📄 গণিত
বেশ কয়েকটি গাণিতিক ধারণা রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে বলা হয়, এগুলো ১৬শ, ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দির ইউরোপীয় পণ্ডিতদের বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা ও গবেষণার ফসল। কিন্তু অধ্যয়ন ও পাণ্ডুলিপি উদঘাটনের মাধ্যমে আমরা অবগত যে, ১০০০ বছর পূর্বের মুসলিম গণিতবিদগণ চরম অধ্যবসায়ের সাথে তাদের গবেষণায় রত ছিলেন। গণিতবিদদের একটা বিরাট অংশ আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের ইরাক বা ইরান অঞ্চল থেকে এসেছিলেন, যে সময় বায়তুল হিকমা ছিল বাগদাদের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক একাডেমি। বায়তুল হিকমা সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে এই বিভাগের বায়তুল হিকমা অধ্যায় ঘুরে আসতে পারেন।
গণিতের ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য সময়ের সূচনা হয় আল-খাওয়ারিযমীর হাত ধরে, যখন তিনি বীজগণিতের প্রস্তাবনার সাথে দুনিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেন। আল-खাওয়ারিযমীর দেয়া এই নতুন ধারণার গুরুত্ব যে কত, তা উপলব্ধি করাটা অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল জ্যামিতি-নির্ভর গণিতের গ্রিক ধারণা থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক বৈপ্লবিক প্রয়াস।
বীজগণিত মূলত একটি একত্রকরণ থিওরি, যা মূলদ সংখ্যা, অমূলদ সংখ্যা ও জ্যামিতিক বিস্তার - এদের সবগুলোকে বীজগাণিতিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এটা গণিতকে নতুন এক মাত্রা দান করে এবং এমন একটি পথ তৈরি করে, যা পূর্বের ধারণা বা তত্ত্বের তুলনায় অধিকতর প্রশন্ত এবং এটা ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির পথ সুগম করে। বীজগাণিতিক ধারণাগুলোর আবির্ভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এটা গণিতকে এমনসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ার পথ করে দেয়, যা পূর্বে অসম্ভব ছিল।
আল-খাওয়ারিযমীর পর বীজগণিতের এই আলোকবর্তিকা হাতে তুলে নেয় তার উত্তরসূরি ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া আল-কারাজী। মনে করা হয়, তিনি-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বীজগণিতকে জ্যামিতিক অপারেশন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করেন এবং সেখানে তিনি পাটিগণিতিক ধাঁচের অপারেশন জুড়ে দেন। আর এই পাটিগণিতিক ধাঁচই আজকের দিনের বীজগণিতের প্রধান অংশ। তিনিই সর্বপ্রথম x, x², x³... এবং 1/x, 1/x², 1/x³... একপদী রাশিগুলোর সংজ্ঞা এবং এদের যেকোন দুটোর গুণফলের নিয়ম বা ফর্মুলা প্রদান করেন। তিনি বীজগণিতের একটি ধারার সূচনা করেন, যা কয়েক শতাব্দি ধরে বিকশিত ছিল।
দুইশত বছর পর ১২শ শতাব্দির পণ্ডিত আল-কারাজীর গাণিতিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আস-সামাওয়াল বীজগণিতের যথাযথ সংজ্ঞা প্রদান করেন, "(বীজগণিত) সকল গাণিতিক পন্থার আশ্রয় নিয়ে অজানাকে নিয়ে কাজ করে, যেমনিভাবে অঙ্কশাস্ত্রবিদ জানাকে নিয়ে কাজ করে।"
বীজগণিতের গল্পগাথায় পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কীর্তিনায়ক হলেন কবি উমর আল-খাইয়্যাম। উমর খাইয়্যাম নামে সমধিক পরিচিত এই পণ্ডিত ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কৌণিক ছেদগুলোর পারস্পরিক বিভক্তিকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্যামিতিক সমাধানের ঘন সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিবিন্যাস প্রদান করেন। তিনি ঘন সমীকরণের বীজগাণিতিক সমাধানের পূর্ণ বিবরণ প্রদানের আশা করেছিলেন এবং বলেন, "যদি সুযোগ আসে এবং আমি সফল হই, তবে আমি এই ১৪ গঠন এবং সেই সাথে তাদের সকল শাখা-প্রশাখা ও অবস্থা এবং সম্ভাব্য ও অসম্ভাব্যের মাঝে কীভাবে পার্থক্য করতে হয়, তা নিয়ে আলোচনা করে একটি পুস্তিকা প্রস্তুত করবো, সেখানে এই শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় উপাদান শামিল থাকবে।"
১২শ শতাব্দিতে আস-সামাওয়াল যখন আল-কারাজীর গাণিতিক ধারার চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন, শারাফুদ্দীন আত-তুসী তখন উমর খাইয়্যাম কর্তৃক জ্যামিতিতে বীজগণিতের প্রয়োগের ধারাটি অনুসরণ করে যাচ্ছিলেন। তিনি ঘন সমীকরণের উপর প্রবন্ধ লিখেন এবং সেখানে উল্লেখ করেন, "(বীজগণিত) অন্য আরেকটি শাখায় মৌলিক অবদান রাখে, যা-র উদ্দেশ্য সমীকরণের মাধ্যমে বক্র রেখার অধ্যয়ন।" আর এর মাধ্যমে বীজগাণিতিক জ্যামিতির নতুন ধারা উন্মোচিত হয়।
বীজগণিত হলো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে মুসলিম গণিতবিদগণ এর ক্রমবিকাশের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। ৯ম শতাব্দির বাগদাদের বায়তুল হিকমাতে বনী মূসা ভাই নামে পরিচিত তিন ভাইয়ের একটি দল ছিল। গৃহ বিভাগে আপনি বনী মূসা ভাইয়েরা কীভাবে নানা ধরনের ট্রিক ডিভাইস তৈরি করেছিল, তা সম্পর্কে জেনেছেন। তারা সহজাত প্রতিভাসম্পন্ন গণিতবিদ ছিলেন এবং ৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া সাবিত ইবনে কুরা ছিলেন তাদের একজন শিক্ষার্থী। সংখ্যাতত্ত্বে তার অবদানের জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত, যেখানে তিনি চমৎকার একটি উপপাদ্য উদ্ভাবন করেন, যা তাকে কয়েক জোড়া সমভাবাপন্য সংখ্যা (Amicable numbers) আবিষ্কারে সফল করে।
