📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 কৃষি ম্যানুয়েল

📄 কৃষি ম্যানুয়েল


কোনো বাগান বা ফসলের পূর্ণ বিকাশের জন্য আবশ্যক পরিচর্যা ও পরিবেশের মধ্যে বাস্তব সামঞ্জস্য থাকা। ভালো পরাগায়ন ও ফসল তোলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন মাটির বিভিন্ন উপাদান, পানি এবং মানবীয় হস্তক্ষেপের যথার্থ অনুপাত। সর্বোচ্চ উৎপাদন লাভের অদম্য আগ্রহ এবং সেইসাথে যে মাটি ও চারাগাছের উপর তারা নির্ভর করতো, সেগুলোর গঠন ও বিকাশ ধারা ব্যাহত না করে স্পেনের মুসলিমগণ কৃষির এক নিয়মতান্ত্রিক অধ্যয়নের সূচনা করে, যেখানে আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে মৃত্তিকা রসায়ন ও মাটি ক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত ছিল।

মুসলিম কৃষি ব্যবস্থা অত্যাধুনিক একটি ব্যাপার ছিল, যা পরিবেশের ভারসাম্য বজায়ের পাশাপাশি উপহার দিয়েছিল উচ্চ ফলনশীল ব্যবস্থা। তাদের ছিল কৃষি ম্যানুয়েল, যেখানে বলতে গেলে সবকিছুই বিস্তারিত ছিল, যেমন: লাঙল চাষ, সাধারণ ও বিশেষ নিড়ানি, গর্ত করা এবং মই দেয়ার মাধ্যমে মাটি উপযুক্ত করার বিবরণ। গুণগত মানের উপর ভিত্তি করে মাটির শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি পানিরও শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। টলেডোর আমিরের মালি ইবনে বাস্সাল ১০৮৫ খ্রিস্টাব্দে "কিতাবুয যারাআ" (কৃষি বিষয়ক পুস্তক) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে তিনি মাটিকে দশটি শ্রেণিতে ভাগ করেন এবং বছরের মৌসুম অনুসারে প্রত্যেক শ্রেণির মাটি কী পরিমাণ জীবনীশক্তি ধরে রাখতে পারে, তা নির্দেশ করেন। জানুয়ারি থেকে মে মাস সময়ে পতিত জমিতে চারবার ফসল চাষের ব্যাপারে তিনি বেশ জোর দেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিনি দশবার ফসল চাষের উৎসাহ পর্যন্ত দেন, উদাহরণস্বরূপ: তুলা জাতীয় শস্য, যেগুলোর চাষাবাদ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের শক্ত মাটিতে করা হতো।

মুসলিম স্পেনের সেভিল শহরের বাসিন্দা এবং ১২শ শতাব্দির উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ইবনে আল-আওয়াম পূর্ববর্তী গ্রিক, মিশর ও পারস্যের পণ্ডিতদের গবেষণা একত্র করে "কিতাবুয যারাআ" (কৃষি পুস্তক) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে কৃষি ও পশু ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৩৪-টি অধ্যায় ছিল এবং একইসাথে এই গ্রন্থে কৃষকদের জন্য নিখুঁত বর্ণনা সম্বলিত নির্দেশনাও অন্তর্ভূক্ত ছিল। এছাড়াও ৫৮৫-টি গাছের বিবরণ, ৫০-টিরও অধিক ফল গাছের রোপণ পদ্ধতির ব্যাখ্যা, গ্রাফটিং, মাটির বৈশিষ্ট্য ও চাষের জন্য মাটি প্রস্তুতকরণ, সার দেয়া, গাছের রোগ-বালাই ও সেগুলোর প্রতিকার, বাগান ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থা, বিভিন্ন গাছের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য এবং মৌমাছি পালনের মতো বিষয়সমূহ এতে স্থান পেয়েছে। জলপাই, কীভাবে জলপাইয়ের চারা লাগাতে হয়, এদের রোগ-বালাইয়ের চিকিৎসা, গ্রাফটিং, জলপাই সংগ্রহ থেকে জলপাইয়ের বৈশিষ্ট্য, অলিভ অয়েল (জলপাই তেলের) পরিশোধন ও কন্ডিশনিং (বিশেষ অবস্থায় আনয়ন)-এর মতো বিষয়াদি - বলতে গেলে জলপাই সম্পর্কে আপনার যা জানার দরকার, তার সবই এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। এমনকি এ গ্রন্থে লাঙল দেয়ার পদ্ধতি, কতবার দিতে হবে, বীজ বপনের সময়, কীভাবে বীজ বপন করতে হবে, বীজ বপনের পর এবং বৃদ্ধির সময় পর্যন্ত পানি দেয়া, চারাগাছের পরিচর্যা এবং ফসল তোলার উপর আলাদা অধ্যায় রয়েছে। এসব তথ্য আয়ত্তের পর একজন সচেতন কৃষক ব্যর্থ হতে পারেন না, ফলশ্রুতিতে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুর অধিকাংশই ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে স্প্যানিস ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে।

৯৬১ খ্রিস্টাব্দের বিখ্যাত 'কর্ডোবা-ক্যালেন্ডার' বর্ণিত পদ্ধতিসমূহের নির্ভুলতা সত্যই অবাক করার মতো। বছরের প্রতি মাসের কর্মকাণ্ড ও সময়সূচি নির্ধারিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মার্চ মাসে ডুমুরের গ্রাফটিং করা হতো এবং এ সময়ে বছরের শুরুর দিকের খাদ্যশস্য জন্মাতে শুরু করতো। এটা ছিল আখ রোপণের সময় এবং এ সময়ে মৌসুমি গোলাপ ও লাইলাক ফুলের মুকুল গজাতো। তিতির পাখির আগমন হতো, রেশমি গুটি পোকা ডিম ফোটাতো এবং মালেট নামের সামুদ্রিক মাছ নদীতে তাদের যাত্রা আরম্ভ করতো। এছাড়াও এই মৌসুমে শশার চাষ এবং তুলা, জাফরান ও বেগুনের বীজও বপন করা হতো। এই মাসে আঞ্চলিক খাজনা সংগ্রহের জন্য সরকারি ডাক ব্যবস্থা ঘোড়া সংগ্রহ করতো। পঙ্গপালের আবির্ভাব হতো এবং তারা তাদের ধ্বংসলীলা চালাতো। লেবু এবং রঞ্জন ও ঔষধে ব্যবহৃত সুগন্ধি গুল্ম মারজোরাম চাষের উপযুক্ত সময় ছিল এ মাস এবং বহু পাখির জন্য এটা ছিল মিলন মৌসুম।

কৃষির সাথে সম্পর্ক রাখে এমন কোনো কৌশলের প্রয়োগ বাকি ছিল না। প্রতিটি শস্যকে ধরে ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে বাস্সাল এমন জমিতে ধান চাষের জন্য বলতেন, যেটা উদীয়মান সূর্য বরাবর মুখ করে থাকতো। এরপর জৈব সার প্রয়োগ করে মাটি পুরোদস্তুর প্রস্তুত করার উপর তিনি বেশ জোর দিতেন। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের দিকে চারা রোপণের জন্য বলতেন। নির্দিষ্ট জমিতে কী পরিমাণ ধানের চারা রোপণ করতে হবে এবং কীভাবে তা সম্পন্ন করতে হবে, সে বিষয়ে ইবনে আল-আওয়াম বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। নির্দিষ্ট উচ্চতায় সেচ দেয়া, বিশেষ করে ধানের চারা রোপণের পূর্বে জমিকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানিতে ডুবিয়ে রাখার অপরিহার্যতা সম্পর্কে তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন; যেমন: পানি শুষে নিলে মাটিতে বীজ পুততে হবে এবং জমিকে পুনরায় পানিতে ডুবিয়ে দিতে হবে।

"প্রকৃতির প্রতি নিবিড় ভালোবাসা এবং কর্মচঞ্চল জীবনযাপন পদ্ধতির সুবাদে ধ্রুপদী ইসলামী সমাজ বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য লাভ করে এবং... বিভিন্ন সভ্যতার রীতিনীতির জ্ঞান আয়ত্ত করে সেটার ভিত্তিতে তারা অর্জন করে সফল ও ভারসাম্যময় কৃষি ব্যবস্থা। সমৃদ্ধির এ সীমা নিছক কিছু কায়দা-কানুন একত্রে জমা করার চেয়েও নিগূঢ় ও তাৎপর্যময় ছিল, বরং এটা ছিল এক স্থায়ী বাস্তুতান্ত্রিক সাফল্য, যা মানব ইতিহাসের ধারাপ্রবাহ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে।" - লুসি বোলেন্স, The use of plants for dyeing and clothing (রঞ্জক ও পোশাকের জন্য লতাগুল্মের ব্যবহার) নামক গ্রন্থের লেখক

ক্ষতিকারক পরজীবী নিধন, আগাছা দূর এবং ফসল তোলা ও নিরাপদভাবে ফসল সংরক্ষণের বিষয়েও ধান বিশেষজ্ঞগণ মনোযোগ দেন। খাদ্য হিসেবে চাল নানা উপায়ে খাওয়া যেতে পারে এবং ইবনে আল-আওয়াম এটা উল্লেখ করেন যে, মাখন, তেল, চর্বি ও দুধ দিয়ে চাল রান্না করে খাওয়াটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। আলমোহাদ রাজবংশের অজ্ঞাতনামা এক লেখকও রান্নার রেসিপি সম্পর্কে "কিতাব আত-তাবাখ আল-মাগরিবী ওয়াল আন্দালুসী" (মাগরিব ও আন্দালুসের রান্না) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে বহুপদের রেসিপি ছিল, যার মধ্যে পাঁচটি রেসিপি ছিল চাল নিয়ে এবং সবগুলোই অত্যন্ত মজাদার ছিল।

উপযুক্ত ভারসাম্য অর্জনের লক্ষ্যে জমির উর্বরতা নিশ্চিত করা ছিল কৃষির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষির এই ক্ষেত্রে মুসলিমগণ নিবিড় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখে এবং আশ্চর্যজনকভাবে হাজার বছর পার হওয়ার পরেও আবাদি জমিগুলো আজও অপরিবর্তিত আছে, যেহেতু মধ্যযুগীয় মুসলিমগণ তাদের জমিতে পরিমিত মাত্রায় অবাধে জৈব সার প্রয়োগ করতো। ইবনে আল-আওয়ام বর্ণনা করেন যে, সর্বোত্তম সার কবুতরের বিষ্ঠা থেকেই আসে এবং আজকের মানদণ্ড মোতাবেক এটা নিশ্চিতভাবে পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক।

ইরানে জমির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বৃত্তাকার টাওয়ার স্থাপন করা হতো। চূড়া থেকে বেরিয়ে আসা ছোট প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট মাটির ইট দিয়ে তৈরি এই টাওয়ারগুলোতে কবুতর রাখা হতো। উচ্চতায় এই টাওয়ারগুলো ১৮ থেকে ২১ মিটার (৬০ থেকে ৭০ ফুট) হতো এবং সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য কবুতরের বিষ্ঠা সংগ্রহ করা এবং অধিকহারে কবুতরের বংশবৃদ্ধির জন্য এগুলো ব্যবহৃত হতো।

এই টাওয়ারগুলোর ভিতরে মৌচাকের খুপরি বা কামরার মতো ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা পাখির বিষ্ঠা সংগ্রহ করে জমির সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হতো। সচরাচর ১ বছর পরপর কবুতর-টাওয়ারগুলো পরিষ্কার করা হতো। বলা হয় যে, খোদ ইরানের ইস্পাহানের বাহিরেই ৩০০০-এরও বেশি কবুতর-টাওয়ার ছিল।

মুসলিম কৃষকদের কর্মকাণ্ড শিল্পীর তুলিতে নতুনভাবে ফুটে উঠেছে। ৯ম শতাব্দীর সৃজনশীল কৃষকগণ নতুন শস্যের চাষ, সর্বাধুনিক সেচ কৌশলের বিকাশে ভূমিকা রাখা, জৈব সারের ব্যবহার, বৈশ্বিক জ্ঞান স্থানীয় পরিমণ্ডলে প্রয়োগ এবং চাষাবাদ প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তিশীল রাখার মতো বৈপ্লবিক কাজে লিপ্ত ছিল।

