📄 পরিচ্ছন্নতা
মধ্যযুগ কথাটা আসলেই আমাদের চোখের সামনে দুর্গন্ধময়, অন্ধকার, এলোমেলো ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের চিত্র ভেসে আসে। কিন্তু এমনটি যদি মুসলিম বিশ্বের জন্য ভেবে থাকেন, তবে আপনি বড় ধরনের ভুল করবেন। বরং ১০ম শতাব্দিতে ইসলামী বিশ্ব যেভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চর্চা করতো এবং তাদের গোসলখানায় যে ধরনের ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল, সেগুলো আজ আমাদের যা আছে, তার সাথে পাল্লা দেয়ার সামর্থ্য রাখে।
পরিচ্ছন্নতা ইসলামে অপরিহার্য এবং প্রতিটি সালাতের আগে ওজু করতে হয়। ১৩শ শতাব্দির বিশিষ্ট যন্ত্র প্রকৌশলী আল-জাযারী রচিত "কিতাব ফী মারিফাতিল হিয়াল আল-হানদাসা" গ্রন্থে রোবটিক ওজু মেশিনেরও বিবরণ রয়েছে। ময়ূরের মতো দেখতে সুবিন্যস্ত মেশিনটি প্রত্যেক অতিথির কাছে আনা হতো, যিনি পানি প্রবাহের জন্য ময়ূরের মাথায় চাপ দিতেন এবং এতে করে ওজু করার জন্য পর্যাপ্ত পানি আটবারে অল্প অল্প করে প্রবাহিত হতো। কিছু মেশিন আপনাকে তোয়ালে পর্যন্ত দিতে সক্ষম ছিল।
তেল (সাধারণত জলপাই তেলের) সাথে আল-ক্বালী (লবণ জাতীয় পদার্থ) মিশিয়ে মুসলিমগণ সাবান প্রস্তুত করতো। পাণ্ডুলিপি অনুসারে সঠিক ঘনত্ব পেতে এই মিশ্রণ সেদ্ধ করা হতো এবং শক্ত হওয়ার জন্য রেখে দেয়া হতো। এরপর এই সাবানগুলো স্নানাগারে ব্যবহার করা হতো।
"আল্লাহ সুন্দর (জামীল) এবং তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন।" - নবী মুহাম্মদ (ﷺ) [সহীহ মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত]
মধ্যযুগীয় মুসলিমগণ তাদের বেশভূষার ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়ে যায়। বিখ্যাত চিকিৎসক ও সার্জন আয- যাহরাবী ছিলেন এমনই এক দক্ষ কারিগর, যার সম্পর্কে হাসপাতাল বিভাগে আপনি আরও জানতে পারবেন। তিনি তার চিকিৎসা গ্রন্থ "আত-তাসরীফ”-এ 'সৌন্দর্যের নানা ঔষধ' শিরোনামে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে কসমেটিক (প্রসাধনী) নিয়ে পূর্ণ আলোচনা করেছেন।
ইসলামের গণ্ডির ভেতরে থেকে তিনি চুল ও ত্বকের যত্ন, সৌন্দর্যবর্ধন, দাঁতের শুভ্রতা বৃদ্ধি এবং দাঁতের মাড়ি শক্ত করা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তার গ্রন্থে নাকের স্প্রে, মুখ ধৌত করার তরল (মাউথওয়াশ) এবং হাতের ক্রিম নিয়েও আলোচনা করেছেন। এমনকি তিনি সুগন্ধি লাঠি নিয়েও আলোচনা এনেছেন, যা স্থির থেকে গড়িয়ে চলতো ও বিশেষ ছাঁচে চাপ দিয়ে বসানো থাকতো, অনেকটা আজকের দিনের রোল-অন দুর্গন্ধনাশকগুলোর (roll-on deodorant) মতো। এছাড়াও তিনি চুল উঠানোর কাঠি, চুলের রঙ যা স্বর্ণকেশী চুল কালো করে, এবড়োথেবড়ো বা কোঁকড়ানো চুল সোজা করার লোশন ইত্যাদি ঔষধ মেশানো প্রসাধনীরও বিবরণ দেন। সানট্যান লোশন (সূর্যরশ্মি থেকে ত্বকের সুরক্ষার লোশন) ও তার উপাদানগুলোর উপকারিতা নিয়েও মুসলিম বিশ্বে আলোচনা হয়েছে এবং এই জিনিসগুলোর সবই প্রায় এক হাজার বছর আগেকার, আর তা ভাবতেই রীতিমতো অবাক হতে হয়।
"যখন তোমরা সালাতের জন্যে উঠো, তখন স্বীয় মুখমণ্ডল ও হাত দুটো কনুই পর্যন্ত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং পদযুগল গিটসহ।" - কুরআন (সূরা আল-মায়িদা: ৬)
বর্তমান ইরাকের কুফাতে জন্ম নেয়া আল-কিন্দী সুগন্ধির উপর "কিতাব কিমিয়া আল-ই'তরি ওয়া তাসয়িদাত" (সুগন্ধি ও পাতনের রসায়ন) নামে একটি গ্রন্থ লেখেন। তার গ্রন্থে সুগন্ধি তেল, মলম, ঝাঁঝালো পানি এবং দামি ঔষধের নকল প্রস্তুতের উপর ১০০'রও বেশি রেসিপির বিবরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথমদিকে সমাজের অধিকতর বিত্তবানরা এগুলো ব্যবহার করতো, পরবর্তীতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে যায়।
মুসলিম রসায়নবিদগণ উদ্ভিদ ও ফুলকে পাতন করে সুগন্ধি এবং রোগনিরাময়ক ঔষধের প্রধান উপাদানগুলো প্রস্তুত করতেন।