সমভাবাপন্য সংখ্যাগুলো আরবী গণিতশাস্ত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ১৩শ শতাব্দিতে সাবিতের উপপাদ্যের নতুন প্রমাণ পেশ করেন আল-ফারিসী এবং এর মাধ্যমে তিনি গুণনীয়ক নির্ণয় (factorization) এবং গুচ্ছ-বিন্যাসতত্ত্ব (combinatorial) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উপস্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি আরও এক জোড়া সমভাবাপন্য সংখ্যা আবিষ্কার করেন: ১৭,২৯৬ এবং ১৮,৪১৬, যা ১৮শ শতাব্দির সুইস গণিতবিদ লিওনার্দো ইউলারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। ইউলারের বহু বছর পূর্বেই আরেক মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ বাকির ইয়াজদী ১৭শ শতাব্দিতে সমভাবাপন্য সংখ্যার আরেকটি জোড়া আবিষ্কার করেন: ৯,৩৬৩,৫৮৪ এবং ৯,৪৩৭,০৫৬।
"(বীজগণিত) সকল গাণিতিক পন্থার আশ্রয় নিয়ে অজানাকে নিয়ে কাজ করে, যেমনিভাবে অঙ্কশাস্ত্রবিদ জানাকে নিয়ে কাজ করে।" - আস-সামাওয়াল, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ
১০ম শতাব্দিতে মুসলিম গণিতবিদগণ গণিতের আরেকটি শাখায় চরম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন, যখন ইবনুল হাইছাম সকল জোড় নিখুঁত সংখ্যাগুলোকে বিন্যস্ত করার প্রথম প্রয়াস চালান। ওইসব পূর্ণ সংখ্যাকে নিখুঁত সংখ্যা বলা হয়, যাদের প্রকৃত ধনাত্মক গুণনীয়কগুলি যোগ করলে ওই সংখ্যা পাওয়া যায় এবং এর সূত্রটি হলো: (2-1) (2k-1), যেখানে 2*-1 হলো মৌলিক সংখ্যা। এছাড়াও আমাদের জানা মতে তিনিই হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি উইলসনের বহু আগেই তার প্রদান করা থিওরি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তত্ত্বটি এরূপ: p যদি মৌলিক সংখ্যা হয়, তবে বহুপদী 1+(p-1)! রাশিটিও p দ্বারা বিভাজ্য হবে। তবে তিনি এই তত্ত্বের প্রমাণ জানতেন কিনা, তা আমরা নিশ্চিত নই। ক্যামব্রিজের গণিতবিদ উইলসনের সাথে এই থিওরির আবিষ্কারকে সম্পৃক্ত করায় এটাকে উইলসনের থিওরি বলা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমরা নিশ্চিত নই যে, তিনি তত্ত্বের প্রমাণ জানতেন কিনা। এর বছরখানেক পর ল্যাগরেঞ্জ নামের এক গণিতবিদ এই থিওরির 'প্রথম আবিষ্কারের' ৭৫০ বছর পর এর প্রমাণ পেশ করেন।
ব্যবসা ও প্রতিদিনের কাজে গণিতের ব্যবহার ছিল এবং বিশেষ করে হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে এটা ছিল আবশ্যকীয় এক মাধ্যম। বর্তমানে আমাদের অধিকাংশই হিসেব ও গণনার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। শূন্য দ্বারা যার সূচনা এবং যা বিলিয়ন ও ট্রিলিয়নেরও গণ্ডি পার করে। কিন্তু ১০ম শতাব্দির মুসলিম দেশগুলোতে ৩-টি স্বতন্ত্র গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো এবং ওই শতকের শেষ দিকে আল-বাগদাদীর মতো লেখক ভিন্ন ভিন্ন ওই পদ্ধতিগুলোর তুলনা করে গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। এই ৩-টি পদ্ধতি হলো: আঙ্গুল-ভিত্তিক পাটিগণিত, যঠিক পদ্ধতি এবং আরবী সংখ্যা পদ্ধতি।
আঙ্গুলের সাহায্যে পরিচালিত হিসাবের সাথে সম্পূর্ণ কথায় লেখা সংখ্যাগুলোর আবির্ভাব ঘটে, যা বণিক সম্প্রদায়ের মাঝে ব্যবহৃত হতো। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গণিতবিদরা যেমন, বাগদাদের আবুল ওফা ১০ম শতাব্দিতে বেশ কিছু পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। আরবী সংখ্যার ব্যবহার ও প্রয়োগে তিনি ভীষণ দক্ষ ছিলেন এবং তিনি বলেন, "পূর্ব দেশীয় খিলাফতের অধীনস্থ জনগণ ও বণিক সম্প্রদায়ের মাঝে দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোর কোনো ব্যবহার ও প্রয়োগ খুঁজে পাইনি।" ষষ্ঠিক পদ্ধতিতে আরবী বর্ণমালা সম্বলিত সংখ্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পদ্ধতি ব্যাবিলনীয়দের কাছ থেকে এসেছে এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় নানা কাজে আরব গণিতবিদগণ অতিমাত্রায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন।
দশমিক স্থানীয়-মান পদ্ধতির সাথে আরবী সংখ্যা ও ভগ্নাংশের পাটিগণিত ভারতীয় সংস্করণ থেকে উদ্ভূত ও বিকাশ লাভ করে। ভারতীয় সংখ্যাগুলোকে মুসলিমগণ ১ থেকে ৯ পর্যন্ত আধুনিক সংখ্যায় একীভূত করে ফেলে, যা আরবী সংখ্যা হিসেবে সমধিক পরিচিতি। এমনটি ধারণা করা হয় যে, এই সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকে তার নিজ প্রতীক বা চিহ্নের কোণের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ৭-সংখ্যাটি এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, যেহেতু মধ্যবর্তী আনুভূমিক রেখার উলম্ব বাহুকে অতিক্রম করার বিষয়টি অধুনা ১৯শ শতকের বিকাশ মাত্র। পরবর্তীতে এগুলো ইউরোপ ও উত্তম আমেরিকার প্রচলিত সংখ্যায় পরিণত হয়। এই সংখ্যাগুলো ভারতীয় সংখ্যা থেকে বেশ স্বতন্ত্র। উদাহরণস্বরূপ, ১-সংখ্যাটির একটি কোণ রয়েছে, ২-সংখ্যাটির দুটি কোণ রয়েছে, ৩-সংখ্যাটির তিনটি কোণ রয়েছে ইত্যাদি। এই সংখ্যাগুলোর আবির্ভাব তখন পর্যন্ত ব্যবহৃত লাতিন সংখ্যা দ্বারা সৃষ্ট সমস্যার সমাধান পেশ করে। আরবী সংখ্যাগুলো গুবারী সংখ্যা নামে পরিচিত ছিল। কারণ, হিসাবের জন্য মুসলিমগণ অ্যাবাকাস জাতীয় গণনাযন্ত্রের পরিবর্তে মাটির বোর্ড (গুবার) ব্যবহার করতো।