এগুলো তাদের ধাবিত করে এক কৃষি বিপ্লবের দিকে এবং এর মাধ্যেমে আরও অধিক সংখ্যক মানুষের দোরগোড়ায় সতেজ খাবার পৌঁছে যায়।

কোনো বাগান বা ফসলের পূর্ণ বিকাশের জন্য আবশ্যক পরিচর্যা ও পরিবেশের মধ্যে বাস্তব সামঞ্জস্য থাকা। ভালো পরাগায়ন ও ফসল তোলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন মাটির বিভিন্ন উপাদান, পানি এবং মানবীয় হস্তক্ষেপের যথার্থ অনুপাত। সর্বোচ্চ উৎপাদন লাভের অদম্য আগ্রহ এবং সেইসাথে যে মাটি ও চারাগাছের উপর তারা নির্ভর করতো, সেগুলোর গঠন ও বিকাশ ধারা ব্যাহত না করে স্পেনের মুসলিমগণ কৃষির এক নিয়মতান্ত্রিক অধ্যয়নের সূচনা করে, যেখানে আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে মৃত্তিকা রসায়ন ও মাটি ক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত ছিল।

মুসলিম কৃষি ব্যবস্থা অত্যাধুনিক একটি ব্যাপার ছিল, যা পরিবেশের ভারসাম্য বজায়ের পাশাপাশি উপহার দিয়েছিল উচ্চ ফলনশীল ব্যবস্থা। তাদের ছিল কৃষি ম্যানুয়েল, যেখানে বলতে গেলে সবকিছুই বিস্তারিত ছিল, যেমন: লাঙল চাষ, সাধারণ ও বিশেষ নিড়ানি, গর্ত করা এবং মই দেয়ার মাধ্যমে মাটি উপযুক্ত করার বিবরণ। গুণগত মানের উপর ভিত্তি করে মাটির শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি পানিরও শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। টলেডোর আমিরের মালি ইবনে বাস্সাল ১০৮৫ খ্রিস্টাব্দে "কিতাবুয যারাআ" (কৃষি বিষয়ক পুস্তক) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে তিনি মাটিকে দশটি শ্রেণিতে ভাগ করেন এবং বছরের মৌসুম অনুসারে প্রত্যেক শ্রেণির মাটি কী পরিমাণ জীবনীশক্তি ধরে রাখতে পারে, তা নির্দেশ করেন। জানুয়ারি থেকে মে মাস সময়ে পতিত জমিতে চারবার ফসল চাষের ব্যাপারে তিনি বেশ জোর দেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিনি দশবার ফসল চাষের উৎসাহ পর্যন্ত দেন, উদাহরণস্বরূপ: তুলা জাতীয় শস্য, যেগুলোর চাষাবাদ ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের শক্ত মাটিতে করা হতো।

মুসলিম স্পেনের সেভিল শহরের বাসিন্দা এবং ১২শ শতাব্দির উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ইবনে আল-আওয়াম পূর্ববর্তী গ্রিক, মিশর ও পারস্যের পণ্ডিতদের গবেষণা একত্র করে "কিতাবুয যারাআ" (কৃষি পুস্তক) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে কৃষি ও পশু ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৩৪-টি অধ্যায় ছিল এবং একইসাথে এই গ্রন্থে কৃষকদের জন্য নিখুঁত বর্ণনা সম্বলিত নির্দেশনাও অন্তর্ভূক্ত ছিল। এছাড়াও ৫৮৫-টি গাছের বিবরণ, ৫০-টিরও অধিক ফল গাছের রোপণ পদ্ধতির ব্যাখ্যা, গ্রাফটিং, মাটির বৈশিষ্ট্য ও চাষের জন্য মাটি প্রস্তুতকরণ, সার দেয়া, গাছের রোগ-বালাই ও সেগুলোর প্রতিকার, বাগান ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থা, বিভিন্ন গাছের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য এবং মৌমাছি পালনের মতো বিষয়সমূহ এতে স্থান পেয়েছে। জলপাই, কীভাবে জলপাইয়ের চারা লাগাতে হয়, এদের রোগ-বালাইয়ের চিকিৎসা, গ্রাফটিং, জলপাই সংগ্রহ থেকে জলপাইয়ের বৈশিষ্ট্য, অলিভ অয়েল (জলপাই তেলের) পরিশোধন ও কন্ডিশনিং (বিশেষ অবস্থায় আনয়ন)-এর মতো বিষয়াদি - বলতে গেলে জলপাই সম্পর্কে আপনার যা জানার দরকার, তার সবই এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। এমনকি এ গ্রন্থে লাঙল দেয়ার পদ্ধতি, কতবার দিতে হবে, বীজ বপনের সময়, কীভাবে বীজ বপন করতে হবে, বীজ বপনের পর এবং বৃদ্ধির সময় পর্যন্ত পানি দেয়া, চারাগাছের পরিচর্যা এবং ফসল তোলার উপর আলাদা অধ্যায় রয়েছে। এসব তথ্য আয়ত্তের পর একজন সচেতন কৃষক ব্যর্থ হতে পারেন না, ফলশ্রুতিতে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুর অধিকাংশই ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে স্প্যানিস ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে।

৯৬১ খ্রিস্টাব্দের বিখ্যাত 'কর্ডোবা-ক্যালেন্ডার' বর্ণিত পদ্ধতিসমূহের নির্ভুলতা সত্যই অবাক করার মতো। বছরের প্রতি মাসের কর্মকাণ্ড ও সময়সূচি নির্ধারিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মার্চ মাসে ডুমুরের গ্রাফটিং করা হতো এবং এ সময়ে বছরের শুরুর দিকের খাদ্যশস্য জন্মাতে শুরু করতো। এটা ছিল আখ রোপণের সময় এবং এ সময়ে মৌসুমি গোলাপ ও লাইলাক ফুলের মুকুল গজাতো। তিতির পাখির আগমন হতো, রেশমি গুটি পোকা ডিম ফোটাতো এবং মালেট নামের সামুদ্রিক মাছ নদীতে তাদের যাত্রা আরম্ভ করতো। এছাড়াও এই মৌসুমে শশার চাষ এবং তুলা, জাফরান ও বেগুনের বীজও বপন করা হতো। এই মাসে আঞ্চলিক খাজনা সংগ্রহের জন্য সরকারি ডাক ব্যবস্থা ঘোড়া সংগ্রহ করতো। পঙ্গপালের আবির্ভাব হতো এবং তারা তাদের ধ্বংসলীলা চালাতো। লেবু এবং রঞ্জন ও ঔষধে ব্যবহৃত সুগন্ধি গুল্ম মারজোরাম চাষের উপযুক্ত সময় ছিল এ মাস এবং বহু পাখির জন্য এটা ছিল মিলন মৌসুম।

কৃষির সাথে সম্পর্ক রাখে এমন কোনো কৌশলের প্রয়োগ বাকি ছিল না। প্রতিটি শস্যকে ধরে ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে বাস্সাল এমন জমিতে ধান চাষের জন্য বলতেন, যেটা উদীয়মান সূর্য বরাবর মুখ করে থাকতো। এরপর জৈব সার প্রয়োগ করে মাটি পুরোদস্তুর প্রস্তুত করার উপর তিনি বেশ জোর দিতেন। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের দিকে চারা রোপণের জন্য বলতেন। নির্দিষ্ট জমিতে কী পরিমাণ ধানের চারা রোপণ করতে হবে এবং কীভাবে তা সম্পন্ন করতে হবে, সে বিষয়ে ইবনে আল-আওয়াম বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। নির্দিষ্ট উচ্চতায় সেচ দেয়া, বিশেষ করে ধানের চারা রোপণের পূর্বে জমিকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানিতে ডুবিয়ে রাখার অপরিহার্যতা সম্পর্কে তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন; যেমন: পানি শুষে নিলে মাটিতে বীজ পুততে হবে এবং জমিকে পুনরায় পানিতে ডুবিয়ে দিতে হবে।

"প্রকৃতির প্রতি নিবিড় ভালোবাসা এবং কর্মচঞ্চল জীবনযাপন পদ্ধতির সুবাদে ধ্রুপদী ইসলামী সমাজ বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য লাভ করে এবং... বিভিন্ন সভ্যতার রীতিনীতির জ্ঞান আয়ত্ত করে সেটার ভিত্তিতে তারা অর্জন করে সফল ও ভারসাম্যময় কৃষি ব্যবস্থা। সমৃদ্ধির এ সীমা নিছক কিছু কায়দা-কানুন একত্রে জমা করার চেয়েও নিগূঢ় ও তাৎপর্যময় ছিল, বরং এটা ছিল এক স্থায়ী বাস্তুতান্ত্রিক সাফল্য, যা মানব ইতিহাসের ধারাপ্রবাহ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে।" - লুসি বোলেন্স, The use of plants for dyeing and clothing (রঞ্জক ও পোশাকের জন্য লতাগুল্মের ব্যবহার) নামক গ্রন্থের লেখক

ক্ষতিকারক পরজীবী নিধন, আগাছা দূর এবং ফসল তোলা ও নিরাপদভাবে ফসল সংরক্ষণের বিষয়েও ধান বিশেষজ্ঞগণ মনোযোগ দেন। খাদ্য হিসেবে চাল নানা উপায়ে খাওয়া যেতে পারে এবং ইবনে আল-আওয়াম এটা উল্লেখ করেন যে, মাখন, তেল, চর্বি ও দুধ দিয়ে চাল রান্না করে খাওয়াটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। আলমোহাদ রাজবংশের অজ্ঞাতনামা এক লেখকও রান্নার রেসিপি সম্পর্কে "কিতাব আত-তাবাখ আল-মাগরিবী ওয়াল আন্দালুসী" (মাগরিব ও আন্দালুসের রান্না) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে বহুপদের রেসিপি ছিল, যার মধ্যে পাঁচটি রেসিপি ছিল চাল নিয়ে এবং সবগুলোই অত্যন্ত মজাদার ছিল।

উপযুক্ত ভারসাম্য অর্জনের লক্ষ্যে জমির উর্বরতা নিশ্চিত করা ছিল কৃষির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষির এই ক্ষেত্রে মুসলিমগণ নিবিড় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখে এবং আশ্চর্যজনকভাবে হাজার বছর পার হওয়ার পরেও আবাদি জমিগুলো আজও অপরিবর্তিত আছে, যেহেতু মধ্যযুগীয় মুসলিমগণ তাদের জমিতে পরিমিত মাত্রায় অবাধে জৈব সার প্রয়োগ করতো। ইবনে আল-আওয়ام বর্ণনা করেন যে, সর্বোত্তম সার কবুতরের বিষ্ঠা থেকেই আসে এবং আজকের মানদণ্ড মোতাবেক এটা নিশ্চিতভাবে পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক।

ইরানে জমির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বৃত্তাকার টাওয়ার স্থাপন করা হতো। চূড়া থেকে বেরিয়ে আসা ছোট প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট মাটির ইট দিয়ে তৈরি এই টাওয়ারগুলোতে কবুতর রাখা হতো। উচ্চতায় এই টাওয়ারগুলো ১৮ থেকে ২১ মিটার (৬০ থেকে ৭০ ফুট) হতো এবং সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য কবুতরের বিষ্ঠা সংগ্রহ করা এবং অধিকহারে কবুতরের বংশবৃদ্ধির জন্য এগুলো ব্যবহৃত হতো।

এই টাওয়ারগুলোর ভিতরে মৌচাকের খুপরি বা কামরার মতো ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা পাখির বিষ্ঠা সংগ্রহ করে জমির সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হতো। সচরাচর ১ বছর পরপর কবুতর-টাওয়ারগুলো পরিষ্কার করা হতো। বলা হয় যে, খোদ ইরানের ইস্পাহানের বাহিরেই ৩০০০-এরও বেশি কবুতর-টাওয়ার ছিল।

