📄 গ্রন্থাগার ও বই বিপণন
বলা হয় যে, আব্বাসী খলীফা আল-মামুন গ্রিক থেকে আরবী ভাষায় অনুবাদ করা প্রতিটি গ্রন্থের জন্য ওই গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ অনুবাদকদের পারিশ্রমিক হিসেবে দান করতেন। এ ধরনের ঔদার্য বইয়ের বিপুল সরবরাহের পথ প্রশস্ত করে, যা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পরবর্তী প্রজন্মের সবার নজর এবং সম্মান আদায় করে। আব্বাসী খিলাফতকালে শত শত গ্রন্থাগার গড়ে উঠে, যার অধিকাংশই ছিল ব্যক্তি মালিকাধীন, আর এভাবেই শত-হাজার গ্রন্থ পাঠকদের নিকট সহজলভ্য হয়ে পড়ে।
জ্ঞানের এসব শাখায় এত পুস্তকের বিস্তৃতির পূর্বে ৭ম শতাব্দিতে মুসলিমদের নিকট কেবল একটি গ্রন্থই ছিল কুরআন। কুরআনের ওহী নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর নিকট আয়াত হিসেবে নাযিল হয়। নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বহু সাহাবা মুখস্ত করে ফেলতেন এবং ওহী লেখকগণ সহজলভ্য লেখনী উপাদান, যেমন: পাতা, বস্ত্র, হাড় ও পাথরে ওই আয়াতগুলো লিখে রাখতেন। পরবর্তীতে ওহী নাযিলের ধারা সমাপ্ত হলে আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক গোটা কুরআন তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। কুরআনের বিন্যাসে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নবী (ﷺ) এটার সংরক্ষণে কোনো ঘাটতি রাখেননি। কুরআন মুখস্ত করা এবং অন্যদের তা শেখানোর এক জীবন্ত কালচার তিনি তার অনুসারীদের মাঝে জন্ম দিতে সফল হয়েছিলেন, যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকলেই অংশ নিয়েছিল। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য মোতাবেক কুরআন মুখস্তে নেমে পড়ে কেউ পুরো কুরআন, কেউ অর্ধেক, কেউ এক তৃতীয়াংশ। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থানান্তরিত হতে থাকে মৌখিক কুরআন, ইসলামী পরিভাষায় যা কিরাতে আম্মা। এজন্যই কুরআন লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপির মুখাপেক্ষী নয়, বরং লিখিত কুরআন কিরাতে আম্মা বা সর্বসাধারণের কিরাতের মুখাপেক্ষী। এ যেন বর্তমান সময়ের অডিও বুক (Audio Book)-এর মানবীয় সংস্করণ, যা বয়ে বেড়াচ্ছে হাজারো থেকে লাখো হাফিজ। সংরক্ষণের এ প্রক্রিয়া সত্যই অভূতপূর্ব।
পরবর্তীতে ইসলামের তৃতীয় খলীফা উছমান ইবনে আফফান (রা.) প্রস্তুত করেন কুরআনের একটি আদর্শ নুসখা। তার এই কাজের ফলশ্রুতিতে আরবী ভাষার পঠন ও লেখনীতে প্রমিতকরণের পথ প্রশস্ত হয় এবং এর মাধ্যমে কুরআনের বিস্তৃতি বেশ সহজ হয়ে উঠে। দুনিয়ার বড় বড় গ্রন্থাগারে আজও প্রায় ১৪০০ বছরের পুরানো উছমান (রা.)-এর সময়কালের পাণ্ডুলিপির নকল পাওয়া যায়।
গ্রন্থ ও পুস্তকাদির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বাভাবিক মানে দাঁড়াচ্ছে: মুসলিমগণ বই-পুস্তক সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার কাজকেও ভালোবাসে। বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধাসম্পন্ন এসব সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগার এবং সেইসাথে বহু স্বনামধম্য ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা মুসলিম বিশ্বের দূর-দূরান্তের পণ্ডিতদের আকর্ষণ করেছিল। এসব গ্রন্থাগারে উন্নতমানের কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় লেখাসমৃদ্ধ এবং চামড়ায় বাঁধানো বিভিন্ন আকারের বই ও পাণ্ডুলিপি ছিল।
৭৩২ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার তিউনিসে যাইতুনা মসজিদভিত্তিক কলেজ কমপ্লেক্সটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩শ শতাব্দিতে এই গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখ্যা ১০০,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
"যতক্ষণ আপনার নীরবতা প্রয়োজন, বই ততক্ষণ নীরব থাকে; যখন আলোচনায় মশগুল হতে চান, তখন তা সরব হয়ে উঠে। বই কখনো আপনার ব্যস্ততাতে বিঘ্ন ঘটায় না; কিন্তু যখনি আপনি নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন, তখন বই হয়ে উঠে আপনার সব থেকে ভালো সঙ্গী। বইয়ের মতো বন্ধু না কখনো প্রতারণা বা তোষামোদের পথ বেছে নেয়, আর না কখনো আপনার ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।"
আজ-জাহিয, ৮ম শতাব্দীর ইরাকের বসরার মুসলিম দার্শনিক ও বিদ্বান
বইয়ের সরকারি সংগ্রহশালাগুলো এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, এমন একটি মসজিদ, শিক্ষালয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল, যেখানে বইয়ের কোনো সংগ্রহশালা ছিল না। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলদের দ্বারা বাগদাদের পতনের আগ পর্যন্ত এই নগরীতে ৩৬-টি গ্রন্থাগার এবং কয়েক শ'য়ের উপর গ্রন্থ ব্যবসায়ী ছিল, যাদের অনেকেই ছিল প্রকাশক এবং যাদের অধীনে অনুলিপিকারদের দল কাজ করতো। কায়রো, আলেপ্পো, ইরানের বৃহৎ শহরগুলো, মধ্য এশিয়া এবং মেসোপটেমিয়াতে এ ধরনের বহু গ্রন্থাগার ছিল।
মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগারগুলোকে দারুল কুতুব বলা হতো এবং এগুলো ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। লেখক ও বিদ্বানগণ এখানে তাদের গবেষণার ফলাফল যুবক, পণ্ডিত ও সাধারণ শ্রোতাদের মিশ্র সমাবেশে তুলে ধরতেন। এ ধরনের আলোচনা সভায় যেকেউ অংশ নিতে পারতো। পেশাদার ওরাক্ব (নুস্সাখ) বা অনুলিপিকারগণ অতঃপর আলোচনার বিষয়বস্তুকে নকল করে গ্রন্থ বানিয়ে ফেলতেন। এমনকি সরকারিভাবে যখন গ্রন্থ লেখার দায়িত্ব দেয়া হতো, তখনও তা এভাবে প্রকাশিত হতো।
সিরিয়ার আলেপ্পো নগরেই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগার ছিল। দশ হাজারেরও অধিক পুস্তকে সমৃদ্ধ সায়ফিয়া নামে সুবিদিত এই গ্রন্থাগার সুবিশাল উমাইয়া মসজিদে অবস্থিত ছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনা মোতাবেক এই গ্রন্থগুলো শহরের বিখ্যাত শাসক সাইফুদ্দোলা উইল করে দান করেন।