"গণিত হলো এই দুনিয়ার বিষয়াদি এবং বিজ্ঞানের জগতে প্রবেশের দরজা ও চাবি ... আমরা যদি সন্দেহকে দূরে সরিয়ে নিশ্চয়তা এবং ভ্রান্তিকে পিছনে ফেলে সত্য লাভ করতে চাই, তবে আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: জ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি গণিতের উপর স্থাপন করা।"
রজার বেকন, ইংরেজ পণ্ডিত
মুসলিম গণিতবিদদের দ্বারা শূন্যের বিস্তৃত সংজ্ঞা ও ব্যবহার ছিল ভারতীয় পদ্ধতির ব্যাপক সংস্কার ও পরিমার্জন। মুসলিমগণ শূন্যকে একটি গাণিতিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, আর তা হলো: যেকোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে তা শূন্যে পরিণত হয়। পূর্বে শূন্যকে খালি বা 'নাস্তি' বিবেচনা করা হতো। মুসলিমগণ শূন্যকে দশমিকীকরণেও ব্যবহার করে, যেন একটি সংখ্যার প্রকৃত অবস্থা জানা যায়, উদাহরণস্বরূপ, পূর্বে ২৩ লিখলে সংখ্যাটি দ্বারা ২৩, ২৩০ বা ২৩০০ ইত্যাদি বোঝানোর সম্ভাবনা থাকতো, কিন্তু শূন্যের ব্যবহারে সে সংশয় দূর হয়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, আমরা যদি ষড়ভুজের মাঝে (বৃত্তের মতো বড়ো একটি) শূন্য বসে থাকার বিষয়টি কল্পনা করি, তবে ওই বৃত্তের ব্যাস এবং ষড়ভুজের বাহুর অনুপাত হবে গোল্ডেন রেশিও (সোনালি অনুপাত)-এর সমান। গোল্ডেন রেশিও সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনি এই বিভাগের জ্যামিতি অধ্যায় দেখতে পারেন।
মুসলিম গণিতবিদগণ আরও কিছু সংখ্যার তাৎপর্য নিয়ে বেশ মোহিত ছিল, যেমন: ০ ও ১-এর সম্পর্ক এবং وَاحِدٌ (ওয়াহিদ- একক, আল্লাহর ৯৯-টি গুণবাচক নামের একটি) ও لاشي قبله ولا شي بغده )লা শাইয়ুন কাবলাহু ওয়া লা শাইয়ুন বা'দাহু - না তাঁর পূর্বে কিছু ছিল এবং না তাঁর পরে কিছু আছে)-এর মধ্যস্থ সম্পর্ক। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আজকের দিনের কম্পিউটারের ভাষা হিসেবে কেবল এই দুটো সংখ্যা অর্থাৎ ০ ও ১ ব্যবহৃত হয়।
৩-টি উৎস থেকে আরবী সংখ্যা ইউরোপে প্রবেশ করে। প্রথমত, গারবার্ট (পোপ প্রথম সিলভেস্টার)-এর মাধ্যমে, যিনি কর্ডোবাতে অধ্যয়ন শেষে রোমে ফিরে যান। এরপর ১২শ শতাব্দিতে চেস্টারের রবার্টের মাধ্যমে, যিনি দ্বিতীয় গুবারী (আরবী সংখ্যা) সম্বলিত আল-খাওয়ারিযমীর দ্বিতীয় গ্রন্থের অনুবাদ সম্পন্ন করেন। এ পথ ধরে ইউরোপে আরবী সংখ্যার প্রবেশের বিষয়টি সমকালীন ঐতিহাসিক কার্ল মেনিগার তার Number Words and Number Symbols গ্রন্থে তুলে ধরেনে। ইউরোপে আরবী সংখ্যার প্রবেশের তৃতীয় পথটি ১৩শ শতাব্দিতে ফিবোনাচ্চির হাত ধরে উন্মুক্ত হয়, যিনি ইউরোপীয় জনগণের কাছে নিজের আহরিত জ্ঞান ছড়িয়ে দেন। মূলত ফিবোনাচ্চির বাবা তাকে আলজেরিয়ার বুজি শহরের সাইয়্যেদ উমর নামে পরিচিত এক শিক্ষকের কাছে গণিত শেখার জন্য পাঠান, আর সেখান থেকেই তিনি এসব জ্ঞান হাসিল করেন। ফিবোনাচ্চির এই শিক্ষক বাগদাদ ও মাওসুল গণিতশাস্ত্রীয় ধারার শিক্ষা দিতেন, যাতে বীজগাণিতিক এবং ধারাবাহিক বা সহসমীকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কায়রোর আলেকজান্দ্রিয়া ও দামেস্কের লাইব্রেরি ভ্রমণের পরপরই ফিবোনাচ্চি তার Liber Abaci গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় আরবী সংখ্যা নিয়ে এবং সেখানে তিনি সংখ্যাগুলোকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেন, "ভারতীয়দের ৯-টি সংখ্যা হলো: ৯৮৭৬৫৪৩২১। এদের সাথে আরবীতে সেফিরাম (সিফরুন- صفّرٌ( নামে পরিচিত '০' প্রতীক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত যেকোন সংখ্যা লেখা সম্ভব।"
আরবী সংখ্যা সম্বলিত হিসাবের এই পদ্ধতি-ই মুসলিম গণিতবিদদের জন্য সংখ্যাতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উচ্চতা হাসিলের পথ সুগম করে। যার ফলে আবুল ওফা ও উমর খাইয়্যামের মতো গণিতবিদদের পক্ষে মূলের উৎপাদক বের করা সম্ভব হয়। আল-কারাজী কর্তৃক উদ্ভাবিত পূর্ণসংখ্যার সূচকের জন্য দ্বিপদী উপপাদ্য (binomial theorem) দশমিক পদ্ধতির ভিত্তিতে সংখ্যাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ১৪শ শতাব্দিতে আল-কাশী বীজগাণিতিক সংখ্যার আসন্ন মান নির্ণয় এবং সেইসাথে পাই-এর মতো বাস্তব সংখ্যাগুলোর দশমিক ভগ্নাংশ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দশমিক ভগ্নাংশ নির্ণয়ে তার অবদান এতটাই অগ্রগণ্য ছিল যে, বহু বছর ধরে তাকে এই বিদ্যার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রথমবারের মতো না হলেও তিনি 'n-তম বর্গমূল' নির্ণয়ের একটি এলগরিদম (algorithm) প্রদান করেন, পরবর্তীতে বহু শতাব্দি পর ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী যথাক্রমে রুফিনি ও হর্নার বিশেষ এই পদ্ধতির পূর্ণতা দান করেন।
যদিও আরব গণিতবিদরা বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব ও সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে তাদের অবদানের জন্য সর্বাধিক পরিচিত, তথাপি তারা জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি ও গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয়গুলোতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সমর্থ হয়।