মুসলিম কৃষকদের কর্মকাণ্ড শিল্পীর তুলিতে নতুনভাবে ফুটে উঠেছে। ৯ম শতাব্দীর সৃজনশীল কৃষকগণ নতুন শস্যের চাষ, সর্বাধুনিক সেচ কৌশলের বিকাশে ভূমিকা রাখা, জৈব সারের ব্যবহার, বৈশ্বিক জ্ঞান স্থানীয় পরিমণ্ডলে প্রয়োগ এবং চাষাবাদ প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তিশীল রাখার মতো বৈপ্লবিক কাজে লিপ্ত ছিল।

এগুলো তাদের ধাবিত করে এক কৃষি বিপ্লবের দিকে এবং এর মাধ্যেমে আরও অধিক সংখ্যক মানুষের দোরগোড়ায় সতেজ খাবার পৌঁছে যায়।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 পানি ব্যবস্থাপনা

📄 পানি ব্যবস্থাপনা


আন্দালুসিয়া কী আফগানিস্তান, শিকাগো কী কায়রো, যেখানেই থাকেন না কেন - কৃষি ও জীবন ধারণের জন্য পানির কোনো বিকল্প নেই। পানি জীবনের উৎস। মুসলিমরা পরম্পরাগতভাবে তৎকালের প্রচলিত সেচ ব্যবস্থা পায়। কিছু জিনিসকে তারা আগের মতো রেখে দেয়, কিছু জিনিসে নিয়ে আসে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ছোঁয়া, আবার সূচনা ঘটায় নতুন কিছু কৌশলের।

মুসলিমদের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারিগর ছিল গণিতশাস্ত্রে প্রভূত সমৃদ্ধি, যার মানে দাঁড়াচ্ছে: পানি উত্তোলন বিদ্যা ও সেচ কার্য সম্পাদনের সাথে সম্পৃক্ত যন্ত্রপাতি প্রতিনিয়ত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেত। ১১শ শতাব্দীর পারস্যের গণিতবিদ ও প্রকৌশলী মুহাম্মদ আল-কারাজী 'মাটির নিচে লুকানো পানি জমিনে উঠানোর ব্যাপারে' আলোচনা করেন। জরিপ যন্ত্র, পানির উৎসের সন্ধান প্রক্রিয়া এবং মাটির নিচে পানি নিষ্কাশনের নালা খনন যন্ত্রের মতো বিষয়গুলোর বিবরণও তিনি দিয়েছেন।

বাষ্পায়নের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করতেই মাটির নিচে এসব পানি নিষ্কাশন নালা বা সুড়ঙ্গ খনন করা হতো। এগুলোকে ক্বানাত বলা হতো এবং এগুলোর সবচেয়ে প্রাচীনতম নমুনা পারস্যে রয়েছে। কৃষিতে ব্যাপক কৃষিজ সমৃদ্ধি, অধিক চাষাবাদের ধারায় এগুলো পরিণত হয় চাষাবাদের অপরিহার্য সহযোগিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শুষ্ক জলবায়ুতে ক্বানাত ভবনগুলো রূপ নেয় কৃষির অত্যাবশকীয় অঙ্গে। পরবর্তীতে এগুলো স্পেনের কর্ডোবাতে এসে নাগরিক জীবনের গৃহস্থালির কাজে পানির প্রাপ্তিকে সহজলভ্য করে দেয়।

পারস্য ও আজকের আফগানিস্তানে হাজারেরও বেশি কুয়া ছিল, যার সবগুলোই এসব পাতাল নালা দ্বারা সংযুক্ত ছিল। পলি মাটির আস্তরণ ও ছাদ ক্ষয়ের সমস্যা মুকাবিলা এবং মাইলের পর মাইল দুর্গম মরুভূমি ও বৈরী ভূখণ্ডে পানির অবিরাম প্রবাহ নিশ্চিত করতেই এগুলো নির্মিত হয়েছিল। কিছু কিছু কঠিন পাবর্ত্য এলাকাতে ক্বানাতগুলো সমতলের ঝরনা হিসেবে দৃশ্যমান হয়, অতঃপর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে সেগুলো আবার হারিয়েও যায়। আলজেরিয়ার সাহারা অঞ্চলে পাতাল টানেল বা সুড়ঙ্গের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল, যা ফোগারাস (ফাজ্জারাত) নামে পরিচিত ছিল।

এখানের কৃষকরা এলাকার সবার জন্য পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে জলচালিত ঘড়ি, ক্লেপসিডরা ঘড়িও ব্যবহার করতো, যেহেতু এগুলোর সাহায্যে দিন ও রাতে প্রতিটি কৃষক কী পরিমাণ পানি পাচ্ছে, তা পরিমাপ করা যেত।

জলবিদ্যুৎ বাঁধ ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইরানের কিছু কিছু এলাকাতে ক্বানাতগুলো আজও কৃষকদের জন্য জীবনতুল্য। শিরাজের উত্তর-পূর্ব এলাকাতে পানির মতো মূল্যবান জিনিস কুয়া থেকে উত্তোলন করা হতো, যেখানে পানির যোগান উৎস ছিল এই পাতাল নালাসমূহ।

একে অপরের সাথে সংযুক্ত ইংরেজি 'এল' আকৃতির কুয়ার সিরিজ ব্যবহার করে মুসলিমগণ দূর দূরান্তে পানি পরিবহনে সক্ষম ছিল। জ্বানাত নামে পরিচিত পাতাল পানি নিষ্কাশন টানেলগুলো ইরানের ইস্পাহানের নিকটবর্তী ছিল। বায়ু চলাচলের জন্য এসব কানাতে ম্যানহোল ঢাকনা ছিল, যা টানেলের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহ সচল রাখতো। কুনাতগুলো আজও ব্যবহৃত হয়।

উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ুর এসব এলাকাতে পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে আজকের দিনের মতো পানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আনা আব্যশক ছিল। তৎকালীন শাসকেরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশাল জলাধার, যেমন: বাঁধগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছিল, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণ পানি উত্তোলন যন্ত্র ব্যবহার করে সীমিত মাত্রায় পানি উত্তোলনে মনোযোগী ছিল।

মিশরে নীলনদের পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জীবনের প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ছিল। ১৪শ শতাব্দির দুই মিশরীয় ঐতিহাসিক আন-নুয়াইরী ও আল-মাকুরিযী বাঁধ ও নীলনদের জলপথ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেন। নালাপথ খনন, পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বাঁধসমূহ তদারকির দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল আইয়ুবী ও মামলুক উভয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সুলতান ও ভূমি মালিকদের উপর। ইরাকে বৃহৎ স্থাপনাগুলো সুলতানের অধীনে ছিল এবং ছোটগুলো ছিল জনগণের অধীনে। এ ধরনের বৃহৎ স্থাপনাগুলো তদারকির দায়িত্ব অধিকাংশই প্রখ্যাত আমির ও সরকারি কর্মকর্তাদের উপর বর্তাতো। মামলুক সাম্রাজ্যের অধীনে এমন কর্মকর্তাকে 'কাশিফ আল জুসুর' বলা হতো, যার কাজ ছিল মিশরের প্রতিটি প্রদেশের বাঁধগুলো দেখাশুনা করা।

পানির অপচয় নিষিদ্ধ করা হয়। পানি নিয়ে সব ধরনের বিবাদ ও পানি-সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন হলে তা আদালতের মাধ্যমে মিমাংসা করা হতো। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ আদালতের বিচারক খোদ কৃষকদের দ্বারা নির্বাচিত হতো এবং তা Tribunal of the Waters (পানি ব্যবস্থাপনা ট্রাইবুনাল) নামে পরিচিত ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার শহরের প্রধান মসজিদের দ্বারপ্রান্তে এই আদালত বসতো। এক হাজার বছর পার হয়ে আজও এই ট্রাইবুনাল ভ্যালেন্সিয়াতে বসে, তবে তা এখন মসজিদ নয় বরং প্রধান গির্জার দ্বারপ্রান্তে।

১২শ শতাব্দির উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ইবনে আল-আওয়াম তার "কিতাবুষ যারাআ'-তে ড্রিপ (ফোঁটায় ফোঁটায় প্রবহমান) সেচ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন এবং মন্তব্য করেন যে, এ কৌশল পানি সংরক্ষণ করে এবং কিছু প্রজাতির জন্য মাত্রাতিরিক্ত পানির সরবরাহ প্রতিহত করে। তিনি গাছের মূলে নির্দিষ্ট আকারের ফুটোসহ পানিপূর্ণ পাত্র আংশিকভাবে পুঁতে দিতেন। পাত্রের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট আকারের ফুটোগুলো পানির ড্রিপিং রেট তথা পানির ফোঁটায় ফোঁটায় নিঃসরণ হারকে নিয়ন্ত্রণ করতো। বর্তমানে এই পদ্ধতি দুনিয়া জুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (পূর্ত-প্রকৌশল) ও মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং (যন্ত্র-প্রকৌশল)-এ বেশ দক্ষ থাকায় পানি উত্তোলনে কিছুই মুসলিমদের পথ আগলে দাঁড়াতে পারেনি, এমনকি পানির উৎস গিরিসঙ্কটে থাকলেও। পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় অত্যাধুনিক যন্ত্রের কল্যাণে পুরো সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়।

আন্দালুসিয়া কী আফগানিস্তান, শিকাগো কী কায়রো, যেখানেই থাকেন না কেন - কৃষি ও জীবন ধারণের জন্য পানির কোনো বিকল্প নেই। পানি জীবনের উৎস। মুসলিমরা পরম্পরাগতভাবে তৎকালের প্রচলিত সেচ ব্যবস্থা পায়। কিছু জিনিসকে তারা আগের মতো রেখে দেয়, কিছু জিনিসে নিয়ে আসে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ছোঁয়া, আবার সূচনা ঘটায় নতুন কিছু কৌশলের।

মুসলিমদের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারিগর ছিল গণিতশাস্ত্রে প্রভূত সমৃদ্ধি, যার মানে দাঁড়াচ্ছে: পানি উত্তোলন বিদ্যা ও সেচ কার্য সম্পাদনের সাথে সম্পৃক্ত যন্ত্রপাতি প্রতিনিয়ত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেত। ১১শ শতাব্দীর পারস্যের গণিতবিদ ও প্রকৌশলী মুহাম্মদ আল-কারাজী 'মাটির নিচে লুকানো পানি জমিনে উঠানোর ব্যাপারে' আলোচনা করেন। জরিপ যন্ত্র, পানির উৎসের সন্ধান প্রক্রিয়া এবং মাটির নিচে পানি নিষ্কাশনের নালা খনন যন্ত্রের মতো বিষয়গুলোর বিবরণও তিনি দিয়েছেন।

বাষ্পায়নের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করতেই মাটির নিচে এসব পানি নিষ্কাশন নালা বা সুড়ঙ্গ খনন করা হতো। এগুলোকে ক্বানাত বলা হতো এবং এগুলোর সবচেয়ে প্রাচীনতম নমুনা পারস্যে রয়েছে। কৃষিতে ব্যাপক কৃষিজ সমৃদ্ধি, অধিক চাষাবাদের ধারায় এগুলো পরিণত হয় চাষাবাদের অপরিহার্য সহযোগিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শুষ্ক জলবায়ুতে ক্বানাত ভবনগুলো রূপ নেয় কৃষির অত্যাবশকীয় অঙ্গে। পরবর্তীতে এগুলো স্পেনের কর্ডোবাতে এসে নাগরিক জীবনের গৃহস্থালির কাজে পানির প্রাপ্তিকে সহজলভ্য করে দেয়।

পারস্য ও আজকের আফগানিস্তানে হাজারেরও বেশি কুয়া ছিল, যার সবগুলোই এসব পাতাল নালা দ্বারা সংযুক্ত ছিল। পলি মাটির আস্তরণ ও ছাদ ক্ষয়ের সমস্যা মুকাবিলা এবং মাইলের পর মাইল দুর্গম মরুভূমি ও বৈরী ভূখণ্ডে পানির অবিরাম প্রবাহ নিশ্চিত করতেই এগুলো নির্মিত হয়েছিল। কিছু কিছু কঠিন পাবর্ত্য এলাকাতে ক্বানাতগুলো সমতলের ঝরনা হিসেবে দৃশ্যমান হয়, অতঃপর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে সেগুলো আবার হারিয়েও যায়। আলজেরিয়ার সাহারা অঞ্চলে পাতাল টানেল বা সুড়ঙ্গের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল, যা ফোগারাস (ফাজ্জারাত) নামে পরিচিত ছিল।