এ সকল প্রক্রিয়া ও ধারণা বণিক, পর্যটক ও ক্রসেডারদের বদৌলতে ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে। বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র What the Ancients Did for Us: The Islamic World উদ্ধৃত করে যে, মুসলিমদের এই জ্ঞান দক্ষিণ ফ্রান্সের হটি প্রোভেন্স পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেখানে সুগন্ধি ইন্ডাস্ট্রির জন্য উপযোগী আবহাওয়া ও উপযুক্ত ধরনের মাটি রয়েছে এবং ৭০০ বছর পার হওয়ার পরও যা আজও সক্রিয়।
ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসাধনী হচ্ছে: হেন্না [মেহেদি), যা এর সৌন্দর্য এবং দক্ষ হাতের জটিল কারুকার্যের জন্য পরিচিত। ইসলামের বিস্তৃতির সাথে সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে হেন্না ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিণত হয় অপরিহার্য প্রসাধনী উপকরণে।
নবী মুহাম্মদ (স) এবং তার সাহাবীগণ তাদের দাড়ি রঙ করতেন, নারীরা তাদের হাত ও পা সজ্জিত করতো এবং আজকের নারীদের মতো তারাও তাদের চুল রঙ করতো। আধুনিক বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান মোতাবেক হেন্না ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস (পচন) এবং রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ করে। এথলেট বা ক্রীড়াবিদদের পা, ত্বকে ফাংগাসের সংক্রমণ ও প্রদাহ উপশমে এটা বেশ কার্যকর। এদের পাতা ও বীজ ঔষধি গুণাগুণ বহন করে এবং উভয়ে দেহ ও মাথাকে ঠাণ্ডা করার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও হেন্নাতে নানা প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যা চুলের পুষ্টির জন্য ব্যবহার করা হয়।
শেক দীন মুহামেদ
১৭৭০ ও ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইল্যান্ডের ব্রিংগটন ছিল ফুলের সমারোহে ঘেরা এক সমুদ্র রিসোর্ট এবং ঠিক এই মনোরোম দৃশ্যেই শেক (শেখ, উচ্চারণভঙ্গির কারণে এটা শেক-এ বদলে যায়) দীন মুহামেদ এখানে পা রাখেন।
শেক দীন মুহামেদ ভারতের পাটনার এক মুসলিম পরিবার থেকে আসেন। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিংগটন সমুদ্র বেলাভূমি, যেখানে বর্তমানে কুইন্স হোটেল রয়েছে, সেখানে মুহামেদের ভারতীয় বাষ্পস্নান নামে একটি স্নানাগার স্থাপন করেন। এখানের গোসল প্রক্রিয়া তুর্কি গোসলের মতোই ছিল, তবে সেবা গ্রহণকারী মক্কেলকে একটি ফ্লানেলে তাঁবুতে শোয়ানো হতো এবং তাকে ভারতীয় ছাম্পি (শ্যাম্পু) নামের এক বিশেষ সেবা বা থেরাপি মালিশ দেয়া হতো। এই অনন্যসাধারণ 'বাষ্পস্নান' ও শ্যাম্পু-স্নান তাকে চূড়ান্ত খেতাব এনে দেয় এবং তিনি পঞ্চম জর্জ ও পঞ্চম উইলিয়াম উভয়ের 'শ্যাম্পু সার্জন' হিসেবে নিযুক্ত হন।
📄 ট্রিক ডিভাইস
যখন আপনি রুবিক্স কিউব নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন, তখন হয়তো আপনার কানে ভেসে আসতে পারে তারের উপর ঝুলতে থাকা ধাতব বলের ক্লিক-ক্লিক আওয়াজ, যেহেতু এই ধাতব বলগুলো ছন্দের তালে তালে একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে। ব্যবসার জন্যই হোক আর বিনোদনের জন্যই হোক- গেমস্ ও পাজেল অনেকের কাছে এগুলো মুগ্ধতার খোরাক।
মানুষের আনন্দ উপভোগের এই অনুভূতিকে করায়ত্ত করেছিল ৯ম শতাব্দির তিন ভাই। মুহাম্মদ ইবনে মূসা ইবনে শাকির, আহমাদ ইবনে মূসা ইবনে শাকির এবং আল-হাসান ইবনে মূসা ইবনে শাকির- এই তিন ভাই বনী মূসা ভ্রাতা নামেই সমধিক পরিচিত। তারা ৯ম শতাব্দির বাগদাদের বিখ্যাত বুদ্ধিবৃত্তিক একাডেমি বায়তুল হিকমার সদস্য ছিল, এ সম্পর্কে বিদ্যালয় বিভাগে আপনি আরও তথ্য পাবেন। গণিতজ্ঞ ও গ্রিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলোর অনুবাদক হওয়ার পাশাপাশি তারা অবিশ্বাস্য ধরনের এমনসব ট্রিক ডিভাইস নির্মাণ করেছিল, যেগুলোকে অনেকে বর্তমানের দামী খেলনার পূর্বপুরুষ আখ্যায়িত করেন। এই ভাইয়েরা নানা ধরনের ট্রিক ডিভাইস ডিজাইন ও উদ্ভাবন করে তাদের সহকর্মীদের মোহাচ্ছন্নতাকে ব্যাপকভাবে উসকে দিতো এবং তাদের "কিতাবুল হিয়াল” (উদ্ভাবনকুশলী ডিভাইস) গ্রন্থে একশতেরও বেশি ট্রিক ডিভাইসের তালিকা রয়েছে। বস্তুত এগুলোই ছিল যান্ত্রিক প্রযুক্তির সূচনা। আজকের দিনের খেলনার মতো এগুলোর ব্যবহারিক কার্যক্রম খুব সামান্য হলেও ১১০০ বছর আগের পুরানো এসব যান্ত্রিক নির্মাণ কৌশল সত্যিকার অর্থে বিস্ময়কর কারিগরি নৈপুণ্য ও জ্ঞানের চূড়ান্ত উৎকর্ষের বহিঃপ্রকাশ ছিল।