📄 ত্রিকোণমিতি
মুসলিমদের দ্বারা প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে চর্চিত জ্যোতির্বিদ্যার হাত ধরেই ত্রিকোণমিতির সূচনা। বস্তুত সালাতের ওয়াক্ত সঠিকভাবে নির্ণয়ের সাথে ত্রিকোণমিতি চর্চা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এমনকি মুসলিমদের বহু আগে গ্রিক জ্যোতির্বিদগণ নির্দিষ্ট ত্রিভুজের জানা কোণ ও বাহুর সাপেক্ষে অজানা কোণ ও বাহু পরিমাপ করতো এবং যার সাহায্যে তারা সূর্য, চাঁদ এবং সে সময়ের জানা ৫-টি গ্রহের গতিবিধি বুঝতে চাইতো।
সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের অবস্থান সম্পর্কিত প্রশ্ন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রিকরা নানা ছক, সারণী ও নিয়ম তৈরি করেন, যা-র সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভবপর ছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ আলোচনা পাওয়া যাবে আনুমানিক ২য় শতাব্দিতে আলেকজান্দ্রিয়ায় কর্মরত জ্যোতির্বিদ টলেমি রচিত Almagest (আলমাগেস্ট) গ্রন্থে। টলেমি রচিত এই গ্রন্থ মুসলিমদের হাত হয়ে ইউরোপের পৌঁছায়, যারা Almagest গ্রন্থের আরবী অনুবাদ করেন এবং এর পরিভাষাসমূহ আরও বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করেন। Almagest-এর আরবী প্রতিশব্দ (আল-আ'যাম), যার মানে: শ্রেষ্ঠ।
প্রাচীনযুগের শেষ দিকের জ্যোতির্বিদরা তাদের যাবতীয় সমতল ত্রিকোণমিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানত Almagest গ্রন্থের পুস্তক-১-এ প্রাপ্ত সারণী ব্যবহার করতো, যা বৃত্তস্থ জ্যায়ের সারণী (Table of chord) তথা ত্রিকোণমিতিক সারণী নামে পরিচিত। কৌণিক চাপের পরিমাণ ১/২-ডিগ্রি থেকে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ১/২-ডিগ্রি হারে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই সারণী ৬০ একক ব্যাসার্ধের বৃত্তের সম্মুখ কোণস্থ জ্যায়ের দৈর্ঘ্য বলে দেয়।
"শাকলুল কাত্তা'আ" (পরস্পরছেদী আকৃতি) শীর্ষক পুস্তকে ১৩শ শতাব্দির মুসলিম জ্যোতির্বিদ আত-তুসী 'সমকোণী ত্রিভুজের সাথে সম্পৃক্ত সমস্যা' সমাধানে কীভাবে বৃত্তস্থ জ্যায়ের দৈর্ঘ্যের সারণী ব্যবহার করতে হয়, তার ব্যাখ্যা দেন। ত্রিভুজ ও বৃত্তস্থ জ্যায়ের মাঝে যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তা আত-তুসীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই সম্পর্ক এরূপ: বৃত্তের অভ্যন্তরে ত্রিভুজ আঁকা যাবে, তখন ত্রিভুজের বাহুগুলো জ্যা হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে সম্মুখস্থ চাপগুলো ত্রিভুজের কোণগুলোর বিপরীতে অবস্থান করে।
কিন্তু এই সারণীগুলোর উপর নির্ভর করার দুটো অসুবিধা রয়েছে। প্রথমত, সমকোণী ত্রিভুজের অজানা বাহু বা কোণের পরিমাণ নির্ণয়ে উদ্ভূত সকল ভিন্নতা সমাধানে এই সারণী ও মধ্যবর্তী ধাপগুলো প্রয়োজন মাফিক পরিবর্তন করে নিতে হয়। এই পদ্ধতি আধুনিক পদ্ধতির বিপরীত, যা ৬-টি পরিচিত ত্রিকোণমিতিক ফাংশন – সাইন (sine), কোসাইন (cosine) ও ট্যানজেন্ট (tangent) এবং এদের বিপরীত ফাংশন স্যাকেন্ট (secant), কোস্যাকেন্ট (cosecant) ও কোট্যানজেন্ট (cotangent) - এর সমন্বয়ে গঠিত। আধুনিক এই পদ্ধতি মুসলিম গণিতবিদদের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিন্যস্ত হয়। বৃত্তস্থ জ্যায়ের সারণীর দ্বিতীয় অসুবিধা হলো: বৃত্তস্থ চাপের দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে প্রায়শই কোণগুলোকে দ্বিগুণ করে নিতে হয়।
প্রকৃতপক্ষে, ১০ম শতাব্দির পূর্বেই মুসলিম পণ্ডিতদের একটি ধারা ইতোমধ্যেই ত্রিকোণমিতির ভিত্তি দাঁড় করায়, যা আত-তুসীর জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়াকে সম্ভবপর করে। আত-তুসী তাদের অবদানগুলো সংগ্রহ করেন, সেগুলো বিন্যস্ত করেন এবং বিশ্লেষণ করে তা আরও সমৃদ্ধ করেন।
তুরস্কের হারানে জন্ম নেয়া আল-বাত্তানী ত্রিকোণমিতি শাস্ত্রের আরেক পৃথিকৃৎ। বর্তমান ইরাকের সামারাতে ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী এই মনীষীকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ত্রিকোণমিতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তার অগ্রগামী ভূমিকার পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল গ্রহানুপুঞ্জের আবর্তনের পর্যবেক্ষণ। মহাবিশ্ব বিভাগের জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যায়ে তার ব্যাপারে আপনি আরও আলোচনা পাবেন - ইনশাআল্লাহ।
এক হাজার বছর পূর্বের মুসলিমগণ ত্রিকোণমিতি চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যেহেতু গ্রহের আবর্তন এবং বাহু ও কোণ নির্ণয়ে তারা ত্রিকোণমিতির সফল প্রয়োগ করেন। বর্তমানে গোলীয় ত্রিকোণমিতি (Spherical trigonometry)-সহ সাধারণ ত্রিকোণমিতিক ব্যবহৃত হয় জ্যোতির্বিদ্যা, মানচিত্রাঙ্কন ও নৌচালনবিদ্যার জটিল সমস্যা সমাধানে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল-বাত্তানী নিজের গাণিতিক সমীকরণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি অন্য পণ্ডিতরা যেন 'পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা' অব্যাহত রাখে, সে ব্যাপারে বেশ উৎসাহ দিতেন, যেন এর মাধ্যমে তার কর্ম পূর্ণতা ও বিস্তৃতি লাভ করে। আল-বাত্তানীর মতো আবুল ওফা, ইবনে ইউনূস এবং ইবনুল হাইছামও গোলীয় ত্রিকোণমিতির সমৃদ্ধকরণে ভূমিকা রাখেন এবং সেটাকে জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করেন।
আল-বাত্তানী প্রথমবারের মতো সাইন (sine), কোসাইন (cosine) প্রতীক ব্যবহার করেন এবং এগুলোকে তিনি অনুপাতের বদলে দৈর্ঘ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যেমনটি আজ আমরা জানি। আল-বাত্তানী ট্যানজেন্ট (tangent)-কে 'বর্ধিত ছায়া' হিসেবে প্রকাশ করেন, যা দেয়ালের উপর স্থাপিত কল্পিত অনুভূমিক লাঠি থেকে উদ্ভূত। ১১শ শতাব্দিতে আল-বিরুনী ট্যানজেন্ট (tangent) ও কোট্যানজেন্ট (cotangent)-এর ত্রিকোণমিতিক ফাংশনের সংজ্ঞা নিরূপণ করেন, যা ভারতীয়দের কাছ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া আল-বিরুনী তাদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত, যারা আধুনিক ত্রিকোণমিতির ভিত্তি নির্মাণে পথিকৃৎ ছিলেন। আল-খাওয়ারিযমী (জন্ম: ৭৮০) সাইন (sine), কোসাইন (cosine) প্রতীক এবং ত্রিকোণমিতিক সারণী প্রস্তুত করেন, যা পরবর্তীতে পশ্চিমে অনুদিত হয়।
বস্তুত, এসব ঘটনা ট্যানজেন্ট (tangent)-সহ নানা প্রতীকে সমৃদ্ধ আধুনিক ত্রিকোণমিতি উদ্ভাবনের ৫০০ বছর পূর্বেকার, উপরন্তু আরও ১০০ বছর পর এসব জ্ঞান নিকোলাস কপার্নিকাসের দৃষ্টিগোচর হয়।
📄 রসায়ন
প্লাস্টিক, রেয়ন, কৃত্রিম রবার থেকে ইনসুলিন, পেনিসিলিন এগুলোর সবই রসায়নে বিপ্লব আনয়নকারী প্রাথমিক সময়ের মুসলিম রসায়নবিদদের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির অবদান।
ইংরেজি 'কেমিস্ট্রি' (বাংলায় রসায়ন) শব্দটি আরবী 'কিমিয়া' থেকে উদ্ভূত এবং পদাশ্রিত নির্দেশক 'আল' যোগ করলে কিমিয়া পরিণত হয় 'আল-কিমিয়া'- তে। পশ্চিমে 'আল-কিমিয়া' শব্দের শেষ বর্ণ ফেলে দিয়ে বানানো হয় ইংরেজি 'আলকেমি'। মধ্যযুগীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের জন্য রসায়ন কোনো রূপকথা বা গুপ্তবিদ্যার চর্চা ছিল না, বরং তা কেবল রসায়নকে ঘিরেই আবর্তিত হতো।
ইসলামী স্বর্ণযুগে রসায়নে তিনজন মুসলিমের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যাদের সময়কাল প্রায় ২০০ বছর যাবৎ বিস্তৃত ছিল।
■ জাবির ইবনে হাইয়ান (আনুমানিক ৭২২ থেকে ৮১৫ খ্রিঃ, ইরান) সকল পণ্ডিত এ ব্যাপারে একমত যে, পশ্চিমে জিবার নামে পরিচিত জাবির ইবনে হাইয়ান রসায়নের জনক। ঔষধ বিক্রেতার এই পুত্র তার জীবনের অধিকাংশ সময় ইরাকের কুফা শহরে অতিবাহিত করেন, যেখানে তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রসায়নকে সুসংহত ধারায় নিয়ে আসেন। নিয়মিত ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগারে কাজে ব্যস্ত রত থেকে তিনি ঊর্ধ্বপাতন, তরলীকরণ, স্ফটিকীকরণ, পাতন, শোধন, সংযুক্তিকরণ, অক্সিডেশন, বাষ্পীকরণ ও পরিস্রাবন পদ্ধতিগুলো উদ্ভাবন করেন এবং এগুলোকে পূর্ণতা দান করেন। নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য না হারিয়ে রাসায়নিক উপাদানগুলো একত্র হয়ে কীভাবে একটি যৌগ গঠন করে, যা খালি চোখে দৃশ্যমান হয় না- এ ব্যাপারে তিনি আলোচনা করেন। এখনকার দিনে এই বিষয় বেশ সাধারণ মনে হলেও ১২৫০ বছর আগের প্রেক্ষাপটে তিনি তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।
সালফিউরিক, নাইট্রিক ও নাইট্রোমিউরিয়াটিক এসিড আবিষ্কারের মাধ্যমে জাবির রাসায়নিক পরীক্ষণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেন, যে এসিডগুলো আজ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি একটি নিখুঁত পরিমাপ যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক রাতলের চেয়ে ৬,৪৮০ গুণ হালকা ওজনের উপাদান পরিমাপ করতে পারে (১ রাতল = ১ কেজি বা ২২০ পাউন্ড) এবং তিনি এটা লক্ষ্য করেন যে, অক্সিডেশনের বিশেষ পর্যায়ে ধাতুর ওজন হ্রাস পায়।
জাবির ইবনে হাইয়ানের কিছু লেখনীর মাঝে রয়েছে: "আল-খাওয়াসুল কাবীর" (রাসায়নিক উপাদান বিষয়ক বৃহৎ পুস্তক), "আল-মাওয়াযিন" (ওজন ও পরিমাপ), "আল-মিযাজ” (সংমিশ্রন) ও "আল-আসবাগ" (রঞ্জক)। ধাতব উপাদানগুলোর গঠনে তার তত্ত্বসমূহ তাত্ত্বিক রসায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সামান্য কিছু পরিবর্তন ও সংযোজনসহ তার এই তত্ত্বসমূহ ১৮শ শতাব্দির আধুনিক রসায়নের শুরুর দিক পর্যন্ত টিকে ছিল।
জাবিরের এই সকল গবেষণা ইরাকের কুফাতে অবস্থিত তার নিজ ল্যাবরেটরিতে সম্পন্ন হয়, যা তার মৃত্যুর ২০০ বছর পর দামেস্ক প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত শহরের একটি এলাকার কিছু ঘর ভাঙার সময় পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। সেখানে পাওয়া পাথরকুচিগুলোর মাঝে একটি উখলি (চুন, বালি ও পানির মিশ্রণ) ও স্বর্ণের একটি বড় টুকরো ছিল।
■ আর-রাযী অথবা রাযিস (৮৬৪ থেকে ৯২৫ খ্রিঃ, ইরান) পশ্চিমে রাযিস নামে পরিচিত মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আর-রাযী রসায়নের উপর "সিররুল আসরার" (রহস্যের রহস্য) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে তিনি প্রমাণ করেন যে, মৌলিক পদার্থের শ্রেণিবিন্যাসে জাবির ইবনে হাইয়ানসহ তিনি তার পূর্বসূরি সকলের চেয়ে এগিয়ে। তিনি মৌলিক পদার্থকে পার্থিব, উদ্ভিদ ও প্রাণিজ পদার্থে বিভক্ত করেন এবং কৃত্রিমভাবে প্রাপ্ত পদার্থ যেমন: লেড-অক্সাইড, কস্টিক সোডা এবং নানা ধরনের খাদ এসবের ক্ষেত্রে সংখ্যা ১ যোগ করেন। তার পূর্বে জাবির খনিজ পদার্থকে দেহ (যেমন: স্বর্ণ ও রুপা), সত্তা (যেমন: সালফার ও আর্সেনিক) এবং রূহ (যেমন: পারদ ও সাল-এমোনিয়াক বা এমোনিয়াম ক্লোরাইড) এই তিন ভাগে বিভক্ত করেছিলেন।