এখানের কৃষকরা এলাকার সবার জন্য পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে জলচালিত ঘড়ি, ক্লেপসিডরা ঘড়িও ব্যবহার করতো, যেহেতু এগুলোর সাহায্যে দিন ও রাতে প্রতিটি কৃষক কী পরিমাণ পানি পাচ্ছে, তা পরিমাপ করা যেত।

জলবিদ্যুৎ বাঁধ ও আধুনিক সেচ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইরানের কিছু কিছু এলাকাতে ক্বানাতগুলো আজও কৃষকদের জন্য জীবনতুল্য। শিরাজের উত্তর-পূর্ব এলাকাতে পানির মতো মূল্যবান জিনিস কুয়া থেকে উত্তোলন করা হতো, যেখানে পানির যোগান উৎস ছিল এই পাতাল নালাসমূহ।

একে অপরের সাথে সংযুক্ত ইংরেজি 'এল' আকৃতির কুয়ার সিরিজ ব্যবহার করে মুসলিমগণ দূর দূরান্তে পানি পরিবহনে সক্ষম ছিল। জ্বানাত নামে পরিচিত পাতাল পানি নিষ্কাশন টানেলগুলো ইরানের ইস্পাহানের নিকটবর্তী ছিল। বায়ু চলাচলের জন্য এসব কানাতে ম্যানহোল ঢাকনা ছিল, যা টানেলের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহ সচল রাখতো। কুনাতগুলো আজও ব্যবহৃত হয়।

উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ুর এসব এলাকাতে পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে আজকের দিনের মতো পানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আনা আব্যশক ছিল। তৎকালীন শাসকেরা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশাল জলাধার, যেমন: বাঁধগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছিল, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণ পানি উত্তোলন যন্ত্র ব্যবহার করে সীমিত মাত্রায় পানি উত্তোলনে মনোযোগী ছিল।

মিশরে নীলনদের পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জীবনের প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ছিল। ১৪শ শতাব্দির দুই মিশরীয় ঐতিহাসিক আন-নুয়াইরী ও আল-মাকুরিযী বাঁধ ও নীলনদের জলপথ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেন। নালাপথ খনন, পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বাঁধসমূহ তদারকির দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল আইয়ুবী ও মামলুক উভয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সুলতান ও ভূমি মালিকদের উপর। ইরাকে বৃহৎ স্থাপনাগুলো সুলতানের অধীনে ছিল এবং ছোটগুলো ছিল জনগণের অধীনে। এ ধরনের বৃহৎ স্থাপনাগুলো তদারকির দায়িত্ব অধিকাংশই প্রখ্যাত আমির ও সরকারি কর্মকর্তাদের উপর বর্তাতো। মামলুক সাম্রাজ্যের অধীনে এমন কর্মকর্তাকে 'কাশিফ আল জুসুর' বলা হতো, যার কাজ ছিল মিশরের প্রতিটি প্রদেশের বাঁধগুলো দেখাশুনা করা।

পানির অপচয় নিষিদ্ধ করা হয়। পানি নিয়ে সব ধরনের বিবাদ ও পানি-সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন হলে তা আদালতের মাধ্যমে মিমাংসা করা হতো। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ আদালতের বিচারক খোদ কৃষকদের দ্বারা নির্বাচিত হতো এবং তা Tribunal of the Waters (পানি ব্যবস্থাপনা ট্রাইবুনাল) নামে পরিচিত ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার শহরের প্রধান মসজিদের দ্বারপ্রান্তে এই আদালত বসতো। এক হাজার বছর পার হয়ে আজও এই ট্রাইবুনাল ভ্যালেন্সিয়াতে বসে, তবে তা এখন মসজিদ নয় বরং প্রধান গির্জার দ্বারপ্রান্তে।

১২শ শতাব্দির উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ইবনে আল-আওয়াম তার "কিতাবুষ যারাআ'-তে ড্রিপ (ফোঁটায় ফোঁটায় প্রবহমান) সেচ কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন এবং মন্তব্য করেন যে, এ কৌশল পানি সংরক্ষণ করে এবং কিছু প্রজাতির জন্য মাত্রাতিরিক্ত পানির সরবরাহ প্রতিহত করে। তিনি গাছের মূলে নির্দিষ্ট আকারের ফুটোসহ পানিপূর্ণ পাত্র আংশিকভাবে পুঁতে দিতেন। পাত্রের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট আকারের ফুটোগুলো পানির ড্রিপিং রেট তথা পানির ফোঁটায় ফোঁটায় নিঃসরণ হারকে নিয়ন্ত্রণ করতো। বর্তমানে এই পদ্ধতি দুনিয়া জুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (পূর্ত-প্রকৌশল) ও মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং (যন্ত্র-প্রকৌশল)-এ বেশ দক্ষ থাকায় পানি উত্তোলনে কিছুই মুসলিমদের পথ আগলে দাঁড়াতে পারেনি, এমনকি পানির উৎস গিরিসঙ্কটে থাকলেও। পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় অত্যাধুনিক যন্ত্রের কল্যাণে পুরো সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 পানি সরবরাহ

📄 পানি সরবরাহ


একবার কল্পনা করুন তো প্রবহমান পানি ছাড়া আপনার জীবন চলছে, যেখানে মাইলের পর মাইল হেঁটে আপনাকে নদী বা খালে যেতে হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে এটা ভাবতে হচ্ছে যে, কীভাবে বালতিতে পানি তোলা হবে, যেহেতু খরস্রোতা পানির উৎসের ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। ৮০০ বছর পূর্বে পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় যুগান্তকারী যন্ত্রসমূহের উদ্ভাবন ও প্রচলনের আগ পর্যন্ত মুসলিমদের অবস্থা অনেকটা এমনই ছিল।

পানি আটকে রাখা, কৃত্রিম নালাপথ তৈরি, পানি সংরক্ষণ ও উত্তোলনের নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং নিজেদের অর্জিত ও অন্যান্য সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে সময়কার প্রচলিত যন্ত্রসমূহে মুসলিমগণ নিয়ে আসে সুনিপুণ সৃজনশীলতার ছাপ।

প্রাচীন মিশরীয়রা শাদুফের মতো যন্ত্র ব্যবহার করতো। সাধারণ মনে হলেও এটা পানি উত্তোলনের কার্যকর এক যন্ত্র ছিল। আবর্তনশীল লম্বা দণ্ডে বালতি বেঁধে এ যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হতো। ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বালতিতে একটি পাল্টা-ওজন থাকতো এবং এগুলো বহন করতো অনুভূমিক কাঠের দণ্ডের উপর দাঁড়ানো দুটি খুঁটি বা স্তম্ভ। এই যন্ত্র মিশরে আজও ব্যবহৃত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ থেকেই খরস্রোতা নালাপথ বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি উত্তোলনের জন্য বৃহৎ জলচালিত চাকা বা নাউর ব্যবহৃত হতো। রোমান লেখক, স্থপতি ও প্রকৌশলী ভিটরুভিয়াস সাধারণ অথচ শক্তিশালী এই যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। যেকোন জলচালিত চাকার মতো প্রবহমান পানির স্রোত এটার প্রান্তে থাকা প্যাডেল কম্পার্টমেন্টে সজোরে ধাক্কা দিতো, আর তাতেই এটা চলা শুরু করতো। প্যাডেল কম্পার্টমেন্টগুলো পানি দিয়ে পূর্ণ হতো এবং এগুলো একেবারে চূড়াতে তুলে আনা হতো, যেখানে পানি সরবরাহের কৃত্রিম নালার সাথে সংযুক্ত প্রধান ট্যাংক বা জলাধারে এই কম্পার্টমেন্টগুলো পানি শুন্য হতো। রোমান ও পারসীয়দের ব্যবহৃত এই যন্ত্র মুসলিমরা নিজেদের চাহিদামাফিক ব্যবহার উপযোগী করে এটাকে আরও বেশি সুসংহত ও কার্যক্ষম করে তোলে।

৭ম শতাব্দির শেষার্ধে বসরায় অবস্থিত একটি খাল খননের আলোচনায় সর্বপ্রথম কোনো মুসলিম নাউরের বিষয়টি উল্লেখ করেন। সিরিয়ার হামা প্রদেশের অরন্টেস নদীতে আজও এসব জলচালিত চাকার দেখা মেলে, যদিও এগুলো আর ব্যবহৃত হয় না। এগুলোর চাকা বেশ বড় আকৃতির ছিল এবং সবচেয়ে বড়টির ব্যাস প্রায় ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) এবং এর বৃত্তাকার কাঠামো ১২০-টি কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল। স্পেনের মুর্সিয়াতে লা নরা (La Nora) নামে পরিচিত নাউরগুলো আজও সচল, কিন্তু এদের আসল চাকাগুলোর স্থান এখন স্টিলের চাকা দখল করে নিয়েছে। এ বিষয় বাদে বলা যায়, স্পেনের মুর আমলের কৃষি ব্যবস্থা কার্যত অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বহু নাউর রয়েছে, যেগুলো অনায়াসে আধুনিক পাম্পের সাথে সফল প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রাখে।

অনেক মুসলিম প্রযুক্তিবিদ এটা প্রত্যক্ষ করেন যে, শক্তি উৎপাদনে পানি ও জীবজন্তুর ব্যবহার কাজের মাত্রা দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়। আল-জাযারী ও তাকিউদ্দীনের মতো দু'জন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রকৌশলী অসংখ্য পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে বহু অভূতপূর্ব যন্ত্র নির্মাণ করেন, যা আজকের আধুনিক সভ্যতাতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী Automated machinery বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পথিকৃৎ।

আল-জাযারী ১২শ শতাব্দির শেষার্ধ ও ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিকে দক্ষিণ তুরস্কে বসবাস করতেন। দিয়ারবাকিরের আরটুক রাজা আনুমানিক ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে তাকে সরকারি কাজে নিয়োগ দেন। একজন দক্ষ স্থাপত্য নকশাবিদ হিসেবে তিনি এমন এক সুনিপুণ পানি উত্তোলন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যেখানে হাতের একটি অঙ্গুলি হেলানো ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি অনায়াসেই তোলা যেত। তিনি তার ক্র্যাংক-সংযুক্ত দণ্ড ব্যবস্থাতে (crank-connecting rod system) সর্বপ্রথম ক্র্যাংক (crank)-এর ব্যবহার করেন। যন্ত্র আবিষ্কারের ইতিহাসে ক্র্যাংককে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বিবেচনা করা হয়। কেননা, এটা চক্রাকার গতিকে সরলরৈখিক গতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম। গাড়ির ইঞ্জিন ও রেলের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের মতো জটিল যন্ত্র থেকে শুরু করে খেলনার মতো প্রায় সব ধরনের যন্ত্রে আজকের দিনে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়।

আল-জাযারী এমন এক যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা কড়িকাঠের কৃত্রিমনালার সাহায্যে একটি জন্তুর দ্বারা চালু হতো। কড়িকাঠের কৃত্রিমনালা পিচ্ছিল-ক্র্যাংক যান্ত্রিক পদ্ধতি (slider-crank mechanism) নামে পরিচিত গিয়ার ও ক্রাংকের সাহায্যে গঠিত জটিল ব্যবস্থার মাধ্যমে উপর ও নিচে চালিত হতো। ১৫শ শতাব্দিতে সংঘটিত প্রকৌশল বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইউরোপের কোথাও যন্ত্রের অংশ হিসেবে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