সায়ফিয়া যেমন ছিল সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ, তেমনিভাবে তিউনিসের যাইতুনা মসজিদ কমপ্লেক্স ছিল সম্ভবত সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এতে লাখের কাছাকাছি পুস্তক ছিল এবং বলা হয় যে, হাবশী সাম্রাজ্যের অধিকাংশ শাসক এই গ্রন্থাগার রক্ষণাবেক্ষণ ও সমৃদ্ধকরণকে মর্যাদার ইস্যুতে পরিণত করেন এবং এ ব্যাপারে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতো। এক পর্যায়ে এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ১০০,০০০-কেও ছাড়িয়ে যায়।
৮ম শতাব্দীর মুসলিম দার্শনিক ও বিদ্বান আল-জাহিয ৫০ বছরের অধিক সময় অধ্যয়ন এবং ২০০-এরও অধিক গ্রন্থ রচনায় অতিবাহিত করার পর বাগদাদ থেকে নিজ বাড়ি বসরাতে প্রত্যাবর্তন করেন। তার এই বিস্তৃত লেখনীর মাঝে "কিতাবুল হাইওয়ান” (প্রাণিজগৎ) উল্লেখযোগ্য, যেখানে তিনি পিঁপড়াদের সামাজিক ব্যবস্থা, পশুপাখির মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং খাদ্যচক্র ও পরিবেশের প্রভাব পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা তুলে ধরেছেন। তার অন্যান্য গ্রন্থের মাঝে রয়েছে "আল-বয়ান ওয়াত তাবইয়ীন” (অলংকার ও বক্তব্য উপস্থাপন) এবং "কিতাবুল বুখালা” (কৃপণতা)। বস্তুত তিনি যথাযথ মৃত্যুই বরণ করেন; ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ৯২ বছর বয়সে নিজের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে অধ্যয়নকালে এক স্তুপ বই তার উপর পড়লে তিনি সেখানেই মারা যান।
গ্রন্থপ্রেমীদের মাঝে একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠে। মারা যাওয়ার পূর্বে তারা তাদের সংগৃহিত পাণ্ডুলিপিগুলো যে সংখ্যা কখনো হাজারও ছাড়িয়ে যেত – মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগারগুলোতে দান করে দিতেন, যেন সবাই তার সংগ্রহশালা থেকে উপকৃত হতে পারে। ঐতিহাসিক আল-জাবুরী বলেন, তুর্কি বংশোদ্ভূত নায়লা খাতুন নামের এক বিত্তশালী বিধবা নারী তার পরলোকগত স্বামী মুরাদ এফেন্দির নামে একটি মসজিদ গড়ে তোলেন, যার সাথে একটি বিদ্যালয় ও গ্রন্থাগার সংযুক্ত ছিল। ভ্রমণরত বিদ্বানদের কাছ থেকে গ্রন্থের আরেকটি সরবরাহ আসতো, বস্তুত মসজিদ কর্তৃক আয়োজিত
উমাইয়া গ্রন্থাগার
স্পেনের উমাইয়া শাসকদের অধীন কর্ডোবা গ্রন্থাগারে ৬০০,০০০-এরও অধিক পুস্তক ছিল। ৯৬১ থেকে ৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্পেন শাসন করা খলীফা দ্বিতীয় আল-হাকিমের জন্য পুস্তকের সান্নিধ্য এতটাই প্রিয় ছিল যে, বলা হয়, "সিংহাসনের চেয়ে পুস্তকের সান্নিধ্যই তাকে বেশি বিভোর করে রাখতো।”
বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও মনিহারী দ্রব্যের সরবরাহের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা মসজিদে গ্রন্থ ও পুস্তকাদি দান করে দিতেন। গ্রন্থাগারগুলোও বিশাল আয়োজনসমৃদ্ধ হতো। ১০ম শতাব্দির ইরানের শিরাজে অবস্থিত এসব কমপ্লেক্সের বিবরণ ঐতিহাসিক আল-মুকাদ্দিসী এভাবে দেন, "হ্রদ ও পানির নালাসহ ভবনগুলো বাগান দ্বারা বেষ্টিত ... সুউচ্চ গম্বুজ, উপর ও নিচ তলাসহ ... মোট ৩৬০-টি কামরা ... প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে ক্যাটালগ (গ্রন্থ তালিকা) তাকের উপর সাজানো ... কক্ষগুলো গালিচা দ্বারা সুসজ্জিত।" শিরাজ, কর্ডোবা ও কায়রোর গ্রন্থাগারগুলোর মতো কিছু কিছু গ্রন্থাগার মসজিদ ভবন থেকে পৃথক ছিল। ভবনগুলো বেশ প্রশস্ত এবং বই-পুস্তকাদি জমা করে রাখার সুসজ্জিত গ্যালারি, পাঠকক্ষ, পাণ্ডুলিপি থেকে অনুলিপি তৈরির কামরা ও সম্মেলন কক্ষসহ নানা উদ্দেশ্যে এই ভবনগুলো ব্যবহৃত হতো। গালিচা, মাদুর ও বসার গদিসহ এ সমস্ত কামরা পর্যাপ্ত আলোকসজ্জিত ও আরামদায়ক হতো। আজকের দিনের গ্রন্থাগারগুলোর মতোই এক হাজার বছর আগের সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকদের সুবিধার্থে পুস্তকের শ্রেণিবিন্যাস ও নির্ভুল ক্যাটালগিং ব্যবস্থাসহ বেশ উচ্চমানের বিন্যাস ব্যবস্থা ছিল। বই-পুস্তকাদি ও নথিপত্রের সংখ্যা ও গুণগত মানের উপর লাইব্রেরিয়ান বা গ্রন্থাগারিকের নিয়ন্ত্রণ থাকতো। ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কায়রোর আল-আযহার গ্রন্থাগারের পুস্তক সংগ্রহের সংখ্যা ১২০,০০০-কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং সেগুলোর ক্যাটালগই ছিল ৬০ খণ্ডে প্রায় ৩,৫০০ পৃষ্ঠার মতো। বলা হয়, স্পেনের আল-হাকিম গ্রন্থাগারের ক্যাটালগ প্রায় ৪৪ খণ্ডের ছিল। গ্রন্থাগার দেখভালের জন্য গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেয়া হতো, যা খুবই সম্মানজনক পদ ছিল এবং এই পদ শুধু শ্রেষ্ঠ বিদ্বানদের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। যারা 'অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর' রাখতেন কেবল তারাই গ্রন্থাগার ও জ্ঞানের জিম্মাদার (রক্ষক) ও তত্ত্ববধায়ক হিসেবে বিবেচিত হতেন। ১২শ ও ১৩শ শতাব্দির দিকে উত্তর আফ্রিকার আলমোহাদ রাজত্বকালে সর্বাধিক প্রাধিকারযুক্ত রাষ্ট্রীয় পদগুলোর মাঝে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা অন্যতম ছিল। এ সকল গ্রন্থাগার ছিল অপরিহার্য জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ধারক, যেমনটি ১৯শ শতাব্দির মার্কিন লেখক রাল্ফ ওয়ালদো এমারসন বলেন, "বাছাই করা সবচেয়ে ছোট একটি গ্রন্থাগারে আপনি কী পাবেন, তা একবার চিন্তা করুন। (এখানে আপনি) সকল সভ্য দেশের হাজার বছরের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধজনের সান্নিধ্য (বইয়ের মাঝে) পাবেন এবং তাদের শিক্ষা ও প্রজ্ঞার প্রাপ্তিসমূহকে সবচেয়ে সুবিন্যস্ত আকারে পাবেন... আমাদের ন্যায় ভিন্ন সময় ও কালের মানুষজনের নিকট (তাদের এসব কীর্তি) বোধগম্য ভাষায় লিখিত আছে।" জ্ঞানের বিকাশে বই বিপণীর বিশেষ অবদান ছিল। ১০ম শতাব্দির গ্রন্থানুরাগী ও বই বিক্রেতা ইবনে নাদিমের প্রসিদ্ধ বই বিপণীটি বৃহদাকার ভবনের উপর তলায় অবস্থিত ছিল, যেখানে খরিদদারগণ পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশ্রাম নেয়া এবং ভাবের আদান-প্রদানের জন্য একত্র হতেন। এক হাজার বছর পূর্বে মুসলিম