নিজের করা পরীক্ষাগুলো লিখে রাখার ক্ষেত্রে আর-রাযী ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রগামী। আমরা তার "সিররুল আসরার" থেকে জানতে পারি যে, ১১০০ বছর পূর্বেই তিনি পাতন, ভস্মীকরণ এবং স্ফটিকীকরণের মতো কাজগুলো করতেন।
তিনি ২০-এরও অধিক ল্যাবরেটরি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, সেগুলোর বিবরণ দেন এবং ব্যবহার করে দেখান। ওই সকল যন্ত্রের অনেকগুলো আজও ব্যবহৃত হয়, যেমন: ধাতু গলানোর পাত্র এবং পাতনের জন্য লাউ আকৃতির পাত্র বা গলাওয়ালা জগ।
■ আল-কিন্দী (৮০১ খ্রি: থেকে ৮৭৩, ইরাক) ক্রিমোনার জেরার্ডের মতো অনুবাদকের বদৌলতে আল-কিন্দীর বহু লেখনী লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়, যার ফলে আরবীর চেয়ে লাতিন ভাষায় তার অধিক লেখনী পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, De gradibus (ডি গ্রাডিবাস) গ্রন্থে আল-কিন্দী বিশ্লেষণ করেন যে, বিভিন্ন উপাদানে মিশ্রিত বা সংশ্লেষিত ঔষধের যৌগিক গঠন ঔষধের নমুনা উপাদানের পরিমাণ ও মাত্রা থেকে গাণিতিকভাবে বের করা সম্ভব এবং নমুনা উপাদানের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে ঔষধের কার্যকারিতার মাত্রার মধ্যে জ্যামিতিক সম্পর্ক বিদ্যমান।
মুসলিম বিশ্বে উদ্ভূত অধিকাংশ জ্ঞান যেমন সেখানে স্থির থাকেনি, ঠিক তেমনি অন্যসব জ্ঞানের মতো আল-কিন্দীর রচনাগুলোও সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তার লেখাগুলো লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়, যা তার তত্ত্বগুলোর ইউরোপে বিস্তৃত হওয়ার প্রমাণ বহন করে। ইতালীয় ক্রিমোনার জেরার্ড অনুবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যেমন: তিনি আর-রাযীর De aluminibus et salibus (লবণ ও ফিটকিরি-র শ্রেণিবিন্যাস ও তৎসংশ্লিষ্ট গবেষণা) গ্রন্থটি অনুবাদ করেন।
আলবার্টাস ম্যাগনাস ও রজার বেকনের মতো ১৩শ শতাব্দির ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীগণ অনুবাদের মাধ্যমে মুসলিম মনীষীদের এসব কর্মের সংস্পর্শে আসেন। রজার বেকন রসায়নের ব্যাপক গুরুত্বের ব্যাপারে বিশেষ বিশ্বাস রাখতেন, যা তিনি আরবী লেখাগুলোর লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করেন।
আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের এই বিশাল হিড়িক ১২শ শতাব্দির মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়। ১৩শ শতাব্দির শেষ তৃতীয়াংশে Summa Perfectionis Magisterii বা Sum of Perfection (পরিপূর্ণতার সমগ্র) শীর্ষক গ্রন্থের সাথে জাবিরের একটি গ্রন্থ Liber Claritatis নামে অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। আরও ৪-টি প্রবন্ধের সাথে এক খণ্ডে সন্নিবেশিত এই গ্রন্থ ১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দির মাঝে বহুবার প্রকাশিত হয় এবং তা The Summa (সমগ্র) নামে সমধিক পরিচিতি পায়। খণ্ডটি এতটাই সাফল্য লাভ করে যে, তা মধ্যযুগের ইউরোপীয় রসায়নের প্রধান পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়। এই ম্যানুয়েল গ্রন্থ শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে সাধারণ রসায়ন শাস্ত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বি থাকে।
পাতন প্রক্রিয়া
প্রথম দিকের রসায়নবিদ এবং রাসায়নিক উপাদান
মুসলিম সভ্যতার প্রতিভাধর সব পরীক্ষক এবং তাদের ঐতিহ্য
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: ১৭শ শতাব্দি পর্যন্ত ইউরোপীয় রসায়ন পাঠ্যপুস্তকগুলোকে প্রভাবিত করা।
স্থান: পারস্য
তারিখ: ৯ম শতাব্দি থেকে সূচনা
প্রধান ব্যক্তিত্ব: আর-রাযী এবং জাবির ইবনে হাইয়ান
প্রথম দিকের রসায়নবিদগণ গোলাপজল থেকে চুলের রঞ্জক কালি, সাবান থেকে রঙ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় উপাদানের এক জমকালো সজ্জা তৈরির জন্য কাজ করেন। ৯ম শতাব্দির একেবারে শুরুর দিকের মুসলিম পরীক্ষকগণ স্ফটিকীকরণ, অক্সিডেশন, বাষ্পীকরণ, ঊর্ধ্বপাতন ও পরিস্রাবন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। পরীক্ষণকে আরও নিখুঁত করার স্বার্থে তারা রাসায়নিক নমুনা উপাদানসমূহ ওজন করার জন্য সূক্ষ্ম মাপন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। এসব পরীক্ষণের পাশাপাশি তারা নতুন তাত্ত্বিক ধারণা ও রাসায়নিক উপাদান সংশ্লিষ্ট ধারণা নিয়ে হাজির হন, যার কতগুলো শতাব্দিকাল ধরে টিকে ছিল।
