📄 বাণিজ্যিক রসায়ন
১১০০ বছর পূর্বের মুসলিম রসায়নবিদদের নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা তাদের এমন এক প্রক্রিয়া আবিষ্কারে সক্ষম করে, যা আজকের দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ ও জাতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। পানির ঠিক পরেই প্রক্রিয়ালব্ধ এই দ্রব্যকে জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান বিবেচনা করা হয়। কেইবা জানতো যে, আরবীতে নাক্ত নামে পরিচিত এই ঘন কালো তেলজাতীয় দ্রব্যের প্রায় ৪০০০-এরও অধিক ব্যবহার রয়েছে? অশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পাতন প্রক্রিয়া ছাড়া না আমরা পেট্রোল পেতাম, আর না পেতাম কেরোসিন, অ্যাসফল্ট (পিচ) অথবা প্লাস্টিক।
পাতন হলো বিভিন্ন তরল পদার্থের গলনাংকের ভিন্নতার প্রেক্ষিতে তাদের পৃথক করার একটি উপায় বা প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া ৮ম শতাব্দি থেকেই মুসলিমদের নিকট সুপরিচিত ছিল। গোলাপজল ও গাছগাছড়া থেকে তৈরি 'এসেনশিয়াল তেল' উৎপাদন ছিল এটার প্রথম ও সুবিদিত প্রয়োগ। পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মদ থেকে বিশুদ্ধ অ্যালকোহল সংগ্রহ করা হতো, যা প্রধানত অমুসলিম সম্প্রদায় ব্যবহার করতো, যেমন: মুসলিম শাসনাধীনে থাকা খ্রিস্টানগণ। জাবির ইবনে হাইয়ান শীতলীকরণের একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন, যা এটার পাতনে ব্যবহার উপযোগী ছিল। পাতনকৃত অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলের চূর্ণ তখন এসিড, নানা ধরনের ঔষধ, সুগন্ধি ও লেখার কালি উৎপাদনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হলেও পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো না, যেহেতু ইসলাম অ্যালকোহল ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
৮ম শতাব্দিতে জাবির ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি চোলাই পাতনযন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা আজকের দিনের পাতন ল্যাবরেটরিগুলোতে ব্যবহৃত হয়। এই যন্ত্র দ্রব্যকে শীতল করে এবং পাতন প্রক্রিয়ার সাহায্যে প্রয়োজনীয় তরল উপাদান সংগ্রহ করে।
রসায়নের অন্যান্য পরিভাষার মতো Alembic (অ্যালেমবিক) শব্দটি এসেছে আরবী 'আল-আমবিক' শব্দ থেকে যার অর্থ: 'পাতনযন্ত্রের মাথা'। চোলাই পাতনযন্ত্রে একটি টিউব দ্বারা দুটো গলাওয়ালা জগ সংযুক্ত থাকে। এই চোলাই পাতনযন্ত্রে জাবির ফুটন্ত মদ ও লবণ থেকে দাহ্য ভাপ বা বাষ্প বেরিয়ে আসতে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তার রসায়ন গ্রন্থে বলেন, "এবং বোতলের মুখে যে আগুন দগ্ধ করে, তার উৎস ফুটন্ত মদ ও লবণ এবং উত্তম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমজাতীয় জিনিস, যেগুলো তেমন একটা ব্যবহার উপযোগী মনে করা হয় না, কিন্তু এই শাস্ত্রে সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে।"
অ্যালকোহলের এই দাহ্য বৈশিষ্ট্য জাবিরের সময় থেকেই ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। ১৪শ শতাব্দির সামরিক প্রবন্ধগুলোতে দেখা যায় যে, সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র বা বিস্ফোরক উৎপাদনে বহুদিনকার আঙ্গুরের পাতিত মদ গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। এসব পাণ্ডুলিপিতে এই সতর্কবার্তা উল্লেখ করা হয় যে, এ ধরনের পাতিত দ্রব্যগুলো সহজেই জ্বলে ওঠতে পারে, তাই এসব দ্রব্য বালিতে পুতে রাখা যায়, এমন পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
আল-কিন্দী তার সুগন্ধি পাতনের জন্য সুবিখ্যাত ছিলেন। এসব বিবরণ তিনি তার প্রসিদ্ধ "কিতাবুল কিমিয়া আল-আতরী ওয়াল তাসয়ি' দাত" (সুগন্ধি ও পাতনের রসায়ন) গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ওই গ্রন্থে তিনি পাতন প্রক্রিয়াকে এভাবে বর্ণনা করেন, “এবং যে কেউ পানি ফোটানোর যন্ত্রের সাহায্যে মদ পাতিত করতে পারে, যেখানে তা গোলাপজলের মতো বর্ণ ধারণ করে। একইভাবে ভিনেগারেরও পাতন সম্ভব, যেখানে তা গোলাপজলের মতো বর্ণ ধারণ করে বেরিয়ে আসে।"
এসিডের ব্যাপারে এই ডায়াগ্রাম সতর্ক করছে। প্রাচীন দুনিয়া ভিনেগারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো এসিড সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো না। কিন্তু জাবির ইবনে হাইয়ানের আবিষ্কৃত এসিডগুলো রাসায়নিক পরীক্ষণের দরজা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করে।
মসৃণ রূপাকে পাতিত মদের সাথে চূর্ণ করে কীভাবে রুপার সাহায্যে লেখার উপকরণ প্রস্তুত করতে হয়, তা নিয়ে ৯০০ বছর পূর্বে তিউনিসিয়ার ইবনে বাদিস বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, "মসৃণ রুপা নিয়ে পাতিত মদসহ তা তিনদিন চূর্ণ করুন, এরপর তা রৌদ্রে উত্তপ্ত করুন এবং আবার তা রৌদ্রে উত্তপ্ত করতে থাকুন যতক্ষণ না তা নরম মাটির মতো হচ্ছে, অতঃপর পানি দিয়ে তা আলতোভাবে ধুয়ে ফেলুন।"
যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি, অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পান করা মুসলিমদের জন্য হারাম, কিন্তু তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর উপকারী ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলো জনস্বার্থে ব্যবহার করা। অ্যালকোহলের এরূপ ব্যবহার ঔষধ শিল্প থেকে প্রসাধনী শিল্পে বিপুল পরিমাণ পণ্যের আবির্ভাব ঘটায়। এক হাজার বছর পূর্বে তাদের অধিকাংশ কাজেরই ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল এবং অন্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে আহরিত জ্ঞান ও তাদের স্বকীয় গবেষণা বহু নতুন পণ্য ও দ্রব্যের উদ্ভাবন সম্ভব করেছিল, যেমন: কালি, বার্নিশ, ঝালাই করার রঙ, সিমেন্ট এবং নকল মুক্তা।
গুরুত্বপূর্ণ যেসব পরীক্ষণ সংশ্লেষী রসায়নের সূচনা চিহ্নিত করেছিল, তাদের মধ্যে 'ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্য' হিসেবে মারকিউরিক ক্লোরাইড আহরণসংক্রান্ত আর-রাযীর পরীক্ষা অন্যতম, যা তিনি তার লবণ ও ফিটকিরির শ্রেণিবিন্যাস ও তৎসংশ্লিষ্ট গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেন। এরসাথে বর্তমানে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত মারকিউরিক ক্লোরাইডগুলোর আবিষ্কার আরও বহু সংশ্লেষী পদার্থের আবিষ্কারের পথ সুগম করে। অন্যান্য দ্রব্যকে ক্লোরিনায়িত করার ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্যের আবিষ্কার মাটি খুঁড়ে অনেক খনিজ এসিডের সন্ধান লাভে সহায়তা করে। রক্তক্ষরণ রোধকারী সঙ্কোচক, উদ্দীপক, দাহক ও জীবানুনাশক ঔষধ হিসেবে বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে। বাণিজ্যিক রসায়ন ও ভারী রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষেত্রে মধ্যযুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হলো 'ফিটকিরি-ঘটিত' শিলা থেকে ফিটকিরির পৃথকীকরণ ও উৎপাদন। কাগজ প্রস্তুত, রঞ্জক ও সালফিউরিক এসিডের উৎপাদনে ফিটকিরি ব্যবহৃত হতো। সালফিউরিক ও হাইড্রোক্লোরিকের মতো এসিডগুলো মূলত জাবির ইবনে হাইয়ান আবিষ্কার করেছিলেন।
📄 জ্যামিতি
জটিল, অভিজাত ও রুচিসম্পন্ন ডিজাইন দ্বারা নিজেদের ভবন সজ্জিতকরণে মুসলিমরা বেশ সুপরিচিত ছিল। এ ব্যাপারে আরও তথ্য আপনি এই বিভাগের 'শিল্প ও সর্পিল বস্তুর কারুকার্যময় নকশা' অধ্যায়ে পাবেন। জ্যামিতি কিংবা পরিমাপ, বিষয়-সম্পত্তি এবং বিন্দু, রেখা, কোণ, দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক নকশার মধ্যস্থ সর্ম্পকে ব্যাপক অগ্রগতি ব্যতীত এসব চমৎকার ডিজাইনের আবির্ভাব কখনো সম্ভবপর ছিল না।
পণ্ডিতগণ গ্রিকদের পরম্পরাগত জ্যামিতির জ্ঞান লাভ করেন, এরপর সেগুলোর বিকাশ ও সম্প্রসারণ ঘটান। ইউক্লিড তার Elements গ্রন্থে জ্যামিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। অধিকাংশ আগ্রহী গণিতবিদদের জ্যামিতিতে হাতেখড়ি ইউক্লিডের বিস্ময়কর ও কালোত্তীর্ণ এই গ্রন্থের মাধ্যমে হতো।
জ্যামিতিতে মুসলিমগণ যে অনুসন্ধিৎস্যু পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটার ভিত্তি তিনটি হেলেনীয় স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমটি ইউক্লিডের Elements গ্রন্থটি, যা বাগদাদের ৮ম শতাব্দির বাইতুল হিকমায় অনুদিত হয়। দ্বিতীয়টি আর্কিমিডিসের On the Sphere and Cylinder (গোলক ও বেলন) এবং The Heptagon in the Circle (বৃত্তস্থ সপ্তভুজ) শীর্ষক দুটি গ্রন্থ। দ্বিতীয় গ্রন্থটি এখন আর মূল গ্রিক ভাষায় পাওয়া যায় না এবং এটা আমাদের নিকট সাবিত ইবনে কুরার আরবী অনুবাদের মাধ্যমে পৌঁছেছে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ভিত্তি পেরজার অ্যাপোলোনিয়াসের কঠিন গ্রন্থ, যা The Conics (চোঙ্গাকৃতি বস্তু) নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লেখা এই গ্রন্থ ৮-টি খণ্ডে বিভক্ত, যার মধ্যে মূল গ্রিক ভাষায় টিকে আছে ৪-টি; অন্যদিকে এটার ৭-টি খণ্ড আরবী অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের নিকট এসেছে।
গ্রিক ও ইসলামী বিশ্ব, উভয়ের অধিকাংশ জ্যামিতিক গঠন (conic sections) চোঙ্গাকৃতি তত্ত্বের অধীনে একীভূত, যা বিভিন্ন জ্যামিতিক গঠন, কেন্দ্রীভূত আলোর জন্য আয়নার ডিজাইন এবং সূর্যঘড়ি তত্ত্বে ব্যবহৃত হতো। একটি নিরেট দ্বৈত-কোণক গঠিত হয় সোজা রেখার সম্প্রসারণের মাধ্যমে, যা ভূমি বা তল নামে পরিচিত বৃত্তের পরিধি থেকে বেরিয়ে আসে এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দু দিয়ে অতিক্রম করে, যে বিন্দুটি চূড়া বা শীর্ষ নামে পরিচিত। একটি সমতল ছেদক দ্বারা দ্বৈত-কোণকের কর্তনের মাধ্যমে কৌণিক ছেদকের উৎপত্তি ঘটে। অবশিষ্ট সমতল ছেদক উৎপাদকের সাপেক্ষে সমতল অংশের কোণ দ্বারা নির্ধারিত হয়। অ্যাপোলোনিয়াস সফলভাবে যুক্তি দেখান যে, বৃত্ত ব্যতীত কেবলমাত্র তিনটি ছেদক উৎপন্ন করা যায়: উপবৃত্ত (ellipse), অধিবৃত্ত (parabola) ও পরাবৃত্ত (hyperbola)।