বিশ্বে সরকারি ও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের পাশাপাশি শতাধিক শিরোনামের পুস্তকসমৃদ্ধ বইয়ের দোকানেরও কমতি ছিল না। আরবী ওয়ারাক্ব বা কাগজ শব্দটি আসলে ওয়াররাক্ব পেশা থেকে এসেছে। এই ওয়াররাক্ত উপাধি কাগজ বিক্রেতা, লেখক, অনুবাদক, অনুলিপিকার, বই বিক্রেতা, গ্রন্থাগারিক এবং সমাজের আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। চীন থেকে মুসলিম বিশ্বে কাগজ তৈরির শিল্পের সূচনার পরপরই ওয়াররাক্বীন পেশাটির সূচনা হয়েছে বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়। বাগদাদই সম্ভবত প্রথম বড় শহর, যেখানে প্রথমবারের মতো ওয়াররাক্বী বই বিপণন চালু হয় এবং কাগজ উৎপাদনের বিস্তৃতির সাথে সাথে বইয়ের দোকানের সংখ্যা মুসলিম বিশ্বে নাটকীয় হারে বৃদ্ধি পায়। ১২শ শতাব্দির মরক্কোর মারাকেশের একটি প্রদেশে যেসব বই বাঁধাইকারী বা বইয়ের সওদাগর নিজেদের বই বিপণী ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি লেখক ও অনুলিপিকারদের নিয়োগ দিতেন, তাদের বোঝানোর জন্য মরক্কোতে কুতুবিয়্যুন নামটি ব্যবহৃত হতো। এই প্রদেশে রাস্তার দুপাশে ৫০টি করে মোট ১০০-টি বই বিপণী ও গ্রন্থাগার ছিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইয়াকুব আল-মানসূরের শাসনামলে একেবারে চূড়ায় আরোহণ করে, যিনি বই বাঁধাই শিল্পের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা এবং বই-পুস্তক পাঠের মনোবৃত্তিতে বেশ উৎসাহ জুগিয়েছেন।
📄 জ্ঞানের অনুবাদ
ইউরোপ তখন অন্ধকারে - অন্যদিকে মুসলিম বিজ্ঞানী ও বিদ্বানদের আবিষ্কার, নব উদ্ভাবন, গবেষণা ও লেখনীর লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, জ্ঞানের জন্য তাদের ছিল অনিবারণযোগ্য তৃষ্ণা। আর সেটা কেবল জ্ঞানের স্বার্থে জ্ঞান শেখা নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ছিল ব্যবহারিক প্রয়োজন এবং মানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য নিবেদিত।
জ্ঞানের প্রতি এই অদম্য স্পৃহার পিছনে রয়েছে নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর আধ্যাত্মিক প্রেরণা। কেননা তিনি (ﷺ) বলেন, "যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন তিনটি জিনিস ব্যতীত তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়: সাদাকায়ে জারিয়া (এমন দান, যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়), ওই জ্ঞান - যা মানুষকে উপকৃত করে; এবং পুণ্যবান সন্তান - যে তার জন্য দু'আ করে।"
বিশ্বকোষতুল্য মুসলিম মহামনীষীগণ তাদের অনুসন্ধানসমূহ লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর উদ্যম প্রদর্শন করেন এবং এর মাধ্যমে তারা যুগান্তকারী তথ্যে সমৃদ্ধ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন, যার প্রতিটি ছিল সুবিশাল। গ্রন্থসমূহ হাজারের পর হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যেত, খণ্ডের পর খণ্ডে বিস্তৃত হতো গ্রন্থের পরিসর এবং এসব পূর্ণ করে ফেলতো গ্রন্থাগারের সব তাক। ৮ম থেকে ১৩শ শতাব্দি পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম সভ্যতার সোনালি যুগ প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কেবল বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেনি, বরং সংযোজন ও সংশোধন, নয়া আবিষ্কার ও প্রচারের মাধ্যমে সেগুলোকে আরও সমৃদ্ধ ও নয়া আকার দান করে। জ্ঞান শেখা এবং তা-র সংগ্রহে মুসলিম কীর্তি সম্পর্কে জানতে হলে আপনি এই গ্রন্থের বায়তুল হিকমা অধ্যায়ে চলে যেতে পারেন।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই সমৃদ্ধ উপলব্ধির একেবারে কেন্দ্রে ছিল সরাসরি প্রত্যক্ষকরণের ধারণা। কোনো কিছু ঠিক মতো কাজ করছে কিনা, তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হচ্ছে: নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করা এবং কেবল এর পরেই আপনি তা লিখতে সক্ষম হবেন। ১০ম শতাব্দির শেষভাগে ইবনুল হাইছাম তার পরীক্ষণ সম্পূর্ণ অন্ধকার কক্ষে পরিচালনা করেন। ইবনুল হাইছাম ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম প্রথম ব্যক্তি, যিনি পরীক্ষণের মাধ্যমে তার তত্ত্ব বা থিওরি যাচাই করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি সকল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরশপাথর 'তুমি যা বিশ্বাস করো, তা প্রমাণ করো' প্রতিষ্ঠা করেন। আপনি তার এবং তার পরীক্ষণ সম্পর্কে এই গ্রন্থের প্রথম বিভাগের দৃষ্টিশক্তি ও ক্যামেরা অধ্যায়ে আরও আলোচনা পাবেন।
জ্ঞানের প্রতি এই পিপাসা ছিল অনেকটা সংক্রমক রোগের ন্যায় সদা বিস্তৃতশীল, যার শাখা-প্রশাখা সমুদ্রের অতল গভীরে পৌঁছে ছিল। বহু শাস্ত্রে পারদর্শী মুসলিম পণ্ডিতদের পরীক্ষণের উপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বকোষ ভবনতুল্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের নয়া ইমরাত থেকে উপকৃত হতে ঝাঁকে ঝাঁকে অমুসলিমরা মুসলিম বিশ্বে পাড়ি জমায়।
"বিচার দিবসে আদম সন্তানের পা এক চুলও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে: কীভাবে সে তার জীবন ব্যয় করেছে, কীভাবে সে তার যৌবন অতিবাহিত করেছে, কোথা থেকে সে তার সম্পদ আহরণ করেছে ও কীভাবে সে ওই সম্পদ ব্যয় করেছে এবং সে তার জ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করেছে।" - নবী মুহাম্মদ (ﷺ), সুনান তিরমিযী
১১৪০ খ্রিস্টাব্দে নরফোকের কর্মচাঞ্চল্যহীন এক গ্রামে জন্ম নেয়া ইংরেজ ধর্মযাজক ও বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল মোরলী জ্ঞানের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন ইউরোপীয় উদারমনা ও প্রগতিশীল ভাবনার এক চিন্তানায়কের নমুনা, যিনি তার মেধা ও মননকে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা বিকশিত করেছিলেন।