এই সময়ের বিজ্ঞানীগণ আধুনিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। জাবির ইবনে হাইয়ান ও তার উত্তরসূরি মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া আর-রাযী পদার্থের শ্রেণিবিন্যাস এবং রাসায়নিক উপাদান বিষয়ক জ্ঞানের বিন্যাসে নতুন পন্থা উদ্ভাবন করেন। তারা রসায়নের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন এবং সিরামিকের উজ্জ্বল্য বৃদ্ধি, চুলের জন্য নয়া রঞ্জক ও পানিনিরোধক কাপড়ের জন্য ভার্নিশ তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালান। অন্যরা সংশ্লেষী রাসায়নিক উপাদান নিয়ে কাজ করে, যা কীটনাশক, কাগজ তৈরি, রঙ করা এবং ঔষধ উৎপাদনে কার্যকর। পশ্চিমে রাযিস নামে খ্যাত আর-রাযী তার কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিতে শতাধিক জিনিস আবিষ্কার করেন এবং প্রাপ্ত গবেষণাগুলো তার কৌতূহল উদ্রেককারী "সিররুল আসরার" গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন।
পশ্চিমে জিবার নামে পরিচিত জাবির বহু উদ্ভাবনী পরীক্ষা চালান, যার মাঝে রয়েছে: আগুনে দাহ্য নয় এমন কাগজ তৈরি করা এবং অন্ধকারেও পড়া যায় এমন কালি তৈরি করা। বলা হয়, পাতনের জন্য তিনি বিশেষ পাতন যন্ত্র (alembic still) তৈরি করেন, যা পাতন প্রক্রিয়ার জন্য ওই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিসমূহের অন্যতম। অদ্ভুত আকৃতির এই কাচ পাত্রে তরল পদার্থ জ্বাল দেয়া হতো এবং ওই তরল পদার্থ ঘন করে তার নানা উপাদানের বিশুদ্ধ অংশ আলাদা করা হতো, যা নির্গমন নলের মাধ্যমে নিঃসরিত হতো। রূচিকর সৌরভযুক্ত পানীয় গোলাপজল পাতন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত অন্যতম প্রথম দ্রব্য, যা খাদ্য ও পানীয়কে সুবাশিত করতে এবং সুগন্ধি ও প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুগন্ধি রসায়ন নিয়ে আল-কিন্দী একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে বিভিন্ন ঘ্রাণের ১০৭-টি সুগন্ধির রেসেপি দেয়া আছে।
প্রথম দিককার রসায়নবিদগণ মদের পাতন করে বিশুদ্ধ অ্যালকোহল সংগ্রহ করতেন পানের জন্য অবশ্যই নয় - বরং জীবানুনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিংবা মাটিজাত রুপার উখার (কাঠ, লোহা বা তজ্জাতীয় কঠিন বস্তু মসৃণ করা বা কাটার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র)-এর সাথে মিশিয়ে কালি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সম্ভবত, এসবের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: নাক্ত হিসেবে পরিচিত ঘন অশোধিত তেল পাতন করে জ্বালানী হিসেবে কেরোসিন উৎপন্ন করা এবং ১২শ শতাব্দিতে ভিনেগার পাতন করে শক্তিশালী এসিড উৎপাদন করা। তেলের পরিশোধনের জন্য পাতন প্রক্রিয়া আজও গুরুত্বপূর্ণ এবং কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে তা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
১২শ ও ১৩শ শতাব্দিতে রসায়নের উপর লিখিত বহু আরবী পাঠ্যপুস্তক ও লেখা বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছানোর জন্য লাতিন ভাষায় অনুদিত হতে শুরু করে। জাবির ইবনে হাইয়ানের সাথে সম্পৃক্ত এমন কিছু রচনা সমগ্র ১৭শ শতাব্দি পর্যন্ত বহুবার পুনর্মুদ্রিত হতে থাকে, যা মধ্যযুগে ইউরোপ জুড়ে রসায়ন শাস্ত্রের প্রধান পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়।
অন্যান্য প্রভাবশালী রসায়নবিদদের রচনাগুলোও বেশ আগ্রহ নিয়ে চর্চিত হতে থাকে। কীভাবে ১০০-এরও রাসায়নিক উপাদান তৈরি ও ব্যবহার করতে হয়, আর-রাযীর রচনা তা প্রদর্শন করে। সংশ্লেষিত ঔষধের ফলাফল রচিত আল-কিন্দীর De gradibus গ্রন্থটি ক্রিমোনার জেরার্ড অনুবাদ করেন। বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত মি গুণগত মানের ব্যাপারে তার প্রদান করা জটিল গাণিতিক সূত্রাবলী পশ্চিমা ঔষধবিজ্ঞানকে দারুণভাবে প্রভাবিত ব
📄 বাণিজ্যিক রসায়ন
১১০০ বছর পূর্বের মুসলিম রসায়নবিদদের নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা তাদের এমন এক প্রক্রিয়া আবিষ্কারে সক্ষম করে, যা আজকের দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ ও জাতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। পানির ঠিক পরেই প্রক্রিয়ালব্ধ এই দ্রব্যকে জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান বিবেচনা করা হয়। কেইবা জানতো যে, আরবীতে নাক্ত নামে পরিচিত এই ঘন কালো তেলজাতীয় দ্রব্যের প্রায় ৪০০০-এরও অধিক ব্যবহার রয়েছে? অশোধিত তেলের ক্ষেত্রে পাতন প্রক্রিয়া ছাড়া না আমরা পেট্রোল পেতাম, আর না পেতাম কেরোসিন, অ্যাসফল্ট (পিচ) অথবা প্লাস্টিক।
পাতন হলো বিভিন্ন তরল পদার্থের গলনাংকের ভিন্নতার প্রেক্ষিতে তাদের পৃথক করার একটি উপায় বা প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া ৮ম শতাব্দি থেকেই মুসলিমদের নিকট সুপরিচিত ছিল। গোলাপজল ও গাছগাছড়া থেকে তৈরি 'এসেনশিয়াল তেল' উৎপাদন ছিল এটার প্রথম ও সুবিদিত প্রয়োগ। পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মদ থেকে বিশুদ্ধ অ্যালকোহল সংগ্রহ করা হতো, যা প্রধানত অমুসলিম সম্প্রদায় ব্যবহার করতো, যেমন: মুসলিম শাসনাধীনে থাকা খ্রিস্টানগণ। জাবির ইবনে হাইয়ান শীতলীকরণের একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন, যা এটার পাতনে ব্যবহার উপযোগী ছিল। পাতনকৃত অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলের চূর্ণ তখন এসিড, নানা ধরনের ঔষধ, সুগন্ধি ও লেখার কালি উৎপাদনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হলেও পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো না, যেহেতু ইসলাম অ্যালকোহল ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
৮ম শতাব্দিতে জাবির ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি চোলাই পাতনযন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা আজকের দিনের পাতন ল্যাবরেটরিগুলোতে ব্যবহৃত হয়। এই যন্ত্র দ্রব্যকে শীতল করে এবং পাতন প্রক্রিয়ার সাহায্যে প্রয়োজনীয় তরল উপাদান সংগ্রহ করে।
রসায়নের অন্যান্য পরিভাষার মতো Alembic (অ্যালেমবিক) শব্দটি এসেছে আরবী 'আল-আমবিক' শব্দ থেকে যার অর্থ: 'পাতনযন্ত্রের মাথা'। চোলাই পাতনযন্ত্রে একটি টিউব দ্বারা দুটো গলাওয়ালা জগ সংযুক্ত থাকে। এই চোলাই পাতনযন্ত্রে জাবির ফুটন্ত মদ ও লবণ থেকে দাহ্য ভাপ বা বাষ্প বেরিয়ে আসতে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তার রসায়ন গ্রন্থে বলেন, "এবং বোতলের মুখে যে আগুন দগ্ধ করে, তার উৎস ফুটন্ত মদ ও লবণ এবং উত্তম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমজাতীয় জিনিস, যেগুলো তেমন একটা ব্যবহার উপযোগী মনে করা হয় না, কিন্তু এই শাস্ত্রে সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে।"
অ্যালকোহলের এই দাহ্য বৈশিষ্ট্য জাবিরের সময় থেকেই ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। ১৪শ শতাব্দির সামরিক প্রবন্ধগুলোতে দেখা যায় যে, সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র বা বিস্ফোরক উৎপাদনে বহুদিনকার আঙ্গুরের পাতিত মদ গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। এসব পাণ্ডুলিপিতে এই সতর্কবার্তা উল্লেখ করা হয় যে, এ ধরনের পাতিত দ্রব্যগুলো সহজেই জ্বলে ওঠতে পারে, তাই এসব দ্রব্য বালিতে পুতে রাখা যায়, এমন পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
আল-কিন্দী তার সুগন্ধি পাতনের জন্য সুবিখ্যাত ছিলেন। এসব বিবরণ তিনি তার প্রসিদ্ধ "কিতাবুল কিমিয়া আল-আতরী ওয়াল তাসয়ি' দাত" (সুগন্ধি ও পাতনের রসায়ন) গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ওই গ্রন্থে তিনি পাতন প্রক্রিয়াকে এভাবে বর্ণনা করেন, “এবং যে কেউ পানি ফোটানোর যন্ত্রের সাহায্যে মদ পাতিত করতে পারে, যেখানে তা গোলাপজলের মতো বর্ণ ধারণ করে। একইভাবে ভিনেগারেরও পাতন সম্ভব, যেখানে তা গোলাপজলের মতো বর্ণ ধারণ করে বেরিয়ে আসে।"
এসিডের ব্যাপারে এই ডায়াগ্রাম সতর্ক করছে। প্রাচীন দুনিয়া ভিনেগারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো এসিড সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো না। কিন্তু জাবির ইবনে হাইয়ানের আবিষ্কৃত এসিডগুলো রাসায়নিক পরীক্ষণের দরজা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করে।
মসৃণ রূপাকে পাতিত মদের সাথে চূর্ণ করে কীভাবে রুপার সাহায্যে লেখার উপকরণ প্রস্তুত করতে হয়, তা নিয়ে ৯০০ বছর পূর্বে তিউনিসিয়ার ইবনে বাদিস বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, "মসৃণ রুপা নিয়ে পাতিত মদসহ তা তিনদিন চূর্ণ করুন, এরপর তা রৌদ্রে উত্তপ্ত করুন এবং আবার তা রৌদ্রে উত্তপ্ত করতে থাকুন যতক্ষণ না তা নরম মাটির মতো হচ্ছে, অতঃপর পানি দিয়ে তা আলতোভাবে ধুয়ে ফেলুন।"
যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি, অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পান করা মুসলিমদের জন্য হারাম, কিন্তু তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর উপকারী ও ক্ষতিহীন উপাদানগুলো জনস্বার্থে ব্যবহার করা। অ্যালকোহলের এরূপ ব্যবহার ঔষধ শিল্প থেকে প্রসাধনী শিল্পে বিপুল পরিমাণ পণ্যের আবির্ভাব ঘটায়। এক হাজার বছর পূর্বে তাদের অধিকাংশ কাজেরই ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল এবং অন্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে আহরিত জ্ঞান ও তাদের স্বকীয় গবেষণা বহু নতুন পণ্য ও দ্রব্যের উদ্ভাবন সম্ভব করেছিল, যেমন: কালি, বার্নিশ, ঝালাই করার রঙ, সিমেন্ট এবং নকল মুক্তা।
গুরুত্বপূর্ণ যেসব পরীক্ষণ সংশ্লেষী রসায়নের সূচনা চিহ্নিত করেছিল, তাদের মধ্যে 'ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্য' হিসেবে মারকিউরিক ক্লোরাইড আহরণসংক্রান্ত আর-রাযীর পরীক্ষা অন্যতম, যা তিনি তার লবণ ও ফিটকিরির শ্রেণিবিন্যাস ও তৎসংশ্লিষ্ট গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেন। এরসাথে বর্তমানে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত মারকিউরিক ক্লোরাইডগুলোর আবিষ্কার আরও বহু সংশ্লেষী পদার্থের আবিষ্কারের পথ সুগম করে। অন্যান্য দ্রব্যকে ক্লোরিনায়িত করার ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্যের আবিষ্কার মাটি খুঁড়ে অনেক খনিজ এসিডের সন্ধান লাভে সহায়তা করে। রক্তক্ষরণ রোধকারী সঙ্কোচক, উদ্দীপক, দাহক ও জীবানুনাশক ঔষধ হিসেবে বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু ঊর্ধ্বপাতিত দ্রব্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে। বাণিজ্যিক রসায়ন ও ভারী রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষেত্রে মধ্যযুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হলো 'ফিটকিরি-ঘটিত' শিলা থেকে ফিটকিরির পৃথকীকরণ ও উৎপাদন। কাগজ প্রস্তুত, রঞ্জক ও সালফিউরিক এসিডের উৎপাদনে ফিটকিরি ব্যবহৃত হতো। সালফিউরিক ও হাইড্রোক্লোরিকের মতো এসিডগুলো মূলত জাবির ইবনে হাইয়ান আবিষ্কার করেছিলেন।