এসব নির্মাণ কৌশলের অধিকাংশই পানি, নকল পশুপাখি ও আওয়াজ তৈরিকে ঘিরে আবর্তিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, পানি পানরত ষাঁড়ের পানি পান শেষ হলে সে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতো। অনেকগুলো প্রকোষ্ঠ, ভাসান (ভাসমান ফাঁপা বস্তু), ভ্যাকুম (বায়ুশূন্য বস্তু) এবং প্লাগ (বা ছিপির) সিরিজ পানিপূর্ণ করে এমনটি করা হতো।
প্রাথমিক ট্যাপ (পিপার ছিপি) দিয়ে পানি কম্পার্টমেন্ট-এ তে প্রবেশ করে এবং এরপর ট্যাপ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাটি পানি পূর্ণ হয়। এতে করে ভাসান-এম (বিপরীত ডায়াগ্রামের দেখা যাবে) পানির স্তর পর্যন্ত উঠে আসে এবং কপাটিকার বাহির থেকে প্লাগকে টেনে ধরে। পানি নালাপথ ধরে কম্পার্টমেন্ট-এ থেকে কম্পার্টমেন্ট-বি তে প্রবাহিত হয়। পানির বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাসান-বি উপরে উঠতে থাকে এবং পানি ভাসান-বি কে উপরে ঠেলতে থাকে, এতে করে দুটো কম্পার্টমেন্টের মধ্যে পানি প্রবাহ নিশ্চিত হয়। কম্পার্টমেন্ট-বি যখন একেবারে বায়ুশূন্য হয়ে পড়ে, তখন কম্পার্টমেন্ট-এ তে একটি বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেহেতু এটাতে বাতাস প্রবেশের কোনো পথ খোলা নেই। ঠিক তখনই বাটি থেকে পানি পাইপের মাধ্যমে টানা শুরু হয় এবং তা কম্পার্টমেন্ট-এ তে প্রবেশ করতে শুরু করে। বাটি থেকে যখন সবটুকু পানি শেষ হয়, তখন বাতাস শোষণ করা হতে থাকে, তাই এটা মনে হতে থাকে যে, ষাঁড়টি তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।
বাটিতে আর কোনো পানি নেই, যা ভাসমান প্লাগটিকে ধরে রাখবে, তাই ওই নির্দিষ্ট প্লাগ বন্ধ হয়ে যায় এবং কম্পার্টমেন্ট-এ কে খালি করার জন্য কেবল প্লাগ-বি খোলা থাকে। কম্পার্টমেন্ট-বি খালি হয় বি ও সি-এর মধ্যবর্তী ছোট ছিদ্র দ্বারা। কম্পার্টমেন্ট-সি-এর একটি পাশ থেকে মুক্তভাবে বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মেধা ও মননকে নাড়িয়ে দেয়া এই ডিভাইস লোকদের ঘন্টার পর ঘন্টা বিমোহিত রেখেছিল, সেটা হলফ করে বলা যায়।
বনী মূসা ভাইদের আরেকটি ট্রিক ডিভাইস ছিল দুই নলা ফ্লাস্ক। প্রতিটি নলে আলাদা রঙের তরল পদার্থ ঢালা হতো, কিন্তু ঢালার সময় 'ভুল' নল দিয়ে 'ভুল' তরল বেরিয়ে আসতো। অনেকটা জাদুকরের মতো যে কিনা নিজের কনুই থেকে কমলার শরবত বানাতে পারেন, কিন্তু এই ভাইদের জামার আস্তিনে এর থেকেও উন্নত ও সাদামাটা, কিন্তু জটিল নির্মাণ কৌশল লুকানো থাকতো।
আসলে তারা জগটিকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা দুটো উলম্ব ভাগে বিভক্ত করেছিল। ডান পাশের ফানেল দিয়ে ডান পাশে তরল যেত এবং বাম পাশের ফানেল দিয়ে বাম পাশে তরল যেত, কিন্তু তরল পদার্থকে এভাবে বের হতে দেয়া যাবে না। এজন্য নির্গমনের জন্য আরেকটি পাইপ লাগানো হতো। দর্শক হিসেবে আসা লোকজন অবশ্যই এগুলোর কিছুই দেখতো না এবং যদিও এটা বেশ সাদামাটা ছিল, তথাপি এই চালাকি তাদেরকে প্রভাবিত ও মুগ্ধ করতো। এই ভাইদের মজা করার ভাবনা তাদেরকে ফোয়ারা ডিজাইনের দিকে ধাবিত করে। আরও জানতে চাইলে নগর বিভাগের ঝরনা অধ্যায়ে একটু চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন।
"কৌতুক কোনো জিনিস নয়, বরং এটা এক প্রক্রিয়া, এক চালাকি - যা আপনি শ্রোতার মনের উপর চালেন। আপনি তার সাথে একটি যুক্তিসঙ্গত উদ্দেশ্য দিয়ে শুরু করেন এবং এরপর হঠাৎ এক মোচড় দিয়ে আপনি তাকে আদৌ কোনো স্থানে রাখেন না কিংবা তাকে এমন এক ময়দানে ফেলে আসেন, যেখানে যাওয়ার প্রত্যাশা সে করেনি।" - ম্যাক্স ইস্টম্যান, মার্কিন লেখক