ড্যানিয়েল মোরলী খুব সম্ভবত বাথ-নিবাসী অ্যাডেলার্ডের ছাত্র ছিলেন, যিনি ভবিষ্যৎ রাজা দ্বিতীয় হেনরির কাছে লিখে পাঠান যে, "লাতিন ভাষায় রচিত লেখনীগুলো সতর্কতার সাথে পাঠ করা এবং উপলব্ধিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন না,... বরং গোলক, বৃত্ত এবং গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের ব্যাপারে আরবদের মতামত উপলব্ধির ব্যাপারেও মনোযোগী হন। আপনিই তো বলেন, যে জন্ম নিয়েছে এবং দুনিয়ার এই বৃহৎ মঞ্চে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু সে যদি জগতের সৌন্দর্যের পিছনের কারণ অনসুন্ধান না করে, তবে সে এই জগতের রঙ্গ-মঞ্চের উপযুক্ত নয় এবং তাকে এখান থেকে বের করে দেয়া উচিত...। আর তাই পৃথিবী ও তার উপাদানের ব্যাপারে আরবীতে যা কিছুই আমি শিখি না কেন, তা আমি লাতিন ভাষায় লিপিবদ্ধ করবো।"
নিজের শিক্ষাকে বিস্তৃত করার মানসে অন্যসব তরুণ শিক্ষার্থীর মতো ড্যানিয়েল তার নিজ জন্মভূমি ইংল্যান্ড ত্যাগ করে পূর্বে অগ্রসর হয়ে প্রথমত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তার ভাষ্য মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় 'একটি জরাজীর্ণ ও মৃতপ্রায়' প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং এখান থেকে দ্রুত বিদায়ের প্রহর তিনি গুণছেন। তিনি বলেন, "প্যারিসের শিক্ষকগণ এতটাই অজ্ঞ যে, তারা মূর্তির ন্যায় নিথর দাঁড়িয়ে থাকে এবং নীরবতার মাধ্যমে তারা প্রজ্ঞার কারিশমা দেখানোর একটা ভান ধরে।"
তাহলে প্রশ্ন হলো, তিনি কোথায় গিয়েছিলেন? বেশ ভালো প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন এভাবে, "এই দিনগুলোতে টলেডোর আরবী শিক্ষার সুনাম ও কদর যেহেতু সর্বত্র, তাই আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বিজ্ঞ দার্শনিকদের কাছে শেখার জন্য দ্রুত সেখানে ছুটে গেলাম।" ১২শ শতাব্দির টলেডোতে কম করে হলেও তিনটি সংস্কৃতি পাশাপাশি বসবাস করতো: মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি। এটা সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতার এমন এক সময় ছিল, যেখানে সকলে শ্বাসরুদ্ধকরভাবে জ্ঞানের পিপাসায় কাতর ছিল।
১২শ শতাব্দির টলেডোতে সম্ভবত বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল। যা পশ্চিমা খ্রিস্টান বিশ্বের অগণিত পণ্ডিত ও অনুবাদককে আকর্ষিত করে। পশ্চিমা বিশ্বে গ্রিক দার্শনিক ও গণিতজ্ঞদের হারিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ লেখনীগুলো মুসলিমদের দ্বারা টলেডোতে আসে, সংরক্ষিত হয় এবং মুসলিমগণ গবেষণার দ্বারা সেগুলোর উৎকর্ষ সাধন করে। পশ্চিমা মহলে অ্যাভেরস নামে পরিচিত ইবনে রুশদের করা এরিস্টটলের পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা ছিল ইউরোপের ধ্রুপদী জাগরণের সত্যিকার সূচনা, যা ইউরোপীয় রেনেসাঁ শুরুর ২০০ বছর পূর্বে সংঘটিত হয়।
"টলেডোর আসল রত্ন শহরের গ্রন্থাগারগুলোতে খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে তিন সম্প্রদায় অর্থাৎ মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি অনুবাদের সাথে জড়িত ছিল। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের সমন্বয়ে গঠিত দল প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর আরবী অনুবাদ সম্পন্ন করতো এবং এরপর তারা সেগুলো ক্যাস্টেলান স্প্যানিশ ও লাতিন ভাষায় রূপান্তর করতো। এমন কাজের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বোঝানোর জন্য আন্দালুসীয় শব্দ কসভিভেনসিয়া (Convivencia) ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ: একত্রে বসবাস।"
রাগেহ উমর, An Islamic History of Europe শীর্ষক বিবিসি'র প্রামাণ্যচিত্র।
যদিও টলেডো গির্জার আর্কাইভে থাকা হাজার হাজার আরবী পাণ্ডুলিপি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল, তথাপি এই গির্জাতে ড্যানিয়েল মোরলীর ১২শ শতাব্দী সময়কালের প্রায় ২৫০০ এর মতো আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুদিত পাণ্ডুলিপি অক্ষত রয়ে গেছে।
১২শ শতাব্দির শেষের দিকে লিখিত ইবনে রুশদ কর্তৃক রচিত এরিস্টটলের ব্যাখ্যা ও সারসংক্ষেপ গ্রন্থগুলোর লাতিন ভাষায় অনুবাদ শুরু করেন স্কটল্যান্ডের পণ্ডিত মাইকেল স্কট এবং তার মৃত্যুর পর ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে তার শিষ্য হারমান দ্য জার্মান এই কাজ সমাপ্ত করেন।
টলেডো ও সিসিলি শহরে করা এই লাতিন অনুবাদগুলো ইউরোপের ভাগ্য বদলে দেয়। "ইবনে রুশদ হয়তো প্যারিসকে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী হিসেবে বেছে নিতেন... ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাঝে আপাত যে দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয় তিনি তা প্রশমনের চেষ্টা করছিলেন। কেননা বিজ্ঞানের মাধ্যমে যে সত্য উদ্ভাসিত হয়, প্রায়শই তা ধর্মগ্রন্থে নাযিল হওয়া সত্যের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ায়। তার এই প্রচেষ্টা বিপরীতফল নিয়ে আসে, যখন তার ধারণাগুলো খ্রিস্টান গির্জাগুলোর দৃষ্টিগোচর হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তারা ইবনে রুশদ ও এরিস্টটলের লেখাগুলো নিষিদ্ধ করে। প্যারিসের বুদ্ধিজীবীগণ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং এই দ্বন্দ্ব বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে" - রাগেহ উমর, An Islamic History of Europe শীর্ষক বিবিসি প্রামাণ্যচিত্রে এই মন্তব্য করেন।
মাইকেল স্কট ও হারমান দ্য জার্মানের সাথে সাথে পুরো টলেডো শহর তৎকালের অনুবাদবিদদের দ্বারা মুখরিত ছিল। এদের মাঝে ক্রিমোনার জেরার্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যিনি আয-যাহরাবীর ৩০-খণ্ডের চিকিৎসা বিশ্বকোষ, ইবনুল হাইছামের আলোকবিজ্ঞানের উপর লিখিত বৃহদাকার "আল-মানাযির", আল-কিন্দীর আলোকবিজ্ঞানের উপর লিখিত প্রবন্ধ, আর-রাযীর লবণ ও ফিটকিরি (সালফেটের) শ্রেণিবিন্যাস এবং বনী মূসা ভাইদের জ্যামিতি বিষয়ক গ্রন্থাদি অনুবাদ করেন। ক্রিমোনার জেরার্ডের বিষয়টি আশ্চর্যকর ছিল যে, আরবী ভাষার উপর পূর্ণ দখলদারিত্ব না থাকা সত্ত্বেও তিনি ৮০-টির বেশি গ্রন্থের অনুবাদ সম্পন্ন করেন। মূলত তিনি স্থানীয় মোজারাব ও স্প্যানিশ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর করে এই কাজগুলো শেষ করেন, যেহেতু তারা আরবী ভাষা জানতো।