■ আল-জাযারীর ঘূর্ণায়মান পাম্প
আল-জাযারী পানি উত্তোলনের জন্য পাঁচটি যন্ত্র ডিজাইন করেন, যার মধ্যে দুটো ছিল শাদুফের উন্নত সংস্করণ এবং আরেকটি ছিল জন্তুর শক্তিকে গিয়ার ও জলশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন। ক্র্যাংক-চালিত সঞ্চালন দণ্ড (crankshaft) উদ্ভাবনের পর জলচালিত পাম্প নির্মাণের মাধ্যমে তার আরেকটি মৌলিক ও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। জলচালিত পাম্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল খাঁজকাটা চাকা (cogwheels), তামার পিস্টন, চোষণ যন্ত্র, নিঃসরণ পাইপ এবং একমুখী দোলক কপাটিকা (clack valve)। এই পাম্প ১২ মিটার (৩৯.৪ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত সরবরাহ ব্যবস্থাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পানি চুষে নিতে পারতো, যে পানি সেচ ও পয়ঃনিষ্কাশনে ব্যবহৃত হতো। এটা দ্বৈত-ক্রিয়া নীতির প্রথম উদাহরণ, যেখানে একটি পিস্টন পানি চুষে নিচ্ছে, অন্যদিকে আরেকটি পিস্টন তা নিঃসরণ করছে। আল-জাযারী পিস্টন ও একমুখী কপাটিকা এমন নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করে দিতেন যে, এরা অত্যন্ত দারুণভাবে কাজ করতো।

আপনার যদি কখনো মনে হয় যে, ঘূর্ণায়মান পাম্পের সাহায্যে আপনি ১৩শ শতাব্দির পানি উত্তোলন যন্ত্র বানাবেন, তবে যন্ত্রটির কার্যপ্রণালীর বিবরণ নিম্নরূপ:

জলচালিত কলের মতো এটাকে কোনো প্রবহমান নদীর কাছে বসাতে হবে, যেখানে এটার অর্ধেক প্যাডেল উত্তাল স্রোতের মাঝে থাকবে। প্যাডেল চাকা ঘোরার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গিয়ারিং কার্যক্রম চালু হয়ে তা পিস্টনকে কর্মক্ষম করে তুলে এবং পিস্টনটি লিভার বা ভার উত্তোলক বাহুর গতির সাথে উঠা-নামা করতে থাকে। আর এভাবেই তৈরি হয়ে গেল একটি ঘূর্ণায়মান পাম্প।

দোলক কপাটিকা পাইপের সাহায্যে পানি ভেতরে প্রবেশ করাতো এবং বাহিরে বের করে দিতো। অন্তর্গামী পাইপ পানিতে ডুবে থাকতো এবং যখনই পিস্টনকে এর সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য মোতাবেক টেনে তোলা হতো, তখনই অন্তর্গামী কপাটিকার সাহায্যে পানি এর মধ্যে শোষিত হতো। বহির্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

পিস্টনটি যখন সজোরে ধাক্কার অবস্থানে চলে যেত, তখন সিলিন্ডারে থাকা পানি বহির্গামী কপাটিকা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতো এবং অন্তর্গামী পাইপের চেয়ে সরু একটি বহির্গামী পাইপের মাধ্যমে পানি নিঃসরিত হতো। অন্তর্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

এই প্রক্রিয়া যন্ত্রটির উভয় অংশে পালাক্রমে চলতো। যন্ত্রের এক অংশ যখন ধাক্কা দেয়ার কায়দায় থাকতো, তখন অপর অংশটি টেনে তোলার অবস্থায় থাকতো। ফলশ্রুতিতে জলচালিত চাকার একটি আবর্তন সম্পন্ন করার সময়ে দুই 'একক পরিমাণ' পানি উত্তোলিত হতো। যতক্ষণ পানির প্রবাহ থাকতো, ততক্ষণ পানি উত্তোলন চলমান থাকতো।

■ তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্প
প্রযুক্তির ময়দানের আরেক বিস্ময় ১৬শ শতাব্দির অটোমান প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন ইবনে মারূফ আর-রশিদ, যিনি "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" (রূহানি যন্ত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কলাকৌশল) নামে যন্ত্র প্রকৌশলের উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বাষ্পশক্তির 'আবিষ্কারের' প্রায় একশত বছর পূর্বে জলচালিত পাম্পের আলোচনার পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সাদামাটা বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নিয়ে নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন।

তার নির্মিত ছয়-সিলিন্ডার পাম্প এবং পানি উত্তোলন যন্ত্র বস্তুত কাগজ প্রস্তুতকরণ ও ধাতুসংক্রান্ত কাজের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা তার নির্মিত পিস্টনগুলো অনেকটা বাষ্পচালিত হাতুড়ির মতো এবং এগুলো দ্বারা কাগজের জন্য কাঠের মণ্ড তৈরি করা যেত অথবা এক আঘাতে ধাতুর লম্বা সরু খাঁদ দূর করা যেত।

এই পাম্প কীভাবে কাজ করে, তাকিউদ্দীন তার পাণ্ডুলিপিতে সেটা তুলে ধরেন। ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটির সাথে ছিল লম্বা অনুভূমিক অক্ষদণ্ড বা Camshaft -এর সাথে সংযুক্ত একটি জলচালিত চাকা। আর এই চাকার সাথে ছিল এর দৈর্ঘ্য মোতাবেক ছয়টি দন্তক (Cam)। নদীর উত্তাল স্রোত জলচালিত চাকাকে ধাক্কা দিতো, যা ক্যামশাফ্টকে ঘোরাতো ও পাক দিতো। ক্যামশাফ্টের প্রতিটি দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে নিচের দিকে ধাক্কা দিতো এবং সবগুলো সংযুক্ত দণ্ড কেন্দ্র বরাবর ঘুরতে থাকে। সংযুক্ত দণ্ডের আরেক পাশে ছিল লেড বা সীসার ভার, যা উপরে উত্তোলিত হতো এবং সাথে করে পিস্টনকেও উপরে তুলে আনতো।

এভাবে একটি বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হতো এবং দোলক কপাটিকার সাহায্যে পানি পিস্টন সিলিন্ডারে শোষিত হতো। নির্দিষ্ট কোণে ক্যামশ্যাফ্টের আবর্তনের পর দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে অবমুক্ত করে দিতো, এরপর পিস্টনের ধাক্কা শেষ হতো। ভরের সাহায্যে সীসার ওজন পিস্টনকে নিচে নামিয়ে পানিকে দোলক কপাটিকার বিপরীতে বল প্রয়োগ করতো, কিন্তু দোলক কপাটিকা বন্ধ থাকায় পানিকে ভিন্ন আরেকটি ছিদ্র দিয়ে নির্গমন পাইপে যেতে হতো। একই সময়ে সবগুলো অংশের যুগপৎ ক্রিয়া এবং সঞ্চালন দণ্ডের অধীনে দন্তকগুলোর কৌণিক বিন্যাস দ্বারা সবগুলো পিস্টনের সুনিয়ন্ত্রিত অনুক্রমে পাম্পটির যান্ত্রিক ক্রিয়ার সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয়।

যন্ত্রের উপর নির্ভরতার পূর্বে যখন আমাদের চারপাশে না গাড়ি ছিল না ছিল সাইকেল বা ইলেকট্রিক পাম্প, ঠিক তখন এই আবিষ্কারগুলো সমাজ ও সভ্যতাকে আসলেই বদলে দিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলো হয়তো ব্যাপক ভিত্তিতে নির্মিত হতো না, তথাপি বহু শহরেই পানির পাম্পের দেখা মিলতো। যার ফলে মানুষদের না পানি সংরক্ষণের পাত্রের পসরা সাজাতে হতো, আর না তাদের শাদুফ দিয়ে পানি উত্তোলনে নিজেদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বরং তারা পাম্প বা কৃত্রিম নালার পাশে দাঁড়িয়ে কেবল পানি উত্তোলন চাকাগুলোর জমা করা মূল্যবান তরল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতো, যেমনিভাবে আমরা কল থেকে পানির প্রবাহের জন্য অপেক্ষা করি।

ঘূর্ণায়মান পাম্প
পানি সরবরাহ
পিপাসার্ত কৃষি ব্যবস্থার জন্য নয়া সেচ প্রযুক্তি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: সেচ ব্যবস্থার কল্যাণেই পীচফল, বেগুন ও ধানের মতো শস্যগুলো পশ্চিমের স্পেনে পৌঁছেছে।
অবস্থান: দিয়ারবাকির, বর্তমান তুরষ্ক
তারিখ: ১২শ শতাব্দীর শেষার্ধ
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: আল-জাযারী, যন্ত্র প্রকৌশলী

শতশত বছর পূর্বের মুসলিম স্পেনে আপনি হয়তো হাজারেরও অধিক পানি উত্তোলন-চাকা দেখতে পাবেন, যেগুলো ধানের জমিতে সেচকাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রতিটি শহর ও গ্রামে সেচ প্রদানে সেগুলো সক্ষম ছিল না।

১২শ শতাব্দীর প্রকৌশলী আল-জাযারী স্থানীয় মানুষদের কাছে সরাসরি পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি উত্তোলনের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার করা পাঁচটি ডিজাইনের মধ্যে দ্বিগুণ কর্মক্ষম চোষণ পাম্প ছিল সর্বোন্নত। তামার পিস্টন, কার্যকর বায়ু নিরোধক, চওড়া পাখনাযুক্ত কপাটিকা ব্যবহার করে আল-জাযারী এমন এক পাম্প উদ্ভাবন করেন, যা দুটো সিলিন্ডার দিয়ে নদীর পানি শুষে নিতো এবং এই যন্ত্রের উপরে থাকা এক ফালবিশিষ্ট নির্গমদ্বারে শুষে নেয়া পানি খালি করতো।

১৬শ শতাব্দীর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন তার অত্যাধুনিক ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের ডিজাইনে নদীর উত্তাল পানি শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করেন এবং তিনি তার রচিত "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" নামক পুস্তকে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বাষ্পচালিত টার্বাইনের প্রাথমিক একটি প্রকার নিয়ে আলোচনা করেন, যে ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দী পর পুনরায় আলোচনায় উঠে আসে।

তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটি একটি পানি উত্তোলন-চাকা দিয়ে চালিত হতো, যার সঞ্চালন দণ্ডে ছয়টি পেঁচানো আকৃতির গজাল বা দন্তক (Cam) ছিল। পানি উত্তোলন-চাকার অভ্যন্তরের ঘূর্ণায়মান ফাঁকা অংশে থাকা গজালগুলো পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডের একটি সিরিজকে সচল করতো, যার ফলে এদের প্রত্যেকেই এক একটি পিস্টনকে টেনে উপরে তুলতো। টেনে তোলা এই পিস্টনগুলো একটি কপাটিকার সাহায্যে পানি শুষে সিলিন্ডারে জমা করতো। সঞ্চালন দণ্ডটি ঘূর্ণায়মান হওয়ায় পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডগুলো খালাস করতো এবং ভার প্রযুক্ত হয়ে পিস্টনকে আবারও নিচে নামিয়ে দিতো, যার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত একটি পাইপের মাধ্যমে সিলিন্ডার হতে পানি বেরিয়ে যেত।

এমন যুগপৎ ক্রিয়ার বদৌলতে পাম্পটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই পানি সরবরাহ করতো এবং সেইসাথে হাতুড়িও পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল, যা দিয়ে কাগজের মণ্ড ও ধাতু পেটানো হতো। তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রের নিহিতার্থ হচ্ছে: মানুষকে আর পানির জন্য কোনো লাইনে দাঁড়াতে হবে না।

মুসলিম বিশ্বে যে কৃষি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার পিছনে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ব্যবসায়ীগণ ধান, পীচফল, এপ্রিকট, বেগুন স্পেনে এনে রোপণ করতো এবং এমন উন্নত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিতো। প্রজনন ও পশুপালনের নয়া কৌশল সকলের কাছে মাংস ও পশম সহজলভ্য করে দেয়, অথচ পূর্বে এসব অঞ্চলে এগুলো কেবল বিলাসিতা ভাবা হতো। পুরুষ ও নারীরা এমনসব খামারে কাজ ও ব্যবসায়িক লেনদেন করতো, যেখানে দূরবর্তী পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কৃত্রিম খালের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো।

আধুনিক কৃষি পদ্ধতি আজ সর্বত্র বিস্তৃত; তথাপি শাদুফ নামে পরিচিত হস্তচালিত পানি উত্তোলনের প্রাচীন যন্ত্রের ব্যবহার আজও আপনি মিশরে দেখতে পাবেন।