📄 দৃষ্টিশক্তি এবং ক্যামেরা
আমরা কীভাবে দেখি, এটা ভেবে শিশু বয়সে কখনো কি অবাক হয়েছেন? কিংবা কখনো কি ভেবেছিলেন যে, নিজের চোখ বন্ধ করলেই না আপনি সকলের থেকে আড়াল হয়ে যাবেন, না তারা আপনাকে দেখবে, আর না আপনি তাদের দেখবেন? দৃষ্টিশক্তির ব্যাপারে গ্রিক বিদ্বানদের ধারণা গতানুগতিক ধারণার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে ছিল এবং সে সময় আলোকবিজ্ঞানের প্রথম উপলব্ধি দুটো প্রধান তত্ত্ব (থিওরি) দ্বারা গঠিত ছিল।
প্রথম তত্ত্ব মতে, আমাদের চোখ থেকে আলো বেরিয়ে আসে, অনেকটা আজকের লেজার প্রযুক্তির মতো এবং আমাদের দৃষ্টি সীমাতে কোনো বস্তুর আগমন দ্বারা এই রশিাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই চোখ থেকে কোনো বস্তুর উপর আলোর বিচ্ছুরণের কারণেই দর্শন ক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দ্বিতীয় ধারণা মতে, আমরা কোনো বস্তু দেখি, কারণ ওই বস্তুর প্রতিনিধিত্বকারী কিছু একটা আমাদের চোখে প্রবেশ করে। এরিস্টটল, গ্যালেন ও তাদের অনুসারীগণ এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু এই তত্ত্ব অনুমান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা সমর্থিত নয়।
দৃষ্টিশক্তির ব্যাপারে গ্রিক তত্ত্বগুলোকে প্রসমৃদ্ধ করে ৯ম শতাব্দির বহু শাস্ত্রে পারদর্শী আল-কিন্দী আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমরা তথা আমাদের অক্ষিকোটর বিচ্ছিন্ন আলোকরশ্মি দ্বারা দেখে না, যেমনটি ইউক্লিড বলেছেন। বরং আলোকরশ্মির ধারাবাহিক বিচ্ছুরণের ফলে ত্রিমাত্রিক আয়তন হিসেবে কোনো বস্তুর আবির্ভাব হলে আমরা ওই বস্তু দেখি।
১৬শ শতাব্দির ইতালীয় চিকিৎসক ও গণিতজ্ঞ জেরোনিমো কারদানো বলেন, "ইতিহাসের ১২ জন অনন্য সাধারণ মেধার একজন হলেন" আল-কিন্দী। কেননা আয়নাসহ ও আয়না ছাড়া দৃষ্টিশক্তি, কীভাবে আলোকরশ্মি সরল রেখায় চলাচল করে এবং দৃষ্টিশক্তির উপর দূরত্ব ও কোণের প্রভাব, একইসাথে দৃষ্টিভ্রমের মতো বিষয় নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। রশ্মিবিজ্ঞান ও তাত্ত্বিক আলোকবিজ্ঞানের উপর আল-কিন্দী দুটো প্রবন্ধ লেখেন, যা ১৩শ শতাব্দিতে ইংরেজ বিদ্বান রজার বেকন ও জার্মান পদার্থবিদ উইটেলো ব্যবহার করেন। বিংশ শতাব্দির ডেনিশ বিদ্বান সেব্যান্ডিয়ান ভোজেলের মতে, "রজার বেকন আল-কিন্দীকে কেবল পার্সপেকটিভ বা বস্তুর উচ্চতা, দৈর্ঘ্য, গভীরতা, আয়তন ও দূরত্ব অনুযায়ী চিত্রাঙ্কন বিদ্যার একজন মহাগুরুই বিবেচনা করতেন না, বরং তিনি নিজের Perspectiva গ্রন্থে এবং তার এই শাখার অন্য পণ্ডিতরাও বারবার আল-কিন্দীর
"রচিত আলোকবিজ্ঞান বিষয়ক লেখাগুলোর উদ্ধৃতি নকল করতেন।"
আল-কিন্দীর হাত ধরে মৌলিক প্রশ্নের সূচনা ঘটে, যার উপর ১০ম শতাব্দিতে আল-হাসান ইবনুল হাইছাম সৌধ নির্মাণ করেন এবং অবশেষে তিনিই ব্যাখ্যা করেন যে, আলোকরশ্মির প্রতিসরণের কারণেই দৃষ্টিশক্তি সম্ভবপর হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক ইতিহাসবেত্তা জর্জ সারটন বলেন, আলোকবিজ্ঞান যেভাবে প্রভূত সমৃদ্ধি করেছে, তা ইবনুল হাইছামের কর্মের কারণেই সম্ভবপর হয়েছে এবং আলোকবিজ্ঞান সম্পর্কে আজ আমরা যা জানি, তার অধিকাংশই তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করে গেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, ইবনুল হাইছামের আগেই ১০ম শতাব্দীর পদার্থ বিজ্ঞানী বাগদাদের ইবনে সাহল লেন্সের মাধ্যমে আলোর প্রতিসরণ নিয়ে কাজ করেন, যদিও আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত নই যে, ইবনে সাহলের কাজের ব্যাপারে ইবনুল হাইছাম জানতেন কিনা। আল-হাসান ইবনুল হাইছাম সচরাচর যিনি ইবনুল হাইছাম নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ এবং পাশ্চাত্যে যিনি আলহাজেন নামে পরিচিত, তিনি এক হাজার বছর পূর্বেই এক নিখুঁত পরীক্ষা চালান, যার মাধ্যমে তিনি এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে সক্ষম হন যে, কোনো বস্তুতে আলো প্রতিফলিত হয়ে তা যদি চোখে প্রবেশ করে, তবেই আমাদের পক্ষে ওই বস্তু দেখা সম্ভব। ইবনুল হাইছামই প্রথম ব্যক্তি, যিনি গ্রিক তত্ত্বগুলোকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেন।