বিবিসি'র Voices from the Dark অনুষ্ঠানে বলা হয়, "(অনুবাদের) এই প্রক্রিয়া অনুবাদ থেকে অনুবাদে ভিন্ন হতো। অনুবাদের এই কাজ কখনো আরবী মাতৃভাষার স্থানীয় লোকদের সাহায্যে সম্পন্ন করা হতো। আরবী জানা স্থানীয় ওই লোক আরবী ও আধুনিক স্প্যানিশ ভাষার পূর্ববর্তী রোমান্স (Romance) ভাষায় পারদর্শী মধ্যবর্তী অনুবাদকের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বই পাঠ করতেন। এরপর রোমান্স (Romance) অনুবাদ লাতিন ভাষায় রূপান্তর করা হতো। কোনো কোনো অনুবাদক একাই এই কাজ সম্পন্ন করতে পারতেন, যেহেতু ৩-টি ভাষার উপর তার দক্ষতা ছিল।"
ষষ্ঠ আলফোনসোর দ্বারা টলেডো শহরের পুনর্নিয়ন্ত্রণ খ্রিস্টানদের হাতে চলে গেলেও শহরটি এই অর্থে মুসলিম থেকে যায় যে, এর লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা বা যোগাযোগের প্রধান ভাষা তখনও আরবী ছিল, যাতে মুসলিম, ইহুদি ও মোজারাব সম্প্রদায়ের লোকেরা কথা বলতো; সমাজ, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ছিল মুসলিম ঘরানার এবং স্থাপত্যগুলো ছিল ইসলামী ধাঁচের। লম্বা বেষ্টনীর সরু রাস্তাগুলো সদ্য পৌঁছানো অনুবাদকদের অধ্যয়ন ও অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য কক্ষের ব্যবস্থা করে দিতো। পশ্চিমা পণ্ডিতদের জন্য টলেডো তীর্থস্থানের মতো ছিল।
টলেডোতে করা লাতিন অনুবাদগুলোর পাণ্ডুলিপি আজও টলেডোর প্রধান গির্জার আর্কাইভে সংরক্ষিত। সেখানে প্রায় ২৫০০ এর মতো পাণ্ডুলিপি রয়েছে, যাতে ড্যানিয়েল মোরলীর সময়কালের আরবী অনুবাদও অন্তর্ভূত আছে।
📄 গণিত
বেশ কয়েকটি গাণিতিক ধারণা রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে বলা হয়, এগুলো ১৬শ, ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দির ইউরোপীয় পণ্ডিতদের বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা ও গবেষণার ফসল। কিন্তু অধ্যয়ন ও পাণ্ডুলিপি উদঘাটনের মাধ্যমে আমরা অবগত যে, ১০০০ বছর পূর্বের মুসলিম গণিতবিদগণ চরম অধ্যবসায়ের সাথে তাদের গবেষণায় রত ছিলেন। গণিতবিদদের একটা বিরাট অংশ আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের ইরাক বা ইরান অঞ্চল থেকে এসেছিলেন, যে সময় বায়তুল হিকমা ছিল বাগদাদের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক একাডেমি। বায়তুল হিকমা সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে এই বিভাগের বায়তুল হিকমা অধ্যায় ঘুরে আসতে পারেন।
গণিতের ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য সময়ের সূচনা হয় আল-খাওয়ারিযমীর হাত ধরে, যখন তিনি বীজগণিতের প্রস্তাবনার সাথে দুনিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেন। আল-खাওয়ারিযমীর দেয়া এই নতুন ধারণার গুরুত্ব যে কত, তা উপলব্ধি করাটা অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল জ্যামিতি-নির্ভর গণিতের গ্রিক ধারণা থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক বৈপ্লবিক প্রয়াস।
বীজগণিত মূলত একটি একত্রকরণ থিওরি, যা মূলদ সংখ্যা, অমূলদ সংখ্যা ও জ্যামিতিক বিস্তার - এদের সবগুলোকে বীজগাণিতিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এটা গণিতকে নতুন এক মাত্রা দান করে এবং এমন একটি পথ তৈরি করে, যা পূর্বের ধারণা বা তত্ত্বের তুলনায় অধিকতর প্রশন্ত এবং এটা ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির পথ সুগম করে। বীজগাণিতিক ধারণাগুলোর আবির্ভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এটা গণিতকে এমনসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ার পথ করে দেয়, যা পূর্বে অসম্ভব ছিল।
আল-খাওয়ারিযমীর পর বীজগণিতের এই আলোকবর্তিকা হাতে তুলে নেয় তার উত্তরসূরি ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া আল-কারাজী। মনে করা হয়, তিনি-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বীজগণিতকে জ্যামিতিক অপারেশন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করেন এবং সেখানে তিনি পাটিগণিতিক ধাঁচের অপারেশন জুড়ে দেন। আর এই পাটিগণিতিক ধাঁচই আজকের দিনের বীজগণিতের প্রধান অংশ। তিনিই সর্বপ্রথম x, x², x³... এবং 1/x, 1/x², 1/x³... একপদী রাশিগুলোর সংজ্ঞা এবং এদের যেকোন দুটোর গুণফলের নিয়ম বা ফর্মুলা প্রদান করেন। তিনি বীজগণিতের একটি ধারার সূচনা করেন, যা কয়েক শতাব্দি ধরে বিকশিত ছিল।
দুইশত বছর পর ১২শ শতাব্দির পণ্ডিত আল-কারাজীর গাণিতিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আস-সামাওয়াল বীজগণিতের যথাযথ সংজ্ঞা প্রদান করেন, "(বীজগণিত) সকল গাণিতিক পন্থার আশ্রয় নিয়ে অজানাকে নিয়ে কাজ করে, যেমনিভাবে অঙ্কশাস্ত্রবিদ জানাকে নিয়ে কাজ করে।"
বীজগণিতের গল্পগাথায় পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কীর্তিনায়ক হলেন কবি উমর আল-খাইয়্যাম। উমর খাইয়্যাম নামে সমধিক পরিচিত এই পণ্ডিত ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কৌণিক ছেদগুলোর পারস্পরিক বিভক্তিকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্যামিতিক সমাধানের ঘন সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিবিন্যাস প্রদান করেন। তিনি ঘন সমীকরণের বীজগাণিতিক সমাধানের পূর্ণ বিবরণ প্রদানের আশা করেছিলেন এবং বলেন, "যদি সুযোগ আসে এবং আমি সফল হই, তবে আমি এই ১৪ গঠন এবং সেই সাথে তাদের সকল শাখা-প্রশাখা ও অবস্থা এবং সম্ভাব্য ও অসম্ভাব্যের মাঝে কীভাবে পার্থক্য করতে হয়, তা নিয়ে আলোচনা করে একটি পুস্তিকা প্রস্তুত করবো, সেখানে এই শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় উপাদান শামিল থাকবে।"
১২শ শতাব্দিতে আস-সামাওয়াল যখন আল-কারাজীর গাণিতিক ধারার চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন, শারাফুদ্দীন আত-তুসী তখন উমর খাইয়্যাম কর্তৃক জ্যামিতিতে বীজগণিতের প্রয়োগের ধারাটি অনুসরণ করে যাচ্ছিলেন। তিনি ঘন সমীকরণের উপর প্রবন্ধ লিখেন এবং সেখানে উল্লেখ করেন, "(বীজগণিত) অন্য আরেকটি শাখায় মৌলিক অবদান রাখে, যা-র উদ্দেশ্য সমীকরণের মাধ্যমে বক্র রেখার অধ্যয়ন।" আর এর মাধ্যমে বীজগাণিতিক জ্যামিতির নতুন ধারা উন্মোচিত হয়।
বীজগণিত হলো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে মুসলিম গণিতবিদগণ এর ক্রমবিকাশের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। ৯ম শতাব্দির বাগদাদের বায়তুল হিকমাতে বনী মূসা ভাই নামে পরিচিত তিন ভাইয়ের একটি দল ছিল। গৃহ বিভাগে আপনি বনী মূসা ভাইয়েরা কীভাবে নানা ধরনের ট্রিক ডিভাইস তৈরি করেছিল, তা সম্পর্কে জেনেছেন। তারা সহজাত প্রতিভাসম্পন্ন গণিতবিদ ছিলেন এবং ৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া সাবিত ইবনে কুরা ছিলেন তাদের একজন শিক্ষার্থী। সংখ্যাতত্ত্বে তার অবদানের জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত, যেখানে তিনি চমৎকার একটি উপপাদ্য উদ্ভাবন করেন, যা তাকে কয়েক জোড়া সমভাবাপন্য সংখ্যা (Amicable numbers) আবিষ্কারে সফল করে।
সমভাবাপন্য সংখ্যাগুলো আরবী গণিতশাস্ত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ১৩শ শতাব্দিতে সাবিতের উপপাদ্যের নতুন প্রমাণ পেশ করেন আল-ফারিসী এবং এর মাধ্যমে তিনি গুণনীয়ক নির্ণয় (factorization) এবং গুচ্ছ-বিন্যাসতত্ত্ব (combinatorial) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উপস্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি আরও এক জোড়া সমভাবাপন্য সংখ্যা আবিষ্কার করেন: ১৭,২৯৬ এবং ১৮,৪১৬, যা ১৮শ শতাব্দির সুইস গণিতবিদ লিওনার্দো ইউলারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। ইউলারের বহু বছর পূর্বেই আরেক মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ বাকির ইয়াজদী ১৭শ শতাব্দিতে সমভাবাপন্য সংখ্যার আরেকটি জোড়া আবিষ্কার করেন: ৯,৩৬৩,৫৮৪ এবং ৯,৪৩৭,০৫৬।
"(বীজগণিত) সকল গাণিতিক পন্থার আশ্রয় নিয়ে অজানাকে নিয়ে কাজ করে, যেমনিভাবে অঙ্কশাস্ত্রবিদ জানাকে নিয়ে কাজ করে।" - আস-সামাওয়াল, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ
১০ম শতাব্দিতে মুসলিম গণিতবিদগণ গণিতের আরেকটি শাখায় চরম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন, যখন ইবনুল হাইছাম সকল জোড় নিখুঁত সংখ্যাগুলোকে বিন্যস্ত করার প্রথম প্রয়াস চালান। ওইসব পূর্ণ সংখ্যাকে নিখুঁত সংখ্যা বলা হয়, যাদের প্রকৃত ধনাত্মক গুণনীয়কগুলি যোগ করলে ওই সংখ্যা পাওয়া যায় এবং এর সূত্রটি হলো: (2-1) (2k-1), যেখানে 2*-1 হলো মৌলিক সংখ্যা। এছাড়াও আমাদের জানা মতে তিনিই হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি উইলসনের বহু আগেই তার প্রদান করা থিওরি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তত্ত্বটি এরূপ: p যদি মৌলিক সংখ্যা হয়, তবে বহুপদী 1+(p-1)! রাশিটিও p দ্বারা বিভাজ্য হবে। তবে তিনি এই তত্ত্বের প্রমাণ জানতেন কিনা, তা আমরা নিশ্চিত নই। ক্যামব্রিজের গণিতবিদ উইলসনের সাথে এই থিওরির আবিষ্কারকে সম্পৃক্ত করায় এটাকে উইলসনের থিওরি বলা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমরা নিশ্চিত নই যে, তিনি তত্ত্বের প্রমাণ জানতেন কিনা। এর বছরখানেক পর ল্যাগরেঞ্জ নামের এক গণিতবিদ এই থিওরির 'প্রথম আবিষ্কারের' ৭৫০ বছর পর এর প্রমাণ পেশ করেন।
ব্যবসা ও প্রতিদিনের কাজে গণিতের ব্যবহার ছিল এবং বিশেষ করে হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে এটা ছিল আবশ্যকীয় এক মাধ্যম। বর্তমানে আমাদের অধিকাংশই হিসেব ও গণনার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। শূন্য দ্বারা যার সূচনা এবং যা বিলিয়ন ও ট্রিলিয়নেরও গণ্ডি পার করে। কিন্তু ১০ম শতাব্দির মুসলিম দেশগুলোতে ৩-টি স্বতন্ত্র গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো এবং ওই শতকের শেষ দিকে আল-বাগদাদীর মতো লেখক ভিন্ন ভিন্ন ওই পদ্ধতিগুলোর তুলনা করে গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। এই ৩-টি পদ্ধতি হলো: আঙ্গুল-ভিত্তিক পাটিগণিত, যঠিক পদ্ধতি এবং আরবী সংখ্যা পদ্ধতি।
আঙ্গুলের সাহায্যে পরিচালিত হিসাবের সাথে সম্পূর্ণ কথায় লেখা সংখ্যাগুলোর আবির্ভাব ঘটে, যা বণিক সম্প্রদায়ের মাঝে ব্যবহৃত হতো। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গণিতবিদরা যেমন, বাগদাদের আবুল ওফা ১০ম শতাব্দিতে বেশ কিছু পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। আরবী সংখ্যার ব্যবহার ও প্রয়োগে তিনি ভীষণ দক্ষ ছিলেন এবং তিনি বলেন, "পূর্ব দেশীয় খিলাফতের অধীনস্থ জনগণ ও বণিক সম্প্রদায়ের মাঝে দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোর কোনো ব্যবহার ও প্রয়োগ খুঁজে পাইনি।" ষষ্ঠিক পদ্ধতিতে আরবী বর্ণমালা সম্বলিত সংখ্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পদ্ধতি ব্যাবিলনীয়দের কাছ থেকে এসেছে এবং জ্যোতিষশাস্ত্রীয় নানা কাজে আরব গণিতবিদগণ অতিমাত্রায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন।
দশমিক স্থানীয়-মান পদ্ধতির সাথে আরবী সংখ্যা ও ভগ্নাংশের পাটিগণিত ভারতীয় সংস্করণ থেকে উদ্ভূত ও বিকাশ লাভ করে। ভারতীয় সংখ্যাগুলোকে মুসলিমগণ ১ থেকে ৯ পর্যন্ত আধুনিক সংখ্যায় একীভূত করে ফেলে, যা আরবী সংখ্যা হিসেবে সমধিক পরিচিতি। এমনটি ধারণা করা হয় যে, এই সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকে তার নিজ প্রতীক বা চিহ্নের কোণের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ৭-সংখ্যাটি এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, যেহেতু মধ্যবর্তী আনুভূমিক রেখার উলম্ব বাহুকে অতিক্রম করার বিষয়টি অধুনা ১৯শ শতকের বিকাশ মাত্র। পরবর্তীতে এগুলো ইউরোপ ও উত্তম আমেরিকার প্রচলিত সংখ্যায় পরিণত হয়। এই সংখ্যাগুলো ভারতীয় সংখ্যা থেকে বেশ স্বতন্ত্র। উদাহরণস্বরূপ, ১-সংখ্যাটির একটি কোণ রয়েছে, ২-সংখ্যাটির দুটি কোণ রয়েছে, ৩-সংখ্যাটির তিনটি কোণ রয়েছে ইত্যাদি। এই সংখ্যাগুলোর আবির্ভাব তখন পর্যন্ত ব্যবহৃত লাতিন সংখ্যা দ্বারা সৃষ্ট সমস্যার সমাধান পেশ করে। আরবী সংখ্যাগুলো গুবারী সংখ্যা নামে পরিচিত ছিল। কারণ, হিসাবের জন্য মুসলিমগণ অ্যাবাকাস জাতীয় গণনাযন্ত্রের পরিবর্তে মাটির বোর্ড (গুবার) ব্যবহার করতো।
"গণিত হলো এই দুনিয়ার বিষয়াদি এবং বিজ্ঞানের জগতে প্রবেশের দরজা ও চাবি ... আমরা যদি সন্দেহকে দূরে সরিয়ে নিশ্চয়তা এবং ভ্রান্তিকে পিছনে ফেলে সত্য লাভ করতে চাই, তবে আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে: জ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি গণিতের উপর স্থাপন করা।"
রজার বেকন, ইংরেজ পণ্ডিত
মুসলিম গণিতবিদদের দ্বারা শূন্যের বিস্তৃত সংজ্ঞা ও ব্যবহার ছিল ভারতীয় পদ্ধতির ব্যাপক সংস্কার ও পরিমার্জন। মুসলিমগণ শূন্যকে একটি গাণিতিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, আর তা হলো: যেকোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে তা শূন্যে পরিণত হয়। পূর্বে শূন্যকে খালি বা 'নাস্তি' বিবেচনা করা হতো। মুসলিমগণ শূন্যকে দশমিকীকরণেও ব্যবহার করে, যেন একটি সংখ্যার প্রকৃত অবস্থা জানা যায়, উদাহরণস্বরূপ, পূর্বে ২৩ লিখলে সংখ্যাটি দ্বারা ২৩, ২৩০ বা ২৩০০ ইত্যাদি বোঝানোর সম্ভাবনা থাকতো, কিন্তু শূন্যের ব্যবহারে সে সংশয় দূর হয়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, আমরা যদি ষড়ভুজের মাঝে (বৃত্তের মতো বড়ো একটি) শূন্য বসে থাকার বিষয়টি কল্পনা করি, তবে ওই বৃত্তের ব্যাস এবং ষড়ভুজের বাহুর অনুপাত হবে গোল্ডেন রেশিও (সোনালি অনুপাত)-এর সমান। গোল্ডেন রেশিও সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনি এই বিভাগের জ্যামিতি অধ্যায় দেখতে পারেন।
মুসলিম গণিতবিদগণ আরও কিছু সংখ্যার তাৎপর্য নিয়ে বেশ মোহিত ছিল, যেমন: ০ ও ১-এর সম্পর্ক এবং وَاحِدٌ (ওয়াহিদ- একক, আল্লাহর ৯৯-টি গুণবাচক নামের একটি) ও لاشي قبله ولا شي بغده )লা শাইয়ুন কাবলাহু ওয়া লা শাইয়ুন বা'দাহু - না তাঁর পূর্বে কিছু ছিল এবং না তাঁর পরে কিছু আছে)-এর মধ্যস্থ সম্পর্ক। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আজকের দিনের কম্পিউটারের ভাষা হিসেবে কেবল এই দুটো সংখ্যা অর্থাৎ ০ ও ১ ব্যবহৃত হয়।
৩-টি উৎস থেকে আরবী সংখ্যা ইউরোপে প্রবেশ করে। প্রথমত, গারবার্ট (পোপ প্রথম সিলভেস্টার)-এর মাধ্যমে, যিনি কর্ডোবাতে অধ্যয়ন শেষে রোমে ফিরে যান। এরপর ১২শ শতাব্দিতে চেস্টারের রবার্টের মাধ্যমে, যিনি দ্বিতীয় গুবারী (আরবী সংখ্যা) সম্বলিত আল-খাওয়ারিযমীর দ্বিতীয় গ্রন্থের অনুবাদ সম্পন্ন করেন। এ পথ ধরে ইউরোপে আরবী সংখ্যার প্রবেশের বিষয়টি সমকালীন ঐতিহাসিক কার্ল মেনিগার তার Number Words and Number Symbols গ্রন্থে তুলে ধরেনে। ইউরোপে আরবী সংখ্যার প্রবেশের তৃতীয় পথটি ১৩শ শতাব্দিতে ফিবোনাচ্চির হাত ধরে উন্মুক্ত হয়, যিনি ইউরোপীয় জনগণের কাছে নিজের আহরিত জ্ঞান ছড়িয়ে দেন। মূলত ফিবোনাচ্চির বাবা তাকে আলজেরিয়ার বুজি শহরের সাইয়্যেদ উমর নামে পরিচিত এক শিক্ষকের কাছে গণিত শেখার জন্য পাঠান, আর সেখান থেকেই তিনি এসব জ্ঞান হাসিল করেন। ফিবোনাচ্চির এই শিক্ষক বাগদাদ ও মাওসুল গণিতশাস্ত্রীয় ধারার শিক্ষা দিতেন, যাতে বীজগাণিতিক এবং ধারাবাহিক বা সহসমীকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কায়রোর আলেকজান্দ্রিয়া ও দামেস্কের লাইব্রেরি ভ্রমণের পরপরই ফিবোনাচ্চি তার Liber Abaci গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় আরবী সংখ্যা নিয়ে এবং সেখানে তিনি সংখ্যাগুলোকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেন, "ভারতীয়দের ৯-টি সংখ্যা হলো: ৯৮৭৬৫৪৩২১। এদের সাথে আরবীতে সেফিরাম (সিফরুন- صفّرٌ( নামে পরিচিত '০' প্রতীক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত যেকোন সংখ্যা লেখা সম্ভব।"
আরবী সংখ্যা সম্বলিত হিসাবের এই পদ্ধতি-ই মুসলিম গণিতবিদদের জন্য সংখ্যাতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উচ্চতা হাসিলের পথ সুগম করে। যার ফলে আবুল ওফা ও উমর খাইয়্যামের মতো গণিতবিদদের পক্ষে মূলের উৎপাদক বের করা সম্ভব হয়। আল-কারাজী কর্তৃক উদ্ভাবিত পূর্ণসংখ্যার সূচকের জন্য দ্বিপদী উপপাদ্য (binomial theorem) দশমিক পদ্ধতির ভিত্তিতে সংখ্যাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ১৪শ শতাব্দিতে আল-কাশী বীজগাণিতিক সংখ্যার আসন্ন মান নির্ণয় এবং সেইসাথে পাই-এর মতো বাস্তব সংখ্যাগুলোর দশমিক ভগ্নাংশ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দশমিক ভগ্নাংশ নির্ণয়ে তার অবদান এতটাই অগ্রগণ্য ছিল যে, বহু বছর ধরে তাকে এই বিদ্যার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রথমবারের মতো না হলেও তিনি 'n-তম বর্গমূল' নির্ণয়ের একটি এলগরিদম (algorithm) প্রদান করেন, পরবর্তীতে বহু শতাব্দি পর ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী যথাক্রমে রুফিনি ও হর্নার বিশেষ এই পদ্ধতির পূর্ণতা দান করেন।
যদিও আরব গণিতবিদরা বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব ও সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে তাদের অবদানের জন্য সর্বাধিক পরিচিত, তথাপি তারা জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি ও গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয়গুলোতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সমর্থ হয়।
📄 ত্রিকোণমিতি
মুসলিমদের দ্বারা প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে চর্চিত জ্যোতির্বিদ্যার হাত ধরেই ত্রিকোণমিতির সূচনা। বস্তুত সালাতের ওয়াক্ত সঠিকভাবে নির্ণয়ের সাথে ত্রিকোণমিতি চর্চা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এমনকি মুসলিমদের বহু আগে গ্রিক জ্যোতির্বিদগণ নির্দিষ্ট ত্রিভুজের জানা কোণ ও বাহুর সাপেক্ষে অজানা কোণ ও বাহু পরিমাপ করতো এবং যার সাহায্যে তারা সূর্য, চাঁদ এবং সে সময়ের জানা ৫-টি গ্রহের গতিবিধি বুঝতে চাইতো।
সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের অবস্থান সম্পর্কিত প্রশ্ন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রিকরা নানা ছক, সারণী ও নিয়ম তৈরি করেন, যা-র সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান করা সম্ভবপর ছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ আলোচনা পাওয়া যাবে আনুমানিক ২য় শতাব্দিতে আলেকজান্দ্রিয়ায় কর্মরত জ্যোতির্বিদ টলেমি রচিত Almagest (আলমাগেস্ট) গ্রন্থে। টলেমি রচিত এই গ্রন্থ মুসলিমদের হাত হয়ে ইউরোপের পৌঁছায়, যারা Almagest গ্রন্থের আরবী অনুবাদ করেন এবং এর পরিভাষাসমূহ আরও বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করেন। Almagest-এর আরবী প্রতিশব্দ (আল-আ'যাম), যার মানে: শ্রেষ্ঠ।
প্রাচীনযুগের শেষ দিকের জ্যোতির্বিদরা তাদের যাবতীয় সমতল ত্রিকোণমিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানত Almagest গ্রন্থের পুস্তক-১-এ প্রাপ্ত সারণী ব্যবহার করতো, যা বৃত্তস্থ জ্যায়ের সারণী (Table of chord) তথা ত্রিকোণমিতিক সারণী নামে পরিচিত। কৌণিক চাপের পরিমাণ ১/২-ডিগ্রি থেকে ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ১/২-ডিগ্রি হারে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই সারণী ৬০ একক ব্যাসার্ধের বৃত্তের সম্মুখ কোণস্থ জ্যায়ের দৈর্ঘ্য বলে দেয়।
"শাকলুল কাত্তা'আ" (পরস্পরছেদী আকৃতি) শীর্ষক পুস্তকে ১৩শ শতাব্দির মুসলিম জ্যোতির্বিদ আত-তুসী 'সমকোণী ত্রিভুজের সাথে সম্পৃক্ত সমস্যা' সমাধানে কীভাবে বৃত্তস্থ জ্যায়ের দৈর্ঘ্যের সারণী ব্যবহার করতে হয়, তার ব্যাখ্যা দেন। ত্রিভুজ ও বৃত্তস্থ জ্যায়ের মাঝে যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তা আত-তুসীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই সম্পর্ক এরূপ: বৃত্তের অভ্যন্তরে ত্রিভুজ আঁকা যাবে, তখন ত্রিভুজের বাহুগুলো জ্যা হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে সম্মুখস্থ চাপগুলো ত্রিভুজের কোণগুলোর বিপরীতে অবস্থান করে।
কিন্তু এই সারণীগুলোর উপর নির্ভর করার দুটো অসুবিধা রয়েছে। প্রথমত, সমকোণী ত্রিভুজের অজানা বাহু বা কোণের পরিমাণ নির্ণয়ে উদ্ভূত সকল ভিন্নতা সমাধানে এই সারণী ও মধ্যবর্তী ধাপগুলো প্রয়োজন মাফিক পরিবর্তন করে নিতে হয়। এই পদ্ধতি আধুনিক পদ্ধতির বিপরীত, যা ৬-টি পরিচিত ত্রিকোণমিতিক ফাংশন – সাইন (sine), কোসাইন (cosine) ও ট্যানজেন্ট (tangent) এবং এদের বিপরীত ফাংশন স্যাকেন্ট (secant), কোস্যাকেন্ট (cosecant) ও কোট্যানজেন্ট (cotangent) - এর সমন্বয়ে গঠিত। আধুনিক এই পদ্ধতি মুসলিম গণিতবিদদের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিন্যস্ত হয়। বৃত্তস্থ জ্যায়ের সারণীর দ্বিতীয় অসুবিধা হলো: বৃত্তস্থ চাপের দৈর্ঘ্য নির্ণয়ে প্রায়শই কোণগুলোকে দ্বিগুণ করে নিতে হয়।
প্রকৃতপক্ষে, ১০ম শতাব্দির পূর্বেই মুসলিম পণ্ডিতদের একটি ধারা ইতোমধ্যেই ত্রিকোণমিতির ভিত্তি দাঁড় করায়, যা আত-তুসীর জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়াকে সম্ভবপর করে। আত-তুসী তাদের অবদানগুলো সংগ্রহ করেন, সেগুলো বিন্যস্ত করেন এবং বিশ্লেষণ করে তা আরও সমৃদ্ধ করেন।
তুরস্কের হারানে জন্ম নেয়া আল-বাত্তানী ত্রিকোণমিতি শাস্ত্রের আরেক পৃথিকৃৎ। বর্তমান ইরাকের সামারাতে ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী এই মনীষীকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ত্রিকোণমিতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে তার অগ্রগামী ভূমিকার পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল গ্রহানুপুঞ্জের আবর্তনের পর্যবেক্ষণ। মহাবিশ্ব বিভাগের জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যায়ে তার ব্যাপারে আপনি আরও আলোচনা পাবেন - ইনশাআল্লাহ।
এক হাজার বছর পূর্বের মুসলিমগণ ত্রিকোণমিতি চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যেহেতু গ্রহের আবর্তন এবং বাহু ও কোণ নির্ণয়ে তারা ত্রিকোণমিতির সফল প্রয়োগ করেন। বর্তমানে গোলীয় ত্রিকোণমিতি (Spherical trigonometry)-সহ সাধারণ ত্রিকোণমিতিক ব্যবহৃত হয় জ্যোতির্বিদ্যা, মানচিত্রাঙ্কন ও নৌচালনবিদ্যার জটিল সমস্যা সমাধানে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল-বাত্তানী নিজের গাণিতিক সমীকরণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি অন্য পণ্ডিতরা যেন 'পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা' অব্যাহত রাখে, সে ব্যাপারে বেশ উৎসাহ দিতেন, যেন এর মাধ্যমে তার কর্ম পূর্ণতা ও বিস্তৃতি লাভ করে। আল-বাত্তানীর মতো আবুল ওফা, ইবনে ইউনূস এবং ইবনুল হাইছামও গোলীয় ত্রিকোণমিতির সমৃদ্ধকরণে ভূমিকা রাখেন এবং সেটাকে জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করেন।
আল-বাত্তানী প্রথমবারের মতো সাইন (sine), কোসাইন (cosine) প্রতীক ব্যবহার করেন এবং এগুলোকে তিনি অনুপাতের বদলে দৈর্ঘ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যেমনটি আজ আমরা জানি। আল-বাত্তানী ট্যানজেন্ট (tangent)-কে 'বর্ধিত ছায়া' হিসেবে প্রকাশ করেন, যা দেয়ালের উপর স্থাপিত কল্পিত অনুভূমিক লাঠি থেকে উদ্ভূত। ১১শ শতাব্দিতে আল-বিরুনী ট্যানজেন্ট (tangent) ও কোট্যানজেন্ট (cotangent)-এর ত্রিকোণমিতিক ফাংশনের সংজ্ঞা নিরূপণ করেন, যা ভারতীয়দের কাছ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া আল-বিরুনী তাদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত, যারা আধুনিক ত্রিকোণমিতির ভিত্তি নির্মাণে পথিকৃৎ ছিলেন। আল-খাওয়ারিযমী (জন্ম: ৭৮০) সাইন (sine), কোসাইন (cosine) প্রতীক এবং ত্রিকোণমিতিক সারণী প্রস্তুত করেন, যা পরবর্তীতে পশ্চিমে অনুদিত হয়।
বস্তুত, এসব ঘটনা ট্যানজেন্ট (tangent)-সহ নানা প্রতীকে সমৃদ্ধ আধুনিক ত্রিকোণমিতি উদ্ভাবনের ৫০০ বছর পূর্বেকার, উপরন্তু আরও ১০০ বছর পর এসব জ্ঞান নিকোলাস কপার্নিকাসের দৃষ্টিগোচর হয়।