"জ্যামিতি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিকে এখানে প্রবেশ করতে দিও না।" - প্লেটোর একাডেমির উপর খোদাই করে লেখা
কৌণিক ছেদকের তত্ত্ব ব্যবহার করে আবু সাহল আল-কুহী সুষম সপ্তভুজ (regular heptagon) নামে পরিচিত সাতটি সমান পার্শ্বযুক্ত বহুভুজ গঠনের এক চমকপ্রদ প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। আবু সাহল আল-কুহী সহজাত প্রতিভাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের একজন, যাদেরকে বাগদাদের প্রভাবশালী ভূইয়া পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকেরা গোটা মুসলিম জাহানের পূর্বাংশ থেকে একত্র করে। কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণের পাহাড়ী অঞ্চলে বেড়ে উঠা এবং বাগদাদের বাজারে কাচের বোতল দিয়ে ভেলকিবাজি দেখানো আবু সাহল আল-কুহী এমন পৃষ্ঠপোষক পেয়ে তার মনোযোগ বিজ্ঞান গবেষণায় নিবদ্ধ করেন। আর্কিমিডিসের কাজের উপর তিনি আগ্রহ প্রদর্শন করেন এবং On the Sphere and Cylinder গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ব্যাখ্যা লেখেন। কৌণিক ছেদ এবং এদের সাহায্যে জটিল জ্যামিতিক সমস্যা সমাধানে তার পূর্ণ মনোযোগ ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, কৌণিক ছেদকের সাহায্যে কীভাবে একটি গোলক তৈরি করতে হয়, তিনি তা ব্যাখ্যা করেন। এই গোলকের খণ্ডিত একটি অংশ একক গোলকের খণ্ডিতাংশের সদৃশ হবে এবং এই গোলকের পৃষ্ঠতল দ্বিতীয় গোলকের খণ্ডিতাংশের সমান হবে। কৌণিক ছেদ অঙ্কন করতে সক্ষম 'পূর্ণ কম্পাস' নামে নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন করলেও আবু সাহল আল-কুহীর মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল সুষম সপ্তভুজ অংকনের বিস্তারিত নির্দেশিকা তৈরির মতো উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে। বৃত্তস্থ সুষম সপ্তভুজের একটি প্রমাণ আর্কিমিডিস প্রদান করেন, যা এটা নির্দেশ করছে যে, সুষম সপ্তভুজ অঙ্কন করা সম্ভব। কিন্তু কীভাবে এটা আঁকতে হবে, তার পর্যাপ্ত ধাপ তিনি প্রদান করেননি। গণিতের তাত্ত্বিক জগতে এটা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। কখনো কখনো বিশেষ গাণিতিক সমস্যা সমাধান বা বিশেষ জ্যামিতিক গঠন অংকনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নির্ণয় বেশ দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে গণিতবিদগণ এটা প্রমাণে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন যে, এমন প্রক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে এবং ওই বিশেষ গঠন অংকনের দায়িত্ব তারা অন্যদের উপর ছেড়ে দেয়।
আর্কিমিডিস যদিও সুষম সপ্তভুজের প্রমাণ পেশ করেছেন, তথাপি এটার সত্যিকার অঙ্কন প্রক্রিয়া শতাব্দি ধরে গ্রিক ও মুসলিম গণিতবিদদের পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য করেছে এবং এই পলায়ন এমন মাত্রায় ছিল যে, আবু আল-জুদ এই মন্তব্য করতে বাধ্য হন যে, "সম্ভবত এটার অঙ্কন প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং যে বিষয়ে এটা জ্যামিতিক প্রতিজ্ঞা হিসেবে কাজ করে, তার চেয়ে এটার প্রমাণ আরও জটিল।" আবু সাহল আল-কুহী এই জন্তুকে পোষ মানাতে সক্ষম হন এবং এই সমস্যাকে মাত্র তিনটি ধাপে সীমাবদ্ধ করতে সফল হন। এই তিন ধাপকে যদি উল্টে দেয়া যায়, তবে তা আমাদের কৌণিক ছেদ অংকনের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি সপ্তভুজের এক বাহুর দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক কৌণিক ছেদ অঙ্কন করতে বলেন। এরপর প্রদত্ত অনুপাত মোতাবেক একটি বিভক্ত রেখা টানতে হবে এবং সে বিভক্ত রেখা থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ত্রিভুজ গঠন করতে হবে। সবশেষে, উদ্ভূত ত্রিভুজ থেকে সপ্তভুজ অঙ্কন করতে হবে।
আবু সাহল প্রদত্ত কোনো কোণকে তিনটি সমান ভাগে বিভক্ত করার পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্যেও বিশেষভাবে পরিচিত। আবু সাহলের চেয়ে বয়সে তরুণ আব্দুল জালিল আস-সিজযী নামের সমসাময়িক এক পণ্ডিত এটাকে 'আবু সাহল আল-কুহীর উপপাদ্য' নামে আখ্যায়িত করেন। আব্দুল জালিল আস-সিজযী এই উপপাদ্যকে ব্যবহার করে সমান নয়টি বাহুর বহুভুজ (nonagon) অঙ্কন করেন।
সূর্যঘড়ির পৃষ্ঠভাগে কৌণিক ছেদ খোদাই করে সংযুক্ত করার জন্য কৌণিক ছেদ সম্পর্কে যন্ত্র নির্মাতাদের জ্ঞান থাকাটা অত্যাবশক ছিল। গ্রিকরা জানতো "দিনের বেলায় সূর্য যখন বৃত্তাকর পথ ধরে অগ্রসর হয়, তখন মাটিতে লম্বভাবে স্থাপন করা দণ্ডের শীর্ষ দিয়ে আলোকরশ্মি অতিক্রমের সময় তা দ্বৈত কোণক (double cone) উৎপন্ন করে। যেহেতু অনুভূমিক সমতল অংশ এই কোণকের উভয় অংশকে খণ্ডিত করে, সেহেতু অনুভূমিক সমতল অংশ দ্বারা কর্তিত অংশ অবশ্যই পরাবৃত্ত (hyperbola) হবে।" এটা সাবিত ইবনে কুরার নাতি ইব্রাহীম ইবনে সিনানকে এ বিষয়ে গবেষণা করতে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। যদিও যকৃত বা লিভারের টিউমারের কারণে তার আয়ুষ্কাল খুব কম ছিল এবং ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন, তথাপি "তার রয়ে যাওয়া কাজ এটার স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, গণিতের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি ছিলেন", যেমনটি সমসাময়িক লেখক জে. এল. বারগ্রেন মন্তব্য করেছেন।