"ইবনুল হাইছাম ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম পদার্থ বিজ্ঞানী এবং আলোকবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। ইংল্যান্ড কিংবা সুদূর পারস্য, যেটাই হোক না কেন, সকলে একই ফোয়ারা থেকে পান করেছেন। কী বেকন কী কেপলার, বস্তুত তিনি ইউরোপের (প্রধান পণ্ডিতদের) উপর প্রভৃত প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।" - জর্জ সারটন তার History of Science গ্রন্থে
ইরাকের বসরাতে জন্ম নেয়া ইবনুল হাইছামের কাছে মিশরের সম্রাট নীলনদের বন্যার প্রভাব হ্রাস করার সাহায্য চেয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি মিশরে আসেন। ইউক্লিড ও টলেমির 'গাণিতিক' পন্থা এবং প্রাকৃতিক দার্শনিকদের সমর্থিত 'প্রাকৃতিক' মূলনীতির মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম সমন্বয় সাধন করেন। ইবনুল হাইছাম বলেন, "আলোকবিদ্যার জ্ঞানের চাহিদাই হচ্ছে প্রাকৃতিক ও গাণিতিক গবেষণার মাঝে সমন্বয় সাধন।"
তিনি একইসাথে গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক ও রসায়নবিদ ছিলেন, কিন্তু তার লেখা "কিতাব আল-মানাযির" গ্রন্থটি আলোকবিজ্ঞানের ভিত্তিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছে। গ্রন্থটি এ বিষয়ে মহাগ্রন্থ (Magnum Opus) হিসেবে পরিচিত, যাতে আলোর প্রকৃতি, বৃত্তান্ত, দর্শনক্রিয়ার কৌশল, চোখের গঠন ও ব্যবচ্ছেদ, প্রতিফলন ও প্রতিসরণ এবং ক্যাটস্ট্রিক (আয়নাতে আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ইত্যাদি) বিষয়াদির আলোচনা রয়েছে।
ইবনুল হাইছাম লেন্স নিয়েও গবেষণা করেন এবং তিনি বিভিন্ন ধরনের দর্পণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, যেমন: সমতল, গোলাকার, অধিবৃত্ত, নলাকার, অবতল ও উত্তল দর্পণ। চোখের উপর প্রতিসরণের জ্যামিতি প্রয়োগের মাধ্যমে চোখকে তিনি ডাইয়স্ট্রিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতেন (ডাইয়প্টার – লেন্সের ক্ষমতার একক)। তিনি অত্যন্ত মেধার সাথে বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণের উপর অনুসন্ধান চালান এবং বায়ুমণ্ডলের সীমা ১৬ কিলোমিটার (১০ মাইল) হিসেব করেন। এটা বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তর ট্রপস্ফিয়ারের সীমার আধুনিক হিসেব ১১ কিলোমিটার (৭ মাইলের) সাথে ভালোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইবনুল হাইছাম তার তত্ত্ব বা থিউরিগুলো যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ ব্যবহার করতেন। এটা তার সময়ে বেশ উদ্ভট বিষয় ছিল, যেহেতু ওই সময় পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান অনেকটা দর্শনের মতোই ছিল এবং সেখানে পরীক্ষা- নিরীক্ষার বালা ছিল না। কোনো তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ একটি শর্ত, এই ধারণা তিনিই সর্বপ্রথম চালু করেন এবং তার গ্রন্থ "কিতাব আল-মানাযির" মূলত টলেমির Almagest গ্রন্থের সমালোচনা। এক হাজার বছর পর আজও এ গ্রন্থ অধ্যাপকদের দ্বারা উদ্ধৃত হয়। তিনি তার গবেষক শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় তথ্যনির্ভর হতে বলেন। কিছু বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন যে, আলোকবিজ্ঞানে স্নেলের সূত্র প্রকৃতপক্ষে ইবনে সাহলের গবেষণা কর্ম থেকে উদ্ভূত।
الواجب على الناظر في كتب العلوم، إذا كان غرضه معرفة الحقائق، أن يجعل نفسه خصماً لكل ما ينظر فيه.
