মিশরের মতো বিশাল দূরত্বকে একই সীমায় নিয়ে আসতো।

কিছু কিছু উটের কাফেলা এতো বিশাল হতো যে, আপনি যদি নিজের অবস্থান ছেড়ে আসেন, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে হয়তো আর সে অবস্থান খুঁজে পাবেন না। বিশালাকার ধাতুর তৈরি কড়াইয়ে খাবার রান্না করা হতো এবং তা গরীব হজ্জযাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা হতো।

যারা হাঁটতে পারতো না, খালি উটগুলো তাদের বহন করতো। ভেড়া ও ছাগল কাফেলার সাথে থাকতো, যাতে সেগুলো থেকে দুধ, পনির ও মাংসের জোগান পাওয়া যায়। উটের দুধ ও মাংস খাওয়া হতো এবং এসব পশুর উচ্ছিষ্ট শুকনো গোবর ক্যাম্পফায়ার তথা তাঁবুর আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। যাত্রাপথে ময়দা, লবণ ও পানি দিয়ে চ্যাপ্টা রুটি ও পিঠা বানানো হতো। ছাগল ও মহিষের চামড়ায় তৈরি থলেতে পানি বহন করা হতো এবং জলাধারগুলো তৃপ্তির স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। দিনের বেলায় মরুভূমির তীব্র উত্তাপ এড়াতে কাফেলাগুলো রাতের বেলায় ভ্রমণ করতো এবং যাত্রাপথ আলোকিত করতে মশাল ব্যবহার করতো। আর এতে অন্ধকার মরুভূমি আলোর আভায় ছেয়ে যেত এবং রাত পরিণত হতো দিনে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00