বারগ্রেন এরপর ইব্রাহীম ইবনে সিনানের অবদানের সারাংশ টানেন এভাবে, "রেনেসাঁর পূর্ব পর্যন্ত আমাদের নিকট পৌঁছানো গবেষণার মাঝে পরাবৃত্তের খণ্ডিত অংশের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে তার আলোচনা সবচেয়ে সরল ... সূর্যঘড়ির কাজের বেলায় তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ ও একক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য সব ধরনের সময় পরিমাপক ঘড়ির ডিজাইন তৈরি নিয়ে আলোচনা করেন, যা ওইসব সমস্যা সমাধানে এক নতুন ও সফল সংযোজন এবং এটা পূর্ববর্তীদের প্রায়শই ধরাশায়ী করতো।”
প্রকৃতিতে পরিমাপ সর্বদাই গাণিতিক নকশা অনুসরণ করে, যা মুসলিম পণ্ডিতদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছিল। গোল্ডেন রেশিও-তে ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্যের আপেক্ষিক আকার এমনভাবে অনুপাত গঠন করে যে, ক্ষুদ্রতর আকৃতির সাপেক্ষে বৃহত্তর আকৃতির অনুপাতটি বৃহত্তর সংখ্যার সাপেক্ষে ক্ষুদ্রতর ও বৃহত্তর দুটি আকৃতির যোগফলের সমান হয়। যেমনটি আমরা শামুকের খোলসের প্রকোষ্ঠে এবং উত্তর আমেরিকাতে জন্ম নেয়া বিশেষ প্রজাতির ফুল কনফ্লাওয়ারের কাঁটাযুক্ত বিন্যাসে দেখতে পাই।
মসজিদ, প্রাসাদ এবং লাইব্রেরির মতো সর্বসাধারণের ব্যবহার্য ভবন সজ্জিতকরণে ব্যবহারিক জ্যামিতিক ডিজাইনের আশ্রয় নেয়া হতো, আর এক্ষেত্রে মুসলিম জ্যামিতিবিদগণ দক্ষ কারিগরদের শিল্প-কৌশলে সংগতি বিধান এবং তাদের শিল্পের সীমা নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে আগ্রহী ছিলেন। ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা আবু নসর আল-ফারাবী, যিনি সঙ্গীত, দর্শন এবং এরিস্টটলের উপর ব্যাখ্যামূলক কাজের জন্য সমধিক পরিচিত, তিনিও সীমিত সামর্থ্যের বিভিন্ন যন্ত্র দ্বারা নানা ধরনের জ্যামিতিক গঠন তৈরির বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন। অদ্ভুতভাবে তার প্রবন্ধের শিরোনাম "আসরারুত তাবিয়াত ফী দাকায়িকিল আশকালিল হানদাসিয়াহ" (জ্যামিতিক গঠনের বিস্তারিত বিবরণ ও তার প্রাকৃতিক গঠনের রহস্য)। আল-ফারাবীর মৃত্যু হলে তার এই অবদানকে পরবর্তীতে আবুল ওয়াফা নিজের "কিতাব ফিমা ইয়াহতাজু সানাউ ফী আমালিল হানদাসাতী" (কারিগরদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্যামিতিক গঠন) শীর্ষক গ্রন্থে একত্র করেন। এই গ্রন্থে তিনি প্রতিটি গঠনের বিস্তারিত বিবরণ ও সেটার পিছনে প্রয়োজনীয় যুক্তি প্রদান করেন।
আবুল ওয়াফা যেসব সমস্যার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেন, তার মাঝে রয়েছে: কোনো একটি কর্তিত রেখার শেষ বিন্দুতে লম্ব অঙ্কন করা; কোনো একটি রেখাকে যেকোন সংখ্যায় সমানভাগে বিভক্ত করা, বৃত্তে বর্গক্ষেত্র অঙ্কন করা এবং বিভিন্ন বাহু (৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১০) দ্বারা সমান বহুভুজ গঠন করা। অবাক করা বিষয় হলো, এসব গঠন নির্দিষ্ট একপ্রান্ত উন্মুক্ত ও সরল প্রান্তবিশিষ্ট 'জংধরা কম্পাস' দিয়েই আঁকা হয়েছে।
মুসলিম কারিগর, স্থাপত্যবিদ ও ক্যালিগ্রাফি অঙ্কনকারীদের জন্য জ্যামিতির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রকৃতি ও গাণিতিক প্রকাশভঙ্গির মাঝে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, এ ব্যাপারে তাদের মাঝে গভীর সচেতনতা বিদ্যমান ছিল এবং প্রতিনিয়ত তারা এসব সুনিবিড় সম্পর্ক দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন।
এমন ধরনের পরিমাপের মাঝে গোল্ডেন রেশিও অন্তর্ভুক্ত। চোখে প্রশান্তি এনে দেয়া পরিমাপের এই অনুপাত প্রকৃতিতে বহুল পরিমাণে দৃশ্যমান, যেমন: শামুকের খোলস ও গাছের পাতা। সাধারণ মানুষের ভাষায়, গোল্ডেন রেশিও দ্বারা সজ্জিত কোনো বস্তুর প্রস্থ মোটামুটিভাবে তার উচ্চতার দুই-তৃতীয়াংশ বা আনুমানিক অনুপাত ১.৬১৮। এটাকে গোল্ডেন রেশিও এজন্য বলা হয় যে, যদি কোনো রেখা বিভক্ত করা হয়, তবে বৃহত্তর অংশের তুলনায় ক্ষুদ্রতর অংশের অনুপাত সমগ্র অংশের সাপেক্ষে বৃহত্তর অংশের অনুপাতের সমান হবে। আনুমানিকভাবে এই অনুপাত দাঁড়ায় ৮:১৩ এবং এই অনুপাত শিল্প ও স্থাপত্যের বিভিন্ন কর্মে দৃশ্যমান।
জ্যামিতিক এসব ঘটনা দ্বারা বিমোহিত থাকার পাশাপাশি মুসলিম শিল্পীগণ যেকোন 'বিশৃঙ্খল' ব্যবস্থার কেন্দ্র অনুসন্ধান করতেন। আর তাই অনুপাতের সাপেক্ষে কেন্দ্রের ধারণাটিও তাদের মনোযোগের বস্তুতে পরিণত হয়।