"সত্য জানাটাই যদি গবেষকের মূল্য লক্ষ্য হয়, তবে তার জন্য আবশ্যক তার পড়া সবকিছুকে তার শত্রুতে পরিণত করা।" - ইবনুল হাইছাম
ক্যামেরা অবস্কিউরা
দৃষ্টিশক্তির নতুন ধারণা
এক ব্যক্তির কারাবাস
আবিষ্কার করে- কীভাবে আমরা দেখি, তার কার্যকালাপ
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: আমাদের চোখ থেকে নির্গত রশ্মিই কোনো বস্তুকে দৃশ্যমান করে, এই প্রাচীন ধারণা ইবনুল হাইছাম সমূলে উৎপাটন করেন।
স্থান: কায়রো, মিশর
তারিখ: ১১শ শতাব্দি
প্রধান ব্যক্তিত্ব: ইবনুল হাইছাম
আমরা কীভাবে দেখি? এই প্রশ্নের সমাধানে প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতদের মাঝে শতাব্দীর পর শতাব্দি ধরে তর্ক-বিতর্ক লেগেই ছিল। কেউ বলেন, আমাদের চোখ থেকে রশ্মিগুচ্ছ বেরিয়ে আসে, আবার কেউ মনে করেন, কোনো বস্তুকে দৃশ্যমান করার জন্য কিছু একটা আমাদের চোখে প্রবেশ করে।
ইবনুল হাইছাম ইরাকের বসরাতে ৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার জীবদ্দশাতে আলোকরশ্মি ও দৃষ্টিশক্তির ব্যাপারে আমাদের জানা সবকিছুকেই সম্পূর্ণরূপে বদলে দেন - যদিও তার এই বৈজ্ঞানিক সততার জন্য তাকে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে।
ঘটনাটি ছিল এরূপ: নীলনদের পূর্বাভাসহীন বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কায়রোর তৎকালীন খলীফা ইবনুল হাইছামকে ডেকে পাঠান এবং তিনি এটার কোনো সুরাহা করতে পারবেন কিনা, তা জানাতে বলেন। নিজের সামর্থ্যের উপর আস্থাবান ইবনুল হাইছাম দম্ভ সহকারে ভাবেন যে, বাঁধ ও কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করে এই বিশাল নদীকে শাসন করা যাবে। কিন্তু যখন তিনি তার নেয়া চ্যালেঞ্জের মাত্রা উপলব্ধি করেন, তখন বুঝে যান যে, এটা অসম্ভব একটা কাজ।
তার এই ব্যর্থতার জন্য খলীফার আক্রোশ থেকে পরিত্রাণ পেতে তিনি পাগলের ভান করার সিদ্ধান্ত নেন, আর তার সুরক্ষার জন্য খলীফা তাকে গৃহবন্দি করেন। এই কারাবাসের সময়ই ইবনুল হাইছাম ওই আবিষ্কার করে ফেলেন, যার জন্য তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হয়।
একদিন তিনি দেখেন, তার অন্ধকার কক্ষে একটি ছোট ফুটো (পিনহোল) দিয়ে আলো জ্বলজ্বল করছে এবং বিপরীত দেয়ালে বাহিরের দুনিয়ার ছবি বিচ্ছুরণ বা প্রতিচ্ছবি ফেলছে। আমাদের চোখ অদৃশ্য আলো পাঠায়, যার কারণে আমরা দেখতে সক্ষম হই, ওই সময়কার মানুষ এই প্রাচীন ধারণা বিশ্বাস করতো। কিন্তু ইবনুল হাইছাম উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃতপক্ষে দৃশ্যমান কোনো বস্তু থেকে আলোকরশ্মি নিসৃত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করলেই আমরা ওই বস্তু দেখতে সক্ষম হই।
একটি কালো কামরা 'ক্যামেরা অবস্কিউরা'-তে পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি দেখান যে, আলোকরশ্মি আমাদের চোখে জ্যামিতিক কোণক আকৃতির বিম্ব হিসেবে প্রবেশ করে। তিনি নানা ধরনের লেন্স ও দর্পণ নিয়েও পরীক্ষা- নিরীক্ষা চালান। ১০১১ থেকে ১০২১ খ্রিস্টাব্দের মাঝে লিখিত "কিতাব আল-মানাযির" গ্রন্থে তিনি তার এই নতুন তত্ত্বগুলোকে লিপিবদ্ধ করেন।
ইবনুল হাইছাম উপলব্ধি করেন যে, মানুষ মাত্রই ভুলপ্রবণ। তাই তিনি তার দেখা প্রাকৃতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে সত্য উন্মোচনের জন্য সত্যায়ন, মূল্যায়ন ও পরীক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। চাঁদ যখন আকাশের দিগন্তে থাকে, তখন তাকে বেশ বড়ো দেখায়, বিষয়টি অতীত ও বর্তমানের বহু মানুষের মতো ইবনুল হাইছামকেও অবাক করতো। পূর্বের বিদ্বানগণ এটাকে বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে সৃষ্ট বলে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু ইবনুল হাইছাম প্রথমবারের মতো অত্যন্ত নির্ভুলভাবে বলেন যে, এটা দৃষ্টিভ্রম তথাপি কেন এমনটি ঘটে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা আজও নিশ্চিত নয়।