একবার কল্পনা করুন তো প্রবহমান পানি ছাড়া আপনার জীবন চলছে, যেখানে মাইলের পর মাইল হেঁটে আপনাকে নদী বা খালে যেতে হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে এটা ভাবতে হচ্ছে যে, কীভাবে বালতিতে পানি তোলা হবে, যেহেতু খরস্রোতা পানির উৎসের ধারে কাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। ৮০০ বছর পূর্বে পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পাম্পের ন্যায় যুগান্তকারী যন্ত্রসমূহের উদ্ভাবন ও প্রচলনের আগ পর্যন্ত মুসলিমদের অবস্থা অনেকটা এমনই ছিল।

পানি আটকে রাখা, কৃত্রিম নালাপথ তৈরি, পানি সংরক্ষণ ও উত্তোলনের নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন এবং নিজেদের অর্জিত ও অন্যান্য সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে সময়কার প্রচলিত যন্ত্রসমূহে মুসলিমগণ নিয়ে আসে সুনিপুণ সৃজনশীলতার ছাপ।

প্রাচীন মিশরীয়রা শাদুফের মতো যন্ত্র ব্যবহার করতো। সাধারণ মনে হলেও এটা পানি উত্তোলনের কার্যকর এক যন্ত্র ছিল। আবর্তনশীল লম্বা দণ্ডে বালতি বেঁধে এ যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হতো। ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বালতিতে একটি পাল্টা-ওজন থাকতো এবং এগুলো বহন করতো অনুভূমিক কাঠের দণ্ডের উপর দাঁড়ানো দুটি খুঁটি বা স্তম্ভ। এই যন্ত্র মিশরে আজও ব্যবহৃত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ১০০ থেকেই খরস্রোতা নালাপথ বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি উত্তোলনের জন্য বৃহৎ জলচালিত চাকা বা নাউর ব্যবহৃত হতো। রোমান লেখক, স্থপতি ও প্রকৌশলী ভিটরুভিয়াস সাধারণ অথচ শক্তিশালী এই যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। যেকোন জলচালিত চাকার মতো প্রবহমান পানির স্রোত এটার প্রান্তে থাকা প্যাডেল কম্পার্টমেন্টে সজোরে ধাক্কা দিতো, আর তাতেই এটা চলা শুরু করতো। প্যাডেল কম্পার্টমেন্টগুলো পানি দিয়ে পূর্ণ হতো এবং এগুলো একেবারে চূড়াতে তুলে আনা হতো, যেখানে পানি সরবরাহের কৃত্রিম নালার সাথে সংযুক্ত প্রধান ট্যাংক বা জলাধারে এই কম্পার্টমেন্টগুলো পানি শুন্য হতো। রোমান ও পারসীয়দের ব্যবহৃত এই যন্ত্র মুসলিমরা নিজেদের চাহিদামাফিক ব্যবহার উপযোগী করে এটাকে আরও বেশি সুসংহত ও কার্যক্ষম করে তোলে।

৭ম শতাব্দির শেষার্ধে বসরায় অবস্থিত একটি খাল খননের আলোচনায় সর্বপ্রথম কোনো মুসলিম নাউরের বিষয়টি উল্লেখ করেন। সিরিয়ার হামা প্রদেশের অরন্টেস নদীতে আজও এসব জলচালিত চাকার দেখা মেলে, যদিও এগুলো আর ব্যবহৃত হয় না। এগুলোর চাকা বেশ বড় আকৃতির ছিল এবং সবচেয়ে বড়টির ব্যাস প্রায় ২০ মিটার (৬৫.৬ ফুট) এবং এর বৃত্তাকার কাঠামো ১২০-টি কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল। স্পেনের মুর্সিয়াতে লা নরা (La Nora) নামে পরিচিত নাউরগুলো আজও সচল, কিন্তু এদের আসল চাকাগুলোর স্থান এখন স্টিলের চাকা দখল করে নিয়েছে। এ বিষয় বাদে বলা যায়, স্পেনের মুর আমলের কৃষি ব্যবস্থা কার্যত অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বহু নাউর রয়েছে, যেগুলো অনায়াসে আধুনিক পাম্পের সাথে সফল প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রাখে।

অনেক মুসলিম প্রযুক্তিবিদ এটা প্রত্যক্ষ করেন যে, শক্তি উৎপাদনে পানি ও জীবজন্তুর ব্যবহার কাজের মাত্রা দারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়। আল-জাযারী ও তাকিউদ্দীনের মতো দু'জন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রকৌশলী অসংখ্য পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে বহু অভূতপূর্ব যন্ত্র নির্মাণ করেন, যা আজকের আধুনিক সভ্যতাতে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টিকারী Automated machinery বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পথিকৃৎ।

আল-জাযারী ১২শ শতাব্দির শেষার্ধ ও ১৩শ শতাব্দির শুরুর দিকে দক্ষিণ তুরস্কে বসবাস করতেন। দিয়ারবাকিরের আরটুক রাজা আনুমানিক ১১৮০ খ্রিস্টাব্দে তাকে সরকারি কাজে নিয়োগ দেন। একজন দক্ষ স্থাপত্য নকশাবিদ হিসেবে তিনি এমন এক সুনিপুণ পানি উত্তোলন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যেখানে হাতের একটি অঙ্গুলি হেলানো ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি অনায়াসেই তোলা যেত। তিনি তার ক্র্যাংক-সংযুক্ত দণ্ড ব্যবস্থাতে (crank-connecting rod system) সর্বপ্রথম ক্র্যাংক (crank)-এর ব্যবহার করেন। যন্ত্র আবিষ্কারের ইতিহাসে ক্র্যাংককে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বিবেচনা করা হয়। কেননা, এটা চক্রাকার গতিকে সরলরৈখিক গতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম। গাড়ির ইঞ্জিন ও রেলের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের মতো জটিল যন্ত্র থেকে শুরু করে খেলনার মতো প্রায় সব ধরনের যন্ত্রে আজকের দিনে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়।

আল-জাযারী এমন এক যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা কড়িকাঠের কৃত্রিমনালার সাহায্যে একটি জন্তুর দ্বারা চালু হতো। কড়িকাঠের কৃত্রিমনালা পিচ্ছিল-ক্র্যাংক যান্ত্রিক পদ্ধতি (slider-crank mechanism) নামে পরিচিত গিয়ার ও ক্রাংকের সাহায্যে গঠিত জটিল ব্যবস্থার মাধ্যমে উপর ও নিচে চালিত হতো। ১৫শ শতাব্দিতে সংঘটিত প্রকৌশল বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইউরোপের কোথাও যন্ত্রের অংশ হিসেবে ক্র্যাংক ব্যবহৃত হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।

■ আল-জাযারীর ঘূর্ণায়মান পাম্প
আল-জাযারী পানি উত্তোলনের জন্য পাঁচটি যন্ত্র ডিজাইন করেন, যার মধ্যে দুটো ছিল শাদুফের উন্নত সংস্করণ এবং আরেকটি ছিল জন্তুর শক্তিকে গিয়ার ও জলশক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন। ক্র্যাংক-চালিত সঞ্চালন দণ্ড (crankshaft) উদ্ভাবনের পর জলচালিত পাম্প নির্মাণের মাধ্যমে তার আরেকটি মৌলিক ও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। জলচালিত পাম্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল খাঁজকাটা চাকা (cogwheels), তামার পিস্টন, চোষণ যন্ত্র, নিঃসরণ পাইপ এবং একমুখী দোলক কপাটিকা (clack valve)। এই পাম্প ১২ মিটার (৩৯.৪ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত সরবরাহ ব্যবস্থাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য পানি চুষে নিতে পারতো, যে পানি সেচ ও পয়ঃনিষ্কাশনে ব্যবহৃত হতো। এটা দ্বৈত-ক্রিয়া নীতির প্রথম উদাহরণ, যেখানে একটি পিস্টন পানি চুষে নিচ্ছে, অন্যদিকে আরেকটি পিস্টন তা নিঃসরণ করছে। আল-জাযারী পিস্টন ও একমুখী কপাটিকা এমন নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করে দিতেন যে, এরা অত্যন্ত দারুণভাবে কাজ করতো।

আপনার যদি কখনো মনে হয় যে, ঘূর্ণায়মান পাম্পের সাহায্যে আপনি ১৩শ শতাব্দির পানি উত্তোলন যন্ত্র বানাবেন, তবে যন্ত্রটির কার্যপ্রণালীর বিবরণ নিম্নরূপ:

জলচালিত কলের মতো এটাকে কোনো প্রবহমান নদীর কাছে বসাতে হবে, যেখানে এটার অর্ধেক প্যাডেল উত্তাল স্রোতের মাঝে থাকবে। প্যাডেল চাকা ঘোরার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গিয়ারিং কার্যক্রম চালু হয়ে তা পিস্টনকে কর্মক্ষম করে তুলে এবং পিস্টনটি লিভার বা ভার উত্তোলক বাহুর গতির সাথে উঠা-নামা করতে থাকে। আর এভাবেই তৈরি হয়ে গেল একটি ঘূর্ণায়মান পাম্প।

দোলক কপাটিকা পাইপের সাহায্যে পানি ভেতরে প্রবেশ করাতো এবং বাহিরে বের করে দিতো। অন্তর্গামী পাইপ পানিতে ডুবে থাকতো এবং যখনই পিস্টনকে এর সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য মোতাবেক টেনে তোলা হতো, তখনই অন্তর্গামী কপাটিকার সাহায্যে পানি এর মধ্যে শোষিত হতো। বহির্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

পিস্টনটি যখন সজোরে ধাক্কার অবস্থানে চলে যেত, তখন সিলিন্ডারে থাকা পানি বহির্গামী কপাটিকা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হতো এবং অন্তর্গামী পাইপের চেয়ে সরু একটি বহির্গামী পাইপের মাধ্যমে পানি নিঃসরিত হতো। অন্তর্গামী কপাটিকা এই সময় ভর ও শীর্ষবিন্দুতে অবস্থানের কারণে বন্ধ থাকতো।

এই প্রক্রিয়া যন্ত্রটির উভয় অংশে পালাক্রমে চলতো। যন্ত্রের এক অংশ যখন ধাক্কা দেয়ার কায়দায় থাকতো, তখন অপর অংশটি টেনে তোলার অবস্থায় থাকতো। ফলশ্রুতিতে জলচালিত চাকার একটি আবর্তন সম্পন্ন করার সময়ে দুই 'একক পরিমাণ' পানি উত্তোলিত হতো। যতক্ষণ পানির প্রবাহ থাকতো, ততক্ষণ পানি উত্তোলন চলমান থাকতো।

■ তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্প
প্রযুক্তির ময়দানের আরেক বিস্ময় ১৬শ শতাব্দির অটোমান প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন ইবনে মারূফ আর-রশিদ, যিনি "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" (রূহানি যন্ত্রসমূহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কলাকৌশল) নামে যন্ত্র প্রকৌশলের উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বাষ্পশক্তির 'আবিষ্কারের' প্রায় একশত বছর পূর্বে জলচালিত পাম্পের আলোচনার পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সাদামাটা বাষ্পচালিত ইঞ্জিন নিয়ে নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন।

তার নির্মিত ছয়-সিলিন্ডার পাম্প এবং পানি উত্তোলন যন্ত্র বস্তুত কাগজ প্রস্তুতকরণ ও ধাতুসংক্রান্ত কাজের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা তার নির্মিত পিস্টনগুলো অনেকটা বাষ্পচালিত হাতুড়ির মতো এবং এগুলো দ্বারা কাগজের জন্য কাঠের মণ্ড তৈরি করা যেত অথবা এক আঘাতে ধাতুর লম্বা সরু খাঁদ দূর করা যেত।

এই পাম্প কীভাবে কাজ করে, তাকিউদ্দীন তার পাণ্ডুলিপিতে সেটা তুলে ধরেন। ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটির সাথে ছিল লম্বা অনুভূমিক অক্ষদণ্ড বা Camshaft -এর সাথে সংযুক্ত একটি জলচালিত চাকা। আর এই চাকার সাথে ছিল এর দৈর্ঘ্য মোতাবেক ছয়টি দন্তক (Cam)। নদীর উত্তাল স্রোত জলচালিত চাকাকে ধাক্কা দিতো, যা ক্যামশাফ্টকে ঘোরাতো ও পাক দিতো। ক্যামশাফ্টের প্রতিটি দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে নিচের দিকে ধাক্কা দিতো এবং সবগুলো সংযুক্ত দণ্ড কেন্দ্র বরাবর ঘুরতে থাকে। সংযুক্ত দণ্ডের আরেক পাশে ছিল লেড বা সীসার ভার, যা উপরে উত্তোলিত হতো এবং সাথে করে পিস্টনকেও উপরে তুলে আনতো।

এভাবে একটি বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হতো এবং দোলক কপাটিকার সাহায্যে পানি পিস্টন সিলিন্ডারে শোষিত হতো। নির্দিষ্ট কোণে ক্যামশ্যাফ্টের আবর্তনের পর দন্তক সংযুক্ত দণ্ডকে অবমুক্ত করে দিতো, এরপর পিস্টনের ধাক্কা শেষ হতো। ভরের সাহায্যে সীসার ওজন পিস্টনকে নিচে নামিয়ে পানিকে দোলক কপাটিকার বিপরীতে বল প্রয়োগ করতো, কিন্তু দোলক কপাটিকা বন্ধ থাকায় পানিকে ভিন্ন আরেকটি ছিদ্র দিয়ে নির্গমন পাইপে যেতে হতো। একই সময়ে সবগুলো অংশের যুগপৎ ক্রিয়া এবং সঞ্চালন দণ্ডের অধীনে দন্তকগুলোর কৌণিক বিন্যাস দ্বারা সবগুলো পিস্টনের সুনিয়ন্ত্রিত অনুক্রমে পাম্পটির যান্ত্রিক ক্রিয়ার সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয়।

যন্ত্রের উপর নির্ভরতার পূর্বে যখন আমাদের চারপাশে না গাড়ি ছিল না ছিল সাইকেল বা ইলেকট্রিক পাম্প, ঠিক তখন এই আবিষ্কারগুলো সমাজ ও সভ্যতাকে আসলেই বদলে দিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলো হয়তো ব্যাপক ভিত্তিতে নির্মিত হতো না, তথাপি বহু শহরেই পানির পাম্পের দেখা মিলতো। যার ফলে মানুষদের না পানি সংরক্ষণের পাত্রের পসরা সাজাতে হতো, আর না তাদের শাদুফ দিয়ে পানি উত্তোলনে নিজেদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। বরং তারা পাম্প বা কৃত্রিম নালার পাশে দাঁড়িয়ে কেবল পানি উত্তোলন চাকাগুলোর জমা করা মূল্যবান তরল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতো, যেমনিভাবে আমরা কল থেকে পানির প্রবাহের জন্য অপেক্ষা করি।

ঘূর্ণায়মান পাম্প
পানি সরবরাহ
পিপাসার্ত কৃষি ব্যবস্থার জন্য নয়া সেচ প্রযুক্তি
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: সেচ ব্যবস্থার কল্যাণেই পীচফল, বেগুন ও ধানের মতো শস্যগুলো পশ্চিমের স্পেনে পৌঁছেছে।
অবস্থান: দিয়ারবাকির, বর্তমান তুরষ্ক
তারিখ: ১২শ শতাব্দীর শেষার্ধ
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব: আল-জাযারী, যন্ত্র প্রকৌশলী

শতশত বছর পূর্বের মুসলিম স্পেনে আপনি হয়তো হাজারেরও অধিক পানি উত্তোলন-চাকা দেখতে পাবেন, যেগুলো ধানের জমিতে সেচকাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রতিটি শহর ও গ্রামে সেচ প্রদানে সেগুলো সক্ষম ছিল না।

১২শ শতাব্দীর প্রকৌশলী আল-জাযারী স্থানীয় মানুষদের কাছে সরাসরি পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পানি উত্তোলনের বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। তার করা পাঁচটি ডিজাইনের মধ্যে দ্বিগুণ কর্মক্ষম চোষণ পাম্প ছিল সর্বোন্নত। তামার পিস্টন, কার্যকর বায়ু নিরোধক, চওড়া পাখনাযুক্ত কপাটিকা ব্যবহার করে আল-জাযারী এমন এক পাম্প উদ্ভাবন করেন, যা দুটো সিলিন্ডার দিয়ে নদীর পানি শুষে নিতো এবং এই যন্ত্রের উপরে থাকা এক ফালবিশিষ্ট নির্গমদ্বারে শুষে নেয়া পানি খালি করতো।

১৬শ শতাব্দীর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তাকিউদ্দীন তার অত্যাধুনিক ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের ডিজাইনে নদীর উত্তাল পানি শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করেন এবং তিনি তার রচিত "আত-তুরুক আস সানিয়াতি ফীল আলাতির রূহানিয়াতি" নামক পুস্তকে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বাষ্পচালিত টার্বাইনের প্রাথমিক একটি প্রকার নিয়ে আলোচনা করেন, যে ধারণাটি প্রায় এক শতাব্দী পর পুনরায় আলোচনায় উঠে আসে।

তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পটি একটি পানি উত্তোলন-চাকা দিয়ে চালিত হতো, যার সঞ্চালন দণ্ডে ছয়টি পেঁচানো আকৃতির গজাল বা দন্তক (Cam) ছিল। পানি উত্তোলন-চাকার অভ্যন্তরের ঘূর্ণায়মান ফাঁকা অংশে থাকা গজালগুলো পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডের একটি সিরিজকে সচল করতো, যার ফলে এদের প্রত্যেকেই এক একটি পিস্টনকে টেনে উপরে তুলতো। টেনে তোলা এই পিস্টনগুলো একটি কপাটিকার সাহায্যে পানি শুষে সিলিন্ডারে জমা করতো। সঞ্চালন দণ্ডটি ঘূর্ণায়মান হওয়ায় পরস্পর সংযুক্ত দণ্ডগুলো খালাস করতো এবং ভার প্রযুক্ত হয়ে পিস্টনকে আবারও নিচে নামিয়ে দিতো, যার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত একটি পাইপের মাধ্যমে সিলিন্ডার হতে পানি বেরিয়ে যেত।

এমন যুগপৎ ক্রিয়ার বদৌলতে পাম্পটি কোনো বিঘ্ন ছাড়াই পানি সরবরাহ করতো এবং সেইসাথে হাতুড়িও পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল, যা দিয়ে কাগজের মণ্ড ও ধাতু পেটানো হতো। তাকিউদ্দীনের ছয়-সিলিন্ডার পাম্পের মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রের নিহিতার্থ হচ্ছে: মানুষকে আর পানির জন্য কোনো লাইনে দাঁড়াতে হবে না।

মুসলিম বিশ্বে যে কৃষি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার পিছনে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ব্যবসায়ীগণ ধান, পীচফল, এপ্রিকট, বেগুন স্পেনে এনে রোপণ করতো এবং এমন উন্নত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমিতে প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিতো। প্রজনন ও পশুপালনের নয়া কৌশল সকলের কাছে মাংস ও পশম সহজলভ্য করে দেয়, অথচ পূর্বে এসব অঞ্চলে এগুলো কেবল বিলাসিতা ভাবা হতো। পুরুষ ও নারীরা এমনসব খামারে কাজ ও ব্যবসায়িক লেনদেন করতো, যেখানে দূরবর্তী পানি উত্তোলন যন্ত্র ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কৃত্রিম খালের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো।

আধুনিক কৃষি পদ্ধতি আজ সর্বত্র বিস্তৃত; তথাপি শাদুফ নামে পরিচিত হস্তচালিত পানি উত্তোলনের প্রাচীন যন্ত্রের ব্যবহার আজও আপনি মিশরে দেখতে পাবেন।

📘 ১০০১ মুসলিম আবিষ্কার > 📄 বাঁধ

📄 বাঁধ


সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা পূর্ত প্রকৌশলের সর্ববৃহৎ স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাঁধ অন্যতম এবং সভ্যতা বিনির্মাণে বাঁধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁধ ব্যবস্থার অভাবে অত্যধিক বন্যা জমি প্লাবিত করে বিনাশ করতো, আর অসম্ভব করে তুলতো ব্যাপকভিত্তিক সেচ কার্যক্রম। বাঁধ নির্মাণ ব্যতীত জলবিদ্যুৎ স্থাপনা অসম্ভব ছিল, যা আজকের দিনে প্রতিনিয়ত শক্তি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

বহু শতাব্দি পূর্বেই মুসলিমগণ নির্মাণ কাঠামো ও বৈচিত্রময় গঠনের মধ্য থেকে খিলানাকৃতির বাঁধ, উপাশ্রয় বাঁধ ও বেড়িবাঁধের মতো বহু বাঁধ নির্মাণ করেছিল। নকশা ও নান্দনিকতার বিচারে এসব বাঁধের মাঝে ৯ম শতাব্দিতে তিউনিসের আগলাবী রাজবংশ কর্তৃক তাদের রাজধানী আল-কায়রাওয়ানের নিকট নির্মিত বাঁধটি সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। ১১শ শতাব্দির দক্ষিণ স্পেনের ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক আল-বাকরী বাঁধটির বিবরণ এভাবে দেন, "আকৃতিতে বৃত্তাকার এবং আয়তনে বিশাল এই বাঁধ। বাঁধের একেবারে কেন্দ্রে অষ্টভুজের একটি টাওয়ার দাঁড়ানো, যা চার দরজাবিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন কক্ষকে বেষ্টন করে আছে। উভয়পাশে খিলানে ঢাকা তোরণের লম্বা সারি এবং এগুলো জলাধারের দক্ষিণ অংশে একটি অপরটির উপর হেলান দিয়ে আছে।"

ইরানের কিবার বাঁধটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন বাঁধ হিসেবে পরিচিত, যা প্রায় ৭০০ বছরের মতো পুরোনো। এ ধরনের নকশার অন্যান্য বাঁধের মতো এই বাঁধের মর্টার বা হামানদিস্তাতে অসমান, এবড়ো-থেবড়ো পাথরকুচির শাঁসের সমষ্ঠি রয়েছে। এক প্রকার স্থানীয় মরু লতাগুল্মের ছাইয়ের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা চুনাপাথর দিয়ে মর্টার তৈরি হতো, যেন তা ফাটল মুকাবিলায় আরও বেশি শক্ত, অটল ও অভেদ্য হয়। এরপরের প্রাচীন বাঁধের তালিকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে বাঁকানো কুসাইবা বাঁধ, যা ৩০ মিটার (৯৮.৪ ফুট) উঁচু এবং ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট। বাঁধটি বর্তমান সৌদি আরবের মদীনার নিকটে অবস্থিত।

আজকের আফগানিস্তানে তিনটি সুপ্রাচীন বাঁধ রয়েছে, যা ১১শ শতাব্দিতে গজনীর সুলতান মাহমুদ নিজ সাম্রাজ্যের রাজধানীর নিকট নির্মাণ করেন। এর মধ্যে একটি বাঁধ তার নামে নামকৃত, যা কাবুল থেকে ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বাঁধটি উচ্চতায় ৩২ মিটার (১০৫ ফুট) এবং দৈর্ঘ্যে ২২০ মিটার (৭২২ ফুট)।

"সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসবেত্তাগণ মুসলিম সময়কে একেবারে বাদই দিয়ে দিয়েছেন, আর বিশেষভাবে বলতে গেলে বাঁধ নির্মাণের ঐতিহাসিকগণ তো মুসলিম আমলের বিষয়টি একদম চেপে গেছেন, এমনকি তারা এই দাবী করে বসেছেন যে, উমাইয়া ও আব্বাসীদের সময়ে বাঁধ নির্মাণ, সেচ ও অন্যান্য প্রকৌশলের কাজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় এবং শেষমেশ তা বিলুপ্ত পর্যন্ত হয়। এ ধরনের কথা নিতান্তই অন্যায় ও অসত্য।"
নরম্যান স্মিথ, History of Dams, ১৯৭১