১০ম শতাব্দির ইখওয়ানুস সাফা বা পবিত্রতার ভ্রাতৃসংঘ নামে পণ্ডিতদের একটি সংগঠন অনুপাত সম্পর্কে তাদের ধারণা তাদের রচিত "রাসাইল" প্রবন্ধমালায় বিবৃত করে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দির স্থপতি ও লেখক ভিটরুভিয়াসের অনুসিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন। ভিটরুভিয়াস মানবদেহকে আনুপাতিক ব্যবস্থা হিসেবে পরিমাপ করেন। কিন্তু ইখওয়ানুস সাফা ভিটরুভিয়াসের এই পরিমাপে ত্রুটি নির্দেশ করে, যেহেতু এই পরিমাপ নাভির পরিবর্তে কুঁচকি বা ত্রিকাস্থিকে কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভিটরুভিয়াসের এই অনুসন্ধান মূলত গ্রিক নিয়মনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এই নিয়মনীতি আবার প্রাচীন মিসরীয় অনুপাত নীতির উপর ভিত্তিশীল, যা দেবতা ওসিরিসের মেরুদণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। 'ঐশ্বরিক মেরুদণ্ড' অথবা জেট পিলার (উলবঃ ঢ়রষষধৎ) বস্তুত ওসিরিসের পূর্বরাজবংশীয় চিত্রায়ন, যা স্থিতি, সহিষ্ণুতা ও কল্যাণ নির্দেশ করে।
ঘাম ঝরানো গবেষণার পর ইখওয়ানুস সাফা ভিন্ন এক উপসংহারে পৌঁছায়। তারা এটা প্রতিষ্ঠিত করে যে, মানবদেহকে যদি প্রসারিত ও বিস্তৃত করা হয়, তবে হাতের আঙ্গুলের ডগা এবং পায়ের আঙ্গুল একটি কল্পিত বৃত্তের পরিধি স্পর্শ করে। মানবদেহ যদি সাত বছরের কম শিশুর হয়, তবে এই কল্পিত বৃত্তের কেন্দ্র কুঁচকি নয় বরং নাভি। এই নিখুঁত অনুপাত - নাভি যার কেন্দ্র, তা সাত বছর থেকে অসামঞ্জস্যশীল হতে শুরু করে [৭ বছর পর্যন্তকে সময়কে মানুষদের নিষ্পাপ থাকার কাল বিবেচনা করা হয়]। জন্মের সময় দেহের মধ্যবিন্দু থাকে নাভি। ব্যক্তির বৃদ্ধির সাথে সাথে মধ্যবিন্দু হারাতে থাকে, যতক্ষণ না তা কুঁচকি বা ত্রিকাস্থিতে পৌঁছাচ্ছে।
ধর্মীয় চিত্রগুলোতে সমানুপাতিক অনুপাত একটি আদর্শ নকশা বা অবয়ব প্রদান করে। প্রস্থ আট একক, উচ্চতা দশ একক এবং মধ্যবিন্দু হচ্ছে: নাভি। দেহের কাঠামো আটটি মাথার সমান, পা দেহের অংশ, মুখমণ্ডল দেহের অংশ, কপাল মুখমণ্ডলের এক-তৃতীয়াংশ এবং মুখমণ্ডল চারটি নাক বা চারটি কানের সমান।
নাভি বৃত্তের কেন্দ্র হিসেবে পৃথিবী ও জৈব উপাদানের অবস্থা নির্দেশ করে এবং এটা এক ধরনের ঐশ্বরিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। সৃষ্টিতত্ত্ব, সঙ্গীততত্ত্ব, ক্যালিগ্রাফি এবং ১০ম শতাব্দি থেকে সব ধরনের শিল্পে এই ঐশ্বরিক অনুপাত প্রতিফলিত হয়ে আসছে। এগুলোকে ভারসাম্য অনুসন্ধানের চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের জন্য তা ছিল: আল্লাহর নৈকট্য।
উদাহরণস্বরূপ, আট সংখ্যার স্বাভাবিক সামঞ্জস্যকে মুসলিম পণ্ডিতগণ মৌলিক সংখ্যার দৃষ্টিতে দেখতেন, যা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সঙ্গীতের স্বরগ্রাম পরিমাপ, কবিতা, ক্যালিগ্রাফি এবং বিভিন্ন শৈল্পিক বিষয়ে প্রয়োগ করতে।
উমর আল-খাইয়্যাম প্রবর্তিত বীজগাণিতিক জ্যামিতির চমকপ্রদ পুরো ক্ষেত্র এবং লেন্স নিয়ে আত-তুসী প্রদত্ত জ্যামিতিক তত্ত্ব - জ্যামিতিতে নতুন দুটো শাখার সংযোজন ঘটায়। এ ব্যাপারে আরও জানতে এই বিভাগের গণিত অধ্যায় এবং গৃহ বিভাগের দৃষ্টিশক্তি ও ক্যামেরা অধ্যায় ঘুরে আসতে পারেন।
📄 শিল্প এবং সর্পিল বস্তুর কারুকার্য [আরাবেস্ক]
শৈল্পিক কিছু ডিজাইনে নজর দিতে পারেন, চোখের পলক ফেলার সাথে সাথে আপনার চোখে ধরা পড়বে ভিন্ন ভিন্ন আকার ও অবয়ব। এ ধরনের জ্যামিতিক শিল্প শুদ্ধ গণিত ও দূরত্ব শিল্পের এক সংমিশ্রণ - যেন আকার ও পুনরাবৃত্তিময় বিন্যাসের পারস্পরিক ক্রিয়া চলছে। মানুষের অবয়ব না থাকলেও জটিল এসব ডিজাইন বয়ে চলা রেখার সমন্বয়ে গঠিত। তাকানোর সাথে সাথে এসব ডিজাইন বদলে যাচ্ছে মনে হবে, এ ধরনের কারিশমা মূলত গভীর চিন্তা ও আধ্যাত্মিক মনসংযোগকে দারুণভাবে উৎসাহিত করে; এসব কারণে এগুলো মসজিদে বেশ ভালোভাবেই মানানসই ছিল।
চিত্রাঙ্কনে নবী মুহাম্মদ (সঃ) মানুষ ও জীবজন্তুর অবয়ব ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। কেননা তিনি চাননি ধর্মান্তরিত হওয়ার সময় মুসলিমদের মনোযোগ আল্লাহ হতে সরে গিয়ে মূর্তি, প্রতিকৃতি কিংবা বস্তুগত দুনিয়া উপাসনার মতো ইসলাম পূর্ব কালচারের দিকে ঝুঁকে পড়ুক।
এর ফলশ্রুতিতে জ্যামিতি মুসলিম বিশ্বের প্রধান শিল্পে পরিণত হয়। শিল্পীগণ নিজেদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে উজাড় করে সম্পূর্ণ নতুন এক শিল্পের সৌধ নির্মাণ করে, যা সর্পিল কারুকার্যময় নকশা বা অ্যারাবেস্ক (Arabesque) নামে পরিচিত। মূলত এটা জ্যামিতিক শিল্পেরই একটি নয়া ধারার বিকাশ। সর্পিল কারুকার্যময় নকশা এক ধরনের বিন্যাস, যেখানে অনেকগুলো একক (বা ইউনিট) সংযুক্ত হয়ে একত্রে মিশে যায়। সবগুলো একক অন্যদের থেকে উদ্ভূত হয়ে সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি স্বাধীন একক নিজে থেকেই সম্পূর্ণ এবং স্বতন্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হলেও সবগুলো একক সংযুক্ত হয়ে সামগ্রিক কাঠামোর একটি অংশ গঠন করে। দ্বিমাত্রিক এই ডিজাইনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাদ, দেয়াল, কার্পেট, আসবাবপত্র ও বস্ত্রাদির উপরিতল সজ্জিত করতে ব্যবহৃত হতো।
তোপকাপি স্ক্রল হলো জটিল এই শিল্পের সবচেয়ে চমৎকার একটি নিদর্শন, যা অতি সম্প্রতি ইস্তাম্বুলে আবিষ্কৃত হয়েছে। তোপকাপি স্ক্রলটিতে দেয়ালের উপরিতল ও খিলানের জন্য ১১৪-টি স্বতন্ত্র জ্যামিতিক নকশা রয়েছে, যা ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগ বা ১৬শ শতাব্দিতে পারস্যে কর্মরত এক শ্রেষ্ঠ নির্মাতার অনন্য কীর্তি। এ ধরনের কর্মের এটাই সর্বাধিক প্রাচীন নিদর্শন, যা অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এটার আবিষ্কারের পূর্বে ইসলামী স্থাপত্য স্কুলের মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন ছিল ১৬শ শতাব্দিতে উজবেকিস্তানের বুখারায় পাওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু স্কুল।
পুষ্পবৃত্ত, পাতা ব্যবহার করে সর্পিল কারুকার্যময় নকশা কখনো লতা বা ফুলের সজ্জা, আবার কখনো লতাগুল্ম ও জ্যামিতিক বিন্যাসের সমন্বয়। এই ডিজাইনগুলো সমানভাবে ইউরোপীয়দের মুগ্ধ করে। রেনেসাঁ যুগ থেকে শুরু করে বারোক, রোকোকো, আধুনিক শিল্প (বিশেষ করে গ্রুটেস্ক) ও স্ট্র্যাপওয়ার্ক সবগুলো শিল্পে সর্পিল কারুকার্যময় নকশার ছাপ দারুণভাবে লক্ষণীয়।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সর্পিল কারুকার্যময় অ্যারাবেস্ক নকশা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন এবং জটিল এসব বিন্যাসের পিছনে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির পরিহিত বিখ্যাত গিঁটযুক্ত ডিজাইনের আলখেল্লা, যেটা তার প্রতিকৃতিতে দৃশ্যমান, সেটার পার্শ্বদেশ ও পর্দাতে সর্পিল কারুকার্যময় অ্যারাবেস্ক নকশা দৃশ্যমান। রাফায়েলের মতো ড্যুরারও জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করেছিলেন। ১৭শ শতাব্দীর ফরাসি শিল্পী জিন বেরেনের গ্রুটেস্ক ডিজাইনে সর্পিল কারুকার্যময় নকশার উপস্থিতি দৃশ্যমান এবং ১৬শ শতাব্দীর ইতালির শিল্পীরা এটাকে আরাবেসসি (arabeschi) হিসেবে আখ্যায়িত করে।
"গাণিতিক পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মুসলিম কারিগরগণ অসীমের ধারণা নিয়ে কী ধরনের অনুসন্ধান চালিয়েছেন, জ্যামিতিক নকশার এমন আশ্চর্যজনক সজ্জা আমাদের সামনে সেটাই তুলে ধরে।"
An Islamic History of Europe শীর্ষক বিবিসি'র প্রামাণ্যচিত্রে গ্রানাডার আল-হামরা সম্পর্কে আলোকপাত করার সময় রাগেহ উমর এ মন্তব্য করেন।
বিংশ শতাব্দীর শিল্পীদের মাঝে জ্যামিতি শিল্প দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তাদের মাঝে ডাচম্যান এম. সি. এশসার অন্যতম। অনন্য ও চমৎকার কিছু শৈল্পিক সৃষ্টি উপহার দেয়ার পাশাপাশি তিনি বিস্তৃত পরিসরে গাণিতিক ধারণার প্রয়োগ ঘটান। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আল-হামরা প্রাসাদে ব্যবহৃত টালি নকশা হচ্ছে তার এসব কর্মের উৎস, যেটা তিনি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে পরিদর্শন করেন। বেশ কিছুদিন ব্যয় করে তিনি এসব নকশা অঙ্কন করেন এবং এ ব্যাপারে তার নিজের মন্তব্য এরূপ: "আমার অর্জিত জিনিসের মাঝে এটা ছিল সর্বাধিক প্রাচুর্যময়।"
সর্পিল কারুকার্যময় নকশাই যে কেবল ইউরোপে প্রবেশ করেছিল, ব্যাপারটি তেমন নয়, বরং মুসলিম বিশ্ব থেকে তৈলচিত্র আমদানির হাত ধরে ১৪শ শতাব্দিতে ইউরোপীয় শিল্পী মহলে এক গুরুত্বপূর্ণ পট পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। পূর্বে তারা কাঠের বোর্ডে ডিম, পানি, মধু ও রঙের সংমিশ্রণে তৈরি রঙিন প্রলেপ ব্যবহার করতো। তিসির বীজের দামি তৈলচিত্র ইউরোপীয় চিত্রকর্মে নাটকীয় প্রভাব ফেলে, যেহেতু এটা ফ্লেমিশ (Flemish) ও ভেনিসের চিত্রকর্মের রঙের সম্পৃক্তি বাড়িয়ে দেয়।
📄 লিপিকার
কী মিসরীয় হাইরোগ্লিফিক কী চীনা বা জাপানি লিপি- শোভাবর্ধক লেখনী হিসেবে এ সবগুলো লিপির রয়েছে বহু ধরন, কিন্তু আরবী ক্যালিগ্রাফি এসব লেখনী থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে। ৭ম শতাব্দিতে ইসলামের বিকাশের পূর্বে ক্যালিগ্রাফির অস্তিত্ব আরবে থাকলেও মুসলিমদের হাতেই এটার উল্লেখ্যযোগ্য সমৃদ্ধি ঘটে। তারা এটাকে শিল্পে ব্যবহার করে, কখনো জ্যামিতিক কখনো প্রাকৃতিক অবয়বের সমন্বয়ে, আবার কখনো এটা রূপ নেয় ইবাদতে, যখন তা ব্যবহৃত হতো কুরআনের আয়াত চিত্রায়নে। যেহেতু কুরআন তার পাঠক ও লিপিকারদের জন্য ঐশ্বরিক পুরস্কারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত কলম-আশ্রিত ক্যালিগ্রাফি শিল্প ছিল আল্লাহকে স্মরণের এক শিল্প।
শৈল্পিক ভঙ্গিতে লেখার এই উদ্দীপনার সাথে আরেকটি চূড়ান্ত উপাদান মিলিত হয়ে ক্যালিগ্রাফির ব্যাপক জনপ্রিয়তায় গতি সঞ্চার করে। আর তা হলো: (আল্লাহর বা কুরআনের) শব্দ, নাম ও বাক্যের সাথে রুহানি শক্তিকে সম্পৃক্ত করা, যেগুলোকে শয়তান থেকে সুরক্ষা লাভের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
আরবী ক্যালিগ্রাফির ভাষাটি প্রাচীন সেমেটিক ভাষার পরিবারভুক্ত এবং এটা বেশ কিছু লিপির আকারে আবির্ভূত হয়েছে, যার মধ্যে কুফি ও নাসখ বিশেষভাবে পরিচিত।
ইরাকের কুফা শহর হতে কুফি লিপির উদ্ভব। কুফা শহরের কুফি ধারার লিপিকারগণ কুরআন লেখার এই স্টাইল ব্যবহার করতেন। এই লিপিতে বর্ণগুলো কৌণিক প্রকৃতির হয়ে থাকে।
নাসখ লিপি কুফি লিপির চেয়ে প্রাচীনতর হলেও আধুনিক আরবী লেখনী ও প্রকাশনার সাথে এটার অনেকটা মিল পরিলক্ষিত হয়। এটা সংযুক্ত, টানা টানা লিপি ও বৃত্তাকার প্রকৃতির এবং এটার বেশ কিছু স্টাইল রয়েছে। ১০ম শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি শিল্পী আবু আলী ইবনে মুকলা জ্যামিতিক নিয়মের ভিত্তিতে লিপির একটা শ্রেণিবিন্যাস উদ্ভাবন করেন। এটা বর্ণ পরিমাপের একটি একক প্রতিষ্ঠা করে, যার সাহায্যে বিভিন্ন বর্ণের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। তিনি ছয়টি কৌণিক লিপির হিসেব করেন, যেগুলো আল-কালাম আস-সিত্তা হিসেবে পরিচিতি পায়। অটোমানদের দ্বারা বিকশিত নাসখ ক্যালিগ্রাফি কুফি স্টাইলের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠে।
কাহিনী: হাই ইবনে ইয়াকযান-এর রহস্য
১২শ শতাব্দির মুসলিম স্পেনে ইবনে তুফায়েল নামে পরিচিত সহজাত প্রতিভাসম্পন্ন এক দার্শনিক, গণিতবিদ, কবি ও চিকিৎসকের জন্ম হয়। আবু বকর ইবনে আব্দুল মালিক ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে তুফায়েল আল-কায়সী তার পূর্ণ নাম, পশ্চিমে যিনি আবুবাকের নামে পরিচিত। আন্দালুসের আলমোহাদ সাম্রাজ্যের শাসক আবু ইয়াকুব ইউসুফের উপদেষ্টা ও রাজসভার চিকিৎসকের মতো রাজকীয় পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন। হাই ইবনে ইয়াকযান উপন্যাসের জন্য বর্তমানে তিনি সমধিক পরিচিত, যার মূল পাণ্ডুলিপি এখন অক্সফোর্ডের বডলিয়ান লাইব্রেরিতে রয়েছে। এই উপন্যাস একই নামের পূববর্তী আরেকটি উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত, যা এক শতাব্দি পূর্বের তথা ১১শ শতাব্দির চিকিৎসক-দার্শনিক ইবনে সীনা রচনা করেন এবং তিনিও তার উপন্যাসের নাম রেখেছিলেন হাই ইবনে ইয়াকযান। কিন্তু ড্যানিয়েল ডেফো কর্তৃক রচিত Life and Strange Adventures of Robinson Crusoe গ্রন্থটি কি এই উপন্যাসকে অবলম্বন করে রচিত?
হাই ইবনে ইয়াকযান-এর অর্থ: 'সদাজাগ্রতের পুত্র, জীবিত' অর্থাৎ এটা 'সদাজাগ্রতের পুত্র জীবিতের গল্প', যেখানে ঘুমন্ত শৈশব থেকে হাই চরিত্রটির জ্ঞানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যে জ্ঞান দিয়ে সে দুনিয়া ও তার চারিপাশ সম্পর্কে পূর্ণরূপে চিন্তা করতে সক্ষম হয়।
এক রাজকন্যার শিশু পুত্র হাই-এর মাধ্যমে গল্পটির সূচনা, যার জন্ম গোপন ছিল। তাকে নিরক্ষীয় একটি দ্বীপে ফেলে আসা হয়, যেখানে একটি হরিণী তাকে দুধ পান করায়। এখানে সে তার জীবনের প্রথম ৫০ বছর কোনো মানুষের সাক্ষাত ছাড়াই পার করে। তার এই নির্বাসনকাল সাত বছর করে সাতটি পর্যায়ে অতিবাহিত হয়। সাত বছরের প্রতিটি পর্যায়ে সে নিজেই তার শিক্ষক এবং নিজে নিজে সে তার নিজ ও চারপাশ সম্পর্কে জানতে থাকে।
হাই ইবনে ইয়াকযান-এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদ ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। ১১ বছর পরে ড্যানিয়েল ডেফোর বিখ্যাত বইটি প্রকাশিত হয়। ডেফোর সমসাময়িক অনেকে বলেন, জুয়ান ফার্নান্দেস দ্বীপে চার বছরের বেশি সময় কাটিয়ে আসা স্কটল্যান্ডের নাবিক আলেকজান্ডার সেলকার্কের অভিজ্ঞতার আলোকে ডেফো তার গল্প দাঁড় করান। কিন্তু Robinson Crusoe ও হাই ইবনে ইয়াকযান-এর মধ্যে যে ধরনের সাদৃশ্য বিদ্যমান, তা থেকে এটা সহজেই অনুমেয় যে, ডেফো খুব সম্ভবত মুসলিম এই কীর্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। দ্বীপে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে একাকী দিনযাপনের নিদারুণ কষ্ট এবং টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে শুরু করে বহু বিষয়েই Robinson Crusoe ও হাই ইবনে ইয়াকযান-এর মধ্যে ব্যাপক সাদৃশ্য দৃশ্যমান।
কাগজ প্রচলনের পূর্বে কুরআন নকল করা, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা এবং এ জাতীয় কাজের জন্য প্রধান অবলম্বন ছিল চামড়ার পাণ্ডুলিপি ও প্যাপিরাস। চামড়ার পাণ্ডুলিপি টেকসই, দ্যুতিময় ও ব্যয়বহুল হলেও এটার একটি পাশই ব্যবহার উপযোগী। প্যাপিরাস ভঙ্গুর প্রকৃতির এবং সেখানে যা লেখা হতো, তা মুছে ফেলা যেত না, ফলশ্রুতিতে সরকারি নথি সংরক্ষণে এটা বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতো। উভয়টি বেশ দামী হওয়ায় যখন এদের সন্তা বিকল্প হিসেবে ৮ম শতাব্দির শেষভাগে চীন থেকে কাগজ উৎপাদনের কলা-কৌশল আয়ত্ত করে মুসলিমরা ব্যাপক হারে কাগজ উৎপাদন শুরু করে, তখন লেখার শিল্প এক নয়া যৌবন লাভ করে।
মুসলিম ও ইউরোপীয় রাজসভার সদস্যদের মধ্যে উপহার আদান-প্রদানের পথ ধরে ইউরোপ আরবী ক্যালিগ্রাফির সংস্পর্শে আসে। প্রথম দিকে, ইউরোপীয়রা আরবী ক্যালিগ্রাফিতে কী লেখা আছে, তা না জেনেই সেটার অনুকরণ করতো। ৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে মিশরে নির্মিত ইবনে তুলুন মসজিদের কুফি লিপিতে অঙ্কিত শিলালিপি প্রথমত ফ্রান্সের গথিক শিল্পে নতুনভাবে বানানো হয় এবং এরপর ইউরোপের অন্যান্য অংশে তা ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষ ভাস্কর গ্যান ফ্রিদাসের করা ফ্রান্সের ল্য পুইয়ে অবস্থিত ক্যাসিড্রাল বা প্রধান গির্জার বারান্দাস্থ খ্রিস্টীয় ভজনালয়ের খোদাই করা কাঠের দরজা এবং ল্যু পুইয়ের নিকটস্থ ল্য ভ্যট চিলাকের গির্জার খোদাই করা দরজা - এমন কীতিগুলোও যে ইবনে তুলুন মসজিদের অনুকরণে করা, এমনটি বিবেচনা করা হয়। ইতালির আমালফির যেসব বণিক কায়রো ভ্রমণ করেছে, ধারণা করা হয় যে, ইউরোপে এসব ডিজাইনের অনুপ্রবেশের পিছনে এসব বণিকই দায়ী। যেহেতু তাদের সাথে কায়রোর ফাতিমী সাম্রাজ্যের বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
"পড়- তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড় এবং তোমার প্রতিপালক দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানতো না।" - কুরআন (৯৬:১-৫)
Legacy of Islam গ্রন্থে প্রফেসর টমাস আরনল্ড বলেন, আয়ারল্যান্ডে ৯ম শতাব্দির একটি ক্রুশ পাওয়া যায়, যেখানে কুফি ক্যালিগ্রাফিতে বাসমালাহ (বিসমিল্লাহি - বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ) বা 'আল্লাহর নামে শুরু করছি' বাক্যটি খোদাই করা ছিল। শিল্পকলার অন্যান্য শাখা বিশেষভাবে চিত্রাঙ্কনে স্টাইলের জন্য কুফি লিপি যোগ করা হতো। লোকেরা ক্যালিগ্রাফির দিকে ঝুকে পড়ে। এমনকি ইতালীয় রেনেসাঁর চিত্রকর জেনটাইল দ্য ফ্যাব্রিয়ানো তার "Adoration of the Magi" চিত্রকর্মে জামার কিনারার শোভাবর্ধনে ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করেন। যেমনটি আমরা আজ জানি যে, কলমের পূর্বে কালাম বা নলখাগড়ার কলমসহ লেখার বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী ছিল। বিপুল চাহিদাসম্পন্ন নলখাগড়াগুলো আরব উপসাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আসতো এবং এগুলো তৎকালীন সময়ে দারুণ মূল্যবান বাণিজ্যিক পণ্য ছিল। এগুলোর দৈর্ঘ্য ২৪ থেকে ৩০ সেন্টিমিটারের (৯.৫ ও ১১.৮ ইঞ্চির) মাঝে ছিল এবং সাধারণভাবে এগুলোর ব্যাসের পরিমাপ এক সেন্টিমিটার (০.৪ ইঞ্চি) হতো। প্রতিটি লিপির স্টাইলের জন্য নির্দিষ্ট কোণে কাটা ভিন্ন ভিন্ন নলখাগড়ার প্রয়োজন হতো।
কালো ও ঘন বাদামি কালি প্রায়শ ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন ধরন ও রঙের কালি ছিল, যেগুলোর প্রতিটির তীব্রতা ও ঘনত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। ক্যালিগ্রাফি শিল্পীগণ সাধারণত নিজেরাই তাদের কালি তৈরি করতো এবং কখনো কখনো কালি তৈরির এসব রেসিপি তারা সযত্নে গোপন রাখতো। নীল চামড়ার লেখনী বস্তু, প্রচ্ছদ পাতা, চিত্র এবং শিরোনাম পাতাতে রুপা ও স্বর্ণের কালি ব্যবহৃত হতো। লাল, সাদা ও নীল কালিগুলো মাঝে মাঝে রঙিন শিরোনামে ব্যবহৃত হতো। কালি শুকানোর জন্য ক্যালিগ্রাফি শিল্পীগণ কালি পাত্র, পালিশ করা পাথর ও বালুকে বাড়তি সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
কলম তৈরীর কাহিনী
৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে মিশরের সুলতান আল-মুয়িজ্জের বিশিষ্ট সাংবাদিক, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহচর "কিতাবু মাজালিস ওয়াল মাসায়ারাত” (শ্রোতা ও সম্মেলন বিষয়ক পুস্তক) রচনা করেন। রাজার অন্তরঙ্গ এই সহচরের পুরো নাম কাযী আবু হানিফা আন-নুমান ইবনে মুহাম্মদ। তার রচিত এই গ্রন্থে তিনি ঝরনা-কলম তৈরির জন্য আল-মুয়িজ্জের নির্দেশ প্রদানের ঘটনাটি তুলে ধরেন:
"আমরা এমন একটি কলম তৈরি করতে চাই, যেটা কোনো দোয়াতের সাহায্য ছাড়াই লিখে যাবে এবং যার কালি তার ভিতরেই মজুদ থাকবে। কলমটি কেবল কালি দিয়ে পূর্ণ করা হবে এবং তা দিয়ে যে কেউ তার ইচ্ছে মতো লিখতে পারবে। লেখক তার জামার আন্তিন বা তার ইচ্ছে মতো জায়গায় এটাকে রাখতে পারবে এবং এটা থেকে কোনো দাগ হবে না, আর না এটা থেকে কালির বিন্দু বেরিয়ে আসবে। লিখতে চাইলেই কেবল কালি বেরুবে। (এমন ধরনের কলম) পূর্বে কেউ কখনো বানিয়েছে, এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। যে বিষয়টির প্রকৃত তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করবে, সে এর পিছনের প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। আমি বললাম, 'এটাও কি সম্ভব?' জবাবে তিনি বললেন, "আল্লাহ চাইলে এটা সম্ভব।"
এই ঘটনার কিছুদিন পর একজন কারিগর একটি কলম নিয়ে আসেন, কালি পূর্ণ থাকা অবস্থায় যা দিয়ে লেখা যায়। তিনি কলমটি উল্টে দিতেন, এক পাশ থেকে আরেক পাশে কাত করতেন, কিন্তু তা থেকে কালি বের হতো না। লেখা ছাড়া কলমটি কালি নিঃসরণ করতো না এবং এটা হাত বা জামাতে কোনো দাগ ফেলতো না। সবশেষে, এটার জন্য কালির পাত্র লাগতো না, যেহেতু এটার ভেতরেই কালির পাত্র আড়াল হয়ে আছে।