পরবর্তীতে ১২৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম নেয়া পারসীয় গণিতবিদ কামালুদ্দীন আল-ফারিসী ইবনুল হাইছামের রেখে যাওয়া তত্ত্ব উপাত্তের উপর কাজ করেন। রংধনুর রঙসমূহের ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টায় আল-ফারিসী বৃষ্টির ফোঁটার মডেল হিসেবে পানিপূর্ণ একটি গোলক আকৃতির দর্পণ নেন এটা দেখাতে যে, সূর্যের আলো পানির ফোঁটার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দু'বার বেঁকে যায়। ইবনুল হাইছামের প্রমাণ অনুসন্ধান পরবর্তী বিদ্বানদের পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান এবং যুক্তিনির্ভর পন্থার বিকাশের দৃশ্যপট তৈরি করে দেয়।
"আলোকরশ্মি দ্বারা আলোকিত যে কারো (এবং অবশ্যই স্বআলোকিত বস্তুর ক্ষেত্রেও) আলো বিপরীত দিকে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণে চোখ যখন কোনো দৃশ্যমান বস্তুর বিপরীতে থাকে এবং ওই বস্তু কোনো না কোনোভাবে আলো দ্বারা আলোকিত হয়, তখন দৃশ্যমান বস্তুর আলোকবিম্ব থেকে আলো চোখের উপরিতলে প্রবেশ করে।" - ১১শ শতাব্দির ইবনুল হাইছামের "কিতাব আল-মানাযির" গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত
"কিতাব আল-মানাধির" -সহ ইবনুল হাইছামের বহু কর্ম লাতিন ভাষায় অনুদিত হয় এবং তার কর্ম ও পদ্ধতি দ্বারা যারা প্রভাবিত হয়েছেন, তাদের মাঝে রয়েছেন: রজার বেকন, লিওনার্দো দা ভিঞ্জি ও ইয়োহান কেপলার। বর্তমানে অনেক আধুনিক আবিষ্কারই রশ্মি ও দৃষ্টির নির্ভুল উপলব্ধির উপর নির্ভর করে, যার মূলভিত্তিগুলো এক হাজার বছর আগে ইবনুল হাইছাম প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন।
📄 ফ্যাশন এবং স্টাইল
ফ্যাশন আসে আর যায়, কিন্তু সুন্দর ও মার্জিত রুচি কখনো ফ্যাশনহীন হয় না। আর তাই বর্তমান সময়ের জ্ব ইউরোপীয় স্টাইল ও সাজ-সজ্জার জন্ম ১২০০ বছর আগেকার ইসলামী বিশ্বের অঙ্গীভূত স্পেনে হয়েছিল, এটা জেনে অবাক হওয়ার মতো কিছুই নেই।
সঙ্গীতজ্ঞ ও শিষ্টাচার গুরু যিরইয়াব ছিলেন ৯ম শতাব্দির স্পেনের কর্ডোবার একজন ধারা প্রবর্তক ও স্টাইলের জীবন্ত কিংবদন্তী (আইকন)। "তিনি তার সাথে করে ফ্যাশন নিয়ে আসেন। ওই সময় বাগদাদ ছিল আজকের যুগের প্যারিস বা নিউইয়র্ক ... বাগদাদ থেকে স্পেন পর্যন্ত চিন্তা ও ভাবনার এক অন্তঃপ্রবাহ ছিল, যার বদৌলতে তিনি তার সঙ্গে করে দাঁতের মাজন, গন্ধনাশক ও ছোট করে চুল কাটার ধরন নিয়ে যান ... (ওই সময়ে) কর্ডোবাতে রাস্তাগুলো রাত্রি বেলায় আলোকসজ্জিত ছিল, আরও ছিল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও প্রবহমান পানি" যেমনটি লেখক জেসন ওয়েবস্টার বিবিসি নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র An Islamic History of Europe-এ যিরইয়াব সম্পর্কে রাগেহ উমরের সাথে আলাপকালে বলেন।
ইরাকের বাগদাদ ছিল মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র, যেখান থেকে যিরইয়াব সঙ্গে করে আরও নিয়ে গিয়েছিলেন খাবার টেবিলের নতুন থালাবাসন, নতুন জৌলুসময় ফ্যাশন, এমনকি তিনি দাবা ও পোলো (ঘোড়ার পিঠে চড়ে দীর্ঘ মুগুরসদৃশ লাঠিযোগে বল খেলা) পর্যন্ত সাথে করে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন মার্জিত রুচির একজন খ্যাতিমান সারগ্রাহী ব্যক্তি যিনি নানা চিন্তা ও ভাবধারা থেকে কল্যাণকর জিনিস আহরণ করেন; এবং তার নাম আভিজাত্যের সাথে একসূত্রে গাঁথা। তিনি তার পরিমার্জিত ও বিলাসী পন্থা দ্বারা খলীফার দরবারকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, যেখানে সাধারণ কর্ডোবাবাসী তার চুল ছোট রাখার নতুন স্টাইল অনুসরণ করতো এবং স্পেনে তার বয়ে আনা চামড়ার আসবাবপত্রগুলো তারা বেশ উপভোগ করতো।