মুসলিম স্পেনে অতিকায় আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হতো এবং গাঁথুনি হিসেবে তারা সেখানে এক প্রকারের সিমেন্ট ব্যবহার করতো, যা পাথরের চেয়েও শক্ত। তুরিয়া নদীতে অবস্থিত ৮-টি বাঁধের প্রতিটির ভিত্তি নদীগর্ভের ১৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নিমজ্জিত, অধিকন্তু সারি সারি কাঠের পাইল (pile) দিয়ে ভিত্তিগুলোকে আরও সুরক্ষা প্রদান করা হতো। নদীর অস্বাভাবিক আচরণের জন্যই এমন কঠিন ও শক্ত ভিত্তির ব্যবস্থা করা হতো। কেননা বন্যাকালীন সময়ে এই প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে শতগুণে বেড়ে যেত। দশ শতাব্দির অধিক সময় পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত সংস্কার ছাড়াই বাঁধগুলো আজও ভেলেন্সিয়ার সেচ চাহিদাকে পূরণ করে যাচ্ছে।

কর্ডোবা শহরের গোয়াদেলকুইভার নদীর বাঁধটি সম্ভবত দেশটিতে টিকে থাকা সর্বপ্রাচীন ইসলামী বাঁধ। ১২শ শতাব্দির ভূগোলবিদ আল-ইদরিসীর মতে, বাঁধটি কিবতীয়্যা পাথরের তৈরি এবং এতে মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে। বাঁধটি নদীতে আঁকাবাঁকা পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। এ ধরনের আঁকাবাঁকা আকৃতি থেকে এটা বুঝা যায় যে, নির্মাতাগণ ঢেউয়ের চূড়াকে উদ্দেশ্য করে এমনটি করেছেন, যেন বাঁধের প্লাবিত হওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। এই বাঁধের অবশিষ্টাংশ নদীগর্ভের কয়েক ফুট উপরে আজও দৃশ্যমান।

এ ধরনের অতিকায় স্থাপনা নির্মাণে মুসলিম প্রকৌশলীগণ ভূমি জরিপের অত্যাধুনিক কৌশল ও উপকরণসমূহ ব্যবহার করেছেন, যেমন: আন্তর্লাব এবং সেইসাথে ত্রিকোণমিতিক হিসেব। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা পাথরখণ্ড দিয়ে বাঁধগুলো নির্মিত হতো। ইস্পাতের পেরেক দিয়ে এই পাথরখণ্ডগুলো সংযুক্ত করা হতো এবং পেরেকগুলো বসানোর ফলে সৃষ্ট গর্ত গলিত সীসা দিয়ে পূর্ণ করা হতো। কারিগরি শিল্প-নৈপুণ্যের মাত্রা ও নকশার উৎকর্ষ এতটাই অর্জিত হয়েছিল যে, ৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত বাঁধগুলোর এক-তৃতীয়াংশ আজও অক্ষত। আর অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গল বাহিনী থেকে শুরু করে তাইমুর লঙ্গের সুবিশাল সৈন্যদলের শতাব্দিব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কল-কারখানাতে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে মুসলিমগণ নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক শক্তিতে (Green energy) বিনিয়োগের নজির স্থাপন করেছিল। খুজিস্তানের আবি গারার প্রণালীতে দেয়া পুল-ই-বলাইতী বাঁধের প্রত্যেক কিনারার প্রাচীর কেটে ভূ-গর্ভস্থ সুড়ঙ্গে কারখানা স্থাপন করেছিল, যা জলশক্তি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রাচীন দৃষ্টান্ত। ডিজফুলের সেতু-বাঁধ এমনই আরেক দৃষ্টান্ত, যা ৫০ হাত ব্যাসের বৃহৎ জলচালিত চাকা চালানোর ক্ষমতা রাখতো এবং চাকাটি ওই শহরের সকল গৃহে পানি সরবরাহ করতো। পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের এমন বহু দৃষ্টান্ত আজও বহুস্থানে দৃশ্যমান।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা পূর্ত প্রকৌশলের সর্ববৃহৎ স্থাপনাগুলোর মধ্যে বাঁধ অন্যতম এবং সভ্যতা বিনির্মাণে বাঁধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁধ ব্যবস্থার অভাবে অত্যধিক বন্যা জমি প্লাবিত করে বিনাশ করতো, আর অসম্ভব করে তুলতো ব্যাপকভিত্তিক সেচ কার্যক্রম। বাঁধ নির্মাণ ব্যতীত জলবিদ্যুৎ স্থাপনা অসম্ভব ছিল, যা আজকের দিনে প্রতিনিয়ত শক্তি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

বহু শতাব্দি পূর্বেই মুসলিমগণ নির্মাণ কাঠামো ও বৈচিত্রময় গঠনের মধ্য থেকে খিলানাকৃতির বাঁধ, উপাশ্রয় বাঁধ ও বেড়িবাঁধের মতো বহু বাঁধ নির্মাণ করেছিল। নকশা ও নান্দনিকতার বিচারে এসব বাঁধের মাঝে ৯ম শতাব্দিতে তিউনিসের আগলাবী রাজবংশ কর্তৃক তাদের রাজধানী আল-কায়রাওয়ানের নিকট নির্মিত বাঁধটি সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। ১১শ শতাব্দির দক্ষিণ স্পেনের ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক আল-বাকরী বাঁধটির বিবরণ এভাবে দেন, "আকৃতিতে বৃত্তাকার এবং আয়তনে বিশাল এই বাঁধ। বাঁধের একেবারে কেন্দ্রে অষ্টভুজের একটি টাওয়ার দাঁড়ানো, যা চার দরজাবিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন কক্ষকে বেষ্টন করে আছে। উভয়পাশে খিলানে ঢাকা তোরণের লম্বা সারি এবং এগুলো জলাধারের দক্ষিণ অংশে একটি অপরটির উপর হেলান দিয়ে আছে।"

ইরানের কিবার বাঁধটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন বাঁধ হিসেবে পরিচিত, যা প্রায় ৭০০ বছরের মতো পুরোনো। এ ধরনের নকশার অন্যান্য বাঁধের মতো এই বাঁধের মর্টার বা হামানদিস্তাতে অসমান, এবড়ো-থেবড়ো পাথরকুচির শাঁসের সমষ্ঠি রয়েছে। এক প্রকার স্থানীয় মরু লতাগুল্মের ছাইয়ের সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা চুনাপাথর দিয়ে মর্টার তৈরি হতো, যেন তা ফাটল মুকাবিলায় আরও বেশি শক্ত, অটল ও অভেদ্য হয়। এরপরের প্রাচীন বাঁধের তালিকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে বাঁকানো কুসাইবা বাঁধ, যা ৩০ মিটার (৯৮.৪ ফুট) উঁচু এবং ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট। বাঁধটি বর্তমান সৌদি আরবের মদীনার নিকটে অবস্থিত।

আজকের আফগানিস্তানে তিনটি সুপ্রাচীন বাঁধ রয়েছে, যা ১১শ শতাব্দিতে গজনীর সুলতান মাহমুদ নিজ সাম্রাজ্যের রাজধানীর নিকট নির্মাণ করেন। এর মধ্যে একটি বাঁধ তার নামে নামকৃত, যা কাবুল থেকে ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বাঁধটি উচ্চতায় ৩২ মিটার (১০৫ ফুট) এবং দৈর্ঘ্যে ২২০ মিটার (৭২২ ফুট)।

"সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসবেত্তাগণ মুসলিম সময়কে একেবারে বাদই দিয়ে দিয়েছেন, আর বিশেষভাবে বলতে গেলে বাঁধ নির্মাণের ঐতিহাসিকগণ তো মুসলিম আমলের বিষয়টি একদম চেপে গেছেন, এমনকি তারা এই দাবী করে বসেছেন যে, উমাইয়া ও আব্বাসীদের সময়ে বাঁধ নির্মাণ, সেচ ও অন্যান্য প্রকৌশলের কাজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায় এবং শেষমেশ তা বিলুপ্ত পর্যন্ত হয়। এ ধরনের কথা নিতান্তই অন্যায় ও অসত্য।"
নরম্যান স্মিথ, History of Dams, ১৯৭১

মুসলিম স্পেনে অতিকায় আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হতো এবং গাঁথুনি হিসেবে তারা সেখানে এক প্রকারের সিমেন্ট ব্যবহার করতো, যা পাথরের চেয়েও শক্ত। তুরিয়া নদীতে অবস্থিত ৮-টি বাঁধের প্রতিটির ভিত্তি নদীগর্ভের ১৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নিমজ্জিত, অধিকন্তু সারি সারি কাঠের পাইল (pile) দিয়ে ভিত্তিগুলোকে আরও সুরক্ষা প্রদান করা হতো। নদীর অস্বাভাবিক আচরণের জন্যই এমন কঠিন ও শক্ত ভিত্তির ব্যবস্থা করা হতো। কেননা বন্যাকালীন সময়ে এই প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে শতগুণে বেড়ে যেত। দশ শতাব্দির অধিক সময় পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত সংস্কার ছাড়াই বাঁধগুলো আজও ভেলেন্সিয়ার সেচ চাহিদাকে পূরণ করে যাচ্ছে।

কর্ডোবা শহরের গোয়াদেলকুইভার নদীর বাঁধটি সম্ভবত দেশটিতে টিকে থাকা সর্বপ্রাচীন ইসলামী বাঁধ। ১২শ শতাব্দির ভূগোলবিদ আল-ইদরিসীর মতে, বাঁধটি কিবতীয়্যা পাথরের তৈরি এবং এতে মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে। বাঁধটি নদীতে আঁকাবাঁকা পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। এ ধরনের আঁকাবাঁকা আকৃতি থেকে এটা বুঝা যায় যে, নির্মাতাগণ ঢেউয়ের চূড়াকে উদ্দেশ্য করে এমনটি করেছেন, যেন বাঁধের প্লাবিত হওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। এই বাঁধের অবশিষ্টাংশ নদীগর্ভের কয়েক ফুট উপরে আজও দৃশ্যমান।

এ ধরনের অতিকায় স্থাপনা নির্মাণে মুসলিম প্রকৌশলীগণ ভূমি জরিপের অত্যাধুনিক কৌশল ও উপকরণসমূহ ব্যবহার করেছেন, যেমন: আন্তর্লাব এবং সেইসাথে ত্রিকোণমিতিক হিসেব। অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা পাথরখণ্ড দিয়ে বাঁধগুলো নির্মিত হতো। ইস্পাতের পেরেক দিয়ে এই পাথরখণ্ডগুলো সংযুক্ত করা হতো এবং পেরেকগুলো বসানোর ফলে সৃষ্ট গর্ত গলিত সীসা দিয়ে পূর্ণ করা হতো। কারিগরি শিল্প-নৈপুণ্যের মাত্রা ও নকশার উৎকর্ষ এতটাই অর্জিত হয়েছিল যে, ৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে নির্মিত বাঁধগুলোর এক-তৃতীয়াংশ আজও অক্ষত। আর অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গল বাহিনী থেকে শুরু করে তাইমুর লঙ্গের সুবিশাল সৈন্যদলের শতাব্দিব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কল-কারখানাতে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে মুসলিমগণ নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক শক্তিতে (Green energy) বিনিয়োগের নজির স্থাপন করেছিল। খুজিস্তানের আবি গারার প্রণালীতে দেয়া পুল-ই-বলাইতী বাঁধের প্রত্যেক কিনারার প্রাচীর কেটে ভূ-গর্ভস্থ সুড়ঙ্গে কারখানা স্থাপন করেছিল, যা জলশক্তি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের অন্যতম প্রাচীন দৃষ্টান্ত। ডিজফুলের সেতু-বাঁধ এমনই আরেক দৃষ্টান্ত, যা ৫০ হাত ব্যাসের বৃহৎ জলচালিত চাকা চালানোর ক্ষমতা রাখতো এবং চাকাটি ওই শহরের সকল গৃহে পানি সরবরাহ করতো। পানি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের এমন বহু দৃষ্টান্ত আজও বহুস্থানে দৃশ্যমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00