১২০০ বছর পরে যিরইয়াব সম্পর্কে ফরাসি ঐতিহাসিক হেনরি টেরাস বলেন, "তিনি শীত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাক চালু করেছিলেন এবং এসব পোশাক পরিধানের নির্দিষ্ট দিনক্ষণও তিনি ঠিক করে দিয়েছিলেন। দুই মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অর্ধ মৌসুমি পোশাকও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তার মাধ্যমে পূর্বের বিলাসী পোশাকগুলো স্পেনে পরিচিতি পায়। তার প্রভাবে একটি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন হয়েছিল, যেখানে রঙিন ছাপযুক্ত বস্ত্র ও স্বচ্ছ বুননের জ্যাকেট প্রস্তুত করা হতো, যেগুলো আজও বর্তমান মরক্কোতে পাওয়া যায়।"
যিরইয়াবের এসব অর্জন তাকে এনে দেয় পরবর্তী প্রজন্মের সম্মান, আজকের দিন পর্যন্ত। মুসলিম বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে যিরইয়াবের নামে কোনো রাস্তা, হোটেল, ক্লাব কিংবা ক্যাফের নামকরণ হয়নি। পশ্চিম বিদ্বান ও সঙ্গীত শিল্পীরা আজও তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
মুসলিমগণ বিশেষত আন্দালুসের মুসলিমগণ জীবনযাত্রার এক অত্যাধুনিক ঢং বেছে নিয়েছিল, যা মৌসুমি প্রভাবের উপর নির্ভরশীল ছিল।
বিশেষ ধরনের খাবার বেছে নেয়া এবং নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক ও ধাতু ব্যবহার করাটা আরাম-আয়েশ ও সুখ- সমৃদ্ধি বয়ে আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শীতকালের পোশাক অপরিহার্যভাবে উষ্ণ তুলা কিংবা পশমি উপাদান দিয়ে বানানো হতো এবং এগুলোর রঙ সাধারণত কালো হতো। গ্রীষ্মের পোশাক হালকা উপাদান - যেমন: তুলা, রেশম ও শন - দিয়ে তৈরি হতো এবং সেগুলো বেশ উজ্জ্বল রঙের হতো।
"শৈলী, ঐকতান, সাবলীলতা এবং উপভোগ্য তালের সৌন্দর্য নির্ভর করে সরলতার উপর।" - প্লেটো, গ্রিক দার্শনিক
আন্দালুসের মুসলিমগণ গ্রিকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ওক কাষ্ঠনির্ভর কিছু ইন্ডাস্ট্রি এবং সেইসাথে পাতলা ছালের তলাবিশিষ্ট জুতার প্রস্তুতপ্রণালীও উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করেছিল। তারা উৎপাদন কৌশলকে আরও গতিশীল ও বৈচিত্রময় করে তোলে এবং পাতলা ছালের তলাবিশিষ্ট জুতা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং এটা তাদের প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়। এই জুতাকে কুরক বলে [বহুবচন আকরাকা], যা পরবর্তীতে কাস্টালিয়াতে এসে আলকোরকে (Alcorque) পরিণত হয়। এই পণ্যের কারিগরদের কারাক বলা হতো। এমনই এক কারিগর ছিলেন সেভিলের চটিজুতা প্রস্তুতকারী সূফী আবদুল্লাহ, যেমনটি মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী উল্লেখ করেছেন। এই ব্যবসা পণ্যের কারিগরগণ গ্রানাডার যে এলাকায় বসবাস করতেন, সেটাকে কারাকীন বলা হতো, বর্তমানে এটা কারাকুইন হিসেবে পরিচিত।
আল-সাক্বাতী ও ইবনে আবদুন নামের দু'জন মধ্যযুগীয় মুসলিম লেখক পাতলা ছালের তলাবিশিষ্ট জুতার প্রস্তুতপ্রণালীর বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেন এবং তাতে লক্ষণীয় যে, জুতার তলায় ব্যবহৃত চামড়া পরিমাণে অপর্যাপ্ত হতে পারবে না; চামড়ার সাথে চামড়া সেলাই করতে হবে এবং মাঝে কিছু দিয়ে ভরাট করা যাবে না। কিছু জুতা প্রস্তুতকারীরা জুতার হিল বা গোড়ালীকে উঁচু করার জন্য হিলের নিচে বালু প্রবেশ করাতো, তবে জুতা জীর্ণ হয়ে গেলে তা আবার ভেঙে যেত। ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের দ্বারা আন্দালুসের পতনের পর তারা আরও উন্নত স্টাইল ও প্রস্তুতপ্রণালী চালু করে।
তাই এরপর থেকে যখনই আপনি জাঁকজমকপূর্ণ নকশাকার দোকানে সর্বশেষ ফ্যাশন সামগ্রী কিনতে যাবেন, তখন এর হাজার বছর আগেকার হাই- হিল (উঁচু গোড়ালিবিশিষ্ট) জুতার কথা স্মরণ করবেন। যখনই আপনি পরার জন্য গ্রীষ্মকালীন পাতলা ট্রাউজার জোড়া বা অন্যকোনো পোশাক নেবেন, তখন ১২০০ বছর আগের 'কালোপাখি' যিরইয়াবের কথা মনে করবেন। কেননা ওই সময় এ ধরনের চিন্তা-ভাবনাগুলো মুসলিম স্পেন, সিসিলি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে খ্রিস্টান ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছিল।